পাগল

হেমেন্দ্রকুমার রায়

(রুশ ঔপন্যাসিক লিওনিডাস আন্ড্রিভ হইতে)

[১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ১১ ডিসেম্বরে, ডাক্তার আন্টনি ইগনাটিভিচ কার্জেন্টজেফ একজন লোককে খুন করেন। এই অপরাধের বিবরণ ও তাহার পরের কতকগুলি ঘটনা হইতে বুঝা গিয়াছিল যে, হত্যাকারীর মস্তিষ্ক অপ্রকৃতিস্থ।

কার্জেন্টজেফকে 'এলিজাবেথ মনোবিজ্ঞানমূলক চিকিৎসালয়' পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করা হয়। সেখানে কয়েকজন বহুদর্শী মস্তিষ্কবিশেষজ্ঞ তাঁহাকে যন্ত্রসহকারে পরীক্ষা করেন।

হাসপাতালে এক মাসকাল কাটিয়া গেলে, ডাক্তার কার্জেন্টজেফ উক্ত বিশেষজ্ঞদের হাতে আপনার নোটবহিখানি দেন। তাহাতে আসল ঘটনার কথাগুলি খুলিয়া লিখা ছিল। আমরা নীচে তাহার কয়েক স্থান তুলিয়া দিলাম।]

মহাশয়গণ,

এতক্ষণ পর্যন্ত আমি সত্য গোপন করিয়া আসিতেছি বটে, কিন্তু এখন আমাকে বাধ্য হইয়া সব কথা খুলিয়া বলিতে হইল। যখন আপনারা সমস্ত ব্যাপারটা জানিতে পারিবেন, তখন বুঝিবেন যে, এ ব্যাপারটা যতটা সহজ বলিয়া মনে হইতেছে, আসলে এটি তত সহজ নয়।

আলেক্সিস,—যাকে আমি খুন করিয়াছি, আমার বিদ্যালয়ের সহপাঠী ছিল। সে উকিল আর আমি ডাক্তার হইলেও, আমরা বরাবর একসঙ্গে পড়াশুনা করিয়া আসিয়াছি। আমি যে তাকে অপছন্দ করিতাম, তাও নয়। সে আমার দরদের দরদি ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। কিন্তু তবু,—কেন জানি না,—তার উপর আমার এতটুকু শ্রদ্ধা ছিল না। তাহার বিনীত ও মধুর প্রকৃতি, তাহার সদাচঞ্চল ভাব ও কল্পনা, তাহার নানা বিষয়ের একগুঁয়ে মতামতের জন্য তাহাকে একটা শিশু বা রমণী বলিয়া মনে হইত। যে সকল লোক তাহার মরমের মরমি ছিল, তাহারা সর্বদাই তাহার স্বভাবের জন্য ব্যথা পাইত। কিন্তু সকলেই তাহাকে প্রাণ দিয়া ভালোবাসিত। তাহারা বলিত, সে 'কলাকুশল'। তাই তাহার ত্রুটিবিচ্যুতিকে কেহ আমলে আনিত না। মানবচরিত্র কী যুক্তিহীন!

সময়ে সময়ে আমিও সকলের 'রায়ে রায়' দিয়া এই 'কলাকুশল' বন্ধুটির ছোটোখাটো দোষগুলিকে গ্রাহ্যের ভিতর আনিতাম না। 'ছোটোখাটো দোষ' বলিলাম এইজন্য যে, আলেক্সিস বৃহৎ কোনো কিছুর উপযুক্ত ছিল না! এমনকী,—সে যা দোষ করিত,—তাও ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ! আমার কথার প্রমাণস্বরূপ আমি তাহার সাহিত্যসাধনার কথা তুলিতে পারি। যে সকল ম্লানদৃষ্টি সমালোচক চিরকাল ধরিয়া নূতন কোনো প্রতিভা আবিষ্কার করিবার ফিকিরে আছে, আলেক্সিসের তুচ্ছ রচনা হইতে তাহারাও মহৎ কিছু বাহির করিতে পারিত না। আলেক্সিসের মতো, তাহার লেখাতেও কোনো একটা বিশেষ গুণ ছিল না।

আলেক্সিস বিবাহ করিয়াছিল। কিন্তু বিধবা হইয়া তাহার স্ত্রী-র সকল রূপ-সৌন্দর্যই এখন মুছিয়া গিয়াছে। আগে যে তাকে দেখিয়াছে, এখন সে তাকে আর চিনিতে পারিবে না। স্বামীকে সে বড়ো ভালোবাসিত। স্বামী হারাইয়া তার কপোলের গোলাপি আভা এখন আর নাই। অনেকদিন-পরা দস্তানার মতো, তার মুখে এখন কুঞ্চনরেখা পড়িয়াছে। আর, তার সেই চোখ দুটি! আগে যে চোখ সর্বদাই হাসিত, এখন সে চোখ হাসিখুশি সব ভুলিয়াছে। আমি সেদিন পুলিশ-কোর্টে তাকে একটি বারের জন্য দেখিয়া তাহার আশ্চর্য পরিবর্তনে একেবারে অবাক হইয়া গিয়াছিলাম। তার ভিতরে তখন এমন জোরও ছিল না যে, সে কুপিত-নেত্রে আমার দিকে চাহিতে পারে! এখন সে অতীতের কঙ্কাল! অভাগা রমণী!

আলেক্সিসের স্ত্রী-র নাম তাসিয়ানা। পাঁচ বছর আগে আমি তাসিয়ানার কাছে বিবাহ-প্রস্তাব করিয়াছিলাম। এ কথা, আমি, তাসিয়ানা ও আলেক্সিস ছাড়া দুনিয়ার আর কেহ জানে না। কিন্তু তাসিয়ানা আমার প্রস্তাবে মত দেয় নাই।

আমার প্রস্তাবে তাসিয়ানা তখন হাসিয়াছিল। সে হাসি কি এখন তার মনে আছে? বোধ হয়—না। কারণ, তারপরে সে কতবার হাসিবার অবকাশ পাইয়াছে। এত হাসির মাঝে সেদিনকার সে হাসি চাপা পড়িয়া গিয়াছে। কিন্তু, আপনারা তাহাকে মনে করিয়া দিবেন যে, ''৫ সেপ্টেম্বরে সে হাসিয়াছিল!'' যদি সে অস্বীকার করে,—এবং সে অস্বীকার করিবেই করিবে—তবে তাকে আবার মনে করাইয়া দিবেন যে, সে হাসিয়াছিল!

যে আমি এমন সবল পুরুষ, যে আমি আর কখনো চোখের জল ফেলি নাই, সেই আমি তাহার স্বমুখে দাঁড়াইয়া কাঁপিতে লাগিলাম। আমি দেখিলাম, তাসিয়ানা তাহার ওষ্ঠ দংশন করিল। আমি তাহাকে জড়াইয়া ধরিবার জন্য হাত দুটি বাড়াইয়া দিলাম। সে তাহার চোখ তুলিয়া চাহিল—সে চোখ দুটি হাসিয়া উঠিল। আমার দু-হাত নিসাড় হইয়া আবার পড়িয়া গেল। সে হাসিতে লাগিল এবং অনেক—অনেকক্ষণ ধরিয়া হাসিল। যতক্ষণ না তার সাধ মিটিল, ততক্ষণ তার হাসিও থামিল না। অবশ্য, তারপরে সে ক্ষমা প্রার্থনা করিল।

'দয়া করে আমাকে মাপ করো!'—তার চোখ তখনও হাসিতেছিল।

আমি— এমনকী আমিও মৃদু মৃদু হাসিলাম। তাহার হাস্যের জন্য যদিও আমি তাহাকে ক্ষমা করিতে পারিতাম,— কিন্তু আমার সেই মৃদু হাস্যের জন্য আমাকে আমি কখনো ক্ষমা করিতে পারিব না!

৫ সেপ্টেম্বর এই ঘটনা ঘটে। শহরের ঘড়িতে তখন বেলা ছয়টা। আমি এখনও সেই প্রকাণ্ড ঘড়ির বৃহৎ, কালো কাঁটা দুটি পর্যন্ত চোখের সামনে স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছি— একটি কাঁটা উপরদিকে, আর-একটি নীচের দিকে। আলেক্সিসও ঠিক ছয়টার সময়ে খুন হয়। কোনো তীক্ষ্ন দৃষ্টির লোক এই সাদৃশ্য হইতে অনেক ব্যাপারের সংকেত পাইবেন।

আজ যে আমি পাগলাগারদে আছি, তাহার একটি কারণ এই যে, আমার অপরাধের কোনো উদ্দেশ্য পাওয়া যায় নাই। এতক্ষণে কি আপনারা আমার উদ্দেশ্য বুঝিয়াছেন? না—ইহা হিংসা নয়। আমার মতো বুদ্ধিমান লোক তুচ্ছ হিংসার জন্য কোনো কাজ করে না।

প্রতিহিংসা? হাঁ, একটি পুরানো কথা দিয়া একটি নূতন ও অজানা ভাবকে যদি কতকটা তবু ফুটাইতে হয়, তবে 'প্রতিহিংসা' বলিলেও বলা যায়।

তাসিয়ানা দ্বিতীয়বার আমাকে ঠকাইল। সে কথা ভাবিলেও আমার রাগ হয়। আলেক্সিসকে আমি খুব ভালোরকমেই জানিতাম। আমি তাই ঠাওরাইয়াছিলাম যে, আলেক্সিসের সঙ্গে আমি যদি তাসিয়ানার বিবাহ দিতে পারি, তবে সে অত্যন্ত অসুখী হইবে। আমাকে বিমুখ করিয়াছে বলিয়া তাসিয়ানা তখন অনুতাপ করিবে। এই কারণে আমি তাহাদিগকে বিবাহিত করিবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। তাহারা তখনই পরস্পরকে ভালোবাসিত। সুতরাং বিবাহ হইয়া গেল।

মৃত্যুর এক মাসমাত্র আগে আলেক্সিস একদিন আমাকে ডাকিয়া বলিল, 'তোমার জন্যেই আজ আমি এত সুখী। না তাসিয়ানা?' বলিয়া, সে তার স্ত্রী-র দিকে ফিরিল।

তাসিয়ানা আমার দিকে চাহিল। মৃদুস্বরে বলিল, 'হ্যাঁ।' তার চোখ দুটি হাসিয়া উঠিল। আমিও মৃদুহাস্য করিলাম। আলেক্সিসও হাসিল। তারপরে তাসিয়ানাকে আলিঙ্গন করিল। আমার সুমুখে তাদের লজ্জাশরম কিছুই ছিল না।

আলেক্সিস বলিল, 'তুমি কিন্তু হেরে গেছ বন্ধু, হেরে গেছ!'

এই যে কৌতুক— ইহা স্থানকালের যেমন অনুপযোগী, তেমনি কৌশলশূন্য। এই কৌতুক তাহার জীবনকে মৃত্যুর দিকে এক সপ্তাহ অগ্রসর করিয়া দিল। কারণ আমি তাহাকে ডিসেম্বর মাসের আঠারোই তারিখের আগে মারিব না ঠিক করিয়াছিলাম।

হাঁ, বিবাহ করিয়া তারা দুটিতে বড়ো সুখে দিনযাপন করিতেছিল। বিশেষ, তাসিয়ানার আনন্দের মাত্রাটাই যেন বেশি ছিল। আলেক্সিস কিন্তু ততটা আবেগভরে তাকে ভালোবাসিত না। সে কোনোরূপ গভীর স্নেহপ্রকাশে একেবারেই অপারগ ছিল। তার একমাত্র বাতিক ছিল সাহিত্য। তা-ই লইয়া সে ভুলিয়া থাকিত। সংসারের দিকে ফিরিয়াও চাহিত না। কিন্তু তাসিয়ানা! স্বামী বই আর কিছু সে জানিত না—সে একেবারে তৎসমর্পিত প্রাণ! আলেক্সিসের স্বাস্থ্য ভালো ছিল না। সে প্রায়ই অসুখবিসুখে পড়িত। সে সময়ে তাসিয়ানা প্রাণপণে স্বামীসেবা করিয়া আপনাকে যেন ধন্যজ্ঞান করিত। কারণ, রমণী যখন ভালোবাসে, তখন তাহার নিজত্ব সম্পূর্ণরূপে ডুবিয়া যায়।

এমনি, প্রতিদিন আমি তার হাস্যরঞ্জিত মুখ দেখিতাম,— তাহা যৌবনপুষ্ট, অযত্নশোভন, পরমসুন্দর! আমি দেখিতাম, আর ভাবিতাম, 'এর কারণ হচ্ছি আমি! মানিক ফেলে সে কাচ পেয়েছে, এটা তাকে বোঝাবার জন্যে তার সঙ্গে আলেক্সিসের বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু সব উলটো হল— আমার ধুলো-মুঠি তার কাছে সোনা-মুঠি হয়ে দাঁড়াল,— যাকে সে ভালোবাসত, তাকেই সে পেয়েছে। চমৎকার!'

আলেক্সিসকে খুন করিবার মতলব আমার মাথায় কখন ঢুকিল, সে কথা আমার মনে নাই। আমার মনে হইত, এ ইচ্ছা জন্মাবধি আমার সঙ্গে আছে। তাসিয়ানাকে যাতনা দেওয়াই আমার উদ্দেশ্য। তাই আমি প্রথম প্রথম এমন সব উপায় খুঁজিতাম, যাতে বেচারা আলেক্সিস যতটা সম্ভব কম কষ্ট পাইয়া মরিতে পারে। আমি সর্বদাই অনর্থক নিষ্ঠুরতার বিরোধী।

নিজের জন্য আমার কোনো ভয়-ভাবনা ছিল না—এটা একটা মস্ত কথা। যে দোষী, যে খুনি, তার কাছে পুলিশের ভয়, বিচারকের ভয়, দণ্ডের ভয়ই বড়ো ভয় নয়! সকলের চেয়ে বড়ো ভয় তার নিজের জন্য, তার বিবেক-বুদ্ধির বিদ্রোহের জন্য। এ বিষয় নিয়া আমি নাড়াচাড়া করিয়াছি। খুনের পরে আমার মনের ভাবকে আমি তন্ন তন্ন পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছি।

আমি যাতনা পাইয়াছি সত্য,— ভীষণ যাতনা! তেমন যাতনা পৃথিবীর আর কেহ কখনো পায় নাই। আমার মাথার চুল সাদা হইয়া গিয়াছে। কিন্তু সে হচ্ছে আলাদা জিনিস। একেবারে আলাদা জিনিস। সে যে কী, তা জানি না— একটা ভয়ানক, আশাতিরিক্ত, স্বাভাবিক অথচ অসম্ভব কিছু! তবু— আমি যাতনা পাইয়াছি বটে, কিন্তু একটুও অনুতপ্ত হই নাই।

আমাকে এখন এই সমস্যা সমাধান করিতে হইবে, আলেক্সিসকে কী করিয়া খুন করি? আমি তাসিয়ানাকে জানাতে চাই যে, তার স্বামীকে মারিয়াছি আমি। সেই সঙ্গে আমি আইনের হাতও এড়াইতে চাই। খুন করিয়া আমি জেলে গেলে তাসিয়ানা বড়ো খুশি হইবে। বিশেষ, (অন্যান্য সকলের মতো) জেলে পচিয়া মরিবার জন্য আমার কোনোই আগ্রহ ছিল না। জীবনকে আমি ভালোবাসি,—অত্যন্ত।

জানালার কাচের ভিতর দিয়া সুরার মতো রাঙা ওই যে নবীন রবিকর আসিতেছে, আমি উহা দেখিতে ভালোবাসি। নরম বিছানার উপরে আমি আমার শ্রান্ত তনুকে বিছাইয়া দিতে ভালোবাসি। বসন্ত-বাতাসের উষ্ণ শ্বাসকে আমি ভালোবাসি, অস্তসূর্যের মহিমময় শোভার ভিতরে আপনাকে আমি ডুবাইয়া দিতে ভালোবাসি, সুলিখিত চিত্তাকর্ষক পুস্তক পড়িতে আমি ভালোবাসি। আমি ভালোবাসি— আপনাকে, আমার এই মাংসপেশির দৃঢ়তাকে, আমার এই নির্মল, নির্ভুল চিন্তাধারাকে! আমি আমার নিঃসঙ্গতাকে উপভোগ করিতে ভালোবাসি— আমার এই আত্মার গভীরতাকে (এই কৃষ্ণদহ, যাহার তটে মস্তিষ্কের কল্পনা নৃত্য করে) কোনো কৌতূহলী দৃষ্টি যে স্পর্শ করিতে পারে না, আমি ইহা অনুভব করিতে ভালোবাসি। জীবনে অবসাদ? লোকে কেন যে এ কথা বলে, তা কে জানে!

আইন এড়ানো, আমার পক্ষে খুব সহজ। লুকাইয়া লোক মারিবার হাজাররকম উপায় আছে। বিশেষ, তুমি যদি ডাক্তার হও, তাহা হইলে তো কথাই নাই। আমিও ডাক্তার। আমি অনেক ফন্দি আঁটিলাম। একবার ভাবিলাম, আলেক্সিসকে কোনো লুকানো অসুখে অসুখী করিয়া মারিব। কথাটা লইয়া অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করিলাম। কিন্তু, তার অসুখের সময়ে সেবা করিয়াও তাসিয়ানা তো কতকটা সুখী হইতে পারে। না, তা হইবে না। আমি তাসিয়ানাকে জানাইতে চাই, কে তার স্বামীকে মারিয়াছে। এটা যে বিশেষ দরকার!

বুদ্ধিমানের পরমবন্ধু— দৈব, আমার সহায় হইল। খবরের কাগজে একদিন আমি একটা ঘটনা পড়িলাম। কোনো কারবারের ক্যাশিয়ার মৃগীরোগের ভান করে। সেই সময়ে তার কাছ থেকে অফিসের টাকা চুরি যায়। কিন্তু, আসলে টাকা চুরি করিয়াছিল সে নিজেই। লোকটা কাপুরুষ। কারণ, পরে সে আপনার দোষ মানিয়াছিল। কিন্তু, এই দৈব ঘটনা আমাকে পথ দেখাইল।

পাগল সাজিয়া আলেক্সিসকে খুন করিলে কেমন হয়? ঠিক কথা! আমি এক বৎসর ধরিয়া মনোবিজ্ঞান সম্বন্ধে যত বই বাহির হইয়াছিল, সমস্ত পড়িয়া ফেলিলাম।

বিশেষজ্ঞদের মতে উন্মাদ বংশানুক্রমিক। আমার পিতা মদে আসক্ত ছিলেন। আমার এক খুড়া পাগলাগারদে মরেন। আমার এক ভগ্নী মৃগীরোগে মারা যায়।

দেখিলাম, পাগলামির অভিনয় করা আমার পক্ষে কিছু শক্ত নয়। বই থেকে আমি অনেক পাগলের লক্ষণ জানিয়াছিলাম। এগুলিকে আমি কাজে লাগাইব। আমি সুপটু অভিনেতার মতো অভিনয় করিব।

আমার মাথায় এক দুর্ভাবনা আসিল,— কোনো পাগলের মাথায় যাহা আসে না। আমার এই পরীক্ষার ভীষণ বিপদের কথা মনে হইল। আপনারা আমার কথার মানে বুঝিতেছেন? পাগলামি আগুনের মতো; তাহা নিয়া খেলা করিলে সর্বনাশের ভয় আছে। গুহার ভিতরে বারুদ পুরিয়া তুমি যদি তাতে আগুন দাও, তাহা হইলে হয়তো তুমি নিরাপদে থাকিতেও পারো; কিন্তু উন্মাদ-ভীতির এককণাও যদি তোমার মাথায় কোনোগতিকে ঢুকিয়া পড়ে, তবে তুমি একেবারেই গিয়াছ। আমি ইহা জানিতাম! আমি ইহা জানিতাম! কিন্তু, বিপদভয়ে কোনো সাহসীর বুক দমে?

সেদিনকার নিমন্ত্রণসভায় আমি বদ্ধপাগলের মতো যে কেলেঙ্কারিটা করিয়াছিলাম, তার কারণ আর বোধ করি, খুলিয়া বলিতে হইবে না। কারগুয়ানফের বাড়িতে আমার প্রথম পরীক্ষাটা আশাতীতরূপে সফল হইয়াছিল।

তাসিয়ানা ও আলেক্সিস সেদিনকার আসরে উপস্থিত ছিল না। আমি আগে থাকিতেই জানিতাম, তারা আসবে না। তারা থাকিলে আমি পাগলামি করিতাম না। কারণ, তাসিয়ানা হয়তো তাহা হইলে ভীত ও সন্দিগ্ধ হইত। পৃথিবীতে যদি কেহ এমন লোক থাকে, যে আমাকে চিনিয়াছে,— তবে সে তাসিয়ানা।

ঠিক করিয়াছিলাম, খাইতে বসিয়া আমি পাগলামি করিব— নিমন্ত্রিতেরা তখন সুরাপানে উত্তেজিত থাকিবে। টেবিলের যেদিকটায় ল্যাম্প ছিল, সেদিকটায় আমি বসিলাম না। কারণ, গোলমাল করিলে হঠাৎ একটা অগ্নিকাণ্ড হইয়া আমার নিজেরই পুড়িয়া মরিবার ভয় ছিল।

আমি পেট্রোভিচের পাশে গিয়া বসিলাম। এই মোটা ও ঘৃণিত জীবটাকে কিছু শিক্ষা দি,— আমার বরাবর এমন একটা সাধ ছিল। এ লোকটা যখন খাইতে বসিত, বিশেষ করিয়া তখনই সে বিরক্তিকর হইয়া উঠিত। প্রথম যেদিন তাহাকে আহার করিতে দেখি, সেদিন আমার মনে হইয়াছিল যে, ভোজন করাটাও ব্যভিচার রূপে গণ্য হইতে পারে।

প্রথমে আমি হাত ঘুরাইয়া পেট্রোভিচের সঙ্গে উত্তেজিতভাবে কথা কহিতে কহিতে পাগলামি শুরু করিলাম। পেট্রোভিচ তার ছোট্ট কুতকুতে চোখ দুটো যতটা পারা যায় ডাগর করিয়া অবাক হইয়া আমার দিকে চাহিয়া রহিল। তারপরে আমি দুঃখিত ও হতাশের মতো ভাবধারণ করিলাম।

শ্রীমতী প্যাভলোভনা মিষ্টস্বরে আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'হ্যাঁ আন্টনি, তোমার কী হয়েছে? তুমি অমনধারা বিষণ্ণ হয়ে আছ কেন?'

যখন সকলের চোখ আমার উপরে পড়িল, আমি তখন একটু বিষাদের হাসি হাসিলাম।

'তোমার শরীর কি ভালো নেই?'

'না, বড়ো ভালো বোধ করছি না। আমার গা কেমন-কেমন করচে— মাথা ঘুরচে। কিন্তু আমার জন্যে তোমরা কেউ ব্যস্ত হোয়ো না। আমি এখনই ভালো হয়ে উঠব।'

কিন্তু, গাধা পেট্রোভিচ আমার কথায় তেমন আশ্বস্ত হইয়াছে বলিয়া মনে হইল না। সে অত্যন্ত সন্দিগ্ধভাবে ও অপছন্দের সহিত চোখের এক কোণ দিয়া ঘন ঘন আমার দিকে তাকাইতে লাগিল। একটু পরেই, যেমনি সে একান্ত পরিতৃপ্তের মতো এক গেলাস মদ ঠোঁটের কাছে তুলিয়া ধরিল, অমনি আমি তার নাকের ঠিক তলা থেকে ঘুসি মারিয়া গেলাসটি চুরমার করিয়া দিলাম। তারপরে আমি মেজের উপরে সশব্দে আর-এক ঘুসি মারিয়া কাচের তালা ভাঙিয়া ফেলিলাম। পাছে কাচের টুকরা লাগিয়া আমার হাত কাটিয়া যায়, সেই ভয়ে আমি মুখ মুছিবার তোয়ালেখানা আগে থালার উপর রাখিয়া তবে ঘুসি মারিয়াছিলাম। আমার এ চালাকি কারো নজরে ঠেকিল না।

ভাঙা কাচগুলা চারিদিকে ছিটকিয়া পড়িল। পেট্রোভিচ মহাখাপ্পা হইয়া, শুয়ারের মত ঘোঁৎঘোঁৎ করিতে করিতে বিষম গোলমাল বাধাইয়া দিল। স্ত্রীলোকেরা সরু গলায় চিৎকার শুরু করিল। আমি দাঁতে দাঁত লাগাইয়া মেজ-ঢাকা চাদরখানা সমস্ত জিনিসের সঙ্গে টান মারিয়া ফেলিয়া দিলাম। সে এক মজার ব্যাপার— একেবারে প্রহসনের দৃশ্য!

সকলে আমাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইল। কেহ আমার হাত চাপিয়া ধরিল, কেহ আমার জন্য জল আনিয়া দিল, কেহ আমাকে লইয়া গিয়া একখানা আরাম কেদারায় বসাইয়া দিল। আমি চোখ পাকাইয়া বাঘের মতো গোঁ গোঁ করিতে লাগিলাম। লোকগুলো এতটা নির্বোধ যে, আমার ন্যাকামি তারা মোটে বুঝিতেই পারিল না। আমার ইচ্ছা হইতে লাগিল যে, সেই বোকাগুলোর নাক ঘুসির চোটে থেঁতলাইয়া দি! কিন্তু এ প্রলোভন আমি সংবরণ করিলাম।

তারপর আমি ধীরে ধীরেপ্রকৃতিস্থ হইতে লাগিলাম। প্রথমে আমি টানিয়া টানিয়া নিশ্বাস ফেলিলাম, তারপর দাঁত কিড়মিড় করিলাম, তারপরে অজ্ঞান হইয়া গেলাম। সবশেষে অস্পষ্টস্বরে দস্তুরমাফিক জিজ্ঞাসা করিলাম, 'আমি কোথায়? কী হয়েছে?'

হাবলা লোকগুলো আমার চালাকি টের পাইল না।

এক মাস পরে, আমার দ্বিতীয় পাগলামির অভিনয় হইল। এবারে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু অনুকূল অবস্থা পাইয়া, সে সুযোগ ছাড়িয়া দিয়া আমি বোকামি করিলাম না। সেদিন যা যা ঘটেছিল, আমার সব ঠিকঠাক মনে আছে।

সেদিনও আমি এক বন্ধুর বাড়িতে জমকালো আসরে বসিয়াছিলাম।

একঘর লোক। বসিয়া বসিয়া সবাই গল্পগুজব করিতেছে। হঠাৎ আমার মনটা কেমন উদাস হইয়া গেল। আমার মনে হইল, দুনিয়ায় আমি একা— আমি একা। সকলের কাছে আমি অচেনা আগন্তুকমাত্র। একাকী আমি আপনার ভিতরে চিরকালের তরে বন্দি হইয়া আছি। তারপর আমি আমার চারিদিককার লোকগুলির উপরে অসন্তুষ্ট হইয়া উঠিলাম। আমার মনে ভয়ানক রাগ হইল। আমি মুঠা করিয়া হাত ছুড়িতে ছুড়িতে অভদ্র ভাষায় চেঁচাইতে লাগিলাম। সকলের মুখে আতঙ্কের চিহ্ন দেখিয়া আমার প্রাণমন খুশি হইয়া উঠিল।

চিৎকার করিয়া বলিলাম, 'ওরে অভাগার দল! ওরে আত্মতুষ্ট, পাপী পশুর দল! ওরে কলঙ্কী সব! আমি তোদের ঘৃণা করি! আমি তোদের ঘৃণা করি!'

আমি নির্দয়ভাবে প্রথমে অতিথিদের, তারপরে তাদের কোচম্যান ও ভৃত্যদের উপরে কিল-চড়-ঘুসি চালাইতে লাগিলাম। তাদের সুখের উপরে তারা যে কী, স্পষ্টাস্পষ্টি সব খুলিয়া বলিয়া আমার ভারী আনন্দ হইল।

যে সত্য বলে, সে কি পাগল?

সেরাতে একলা বাড়িতে ফিরিয়া সমস্ত কথা মনে করিয়া আমি হাসিতে লাগিলাম। আপনা-আপনি বলিলাম, 'কী আশ্চর্য অভিনেতা আমি।'

তারপরে আমি একখানা বই হাতে করিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িলাম। সেখানা কী বই? আমি গ্রন্থকারের নাম বলিতে পারি— গি দে মোঁপাসা। মোঁপাসার লেখা আমার বড়ো ভালো লাগে।

গল্প শেষ করিয়া, শিশুর মতো নিশ্চিতভাবে আমি ঘুমাইয়া পড়িলাম। পাগলে কি বই পড়ে? বই পড়িয়া তারা কি আনন্দ পায়? পড়া শেষ হইলে তারা কি শিশুর মতো ঘুমাতে পারে?

পাগলে ঘুমায় না। তারা কষ্ট পায়। মস্তিষ্কের ভিতরেই তাদের যত গোলযোগ। হ্যাঁ, তাদের সুমুখে সব গোলমেলে, ঝাপসা-ঝাপসা ও টলমলে। তারা চেঁচাইতে চায়, আঁচড়াইতে চায়, হাত কামড়াইতে চায়। তারা চার হাত-পায়ে আস্তে আস্তে হামাগুড়ি দিতে চায় এবং তারপরে হঠাৎ লাফাইয়া উঠিয়া চিৎকার করিতে চায়, 'হাঃ! হাঃ!'

এবং তারা হাসিতে চায়। আবার চেঁচাইতে চায়। তাহারা গর্জন করিতে চায়,— দুঃখিতের মতো, দুঃখিতের মতো!

হাঁ,—হাঁ!

আমি শিশুর মতো ঘুমাইয়া পড়িলাম। পাগলে কি ঘুমায়?

আমার দ্বিতীয়বারের পাগলামির পরে লোকে আমাকে ভয় করিতে আরম্ভ করিল। তারা আর আমাকে নিমন্ত্রণ করিত না। দৈবাৎ কোনো বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হইলে, সে কাষ্ঠহাসি হাসিয়া, অর্থসূচক স্বরে জিজ্ঞাসা করিত, 'কী বন্ধু, কেমন আছ?'

তখন অবস্থাটা এমন দাঁড়াইয়াছিল যে, আমি কোনোরূপ অত্যাচার করিলে, সেজন্য আমাকে কেহ দোষী করিত না। কিন্তু আমার অতীত ও ভবিষ্য পাপ হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্য দরকারি হুকুম পাইলে ঢের সুবিধা হইবে। অতএব, আমি তখন সেই চেষ্টা করিতে লাগিলাম। কোনো ডাক্তারের অনুকূল অভিমত পাইলেই আমার চলিয়া যাইবে। আমি সুযোগের অপেক্ষায় রইলাম।

বেশি দিন অপেক্ষা করিতে হইল না। তাসিয়ানা ও আলেক্সিসই সে সুযোগ করিয়া দিল।

তাসিয়ানা বলিল, 'প্রিয় আন্টনি, আমি তোমাকে ডাক্তারের কাছে যেতে বলি।'

এর আগে তাসিয়ানা আমাকে কখনো 'প্রিয়' ডাকে ডাকে নাই। এহেন অনুগ্রহ পাইবার জন্য আমাকে আগে পাগল বনিতে হইয়াছে!

'বেশ তো, আমি যাব অহন।'

তাসিয়ানা, আলেক্সিস ও আমি,—এই তিনজনে তখন পাঠগৃহে দাঁড়াইয়া ছিলাম। এই ঘরেই পরে হত্যার অভিনয় হইবে।

আলেক্সিস মুরুব্বিয়ানা চালে কহিল, 'হ্যাঁ, তোমার আর কালবিলম্ব না করে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। নইলে, তুমি যে কখন কী ফ্যাসাদ বাধিয়ে বসবে, তা ভগবানই জানেন।'

দোষ থেকে আপনাকে খালাস রাখিবার জন্য আমি দুর্বল ও বিনীত স্বরে কহিলাম, 'আমি আর এমন কী করতে পারি?'

'কে জানে তুমি কী করবে! হয়তো কোনোদিন কারো মাথাই ভেঙে দু-ফাঁক করে দেবে!'

আমি টেবিলের উপর হইতে একটা ধাতুনির্মিত ভারী কাগজের চাপা তুলিয়া লইলাম। একবার আলেক্সিসের দিকে, আর-একবার কাগজ-চাপার দিকে চাহিয়া বলিলাম, 'কারুর মাথা ভাঙব বলচ? মাথা?'

'হ্যাঁ, তা নয়তো আর কী। তুমি কোনদিন হঠাৎ ওই কাগজ-চাপাটার মতো একটা কিছু হাতে করে তুলে নেবে, আর কাগজও তখনই ফরসা হয়ে যাবে।'

ব্যাপারটা চিত্তাকর্ষক হইয়া উঠিতেছে। আমি এই কাগজ-চাপাটা দিয়েই যে মাথাটা ভাঙব ঠিক করেচি, চূর্ণ হবার আগে ঠিক সেই মাথার ভেতরেই ঠিক সেই চিন্তাটাই ঢুকেচে! তথাপি, এমন লোকও আছে, যে ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে বিশ্বাস করে না! কী ভ্রম!

আমি বলিলাম, 'এই কাগজ-চাপাটা দিয়ে মারলে কারো বেশি কিছু লাগবে না।'

'কেন, তুমি কি বলতে চাও এটা খুব হালকা?' বলিয়া, আলেক্সিস আমার হাত থেকে কাগজ-চাপাটা নিয়া তার হাতল ধরিয়া দু-একবার দুলাইয়া দেখিল। তারপর কহিল, 'আচ্ছা, তুমি একবার পরীক্ষা করে দেখো।'

আমি কহিলাম, 'আমি বেশ ভালো করেই দেখেচি।'

'না, না— একবার দেখোই-না কেন। তাহলেই তুমি বুঝতে পারবে।'

অপ্রসন্নভাবে, অথচ মৃদুহাস্যের সহিত আমি তার হাত থেকে সেই ভারী কাগজ-চাপাটা লইলাম। এমন সময় তাসিয়ানা আসিয়া বাধা দিল। কম্পমান ওষ্ঠে, বিবর্ণ মুখে সে প্রায় চিৎকার করিয়া বলিল, 'আলেক্সিস, থামো থামো! ওসব কথায় কাজ নেই।'

আলেক্সিস আশ্চর্য হইয়া বলিল, 'কেন, হয়েচে কী?'

'তোমরা কী সব ছাই কথা বলচ? জানো, ওরকম ঠাট্টা আমি পছন্দ করি না!'

তখন আমরা সকলেই হাসিয়া উঠিলাম। কাগজ-চাপাটা যেখানে ছিল, সেইখানেই আবার রাখিয়া দেওয়া হইল।

প্রফেসরটির কাছে গেলাম।

আমি যাহা ভাবিয়াছিলাম, তাহাই হইল। তিনি খোঁজ নিলেন যে, আমাকে যত্ন করিতে পারেন, আমার এমন এক আত্মীয় আছেন কি না। তিনি উপদেশ দিলেন, আমি যেন এখন চুপচাপ বাড়িতে বসিয়া বিশ্রাম করি। আমি নিজে ডাক্তার বলিয়া, অনেক যুক্তিতর্কের অবতারণা করিয়া তাঁহার সহিত তর্ক করিলাম। ফলে, আমার পাগলামির বিষয়ে তাঁহার যেটুকু সন্দেহ ছিল, তাহাও ঘুচিয়া গেল। তিনি বলিলেন আমার আর কোনো আশা নাই—আমি বদ্ধপাগল। আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইল। সেই মুহূর্ত হইতে আলেক্সিসের জীবন আমার মুঠার ভিতরে আসিল।

আলেক্সিস নিজের স্বাস্থ্যরক্ষার প্রতি অত্যন্ত অমনোযোগী ছিল। তাসিয়ানা একদিন আমার কাছে আসিল। আমি আলেক্সিসের কুশলসংবাদ জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, সে ভালোই আছে। আমার মুঠার ভিতর হইতে যম তাহাকে ছিনাইয়া লইয়া যায়, আমার এই এক ভয় ছিল। তাসিয়ানা যাহাতে সন্দেহ না করিতে পারে, সেইজন্য এ সময়টা আমি খুব সহজভাবে ব্যবহার করিলাম। আলেক্সিস বা তাসিয়ানা,—কেহই আমার পাগলামির অভিনয় দেখে নাই। আমি যে পাগল, এ কথা মনে করা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

তাসিয়ানা যাইবার সময় বলিল, 'আমাদের বাড়িতে গিয়ে একবার দেখা কোরো।'

আমি বলিলাম, 'সে তো আমিপারব না— ডাক্তারের নিষেধ যে!'

'বোকার মতো কী তুমি বলচ! না, তুমি আসতে চাও। তোমার আর আমাদের বাড়িতে তফাত কী? বিশেষ, আলেক্সিস তোমার সঙ্গে দেখা করিবার জন্য ভারী ব্যস্ত হয়ে উঠেচে।'

কথা দিলাম তো যাইব। আমি যে কথা রাখিব তাহা নিশ্চিত! কথা-রাখা সম্বন্ধে এতটা নিঃসন্দেহ আমি এর আগে আর কখনো হই নাই।

১১ ডিসেম্বর, সন্ধ্যা পাঁচটার সময়ে আমি যখন আলেক্সিসের পাঠাগারে প্রবেশ করিলাম, তখন সেই কাগজ-চাপাটা ঠিক স্বস্থানেই ছিল। সেখানে আলেক্সিস ও তাসিয়ানা— দুজনেই বসিয়া ছিল। আমাকে দেখিয়া তারা খুব খুশি হইল।

আলেক্সিস আমার হাত ধরিয়া বলিল, 'তাসিয়ানার মুখে শুনলাম, তুমি বেশ ভালো রকমেই সেরে উঠেচ। নইলে, আমি নিজেই তোমাকে দেখতে যেতাম। আজ আমরা থিয়েটারে যাব। তুমিও যাচ্চ তো?'

তারপর আমরা গল্পগুজবে মাতিয়া উঠিলাম। আমি দিব্য ভালোমানুষের মতো পরিষ্কার ভাষায় কথা কহিতে লাগিলাম। কিন্তু কথা কহিতে কহিতে আমি বরাবর ঘড়ির কাঁটাটির দিকে চাহিয়া ছিলাম। ওই কাঁটা যখন ছয়ের ঘরে ঠেকিবে, আমি তখন হত্যাকারী হইব!

ছয়টা বাজিতে সাত মিনিট দেরি। আলেক্সিস আলস্যভরে সোফা ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।

'আমি এখন ফিরে আসচি।' বলিতে বলিতে সে ঘরের বাহির হইয়া গেল।

তাসিয়ানার সঙ্গে চোখাচোখি হয়, এ আমার ইচ্ছা নয়। আমি জানালার কাছে গেলাম। পরদা সরাইয়া দিয়া, বাহিরের দিকে তাকাইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। আমি দেখিতে না পাইলেও বুঝিলাম যে, তাসিয়ানা আমার পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। আমি তার নিশ্বাসের শব্দ শুনিলাম। এবং বুঝিলাম যে, সে জানালার দিকে তাকাইয়া নাই— সে চাহিয়া আছে আমার দিকেই। আমি তবু চুপ করিয়া রহিলাম।

তাসিয়ানা বলিল, 'বাহিরে বরফ কেমন চকচক করচে।'

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

'আন্টনি!' আমাকে ডাকিয়াই সে থামিয়া গেল।

আমি তখনও স্তব্ধ।

সে কম্পিতস্বরে আবার ডাকিল, 'আন্টনি।'

আমি তার দিকে চাহিলাম।

সে টলিতে টলিতে পড়িয়া যায়-যায় হইল— যেন আমার চক্ষু হইতে একটা তীব্র তেজ তাহাকে ধাক্কা মারিয়াছে। এমনি সময়ে আলেক্সিস ঘরে ঢুকিল। তাসিয়ানা একলাফে তার স্বামীর পাশে গিয়া দাঁড়াইল।

অস্ফুটস্বরে সে বলিল, 'আলেক্সিস! আলেক্সিস! আন্টনি—'

'এ কী?'

হাস্যহীন মুখে এবং মনের আনন্দকে ঢাকা দিবার জন্য আমার স্বরকে নিচু করিয়া বলিলাম, 'তাসিয়ানার বিশ্বাস হয়েচে যে, এই জিনিসটা দিয়ে আমি তোমাকে খুন করতে চাই।'— বলিয়া, অত্যন্ত শান্তভাবে, আমি সোজাসুজি টেবিলের কাছে গিয়া কাগজ-চাপাটা তুলিয়া নিলাম এবং আলেক্সিসের নিকটস্থ হইলাম।

আলেক্সিস বিবর্ণ, নিষ্পলক নেত্রে আমার দিকে চাহিল। আমার কথাকে আবৃত্তি করিয়া বলিল, 'তাসিয়ানার বিশ্বাস—'

'হ্যাঁ, তার বিশ্বাস হয়েচে!'

আস্তে আস্তে সহজ ভঙ্গিতে আমি আবার হাত তুলিলাম,— সঙ্গে সঙ্গে আলেক্সিসও তার হাত তুলিতে লাগিল। তখনও সে আমার মুখের দিকে তেমনি চাহিয়া আছে।

কঠিন কণ্ঠে আমি বলিলাম, 'নামাও হাত।'

তার হাত অবশ হইয়া পড়িয়া গেল। অপলক চোখে তখনও সে আমার দিকে চাহিয়া ছিল। তার ওষ্ঠে কেবল একটা পাণ্ডুর, সন্দেহপূর্ণ হাসির রেখা দেখা যাইতেছিল। তাসিয়ানা কী বলিয়া আর্তনাদ করিয়া উঠিল,— কিন্তু, তখন আর সময় ছিল না! কাগজ-চাপার তীক্ষ্ন দিকটা দিয়া, আলেক্সিসের চোখের উপরে নহে—তার ভুরুর কাছে, রগ ঘেঁষিয়া আমি আঘাত করিলাম। ম্যাজিস্ট্রেট আমায় বলিয়াছিলেন যে, আমি তাহাকে অনেকবার আঘাত করিয়াছি,— কারণ, তার মাথা ভাঙিয়া গুঁড়া হইয়া গিয়াছিল। ইহা সত্য নহে। আমি আলেক্সিসকে তিনবার আঘাত করিয়াছি,— তিনবার মাত্র! প্রথম আঘাত যখন সে দাঁড়াইয়া ছিল, বাকি দুবার সে পড়িয়া গেলে পর মারিয়াছি।

এ কথা সত্য যে, আঘাত অতি সজোরে হইয়াছিল। কিন্তু, তিনবারের বেশি মারি নাই। সব কথা আমার বেশ মনে আছে। আলেক্সিসকে আমি তিনবার মারিয়াছি।

রাত্রির অন্ধকার শ্রান্ত স্নায়ুযন্ত্রকে অত্যন্ত অতিভূত করে। এইজন্য, সে সময়ে এমন সব ভাবনা আমাদের মনে আসে, যাতে আমরা ভয় পাই। খুনের পরে যখন রাত আসিল, তখন আমার প্রাণমন স্বভাবতই অসাধারণ উত্তেজনার বশীভূত হইয়া পড়িল। আমার অবস্থায় পড়িলে খুব বেশি আত্মসংযম থাকা দরকার; একটা লোক খুন করা তো বড়ো যে-সে কথা নয়!

কাপড়চোপড় বদলাইয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হইয়া আমি চা-পান করিতে বসিয়া, আমার দাসী মেরিয়াকে ডাকিলাম। তার সঙ্গে আমি বরাবর সদয় ব্যবহার করিতাম। আমার পাগলামির কথা সে কিছু জানিত না। তবু সে,— কেন জানি না—আমাকে দেখিয়া ভয় পাইল। আমার কাছে আসিতে চাহিল না।

আমি মনে মনে বলিলাম, 'হু! তাহলে দেখচি আমার ভিতরে এমন কিছু আছে, যা সাধারণের ভিতরে নেই— যার জন্যে লোকে আমাকে দেখে ভয় পায়।'

পড়িবার ঘরে ঢুকিয়া, আমি শুইয়া পড়িলাম। আমার তখন আদপেই বই পড়িতে ইচ্ছা হইতেছিল না। আমার শ্রান্ত দেহ তখন যেন ভাঙিয়া পড়িতেছিল। আপনার ভূমিকা সুন্দররূপে অভিনয় করিবার পর কোনো অভিনেতার যেমন দশা হয়,— আমার দশাটাও তখন অনেকটাই সেইরকম।

আমার চোখের পাতা ভারী হইয়া আসিল। আমি ঘুমাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। এমন সময়ে আমার মস্তিষ্কে এক নূতন ভাবনা আসিয়া জুটিল। আমার অন্যান্য চিন্তার মতো ইহাও পরিষ্কার, নিখুঁত, সরল! এ চিন্তা ধীরে ধীরে আমার ভিতর ঢুকিল। সে যেন কোনো লোকের মতো বলিল:—

'খুব সম্ভব, ডাক্তার কার্জেন্টজেফ সত্যই পাগল। তিনি পাগলামির অভিনয় করিতেছেন বলিয়া ভাবিতেছেন, কিন্তু আসলে তিনি নিজেই পাগল। এখনই তিনি পাগল।'

আমার মস্তিষ্কে এই চিন্তাটা ঘুরিয়া-ফিরিয়া বেড়াইতে লাগিল। আমি কিছুই বুঝিতে না পারিয়া হাসিতে লাগিলাম।

'তিনি পাগলামির অভিনয় করিতেছেন বলিয়া ভাবিতেছেন, কিন্তু তিনি সত্যই পাগল। এখন,— এই মুহূর্তেই তিনি পাগল।'

প্রথমে ভাবিলাম, আমার দাসী মেরিয়া এই কথাগুলি বলিতেছে;—কারণ, আমি যেন একটা স্বর শুনিতে পাইতেছিলাম; আর, সে স্বর মেরিয়ার। তারপরে ভাবিলাম, সে স্বর আলেক্সিসের। হাঁ, নিহত আলেক্সিসের। শেষটা বুঝিলাম না,—এ আমারই চিন্তা। কী ভয়ানক কল্পনা!

আমি মুঠা করিয়া আমার চুল চাপিয়া ধরিলাম— আমি লাফাইয়া উঠিলাম। ঘরের মাঝখানে দাঁড়াইয়া— কেন জানি না— আমি বলিলাম:—

'বটে—এমনধারা! তাহলে সব শেষ! আমি যা ভয় করছিলাম, তা-ই হল। আমি একেবারে সীমার কাছে সাহস করে এগিয়ে গিয়াছিলাম,— এখন ভবিষ্যৎ আমাকে উন্মত্ততা দান করতে চাইচে।'

আমাকে যখন গ্রেপ্তার করিতে আসিল, আমার অবস্থা তখন ভয়ানক। আমার কাপড়চোপড় সব ছেঁড়াখোঁড়া। কিন্তু ভগবান দোহাই, সেদিনকার মতো সন্ধ্যাকালটা তেমন অবস্থার ভিতরে কাটাইয়াও আমি যে পাগল হইয়া যাই নাই,— ইহাতেও কি আমার মস্তিষ্কের স্থিরতা প্রমাণিত হইতেছে না? আমি সেদিন কাপড়চোপড় ছেঁড়া ও আয়নাগুলি ভাঙা ছাড়া আর কোনো অন্যায় কাজ করি নাই। কিন্তু, এই সঙ্গে তোমাদের আর-একটা কথাও বলিয়া রাখি। সেরাতে আমাকে যেরকম যাতনা ভোগ করিতে হইয়াছিল, যদি কখনো তোমাদের কাউকে সেরকম যাতনা ভোগ করিতে হয়, তবে তোমার ঘরের আয়নাগুলিকে কাপড় দিয়া ঢাকিয়া রাখিয়ো। ঢাকিয়া রাখিয়ো—ভালো করিয়া ঢাকিয়া রাখিয়ো।

তারপর, যতক্ষণ না পুলিশ আসিল, ততক্ষণ পর্যন্ত আর কী হইয়াছিল, সেসব কথা আমার কিছুই মনে নাই। আমি তাহাদের জিজ্ঞাসা করিলাম, ক-টা বাজিয়াছে?

'বেলা ন-টা।'

আলেক্সিসের মৃত্যুর পরে যে সবে তিন ঘণ্টা কাটিয়াছে, এ কথা আমি সহজে বিশ্বাস করিতে পারিলাম না।

কিন্তু, একটা ব্যাপার আমার বেশ মনে আছে। আমার সেই চিন্তা— কিংবা—সেই স্বর! অন্তত,—সেটা সত্য।

'ডাক্তার কার্জেন্টজেফ ভাবিয়াছেন যে, তিনি পাগলামির ভান করিয়াছেন। কিন্তু আসলে তিনি পাগল।'

আমি এইমাত্র আমার নাড়ি পরীক্ষা করিলাম,— একশো আশিবার কাঁপিল। সেই স্বরের স্মৃতি মনে হইবামাত্র আমার হৃদয় এইরূপে উত্তেজিত হইয়া উঠে।

মহাশয়গণ,

আপনারা সকলেই বৈজ্ঞানিক। অতএব, আপনাদের কাছেই আমি একটা উত্তর চাই। আপনারা স্বভাবতই পরস্পরের সঙ্গে একমত হইবেন না। কিন্তু আমি আপনাদের সকলকার কথাই বিশ্বাস করিব। কেবল, আমার এই প্রার্থনা যে, আপনারা আপনাদের মত প্রকাশ করুন। এখানে আমি আর-একটি তুচ্ছ, কিন্তু চিত্তাকর্ষক ঘটনা বলিব। ইহাতে আপনাদের মত গঠনের সুবিধা হইতে পারিবে।

আমি এখন পাগলাগারদে। এক শান্ত প্রভাতে, এখানে একদিন আমার শুশ্রূষাকারিণী ধাত্রী হঠাৎ আমার কাছে থেকে সরিয়া গেল। তার ভাব দেখিলে মনে হয়, সে যেন হঠাৎ কী একটা অজানা কারণে ভয় পাইয়াছে।

আমি তখন বিছানার উপর বসিয়া বসিয়া ভাবিতেছিলাম, অতঃপর, কী করা যায়! তারপরে দেখিলাম, আমি এক অদ্ভুত কাজ করিতে চাই। আমি,— ডা. কার্জেন্টজেফ— কুকুরের মতো চিৎকার করিতে চাই!

আমার সাধ হইতেছিল, কাপড়জামা ছিঁড়িয়া ফেলিতে ও আপনাকে আপনি আঁচড়াইতে। জামার কলারে প্রথমটা আস্তে আস্তে আঙুল ঢুকাইয়া দিয়া তারপর হঠাৎ একটানে কলার থেকে নীচে পর্যন্ত পড় পড় করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিবার জন্য আমার ইচ্ছা হইতেছিল। আমার বাসনা হইল,— আমি ডাক্তার কার্জেন্টজেফ,— আমার বাসনা হইল, হাঁটু ও হাত পাতিয়া হামাগুড়ি দি!

চারিদিক তখন স্তব্ধ। জানালার শার্সিতে তুষারকণা ঝকমক করিতেছিল। অদূরেই আমার ধাত্রী নীরবে প্রার্থনারত। আমি অনেকক্ষণ ধরিয়া আমার কী কর্তব্য, তাহা ভাবিলাম। আমি যদি ঘেউ ঘেউ করি, তবে একটা শোরগোল পড়িয়া যাইবে ও আমার দুর্নাম রটিবে। যদি আমি জামা ছিঁড়ি, কাল সকলে তাহা টের পাইবে। আচ্ছা, তবে শুধু হামাগুড়িই দেওয়া যাক! তাহা হইলে, কেহ কিছু শুনিতে পাইবে না। আর সে সময়ে যদি কেহ আমার ঘরের ভিতর আসিয়া পড়ে, তবে বলিলেই চলিবে যে, আমার একটা বোতাম হারাইয়া গিয়াছে, আমি তাহাই খুঁজিতেছি।

তারপরে ভাবিলাম, 'আচ্ছা, শুধুমুধু আমি হামাগুড়িই বা দিতে চাই কেন? তবে, সত্যই কি আমি পাগল?'

ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়া উঠিল। আমার প্রাণে একটা আকস্মিক দুর্দম বাসনা বলবতী হইয়া উঠিল যে, হাঁ— একসঙ্গে আমি তিনটা কাজই করিব,— আমি ঘেউ ঘেউ করিব, হামাগুড়ি দিব, আপনাকে আপনি আঁচড়াইব। আমি ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলাম। নিজেকে জিজ্ঞাসা করিলাম, 'তুমি হামাগুড়ি দিতে চাও?'

কোনো উত্তর নাই।

'তুমি হামাগুড়ি দিতে চাও?'

তখনও উত্তর নাই।

'দাও তবে হামাগুড়ি।'

জামার আস্তিন উলটাইয়া আমি চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিতে লাগিলাম। ঘরের আধখানা বরাবর এমনি হামাগুড়ি দিয়া আমি আমার ভ্রম বুঝিতে পারিলাম। বুঝিয়া, যেখানে ছিলাম সেইখানেই বসিয়া আমি হাসিতে লাগিলাম, হাসিতে লাগিলাম, হাসিতে লাগিলাম।

হঠাৎ আমার এমন নির্বুদ্ধির মতো ইচ্ছা হইল কেন, আমি বসিয়া বসিয়া তাহা বুঝিতে চেষ্টা করিলাম। আমার কপট পাগলামির কল্পনা হইতেই এই উন্মত্তের মতো ইচ্ছার উদয় হইয়াছে। এ ইচ্ছা যেই পূর্ণ হইল, আমি বুঝিলাম যে, আমি পাগলা নই। আমি যে কারণ দেখাইলাম, তাহা অতি সরল ও যুক্তিপূর্ণ। কিন্তু—

কিন্তু তবু আমি হামাগুড়ি দিয়াছি তো। আমি কি পাগলের মতো আত্মপ্রবোধ দিতেছি, না, বিচার-বুদ্ধিমান হইয়াও পাগল হইতে বসিয়াছি?

মহাশয়গণ, আমাকে সাহায্য করুন। এই ভীষণ, এই নির্দয় সমস্যা পূরণ করুন। আপনাদের মত শুনিবার জন্য আমি অতি ব্যগ্রভাবে অপেক্ষা করিতেছি। বলুন— আমি কী? পাগল?

ভারতী, বৈশাখ ১৩২২ (এপ্রিল ১৯১৫)

অধ্যায় ১ / ৪০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%