সামান্য জীবন

মতি নন্দী

বাজার যাবার পথে বস্তিটা পড়ে।

সেখানকার এক বাসিন্দা পাগল হয়ে বৌ—ছেলেমেয়েকে মারধর করছে, ঘরের জিনিস ভাঙছে, কাপড় ছিঁড়ছে। উৎপাতে বস্তির লোকে অতিষ্ঠ। চিকিৎসার পয়সা নেই। পাগলা গারদে পাঠাবার উপায়ও তাদের জানা নেই। তাই ওরা পরামর্শ করে ঠিক করেছে পাগলাকে চোর বানিয়ে থানায় দিয়ে আসবে। তারপর পুলিস যা করার করবে—হয়তো পুলিসই পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবে। ওদের এই পরিকল্পনা দু—চারজন জেনেছিল, তার মধ্যে আমিও।

একদিন বাজারে যাবার পথে দেখলাম চোরকে পেটানো হচ্ছে। নির্মম অকথ্য সেই প্রহার। অনুষ্ঠান বহু লোক দাঁড়িয়ে দেখছে। পাগলের মুখ রক্তে ভরা, গায়ে লাঠির দাগড়া, সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে সকলের মুখের দিকে তাকাচ্ছে আর অনুযোগের স্বরে বলছে, ''আমার লাগছে, আমার লাগছে।''

এই সময় ছোট্টখাট্ট শীর্ণ এক বৃদ্ধ অপ্রত্যাশিত বিকট হুঙ্কার দিয়ে ভিড়ের মধ্য থেকে এগিয়ে এসে পাগলকে আড়াল করে দাঁড়াল। সেইদিন থেকেই ওর সঙ্গে আলাপ। বললেন, ''পাড়ায় নতুন এসেছি, আগে থাকতাম সিঁথিতে। উল্টোডাঙ্গায় একটা প্রাইমারি স্কুলে তিরিশ বছর পড়াচ্ছি। আমিই তার হেড মাস্টার।'' পাগলকে পুলিসে দেওয়া যায়নি। কিন্তু হেড মাস্টারকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সেদিন বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।

বাজারে রোজ রোজ দেখা হয় হেড মাস্টারের সঙ্গে। শান্ত ধীর নম্র স্বরে উনি কুশল জিজ্ঞাসা করেন। দাঁড়িয়ে দু—চার কথা বলি। একদিন উনি বললেন, ''আসুন না আমার বাসায় এ ভাবে কি বাজারে দাঁড়িয়ে আলাপ হয়।''

আন্তরিক ভাবেই বললাম, ''নিশ্চয় যাব।''

শুনে হাসলেন। ওঁর সামনের দুটি দাঁত নেই। হাসলে ওঁকে ভাল দেখায় না।

গড়িমসি এবং সময়াভাবে যাওয়া হচ্ছিল না। দেখা হলেই উনি ঘাড় কাত করেন আর আমি বলি, ''নিশ্চয় যাব।''

অবশেষে এক ছুটির সন্ধ্যায় ওঁর বাসায় গেলাম। প্রাইমারি স্কুলগুলির দুর্দশা নিয়ে শহরের কাগজে একটি প্রবন্ধ লেখার জন্য তথ্য সংগ্রহই ছিল আমার যাওয়ার উদ্দেশ্য।

একতলার তিনটি ঘরে তিনটি ভাড়াটে পরিবার। একটিতে থাকেন হেড মাস্টার। ঘরে ধূপ জ্বলছে, কম্বলের আসনে বসে উনি একটা কাঠের ডেসকের উপর ঝুঁকে লিখছেন। এক মহিলা পাশে বসে ওঁকে হাত পাখায় বাতাস করে যাচ্ছে। তকতকে ঘরে এমন এক স্নিগ্ধ গাম্ভীর্য বিরাজ করছে, মনে হল হেড মাস্টার যেন পুজোয় বসেছেন।

''আসতে পারি।'' দরজা থেকে বললাম।

ওঁরা দুজনেই অবাক হলেন। হেড মাস্টার সমাদরে ঘরে এনে তক্তপোশে আমাকে বসালেন। বললাম, ''লিখছিলেন, বিরক্ত করলাম।''

উনি বললেন, ''আরে ও কিছু নয়। রোজই লিখি।''

''রোজ লেখেন? উপন্যাস নাকি?'' উনি লাজুক স্বরে বললেন, ''উপন্যাস নয়, আত্মজীবনী।''

''আত্মজীবনী!'' অবাক হলাম।

উনি ডেসকের ডালাটা তুললেন। থরে থরে ১৫—২০টি খাতা, প্রতিটিতে ১—২—৩ নম্বর দেওয়া। বললাম, ''এতো লিখেছেন?''

''সামান্য জীবন, লেখার কিইবা আছে। শুধু বাল্য কৈশোর যৌবন আর প্রৌঢ়ত্বের কিছু ঘটনা।''

হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে পড়লাম। বললাম, ''আপত্তি না থাকে তা একটু পড়ে শোনাবেন?''

মহিলাটি, ওঁর স্ত্রী, কখন যেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন। দরজার বাইরে থেকে তিনি বললেন, ''সাত নম্বরটা শোনাও না।''

হেড মাস্টারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ''আমার যৌবনের খাতা। ওর শুনতে খুব ভাল লাগে।''

তারপর উনি পড়তে শুরু করলেন।

''যৌবন কাহাকে বলে আমি তাহা জানি না। কখন সে আসিল এবং কখনই বা চলিয়া গেল আমি টের পাই নাই। ছয়টি টিউশনি করিয়া কুড়ি টাকা উপার্জন করি। ম্যাট্রিক পাস নহি যে হাই স্কুলে শিক্ষকতা করিব। আমার ইংরাজি জ্ঞান নাহি কিন্তু হাই স্কুল শিক্ষকদিগের অপেক্ষা বাংলা ব্যাকরণে ব্যুৎপত্তি কিঞ্চিত বেশিই, এই গর্ব করিতে পারি। সারাদিন পরিশ্রম করিয়া ক্লান্ত দেহে গৃহে ফিরিয়া আমার স্ত্রী লাবণ্যময়ীকে দেখিলে চক্ষু জুড়াইয়া যাইত। সে পরমা সুন্দরী, তাহার পাশে নিজেকে বড়ই কুশ্রী দেখাইত। তাহার বয়স অল্প, সে নানারূপ সাধ আহ্লাদের জন্য বায়না ধরিত, কিন্তু আমি সামর্থ্যের অভাবে তাহা মিটাইতে পারি নাই। প্রেম ভাষণেও আমি অপটু। লাবণ্যময়ী একদিন পাড়ার এক যুবকের সহিত গৃহত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল। আর ফিরে নাই। এজন্য আমার মনোকষ্ট হয়। তাহার স্মৃতি আজিও ভুলিতে পারি নাই।''

হেড মাস্টার থেমে গিয়ে বললেন, ''এটা থাক বরং ১৩ নম্বরটা পড়ি। কেমন?''

দরজার দিকে তাকিয়ে উনি সম্মতি চাইলেন। ঘোমটা দেওয়া একটা মাথা হেলে পড়ল। হেড মাস্টার শুরু করলেন—

''মধ্য রাত্রে ক্রন্দন শুনিয়া ঘরের দরজা খুলিয়া বাহির হইলাম। দেখি গিন্নিমার পরিচারিকা প্রীতিবালা সিঁড়িতে বসিয়া কাঁদিতেছে। ১৫ দিন হইল সে কাজে যোগ দিয়াছে। আমি এই গৃহে দুই বছর গৃহশিক্ষকরূপে আছি। অনাথা যুবতী প্রীতিবালা কুরূপা তদুপরি খঞ্জ। তাহাকে পীড়াপীড়ি করিয়া জানিলাম, গৃহকর্তা দাস মহাশয় এইমাত্র তাহার কৌমার্য গ্রহণ করিয়াছে। শুনিয়া ক্রোধ হইল। পরদিন সকালে দাস মহাশয়কে ভর্ৎসনা করিলাম। তিনি বলিলেন এ ব্যাপারে আমার নাক গলাইবার প্রয়োজন নাই। আমি বলিলাম, আছে, কারণ তিনি বলপূর্বক এই কুমারীর দেহ কলুষিত করিয়াছেন। ইহা পাপ, ইহা অন্যায়। তখন দাস মহাশয় দারোয়ান দ্বারা আমাকে প্রহারে জর্জরিত করাইলেন, দুইটি দাঁত ভাঙিয়া গেল। অবশেষে গলাধাক্কা দিয়া আমাকে গৃহ হইতে তাড়াইয়া দিলেন। আমি চলিতে শুরু করিলাম। কিয়ৎক্ষণ পর পিছনে তাকাইয়া দেখি পরিচারিকা প্রীতিবালা আমাকে অনুসরণ করিতেছে।''

হেড মাস্টারের স্ত্রী দরজার বাইরে থেকে বললেন, ''ওনাকে চা—টা আগে এনে দিই।''

তাকিয়ে দেখি উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরে যাচ্ছে। আগে লক্ষ্য করিনি উনি খুঁড়িয়ে হাঁটেন।

''নিশ্চয় বিষণ্ণ লাগছে এইসব সামান্য কথা শুনতে।'' লাজুক স্বরে হেড মাস্টার বললেন আর অপ্রতিভের মতো হাসলেন। আমি তখন দেখলাম ওঁর ভাঙা দুটো দাঁতের জায়গায় দুটো জীবন গজিয়ে উঠেছে।

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%