মতি নন্দী
শেষকালে কিনা চল্লিশ মিনিট আগেই এসে গেলাম! বিরক্ত না হয়ে সাধনরঞ্জন কর আরামই বোধ করল। সময়টা এখন আর ব্যাপার নয় যখন এসেই পড়া গেছে।
রাত ন'টায় টিভি খবরে চার মহানগরের আজ কা তাপমান তালিকায় দিল্লির সর্বনিম্ন বারো দশমিক তিন সেলসিয়াস দেখামাত্রই সাধন কেঁপে উঠেছিল। ভোর ছ'টায় কম্বলের তলা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তার মতো শীত কাতুরেকে তো এখুনি বিছানা নেওয়া উচিত। এবং তাই নেবার জন্য হোটেল লবি থেকে লিফটের দিকে যাওয়ার পথে সে রিসেপশনিস্টকে আর একবার মনে করিয়ে দিয়েছিল, ঠিক ছটায় যেন...।
টেলিফোনটা ঠিক ছটাতেই বেজে উঠেছিল। রাতেই সে সুটকেস ভরে রেখেছিল। অফিসের সুপ্রকাশের কাছ থেকে ধার নেওয়া এই ছোট্ট সুটকেসটা হাতে নিয়েই প্লেনে ওঠা যায়। সুপ্রকাশ কখনো প্লেনে চড়েনি, হয়তো চড়বে না। ওর ছোট ভাই হামবুর্গ থেকে তিন মাসের ছুটিতে এসে সুটকেসটা দাদাকে দিয়ে গেছে। সাধনের জিনিসপত্র এতেই ধরে গেছে। তিন দিনের জন্য তো আসা!
অফিসের দুজন বড়কর্তা আগেই দিল্লিতে এসে গেছেন। হঠাৎ কলকাতা অফিসে দিল্লি থেকে টেলিফোন, সাধনবাবু যেন কাল ভোরের ফ্লাইটেই অমুক অমুক কাগজপত্তর নিয়ে চলে আসেন। ফিনান্স মিনিস্ট্রি থেকে দেখতে চেয়েছে। কালকেই দাখিল করতে হবে, এয়ারপোর্ট থেকে সোজা কণিষ্ক হোটেলে চারশো এগারো নম্বর ঘরে যেন হাজির হন।
ফোন আসার দু'ঘণ্টার মধ্যে চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্টকে দিয়ে ভাউচার করিয়ে ক্যাশ থেকে টাকা তুলে বেয়ারা পবিত্রকে এয়ারলাইন্স অফিসে পাঠায় টিকিট কাটতে। এই কাজ পবিত্র আগেও করেছে। চিরকুটে যাওয়া—আসার তারিখ ও ফ্লাইটের সময় সে লিখে দিয়েছিল। ঘণ্টাখানেক পর পবিত্র টেবলে একটা খাম রাখে। সাধন তখন কাগজপত্তর গোছাতে ব্যস্ত। শুধু বলে, 'ও কে করা আছে তো?' পবিত্র ঘাড় নাড়ে। 'ফেরার ফ্লাইট সকালে, সেটাও?' পবিত্র আবার ঘাড় নাড়ে। 'আপনি যেমন লিখে দিয়েছেন তাই ওরা দিয়েছে।'
রিপোর্টিং টাইমের চল্লিশ মিনিট আগেই যে পৌঁছে যাবে সাধন বুঝতে পারেনি। ছ'টায় ঘুম ভাঙার একঘণ্টার মধ্যে সে ট্যাক্সিতে চড়ে বসে। তারপর হুহু করে কুড়ি মিনিটেই পালাম এয়ারবাস টার্মিনাল। বাঙ্গালোর আর কলকাতার জন্য দুটো এয়ারবাস ছাড়বে। এক একটায় কত যাত্রী ধরে? সানু তাকে বলেছিল দুশো পঁচাত্তর। হতে পারে, এখন ছেলেরা অনেক খবর রাখে। সাধন ভেবেছিল অন্তত দু—তিনশো লোকের ভিড় পৌঁছেই দেখতে পাবে। বারো—চোদ্দটা কাউন্টার এখন ভোঁ ভোঁ। বোর্ড লাগালে পর লাইন পড়বে কিন্তু লোক তো বড় জোর জনা পঞ্চাশ। বইয়ের আর কফির দোকানটা খুলেছে। কাঁচের দেয়ালের মধ্য দিয়ে সে বাইরে তাকিয়ে দেখল, একটা মোটর থেকে ধুতি, গরম কোট পরা এক প্রৌঢ়, শাল গায়ে এক প্রৌঢ়া নামল। ঢাউস দুটো সুটকেস আর দড়ি বাঁধা চুবড়ি তাদের সঙ্গে। সাধন ক্লোজড সার্কিট টিভি স্ক্রিনে সময় দেখল। এইবার ওরা আসতে শুরু করবে। ততক্ষণ এক কাপ কফি খেয়ে নিলে কেমন হয়।
''ফাইভ ফিফটি... ফাইভ রুপিজ ফিফটি পৈসা।''
লোকটার মাথায় সাদা রাঁধুনি—টুপি। কফি চাওয়মাত্র এটাই তার প্রথম কথা। উচ্চচারণ থেকেই বোঝা যায় ইংরেজিতে বলা—কওয়ায় অভ্যস্ত। কিন্তু সাধন অপ্রতিভ ও আহত বোধ করল প্রথমেই তাকে দামের কথাটা জানিয়ে দেবার জন্য। কেন, সাড়ে পাঁচ টাকা দিয়ে কফি খাবার ক্ষমতা কি তার নেই? স্যুট—টাই, হাতে একটা ফরেন মেড সুটকেস, প্লেনে চড়তে এসেছে তবু তাকে দেখে কিনা প্রথমেই দামের কথাটা বলল! লোকটা কি বুঝতে পেরেছে সুটকেসটা তার নয়, প্লেন চড়ছে অফিসের পয়সায়! তার চোখে—মুখে দুঃস্থ বা অভাবী ছাপ বা ছোটবেলার কষ্টের বছরগুলোর ছায়া কি ফুটে রয়েছে?
''ওহ, হ্যাঁ।'' দামটা তো জানেই এমন একটা ভাব দেখিয়ে সাধন দশ টাকার নোট কাউন্টারে রাখল।
''ওই কাউন্টারে, ক্যাশিয়ারকে দিন।''
এরপর কফির কাপ এল। চুবড়ি থেকে চিনির পুরিয়া তুলতে গিয়ে সাধন তুলল না। তিন সপ্তাহ আগে সে ব্লাডশু্যগার টেস্ট করিয়েছে। একশো চুয়ান্ন পি.পি.। ডাক্তার বলেছে কিছু না, তবে চিনি ছাড়া চা খাবেন। রোগটা হল কী করে?
কফি নিয়ে সে চেয়ারে বসল। এটা তো বংশগত রোগ, বাবার ছিল কি? ডাক্তার ঠাট্টা করে বলেছিল, অ্যাফ্লুয়েন্সির লক্ষণ এই রোগ। শরীরের নড়াচড়া, পরিশ্রম কমে গেলে, আর ভাল ভাল খাবার গাণ্ডেপিণ্ডে খেলে এটা হয়। কফি শেষ করেই সাধন পায়চারি শুরু করতে করতে বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়াল।
হিন্দি, ইংরিজি ঝকমকে রঙিন ম্যাগাজিন। ইংরিজি পেপারব্যাকে ডিটেকটিভ আর থ্রিলারগুলো সাজানো তাসের মতো শোয়ানো। সবার উপরের বইটার নাম ডটার অব স্যাম, মলাটে বিকিনি আর ব্রা পরা, লম্বা, আলথালু একমাথা সোনালি চুল, ছিপছিপে, এক তরুণী। এক হাতে অবহেলাভরে ধরা স্টেনগানের বাঁট তলপেটে আটকানো, পা ফাঁক করে তেরচা হয়ে দাঁড়িয়ে, পায়ে স্টিলেটো হিল জুতো, চাহনি এবং স্টেনগানের নল নিবদ্ধ সামনে কোনো অদৃশ্য শিকারের দিকে। চোখে ভয় বা হিংস্রতা নেই। শরীরটাকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে রাখার এবং চোখে নিরাসক্ত উদাসীন চাহনি থাকার জন্যই বোধহয় সাধনের সারা দেহে রোমের গোড়া শক্ত হয়ে উঠল। সে তরুণীর পা থেকে চুল পর্যন্ত চোখ ওঠানামা করাতে করাতে কীরকম যেন একটা ব্যাপার গলার কাছে ঘটছে বোধ করল।
কোন জায়গাটায় যে কিছুক্ষণের জন্য চোখটা ধরে রাখবে ভেবে পাচ্ছে না। পায়ের গোছ, হাঁটু, ঊরু, তলপেট, নাভি, স্তন, পাছা, কাঁধ, গলা যেখানেই চোখ রাখছে মনে হচ্ছে আর কিছু না দেখলেও চলে। কিন্তু তাই বা কী করে হয়? চোখ যে পিছলে যাচ্ছে এখান থেকে সেখান এবং অবিরাম। চুল পর্যন্ত উঠেই সরসর করে নেমে আসছে সরু হাই হিলে আর এই ওঠানামার ঘর্ষণ যতবার হচ্ছে তার মাথার সঙ্গে শরীরের সম্পর্কটা কীরকম অস্বাভাবিক বদলে যাচ্ছে, দুটোর মাঝে একটা শূন্যতা তৈরি হয়ে তাকে খণ্ডিত করে ফেলছে। সাধন বুঝতে পারল তার দেহ ও মাথার সঙ্গে যোগাযোগটা আপাতত ছিঁড়ে গেছে। সে এজন্য অবশ্য বিপন্ন বোধ করল না, এরকম তার প্রায়ই হয়ে থাকে। অফিসে, বাড়িতে, সামাজিক জমায়েতে, রাস্তা দিয়ে চলার সময় বহুবার সে এই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়েছে। তারপর আবার তার মাথা এবং ধড় জুড়ে গেছে। তবে তার একটাই শুধু ভয়, এটা যেন স্থায়ী হয়ে না যায়—এই আলাদা হয়ে যাওয়াটা।
কেউ কি তাকে দেখছে? আড়চোখে তাকাতেই দোকানির সঙ্গে তার চোখাচোখি হল। সঙ্গে সঙ্গে সে ভ্রূ কুঁচকে চাহনিটা তিন ইঞ্চি সরিয়ে ছবিহীন একটা পেঙ্গুইনের মলাটে রাখল এবং ব্যগ্র হয়ে বইটা তুলে মন দিয়ে কয়েকটা পাতা উল্টে দেখে যেন বহুবার পঠিত এমন একটা ভাব করে রেখে দিল।
সুটকেস বোঝাই ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে, ঝোলাঝুলি কাঁধে, নানান ধরনের শীতবস্ত্র গায়ে এবার ওরা আসতে শুরু করেছে। সাধন পকেট থেকে টিকিট বার করল। পাতা খুলে একবার চোখ বুলিয়ে নিল হলুদ কাগজটায়। নেম অব প্যাসেঞ্জার: কর সাধন মিঃ ফ্রম: ডেহলি টু ক্যালকাটা; ফ্লাইট: ফোর জিরো ওয়ান ; ডেট: সিক্সটিন ডিসেম্বর; টাইম: জিরো নাইন ফিফটিন; স্ট্যাটাস: ও. কে.। সই ঠিকঠাক রয়েছে, এখন বোর্ড লাগালেই হ্যান্ড ব্যাগেজ লেখা কাউন্টারটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া। অলস চোখে সে খুঁজে দেখতে লাগল চেনাজানা কাউকে পাওয়া যায় কিনা। তখন নজরে পড়ল মেহরোত্রা না মালহোত্রা পদবির লোকটিকে। নামটা তার মনে আছে, অরুণ। কলকাতা থেকে আসার সময় পাশের সিটেই ছিল, দিল্লির লোক। কলকাতায় ব্যবসা, বৌ ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকে কলুটোলায়। ঘন ঘন সিগারেট খাচ্ছিল, এক সময় প্যাকেট খালি হয়ে যেতে কিছুক্ষণ উসখুস করে সাধনের কাছে একটা চায়।
তখন কথায় কথায় বলেছিল রাতে টেলিফোন পেয়েছে আশি বছর বয়সি বাবার এখন তখন অবস্থা তাই ভোরেই দমদমে এসে টিকিট কিনে প্লেন ধরেছে। সাধন ওকে দুটো সিগারেট খাইয়েছে।
লোকটি সাধনকে দেখতে পেয়ে হাসিমুখে এগিয়ে এল। বাবা তাহলে মরেনি। তবু সে জিজ্ঞাসা করল, ''বাবা কেমন আছেন?''
''ভাল, ভালই। মনে হয় এ—যাত্রা টিকে গেলেন। আপনিও এই ফ্লাইটে?''
''কাজ হয়ে গেল, মিছিমিছি আর কেন থাকা। ছেলের টেস্ট পরীক্ষা সেভেনটিন্থ, কাল থেকেই, আমি থামলে তবু বইটই নিয়ে বসবে।''
''সেভেনটিন্থ তো পরশু।'' লোকটি সিগারেট প্যাকেট খুলে বাড়িয়ে ধরেছে। একটা টেনে নিতেই লাইটারটা মুখের কাছে এগিয়ে এল। ধোঁয়া ছেড়ে সাধন ভ্রূ কোঁচকাল। তার শরীরের তাপ শূন্য ডিগ্রি নিচে নেমে যাচ্ছে।
''আজ কত তারিখ?''
''ফিফটিনথ।''
''সিক্সটিনথ নয়!''
''না তো... গতকাল ফোর্টিনথ গেছে।'' দাড়িওয়ালা একজনকে দেখে লোকটি ''হ্যাল্লো'' বলে ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গেল সাধনকে একটা ''এক্সকিউজ মি'' জানিয়ে।
সাধনের ঠান্ডা শরীরে তাপ ফিরে এল কয়েক সেকেন্ডেই কিন্তু মাথার মধ্যে একঝলক অন্ধকার ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে। কী ভুলই না করে ফেলেছে। এমন গাড়োল সে হল কী করে? আজ পনেরোই আর ধরে নিয়েছে কিনা ষোলোই! টিকিটের তারিখটা কি পড়ে রাখেনি? আজ কত তারিখ সেটারও কি হুঁশ রাখেনি? পবিত্রকে তো সে নিজে হাতে লিখে দিয়েছিল আজ সোমবারেরই তারিখ, তাহলে... এয়ারলাইন্সের লোকই ভুল করে মঙ্গলবারের তারিখ লিখে ফেলেছে হয়তো। কিংবা সে নিজেই ভুল করেছে তারিখ লিখতে। কিন্তু তাই বা কেন হবে? লেখার সময় এই রকম ভুল করার মতো অবস্থা কি তার মাথায় তৈরি হয়েছিল!
কিন্তু এখন অতশত ভেবে কি কোনো লাভ আছে? বরং ভুলটা সামলাবার চেষ্টাই এখন দরকার। গাধা তো বনে গেছিই। এখন আবার হোটেলে ফিরে যাওয়া যায় না। 'কুল হেডেড' বলে অফিসের কর্তাদের কাছে তার সুনাম আছে, নয়তো দিল্লি দৌড়ে আসার জন্য ডাক পড়ত না। বৌ জিতা অর্থাৎ অপরাজিতার কাছে সে 'একনম্বর ম্যানেজ মাস্টার' আর সানুকে বলতে শুনেছে 'বাবা খুব স্মার্টলি দিনকে রাত করে দিতে পারে।' তার থেকেও বড় কথা এটা এখন নিজেকেই নিজের চ্যালেঞ্জ, ষোলোকে পনেরো করতে হবে।
এখন ঠিক আটটা, ক্যালকাটার বোর্ড দিয়েছে কাউন্টারে। সাধন লাইনে দাঁড়াল, লোক গুনল। ছেচল্লিশ। সিটের সংখ্যা দুশো পঁচাত্তরই যদি হয় সবাই কি আসবে? অনেকে তো টিকিট ক্যানসেলও করে কিংবা নানান কারণে প্লেন ফেইল করতে পারে। সে নিজেও তো একবার ট্রেন ফেইল করেছিল হাওড়া ব্রিজে ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে গিয়ে।
এখন একটাই উপায়, এয়ারলাইন্সের লোকেদের ধরাধরি করে এই ফ্লাইটেই যাবার ব্যবস্থা করা। সে লক্ষ্য করল কাউন্টারে মালপত্তর জমা দিয়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে যাত্রীরা যেমন চলে যাচ্ছে তেমনি লাইনে আবার নতুন লোকও এসে দাঁড়াচ্ছে। সাধন দমে গিয়েও ভাবল, একটা সিটও কি পাওয়া যাবে না?
এনকোয়ারিতে গিয়ে সে জানতে চাইল, ফ্লাইট বদলে এই ফ্লাইটে যেতে চাই, কার সঙ্গে দেখা করব? রিসেপশনিস্ট মহিলাটি ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত। সাধন অপেক্ষা করার সময় ভাবল, এই সকালবেলায় এমন একটা খোঁপা বাঁধার সময় পায় কী করে! জিতা প্রাইমারি—স্কুলে পড়াত যখন সেও ভোর ছ'টার মধ্যেই ভাল খোঁপা বেঁধে, মুখে কিছু লাগিয়ে ফিটফাট হবার সময় করে নিতে পারত! দ্বিগুণ মাইনেয় সাধন নতুন অফিসে যোগ দেবার পরই জিতা মাস্টারি ছেড়ে দেয়। ইনিও জিতার কাছাকাছি বয়সের, চাকরি চালিয়ে যাচ্ছেন যখন তাহলে মাইনেটা ভালই।
''আপনি ডিউটি অফিসারের সঙ্গে দেখা করুন। ওই দিকে।''
রিসেপশনিস্ট আঙুলটা যে দিকে দেখাল সাধন সেই দিকে ছুটল। কাউন্টারগুলোর পিছনে একটা ঘরের দরজা।
সেই মেহরোত্রা না মালহোত্রাকে সে দেখতে পেল। বুক পকেটে কমলা রঙের বোর্ডিং পাস, হাতে সিগারেট, নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে দাড়িওয়ালার সঙ্গে গল্প করতে করতে সিকিউরিটি চেকিংয়ের জন্য চলেছে। সাধনের মাথাটা গরম হয়ে উঠল। আমি একটা গাধার বাচ্চা, মনে মনে কথাটা বলেই সে টের পেল মাথা আর ধড়ের মধ্যে সম্পর্কটা হারাচ্ছে, গলার কাছটা ফাঁকা লাগছে।
ঘরে দুজন স্ত্রীলোক—সহ ছয়জন। সাধন বুঝতে পারছে না এদের মধ্যে তার দরকারের লোকটি কোন জন। ওরা প্রশ্ন—ভরা চোখে তার দিকে তাকাল।
''আমি ডিউটি অফিসারকে চাই।''
''ইয়েস!''
কালো কোট ও প্যান্ট পরা, সুদর্শন বছর চল্লিশের লোকটি তার হাতের টিকিটটি সামনে দাঁড়ানো মাথাভরা পাকা চুল, স্বাস্থ্যবান, সোনালি ফ্রেমের চশমা—পরা এক বৃদ্ধের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে সাধনের দিকে তাকাল। এরপর সাধন যা বলল মুহূর্ত আগেও সে জানত না কথাগুলো তার মাথায় এইভাবে সাজানো ছিল।
''কাল রাতে আমার বাবা মারা গেছে। আমাকে এই ফ্লাইটে কলকাতায় যেতেই হবে কিন্তু আমার টিকিট সিক্সটিন্থের।''
ডিউটি অফিসারের মুখে কোনো ভাবান্তর ঘটল না। স্বাভাবিক স্বরে বলল, ''টেলিগ্রাম আছে।''
''না, রাতে টেলিফোনে খবর পেয়েছি।''
''আপনি ওয়েটিং লিস্ট কাউন্টারে অপেক্ষা করুন।''
''আমার যাওয়া খুব দরকার। এই ফ্লাইটে না পৌঁছলে বাবাকে শেষবারের মতো আর দেখতে পাব না... আমিও বড় ছেলে, আমাকে...'' মুখাগ্নির ইংরেজিটা মনে না পড়ায় সাধন থেমে গিয়ে মুখটা ব্যাকুল এবং চোখ ছলছল করার চেষ্টা করল।
''আপনি কাউন্টারে যান।''
স্বরে কোনো সমবেদনা নেই। হয়তো এইরকম কথাবার্তা রোজই ওকে শুনতে হয়। কিন্তু সাধন বুঝতে পারছে না লোকটি তার কথা আদৌ বিশ্বাস করেছে কিনা। তবে কফিওয়ালা তার মুখে অভাবী কিছু একটা দেখেছিল, তাহলে ডিউটি অফিসারও নিশ্চয় দেখে থাকবে। কিছু একটা অভাব, কিছু একটা যাতনা, কষ্ট। সে আশ্বস্ত বোধ করল।
ওয়েটিং লিস্ট কাউন্টারের সামনে জনা পনেরো লোক। প্রত্যেকের মুখে একই ধরনের উদ্বেগ, কাতরতা। বোর্ডিং পাস নেবার জন্য লাইনটায় ভাঁটা পড়েছে, মাত্র ছ'জন দাঁড়িয়ে। দুশো পঁচাত্তর জন কি এর মধ্যেই পাস নিয়ে ফেলেছে! অসম্ভব! আটটায় কাউন্টার খুলেছে, এখন আটটা পঁয়ত্রিশ মাত্র। পঁয়ত্রিশ মিনিটে কটা লোকই বা...।
''ব্যস্ত হবেন না। যাদের কনফার্মড টিকিট তাদের জন্য অন্তত চল্লিশ মিনিট তো অপেক্ষা করা উচিত। তারপর আপনাদের দেখব।''
ডিউটি অফিসার পনেরো জনকে আশ্বাস দিল। তার হাতে সাদা কাগজে টাইপ করা নামের তালিকা। সাধন জানে ওতে তার নাম নেই।
''আচ্ছা বাঙ্গালোর ফ্লাইটের জন্য যারা—সি বি সালধানা, জি কে গোপালকৃষ্ণন, মিসেস গোপালকৃষ্ণন...''
নাম পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে টিকিটগুলো নিজের কাছে নিয়ে রাখতে লাগল। তারপর অপেক্ষমাণদের নিয়ে ডিউটি অফিসার চলে গেল বাঙ্গালোর কাউন্টারে। সাধন গুনল, কলকাতার জন্য সাত জন রইল। ওদিকে কলকাতার কাউন্টারের সামনে একজনও যাত্রী নেই। এত তাড়াতাড়ি কি দুশো পঁচাত্তর ভরে গেল? অসম্ভব।
লোকটি ফিরে এল, হাতে আর একটি তালিকা। মুখ তুলে অপেক্ষমাণদের দিকে একবার তাকাল। সাধন দাঁড়াবার ভঙ্গিটা শোকাহত, মুহ্যমান করে, বিপন্ন চোখে তাকিয়ে, যদি চোখাচোখি হয়, যদি করুণা, দয়ার উদ্রেক হয় তাহলে একটা সিট হয়তো পাইয়ে দেবে। বাবাকে শেষ দেখার সুযোগ কি করে দেবে না? চোখাচোখি হল। কোনোরকম সহানুভূতি, বা দয়ার লেশমাত্র চোখে নেই। সাধনের সন্দেহ হল, লোকটা বোধহয় তাকে ধরে ফেলেছে।
''ড. কে. বাসু, তপনকুমার ঘোষ, বি. কে. কেজরিওয়াল, এফ রেহমান...।'' টানা নামগুলো পড়ে গেল। দুটো নামে দুবার ডেকেও কোনো উত্তর মিলল না।
''আর কেউ আছেন?''
''আমি আমি, আমার আজই...'' সাধন সামনের লোককে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে গেল। ''আমার বাবা মারা গেছেন, আপনাকে তো বলেইছি, আমি এই ফ্লাইটেই...''
সাধন প্রায় ভেঙে পড়ল। গলা বন্ধ হয়ে আর কথা বেরোচ্ছে না। ডিউটি অফিসার তার হাত থেকে টিকিটটা নিয়ে ''আসুন'' বলে কলকাতার কাউন্টারের দিকে এগোল। সবাই হুড়মুড়িয়ে ছুটল।
মিনিট পাঁচেক পর সাধন সিকিউরিটি চেকিংয়ের জন্য যখন লাইনে দাঁড়াল, তখনও সে কমলা রঙের বোর্ডিং পাসটার দিকে তাকিয়ে। বিশ্বাসই করতে পারছে না সে কলকাতা যাচ্ছে। গলার কাছটা এখন আবার শূন্য ঠেকছে।
''আপনার বাবার কী হয়েছিল?''
সাধন চমকে পিছনে তাকাল। ডিউটি অফিসারের ঘরে পাকা চুল, সোনালি ফ্রেমের চশমা পরা এই লোকটিই তো ছিল। শান্ত দৃষ্টিতে সহানুভূতি—ভরে তাকিয়ে।
''ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, এটা চতুর্থবার।''
''কখন হয়েছে?''
''কাল রাতে। টেলিফোনে ভাই বলল, খেয়েদেয়ে শুয়েছেন, দশ মিনিটের মধ্যেই... ডাক্তার আনার আগেই।''
''বয়স কত হয়েছিল?''
লাইনটা দ্রুতই এগোচ্ছে। প্লেন ছাড়ার সময় হয়ে এল তাই দায়সারা চেকিং হচ্ছে। ইলেকট্রনিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য সময় কম লাগছে। বিজ্ঞান যে মানুষের কাজকর্ম কত তাড়াতাড়ি করে দিয়ে গতি এনে দিয়েছে সাধন এ—কথাটা অনেককে অনেকবার বলেছে, এখন আবার এই পাকা চুলে লোকটিকে তার বলতে ইচ্ছে করল।
''সাতাত্তর।''
''দমদম পৌঁছতে পৌঁছতে তো সাড়ে এগারোটা বেজে যাবেই, কোনদিকে থাকেন? আমায় নিতে গাড়ি আসবে, আপনাকে নামিয়ে দিয়ে তাহলে হাওড়ায় বাড়িতে যেতাম।''
''ওহ আমি থাকি বাগবাজারে।''
সল্ট লেকের বদলে বাগবাজার কেন মুখ বেরিয়ে এল? সাধন গলার কাছে হাত রাখল টাইয়ের গেরো ঠিক আছে কিনা বোঝার জন্য। তার মনে হল, এই বিচ্ছিন্ন হওয়াটা বারবার ঘটলে ব্যথা লাগে, কষ্ট হয়। 'ডটার অব স্যাম'—এর স্টেনগানটা যে কীসের প্রতীক তা কি আর বুঝতে বাকি আছে। জিতা কি ব্যায়াম—টায়াম, ডায়েট কন্ট্রোল করে ওই রকম কোমর বানাতে পারে না! পারবে না, সে বয়স আর নেই।
''আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যাব। শেষ দেখা না হওয়ার কষ্ট আমি বুঝি। আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমি জার্মানিতে।''
সাধন ম্লান হাসল। লোকটা ভাল। বাবাকে ক'জন আর ভালবাসে, সবাই তো ভয়ই করে। ভালবাসতে পারাটা বিরল গুণ। এইসব গুণী লোকের সংখ্যা কমে আসছে। এর কথা বলার ভঙ্গি, স্বর বড় স্নিগ্ধ, ঠান্ডা, মনজুড়োনো। এই রকম হতে পারলে...।
পা থেকে মাথা পর্যন্ত মেটাল ডিটেক্টর বুলিয়ে বোর্ডিং পাস—এ ছাপ মেরে দিল সিকিউরিটির লোক। সাধনের মনে হল, শরীরে পাপ আছে কিনা যদি এইভাবে ধরার কোনো যন্ত্র থাকত! হয়তো বিজ্ঞান তাও তৈরি করে দেবে। কিন্তু মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখাগুলোকে... বিজ্ঞানের অতটা বাড়াবাড়ি না করাই ভাল।
প্লেনে পৌঁছে দেবার জন্য বাস দাঁড়িয়ে। সাধন সুটকেস হাতে অপেক্ষা করছে। ''তাড়াতাড়ি চলুন, আমরাই বোধহয় শেষ ব্যাচ।''
ব্যস্ত না হয়ে বৃদ্ধ বলল, ''বোধহয়। তবে চেক ইন যখন করেছি আমাদের ফেলে রেখে প্লেন যেতে পারবে না।''
বাসটা কয়েকজন যাত্রী নিয়ে এয়ারবাসের সিঁড়ির কাছে থামল। সাধন পিছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে কেবিনের মধ্যে ঢুকে একুশ সারির 'বি' সিটটি খুঁজে, উপরের লকারে সুটকেসটা ঠেলে ঢুকিয়ে সারা কেবিনে চোখ বুলিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল, তারপর রেগে উঠল। ডিউটি অফিসারকে মোটেই বলার দরকার ছিল না বাবা মারা গেছে। সোজাসুজিই বলা যেত, মশাই তারিখ ভুল করে এসে পড়েছি দোষটা আমারই। কিন্তু শহরে ফিরে গিয়ে আবার হোটেলে ওঠা, একটা দিন নষ্ট হওয়া, আমার ছেলের টেস্ট পরীক্ষা কাল থেকেই এ সময় কাছে থাকলে তবু একটু পড়তে বসবে, এই সব বিবেচনা করে যদি আমাকে এই ফ্লাইটে সিটের ব্যবস্থা করে দেন। স্ট্রেইট সত্যি কথা বললে লোকটা নিশ্চয় করে দিত। না করার তো কোনো কারণ নেই, প্লেনে অন্তত দেড়শো সিট খালি যাচ্ছে। একরকম বাধ্যই করা হল তাকে মিথ্যা বলতে। লোকটা এমন একটা ভাব দেখাল যে প্লেনটা ভরেই গেছে, যেন বিনি টিকিটের যাত্রীকে দয়া করছে। সাধন গজগজ করতে করতে সিটবেল্ট বাঁধল। এই ভাবেই মানুষকে মিথ্যুক বানানো হয়, নষ্ট করা হয়।
বৃদ্ধ পিছনের সিটে। সাধন মাথা ঘুরিয়ে বলল, ''দেখেছেন কীরকম খালি।''
''হ্যাঁ, এই ঠান্ডায় ভোরবেলায় কে আর বিছানা ছাড়তে চায় খুব দরকার না থাকলে।''
সেও একটা দুঃখজনক দরকারে চলেছে, এই ভেবে সাধন সামনের সিটের পিছনে গোঁজা টাটকা খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে রেখে দিল। এখন দুনিয়ার খবর জানার জন্য কৌতূহলী হওয়া অনুচিত। এখন তাকে মুহ্যমান হতে হবে। মাথাটা পিছনে হেলিয়ে সে চোখ বন্ধ করল। গত দেড় ঘণ্টা ধরে মন যে কচলানি সহ্য করছে তারপর এই নিশ্চিন্তি।
ধীরে ধীরে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। এয়ার হোস্টেল ট্রে বাড়িয়ে দিতে সে দুটো টফি তুলে নিল। আধা ঘুমের মধ্যেই শুনল, কৃপায়ে আপনা ধেয়ান দিজিয়ে আপকা মুখ্য বৈমানিক কাপ্তন ভাল্লা... কলকাত্তা পৌঁছানে কি লিয়ে সময় দো ঘণ্টা...। এরপর রানওয়ে দিয়ে প্লেন দৌড় শুরু করতেই সাধনের চটকা ভেঙে গেল। সিটের হাতল চেপে ধরে নিশ্বাস বন্ধ করে সে অপেক্ষা করতে লাগল। এই সময় খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি, তোবড়ানো গাল, কুঁজো হয়ে যাওয়া ঢ্যাঙা চেহারা, চাহনিতে খিটখিটে মেজাজের ছোপধরা একটা লোক তার চোখে ভেসে উঠল। পরনে লুঙি, বগল ছেঁড়া গেঞ্জি, সামনের দুটো দাঁত নেই।
''বাবা!'' সাধন মুঠো শক্ত করে হাতল ধরে রইল। ওঠার সময়টা তার ভয় করে। প্লেনের জীবনে এটা নাকি খুব কঠিন সময়, ঠিক মানুষের জীবনের মতো। পাইলট ভাল না হলে ভেঙে পড়তে পারে। ফাসন ইওর সিটবেল্ট অক্ষরগুলোর আলো নিভে যাবার পর কোমরের বাঁধন খুলতে খুলতে হাঁফ ছাড়ল। যাক ভেঙে পড়েনি, এবার তাহলে স্বচ্ছন্দে কলকাতায়। তাড়াতাড়ি পৌঁছবার ব্যস্ততা না থাকলে ট্রেনই ভাল, বাঁধা রাস্তায় গড়গড়িয়ে যাবে।
সাধন ঘুমিয়েই উড়ে গেল অ্যারাইভাল লাউঞ্জে একটি কিশোরের সঙ্গে বৃদ্ধ পরিচয় করিয়ে দিল। ''আমার নাতি, পৌত্র, নিতে এসেছে। বুড়ু আমার সুটকেসটা খালাস করে আন আমরা এখানে দাঁড়াচ্ছি।''
সানুর বয়সিই। কী করছে এখন সানু! বই নিয়ে ব্যস্ত। সাধন ঘড়ি দেখল। পৌনে বারোটা।
''দেরি হয়ে যাচ্ছে?'' বৃদ্ধকে উৎকণ্ঠিত দেখাল।
''না না, ভাইকে বলে দিয়েছি একটার মধ্যে পৌঁছব, ততক্ষণ ডেডবডি রাখিস, আমি কাঁধ দেব।''
''আমি এই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আপনি তো বড়ছেলে?''
''হ্যাঁ, আমরা দুই ভাই।''
''আমিও বড়ছেলে। বাবার যৌবনকাল দেখেছি, খুব খাটতেন, খুব স্ট্রাগল করেছেন। ওনার একটা ছোট্ট মুদির দোকান ছিল।''
''আমার বাবা কম্পাউন্ডার ছিলেন। উনিও পরিশ্রম করতেন, অমানুষিক। রাতে ফার্মেসি থেকে ফিরেই আমাকে পড়াতে বসতেন তা যত রাতই হোক না, ঘুম থেকে তুলেও পড়া ধরেছেন ক্লাস এইটের পর আর পারতেন না পড়াতে, তখন শুধু কাছে বসে থাকতেন একটা বেত নিয়ে। একটু ঢুলুনি দেখলেই শপাং। বলতেন, বুঝবি, পরে বুঝবি কেন মারছি। ট্রামে সেকেন্ড ক্লাসে ছাড়া চড়েননি তাও শুধু কাজে যাবার সময়, ফিরতেন হেঁটে। দাড়ি কামাতেন তিন দিন অন্তর।''
কীরকম একটা আবেগ ফোয়ারার মতো সাধনের বুক থেকে মাথার দিকে উঠে যাচ্ছিল বাবার কথা বলার সময়। কিন্তু মাঝখানের ওই যে ব্যাপারটা ওটা তো যে—কোনো মুহূর্তেই শুরু হয়ে ফোয়ারাটাকে বুদ্বুদ করে দেবে। যেন সেই ভয়েই সাধন খাপছাড়া ভাবে বলে উঠল ''গিয়ে যদি দেখি বাবা বেঁচে আছেন?''
বাগবাজারে গিরিশ অ্যাভিনুর মোড়ে সাধন গাড়ি থেকে নামল। জানলা থেকে মুখ বার করে বৃদ্ধ ব্যস্ত স্বরে বলল, দেরি করবেন না, তাড়াতাড়ি যান।''
এবার বিজয়ার প্রণাম করতে আসা হয়নি, পুজোয় সপরিবার রাজস্থান বেড়াতে গেছল। তার আগের বিজয়ায় এসেছিল। সাধন হনহনিয়ে গলি দিয়ে হেঁটে বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখল কর্পোরেশন জলমিস্ত্রি রাস্তা খুঁজে কিছু একটা সারাই করছে গর্তের মধ্যে হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে। মাটির স্তূপের উপর উবু হয়ে বসা লোকটি খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি ভরা মুখ তুলে সাধনের দিকে তাকাল।
''কী ব্যাপার, এখন?''
''এই দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। অনেকদিন তো...।'' সাধন প্রণাম করার জন্য ঝুঁকল।
''থাক থাক।'' সাধনের মাথায় হাত ছুঁইয়ে বৃদ্ধউঠে দাঁড়াল। ''এত মোটা হয়ে গেছিস! গাড়িটাড়িতে কম চাপ। বৌমার কাছে শুনেছিলাম ডায়বেটিস, রোজ সকালে খালি পেটে আধকাপ করলার রস খাবি। চায়ে চিনি বন্ধ করেছিস?''
''হ্যাঁ।''
''সকালে অন্তত একমাইল হাঁটবি, বেশ জোরে জোরে।''
''হ্যাঁ।''
''ছেলে এবার পরীক্ষা দেবে?''
''হ্যাঁ।''
''টিভি বন্ধ রাখবি, পড়ার খুব ক্ষতি করে।''
সাধন চুপ রইল।
''ভাল গাওয়া ঘিয়ে ব্রাহ্মী শাক ভেজে ওকে খাওয়াবি, ব্রেনের পক্ষে উপকারী, তোকে আর মদনকে খাওয়াতাম।'' কথাগুলো বলে বৃদ্ধ মিস্ত্রির কাজের দিকে মুখ ফেরাল।
''তুমি কেমন আছ?''
''আমি?'' বৃদ্ধ অবাক। ''আমি তো ভালই আছি! আজ বাজারে গাছপাকা একটা পেঁপে পেয়ে গেলুম, দারুণ। ভেতরে আয়, বৌমাকে বলি কেটে দিক তোকে।''
''আমার তো মিষ্টি ফল খাওয়া উচিত নয়।''
''য়্যাঁ। ঠিক খাওয়া তো উচিত নয়। না না খেতে হবে না, ইসস একদম ভুলে গেছলুম।'' বৃদ্ধ অপ্রতিভ হয়ে হাসল। ''তুই পেঁপে ভালবাসতিস এটাই শুধু মনে আছে।''
''আমি এখন যাই, রোদ নরম থাকতে থাকতেই পৌঁছে যাব।''
''বাসে না ট্যাক্সিতে?''
''হেঁটেই যাব, হাঁটা আমার দরকার, পঁয়তাল্লিশ মিনিটেই পারব মনে হচ্ছে।'' সাধন ঘড়ি দেখল।
''গুড, ভেরি গুড।'' বৃদ্ধ সাধনের পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। ''হাঁটা তোর উপকার করবে।''
সাধন এইটাই শুনতে চেয়েছিল। সে হাঁটতে শুরু করল। মিনিট দশেক পর পায়ের গোছ থেকে হাঁটু পর্যন্ত পেশিতে ব্যথা শুরু হল। সুটকেসটা বারবার হাতবদল করে নিতে হচ্ছে। ঊরু দুটো টনটন করে ভারী হয়ে যাচ্ছে। কুঁচকির যন্ত্রণায় সে একসময় সুটকেস নামিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল।
একটা খালি অটো রিকশা তার সামনে এসে মন্থর হল। সাধন চালকের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বিড়বিড় করল, ''না আমার কষ্ট হচ্ছে না।''
আবার সে হাঁটা শুরু করল। সুটকেসটা হাতে ঝুলিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে, গরমও লাগছে। সে টাইটা গলা থেকে খুলে পকেটে রাখল। তারপর সুটকেসটা তুলে নিল মাথায়। তার মনে পড়ে গেছে একদিন শ্যামবাজার থেকে তুলো কিনে বাবা বস্তাটা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। পিছন পিছন আসছিল সে আর মদন। পাড়ায় ঢোকার সময় সে ভাইকে বলেছিল, 'বাবাকে বল না এবার হাতে করে নিতে।' মদন সিঁটিয়ে গিয়ে বলে, 'গাঁট্টা খাবার ইচ্ছে হয়ে থাকে তো তুই বল।' সাধন এগিয়ে গিয়ে তখন বলেছিল, 'বস্তাটা এবার আমাদের দাও, দুজনে ধরে নিয়ে যাব।' বাবা অবাক হয়ে বলেছিল, 'পারবি? ভেরি গুড।' দুই ভাই অনায়াসেই বস্তাটা বয়ে এনেছিল। পরে বাবা বলে, 'পারবি জানলে তো শ্যামবাজার থেকেই তোদের দিয়ে বওয়াতাম।'
সাধনের মুখে চিলতে হাসি ফুটল। বাবাকে নিয়ে টুকরো টুকরো ছবি তার চোখে ভেসে আসছে। পায়ের কুঁচকির ব্যথা আর বিশেষ সে অনুভব করছে না। সুটকেসটা মাথা থেকে নামিয়ে রুমালে মুখ মুছল। ঘড়ি দেখে সময়ের হিসেব কষে ভ্রূ কুঁচকে উঠল। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছতেই হবে। বাবার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার একটা ঝোঁক তাকে পেয়ে বসেছে। সুটকেসটা এবার হাতে ঝুলিয়ে সে চলতে শুরু করল।
বাবা একটা নতুন ফাউন্টেন পেন দেখিয়ে তাকে বলেছিল 'স্কুল ফাইনালে ফার্স্ট হলে এটা পাবে।' সাধন মাথা নাড়ায় বলেছিল, 'তাহলে প্রথম পঁচিশ জনের মধ্যে?' সাধন বিব্রত হয়ে 'আমি অত ভাল স্টুডেন্ট নই বাবা।' বলার পর দেখেছিল বাবার মুক ম্লান হয়ে গেল। পরীক্ষার প্রথম দিন সকালে বাবা কলমটা হাতে দিয়ে বলে 'আর কিছু নয়, ভালভাবে পাস হও।' সাধন একান্ন হয়েছিল।
তাদের আবাসনটা এবার দেখা যাচ্ছে। রাস্তায় পদচারীর সংখ্যা কমে আসছে, দু পাশের বাড়িগুলো নিঝুম, সাধনের কানের পিছন দিয়ে ঘাম গড়িয়ে নামছে। সে ঘড়ি দেখল। তারপর সুটকেসটা মাথায় তুলেই ছুটতে শুরু করল। আর দু মিনিট মাত্র বাকি।
দোতলায় নিজের ফ্ল্যাটের কলিং বেল টিপে যখন সে ঘড়িতে দেখল কুড়ি সেকেন্ড বাকি, সাধন স্পষ্ট বুঝতে পারল তার মাথা ও দেহের মধ্যে কোনো শূন্যতা নেই। ভিতর থেকে একটা চাপা গোলমালের শব্দ আসছে। টিভি চলছে, এই দুপুরে!
সানু দরজা খুলে সরে দাঁড়িয়ে অবাক স্বরে বলল, ''তুমি, আজকে যে? আসার কথা ছিল তো কাল!''
''তোর টেস্ট পরীক্ষা না?''
''সে তো কাল থেকে।''
''এখন তোর বই নিয়ে বসার কথা।''
সাধন দ্রুত ঘরে ঢুকে সুইচ বন্ধ করে দিল।
''একি, স্লগ ওভারস এবার শুরু হতে যাচ্ছে আর তুমি—'' সানু বিরক্ত মুখে সাধনকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে সুইচ খুলে দিল।
''সানু।'' কর্কশ চিৎকার করে উঠল সাধন। ''বন্ধ করো টিভি, পড়তে বসো।''
''বসব বসব। কপিলদেব আগের ওভারে একটা সিক্সার ঝাড়ল।... এখন কি পড়াটড়া... ঠিক পাস করে যাব, কথা দিচ্ছি।''
সোফায় কোলে বালিশ নিয়ে বসে সানু সামনে দু পা ছড়িয়ে দিয়েছিল। ঝনঝন করে টিভি স্ক্রিনটা ভেঙে দিয়ে পেতলের ফুলদানিটা ছিটকে তার পায়ের উপর পড়তেই সে লাফিয়ে উঠে সাধনের দিকে তাকিয়ে রইল। সাধনও তাকিয়ে। সানুর চোখে ক্ষোভ, হতাশা ছাড়াও একধরনের বিস্ময়। সে তার বাবাকে একদমই চিনতে পারছে না। ঘুমভাঙা জিতা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল।
''কী হল? য়্যাঁ, একি কে ভাঙল?''
''বাবা।'' সানু আঙুল দিয়ে দেখাল।
সাধন তাই শুনে প্রচণ্ড রেগে উঠে বলল, ''বাবা কেন হবে, এ তো আমি। বাবা তো আজ সকালে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে।''
তারপর সাধন নিজেকে বলল, বাবাকে না মেরে আমার উপায় নেই। বারবার দু খণ্ড হওয়া আর পোষাচ্ছে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন