হেমেন্দ্রকুমার রায়
ক
নিমাইখুড়ো 'ওস্তাদ' উপাধি যে কোথা হইতে সংগ্রহ করিলেন, সে ইতিহাস কেহ রাখে না; তবে, যখনই কেহ তাঁহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিত, তখনই তিনি গালভরা হাসিয়া উত্তর দিতেন, 'আমার নাম ওস্তাদ শ্রীনিমাইচরণ রায়, আপনার দাসানুদাস।'
তাঁহার ওস্তাদজির প্রধান উপকরণ ছিল একটি তানপুরা। যন্ত্রটির 'মানকা' ভাঙিয়া আধখানা হইয়া আছে, 'মুদারা খরজে'র তারটি নাই, 'সোয়ারি'গুলি কোথায় উড়িয়া গিয়াছে এবং 'তুম্বি'র উপরে ইঁদুরের উপদ্রবে ছোটো-বড়ো অনেকগুলি ছেঁদা হইয়াছে। তানপুরার ভিতরে সপরিবারে পরম সুখে আরশুলারা বাসা বাঁধিয়া নিরাপদে ঘরকন্না করিত। রোজ সকালে কাক-চিল ডাকিবার আগেই নিমাইখুড়ো তম্বুরার 'তবলি'তে তাল রাখিতে রাখিতে 'সা, রে, গা, মা— মা, গা, রে, সা' বলিয়া দু-চোখ বুজিয়া প্রাণপণে হাঁ করিয়া গলা সাধিতে বসিতেন এবং সেই অপূর্ব সংগীত-শ্রবণে আরশুলাদের নিদ্রাভঙ্গ হইত; তাহারা পালে পালে শুঁড় নাড়িতে নাড়িতে বাহিরে আসিয়া তানপুরার গা-ময় 'মর্নিং ওয়াক' করিয়া বেড়াইত।
নিমাইখুড়োর সংগীতপটুতা পাড়ার ছেলে-বুড়ো-মেয়ে সবারই জানা ছিল। কথিত আছে, একদা বর্ষাকালে নিমাইখুড়োর শ্রোতাদের ভিতরে মুড়ি ও ফুলুরি খাইতে খাইতে তর্ক শুরু হইয়াছিল যে, ওস্তাদজি মেঘমল্লার গাহিতে পারেন কি না। তর্ক শুনিয়া খুড়ো সবজান্তার মতো ঈষৎ হাসিয়া এবং ঈষৎ কাশিয়া তখনই তানপুরা লইয়া বসিয়া গেলেন। মেঘমল্লারের অপূর্ব মহিমায় খুড়োর গায়ে দরদর ধারে ঘর্ম ঝরিয়া তাঁহার লোলচর্ম সিক্ত করিতে লাগিল। অবশেষে গান শেষ হইলে, খুড়ো যখন তানপুরা রাখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, 'কেমন— শুনলে তো?'— তখন তাঁহার একজন মুখর ভক্ত করজোড়ে নিবেদন করিল, 'কিন্তু ওস্তাদজি, কই আকাশে বৃষ্টি হল না তো?'
খুড়ো মুরুব্বিয়ানা চালে ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, 'হবে বাবা, হবে। কী— ন বিদ্যে সঙ্গীতং পরং— কী না, গানের মতো বিদ্যে পরে আর হবে না— বলব কী, লাখ টাকার কথা! দাঁড়াও, পৃথিবীতে বসে গান গাচ্চি,— সুরটাকে আগে আকাশে গিয়ে পৌঁছোতে দাও, পৃথিবী থেকে আকাশ তো দু-চার মিনিটের— বলব কী— পথ নয়! আমি গাইলাম মেঘমল্লার— বৃষ্টি হবে না?— বলব কী— আলবত হবে।'
কথাগুলো খুব জোরের সঙ্গেই খুড়ো বলিলেন বটে, কিন্তু শ্রোতাদের মুখের ভাব দেখিয়া স্পষ্ট বুঝিতে পারা গেল যে, খুড়োর কথায় মনের ভিতর হইতে তাঁরা তেমন জোর পাইলেন না। খুড়ো মনে মনে চটিলেন; কিন্তু মুখে কিছু বলিলেন না।
বর্ষাকাল। শেষরাতে একপশলা বৃষ্টি হইয়া গেল। পাড়ার গঙ্গাধর ভট্টাচায্যি পাশ ফিরিয়া শুইয়া আফিমের ঘোরে বোধ করি পরমানন্দে স্বপ্নলোকে বিচরণ করিতেছিলেন, এমন সময়ে হঠাৎ সদর দরজার কড়া ঘন ঘন নড়িতে লাগিল। ভট্টাচায্যির নেশা ও ঘুম যুগপৎ চটিয়া গেল। বিরক্ত হইয়া তিনি আপনমনে বলিলেন, 'এত রাতে কোন ''শা—'' আবার জ্বালাতন করতে এল রে? ''শা—''রা জানে না যে, নেশা করতে যথেষ্ট পয়সা খরচ হয়!'
রাস্তা হইতে ডাক আসিল, 'ও ভট্টাচায্যি, বাড়ি আছ হে?'
ভট। (স্বগত— চটিয়া) বাড়ি থাকব না তো, এত রাতে থাকব কোথায়? নেশা করি আর যা-ই করি, চরিত্তির বাবা ঠিক রেখেছি— হুঁ হুঁ, সেদিকে ভটচায সেয়ানা ছেলে!'
আগন্তুক। ভটচায— ও ভটচায!
ভট। কে হে?
আগন্তুক। আমি খুড়ো।
ভট। (তাড়াতাড়ি জানালায় মুখ বাড়াইয়া) খুড়ো! ব্যাপার কী? এত রাতে, এই বৃষ্টিতে!
খুড়ো। বলব কী,— আর চাই?
ভট। কী?
খুড়ো। বাদলা?— মেঘমল্লারের— বলব কী— ফল দেখচ তো?
গঙ্গাধর ভটচায্যি এতক্ষণে ব্যাপারটা তলাইয়া বুঝিলেন। তিনি কী উত্তর দিবেন ভাবিতে লাগিলেন। খুড়ো কিন্তু তাহার উত্তরের অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া রহিলেন না, হনহন করিয়া পাশের বাড়ির দরজার সামনে গিয়া আবার কড়া নাড়িতে নাড়িতে চিৎকার করিলেন, 'ওহে, জল-টল আর চাই নাকি?'
পরদিন শুনা গেল, গত রাত্রে খুড়োর চিৎকারে পাড়ার সকলকার ঘুম ভাঙিয়াছিল।
খ
মাস ছয় হইল, খুড়োর ঘর অন্ধকার করিয়া তাঁহার তৃতীয় পত্নী পরলোকে প্রস্থান করিয়াছেন।
স্ত্রী-র মৃত্যুর পর প্রতিরাত্রে ঘুমাইবার আগে অত্যন্ত দুঃখিতভাবে একবার করিয়া তিনি বেহাগ রাগিণীর আলাপ করিতেন। যখন যাহার সঙ্গে দেখা হইত, তাহাকেই বলিতেন, 'তিন-তিনবার সংসার পাতলাম, হায় হায়— বলব কী— তবু বংশরক্ষা হল না!'
খুড়োর বয়স প্রায় পঞ্চান্ন বৎসর হইয়াছে। দাঁতগুলি প্রায় পড়িয়া গিয়াছে— দেহখানি এমনই বাঁকা যে, তাঁহার পায়ে ও মাথায় যদি কেহ ছিলা বাঁধিয়া দেয়, তাহা হইলে তিনি অনায়াসেই চমৎকার জীবন্ত ধনুকে পরিণত হন।
হঠাৎ পাড়ায় জনরব শোনা গেল, বংশরক্ষার জন্য খুড়ো আবার বিবাহ করিবেন। একটু কৌতূহলী হইয়া খুড়োর বাড়ির দিকে গুটিগুটি চলিলাম।
তাঁহার বাড়িতে গিয়া শুনিলাম, আজ খুড়োর আশীর্বাদ।
বাহিরের ঘরে তিনজন লোক বসিয়া রহিয়াছেন, চেহারা দেখিয়াই আন্দাজ করিলাম, তাঁহাদের একজন পুরোহিত, একজন ঘটক ও আর-একজন কন্যাপক্ষের অভিভাবক।
অল্পক্ষণ পরেই পাড়ার দুটি বৃদ্ধের সঙ্গে দ্বারপথে খুড়োর মূর্তি দেখা গেল। খুড়োর দিকে তাকাইয়া আমি একেবারে থ হইয়া গেলাম।
খুড়োর সাদা চুল কলপের মহিমায় কুচকুচে কালো হইয়া উঠিয়াছে। মাথার মাঝখানে লম্বা টেড়ি। দুই কানে দুইটি আতর-মাখানো তুলার নুটি গোঁজা। মুখে পাউডার। পানে কি আলতায়— ভগবান জানেন,— ঠোঁট দুটি তাঁর রাঙা টুকটুকে। খুড়ো যখন হাসিতেছেন, তখন তাঁর ঠোঁটের ফাঁক দিয়া পরিষ্কার দুই সারি দাঁত দেখা যাইতেছে; বুঝিলাম, খুড়ো দাঁত বাঁধাইয়াছেন। তাঁহার গায়ে একটি ডোরাকাটা রঙিল পিরান— তার উপর কোঁচানো কালাপেড়ে চাদর। পরনেও একখানি চওড়া কালাপেড়ে কাপড়। ডান হাতে একখানি সিল্কের রুমাল ঝুলিতেছে। পায়ে রাঙা রঙের 'ফুল' মোজা ও বেগুনি ভেলভেটের পম্প-শু।
খুড়ো দরজার কাছ থেকেই সামনে হেঁট হইয়া সাতিশয় বিনয়ের সহিত প্রণাম করিতে করিতে আসিয়া বসিলেন;— ফলে, তাঁহার বাঁকা দেহ আগন্তুকদের চোখে ঠেকিল না।
নিরাপদে আশীর্বাদ হইয়া গেল।
সকলে চলিয়া গেলে পর আমি খুড়োর কাছ ঘেঁষিয়া বসিয়া বলিলাম, 'তারপর খুড়ো!'
খুড়ো বলিলেন, 'কী জানো নিমাই, বিয়ে করতে ইচ্ছে আমার আদপেই ছিল না; তবে বংশটা— বলব কী— লোপ পেয়ে যাবে, সেইজন্যেই—'
'তোমার বিয়ে করা! তা বুঝেচি। একখানা ভৈরবী গাও তো খুড়ো!'
খুড়ো হাসিমুখে তানপুরা লইয়া বসিলেন।
গ
মণিরামপুরের কাছে খুড়োর শ্বশুরবাড়ি। আজ রাত্রির লগ্নে বিবাহ। আমরা বরযাত্রী।
বৈকালে খুড়োকে লইয়া আমরা স্টেশনে গেলাম। স্টেশনসুদ্ধ লোক অবাক হইয়া হাঁ করিয়া বরের দিকে চাহিয়া রহিল। খুড়োর কিন্তু কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ নাই; তিনি হাসি-হাসি মুখে সোজা ট্রেনে গিয়া উঠিয়া বলিলেন, 'ওহে গদা, আমার তানপুরোটা দে তো!'
গদা তাড়াতাড়ি ভাঙা তানপুরাটি খুড়োর হাতে তুলিয়া দিল। বাসরঘরে গান গাহিবেন বলিয়া খুড়ো তানপুরাটি সঙ্গে লইয়াছেন।
গাড়ি ছাড়িয়া দিল।
গঙ্গাধর ভটচায বলিলেন, 'তোমার বউকে দেখেচ খুড়ো?'
গদগদকণ্ঠে খুড়ো বলিলেন, 'দেখিনি বটে, কিন্তু শুনেছি নাকি পরমাসুন্দরী! ঘটক তো বললে, একেবারে ডানাকাটা পরি,— রংটি কেবল একটু কালো।'
ভটচায মুখ টিপিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলেন, 'পরিটির বাপ কী করেন খুড়ো?'
খুড়ো বলিলেন, 'আমার শ্বশুরের কথা বলচ বুঝি? আহা, তিনি স্বর্গারোহণ করেছেন! শাশুড়ি-ঠাকরোন কন্যাদায়ে পড়ে— বলব কী— আহার-নিদ্রা একরকম ভুলে গিয়েছিলেন বললেই হয়, আমি না হলে এ গরিব বিধবার আর উপায় ছিল না। বুঝেছ ভটচায! পয়সাকড়ির লোভে আমি এ বিবাহ করছি না— এ শুধু পরোপকার করা, পরোপকার!'
ভটচায মাথা নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন, 'হ্যাঁ হ্যাঁ— নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই এ বাজারে কন্যাপণ না নিয়ে বিবাহ করা পরোপকার নয় তো নিজের উপকার নাকি? তা খুড়ো, মেয়েটির বয়স কত?'
'কী জানো, বয়স একটু হয়েছে। বছর ষোলো-সতেরো— বলব কী— হয়েছে!— ওরে গদা, এসেন্সের শিশিটা নিয়েছিস তো?'
গদাই পোঁটলাপুঁটলি খুঁজিয়া বলিল, 'কই, না তো!'
খুড়ো চোখ কপালে তুলিয়া বলিলেন, 'না তো কীরে ব্যাটা! রাত্তিরে আমি মাখব কী? অ্যাঁ— বলব কী—'
খুড়োর মুখ দিয়া আর কথা বাহির হইল না।
গদাই দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া মাথা চুলকাইতে লাগিল।
খুড়ো ব্যাকুলভাবে বলিলেন, 'হায় হায়, মুখ্যু ব্যাটা, বেয়াকুব ব্যাটা, আমার— বলব কী— সর্বনাশ করলে দেখচি! অমন দামি এসেন্সটা— গাঁট থেকে করকরে ছ-গন্ডা পয়সা বার করে কেনা গেল,— (বলিতে বলিতে খুড়ো হুংকার দিয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন)— হারামজাদা ব্যাটা! আজ তোকে গাড়ি থেকে ঝুপ করে— বলব কী— ফেলে দেবই দেব!'
গদাই কাঁদিতে কাঁদিতে কামরার এককোণে সরিয়া গিয়া বলিল, 'এজ্ঞে, তাহলে মরে যাব কর্তা!'
আমরা অনেক কষ্টে খুড়োকে আবার ঠান্ডা করিলাম।
খুড়ো গজরাইতে গজরাইতে খানিকক্ষণ বসিয়া বসিয়া তামাক টানিলেন। তাহার পর বলিলেন, 'গাড়িখানা চলচে যেন গোরুর গাড়ি! ঠিক সময়ে পৌঁছুতে না পারলে আবার লগ্নভ্রষ্ট হয়ে যাবে। এই গদা— পাজি ব্যাটা! আমার সুমুখ থেকে তুই সরে যা বলচি। তোকে দেখলেও— বলব কী— আমার ভয়ানক রাগ হচ্চে! হায়, হায়, ছ-ছ-আনা পয়সা দিয়ে কেনা,— অমন দামি এসেন্সটা।...'
ঘ
যথাসময়ে বিবাহবাড়িতে গিয়া হাজির হইলাম।
খুড়োর শ্বশুরবাড়িটি পাকা বটে, কিন্তু পঞ্চাশ-ষাট বৎসরের ভিতরে বোধহয় তাহা আর মেরামত করা হয় নাই। তার একদিকটা পড়িয়া গিয়াছে, আর-একদিকও পড়ো-পড়ো।
গাঁ-সুদ্ধ লোক বর দেখিতে ছুটিয়া আসিল— কিন্তু বর দেখিয়া সকলে রীতিমতো হতভম্ব হইয়া গেল।
স্ত্রীলোকেরা প্রকাশ্যে যে সকল চোখা চোখা সমালোচনা করিতে লাগিল, তাহা শিষ্টও নয়, মিষ্টও নয়।
একজন বলিল, 'আ ম'ল, এরা কি এটা মড়া-পোড়ানো ঘাট পেয়েছে যে, এই বাহাত্তুরে মিনসেকে কাঁধে করে এখানে এনেছে!'
আর-একজন বলিল, 'মরি, মরি! বর নয় তো নটবর! আহা, খোকা-বরের মুখ দেখেচ গা— মুখ দেখলে যেন নুড়ো জ্বেলে দিতে সাধ যায়!'
আর-একজন বলিল, 'মরে যাই, কালাচাঁদের আবার শখটুকু আছে ষোলোআনা! গালে আবার আলতা মেখেচেন— অমাবস্যায় চাঁদের আলো, রূপ যেন ফেটে পড়চে!'
এইসব অপ্রত্যাশিত সমালোচনা শুনিয়া খুড়ো দস্তুরমতো চমকিয়া চমকিয়া উঠিতে লাগিলেন। আমাদেরও কেমন লজ্জাবোধ হইতে লাগিল।
বাড়ির ভিতর হইতে হঠাৎ এক স্ত্রী-কণ্ঠের বিষম চিৎকার উঠিল। কে চেঁচাইয়া বলিতেছে, 'হ্যাঁ রে মুকুন্দ, তুই কি একেবারে চোখের মাথা খেয়েছিস? এই ঘাটের মড়াটাকে কী বলে তুই আশীর্বাদ করে এলি?'
তথাকথিত চক্ষু-মস্তক-ভক্ষণকারী ভয়ে ভয়ে কী উত্তর দিল আমরা শুনিতে পাইলাম না; কিন্তু তাহার উত্তর শুনিয়া স্ত্রীলোকটি একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিয়া বলিল, 'হ্যাঁ রে পোড়ারমুখো, হ্যাঁ! গরিব হয়েছি বলে মেয়ের গলায় দড়ি-কলসি বেঁধে জলে ফেলে দেব,— না?'
এতক্ষণে বুঝিতে পারিলাম, স্ত্রীলোকটি হইতেছেন আমাদের খুড়োরই হবু-শাশুড়ি, আর যাঁহার উপরে এতটা 'তম্বি' করা হইতেছে, তিনিই সেদিন খুড়োকে আশীর্বাদ করতে গিয়াছিলেন।
বিবাহের আরম্ভটা আশাপ্রদ ও উজ্জ্বল বলিয়া মনে হইল না। খুড়োর দিকে চাহিয়া দেখিলাম, তিনিও যেন একেবারে মুষড়াইয়া পড়িয়াছেন।
* * *
খুড়ো বাসরঘরে গিয়াছেন।
সেরাতে কলিকাতায় ফেরা অসম্ভব বলিয়া আমরা সকলে বৈঠকখানার এককোণে গিয়া শুইয়া পড়িলাম; কিন্তু ঘুম কি সহজে আসে? আমাদিগকে স্তব্ধ হইতে দেখিয়া ব্যাং ও মশার দল এমনই উৎসাহের সহিত ভেঁপু ও বেহালা বাজাইতে শুরু করিল যে, সেরাতে আমার নিদ্রাদেবীর আরাধনা নিষ্ফল বলিয়া বোধ হইল। এক-একটা ব্যাং আবার এতদূর মানুষ-ঘেঁষা যে, আমাদের গায়ের উপরে অনায়াসে অসংকোচে লাফাইয়া উঠিয়া মহানন্দে নৃত্য আরম্ভ করিয়া দিতে লাগিল। অনেক রাতে, অনেক কষ্টে, গঙ্গাধর ভট্টাচার্যের নাকের ডগায় উপবিষ্ট একটি সংগীতপটু কোলাব্যাংকে স্তিমিত নেত্রে দেখিতে দেখিতে আমি ধীরে ধীরে ঘুমাইয়া পড়িলাম।
ঙ
ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া স্বপ্ন দেখিতেছিলাম, ব্যাঙের রাজা খুড়োকে তাঁহার ওস্তাদের পদে বরণ করিয়াছেন। তাঁহার দরবারে ঊর্ধ্বমুখ অসংখ্য ব্যাং, ব্যাং-বউ (ব্যাংরা স্ত্রী- স্বাধীনতার অত্যন্ত পক্ষপাতী), ও ব্যাঙাচিদের মাঝখানে বসিয়া, কাঁধে ভাঙা তানপুরাটি লইয়া মাথা নাড়িতে নাড়িতে খুড়ো বলিতেছেন, 'ব্যাঙের ডাকই তো হল আসল— বলব কী— ধ্রুপদের সুর। গলা থেকে অমন আওয়াজ বার করতে পারে ক-টা গাইয়ে, মহারাজ?'
ব্যাং-মহারাজ কিন্তু খুড়োর কথা শুনিতেছিলেন না। তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সহিত চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া খুড়োর তানপুরাটি নিরীক্ষণ করিতেছিলেন।
তিনি ডাকিলেন, 'ওস্তাদজি!'
খুড়ো জোড়হাতে বলিলেন, 'হুকুম করুন মহারাজ!'
'তোমার কাঁধে ওটা কী?'
'তানপুরো হুজুর!'
'ওটি আমাকে ভাড়া দিতে হবে— ওর ভেতরে আমি আমার প্রাসাদ তৈরি করব।'
মনে মনে প্রমাদ গনিয়া খুড়া কহিলেন, 'আজ্ঞে মহারাজ, এটি যে আগে থাকতেই— বলব কী— ভাড়া হয়ে গেছে।'
'হয়ে গেছে! ভাড়া নিলে কে?'
'আজ্ঞে, আরশুলারা।'
'ব্যাটাদের উঠিয়ে দাও।'
'আজ্ঞে, আরশুলাদের সঙ্গে— বলব কী— এগ্রিমেন্টো হয়ে গেছে যে!'
'এগ্রিমেন্টো আবার কী? জোর যার মুল্লুক তার।'
খুড়ো ক্ষীণস্বরে কী বলিতে যাইতেছিলেন, এমন সময়ে হঠাৎ আমার ঘুম ভাঙিয়া গেল।— আমার গা ধরিয়া কে ঘন ঘন নাড়া দিতেছিল। তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া দেখি, খুড়োর চাকর গদাই।
'কী রে গদা?'
গদাই কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল, 'বাবুর বউ বাসর থেকে কখন উঠে পালিয়ে গেছে।'
'বউ পালিয়েছে কী রে ব্যাটা!'
'হ্যাঁ গো হ্যাঁ! কনের মা বাবুকে ধরে ঝাঁটা মারছে, বাবুও বোধহয় এতক্ষণে চম্পট দিয়েছে।'
আমি হতভম্ব হইয়া বসিয়া রহিলাম। হঠাৎ বাহিরে বিষম গোলযোগ শুনা গেল— কাহারা চেঁচাইয়া বলিতেছে, 'ওরে লাঠিসোঁটা যা কিছু আছে, নিয়ে চটপট চলে আয়। বরযাত্রীগুলোকে মেরে-ধরে হাড়গোড় সব গুঁড়ো করে দিতে হবে।'
এরকম বেয়াড়া কথা শুনিলে কোনো ভদ্রলোকই স্থির হইয়া বসিয়া থাকিতে পারে না,— আমিও তড়াক করিয়া একলাফে দাঁড়াইয়া উঠিলাম। গঙ্গাধর ভট্টাচার্য তখনও গভীরভাবে নিদ্রিত এবং তাঁহার নাকের উপরে তখনও সেই কোলাব্যাংটি চিত্রার্পিতের মতো বসিয়া বসিয়া ঘাড় বাঁকাইয়া একমনে নাসা-গর্জন শ্রবণ করিতেছে।
ভটচাযকে অনেক কষ্টে জাগাইয়া সংক্ষেপে সব কথা খুলিয়া বলিলাম। ভটচাযের ঘুমের ও আফিমের নেশা আশ্চর্যরূপে এক লহমায় ছুটিয়া গেল। তিনি তখনই 'আঁ' বলিয়া সুদীর্ঘস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন; ভয়ে তাঁহার কাছা ও কোঁচা দুইই খুলিয়া গেল; কিন্তু সেই অবস্থাতেই তিনি চক্ষু না পালটিতে ভোজবাজির মতো ঘরের ভিতর হইতে একদৌড়ে অদৃশ্য হইলেন।
আমি ডাকিলাম, 'ভটচায, তোমার জুতো হে, জুতো!'
ভটচায পলাইতে পলাইতে বলিলেন, 'প্রাণ থাকলে ঢের জুতো হবে!'
অগত্যা আমি ভটচাযের পদাঙ্ক অনুসরণ করিলাম। গদাই ও অন্যান্য সকলে আগেই চম্পট দিয়াছিল।
বাড়ি হইতে বাহির হইবার সময় শুনিলাম, খুড়োর শাশুড়ি চিৎকার করিতেছেন, 'ওরে, মিনসেগুলো পালায় যে! হতভাগারা এমন বর নিয়ে এসেচে যে, ভয়ে আমার পেটের মেয়ে কোথা পালাল! আয়— আয়— শিগগির আয়, ধরে আন সবগুলোকে, আমি নিজের হাতে ঝাঁটাপেটা করব— তবে আমার রাগ যাবে।'
পিছনে দ্রুত পদধ্বনি শুনিলাম এবং আমিও আমার পদযুগলকে যথাসাধ্য দ্রুততর বেগে চালাইয়া দিলাম।
বাহিরে ঘোর অন্ধকার। ভটচায যে কোনদিকে মরিয়া হইয়া দৌড় মারিয়াছে, কিছুই ঠাহর করিতে পারিলাম না। স্থূলকায় ভটচাযের যেরকম আজানুলম্বিত দোদুল্যমান কুমড়ার মতো ভুঁড়ি, তাহাতে সে যে অমন ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মতো ছুটিতে পারে, আগে আমার সে খেয়াল আদপেই ছিল না।
অন্ধকারে গাছে গাছে ধাক্কা, ইট-পাটকেলের ঠোক্কর এবং খানাডোবায় হোঁচট খাইয়া, এক পাটি জুতা ও চশমাখানা হারাইয়া কোনোগতিকে গ্রাম পার হইয়া মাঠের উপর আসিয়া পড়িলাম। হতভাগারা গাঁয়ের শেষ পর্যন্ত আমার পিছনে পিছনে তাড়া করিয়া আসিয়াছিল।
মাঠের উপরে বসিয়া আগে খানিকক্ষণ হাঁপ ছাড়িয়া লইলাম। তখন অগ্রহায়ণের শেষ— কনকনে শীত পড়িয়াছে। তাহার উপরে শেষরাত, খোলা মাঠ আর ঠান্ডা হাওয়া। আমার সর্বাঙ্গ ঠকঠক করিয়া কাঁপিতে লাগিল,— দাঁতে দাঁত লাগিয়া যায় আর কী! দুঃখের উপর দুঃখ,— আলোয়ানখানাও বিয়েবাড়িতে ফেলিয়া আসিয়াছি। খুড়োর উপর ভয়ানক রাগ হইল; কিন্তু মনের রাগ মনেই চাপিয়া আস্তে আস্তে উঠিয়া দাঁড়াইলাম।
মাঠের ওপারে— অনেক তফাতে, গোটাকতক আলো চোখে পড়িল। বুঝিলাম, স্টেশনের আলো। সেই আলো লক্ষ করিয়া হাড়ভাঙা লাঠি এড়াইয়া ও হাড়ভাঙা শীতে কাঁপিতে কাঁপিতে চলিতে লাগিলাম। আমার দু-ধারে জলভরা ধানের খেত,—মাঝখানে আল।
কিন্তু বিষের গেলাস বুঝি এখনও ভরতি হয় নাই!— পায়ের কাছে হঠাৎ সাপের মতো কী একটা ফোঁস করিয়া উঠিল! ভয়ে আঁতকাইয়া দিলাম একলাফ— পড়িলাম একেবারে জলের ভিতরে! উঃ! সে যে কীরকম বিপরীত আরাম, ভুক্তভোগী ভিন্ন আর কেহ তাহা বুঝিবেন না।
বিপদের উপরে বিপদ! জলের ভিতরে আমি পড়িতে আর-একটা কী প্রকাণ্ড জানোয়ার ঝপঝপ করিয়া তফাতে সরিয়া গেল। ও বাবা, বাঘ নাকি? ডাঙায় সাপ, জলে বাঘ— যাব কোথা! আমার দেহে কাঁটা দিয়া উঠিল, প্রাণের মায়া একেবারে ছাড়িয়া দিলাম।
প্রাণ তো গিয়াছেই! তবু একবার শেষ চেষ্টা করা যাক! জানোয়ারটাকে ভয় দেখাইবার জন্য যতটা বিকটস্বরে পারা যায়— চিৎকার করিয়া উঠিলাম।
উত্তরে শুনিলাম, 'আও না, আও! কাছে এসেচ কি টুঁটি চেপে ধরেছি— খবরদার! আমার গায়ে ভয়ানক জোর— জলে চুবিয়ে মারব, চুবিয়ে মারব।'
সবিস্ময়ে বলিলাম, 'কে ও, ভটচায নাকি?'
ভটচাযও আশ্চর্য হইয়া বলিল, 'কে— তুমি?'
'ব্যাপার কী ভটচায?'
'গুরুতর। ছুটতে ছুটতে পতন।'
'চে�চাচ্ছিলে কেন?'
'ভয়ে দাদা, ভয়ে। তুমিও তো চেঁচানোতে কম যাও না!'
'আমি ঠাউরেছিলাম, তুমি বাঘ।'
'আর আমি ভেবেছিলাম তুমি খুড়োর শ্বশুরবাড়ির কেউ। আমাকে ধরতে তুমি জলে নেমেছ। তাই নিজে ভয় পেয়েও তোমাকে ভয় দেখাচ্ছিলাম।'
'বোঝা গেছে ভটচায, বোঝা গেছে। আমরা দুজনে একই কারণে চেঁচাচ্ছিলাম। উপায় না থাকলে কাপুরুষও সাহসী হয়। এখন ওঠো। স্টেশনে গিয়ে বসে থাকা যাক গে।'
চ
কলিকাতায় আসিয়া, বৈকালে খুড়োর দেখা পাইলাম।
জিজ্ঞাসা করিলাম, 'কী খুড়ো, বউ দেখাবে না?'
খুড়ো হতাশভাবে বলিলেন, 'মড়ার ওপরে খাঁড়ার ঘা— বলব কী— আর দিয়ো না। খান্ডারনির হাতে পড়ে আর-একটু হলেই প্রাণটা গিয়েছিল আর কী!'
'বউ পালাল কেন খুড়ো?'
খুড়ো অধোবদনে বলিলেন, 'কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে— বলব কী— আর দিয়ো না। গেলুম বিয়ে করতে, ফিরে এলুম ঝাঁটা খেয়ে। হায়, হায়, বংশটা আর রইল না দেখচি! কপাল দাদা, কপাল!'
আমি বললাম, 'কেন খুড়ো, ভাবচ কেন, এবার আমি নিজে তোমার জন্যে মেয়ে দেখব। তবে, তোমার বিয়েতে আর বরযাত্রী হতে পারব না খুড়ো!'
'মাপ করো বাবা, বংশরক্ষার দরকার নেই; এখনও পিঠখানা ফুলে— বলব কী— ঢাক হয়ে আছে। আর দু-এক ঘা পড়লে তোমরা বাবা, খুড়োকে আর চোকে দেখতে পেতে না।'
খুড়ো তাঁহার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিয়াছেন। বংশ-যষ্টির ভয়ে বংশরক্ষার জন্য খুড়ো আর কখনো আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই। তবে, আজকাল তাঁহার নৈশসংগীতে বেহাগ রাগিণীর অতিশয় বাড়াবাড়ি হইয়া উঠিয়াছে।
মর্মবাণী ৭ পৌষ ১৩২২ (ডিসেম্বর ১৯১৫)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।