হেমেন্দ্রকুমার রায়
মানি না, মানি না—ভগবানকে আমি মানি না!... তর্ক করতে চাও? শাস্ত্রের বচন তুলতে চাও? আমার আপত্তি নেই। হয়তো ভগবান বলে কেউ আছেন। কিন্তু তাঁকে আমি মানি না!
কেন মানব? মানবার যদি কোনো সংগত কারণ থাকে, তবে আমার পক্ষে তাঁকে না-মানবারও কি যথেষ্ট কারণ নেই? মানুষ কি অকারণে বিদ্রোহী হয়? যে এ কথা বলে মানুষকে সে চেনে না।
ভগবানের চেয়ে অনেক মানুষকে আমি বরং শ্রেষ্ঠ বলে মনে করি। বুদ্ধ, খ্রিস্ট, চৈতন্য! জীবের মঙ্গলের জন্যে এঁরা যত কেঁদেচেন, এঁরা যত ভেবেচেন, এঁরা যত স্বার্থত্যাগ করেচেন, ভগবানের মধ্যে তেমন করুণা কোনোদিনই আমার চোখে পড়েনি।... এঁদের নিজস্ব মহত্ত্ব আর বিশ্বপ্রেমকে দেখিয়ে তোমরা ঈশ্বরকেই বড়ো করে তুলতে চাও! তাতেও আমার আপত্তি আছে—বিশেষ আপত্তি! কারণ ভগবান আর যা হোন তা হোন, করুণাময় কখনো নন।
ঠগির চেয়ে তিনি বেশি নিষ্ঠুর। ঠগি তো দম বন্ধ করে দু-এক মুহূর্তে নরহত্যা করে, কিন্তু ভগবান আমাদের হত্যা করেন দিনে দিনে, রয়ে-বসে, আজীবন ধরে। অবোধ বালকও ভাঙবার জন্যে পুতুল গড়ে না। এখানে সে-ও ভগবানকে উঁচিয়ে গেছে। তুমি সৃষ্টিকর্তা বলে ভগবানের পুজো করচ। কিন্তু এ পুজো এখনই থামিয়ে দাও। কারণ তিনি সৃষ্টিকর্তা বলেই তো তাঁর নির্মমতা বেশি দারুণ হয়ে বুকে এসে বাজে। এ দুনিয়ায় মৃত্যুই সব চেয়ে নিশ্চিত। তবু ভগবান আমাদের সৃষ্টি করেন কেন, তা ভেবে দেখেচ? আবার সকলকে ধ্বংস করবার জন্যে। তিনি পিতা? তাহলে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ হত পুত্রের বুকের রক্তে তাঁর হস্ত রাঙা হয়ে উঠচে—কিন্তু তাতেও তাঁর ভ্রূক্ষেপ নেই— তিনি আবার নতুন সৃষ্টি করচেন, আবার নতুন হত্যার আনন্দ উপভোগ করবার জন্যে। ভগবান মানুষের বিচারক? কিন্তু তাঁর বিচারক কে?
খ
ধনীর সন্তান আমি, যে নিশ্চিন্ত আরামের মধ্যে বাস করলে মানুষ ঈশ্বরভক্ত হতে বাধ্য, ছেলেবেলায় আমার অদৃষ্টে তার কিছুরই অভাব হয়নি।
সেদিন আজ থাকলে আমিও ভগবানকে হয়তো না মেনে পারতুম না।... কিন্তু আমার অজ্ঞাতসারেই আমাদের সংসারের উপরে সর্বশক্তিমানের নির্দয় হস্তের ছায়া ধীরে ধীরে নেমে এল। সে ছায়া এখনও সরেনি, বরং দিনকে দিন বেশি ঘনীভূত হয়ে নিরেট অন্ধকারে পরিণত হতে চলেছে।
এই ভেবেই আমি আশ্চর্য হই যে, কেবল কি আমাদের সংসারের উপরেই ঈশ্বরের তীক্ষ্ন দৃষ্টি এমন স্থিরভাবে প্রসারিত হয়ে আছে? দুর্ভাগ্যের এমন বৈচিত্র্য থাকতে পারে, তা আমি কখনো ভেবে দেখিনি। এ বৈচিত্র্যের অতলে এখনও থই পাচ্ছি না। আরও কত কী দেখব তা কে জানে?
আমার দুর্ভাগ্যের গোটাকতক প্রধান ঘটনা তোমরা শোনো। হয়তো তোমরা শুনেও সহ্য করতে পারবে না,—তবু শোনো।
'স্পেকুলেশনে' বাবার সর্বস্ব গেল। আমাদের হালচাল অনেকটা পথের ভিখারির মতো হয়ে পড়ল— সে দৃশ্য বাবা বেশি দিন প্রাণ ধরে দেখতে পারলেন না—তাই এপারের মায়া একেবারে কাটিয়ে চলে গেলেন পরপারে, পরলোকে। তারপর গেলেন দাদা— যাঁর রোজগারে তখনও যেমন-তেমন করে আমাদের সংসার চলছিল।
আগেই বলেছি,—প্রথম জীবনে দুঃখের সোয়াদ আমি কোনোদিনই পাইনি। যাকে বলে আদুরে ছেলে, সংসারের মধ্যে আমি ছিলুম ঠিক তা-ই।
সর্বদাই বাবার সঙ্গে সঙ্গে ফিরতুম। নিজের কাজে বাবা দুবার বিলাতে গিয়েছিলেন। পাছে আমার জন্য মন কেমন করে, সেই ভয়ে আমাকেও তিনি ফেলে যেতে পারেননি। আঁতুড় ঘরেই আমি মা-মরা ছেলেমানুষ হয়েছি বাবারই কোলেপিঠে। বোধ করি, বাবা আমাকে সেইজন্যেই এতটা ভালোবাসতেন।
বাবা ছিলেন—ইংরেজি-মেজাজের লোক, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে থেকে আমারও প্রথম জীবনটা বিলাতি আবহাওয়ার ভিতরেই কেটে গিয়েছিল। ষোলো বছর বয়সের মধ্যেই দু-দুবার বিলাতে গিয়ে এবং কলকাতাতেও সাহেবি স্কুলে পড়ে আমার একটি শক্তি হয়েছিল এই যে, আমি অনেক ইংরেজের চেয়েও ভালো ইংরেজি লিখতে পারতুম। বাল্যকাল থেকেই আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, ইংরেজি সাহিত্যে স্থায়ী যশ অর্জন করব।
দাদা যখন মারা গেলেন, তখন এই যশটুকুই আমার একমাত্র সম্বল। ভারতের ও বিলাতের অনেক ইংরেজি সাময়িক পত্রে আমি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখতুম। আমার চার-পাঁচখানা উপন্যাস বিলাতেও মন্দ আদর পায়নি। সেসব লেখায় আমি ভারতীয় জীবনের ছবিই দিতে চেষ্টা করেছি। হয়তো সে ছবির নূতনত্ব সমুদ্রের ওপারেও কৌতূহল আকর্ষণ করেছিল।
কিন্তু এই ইংরেজি সাহিত্যই যে কখনো আমার জীবিকানির্বাহের একমাত্র উপায় হতে পারে, এ কথা কোনোদিনই ভাবিনি। দাদার মৃত্যুর পর দিন যখন চলে না, তখন একখানি ইংরেজি সংবাদপত্রের সম্পাদকের পদ পেয়ে ভগবানকে অনেক ধন্যবাদ দিয়েছিলুম; সে কথা আজও আমি ভুলিনি। কিন্তু তখন জানতুম না যে, ধন্যবাদে ভগবান ভোলেন না। মনুষ্য-মৃগয়ায় কোনোদিন তিনি ক্ষান্ত দেন না।
বেশ মোটা মাইনে পেতুম। তারই উপরে নির্ভর করে বিবাহও করলুম। কিছুকাল নতুন প্রেমের কল্পলোকে আনন্দের যে আভাস পেয়েছিলুম, এখানে কবির ভাষায় তা প্রকাশ করে লাভ নেই। কারণ আমি সুললিত প্রণয়-কাহিনি লিখতে বসিনি, তা লেখবার মতন মনের হালও আমার নয়।
বিবাহের পর চার বছর কেটে গেল—ভাবলুম, নিয়তির কোপদৃষ্টি থেকে এতদিনে বুঝি খালাস পেলুম।
ভুল—ভুল! কলেরা এসে আমার ভ্রম আবার ভেঙে দিলে। আমাকে ভুলবার জন্যে ভগবান আনন্দের যে মায়ামৃগকে আমার ঘরে পাঠিয়েছিলেন, ফাঁকি দিয়ে আবার তাকে কেড়ে নিলেন। বিপত্নীক আমি,—প্রাণপণ আলিঙ্গনের মধ্যে শূন্যতাকে আঁকড়ে ধরে ধূলিশয্যায় পড়ে হাহাকার করতে লাগলুম।...
কেঁদে কেঁদে কেঁদে কি না জানি না, কিন্তু এটা বুঝতে পারলুম— আমার দৃষ্টিশক্তি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। বড়ো বড়ো ডাক্তার দেখালুম—সবাই এককথাই বললেন, 'তোমার চোখ অন্ধ হয়ে যাবে—আর কোনো উপায় নেই!'
উঃ, সে কী কষ্ট! জন্মান্ধ যে, তার দুঃখ আমার তুলনায় কত তুচ্ছ! পৃথিবীর পরতে পরতে এই রঙের খেলা, রূপের মেলা যে কখনো স্বচক্ষে দেখেনি, সে কেমন করে বুঝবে যে, এর থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ কী?... আমার চোখের সামনে অন্ধকারের পরদা ক্রমেই বেশি পুরু হয়ে উঠতে লাগল। দিনে দিনে দেখতে লাগলুম, প্রকৃতির মধুর রূপের ছবি, বিচিত্র রঙের ঢেউ, ছন্দিত গতির লীলা আমার সামনে থেকে জলের আঁকের মতো মুছে মুছে মুছে মিলিয়ে যাচ্ছে। উষার সিঁদুর-লেখা, ভোরের শিশু রবি, গোধূলির মায়া-কিরণ, ভাঙা মেঘে চাঁদের আলো, বাদলের ব্যাকুল মেঘ, শীতের সোনালি রোদ, বসন্তের পুষ্পিত উপবন, শরতের অম্লান প্রভাত,—বিদায়, বিদায়, তোমাদের কাছে চিরবিদায়,—হে বন্ধু, চিরবিদায়!
গ
অন্ধ! অন্ধতার এই অন্ধকূপে দশ বৎসর মগ্ন হয়ে আছি।
প্রিয়তমার ছোট্ট স্মৃতি—আমার এই ছায়া। বিবাহের এক বৎসর পরেই তাকে পেয়েছিলুম—এখন তার বয়স তেরো বছর। ভাগ্যে ছায়া ছিল, তখনও তাই ভগবানকে ভুলিনি।
তেরো বছরের মেয়ে ছায়া—আমার এই ভগ্নচক্র জীবনযানকে সেই তার ছোটো ছোটো দুখানি দরদভরা স্নেহকোমল বাহু দিয়ে কোনোরকমে কায়ক্লেশে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে! বাছা আমার কোনোদিন বুঝি নিশ্চিন্ত হয়ে পুতুলখেলাও করতে পায়নি, জ্ঞান হয়ে পর্যন্ত সে পাকা গিন্নি, এই কানা অথর্ব বুড়ো ছেলেটার সেবায় তার কচি কচি হাত দুটি সর্বদাই জোড়া থাকত।
সম্পাদকি অনেকদিন ঘুচে গেছে। তবে আমার জন্যে দয়াপরবশ হয়ে কাগজের স্বত্বাধিকারী গোটাকতক টাকার মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, এজন্যে তাঁকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। আমার আগে লেখা ইংরেজি উপন্যাস কখানার কিছু কিছু বিক্রি এখনও আছে। কোনোরকমে সংসার চলে যাচ্ছে।
বর্তমানই আমাকে আচ্ছন্ন করে রয়েছে। আর কিছু ভাবতে পারি না—ভাবতে ভয় হয়। অতীতের দিকে চাইলেই দেখি, নিজের হাতে সাজানো সারি সারি চিতা দাউদাউ জ্বলছে,— কত বন্ধু, কত স্বজনের হারা-মুখ সেখানে শ্মশানের ধোঁয়ায় কলঙ্কিত হয়ে উঠছে! ওঃ— চোখ নেই, কিন্তু এই অন্তর্দৃষ্টিও সেই সঙ্গে মুছে গেল না কেন?
ভবিষ্যতের কথা ভাবতে গেলেই খালি একটি সত্যই মনে পড়ে যায়,— ছায়ার আমার বয়স হচ্ছে, তারও বিয়ে দিতে হবে, কে এক পরের ছেলে এসে এই অন্ধের নড়িকে কেড়ে নিয়ে যাবে! কী ক্রুর এই সমাজের বিধি! এই অসহায়তা, এই জীবন্মৃত অবস্থার মধ্যে আমি পড়ে আছি, আমাকেও মেয়ের বিয়ে দিতে হবে কেন?
ঘ
ভগবান এখনও আমাকে ভোলেননি।
ভেবেছিলুম, দুর্ভাগ্যের শেষ ধাপে নেমে এসেছি, এরপরে আমার নিজের মরণ ছাড়া আর কিছুই বাকি নেই। ভগবান আবার আমার ভুল শুধরে দিলেন। নইলে বোধহয় এই একটুখানি ফাঁকের জন্যে তাঁর এত বড়ো বিশ্ব-সৃষ্টিটা দস্তুরমতো ব্যর্থ হয়ে যেত!
আমার এই ধারাবাহিক দুঃখের কাহিনি নিশ্চয়ই কারো ভালো লাগবে না। কেউ কেউ হয়তো ভাববেন, আমি অত্যুক্তি করছি। কিন্তু তা নয়— আমার একটি কথাও মিথ্যে বা বাড়িয়ে লেখা নয়! ভগবানের উপরে অতি-ভক্তিতে মানুষ অন্ধ হয়ে আছে। চোখ থাকলে সে স্পষ্ট দেখতে পেত, পৃথিবীতে ভগবানের অবিচারের আর অত্যাচারের ইতিহাস কী বিরাট! লক্ষ লক্ষ মহাভারতেও তা কুলোয় না। কান পেতে শোনো, পৃথিবীর এই বাতাস আর তরুর অনন্ত মর্মর, কোটি কোটি অত্যাচারিত আত্মার দীর্ঘশ্বাস আর আর্তস্বর দিয়ে গঠিত কি না! যাদের মরা উচিত তাদের উপরে নয়, যাদের বাঁচা উচিত তাদের উপরেই ভগবানের সদাসচেতন মৃত্যুদণ্ড অতর্কিতে আচম্বিতে নেমে এসে পড়ে!
যাক—দুঃখের কথা আর বাড়াব না, এবার যা বলবার খুব সংক্ষেপেই তা সেরে নেব।
হঠাৎ একদিন ছায়া অসুখে পড়ল। জ্বর। প্রথমে ধরা পড়েনি, তারপর জানা গেল, টাইফয়েড।
ঘরপোড়া গোরু যখন সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়, তখন এত বড়ো বিপদের কথা শুনে আমার মনের ভাব কীরকম হল, এখানে তা খুলে না বললেও চলবে।
একে আমার এই নাচার অবস্থা, তায় অর্থাভাব। আমার কপালে বিপদ সর্বদাই চরমে উঠেছে, তাই ছায়ার আশা আগে, থাকতেই আমি ছেড়ে দিলুম— আমার এই আঁধার ঘরের মানিকটিকে হাতে পেয়েও মরণ যে তাকে পিছনে ফেলে রেখে বিদেয় হবে, এমন দুরাশা আমি কিছুতেই করতে পারলুম না।
তবু একবার শেষ চেষ্টা তো করতে হবে। ছায়াকে বাঁচাতে হলে ভালো ডাক্তার ডাকা দরকার। ভালো ডাক্তার ডাকতে হলে যথেষ্ট অর্থের দরকার। কিন্তু, কিন্তু অর্থ কোথায় পাব? শেষটা কি টাকার জন্যে চিকিৎসার অভাবে আমার এই শেষ মায়ার পুতুলটিকে শ্মশানে বিসর্জন দিয়ে আসতে হবে? এ কথা মনে হলে বাপের বুক কেমন করে, তা কি তোমরা বুঝতে পারছ?
আমার অন্ধ চক্ষু অশ্রুজলে ভিজে উঠল। বসে বসে ভাবতে লাগলুম। টাকা, টাকা, টাকা! টাকা পাব কোথায়, কে আমায় টাকা দেবে—যে টাকায় আমার ছায়াকে আবার মরণের মুখ থেকে ছিনিয়ে আনব?
একটা কথা স্মরণ হল। মাসখানেক আগে একজন প্রকাশক (বোধহয় তিনি আমার অবস্থার কথা জানতেন না।) আমার কাছে প্রস্তাব করে পাঠিয়েছিলেন যে, আমার কোনো ইংরেজি উপন্যাস থাকলে তিনি তা প্রকাশ করতে সম্মত আছেন।
অন্ধ হয়ে পর্যন্ত আমি আর উপন্যাস লিখতে পারিনি। লেখবার শক্তিও ছিল না, লেখবার মতো মনের অবস্থাও ছিল না। যদিও কাগজে-কলমে লেখবার ক্ষমতা আমার নেই, তবু বিলাতি লেখকদের মতো 'টাইপরাইটারে' রচনা করা তো আমার পক্ষে এখনও অসম্ভব নয়। 'টাইপরাইটার' ব্যবহারে আমি বরাবরই নিপুণতার পরিচয় দিয়েছি। এখনও মাঝে মাঝে চিঠিপত্র লিখে থাকি।
আজ বিপদে পড়ে আমার মাথায় এই বুদ্ধি এল। তখনই প্রকাশককে চিঠি লিখে জানালুম যে, দিন দুয়েকের মধ্যে আমার লেখা একখানি ছোটো উপন্যাস পেলে তিনি অন্তত দেড় হাজার টাকায় তার 'কপিরাইট' কিনে নিতে এবং হাতে হাতে টাকা চুকিয়ে দিতে রাজি আছেন কি না?... উত্তরে জানলুম, আমার শর্তে প্রকাশকের কোনোই অমত নেই।
তোমরা শুনে আশ্চর্য হোয়ো না যে, সেই সুখবরে আমি ভগবানকে কায়মনোবাক্যে ধন্যবাদ দিলুম— একবার নয়, অনেকবার!
ঙ
বিকালবেলায় আমি আমার ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলুম। চাকরের উপরে মানা রইল, আমি নিজে ঘর থেকে না বেরুলে কেউ যেন আমাকে বিরক্ত করতে না আসে।
বন্ধুর বাড়ি থেকে একটি ভালো 'টাইপরাইটার' চেয়ে আনিয়েছি। এই ক্ষুদ্র যন্ত্রের উপরেই আজ আমার ছায়ার প্রাণরক্ষার ভার! একে না পেলে আমাকে হয়তো আত্মহত্যা করতে হত!
আমি খুব তাড়াতাড়ি চিন্তা ও রচনা করতে পারি। হিসাব করে দেখলুম, যদি একটানা ষোলো-সতেরো ঘণ্টা পরিশ্রম করি, তবে কাল সকালে আটটা-নয়টার মধ্যে ছোটোখাটো একখানি উপন্যাস লিখে ফেলতে পারব।
'টাইপরাইটার'-এর সামনে গিয়ে বসলুম। লেখা শুরু করলুম নিজেরই দুঃখের কাহিনি ধরে। সেই সঙ্গে নানা কল্পিত ঘটনা মিশিয়ে আমার প্লটকে অবশ্য যথেষ্ট ঘোরালো, চিত্তাকর্ষক ও মর্মস্পর্শী করে তুলতেও চেষ্টার ত্রুটি করলুম না। কারণ আমি জানি, আমার নিজের যে কাহিনি আজ তোমাদের সকলের কাছে বলে বুকের বোঝা হালকা করবার চেষ্টা পাচ্ছি, তার মধ্যে কিছুমাত্র বৈচিত্র্য নেই—তা অত্যন্ত বাস্তব এবং নিত্যশ্রুত। সংসারে এমন মানুষ লাখো লাখো রয়েছে, যাদের ললাটের উপরে বিধাতা আমারই কাহিনির পুনরুক্তি স্পষ্ট করে লিখে রেখেছেন। সে কাহিনি নিয়ে উপন্যাস লিখতে হলে আরও বেশি রং ফলিয়ে আমাকে খোদার উপরে খোদকারি করতে হবে। একঘেয়ে সাদাসিধে সত্য কথাও বারংবার সহ্য করা অসম্ভব।
লিখতে লাগলুম—প্রাণপণে। এমন করে জীবনে আর কখনো লিখিনি,— লেখবার দরকারও হয়নি। এ লেখার উপরে কেবল আমার সাহিত্যিক যশ নয়— আমার নিজের মরণ-বাঁচন, আমার অন্ধ প্রাণের হাসি-কান্না—এককথায়, আমার ইহলোকের ভালো-মন্দ সমস্ত নির্ভর করছে। তাই লিখছি, লিখছি, আর লিখছি— বিকেল গেল, সন্ধে উতরোল, রাত হল, চারদিক নিসাড় থমথমে হয়ে এল, আমার কিন্তু সেসব ভাববার এক মুহূর্ত ছুটি নেই।
পাশের ঘর থেকে ছায়ার ও নার্সের সাড়া পেলুম। ছায়া চেঁচিয়ে প্রলাপ বকছে, নার্স তাকে ঠান্ডা করতে চেষ্টা পাচ্ছে। লিখতে লিখতে একবার থামলুম।... ছায়া আপনমনেই বলছে, 'ও কী বাবা, ওদিকে যেয়ো না—ওদিকে যেয়ো না, ওদিকে ছাতের আলশে, এখুনি পড়ে যাবে যে!... হ্যাঁ বাবা, তুমি যে বড়ো এখনও জেগে বসে আছ, অসুখ হবে যে,— শোও গে যাও, এখনও গেলে না? হ্যাঁ বাবা, তুমি ভারী দুষ্টু ছেলে বাবা!... হ্যাঁ বাবা, সত্যি করে বলো দেখি বাবা, তুমি আমাকে বেশি ভালোবাসো, না আমার মা-কে?— আমাকে? ইস—তোমার নিজের চেয়েও?... দেখো বাবা, তোমার জন্যে কেমন ফুলের মালা গেঁথেচি! সবে-ফোটা বেল ফুল— গন্ধ পাচ্চ তো?... বাবা, তুমি চুপটি করে বসে থাকো, আমাকে চুমু খাবার জন্যে অত দুষ্টুমি কোরো না—রও, আগে তোমার চুলটা ভালো করে আঁচড়ে দি, মাথাটা ভারী নোংরা হয়ে রয়েচে যে, লোকে দেখলে নিন্দে করবে অত বড়ো ধাড়ি মেয়ে, বাপের যত্ন নেয় না...'
আমার ছায়া, আমার ছায়া! পিতৃময় জগতে সে একান্তে বাস করে—প্রলাপেও বাপের কথাই বলছে, অচেতনেও বাপের ভাবনাই ভাবছে! এমন মেয়ে কার আছে?
সজল চোখে ফের লেখা শুরু করলুম। প্রত্যেক মুহূর্তের সঙ্গে হয়তো ছায়ার জীবন একটু একটু করে ক্ষয় হচ্ছে!... বাতাসের শীতলতায় বুঝছি, রাত ক্রমে ফুরিয়ে আসছে, বোধহয় এখন চাঁদ মুখ রাঙা করে পশ্চিম আকাশের মৌন-রহস্যের মধ্যে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে! আমার লেখার কল কিন্তু সমানে চলছে, চলছে আর চলছে! মাথা দপদপ করছে, দেহ এলিয়ে পড়ছে, দু-হাত অসাড় হয়ে আসছে—তবু কিন্তু থামবার জো নেই! সারারাত্রের নিস্তব্ধতাকে ঠকাঠক শব্দে চঞ্চল করে তুলে আমার অশ্রান্ত কল তাই চলেছে তো চলেছেই!
সকাল হল। তখনও লিখছি। এক-একখানা পৃষ্ঠা 'টাইপ' হয়ে যাচ্ছে, আর আমি সেখানা পাশের চুবড়ির ভিতরে ফেলে দিয়ে, কলের ভিতরে তাড়াতাড়ি আর-একখানা সাদা কাগজ পুরে দিচ্ছি,— এমনি করে অনেক পাতা লেখা হয়ে গেছে।... বেলা প্রায় ন-টার সময়ে গভীর একটা আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আমার লেখা শেষ করলুম!... সে যে কী বিপুল মুক্তির আনন্দ, তা আর বলবার নয়! সেই আনন্দের স্বরূপ বর্ণনা করতে পারলেও আর-একখানা চমৎকার উপন্যাস লেখা যায়! দেহের অবস্থা তখন শোচনীয়, কিন্তু সেসব কষ্ট-গ্লানি আমার আনন্দের উচ্ছ্বাসকে একটুও দমাতে পারলে না। আমার আর কিছু ভাববার নেই— উপন্যাস শেষ করেছি, ছায়ার চিকিৎসার উপায় হয়েছে, তা-ই যথেষ্ট! আমার আর-একটি মস্ত তৃপ্তির কথা, আজকে যে উপন্যাস আমি একাসনে বসে সমাপ্ত করলুম, এর আকার ছোটো হলেও এর চেয়ে ভালো বই নিশ্চয়ই আমি আর কখনো লিখিনি! এর পত্রে পত্রে ছত্রে ছত্রে আমার প্রাণের কতখানি যে চোখের জলের সঙ্গে ঢেলে দিয়েছি, তা শুধু আমিই জানি—আমিই জানি! লেখক কী মন নিয়ে এ লেখাটি লিখেছে তা কেউ জানবে না বটে, কিন্তু বিলাতের পাঠকসমাজে নিশ্চয়ই এর বিশেষ আদর হবে।
চ
ঘরের দরজায় কে ধাক্কা মারলে।
আমি উঠে দরজা খুলে দিতেই, বন্ধু নির্মল এসে ঘরে ঢুকে বললে, 'ওহে, ছায়াকে দেখতে এসেছিলুম। তার অসুখ যে আরও বেড়ে উঠেচে!'
আমি বললুম, 'আজকেই কলকাতার শ্রেষ্ঠ ডাক্তারের হাতে ছায়াকে সঁপে দেব। আমার যা সাধ্য তা করব।'
নির্মল আমার উপন্যাসের কথা জানত। সে বললে, 'তবে কি তোমার লেখা শেষ হয়েচে?'
আমি বললুম, 'হ্যাঁ। এখন লেখাটা তোমাকে একবার চেঁচিয়ে পড়তে হবে— কিছু কিছু শুধরে আজকেই প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে টাকা নিয়ে আসব। লেখা কাগজগুলো চুবড়ির ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে আছে। তুমি ভাই ওগুলো তুলে সাজিয়ে-গুছিয়ে ফেলো তো!'
নির্মল খানিক পরে বললে, 'ওহে, তোমার লেখা কাগজ কোথায়?'
'কেন, ওই বেতের চুবড়ির ভেতরে!'
নির্মল আরও কিছুক্ষণ খুঁজে বললে, 'চুবড়ির ভেতরে অনেকগুলো কাগজ রয়েচে বটে, কিন্তু সব যে দু-পিঠ সাদা।'
একটু আশ্চর্য হয়ে বললুম, 'কী বলচ হে, ভালো করে দেখো, ভালো করে দেখো!'
নির্মল বললে, 'চুবড়ি আর দেখতে হবে না, কী হয়েচে আমি বুঝেচি!' বলেই সে কলটা একবার চালালে। তারপর বললে, 'চমৎকার অদৃষ্ট তোমার! কলের ভেতরে ফালির ফিতে নেই!'
কালির ফিতে নেই! দু-পিঠ সাদা কাগজ তবে কি বিকেল, রাত, সকাল ধরে একাসনে বসে আমি এই পণ্ডশ্রম—
পাশের ঘর থেকে ছায়া আর্তস্বরে চেঁচিয়ে উঠল—আমি মাথা ঘুরে মাটির উপরে আছড়ে পড়লুম!...
তারপর? আমার জীবন-কাহিনি আর বলতে চাই না, কী হবে তা শুনে? তা বিস্বাদ, তিক্ত, দুঃসহ! এইটুকু কেবল শুনে রাখো,—তারপর থেকে আমি ভগবানকে মানি না! এ জীবনে আর কোনোদিন মানবও না।
ভারতী, কার্তিক ১৩২৮ (অক্টোবর ১৯২১)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।