হেমেন্দ্রকুমার রায়
ক
ডেপুটিগিরির সচল পদ পাইয়া বাংলাময় চলিয়া বেড়াইতেছিলাম। সম্প্রতি ছ-মাসের ছুটি লইয়া কলিকাতায় আসিয়া কিছুদিনের জন্য চলা বন্ধ করিয়া অচল হইয়া বসিয়াছি।
বাড়ির সামনেকার রোয়াকে বসিয়া সেদিন খবরের কাগজ পড়িতেছিলাম। হঠাৎ মুখ তুলিয়া দেখি, আমার দিকে অবাক হইয়া চাহিয়া একটা লোক চুপ করিয়া রাস্তার উপরে দাঁড়াইয়া আছে।
আমার চোখ তাহার চোখে মিলিবামাত্র সে থতমত খাইয়া মুখ নিচু করিয়া একদিকে চলিয়া গেল। খানিক দূর গিয়া মুখ ফিরাইয়া আবার সে আমার দিকে চাহিল। আমি তখনও কৌতূহলী হইয়া তার দিকে তাকাইয়া আছি দেখিয়া সে হনহন করিয়া খানিকটা আগে চলিয়া গেল। তারপর ফিরিয়া আবার আমার দিকেই আসিতে লাগিল।
একেবারে আমার সুমুখে আসিয়া দু-চারবার ঢোঁক গিলিয়া সে দ্বিধার সহিত বলিল, 'আপনি— আপনি কি আমাকে চিনতে পারচেন?'
বাস্তবিক, লোকটাকে চিনি-চিনি মনে হইতেছিল; কিন্তু ঠিক স্মরণ না-হওয়াতে আমি একটু বোকা বনিয়া মাথা চুলকাইতে লাগিলাম।
সে-ও সন্দিগ্ধস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, 'আপনার নাম তো পূর্ণেন্দুবাবু?'
আমি একটু আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিলাম, 'আজ্ঞে হ্যাঁ।'
'আর আমি হচ্চি জগাই— হা-হা-হা!'
খুব খানিকক্ষণ হাসিয়া হঠাৎ হাসি থামাইয়া সে খপ করিয়া আমার একখানা হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, 'কী হে পূর্ণ,— আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড নাকি বাবা? গ্লাস-ফ্রেন্ড না হলেও আমি তো তোমার ক্লাস-ফ্রেন্ড— সে কথাটা কি স্রেফ ভুলে বসে আছ— অ্যাঁ?'— বলিয়াই সে আমার হাত ছাড়িয়া মুরুব্বিয়ানার সহিত পিঠ চাপড়াইতে শুরু করিয়া দিল।
এতক্ষণে চিনিলাম,— জগাই বটে! ছেলেবেলায় তার সঙ্গে স্কুলে পড়িয়াছিলাম। তার মতো ডানপিটে ও বকাটে ছেলে ক্লাসে আর দুটি ছিল না। দুষ্টামির নিত্যনূতন ফন্দি চটপট আবিষ্কার করিতেও সে অদ্বিতীয় ছিল। আমরা তাকে জুজুর মতো ভয় করিতাম। যে পণ্ডিত মাথার টিকি বজায় রাখিতে চাহিতেন— তিনি সাধ্যমতো জগাইচাঁদকে ঘাঁটাইতেন না। চেয়ারে চারিটা পায়ার তলায় চারিটা সুপারি রাখিয়া মাস্টারমশাইকে যে কতবার সে 'পপাত ধরণিতলে' করিয়াছে, তাহার সংখ্যা হয় না। স্কুলের হেডমাস্টার বেজায় কড়া ও গরম মেজাজের লোক ছিলেন। প্রথম দিনকতক তিনি জগাইচাঁদকে শায়েস্তা করিবার চেষ্টা করিলেন; কিন্তু জগাইচাঁদ সপ্তাহখানেক ধরিয়া তাঁহার তামাকে লঙ্কাবাটা মিশাইয়া, চেয়ারে ষাট-সত্তরটি ছারপোকা ছাড়িয়া এবং জুতার ভিতরে আলপিন ঢুকাইয়া তাঁহাকেই দস্তুরমতো শায়েস্তা করিয়া দিল। হেডমাস্টারের কড়া ও গরম মেজাজ একেবারে ঠান্ডা হইয়া গেল।
এ সেই জগাই! আজ পনেরো-ষোলো বৎসর তাহাকে দেখি নাই— এতদিন পরে এমন হঠাৎ তাহার সঙ্গে দেখা হইয়া যাওয়াতে মনে মনে কিছু খুশি হইলাম। জীবনের মাঝপথে বাল্যের সাথিকে দেখিলে খুশি হয় না, এমন লোকও বোধ করি সংসারে নাই।
হাসিতে হাসিতে জগাইকে লইয়া বাহিরের ঘরে গিয়া বসিলাম।
জগাইয়ের মাথায় লম্বা টেড়ি, চুলগুলা তেল-চকচকে। গায়ে একটা আধ-ময়লা চুড়িদার পাঞ্জাবি, জামাটা যে ইস্ত্রি করা হয় নাই, বাড়িতেই 'জলকাচা' হইয়াছে, সেটা বেশ স্পষ্টই বুঝা যায়। পরনে একখানা চওড়া পাড়ের শাড়ি— নিশ্চয়ই কোনো স্ত্রীলোকের। পায়ে তালি-মারা অনেক দিনের পরা একজোড়া পম্প-শু— ডান পায়ের জুতাটি মুখব্যাদান করিয়া হাওয়া খাইতেছে। বাঁ হাতে একগাছা পিচের ছড়ি,— মাথার দিকটা ভাঙিয়া গিয়াছে; ডান হাতে একটা বিড়ি— সবটাই প্রায় পুড়িয়া গেলেও জগাই অতি সন্তর্পণে বিড়ির গোড়ার দিকটা ধরিয়া যথেষ্ট উৎসাহের সহিত টানিতে ছাড়িতেছে না।
জগাই জামার সামনেকার নীচের অংশটি কোলের ভিতরে গুঁজিয়া বসিয়া পড়িল। আমি লক্ষ করিলাম, জামার সেখানটায় লম্বা সেলাই করা। সেলাইটা যে আমার চোখে পড়ে, বোধহয় জগাই সেটা পছন্দ করে না— তাই সেলাইটা কোলের ভিতরে ঢাকিয়া রাখিল। বুঝিলাম, জগাইয়ের মনে বাবুগিরির শখটুকু বিলক্ষণ, কিন্তু বেচারির পয়সার ভারী খাঁকতি।
সামনে টিনের বাক্সে ভালো ইজিপশিয়ান সিগারেট ছিল। বাক্সটি দেখিবামাত্র জগাই হাতের বিড়িটা ফেলিয়া দিয়া, টপ করিয়া একটি সিগারেট ধরাইয়া ফেলিল। তারপর চেয়ারে হেলিয়া পড়িয়া কড়িকাঠের দিকে তাকাইয়া পরম আরামের সহিত হু হু করিয়া ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিল, 'বাঃ বাঃ, বেড়ে সিগারেট তো!'
আমি একটু হাসিয়া বলিলাম, 'তারপর জগাই, কেমন আছ, বলো।'
জগাই টেবিলের উপরে নবাবের মতো একখানা পা তুলিয়া দিয়া নাচাইতে নাচাইতে বলিল, 'আছি ভালো। খাচ্চিদাচ্চি বেড়িয়ে বেড়াচ্চি। তবে কী জানো, যা কিছু কষ্ট অন্ন-বস্ত্রের।'
আমি হাসিয়া বলিলাম, 'কীরকম?'
জগাই চেয়ারের দু-পাশে হাত দুলাইতে দুলাইতে বলিল, 'মাই ডিয়ার পূর্ণ, ব্যাবসা-ট্যাবসা কি পুলিশের জ্বালায় আর করবার জো আছে! আরে ছিঃ ছিঃ! ঘেন্না ধরিয়ে দিলে।'
আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম, 'পুলিশের জ্বালায় ব্যাবসা বন্ধ! সে কীরকম ব্যাবসা?'
জগাই সোজা হইয়া বসিয়া টেবিলে একটা চড় মারিয়া বলিল, 'খুব ভালো ব্যাবসা পূর্ণ, খুব ভালো ব্যাবসা। পেটেন্ট আর স্বপ্নাদ্য ওষুধের ব্যাবসা করে দিনকতক দু-হাতে টাকা লুটে নিয়েছিলাম— তা, তা-ই দেখে টিকটিকি-ব্যাটাদের চোখ টাটিয়ে উঠল।'
আমি কৌতূহলী হইয়া বলিলাম, 'কেন?'
'আরে, সে কথা আর জিজ্ঞেস করো কেন? খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম,''বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে প্রস্তুত, আমেরিকার জন সাহেবের আবিষ্কৃত অদ্ভুত দন্তমঞ্জন।'' দিনকতক খুব বিক্রি হয়েছিল, এর মাঝে হঠাৎ টিকটিকি-ব্যাটারা কেমন করে ধরে ফেললে যে, আমার অদ্ভুত দন্তমঞ্জনে শুধু ইটের গুঁড়ো আছে। এই আর কী— অমনি মামলা রুজু। আমি কিন্তু সহজে ছাড়িনি বাবা,— শত শত প্রমাণ দেখিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রাঞ্জল ভাষায় বোঝাতে চেষ্টা করেছিলুম যে, যে দন্তমঞ্জনে বিশুদ্ধ ইটের গুঁড়ো থাকে, সত্য সত্যই তা অদ্ভুত কি না। ম্যাজিস্ট্রেট শুনে হেসে ফেললেন; কিন্তু হেসেই আমার দুশো টাকা জরিমানা করলেন। সেইদিন থেকেই ব্যাবসা বন্ধ।'
বুঝিলাম জগাইয়ের দুষ্টামি বুদ্ধি এখনও যায় নাই; কিন্তু সেইসঙ্গে তাহার সরলতাটুকুও আমার কাছে নেহাত মন্দ লাগিতেছিল না।
জগাই ততক্ষণে প্রথম সিগারেটটা পুড়াইয়া ছাই করিয়া আর-একটা ধরাইয়া বলিল, 'যাহোক, মাই ডিয়ার পূর্ণ, তোমাকে এতদিন পরে হঠাৎ আবিষ্কার করে আমি মনে মনে বড়োই খুশি হয়ে উঠেচি। ইচ্ছে হচ্চে গলা ছেড়ে গান গাই—' বলিয়াই বাঁ হাতে টেবিল চাপড়াইয়া মাথা নাড়িয়া সে গান শুরু করিয়া দিল—
'ভোজন করো কৃষ্ণজিরে,
ভজন করো কৃষ্ণজিরে-এ—এ—এ—'
গানের চোটে ঘরখানা যেন কাঁপিতে লাগিল। পাছে বাড়ির ভিতর আমার স্ত্রী গান শুনিয়া ভয়ে আঁতকাইয়া উঠেন, সেইজন্য তাড়াতাড়ি আমি ব্যস্তসমস্ত হইয়া বলিয়া উঠিলাম, 'ও জগাই, থামো, থামো,— গান-টান পরে শোনা যাবে অখন।'
জগাই গান থামাইয়া দুঃখিতভাবে মাথা নাড়িয়া বলিল, 'ওই তো দাদা! ওস্তাদজি তাইতেই বলেন, রসজ্ঞ শ্রোতা দুনিয়ায় বড়োই কম পাওয়া যায়। এই দেখো-না, এমন খাসা টপ্পাখানা ধরা গেল, কোথায় সমের বরে মশগুল হয়ে মাথা নেড়ে সায় দেবে, তা সেসব চুলোয় গেল— অন্তরাটা ধরতে-না ধরতে তুমি কিনা আমাকে থামিয়ে দিলে! আরে ছ্যাঃ— ছ্যাঃ!'
জগাই সিগারেটে একটা দমভর টান দিয়া ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে জড়িতস্বরে বলিল, 'তুমি বোধহয় পদ্য-টদ্য পড়ো না? এবার থেকে পড়তে চেষ্টা করবে। নইলে রসবোধ হবে না।'
আমি যে অরসিক নই, এটা প্রমাণিত করিতে গেলে, পাছে জগাইচাঁদ দ্বিগুণ উৎসাহিত হইয়া আবার 'কৃষ্ণজিরে'র গান ধরিয়া বসে, সেই ভয়ে এ অপবাদ আমি মাথা পাতিয়া লইলাম।
আরও দু-চারিটা কথার পর জগাই সেদিনকার মতো বিদায় লইল। যাইবার আগে সে আর-একবার আমার সিগারেটের তারিফ করিতে করিতে বেশ সপ্রতিভভাবেই কৌটা হইতে গোটা কুড়ি ইজিপশিয়ান সিগারেট লইয়া টপাটপ পকেটে পুরিয়া ফেলিল। তাহার এই সপ্রতিভ ভাবটাও খুব শিষ্ট না হইলেও আমার বেশ মিষ্ট লাগিতেছিল; কিন্তু যতই মিষ্ট লাগুক, এটা ঠিক যে, তার পরদিন হইতে আমি টেবিলের উপরে দামি ইজিপশিয়ান সিগারেটের বদলে হাওয়াগাড়ি সিগারেটের কৌটা রাখিয়া দিতাম।
কিন্তু জগাইচাঁদের অসাধারণ উৎসাহ তাহাতেও কিছুমাত্র দমিয়া যায় নাই; প্রতিদিন সে অন্তত গোটা দশ-বারো সিগারেট না পুড়াইয়া ও গোটা পনেরো না পকেটস্থ করিয়া কোনোদিন আমার ঘর ছাড়িয়া উঠিয়া যাইত না।
খ
হ্যাঁ,— বাস্তবিক, জগাই আমাদের বেড়ে লোক। ছুটির একঘেয়ে দিনগুলা তাহাকে লইয়া হাসিখুশিতে গোলে-হরিবোলে দিব্য একরকমে কাটিয়া যাইত।
তাহার কথাবার্তার ভিতরে আমি একটা বিশেষত্ব সর্বদা লক্ষ করিতাম। যখন-তখন সে তাহার স্ত্রী-র কথা পাড়িত ও যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গেই জগাই সে কথাগুলা বলিত। সে যে তার স্ত্রী-কে অত্যন্ত ভালোবাসে, এটা আমি বেশ বুঝিতে পারিতাম।
মধ্যে জগাই একদিন আমাকে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। লোকের বাড়িতে নিমন্ত্রিত হইয়া হাঁ করিয়া লুচির আশায় বসিয়া থাকাটা আমি আদপেই ভালোবাসিতাম না কিন্তু জগাই পাছে মনে করে যে, সে গরিব বলিয়াই আমি তাহার বাড়িতে নিমন্ত্রণে যাইতে নারাজ, সেই ভয়ে তাহার কথা ঠেলিতে পারিলাম না।
জগাই খাবারের বন্দোবস্ত বড়ো মন্দ করে নাই। তাহার স্ত্রী-র রান্নাও বেশ হইয়াছিল।
খাইতে বসিয়া দেখিলাম, একটি গৌরাঙ্গী মহিলা আমাকে পরিবেশন করিতেছেন।
জগাই আমার সুমুখেই, মেঝের উপরে উবু হইয়া বসিয়াছিল। মহিলাটি ঘরে আসিবামাত্র জগাই উচ্চকণ্ঠে বলিল, 'মাই ডিয়ার পূর্ণ, এসো আমার স্ত্রী-র সঙ্গে তোমাকে ইন্ট্রোডিউস করে দি। ইনি হচ্ছেন আমার স্ত্রী শ্রীমতী কমলা দাসী,— আর, ওগো! শুনচ? ইনি হচ্চেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র সেন— আমার গ্লাস-ফ্রেন্ড না হলেও ক্লাস-ফ্রেন্ড। ও কী, মুখে ঘোমটা কেন? পূর্ণর সামনে ঘোমটা! অ্যাঁঃ— বলো কী! খোলো, খোলো— ঘোমটা খোলো।'
মহিলাটি মুখের ঘোমটা আরও বেশি করিয়া টানিয়া, সলজ্জ, ত্রস্তপদে তাড়াতাড়ি ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া গেলেন।
আমিও লজ্জায় অধোবদন হইয়া বসিয়া রহিলাম।
খাওয়াদাওয়া হইয়া গেলে পর বিদায় লইয়া রাস্তায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছি, এমন সময়ে জগাই আমার হাত ধরিয়া বলিল, 'মাই ডিয়ার পূর্ণ, তুমি কি আমার ওপর রাগ করেচ?'
আমি একটু আশ্চর্য হইয়া বলিলাম, 'রাগ! কেন?'
জগাই বলিল, 'আমার স্ত্রী-র সঙ্গে তোমার পরিচয় করে দেবার সময়ে যে কথাগুলো বলেছিলাম,— সেইজন্যে? আমার স্ত্রী বললে, আমি নাকি ভারী অসভ্য ব্যবহার করেচি আর তুমি তাই চটে গিয়েছ। সে বললে, তোমার কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া উচিত।'
আমি হাসিয়া বলিলাম, 'না, না, আর ক্ষমা চাইতে হবে না,— আমি রাগ করিনি।'
গ
সেদিন জগাই হঠাৎ আসিয়া আমাকে বলিল, 'মাই ডিয়ার পূর্ণ, আমার একটা উপকার করতে হবে।'
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, 'কী উপকার?'
একটু ইতস্তত করিয়া জগাই বলিল, 'যদি— যদি আমাকে কুড়িটা টাকা ধার দাও! আমি তিন দিনের ভেতরে নিশ্চয় শোধ করব। দেবে ভাই?'
তাহাকে কুড়িটা টাকা দিলাম। সে আমাকে অনেক ধন্যবাদ জানাইয়া তাড়াতাড়ি চলিয়া গেল।
জগাই 'অগস্ত্য-যাত্রা' করিয়াছে। তিন দিনের ভিতরে টাকা শোধ করিবে বলিয়া সেই যে সে চলিয়া গিয়াছে, আর তাহার টিকিটি পর্যন্ত দেখিবার জো নাই। অবশ্য, টাকার জন্য আমি ব্যস্ত নই; কিন্তু জগাইয়ের অভাবে আমার দিনগুলা ভগ্নচক্র শকটের মতো স্তম্ভিত হইয়া আছে, সময় আর কাটিতেই চাহে না। এইজন্যই বন্ধুবান্ধবকে টাকা ধার দিতে নাই; তাতে টাকাও পাওয়া যায় না, বন্ধুত্বও থাকে না।
প্রায় কুড়ি দিন কাটিয়া গিয়াছে। আমি জগাইয়ের আশাভরসা একরকম ছাড়িয়াই দিয়াছি। এক-একবার মনে করিয়াছি, জগাইয়ের বাড়িতে গিয়া খোঁজ লইয়া আসি, কিন্তু পাছে সে ভাবিয়া বসে যে, আমি তাগাদা করিবার জন্য তাহার খোঁজ লইতেছি, সেই ভয়ে তাহার বাড়িতে যাওয়াও আর ঘটিয়া উঠিল না।
কিন্তু, ইহার ভিতরে জগাই নিজেই একদিন আসিয়া হাজির।
আমি বলিলাম, 'কী হে জগাই, একেবারে ডুমুরের ফুল হয়ে উঠেচ যে!'
জগাই বলিল, 'মাই ডিয়ার পূর্ণ, আমি এখন আবার বিজনেসম্যান অর্থাৎ মাতৃভাষায়, কাজের লোক হয়ে উঠেচি। আমার সময় এখন মূল্যবান।'
আমি হাসিয়া বলিলাম, 'বলো কী! ''অদ্ভুত দন্তমঞ্জন'' ফের বাজারে চলছে নাকি?'
'আরে ধ্যাৎ! ''অদ্ভুত দন্তমঞ্জন''-এর নিকুচি করেছে! মাই ডিয়ার পূর্ণ, সেসব কিছু নয়— আমি এখন দালালি-ব্যাবসা ধরেচি।'
দালালির গুপ্তরহস্য সম্বন্ধে জগাইচাঁদ লম্বা এক বক্তৃতা ফাঁদিয়া বসিল, আমি চুপচাপ শুনিয়া যাইতে লাগিলাম।
বক্তৃতা শেষ করিয়া জগাইচাঁদ উঠিয়া দাঁড়াইল। পকেট হাতড়াইয়া একখানা নোট বাহির করিয়া জগাই বলিল, 'মাই ডিয়ার পূর্ণ, তোমার টাকা কুড়িটা নাও। বিজনেসে বড়ো ব্যস্ত ছিলাম বলে এদিকে আসতে পারিনি, তোমার টাকাগুলোও সেইজন্যে আর দেওয়া হয়নি, কিছু মনে কোরো না ডিয়ার!'
নোটখানা লইয়া আমি ব্যাগের ভিতরে রাখিয়া দিলাম।
খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া জগাই বলিল, 'পূর্ণ, তোমাকে আর-একটা কথা বলব-বলব মনে করচি, কিন্তু বলতে পারচি না।'
'কেন?'
'পাছে তুমি কিছু মনে করো।'
'মনে আবার করব কী? বলো।'
'মাই ডিয়ার পূর্ণ, আমার স্ত্রী আজ এক জায়গায় নিমন্ত্রণে যাবে, যদি একছড়া হার দাও, তাহলে ভারী উপকার হয়। তার হারছড়া ছিঁড়ে গেছে। আজ নিয়ে যাব, কালকেই ফিরিয়ে দেব।'
জগাইয়ের আজকের প্রার্থনাটা আমার কাছে ভারী বেসুরো ঠেকিল; কিন্তু কী আর করি, চক্ষুলজ্জার খাতিরে মনে মনে বিরক্ত হইয়াও বাড়ির ভিতরে গেলাম। পত্নীর কাছ থেকে তাঁহার হারছড়া চাহিয়া জগাইকে আনিয়া দিলাম।
ঘ
পরদিন বৈকালে কতকগুলা জিনিস কিনিতে 'মিউনিসিপাল মার্কেটে' গিয়াছিলাম।
জিনিসপত্র কেনা হইয়া গেল। আমার কাছে খুচরা টাকা ছিল না, ব্যাগের ভিতর হইতে জগাইয়ের দেওয়া নোটখানা বাহির করিয়া দোকানদারকে বলিলাম, 'টাকা ভাঙাতে হবে।'
দোকানদার নোটখানা আমার হাত হইতে লইয়া বিস্ফারিত চোখে ভালো করিয়া দেখিতে লাগিল। তারপর আমার দিকে মুখ তুলিয়া চাহিয়া বলিল, 'কী ম'শয়, এসব জোচ্চুরি কতদিন শিখেচেন?'
আমি আশ্চর্য হইয়া ভ্রূ সংকোচ করিয়া বলিলাম, 'কী বললে?'
'ওঃ! বাবু যে একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন দেখচি! আমি হচ্চি লালু মিয়া, আমার কাছে এসেছ জাল নোট চালাতে! পাজি, ত্যাঁদড় কোথাকার।'
'কী বলছিস উল্লুক?'
'চুপ রহো! ওরে, পুলিশ ডাক তো!'
আমার চারিদিকে লোক জড়ো হইল। লজ্জায়, অপমানে যেন আমার মাথা কাটা গেল। নোটখানা দেখিয়া বুঝিলাম, দোকানদারের কথা মিথ্যা নয়।
বেগতিক দেখিয়া আমি নরম হইয়া বলিলাম, 'দেখো, আমি জানতুম না যে, নোটখানা জাল। আর-একজন আমাকে এখানা দিয়েচে।'
দোকানদার গরম হইয়া বলিল, 'হুঁ হুঁ চাঁদ! পথে এসো! আমি হলুম লালু মিয়া, আমার কাছে এসেছ জাল নোট চালাতে! ওরে, পুলিশ ডাক তো!'
কোনোরকমে তাহাদের হাত হইতে ছাড়ান পাইয়া আমি সেখান হইতে মানে মানে সরিয়া পড়িলাম।
ওঃ! সে সময়ে যদি একবার জগাইয়ের দেখা পাইতাম!
পিছনে বাজারসুদ্ধ লোক হাসিতে লাগিল। দোকানদার গলা চড়াইয়া তখনও বারংবার গর্জন করিতেছে, 'আমি হলুম লালু মিয়া, আমার কাছে এসেছ জাল নোট চালাতে! ওরে, পুলিশ ডাক তো!'
ঙ
জগাই কোথায়?
বাজারের সেই ব্যাপারের পরে এক মাস কাটিয়া গিয়াছে, কিন্তু জগাইয়ের দেখা নাই।
আমি তাকে তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিলাম— এমনকী, তাহার বাড়িতে পর্যন্ত গিয়াছি; কিন্তু, সে বাড়ি ছাড়িয়া জগাই যে সপরিবারে কোথায় উঠিয়া গিয়াছে, কেহ তাহা জানে না।
বাড়িওয়ালা আমাকে বলিল, 'মশাই, সে আমার পাঁচ মাসের ভাড়া দেয়নি। তার সঙ্গে যদি আপনার দেখা হয়, তাহলে বলে দেবেন, একবার যদি তার টিকিটি দেখতে পাই, তবে হয় তার মাথা নয় পাঁচ মাসের ভাড়া না নিয়ে আর ছেড়ে দেব না। আমরা পাঁচ পুরুষ কলকাতা শহরের বাড়িওয়ালা— আমাকেই ফাঁকি— অ্যাঁ! হয় ভাড়ার টাকা, নয় মাথা— একটা কিছু নেবই নেব,— বুঝেছেন?'
বুঝিলাম, জগাইয়ের দেখা তো আর পাইবই না— সেইসঙ্গে আমার দামি সোনার হারছড়াও জন্মের মতো গেল। জগাইয়ের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠতা করিয়াছিলাম বলিয়া এখন আমি মনে মনে অনুতপ্ত হইলাম। ওঃ! তার জন্যে সেদিন দশজনের সামনে কী অপমানিতই হইয়াছিলাম! আর-একটু হইলেই হাতে হাতকড়ি পড়িত। ইচ্ছা ছিল, জগাইকে ধরিয়া সে অপমানের প্রতিশোধ লইব; কিন্তু মনের রাগ মনেই চাপিয়া গুমরাইতে গুমরাইতে বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম।
* * *
আমার ছুটি প্রায় ফুরাইয়া আসিল। সেদিন বৈকালে বেড়াইতে বাহির হইয়াছি, এমন সময়ে খানিক তফাতে একটা লোককে দেখিয়া চমকিয়া উঠিলাম!
কে ও? জগাই না! হ্যাঁ— তা-ই তো!
আমি তাড়াতাড়ি অগ্রসর হইয়া একেবারে তাহার সুমুখে গিয়া দাঁড়াইলাম।
আমাকে দেখিবামাত্র জগাইয়ের মুখ ভয়ে কালিপানা হইয়া গেল। সে পাশ কাটাইয়া চলিয়া যাইবার চেষ্টা করিল; কিন্তু আমি তাহাকে বাধা দিয়া বলিলাম, 'কী জগাই, চিনতে পারচ?'
জগাই থতমত খাইয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। ঢোঁক গিলিয়া বলিল, 'কে মশাই, আপনি?'
আমি কঠোরস্বরে বলিলাম, 'বটে! তুমি আমাকে চেনো না— না?'
জগাই বলিল, 'পথ ছাড়ুন মশাই, পথ ছাড়ুন। রাস্তার মাঝখানে আর অসভ্যতা করবেন না।'
আমি আর সহ্য করিতে পারিলাম না— তাহার মুখে সজোরে এক চড় কষাইয়া দিয়া বলিলাম, 'নির্লজ্জ, চোর, জালিয়াত! দে, আমার হার দে।'
চড় পাইয়া জগাই ষাঁড়ের মতো চেঁচাইয়া উঠিল। 'পাহারাওয়ালা আমায় খুন করলে— পাহারাওয়ালা, পাহারাওয়ালা!'— বলিতে বলিতে সে ছুটিল। আমিও ছাড়িলাম না— তাহার পিছনে পিছনে ছুটিলাম। রাস্তার অনেক লোকও মজা দেখিতে আমাদের অনুসরণ করিল।
জগাই, ছুটিতে ছুটিতে হঠাৎ একটা বাড়ির ভিতরে ঢুকিয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ঢুকিলাম।
জগাই সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিতে গেল; কিন্তু হোঁচট খাইয়া ঘুরিয়া পড়িল। আমি একেবারে তাহাকে মাটির সঙ্গে চাপিয়া ধরিলাম।
জগাই আর্তনাদ করিয়া উঠিল, 'খুন করলে, খুন করলে!'
গোলমালে একজন লালপাগড়িও বাড়ির ভিতরে ঢুকিয়াছিল। সে কাছে আসিয়া বলিল, 'কী হয়েচে বাবু?'
জগাই বলিল, 'ও পাহারাওয়ালাজি, আমাকে বাঁচাও! এই হতভাগা গুন্ডা আমাকে মেরে ফেললে!'
রাগে অজ্ঞান হইয়া আমি বলিলাম, 'স্টুপিড, আবার গালাগালি!'— আমি ঘুসি তুলিলাম।
হঠাৎ পিছন হইতে কে আমার হাত চাপিয়া ধরিল। ফিরিয়া দেখি, একজন স্ত্রীলোক।
তাঁহার মাথার কাপড় খুলিয়া গিয়াছে, একরাশ এলোমেলো চুল কাঁধে-বুকে এলাইয়া পড়িয়াছে, মুখে-চোখে ভীতা হরিণীর মতো অসহায়, কাতর ভাব!
আমার হাত অসাড় হইয়া পড়িয়া গেল।
মহিলাটি মিনতি-মাখা স্বরে আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন, 'ইনি আমার— ইনি আমার স্বামী। এঁকে আপনি মারচেন কেন?'
জগাইয়ের স্ত্রী? এত সুন্দরী!
আমি মৃদুস্বরে বলিলাম, 'আপনার স্বামীর জন্যে আমি ভয়ানক অপমানিত হয়েচি। আপনার স্বামী আমার একছড়া হার নিয়ে এসে আর ফিরিয়ে দেয়নি। একে পুলিশে দেব।'
মহিলার মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। তিনি জগাইয়ের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে চাহিলেন,—জগাই আস্তে আস্তে মাথা হেঁট করিল।
রমণী আবার আমার দিকে তাকাইলেন। সে চোখ কী ব্যথাভরা!
তিনি একবার পাহারাওয়ালার দিকে, ভিড়ের দিকে চাহিলেন। তাঁহার দেহ লজ্জা-ভয়ে যেন কাঁপিয়া উঠিল। তারপর তিনি হঠাৎ গলা হইতে একছড়া হার খুলিয়া, আমার সুমুখে ধরিয়া বলিলেন, 'আমার এই একছড়া হার আছে। আমাদের ঘরে আর হার নেই। এ হার কি আপনার?'
হ্যাঁ— এ হার তো আমারই বটে! আমি কী বলিতে যাইতেছিলাম; কিন্তু তাঁহার চোখের দিকে চাহিয়া থামিয়া গেলাম। সে চোখ যেন কথা কহিতেছিল, সে চোখ যেন বলিতেছিল, 'ওগো, আমার স্বামীকে বাঁচাও,— ওগো আমার স্বামীকে বাঁচাও!'
আমি কী বলিব?
রমণী আবার বলিলেন, 'এ হার কি—'
আমি বাধা দিয়া বলিলাম, 'না, এ হার আমার নয়— মাপ করুন, মাপ করুন— আমার ভুল হয়েচে।'
রমণী মাথায় ঘোমটা টানিয়া আমার দিকে পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইলেন।
জগাই, লাফাইয়া উঠিয়া বলিল, 'শুনলে তো পাহারাওয়ালা সায়েব, শুনলে তো সব? মিছামিছি আমায় কী নাকালটাই করলে! আচ্ছা বাবা, ভগবান আছেন।'
চ
সন্ধ্যাবেলায় বাড়িতে বসিয়া বসিয়া ভাবিতেছিলাম, 'বোঝা গেছে, ওরা স্বামী-স্ত্রী-তে জোচ্চোর! সুন্দর মুখ দেখে ভুলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি।'— এমন সময়ে একজন লোক আসিয়া আমার হাতে একটা মোড়ক দিয়া দাঁড়াইল।
একটু বিস্মিত হইয়া মোড়কটা খুলিলাম। ভিতরে আমার সেই হারছড়া আর একখানা চিঠি। চিঠিখানা পড়িলাম—
'আমার স্বামীর অনেক দোষ,— কিন্তু তিনি আমাকে ভালোবাসেন।
আমি সামান্য স্ত্রীলোক,— তাঁকে একদিন বলেছিলাম, তুমি আমাকে ভালোবাসো না। ভালোবাসলে আমাকে অন্তত একখানা গয়নাও দিতে।
তার পরের দিন তিনি আমাকে একছড়া হার এনে দিয়ে বললেন, ''একজন বেচতে চাচ্ছিল, তোমার জন্যে কিনে আনলুম।''—তখন আমার একটু আশ্চর্য হলেও আমি সন্দেহ করিনি।
ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন,— আপনি আমার স্বামীকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।
লজ্জাহীনাকে ক্ষমা করবেন, আপনার হার ফিরিয়ে দিলাম।'
আমার চোখের সুমুখে এক জ্যোতির্ময়ী দেবী-প্রতিমা জাগিয়া উঠিল।
হে দেবী, আমি তোমাকে প্রণাম করি।
মর্মবাণী ৩০ ভাদ্র ১৩২২ (আগস্ট ১৯১৫)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।