প্রেতাত্মা

হেমেন্দ্রকুমার রায়

বন্ধুদের মজলিশ। সিগারেট ও তামাকের ধোঁয়ায় ঘর যেন মেঘলা হয়ে উঠেছে। তাস-দাবা-পাশা চলছে অবিশ্রান্তভাবে, কারণ সেদিন রবিবার।

আমরা কয়জনে এককোণে বসে গল্পগুজব করছি।

হরেন বলেছিল, 'আচ্ছা নরেন, তোমার জীবনে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কী? বলতে পারো?'

'এম.এ. বি.এল. ডিগ্রি নিয়েও ত্রিশ টাকা মাইনে চাকরি পেয়ে হাসিমুখে বাড়িতে সেই খবর দেওয়া।'

'আর বরেন? তোমার জীবনে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কী ঘটেছে?

'বিবাহ।'

'আর কিছু নয়?'

'না। বাঙালির জীবনে বিবাহের চেয়েও স্মরণীয় ঘটনা আমি তো কল্পনাও করতে পারি না।'

'আর সুরেন?'

'মনে করতে পারচি না ভায়া! খুব সম্ভব, আমার জীবনে কোনো স্মরণীয় ঘটনা ঘটেনি—কেননা বরেনের মতো আমি বিবাহ পর্যন্ত করবার সুযোগ পাইনি। আমি খাইদাই বগল বাজাই—ব্যাস!'

আমি বললুম, 'কিন্তু আমার জীবনে সত্যই স্মরণ করে রাখবার মতো একটি ঘটনা ঘটেচে। তোমাদের শোনবার উৎসাহ থাকলে আমি শোনাবার কষ্ট স্বীকার করতে পারি।'

হরেন বললে, 'আরে, গল্প শোনবার উৎসাহ আছে বলেই তো এমন প্রশ্ন করেচি, তুমি অনায়াসে পালা শুরু করতে পারো।'

'তবে শোনো।'

পরেশবাবু ছিলেন—ছিলেন বলচি কেন, তিনি এখনও বর্তমান—আমার বিশেষ বন্ধু, যদিও আমার চেয়ে তিনি বয়সে অন্তত দশ-বারো বৎসরের বড়ো।

মফসসলে তাঁর মস্ত বড়ো জমিদারি। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ জমিদারদের মতন তিনিও মফসসলকে বয়কট করে কলকাতার বুকেই স্থায়ী আস্তানা গেড়ে বসেছেন। জমিদারি থেকে আসে তার রূপচাঁদ পক্ষীর ঝাঁক এবং সেই পক্ষীগুলিকে কী উপায়ে অতি চটপট উড়িয়ে দেওয়া যায়, কলকাতা শহর নিত্য তারই ব্যবস্থা করে।

পরেশবাবু বিপত্নীক। আমার সঙ্গে আলাপ হবার আগেই তাঁর স্ত্রী নাকি স্বামীকে একটিমাত্র কন্যারত্ন উপহার দিয়ে ইহলোক থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।

পরেশবাবু আর বিবাহ করেননি। স্বর্গীয়া স্ত্রী-র প্রতি তাঁর অনুরাগ অথবা তাঁর প্রতি ঘটকদের বিরাগই যে এর হেতু, আমার এমন মনে হত না। কারণ সাধারণ স্ত্রী-জাতির ওপরে পরেশবাবু প্রায়ই যে সমস্ত মতামত প্রকাশ করেন, তা শ্রবণ করলে অত্যন্ত সহিষ্ণু অন্তঃপুরেও আনন্দের কলরব উঠবে না।

তা বলে তোমরা কেউ মনে ভেবে বোসো না যে, তপ্ত তাজা রক্তমাংসের প্রতি পরেশবাবুর লোভের অভাব আছে। মোটেই নয়। শহরের পল্লিবিশেষে এই প্রবীণ বয়সে আজও তাঁর ঘন ঘন আনাগোনা বন্ধ হয়নি।

আমার বিশ্বাস, নারীর সঙ্গে পুরুষ যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, এইটেই তিনি সহ্য করতে নারাজ। নারীর বিদ্রুপভরা কটাক্ষ তাঁর কাছে কোনোদিনই ব্যর্থ হয়নি কিন্তু নারীর হৃদয়ের আবেদন তাঁর কাছে তারুণ্য রোদ মাত্র। তিনি দেহের পূজারি, মনের নন!

অনেকদিন মেলামেশার পরেও এরা কারা আবিষ্কার করতে পারিনি। সান্ধ্য-আসরে 'পেগ'-এর পর 'পেগ' ঢেলে দেখেছি, তাঁর অন্তরের দ্বার একটুও ফাঁক হয় না। অথচ বরাবরই অনুভব করেছি, তাঁর মনের ভিতর কী যে একটা রহস্য আপনাকে সন্তর্পণে আগলে রেখেছে।

পাঁচ বৎসর আগে হঠাৎ এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যার কোনো আভাস আমি আগে থাকতে দেব না। ঘটনা তোমাদের কাছে আমি সবিস্তারে বর্ণনা করতে চাই—কারণ সেরকম ঘটনা জীবনে দুবার ঘটে না।

একদিন পরেশবাবুর বাড়িতে বসে বাবুর্চির হাতে তৈরি রামপাখির উত্তপ্ত মাংস এবং ইংরেজের হাতে তৈরি 'জনি ওয়াকার'-এর সুশীতল 'আনন্দ' উপভোগ করছি, হঠাৎ তিনি বললেন, 'ওহে ভায়া, আসচে হপ্তায় আমার মেয়ের বিয়ে তা জানো তো?'

'হ্যাঁ, শুনেচি বটে। তবে প্রজাপতি-মার্কা অফিসিয়াল খবর এখনও পাইনি।'

'পাওনি, পাবে।... কিন্তু আমার ওই একটিমাত্র মেয়ে, তার বিয়েতে কিঞ্চিৎ সমারোহ না করলে কেন চলবে না!'

'হ্যাঁ, সমারোহের দরকার বইকী!'

'গায়ে-হলুদের দিনে মিনার্ভা থিয়েটার আসবে। ধর্মমূলক নাটক ''আত্মদর্শন''-এর অভিনয় করবে।'

'তাহলে নিমন্ত্রণ করলেও সেদিন আমি আর এমুখো না।'

'সে কী হে? ''আত্মদর্শন''-এর মতো নাটক, যার মহিমায় ''রঙ্গমঞ্চে ধর্মের প্রবল বন্যা প্রবাহিত'' হয়ে আছে—'

'রক্ষা করো পরেশদা, আমি থিয়েটারের ''গ্যালারি পিট''-র বাসিন্দা নই। যেদিন ধর্মের দিকে মতি হবে সেদিন নিশ্চয় কোনো গুরুদেবের আশ্রয় গ্রহণ করব। কারণ বারবনিতার পিতলের নূপুরের চটুল বোলের তালে তালে তৈরি সুলভ বুকনি সহ্য করতে আমি একান্তই নারাজ।'

'কিন্তু কামিনীকাঞ্চন ত্যাগী রামকৃষ্ণ পরমহংসের মতন মহাপুরুষও রঙ্গালয়ে গিয়ে ভাবে বিভোর হয়ে উঠতেন, কী তুমি জানো না?'

'শুনেছি! কিন্তু আমি তো রামকৃষ্ণ পরমহংস নই, সামান্য মানুষ মাত্র—কামিনী আর কাঞ্চন, দুইই আমার কাছে সমান লোভনীয়।'

'আর উপায় নেই, বায়না হয়ে গেছে।'

'তাহলে গায়ে-হলুদের রাত্রে আমি আমার বাড়িতেই নামহয় পুঁইশাক আর কুঁচো চিংড়ি দিয়ে ''ডিনার'' ভক্ষণ করব।'

'একেবারেই এতটা হতাশ হোয়ো না ভায়া! তারপর বিয়ের দিনও আছে তো। সেদিন তুমি কী করতে চাও?'

'আমি বলি, বিয়ের দিনে শহরের কোনো ভালো বাইজিকে আনানো হোক।'

'ভালো বাইজি? আমার আপত্তি নেই। কিন্তু কাকে আনাব?'

'সরলা-বাইজি? শুনেছি, সে চমৎকার গায়।'

'কিন্তু তাকে দেখতে কেমন? তার বয়স কত?'

'তাকে দেখতে কেমন, তা আমি বলতে পারি না, কারণ তাকে আমি কখনো দেখিনি। তার বয়স কত, তা আমি জানি না, কারণ তার ঠিকুজি কি কুষ্ঠি কখনো আমার চোখে পড়েনি। আমি খালি এইটুকুই শুনেছি যে, সরলা বাইজির গান নাকি বীণাপাণির বীণাধ্বনির মতো— একদিন শুনলে চিরদিন মনে থাকে।'

'বেশ, সে যদি সুন্দরী হয়, আমার হয়ে তুমিই তাকে নিয়ে এসো।'

'আর, সে যদি সুন্দরী না হয়?'

'তাহলে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ আমার মতে কুৎসিত নারী হচ্ছে ভগবানের মূর্তিমান অভিশাপের মতন। পূর্ণিমার রাত্রে কোকিল যখন দূর থেকে ডাকে, তখনই তা ভালো লাগে। কিন্তু সে যখন চোখের সামনে বসে হাঁ করে চেঁচায়, তখন আমার কানে ধরে তালা, চোখে ছোটে ঘুম, আর গায়ে আসে জ্বর।'

সরলা বাইজিকে দেখলুম।

বন্ধু আমার যৌবনের ভক্ত, কিন্তু সরলা বাইজি যুবতি নয়।

তবে, আজও তাকে জরা আক্রমণ করেনি। তার বয়স হবে অন্তত চৌত্রিশ কি পঁয়ত্রিশ, কিন্তু তার অপূর্ব সৌন্দর্যের লোভে যৌবনের তারুণ্য আজও যেন তাকে ভুলে বিদায় নিতে পারেনি। অধিকাংশ পঞ্চদশী কি ষোড়শীর চটুল নবীনতা তার সামনে এলে, উষার অচঞ্চল মাধুরীর স্পর্শে পূর্ণিমার চপল জ্যোৎস্না-কিরণের মতন পরিম্লান হয়ে যায়!

জানি না, প্রথম যৌবনে তার রূপ ছিল কীরকম মারাত্মক! জানি না, তার ওই দেহদুর্গের মধ্যে বন্দি হয়ে আজ কত পুরুষের প্রণয়-স্মৃতি নীরবে হাহাকার করছে।

কিন্তু সে যখন তার ডাগর ডাগর দুটি চোখের স্বপন দুলানো দৃষ্টি আমার চোখের উপরে লীলায়িত করে ভৈরব রাগিণীর মতো মধুর স্বরে বললে, 'আপনার কী দরকার?'—তখন তার খুব ছোট্ট এই জিজ্ঞাসাটি পৃথিবীর যেকোনো শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতার চেয়ে চমৎকার বলে মনে হল।

ধীরে ধীরে মুগ্ধের মতো বললুম, 'আপনাকে গান শোনাতে যেতে হবে।'

'কোথায়?'

'এক বিয়েবাড়িতে।'

'কবে?'

তারিখ বললুম।

সে আপত্তি করলে না।

বলা বাহুল্য সরলাকে দেখে পরেশবাবুর চক্ষু স্থির হয়ে গেল, বিস্ময়পূর্ণ মৌন প্রশংসায়। তিনি এমন দৃষ্টিতে তার মুখের পানে তাকিয়ে রইলেন যে, সরলা যেন অত্যন্ত লজ্জিতভাবেই নিজের মুখখানি অন্যদিকে ফিরিয়ে দিলে। তাদের অকুণ্ঠ চোখের ভাষা পুরুষের ক্ষুধিত চাউনি দেখলে দ্বিগুণতর স্পষ্ট হয়ে পালটা জবাব দিতেই অভ্যস্ত, তাদেরই একজনের কাছ থেকে লজ্জায় এই ভঙ্গিটি দেখবার আশা আমি করিনি নিশ্চয়ই।

পরেশবাবু কার্যান্তরে গেলে পর সরলা খুব চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করলে, 'উনি কে?'

আমি বললুম, 'উনিই এ বাড়ির কর্তা।'

সরলা যেন আবার কী প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ থেমে পড়ে হারমোনিয়ামটা নিয়ে অকারণে নাড়াচাড়া করতে লাগল।

বিয়েবাড়ির উজ্জ্বল আলোকমালা তার চপল চোখের উপরে, তার রত্নখচিত অলংকারের উপরে পড়ে নৃত্য করছিল।... নিমন্ত্রিতরা সকলেই যতটা সম্ভব তার কাছে ঘেঁষে সরে এসে বসল।

সরলা মাটি থেকে দৃষ্টি না তুলেই বললে, 'তাহলে আমি গান শুরু করি?'

আমি বললুম, 'শুধু গান নয়, নাচও শুরু করুন।'

সরলা বললে, 'মাফ করুন, আমি নাচতে পারব না।'

পরেশবাবু বললেন, 'তাও কি হয়, সকলেরই মুখে আপনার নাচের সুখ্যাতি শুনি!'

সরলা ভুরু কুঁচকে একবার পরেশবাবুর মুখের উপরে চকিতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই আবার মুখ নামিয়ে নিলে। তারপর ধীরে ধীরে বললে, 'আজ আমার পায়ে বড়ো ব্যথা...'

পরেশবাবু হতাশভাবে বললেন, 'তাহলে আর উপায় কী? গানই হোক।'

'কী গান গাইব, বাংলা না হিন্দি?'

শ্রোতাদের অধিকাংশই বাংলা গান শুনতে চাইলে।

সরলা হারমোনিয়ামের ওপরে অঙ্গুলিচালনা করে গাইলে—

দখিন বাতাস বয়ে যায় সখী,

কে আর ভরিবে জীবন-ডালা,

ঝরিয়া গিয়াছে মরম-মুকুল,

কী-দিয়ে সজনি গাঁথিব মালা?

আজও মনে আছে কতদিন আগে,

সেধেছিল বাঁশি আদর-সোহাগে,

সেদুটি অধর মিলন-পিয়াসি,

সে দুটি নয়ন অমিয়-ঢালা!

তেমনি হাসিছে রুপালি চাঁদিনি,

গেয়ে গেয়ে চলে নটিনী তটিনী,

তবু কেন এই মধুর ভুবনে

আমারই ফুরাল গানের পালা!

যেমন বিষাদভরা কণ্ঠ, তেমনি বিষাদভরা সংগীত-সরলার প্রজাপতির মতন লঘু জীবনের সঙ্গে দুটির কোনো যেন মেলে না!

তার মুখের পানে চেয়ে আমার মনে হল, বিয়েবাড়ির উজ্জ্বল আলোকমালা তার চোখের উপরে এখন যেন আর নৃত্য করছে না! তার মুখ যেন আর নটীর মুখ নয়।

ইতিমধ্যে বর এসে পড়ল, আমাকে আসর ছেড়ে বাইরে যেতে হল। সমস্ত তদারক করবার ভার ছিল আমার উপরে।

বর-কন্যাকে সভাস্থ করে আমি বরযাত্রীদের আহারের ব্যবস্থা করবার জন্যে বাড়ির ভিতরে গেলুম। তারপর আর গানের আসরে আসবার সময়ই পেলুম না। মাঝে মাঝে কেবল দূর থেকে সরলার করুণ কণ্ঠের করুণ গানের কথা কানে এসে বাজতে লাগল এবং নানান কাজের ভিতরেও বার বার আমার মনে হতে লাগল, রূপ জীবিকা, আনন্দ কিনতে মানুষ যার কাছে যায়, হাসি বিলানোই যার ধর্ম, তারই বুকের ভিতরে কীসের দুঃখ জমা হয়ে আছে যে আজকের এই উৎসবের আসরেও তার গানের সুর এমন অশ্রান্ত আর্তনাদ করছে?

অতিথিদের আহারাদি সাঙ্গ হল, বিয়েবাড়ির জনতা ক্রমেই শীর্ণ হয়ে পড়ল।

পরেশবাবু আমার হাতে খানকয়েক নোট দিয়ে বললেন, 'ভায়া, আমার এখন নীচে নামবার অবসর নেই, তোমার বাইজিকে আদর করে খাইয়ে এসো। আর নোটগুলো তাকে দিয়ো।'—একটু থেমে তিনি আবার বললেন, 'এই হট্টগোলে তার সঙ্গে আজ আলাপ করা হল না। আর-একদিন সে চেষ্টা করা যাবে অখন। ঠিক স্মরণ হচ্ছে না, কিন্তু এই সরলাকে আমি যেন আর কোথাও দেখেছি।'

আমি বললুম, 'তার আর আশ্চর্য কী,—দুই পক্ষই পুরাতন পাপী।'

পরেশবাবু যেন তাঁর স্মৃতি-সাগর মথিত করতে করতে ধীরে ধীরে মৃদুস্বরে বললেন, 'হ্যাঁ, আমরা দুজনেই পুরাতন পাপী বটে, কিন্তু—কিন্তু, আমার মনে হচ্ছে যেন, এর আগে অনেকের সাথে আমাদের দেখা হয়নি। যেন—যেন—'বলতে বলতে তিনি নির্বাক হয়ে পড়লেন।

আমি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলুম। উঠানের আসরে একজন তখন আর নেই বললেই হয়।

ঠাকুরদালানের উপরে বর-কন্যার শূন্য সিংহাসন পড়ে আছে। সেইদিকে নিষ্পলক নেত্রে তাকিয়ে, আসরের মাঝখানে সরলা চুপ করে বসে আছে—জড়প্রতিমার মতো।

তার কাছে গিয়ে বললুম, 'আপনাকে একবার উঠতে হবে।'

সরলা বোধহয় একমনে কী ভাবছিল। আমার গলার আওয়াজে অত্যন্ত চমকে উঠে সে বললে, 'অ্যাঁ?'

'আমার সঙ্গে একবার এদিকে আসুন।'

সরলা কোনো কথা না বলে কলে চলা পুতুলের মতো আমার সঙ্গে সঙ্গে পাশের একটি ঘরে এসে দাঁড়াল।

আমি বললুম, 'আপনাকে আজ এখানে কিছু খেয়ে যেতে হবে।'

সে যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠে ব্যস্ত ও কাতরভাবে বললে, 'খেয়ে যেতে হবে? না—না—আমি খেতে পারব না—আমার শরীর বড়ো খারাপ—আমাকে মাফ করুন।'

'কেন, তাতে কোন—'

'দয়া করে আমাকে আর অনুরোধ করবেন না— আমি পারব না!'

'তাহলে আপনার দর্শনি নিন', বলে আমি নোটগুলো তার পায়ে গুঁজে দিলুম।

কিন্তু নোটগুলো তখনই মেঝের উপরে ফেলে দিয়ে আমাকে হঠাৎ বিস্ময়ে বিহ্বল করে সরলা উদ্ভ্রান্ত স্বরে বলে উঠল, 'আমি টাকা চাই না—আমি টাকা চাই না—খালি এখানে একটি রাত থাকতে চাই—খালি একটি রাত! কেউ জানতে পারবে না, আমি এই ঘরে লুকিয়ে থাকব—তারপর কাল বর-কন্যা বিদায় হলেই আমি আবার লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে যাব। আমাকে থাকতে দেবেন? বলুন—বলুন—অভাগিনির উপরে দয়া করুন!'—বলতে বলতে আচম্বিতে বসে পড়ে দুই হাতে সে আমার দুই পা প্রাণপণে চেপে ধরল।

কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো কাঠ হয়ে আমি দাঁড়িয়ে রইলুম—আমার দুই পা এই বিচিত্রা নারীর তপ্ত অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে গেল!

...অনেক কষ্টে নিজেকে কতকটা সামলে নিয়ে বললুম, 'এ কী, আপনি করছেন কী! পা ছাড়ুন—পা ছাড়ুন—লোকে দেখলে কী বলবে?'

'না, পা আমি ছাড়ব না—আগে বলুন, আজকে আমাকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেবেন না?'

'কিন্তু এখানে থাকবার জন্যে আপনি এমন কাকুতিমিনতি করছেন কেন?'

'কেন? কিন্তু বললে কি আপনি বিশ্বাস করবেন?'

'বিশ্বাস না-করবার কোনো কারণ নেই!'

'এ আমার স্বামীর বাড়ি।'

'কী? কী বললেন?'

'এ আমার স্বামীর বাড়ি। আর... যে মেয়ের আজ বিয়ে হল, আমি তার মা!'

চরম বিস্ময়ে আমি যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলুম!

'বিশ্বাস করুন, আমি তার মা, তার গর্ভধারিণী বাড়ির কর্তাকে দেখেই চিনতে পেরেছিলুম—তারপর বরের পাশে আমার মেয়েকে দেখলুম! আমার মন ছুটে গিয়ে তখনই তাকে কোলে নিতে চেয়েছে, আমার সমস্ত প্রাণ চিৎকার করে কেঁদে উঠতে চেয়েছে—তবু আমি গান গেয়েছি—গানের পর গান গেয়েছি—পাছে লোকে সন্দেহ করে—পাছে আমার মেয়ের কোনো অনিষ্ট হয়! কান্নায় আমার বুক ভরে আছে—আর আমি পারছি না গো, না কেঁদে আর পারছি না!'

আমি বললুম, 'কিন্তু পরেশবাবুর স্ত্রী যে মারা গেছেন।

'না, লোকে জানে তা-ই, কিন্তু আমি মরিনি! জীবনে স্বামীর সঙ্গ পেয়েছি দু-দিনের জন্যে, স্বপ্নের মতো। তারপর তিনি থাকতেন কলকাতায়, আমি থাকতুম দেশে—বছরে দু-তিন দিনের বেশি দেখা পেতুম না। মনের ভুলে একদিন পথে এসে দাঁড়ালুম, আত্মীয়েরা প্রচার করলে আমি মরেছি! আজ ষোলো বৎসর পরে প্রেতাত্মার মতো আবার আমি ফিরে এসেছি;—সকলের অজান্তে প্রেতাত্মার মতোই আবার আমি চলে যাব।... কিন্তু আর একটি রাত আমাকে এখানে থাকতে দিন! আমি মহাপাপী, আমার ইহকাল নেই পরকালও নেই—তবু যে আমি মা! আমার বাছা কেমন করে স্বামীর ঘর করতে যায়, নিজের চোখে একটিবার দেখে যাব! সে যে আমার মেয়ে, ওগো আমি যে তার মা।'

সরলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল—সে এক কলঙ্কিনীর কান্না না, মাতৃত্বের কান্না!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%