হেমেন্দ্রকুমার রায়
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!
কী বলচেন?— হাসচি কেন? হুঃ— হাসচি কেন!— কে জানে! হয়তো কাঁদতে পারচি না বলেই হাসচি! আমার বুকের ভিতরে বালির চড়া পড়ে গেছে কিনা! শুকিয়ে গেছে গো, শুকিয়ে গেছে। চোখ দিয়ে তাই আর জল আসে না। আমি কান্নার বদলে তাই শুধু হাসচি আর হাসচি!
—হ্যাঁ, যা বলছিলুম। বাবা তো কিছুতেই আমার দিকে মুখ তুলে তাকালেন না। আমার হয়ে বলতে গিয়ে উলটে মা তাঁর কাছে ধমক খেলেন।
বাবা বললেন, 'পঞ্চাশ হাজার টাকা আমি কখনো চোখেও দেখিনি। মেয়ে অন্ধ, তা হয়েচে কী! এতগুলো টাকা কি ছাড়া যায়?'
মেয়ে চোখে দেখতে পায় না, বাবাও পঞ্চাশ হাজার টাকা কখনো চোখে দেখেননি। বিয়ে হলে মেয়ে যদিও চোখে দেখতে পাবে না, কিন্তু বাবা তো এতগুলো টাকা চোখে দেখতে পাবেন!— ব্যাস, তাহলেই হল, তাহলেই হল! তাঁকে টাকা দেখাবার জন্যে আমাকে বিয়ে করতে হবে।
মা বড়ো অবুঝ। স্ত্রীলোক কিনা। বললেন, 'তবু ছেলেটার দিকেও তো একবার তাকাতে হয়!'
বাবা রেগে বললেন, 'ভগবান যাকে মেরেচেন, আগে তার দিকে তাকানো উচিত! জানো সে অন্ধ!'
হাঃ হাঃ— বাবার কী ধর্মজ্ঞান! কিন্তু বাবা আমার এ সহজ কথাটা ইচ্ছে করেই বুঝলেন না যে, ভগবান যাকে মেরেচেন, দুনিয়ায় আমি ছাড়া তার দিকে তাকাবার জন্যে আরও ঢের লোক আছে। এ বাংলা যে দয়ায় ভরা! পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে পারলে এখানে অন্ধ হলেও বিয়ে বন্ধ থাকে না; বাঙালি বরের বাপ টাকা পেলে চিতা থেকেও মরা মেয়েকে ছাদনাতলায় টেনে নিয়ে যেতে পারে!
বাবা আবার বললেন, 'আমার যদি বয়স থাকত, এ মেয়েকে তাহলে আমিই বিয়ে—'
মা তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললেন, 'চুপ করো, চুপ করো! কী বলচ তুমি!'
বাবা ঠিকই বলচেন। তিনি যে পরমহিন্দু। দু-বেলা সন্ধ্যাহ্নিক করেন, মাথায় টিকি, গলায় পইতে রাখেন, ভগবান যাকে মেরেচেন তার দিকে তিনি তাকাবেন না?
হাঃ হাঃ!—
আমারও,— তাতে আপত্তি ছিল না।
খ
দুঃখের কথা, পঞ্চাশ হাজার টাকা চোখে দেখবার অবকাশ বাবা বেশি দিন পেলেন না। মৃত্যু এসে আমার এই অন্ধ বধূর মতো বাবাকেও অন্ধ করে অন্ধকারে নিয়ে গেল। জানি না, ইহলোকের এই পঞ্চাশ হাজার টাকার আওয়াজ তিনি তাঁর বৈতরণীর পরপার থেকে শুনতে পাচ্চেন কি না।
হাহাঃ!— আর, আর— আমার এই হাসির শব্দ! এও কি তাঁর কানে যাচ্চে? এ হাসির শব্দ কি তাঁর বুকের হাড়ে হাড়ে, তাঁর পাঁজরে পাঁজরে গিয়ে ঘা মারচে, মারচে, মারচে? আমি এটা জানতে চাই। কেউ বলতে পারো?
বেণু শুধু অন্ধ নয়। ভগবান তাকে অন্ধকারের মতো কালো করে, আমার মুখের সামনে বিষের পাত্র পূর্ণ করে রেখেচেন।
কিন্তু তার নাম রাখলে কে? নামের এমন সার্থকতা আমি আর কখনো দেখিনি! আশ্চর্য! তার সমস্ত রূপের অভাব, চোখের অভাব যেন এই মধুর, কোমল অথচ বিষাদ-মাখা স্বরের ভিতরে পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল।
কিন্তু, সে অন্ধ। সে কালো। তার দিকে চাইতে আমার ঘৃণা হত; আমার রাগ হত। আপনার চির-অন্ধকারের মধ্যে ডুবিয়ে কেন সে আমার জীবনকেও অন্ধকার করে দিলে? কেন দিলে— কেন?
সে বাড়ির অন্য অন্য সকলকার পায়ের শব্দের ভিতর থেকে আমার পায়ের শব্দ ঠিক চিনে নিতে পারত। এটা আমি লক্ষ করে দেখেচি। আমার পদশব্দ শুনলেই সে মুখ তুলে উৎকর্ণ হয়ে থাকত। কিন্তু, আমি যে তাকে ঘৃণা করি, এটা সে বুঝতে পারত। কারণ, আমি তার কাছে গেলে সে সরে যেত। নয়তো কেমন যেন জড়সড় হয়ে অপরাধীর মতো বসে থাকত। আর-এক আশ্চর্যের কথা, আমার সঙ্গে এতদিন সে একটাও কথা বলেনি। এক অন্ধ, অন্ধকার মৌনের মতো সে আমার প্রাণমনের উপরে চেপে বসেছিল।
তাকে কথা কওয়াবার জন্যে আমিও কিছু ব্যস্ত ছিলাম না। আমিও তার সঙ্গে কথা কইনি।
এমনিভাবে এক বছর গেল। এই এক বছর আমরা কেউ কারো সঙ্গে একটাও কথা কইনি। স্বামী-স্ত্রী-র মাঝে এমন নীরবতা যে থাকতে পারে, আগে আমার এ জ্ঞান ছিল না। ওঃ! তোমরা এ কল্পনা করতে পারবে না। এ নীরবতা অসহ্য— অসহ্য— অসহ্য!— হ্যাঁ, অসহ্য বটে,— তবু এ নীরবতা ভঙ্গ করবার সাহস আমাদের কারো ছিল না।
গ
আমি জীবনটাকে উপভোগ করছিলাম।
আমার যৌবনের ভিতরে অনেকখানি ফাঁক থেকে গিয়েছিল। ইচ্ছার বিরুদ্ধে যার পূর্ণ যৌবনের তপ্ত রক্তধারা অপব্যয় হয়, তার কষ্ট সকলে বুঝতে পারবেন না।
বন্ধুরা পরামর্শ দিলেন, ক্ষতিপূরণ করো। লোহার সিন্ধুকে পঞ্চাশ হাজার টাকার কোম্পানির কাগজ মজুত রেখে, বাবা (অনিচ্ছাসত্ত্বে কি না, জানি না!) পরলোকে প্রস্থান করেছিলেন!— কিন্তু দুঃখের বিষয়, সিন্ধুকের চাবিটি তিনি ট্যাঁকে করে নিয়ে যেতে পারেননি।
সেই পঞ্চাশ হাজার টাকায় আমি আমার জীবনের ফাঁকটুকু ভরিয়ে তোলবার চেষ্টা করলাম। প্রায়ই আমার বৈঠকখানায় বাইজির 'হিলি-মিলি-পানিয়া'র সঙ্গে মদের পিয়ালায় ঠিনি-ঠিনি সুর বেজে উঠতে শুরু হল। ফলে, আমার জীবনের ফাঁকটুকু যতই ভরে উঠতে লাগল, বাবার লোহার সিন্ধুকও ক্রমে ততই খালি হয়ে আসতে লাগল।
বেণুর চোখ ছিল না, কিন্তু কান ছিল। সে কিছু দেখতে না পেলেও শুনতে পেত সব। আমাকে মুখ ফুটে কিছু না বললেও, তার মনে যে ঝড় উঠেচে, এটা আমি তার মুখ দেখে বেশ স্পষ্টই বুঝতে পারতাম। কিন্তু, বুঝেও আমার প্রাণে দয়া হত না,— বরং একটা নিষ্ঠুর আনন্দের ভাব জেগে উঠত।
রাত্রে আমি প্রায়ই বাড়িতে থাকতাম না। বাড়িতে থাকলেও বেণুর কাছে যেতাম না। তার প্রতি আমার ঘৃণা ও রাগ ক্রমেই বেড়ে উঠছিল।
সেদিন হঠাৎ আমার জ্বর হল। বাইরের ঘরে জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। তারপর, কখন যে আমার প্রাণের ইয়ারেরা আমার কাছে থাকাটা অনাবশ্যক মনে করে আস্তে আস্তে সরে পড়েছিল, আর কখন যে চাকরেরা আমাকে ধরাধরি করে অন্দরে শুইয়ে দিয়ে এসেছিল, সে খেয়াল আমার আদপেই ছিল না।
* * *
স্তব্ধ রাত্রে, ঘরের ঘড়িটা হঠাৎ বেজে উঠল। সেই শব্দে আমার জ্ঞান হল। আমি গুনলাম একটা, দুটো, তিনটে, চারটে! শেষরাতের থমথমে নিস্তব্ধতাকে অকস্মাৎ জাগ্রত করে দিয়ে ঘড়িটা আবার থেমে গেল। কেবল, রজনির হৃৎপিণ্ডের শব্দের মতো, সেই চিরজাগন্ত ঘড়িটা ক্রমাগত মৃদুস্বরে করতে লাগল টিক-টিক-টিক!
মনে হল, কে যেন আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে,— খুব আলতোভাবে। আমার মাথার ভিতরটা তখন জ্বলেপুড়ে যেন খাক হয়ে যাচ্ছিল,— কে আমার সেবা করচে সে কথা আমি বুঝতেও পারলাম না, বুঝবার চেষ্টাও করলাম না।
'বড়ো তেষ্টা— একটু জল।'
আমার মুখের কাছে কে জলের গেলাস ধরলে।
জল পান করে আমি অনেকক্ষণ শুয়ে রইলাম। অন্ধকারে দেখতে পেলাম না,—কিন্তু, কে আমাকে পাখার বাতাস করছিল।
* * *
হঠাৎ আমার কপালে দু-ফোঁটা জল পড়ল। এ কীসের জল? আবার,— এক, দুই, তিন ফোঁটা! এক ফোঁটা আমার ঠোঁটে পড়ল— বুঝলাম, সে চোখের জল! এই রাতে আমার শিয়রে বসে কাঁদে কে?
তখন, একজনকে মনে হল। হ্যাঁ,— একজনকে! কিন্তু— কিন্তু, কেন কাঁদে সে?
পীড়ায় বোধ করি, মানুষের মনকে পলকা করে ফেলে। নইলে, ক-ফোঁটা অশ্রুজলে আমার অমন পাথরের মতো মন ভিজে নরম হয়ে গেল কেন?
আস্তে আস্তে ডাকলাম, 'বেণু?'
উত্তর পেলাম না।
'বেণু?'
পাখার হাওয়া থেমে গেল।
'বেণু, কথা কও!'
অতি মৃদু-কম্পিতস্বরে উত্তর পেলাম, 'কী বলচ?'
'তুমি কাঁদচ কেন?'
'কাঁদিনি।'
'মিছে কথা বোলো না।'
ভয়ে ভয়ে বাধো-বাধো গলায় বেণু বললে, 'আর,— আর কাঁদব না।'
আমি চুপ করে রইলাম। তখন কী ভাবছিলাম, তা আর আমার মনে নেই।
অনেকক্ষণ পরে জিজ্ঞাসা করলাম, 'এত রাত পর্যন্ত তুমি জেগে আছ কেন?'
'তোমার যে জ্বর হয়েছে!'
'আমার জ্বর, তাতে তোমার কী?'
উত্তর পেলাম না। তার বদলে আমার কপালে আবার দু-ফোঁটা জল পড়ল। যে চোখে দৃষ্টি নেই, সে চোখেও ব্যথার অশ্রু থাকে! ভগবান! দু-বিন্দু অশ্রু মনের কথা এমন করে খুলে বলতে পারে?
আমার মনটা কীরকম হয়ে গেল,— আমি দু-হাত বাড়িয়ে বেণুকে আমার বুকের উপরে টেনে নিলাম। তার মুখে আমার মুখ রেখে চুম্বন করলাম। বেণু অস্ফুটস্বরে কী বললে। তার সারা দেহ থরথর করে একবার কেঁপে উঠল। তার মাথাটি আমার কাঁধের উপরে এলিয়ে পড়ল। তারপর, প্রাণপণে আমার বুক দু-হাতে জড়িয়ে ধরে সে স্থির হয়ে পড়ে রইল।
* * *
প্রাতঃসন্ধ্যার স্তব্ধ চিতা যখন পূর্বমেঘে জ্বলে উঠল, তখন তার আলো বেণুর অন্ধ নেত্রে, কৃষ্ণ দেহের উপরে এসে পড়ল।
অন্ধ বেণু— কালো বেণু!
তখনও সে আমার বুকের উপরে তেমনি নিঃসাড় হয়ে পড়ে ছিল। ভোরের আধা আলোয়, আধা ছায়ায় বেণুর অন্ধ চোখ ও কালো দেহের দিকে একবার চেয়ে দেখলাম। তেমন করে আগে কখনো তাকে দেখিনি, পরেও কখনো দেখবার সময় পাইনি।
তার চোখের পাতা দুটির উপরে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিলাম। পদ্মপুটে বন্দি বৃষ্টিবিন্দু নাড়া পেলে যেমন ঝরে পড়ে, বেণুর চোখ থেকেও তেমনি ঝরঝর করে আবার অশ্রু ঝরে পড়ল।
'বেণু!'
'ওগো না গো না, আর অমন করব না!'
'কী করবে না?'
'আর কাঁদব না!'
আমার অবরুদ্ধ কণ্ঠ ভেদ করে বলে উঠলুম, 'না,— কাঁদো তুমি। আমিও কাঁদি।'
তারপর? তারপর আমার জ্বর বসন্ত রোগে দাঁড়াল। বসন্ত আমাকে প্রাণে মারলে না, কিন্তু আমার চোখ দুটো উপড়ে নিয়ে গেল।
বেণুর মতো আমিও অন্ধ!
বেণুকে জীবনে সেই একবারমাত্র দেখেছিলুম। তাকে দেখার আশা মিটল কই? এই ঘন অন্ধকার ঠেলে তার একটা ছায়ামূর্তি বিদ্যুতের মতো এক-একবার চমকে ওঠে বটে, কিন্তু তাতে যে তৃপ্তি হয় না গো, তৃপ্তি হয় না!
ভারতী জ্যৈষ্ঠ, ১৩২২ (মে ১৯১৫)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।