মতি নন্দী
ঘন—বুনোটের জাল জানলায় আটকানো। মাছির মতো ছটফট করে খুকীর চোখদুটো। রাস্তা দিয়ে মানুষ হাঁটে, রিকশা, ঠেলাগাড়ি যায়, ইলেকট্রিক ইন্সপেক্টরের মোটর সাইকেলও মাসে দু'একবার আসে, জালের এপার থেকে খুকী তাকিয়ে থাকে। খুকীর কোনো কাজ নেই। ঘড়ির দিকে তাকায়, ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই বাবা অফিস বেরিয়ে যাবে। তারপরেই এক ছুটে চলে যাবে ও হালদার বাড়ি।
নাকের উপর ধুলোর তিলক কেটে দিয়েছে জালটা। জালে চাপড় দেয় খুকী। এইটুকু তো ঘর। লাফিয়ে হাত বাড়ালে কড়িকাঠটাকে বোধহয় ছোঁয়া যায়। জংশন স্টেশনের মতো কড়িকাঠের কাটাকুটি। উই পোকায় ঝাঁঝরা করে দিয়েছে বরগা। দরজার চৌকাঠটাও ক্ষয়ে ক্ষয়ে মিশিয়ে এসেছে মেঝের সঙ্গে। ঘরে রোদ্দুর আসে না। লেপ তোশকে ভ্যাপসা গন্ধ। একতলা বাড়ি। ছাদের সিঁড়ি নেই,বিছানা রোদে দেওয়া যায় না। খুকী হাঁপিয়ে ওঠে। ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। সিমেন্ট—ওঠা উঠোন। পুরু শ্যাওলা। এখন আর পা হড়কায় না। একপাশে রান্নাঘর আর বাড়িওয়ালী বুড়ি থাকে। খুকী ঘড়ি দেখে আবার, আর এতক্ষণে, যেন এই প্রথম মনে পড়ল, হালদার বাড়িতে একটাও কড়িকাঠ নেই। ঢালাই কংক্রিটের ছাদ। এ পাড়ায় ওই একটি বাড়িতেই ওপর দিকে তাকালে ধবধবে দেওয়াল দেখা যায়। নতুন কালির গন্ধ এখনো ফুরোয়নি। অত তো হাওয়া! আর দরজায় পালিশ। হাত দিলে পিছলে পড়ে হাত। কেউ ডাকেনি, নিজে যেচে আলাপ করা খুব সোজা কথা নয়। তবু অনেকটা সোজা হয় যদি সমবয়সী কোনো মেয়ে থাকে, কিন্তু হালদার বাড়িতে মেয়ে নেই, ছোট বৌ কম করেও তার থেকে দশ বছরের বড়। হালদার গিন্নি চালচলনে রাশভারী, আর বড় বৌ যেন মোমে গড়া পুতুল। কী খুশিই না হল ওরা তাকে দেখে। সেই প্রথম দিনেই মুগ্ধ হয়েছিল খুকী। ইচ্ছে করে এবাড়ির মেয়ে হয়ে থেকে যায়। গল্প করে এটা—ওটার। সতেরো নম্বরের ন' পিসির গল্প বলে। হালদার বাড়ির সুন্দর ফুরফুরে বৌ দুজন, অবাক চোখে শোনে, আর মুখ চাওয়া—চাওয়ি করে বলে, ''ওমা, তাই নাকি!''
ওদের বিস্ময়ে খুকী খুব খুশি। সে চাইছিল ওরাও তাকাক তার দিকে, শুনুক তার কথা। ন' পিসিকে ওরা জানে স্বামী পরিত্যক্তা দুঃখিনী। তাই রসিয়ে রসিয়ে খুকী গল্প করে। অল্পবয়সী কোন সম্পর্কের কার সঙ্গে যেন ন' পিসি বেরিয়ে গিয়েছিল, তারপর কেমন করে জানি বাপের বাড়িতে ঠাঁই পেয়েছে। বড় বৌ, ছোট বৌ, দুজনেই খুকীর গা ঘেঁষে আসে। মৃদু তাপ পাওয়া মোমের মতো নরম নরম হাত বড় বৌয়ের, খুকীর হাত ছুঁয়ে যায়। ছোট বৌয়ের ডাগর চোখ, খুকীর চোখ পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকে। সময় কাটে গল্পে। তারপর খুকী বাড়ি ফেরে। মা ঝাঁঝিয়ে ওঠে।
''ছিলি কোন চুলোয় এতক্ষণ?''
''হালদার বাড়িতে।''
স্নান করা বেড়ালের মতো চুপসে যায় মা।
''কী রোজ রোজ যাস ওদের বাড়ি। গেলেই তো এটা—ওটা খেতে দেবে। ওতে কখনো মান থাকে।''
খুকী চুপ করে থাকে, শুধু আর একটা কথা শোনার জন্য। প্রতিদিনের শোনা কথাটা।
''হ্যাঁরে, আজ কী খেতে দিল রে?''
তারপরই কথায় কথায় ঢেউ ছড়ায় খুকী, মার প্রশ্নের ঘাটলায়।
প্রায় লাফিয়ে উঠল খুকী। পাঁচটা মিনিট কেটে গেছে অনেকক্ষণ। মা একবার চিৎকার করে ওঠে। ''তাড়াতাড়ি ফিরিস। কাপড় সেদ্ধ করতে দিচ্ছি। এসে কেচে দিবি।''
কথাটা শুনতে পেল কি পেল না, খুকী ততক্ষণে হালদার বাড়ির বড় বৌয়ের ঘরে পর্দা সরিয়ে ইতস্তত করতে শুরু করে দিয়েছে। নতুন বালা গড়িয়ে এসেছে। আয়নার সামনে বালাপরা হাতটাই নয় শরীরটাকেও ঘুরিয়ে—ফিরিয়ে দেখছে বড় বৌ। খুকী মুগ্ধ চোখে আয়নাটারই তারিফ করে। কী বড় আয়নাটা! আরশুলা রঙের ড্রেসিং টেবল, গা—ডোবানো সোফা, বসলেই আরাম জড়িয়ে ধরে গলা পর্যন্ত। ঝকঝকে রেডিও সেট, রঙিন শেডের ল্যাম্প, ডানলোপিলোর বিছানা। প্রত্যেক দিন খুকী এ—সব দেখে, আজকেও দেখল বড় বৌকে দেখার সঙ্গে। তারপর পায়ে পায়ে ঘরের মাঝে এসে দাঁড়াল।
ফুরফুরে হাওয়া আসছে। পাখাটা বন্ধ। তবু হাওয়া আসে। তিনতলায় ঘর। সারা দেওয়ালটাই তো জানলা দিয়ে তৈরি। আলো, আলো আর হাওয়া। ঘুম পেয়ে যায় খুকীর। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, শুধু ঘুমিয়ে থাকতে পারে সে এমন একটা ঘর পেলে। একটুখানির জন্য চোখটা বুজেও আসে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ন করে নেয় দৃষ্টিটা। বড় বৌয়ের মুখে বিরক্তি ফুটে উঠেছে। খুকীর মন দুরুদুরু। না বলে ঘরে ঢুকেছে, তাই কি? এবাড়ির রীতি, জিজ্ঞাসা করে ঘরে ঢোকা। কিন্তু সে তো ঝি—চাকরদের জন্য নিয়মটা। না, ঝি—চাকরদের সঙ্গে তার তফাত নিশ্চয় আছে। কথাটা ভেবে মনে মনেই লজ্জা পেল খুকী। কী আক্কেলে সে নিজেকে ঝি—চাকরদের সঙ্গে তুলনা করার কথা ভাবতে পারল।
খুকী আবার তাকায়। বিরক্তি চিহ্নটা নেই। তবু যথেষ্ট ভরসা পায় না।
''মার যেমন পছন্দ। এটাকে ভেঙে আবার গড়াব।'' বড় বৌ বলে হঠাৎ। মুখের বিরক্তিটা হাতে টেনে, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বড় বৌ খুলে ফেলল বালাটা। খুকী চুপ করে রইল।
''আজকাল কি আর ঐ ফ্যাশান চলে।''
নড়েচড়ে বসল খুকী। এবার বড় বৌ কথা চাইছে তার কাছ থেকে।
''তারকদার বৌয়ের কিন্তু ঠিক ওমনি একটা বালা আছে।'' নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল খুকী। তারকদার বৌয়ের গল্প এ—বাড়ির সবাই জানে। বি এ পাস। প্রেম করে বিয়ে হয়েছে। কী একটা আপিসে চাকরি করে, মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়। এই নিয়ে তারকদার সঙ্গে বৌয়ের তুমুল ঝগড়া হয় মাঝে মাঝে। গলার শির ফুলিয়ে নয়, দাঁতে দাঁত চেপে কথা কাটাকাটি হয়। হাজার হোক শিক্ষিত তো দুজনেই। নিজেদের কথা আর পাঁচজনকে শুনতে দিতে চায় না।
''তুমি শুনেছ ওদের ঝগড়া?''
স্প্রিংয়ের ধাক্কায় দুলতে দুলতে বড় বৌ খাটের কিনারে গড়িয়ে এল। খুকী ঝগড়া শোনেনি, তবু ইচ্ছে হল বলে, হ্যাঁ শুনেছি। তাহলে হয়তো, বড় বৌ ওকে টেনে নিয়ে খাটের উপর শুইয়ে, মুখের কাছে মুখ নিয়ে শুনতে চাইবে গল্পটা। এমন খাটে কোনোদিন শোয়নি খুকী। লোভী চোখে তাকাচ্ছে সে বড় বৌয়ের প্রায় অর্ধেক—ডোবা শরীরটার দিকে। ''কি? শুনছে, কি বলে ওরা ঝগড়ার সময়?''
মুখ টিপে হেসে খুকী একবার খোলা দরজাটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, ''সে বড় অসভ্য কথা।''
হাত বাড়িয়ে খুকীকে খাটের ওপর টেনে আনল বড় বৌ। যা ভেবেছিল তাই। খুকী বিছানায় সাবধানে হাত বুলিয়ে, হাসল। কী রকম গা এলিয়ে শুয়ে রয়েছে বড় বৌ। এমন বিছানায় শোয়া ওর অনেক দিনের অভ্যাস। খুকী তার নিজের বসবার ভঙ্গিটাও অনেকখানি শ্লথ করে দিল।
এতক্ষণে বড় বৌয়ের মনে হল, গরম চায়ের সঙ্গে খুকীর গল্পটা ভাল জমবে।
''খুকী ভাই, একটা কাজ করবে? নিচে গিয়ে ঠাকুরকে বলবে দু'কাপ চা পাঠিয়ে দিতে।'' খুকী উঠে দাঁড়াল।
''কিছু মনে করলে না তো? ঝিটা যে থেকে থেকে কোথায় ডুব মারে। আর বিস্ফুটের টিনটাও নামিয়ে দিয়ে যাও।''
ঝড়ের মতো নিচে নেমে আসে খুকী। এ বাড়ির বাজার আসে দশটায়। স্কুল বা অফিসের ভাত খাওয়ার কোনো লোক নেই। ব্যবসাদারের বাড়ি। তবু দশটা বেজে গেছে, তাই মরবার ফুরসত নেই রান্নার ঠাকুরের।
''ঠাকুর শিগগির দু'কাপ চা করে দাও।''
''চা—ফা এখন হবে না। এতক্ষণ উনুন কামাই যাচ্ছিল, তখন আসনি কেন।''
ভাঁড়ারঘর আর রান্নাঘরের মধ্যে কয়েকবার ছোটাছুটি করে ঠাকুর। তবু দাঁড়িয়ে থাকে খুকী। তিন তলার ঘরে, ফুরফুরে হাওয়া। সাদা দেওয়ালে ধাক্কা লাগা সূর্যের আলো। নরম সোফা, আর বড় বৌ, এদের ঘেরাটোপের মধ্যে বসে চা খাওয়া। তার জন্য কিছুক্ষণ কেন, সারা বেলাটাই তো সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
ডাল ফুটছে উনুনে। পিঁড়িতে পা গুটিয়ে বসে ঠাকুর তাকাল খুকীর দিকে। সরু সরু পা। ফ্রকটা ঝলমল করে কোমরের নিচে হাঁটুর তলা পর্যন্ত। কিন্তু অস্বস্তি হয় পনেরো বছরের খুকীর। বুকের কাছটায় হাত পাশাপাশি করে দাঁড়িয়ে থাকে, অন্যমনস্কর ভান করে।
পানের ছোপ পড়া ঠাকুরের দাঁতগুলো কালো ঠোঁট দুটোকে পিছনে ফেলে খুকীর দিকেই যেন এগিয়ে আসে। চৌকাঠের ধারে সরে আসে খুকী। ঠাকুর এ বাড়িতে অনেক দিনের লোক।
''চলে যাচ্ছ নাকি!''
ডালের কড়া নামিয়ে, কেটলি বসাল ঠাকুর। ''তুমি নিজেই করে নিয়ে যাও।''
ঘরের মধ্যে গুটি গুটি এসে দাঁড়াল খুকী। ঠাকুর পা চুলকোতে শুরু করল। খুকী আড়ষ্ট হয়ে তাকিয়ে থাকে কেটলির দিকে। গনগনে আঁচ, দু'কাপ জল সঙ্গে সঙ্গেই ফুটে উঠল! চা ছেঁকে দুধ, চিনি দেবার সময় হাঁ—হাঁ করে উঠল ঠাকুর।
''করছ কী অতখানি চিনি দেয়! মা যদি জানতে পারে, তাহলে কুরুক্ষেত্তর বাধাবে।''
ভয়ে আর নিজের কাপে চিনি দেয় না খুকী। পেয়ালা হাতে উঠে দাঁড়ায় সে। কানা ছাপিয়ে পড়ছে চা। সাবধানে পায়ে পায়ে এগোতে শুরু করে। প্রায় ধমকে তাকে থামায় ঠাকুর। ''চিনি না দিয়ে চা খাবে কী!''
দু'চামচ চিনি কাপে ঢেলে, চামচ নাড়তে থাকে ঠাকুর। বাঁ হাতটা খুকীর কাঁধে এসে পড়ে যেন আচমকা। সরে যেতে গেল খুকী, আঙুলগুলো কাঁকড়ার মতো খুবলে ধরল ঘাড়টা। ভয়ে কেঁপেও ওঠে খুকীর হাত। খানিকটা চা চলকে পড়ল পায়ে। কেউ যদি এসে পড়ে, কেউ যদি দেখে ফেলে, তার চেয়ে চে�চিয়ে উঠলে কেমন হয়।
কিংবা একটা চড় যদি মারা যায়, কিন্তু দু'হাতে যে কাপ রয়েছে। যদি ভেঙে যায়। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে খুকী সোনালি নকশা করা পাতলা ফিনফিনে কাপ দুটোর দিকে। এত কথা যখন ভাবছিল ততক্ষণে চাপ চাপ, বিড়ি আর দোক্তার গন্ধ তার গালে ঠোঁটে বুলিয়ে গেল ঠাকুর।
রান্নাঘর থেকে প্রায় ছিটকেই খুকী এল। গরম চা আঙুলে পড়ল। উঠোনে দাঁড়িয়ে থরথরিয়ে একবার কেঁপে উঠল। চারতলা হালদার বাড়িটা চায়ের কাপে দুলে ওঠে, ভেঙে ভেঙে যেতে লাগল। সিঁড়িতে ওঠার আগে কাপ দুটো সে নামিয়ে ফুঁ দিল আঙুলে। কেমন একটা পুরুষালি গন্ধ, গা গুলিয়ে উঠল খুকীর। যদি কেউ দেখে ফেলত তাহলে কী হত। ভয়ে শিরশির করে ওঠে হাঁটুদুটো। নিশ্চয় তাকে সকলে খারাপ ভাবত, এই বাড়িতে আসাও বন্ধ হয়ে যেত।
থুথু ফেলে কাপ দুটো তুলে নিল খুকী। হালদার বাড়ির সিঁড়ির রেলিংগুলো নির্ভুল ছায়া ফেলে কাপের মধ্যে এখন পাশাপাশি সাজানো রয়েছে। ঘরে ঢুকতেই কপট ঝঙ্কার দিয়ে উঠল বড় বৌ।
''ওমা, তুমি আবার নিজে হাতে করে আনলে কেন, ঠাকুরকে বললেই তো হত।''
''আপনাদের ঠাকুরের যা মেজাজ। কত খোশামোদ করে তবে চা তৈরি করে আনলুম।''
হেসে তাকাল খুকী বিস্কুটের টিনটার দিকে।
হালদার বাড়ি থেকে বার হতেই বারো নম্বরের জেঠিমা ডাকল খুকীকে। বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল, তবু হেসে জানলার ধারে এগিয়ে এল খুকী।
''সত্যি বলছি, আর একদম সময় পাই না। নইলে বলুন আপনার কাছে তো রোজই আসতুম।''
''আহা—হা, কী এমন কাজের লোক হয়েছিস শুনি। হালদার বাড়ি রোজ যাবার সময় তো ঠিকই পাস।''
জেঠিমার সুরে অভিযোগ নয় অভিমানটাই তীব্র। খুকী জানলার রডে হাত বুলোয়। কোনো কথা বলে না সে। যেন জেঠিমার কথাটাই সে মেনে নিয়েছে এমন ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে থাকে।
''হ্যাঁরে ছোট বৌয়ের বাপের বাড়ি আহিরীটোলায় না? সেদিন ভাগ্নীর বড় ননদ এসেছিল। সে—ই বলল, হালদার বাড়ির ছোট বৌ ওদের শ্বশুরবাড়ির পাড়ার মেয়ে। বাপটার বুঝি মনোহারি দোকান আছে। দেখতে সুন্দর, কটা গায়ের রঙ বলেই না উতরে গেল।''
খুকীর কথা যেমন করে থামিয়েছিল জেঠিমা, তেমনি করে খুকী বলে উঠল, ''আচ্ছা, জেঠিমা এখন চলি, মা রাগ করবে।''
''আহা, এই তো মোটে সাড়ে এগারোটা, ভেতরে আয় না। ডলু কী কেলেঙ্কারি করেছে শুনেছিস তো।''
মনে মনে ক্লান্ত হয়ে ছিল খুকী। এক কাপ চা, খান দুই বিস্কুট খিদেটাকে যেন চাগিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছে হল ভিতরে গিয়ে বসে। তারিয়ে তারিয়ে শোনে ডলুর কথা। সবই জানা, তবু নতুন কিছু হয়তো ঘটেছে এবারে। জেঠিমার পাশ দিয়ে সে ঘরের মধ্যেটা দেখতে পায়। ছোট্ট ঘর, সারা ঘর জুড়ে প্রায় সেকেলে ভারী পালঙ্ক। খাটে স্তূপীকৃত বালিশ আর তোশক। খাটের নিচে বড় কয়েকটা ট্রাঙ্ক। দেয়ালে তাক ভর্তি টিনের কৌটো আর শিশি বোতল। আলমারি, আলনা আর ঠাকুর দেবতার ছবি। দম আটকে আসে শুধু তাকিয়ে থাকলেই। সঙ্গে সঙ্গে হালদার বাড়ির ঘরগুলোও মনে পড়ে খুকীর।
পাড়ার অন্য বাড়িতে আর না যাবার কারণটা এই মাত্র যেন খুঁজে পেল খুকী। ভাল লাগে না। এই দম চাপা ঘর, ময়লা জামা—কাপড়, নোংরা চালচলন। ঠিক এই জন্য তার নিজের বাড়িটাও ভাল লাগে না। এরা চুপ করে থাকতে জানে না। অবাক হতে জানে না। এদের মাঝে খুকী অতি সাধারণ হয়ে যায়। কত তফাত এদের সঙ্গে হালদার বাড়ির। সেখানকার বড় বৌ, ছোট বৌ, নভেল হাতে বিছানায় গড়ায়, রেডিওর কাঁটা ঘোরায়, সাজগোজ করে সিনেমায় যায়। অজস্র সময় আর উপকরণ ফেলে ছড়িয়েও শেষ করতে না পেরে হাঁপিয়ে ওঠে। খুকী ঈর্ষা করে না। তাতেও তার ভয়। যদি ওরা জেনে ফেলে। কাছে আসতে যদি না দেয়।
''না জেঠিমা আজ বসব না। আর একদিন এসে শুনব।''
চলে যাচ্ছিল খুকী। জেঠিমা ডেকে জিজ্ঞাসা করল, ''হ্যাঁরে ওদের দু বোয়েরই ছেলেপুলে হয়নি কেন রে?''
''জানি না।''
ক্লান্তস্বরে খুকী জবাব দিল। আবার প্রশ্ন আসে জেঠিমার, ''ছোট বোয়ের ভায়ের বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে শুনলুম?''
ঘাড় নেড়ে খুকী এগিয়ে যায়।
''ভাগ্নীর ছোট ননদ এবার আই এ পাস দিয়েছে, এবার বলি না কথাটা।''
খুকী তখন অনেক দূরে।
দুপুরের অর্ধেক পর্যন্ত কাপড় কেচে, ক্লান্ত হয়ে পড়ে খুকী। মাদুরে শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ে, আর কাঠওয়ালির চিৎকারে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে যায়। একদিন বুঝি ওর কাছ থেকে কাঠ কিনেছিল, তাই রোজ জানলার কাছে চিৎকার করে যাবে। খোলা কল দিয়ে জল পড়ছে। বিরক্ত হয়েই খুকী কলটা বন্ধ করে দেয় আর গজগজ করে। এই এক আপদ জুটেছে। রোজ এসে ঘ্যান—ঘ্যান করবে। বিরক্ত হয়েই খুকী কলঘরে যায়।
কিন্তু খুকী যখন হালদার বাড়ির ছাদের পাঁচিলে কনুই রেখে দাঁড়ায়, বিরক্তির রেশমাত্র তখন আর থাকে না। গোটা পাড়াটাই ঐখান থেকে দেখা যায়। অবাক লাগত প্রথম প্রথম। নতুন মনে হত বাড়িগুলোকে এত ওপর থেকে দেখলে, অবাক হবার সুযোগটুকু দেবার জন্য হালদার বাড়ির কাছে কৃতজ্ঞতা জানাল খুকী মনে মনে। নিচু নোংরা বাড়ি আর মানুষগুলোর হাত থেকে কিছুক্ষণের জন্যও তাকে রক্ষা করেছে হালদার বাড়ি।
এতদিন যাওয়া—আসা করছে খুকী, হালদার বাড়ির প্রকৃতি সে চিনে নিয়েছে তার বুদ্ধি দিয়ে। সময় কাটাবার অজস্র উপকরণের মধ্যে খুকী আর তার গল্পও একটা উপকরণ। তাই খটকা লাগল খুকীর। আজ কয়দিন ধরেই সে লক্ষ্য করেছে, তাকে দেখে আর হালদার বাড়ি তেমন খুশি হতে পারছে না। সারা বাড়িটা যেন থমথমে মুখ নিয়ে তার দিকে ভ্রূকুটি করে আছে। খুকী ভয় পায় এসব দেখে। হালদার বাড়িতে সে অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েছে। এ বাড়ির প্রতিটি কথা আর ভাবভঙ্গি বিশ্লেষণ করে। ভয়টা তার বেড়ে যায়, সেদিন চিলেকোঠার ঠাকুর ঘরে হালদার গিন্নির কথাটা মনে পড়ে।
ঠাকুর ঘর পরিষ্কার করছিল হালদার গিন্নি। শুধু একবার তাকিয়ে কাজে মন দিল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে খুকীই প্রথম কথা শুরু করল।
''ভটচাজদের শ্রীধরের কাজগুলো সব দত্ত কাকীই করে। বাসন মাজা ঘর ধোয়া এমন—কি পুরুত ঠাকুরের জামা কাপড় পর্যন্ত কেচে দেয়।''
হালদার গিন্নি শুনেও শোনে না। খুকী তাতে কিছু মনে করে না। আপন মনেই সে বলে যায়, শুধু চোখ দুটোকে তীক্ষ্ন রেখে!
''এই নিয়ে কত কথা উঠেছিল, আর উঠবে নাই বা কেন, অল্প বয়সে বিধবা হয়েছে তার অত রাত পর্যন্ত মন্দিরে থাকার দরকারটাই বা কিসের? পুরুত তো লোক ভাল নয়। ছোটবেলায় ডলুকে একবার কি করেছিল জানেন?''
''জানি কি করেছিল?''
এতটুকু হয়ে যায় খুকী, হালদার গিন্নির স্বরের তীব্রতায়। গুটি গুটি সে তিনতলায় নেমে এসেছিল। উল বুনছিল বড় বৌ। খুকী চুপ করে দেখছিল। হঠাৎ সে বলে ওঠে।
''তারকদার সোয়েটারটা দেখেছেন তো, খয়েরি হাতায় কালো বর্ডার। বলুন তো কে করছে।''
বড় বৌ কথা বলে না, আরো দ্রুত হাত চলে। উত্তর না পেয়ে অপ্রস্তুত হয় না খুকী। জবাবটা সে নিজেই দেয়।
''নীলিমাদি। আগে ওদের বাড়িতে ভাড়া ছিল। তারকদার বিয়ের আগেই উঠে গেছে। এখনো তারকদা ওদের বাড়ি যায়। প্রত্যেক রোববার। নীলিমাদির এখনো বিয়ে হয়নি, খুব ভাব ছিল ওদের দু'জনের। এই নিয়ে বৌদির সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল। তাকে বৌদি কি বলেছিল জানেন?''
''জানি।''
ছোট বৌয়ের ঘরে পা দিয়েই মনে নড়ল আবার, এ বাড়িতে ক্রমশই সে অবাঞ্ছিত হয়ে পড়ছে। খাটে শুয়ে সিনেমা পত্রিকার ছবি দেখছিল ছোটবৌ। শুধু একবার মুখ ফিরিয়ে দেখল খুকীকে।
''পড়ছেন বুঝি! কী পড়ছেন?''
জবাব পেল না খুকী। তা'তে কী হয়েছে, এ বাড়িতে তার কথাই তো সকলে শুনতে চায়।
''আপনার মতো বিনুদিরও বই পড়ার বাতিক আছে। ওর ভায়ের মাস্টার রোজ বই এনে দেয়। একদিন বই না পেলে সে'কী ছটফটানি বিনুদির। শুধু বই তো আর নয়, ওর মধ্যে আরও একটা জিনিস থাকে।''
''জানি, চিঠি থাকে তো!''
জানি জানি আর জানি। আর কিছু জানতে বাকি নেই এদের। কেউ তার কথা শুনতে চায় না। এ বাড়ির কৌতূহল যেন ফুরিয়ে গেছে। সব সম্পর্ক ফুরিয়ে আসছে তার হালদার বাড়ির সঙ্গে।
কাঠের রেলিংয়ে হাত রাখে খুকী। কী পালিশ! পর্দাগুলো হাওয়ায় দুলছে। পর্দায় ময়ূরের নকশা মনে হয় যেন নাচছে। চোখ ফেরানো যায় না। চা খাবার জন্য কেউ তাকে ডাকল না।
বাড়ি ফিরে খুকী ঠিক করল, আর সে হালদার বাড়ি যাবে না। পরপর কতগুলো বিকেল গড়িয়ে গেল, রাত পুইয়ে এল।
সদর দরজা থেকে পায়ে পায়ে দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে যায় খুকী ডলুদের সদর লক্ষ্য করে। হালদার বাড়ির সীমানা দিয়েই সে ছুটে একদম ডলুদের রান্নাঘরে এসে উঠল।
''বেশ করেছি। আমার সব্বোনাশ আমি করেছি তাতে তোমাদের কী?''
ঘর থেকে চাপা চিৎকারে বাতাস তোলপাড় করল ডলু। রান্নাঘর থেকে একই সুরে জবাব দিল ডলুর মা।
''তুই কি আমার একটা মেয়ে? অন্যগুলোর ভবিষ্যৎ দেখতে হবে না? এই কেলেঙ্কারির পর ওদের আর বিয়ে হবে।''
''বিয়ে না হয়, তাহলে আমি যা করেছি তাই করবে। সংসারে যখন এনেছিলে মনে ছিল না, খাইয়ে পরিয়ে বিয়ে দিতে হবে।''
''বলি তোর বিয়ে কি আমরা ইচ্ছে করে দিচ্ছি না? বাপের রোজগার—পাতি, সংসারের মানুষ জন, সব মিলিয়েই না বিবেচনা করতে হয়।''
কী একটা বলবার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল ডলু, খুকীকে দেখে চুপ করে ফিরে গেল। জুলজুলে চোখে খুকী তাকায় ডলুর ঘরটার দিকে। হালদার বাড়িতে প্রবেশের ছাড়পত্র যেন ডলুর কাছে। এবার সে এমন করে তার গল্পের ঝুলি ভরাবে যাতে আর কোনোদিন না হালদার বাড়ি বলতে পারে, জানি।
শ্বেতপাথরের সিঁড়ি মাড়িয়ে, চকচকে রেলিং ধরে ধরে, ময়ূর আঁকা পর্দার সামনে, নিঃসংকোচে দাঁড়াল খুকী। ফুরফুরে হাওয়ায় পর্দার ময়ূরটা নাচছে। খুকী পর্দা সরিয়ে ঢুকল। ছোটবৌ চা খাচ্ছে। পাতা জোড়া ছুঁই ছুঁই করছে সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে। ফিসফিস করে খুকী বলল, ''জানেন কি হয়েছে ডলুর।''
''জানি।''
কয়েক মুহূর্তের জন্য খুকীর চোখের সামনে ময়ূর নেচে উঠল। জানি জানি আর জানি। ওরা সব জানে। সব? ওদের জানার বাইরেও কি কিছু থাকতে পারে না? খুকী অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকল ছোটবৌয়ের দিকে, তারপর টপটপ করে জল পড়তে শুরু করল তার চোখ থেকে।
''কী ব্যাপার, কাঁদছ কেন?''
খুকী ফুঁপিয়ে উঠে দু'হাতে মুখ ঢাকল।
''কিছু হয়েছে কি তোমার?''
খুকী মাথা নোয়াল। ''আমার, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে।''
অবাক হয়ে ছোটবৌ উঠে ওর পাশে এল। খুকী ফিসফিস করে কি যেন বলতেই ছোটবৌ কৌতূহলে ফেটে পড়ে বলল, হ্যাঁ, কার সঙ্গে? কে করল তোমার... কবে হল, কী ভাবে?''
খুকী মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ''না না বলতে পারব না।''
আর সে মনে মনে ধারাবাহিক সুখে বলতে থাকল, এইবার এইবার, দেখি কেমন করে জানি বলো, এইবার দেখব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন