মতি নন্দী
সিঁড়িতে দুজন উঠছে। শব্দের প্রকারে বোঝা যায় প্রতিযোগিতা হচ্ছে ওঠার। তিনতলার ল্যান্ডিংয়ে একজন থেমে খিলখিল হেসে চারতলার সিঁড়ি ধরল। পিছনে তাকিয়ে উঠছেন দুহাতে আঁচলটাকে বুকে চেপে। তবু বাম বাহু উপচে আঁচল লুটোচ্ছে। উত্তেজনার ঝাপটে মুখ রক্তিম। চারতলায় পৌঁছবার মুখে সামনে তাকিয়ে, দেখলেন পাশের ফ্ল্যাটের নির্মলবাবু সঙ্গে একটি পুরুষ ও স্ত্রীলোক ওঁর দিকেই তাকিয়ে চোখে কৌতূহল। সেই সময় সিঁড়ি থেকে অপর প্রতিযোগী হাঁসফাঁস করে বললেন, ''রানু, আস্তে। তোমার হার্টের ট্রাবলটা কাল রাতেও....এভাবে তোমার কিন্তু....।'' উনি পিছনে তাকিয়ে শেষ ধাপ অতিক্রম করে পা রাখতেই আঁচল জড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।
নির্মল এগিয়ে যাচ্ছিল। তার আগেই মহিলা চটপট উঠে লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিজেদের ফ্ল্যাটের দরজায় প্রথমেই দুমদাম কিল বসালেন, কলিংবেলের বোতাম টিপলেন তারপর।
''রানু কোথায় লাগল?'' বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে ওঁর স্বামী উঠে এলেন। প্রথমেই নজরে আসে মাথাজোড়া টাক ও দেহের হৃষ্টপুষ্ট আয়তন। বেড়িয়ে ফিরছেন তাই পরনে হাফপ্যান্ট, স্পোর্টস শার্ট ও কেডস।
''ডাক্তারের বারণ তবুও তুমি'' উবু হয়ে তিনি স্ত্রীর গোড়ালিতে হাত রাখলেন।
''কিছু হয়নি, কিছু হয়নি।'' আরও কয়েকটা অধৈর্য কিল দরজায় পড়ল। কলিংবেলও বাজল। এরমধ্যেই চাপা গলায় একবার বললেন, ''পা ছাড়।''
ঝি দরজা খুলে ভীত মুখে তাকাল।
''ঘুমোচ্ছিলিস নাকি?''
দরজা বন্ধ হবার পর নির্মল বলল, ''আমার প্রতিবেশী। বেশ সুখেই আছে।''
অনন্তর স্ত্রী বলল, ''দুজনের মধ্যে কিন্তু বয়সের তফাত অনেক।''
নির্মল জানাল, ''প্রায় আঠারো বছরের। মিস্টার গুহ নিজেই বলেছেন উনি এখন পঞ্চান্ন, স্ত্রী আটত্রিশ। বিয়ে হয়েছে প্রায় সাত বছর।''
স্বামীকে লক্ষ্য করে অনন্তর স্ত্রী বলল, ''কিরকম ভাইবোনের মতো লাগছে না?''
অনন্ত এতক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে ছিল। স্ত্রীর কথায় কর্ণপাত না করে নির্মলকে বলল, ''ওঁকে কিন্তু চেনা চেনা লাগল, নাম কি রে?''
''কার?''
''মহিলাটির।''
''মালতী গুহ।''
অনন্ত যেরকম মুখভঙ্গি করল তাতে যেন একটা রহস্য চুকে গেল। ''সুখে থাকলেই ভাল। এবার তাহলে চলি। তুই কিন্তু বুধবার অবশ্যই যাবি, কেমন?''
নির্মল ঘাড় নাড়ল। স্ত্রীকে নিয়ে অনন্ত সিঁড়ি ধরল। কয়েক ধাপ নেমেই হঠাৎ ফিরল। নির্মল তখনও দাঁড়িয়ে। বালবটা কম পাওয়ারের। দেওয়াল বিবর্ণ। জানলা দিয়ে রাস্তার গাছগুলো দেখা যায়। এত বড় ফ্ল্যাট বাড়িটায় কোনো সাড়াশব্দ নেই। অনন্তর মনটা ছমছম করে উঠল।
''তোর ভয় করে না একা থাকতে?'' হেসে নির্মল মাথা নাড়ল। অনন্ত নেমে গেল।
ঘরে আলো জ্বলছে। নিবিয়ে দুটো টেবলল্যাম্পই নির্মল জ্বালল। লম্বা টেবল। অভিধানগুলো সার দিয়ে হেলিয়ে রাখা। পাতাগুলো মৃতের চোখের মতো খোলা। ল্যাম্পদুটো বইগুলোর মাঝে ঘাড় নুইয়ে। ঘরের অধিকাংশই চাপ অন্ধকারে ছাওয়া। দেয়াল ঘড়িটা টকটক শব্দ করে চলেছে। অতি ধীরে মাথার উপরে পাখা ঘুরছে। জানলা দিয়ে হাওয়া এলে পর্দাটা ফুলে উঠে থরথর করে কাঁপে। নির্মল তখন সন্তর্পণে তাকায়। স্টিলের আলমারিটা অন্ধকারের কোণায় ঠায় যেন অপেক্ষা করছে।
দেওয়ালজোড়া বইয়ের শেলফ। সে কলম রেখে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
বাইরের দরজায় খুটখুট শব্দ হয়। গয়ারাম দরজা খুলে দিল।
''নির্মলবাবু কি কাজে বসে গেছেন?'' বলতে বলতে পাঞ্জাবি—পাজামাপরা গুহ ঘরে ঢুকলেন।
নির্মল কুঁজো হয়ে বসেছিল। ঘাড় ফিরিয়ে হাসল।
''তখন দেখলেন তো কী জোরে পড়ল।'' চেয়ার টেনে গুহ শুরু করলেন, ''এই নিয়ে একচোট হয়ে গেল।''
''আপনাদের তো রোজই একচোট হয়।''
''কথা তো শুনবে না। ডক্টর সেনগুপ্ত তো বলেই দিয়েছেন পরিশ্রম একদম চলবে না, কমপ্লিট রেস্ট। অথচ দেখলেন তো কিভাবে দৌড়ে উঠল।''
গুহ সুগন্ধি রুমালে ঘাম মুছলেন। নির্মল কলমটা টেবলে ঠুকল।
''আপনার এই ঘরটা কিরকম স্যাঁতসেঁতে লাগে বোধহয় অন্ধকার অন্ধকার বলেই, না?''
''আপনি প্রত্যেকদিনই এ—কথা বলেন।''
''প্রত্যেকদিনই যে এইরকম মনে হয়।'' হঠাৎ টেবলের দিকে ঝুঁকে গুহ বললেন, ''কদ্দূর এগোলেন।'' একটুখানি উঠে টেবলে রাখা পাণ্ডুলিপি দেখতে দেখতে ''ওরে বাবা, ডেথ—এ পৌঁছে গেছেন। অ্যাঁ এখুনি ডেথ, মৃত্যু? নাউন বিশেষ্য, মরণ; জীবনাবসান; হত, ধ্বংসকারী শক্তি; অধ্যাত্মজীবনের অভাব...এটার মানে কী?''
''কিসের?''
''এই অধ্যাত্মজীবনের অভাব?''
চেয়ারে মাথা এলিয়ে নির্মল বলল, ''মানে আর কী, এমনিই।''
''বাঃ অভিধানে কি এমনি এমনি কোনো কথা থাকে?''
''থাকে না? সব কথাই কি আমরা ব্যবহার করি!''
নির্মলের মনে হল, কথা বলতে শুরু করলে এ লোকটা জমিয়ে বসবে। এমনিতেই ক্লান্ত লাগে; তারপর বোকার মতো প্রশ্ন করে যাবে। কাল বলেছিল, আপনি বিয়ে করেননি কেন?
''শব্দ গুনে গুনেই তো পাবলিশার টাকা দেয়, তাই একটু বাড়িয়ে দিলাম।''
গুহ দুই হাঁটু নাড়তে শুরু করলেন। ব্যাপারটা যেন এখন বুঝে ফেলেছেন। ''ফাঁকি দিয়ে লাভ করছেন তাই অধ্যাত্মজীবনের অভাব।''
''আচ্ছা মিস্টার গুহ।'' নির্মল কলম দিয়ে টেবলে টোকা দিতে শুরু করল। গুহ হাঁটু নাড়ানো বন্ধ করলেন। ''আচ্ছা, আপনার কি মৃত্যু—ইচ্ছা হয়েছে?''
সঙ্গে সঙ্গে গুহ সিধে হয়ে বসলেন। ব্যগ্র হয়ে বললেন, ''কেন, কেন, একথা বলার অর্থ?''
''অভিধানে কথাটা আছে তো তাই বললাম।''
নির্মল সন্তর্পণে কলমে ঢাকনা পরাল। ধীরে ধীরে ঘুরে বসল। টেবলল্যাম্প ঘুরিয়ে দিল গুহর দিকে। অস্বস্তিতে চোখ পিটপিট করল গুহ।
''দেওয়ালের আলোটা জ্বাললে হয় না?''
নির্মল যেন শুনতেই পেল না। বারান্দার দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে বলল, ''একদিন তো মরতেই হবে আমাকে আপনাকে আপনার স্ত্রীকে সবাইকেই। সে কথাটা কি ভেবে দেখেছেন? নিশ্চয় ভেবেছেন, কোনো না কোনোদিন ভাববেনই। তখন কি মনে হবে?''
''আলো একটু ঘুরিয়ে দিন না।''
নির্মল একদৃষ্টে গুহর দিকে তাকিয়ে রইল। গুহ হাত বাড়িয়ে ল্যাম্পটা সরিয়ে দিতে গেল। নির্মল ওর নাগালের বাইরে টেনে নিল।
''মনে হবে ভীষণ একা। পৃথিবীর যাবতীয় ব্যাপারই নিরর্থক। যে দৃশ্যকে তারিফ করছি, যে নারীকে ভালবাসছি, যে সন্তানের মঙ্গল কামনা করছি এসবই ক্ষণস্থায়ী। এর পিছনেই ওৎ পেতে রয়েছে ধ্বংস, তাই না?''
নির্মলের কণ্ঠস্বর ঢ্যাপঢ্যাপে শোনাল। গুহ সুগন্ধি রুমালে মুখ মুছে অস্ফুটে বললেন, ''আজ কেমন যেন গরম পড়েছে।''
''হ্যাঁ পাখাটা বাড়িয়ে দিন না।''
গুহ রেগুলেটর টেনে পাখার বেগ বাড়িয়ে এলেন।
''আপনার ঘরে বাইরের হাওয়াও আসে না।''
''হ্যাঁ।'' নির্মল আলোটা ঘুরিয়ে নিল। সঙ্গে সঙ্গে গুহ চাঙ্গা হয়ে উঠলেন।
''কী সব আজে বাজে কথা যে বলেন। সবই যদি নিরর্থক তাহলে এতসব গড়ে উঠত না।''
নির্মল চেয়ারে মাথা হেলিয়ে ক্লান্তভাবে বসে রইল। গুহ আর একটু উৎসাহভরে বললেন, ''আপনার মতো করে যদি সবাই ভাবত, তাহলে এর কিছুই হত না।''
''কী হত না?''
''এই বাড়ি ঘর, রাস্তাঘাট, ছেলেপুলে।''
গুহর গাল ভরতি হয়ে গেছে কথার প্রাচুর্যে, বারকয়েক ঢোঁক গিলে আবার বললেন, ''আসলে কি জানেন, দিনরাত কুঁজো হয়ে চেয়ারে বসে এই একঘেয়ে কাজ করেন, বাইরে তো আমাদের মতো বেরোন না, তাই। একটা কিছু করুন যাতে সুখ—শান্তি পাবেন।''
''সুখী লোকেরাই তো মৃত্যু—ইচ্ছার শিকার হয়। আপনারও হয়?''
গুহ যেন ছুরিকাহত হলেন। ''কী বলছেন, আমি!''
''নিশ্চয় আপনি সুখী একথা অস্বীকার করবেন?''
নির্মল ঝুঁকে পড়ল। যেন ভূপতিত শিকারকে পর্যবেক্ষণ করছে। ''আপনি সুখী নন? আপনার স্ত্রী সুখী নন?''
''নিশ্চয়।'' গুহ শেষ চেষ্টার মতো প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। ''কেন সুখী হওয়াটা কি দোষের?''
''সুখ নিয়ে আপনারা কী করেন? সর্বদাই তো ব্যস্ত সুখকে আগলে রাখতে। এতে কি ক্লান্তি আসে না? তখন কি মনে হয় না আরও বড় সুখ যাতে ক্লান্তি নেই, উদ্বেগ নেই, তার আশ্রয় নেওয়াই ভাল?''
গুহ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। একটি কথা না বলে বেরিয়ে গেলেন।
নির্মল দেওয়াল ঘড়ি দেখল। আজ ওকে বিদায় করতে বেশি সময় লাগেনি। নির্মল কলম খুলে লেখার দিকে তাকাল। ডেথ শব্দটির সঠিক ব্যবহার কীভাবে হয় উদাহরণ দিয়ে একটা বাক্য রচনা করতে হবে।
বইয়ের তাকগুলোর দিকে সে তাকাল। যে—কোনো একটা বই খুললে একটি বাক্য পাওয়া যাবেই। উঠে নামিয়ে আনতে হবে। খুঁজে বার করে লিখতে হবে, অনুবাদ করতে হবে! এর থেকে বরং বানিয়ে একটা বাক্য রচনা করে ফেলা যায়। কিন্তু বাক্যের শেষে ব্র্যাকেটে তাহলে কোনো বড় লেখকের নাম দেওয়া যাবে না। লোকের ধারণা বড় লেখকরাই শুধু শব্দের যথাযথ ব্যবহার জানে। উজবুক আর কাকে বলে। একটা চমৎকার বাক্য লিখে পাশে যদি শেকসপিয়রের নাম বসিয়ে দিই! চিটিং, ঠকানো হবে? কাকে? শেকসপিয়র, না এই অভিধানের পাঠককে! লোকটা তো কবে মরে ভূত হয়ে গেছে, মানহানির মামলা করতে আসবে না।
নির্মল হাসল। বানিয়ে লিখলে মন্দ হয় না। অন্যায় হবে বটে নিজের লেখা অন্যের নামে চালিয়ে দেওয়ায়। কিন্তু তাতে ক্ষতি কী? এতে আমারই সুবিধে কষ্ট করে উঠে তাক থেকে বই আনতে হবে না।
উঠতে হবে না এই ভেবেই নির্মল আরাম বোধ করল। একবার বাথরুমে যাওয়া দরকার। একটু পরে গেলেও চলবে। দুটো পা তুলে দিল, যে চেয়ারে গুহ বসেছিলেন। শব্দ করে আঙুল মটকাল। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় চোখ বুজল।
হঠাৎ চটক ভাঙল প্রচণ্ড শব্দে। একটা জেট বিমান নিচু হয়ে উড়ে যাচ্ছে। পিছনে যেন বিরাট পাথরের চাঙ্গড় বাঁধা। তারই ধাক্কায় বিশ্ব চরাচর চুরমার করতে করতে বিমানটি চলে গেল। সিধে হয়ে বসতে গিয়ে নির্মল টের পায় স্নায়ুকোষের প্রাচীরগুলো ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে। বুকের মধ্যে দপদপ করছে।
কিছুক্ষণ পরেই এই বিধ্বস্তভাব কেটে গেল। ঘড়িটা টকটক করছে। দূরের কোনো বাড়িতে নাছোড়বান্দা বেহালা—বাদকটি আজও সাধনা শুরু করেছে। এই দুটি শব্দ উদ্ধারকারীর মতো নির্মলকে টেনে তুলল। চোখে—মুখে জল দেবার জন্য সে বাথরুমে এল।
দুটি ফ্ল্যাটের বাথরুম পাশাপাশি। এ বাড়ির প্রতি তলাতেই তাই। বাথরুমের জানালায় গরাদ নেই, পাল্লায় ঘষা কাচ লাগানো। জানালা খোলা দেখে নির্মল বিরক্ত হল। পাশের ফ্ল্যাটে চোর ঢুকলে এই জানালা গলে কার্নিসে নামতে পারে। ড্রেন পাইপ ধরে ওপাশে হাত বাড়ালেই পাশের বাথরুমের জানালায় পৌঁছনো যায়। গয়ারামকে জাগিয়ে তুলে বকুনি দেবার ইচ্ছাটি মুলতুবি রেখে সে জানালা বন্ধ করল। চৌবাচ্চায় মুখ ডুবিয়ে দিল।
জলে সন্তর্পণে নির্মল চোখ খুলল। ঘোলাটে আবছা। চৌবাচ্চার তলায় কালো কালো কি সব, সম্ভবত শ্যাওলা। ডান হাতটা নাড়তেই পর্দার মতো কালো কালো শ্যাওলা দুলতে থাকল। মুখ তুলে নিল সে। দম বন্ধ হয়ে আসছিল।
হাওয়ার জন্য নির্মল রাস্তায় ঝুল বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সারি দেওয়া গাছের ডালপালা রাস্তার আলোকে চেপে ধরেছে ভূপৃষ্ঠে। ক্লান্ত হয়ে রাস্তা দিয়ে কেউ চলেছে। ঝুঁকে দেখল, পা টেনে টেনে একটা ষাঁড়। অজস্র নক্ষত্র। কেউ যেন একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে আকাশে চেপে নিবিয়েছে। নির্মল ঠাণ্ডা রেলিংয়ে কপাল ঠেকাল। এই গভীর রাত্রে নিঃসঙ্গতা প্রকট হয় অতি ধীরে।
গুহদের ফ্ল্যাটে নীল আলো জ্বলছে। প্রতিটি ঘরে, দালানেও। মিসেস গুহর ভূতের ভয়। রাত্রে ওঁর নাকি মনে হয় কে এসে গলা টিপে দেবে। মাসদুয়েক আগে ঠিক এইভাবেই নির্মল দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন মিসেস গুহ। নির্মল অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে যায়। গুহর টর্চের আলোয় বারান্দাটা তোলপাড় হয়। পরদিন তিনি জানান কেউ যেন বারান্দা দিয়ে লাফিয়ে পড়তে যাচ্ছিল বলে ওঁর স্ত্রীর মনে হয়েছিল। নির্মল বলেছিল উনি কি রাত্রে জেগে থাকেন এইসব দেখার জন্য? গুহ বলেন প্রতি রাত্রেই ওঁর ঘুম ভেঙে যায়।
একটা কুকুর তারস্বরে চিৎকার করতেই নির্মল শুতে গেল। শেষ রাত্রে ঘুমিয়ে পড়ল। গয়ারাম তুলে দিল ভোরবেলাতেই। প্রকাশক এসেছে। দশ মিনিটেই কথা সেরে নির্মল আবার ঘুমিয়ে পড়ল। এ লোকটিকে আরও একটি হায়ার সেকেন্ডারির নোট বই লিখে দিতে হবে।
বুধবার অনন্তর বড়ছেলের উপনয়ন। সেখানে পরিচিত একজনকে মাত্র নির্মল দেখতে পেল। সুধাংশু, ষোলো বছর কলেজে পড়াচ্ছে। পাঞ্জাবির গলার বোতাম আঁটা, কাঁধে পাট করা চাদর। গালদুটি তোবড়ানো।
''আমাদের আর থাকা না থাকা।''
নির্মলের প্রশ্নের জবাবে উত্তর দিয়েই সে বলল, ''তুমি কলেজ ছাড়লে কেন?''
''এমনি। রোজ একঘেয়ে বলতে ভাল লাগছিল না।''
''বইগুলো তো বেশ ভালই চলছে।''
নির্মল হাসল। প্রায় চার বছর পরে দেখা।
''ছেলেপুলে কটি?''
নির্মল হেসে মাথা নাড়ল।
''একটিও না।'' এবং সঙ্গে সঙ্গে পালটা জিজ্ঞাসা, ''শুনছিলাম একটা টিউটোরিয়াল করেছ?''
সুধাংশু ঘাড় নাড়ল।
''কীরকম রোজগার হচ্ছে?''
''বড্ড খাটুনির কাজ। দুজন পোস্ট গ্র্যাজুয়েটকে রেখেছি। আমার বউও পড়ায়। অঙ্কটা ভালই পারে। বিএ—তে তো অনার্স ছিল।''
সুধাংশুর স্তিমিত চোখে ঔজ্জ্বল্য দেখা দিয়েছে। নির্মল মুখ ফিরিয়ে ঘরের আর এক কোণের আলোচনায় মন দিল। হাসির কথা হচ্ছে।
''অসীমকে তো বললুম এবার তোর বউকে রেস্ট দে, তা হতচ্ছাড়া বলল...।''
বক্তা নিচুস্বরে কিছু বলল, হইচই করে উঠল বাকিরা।
''ওকে তো দেখি সন্ধের পর চৌরঙ্গিতে ঘুরঘুর করে। বউ তো অনেক দিন শয্যাশায়ী।''
অনন্ত ভিতর থেকে এল। ঘামে টসটস করছে। গল্পগুজবের মাঝখানে বসল।
নির্মল মাথা হেলিয়ে সুধাংশুকে জিজ্ঞাসা করল, ''সারাদিনে কী কর?'' কথাটা মাথায় ঢুকল না। সুধাংশু তাকাল অবাক হয়ে ''কী করি মানে?''
''টাকা রোজগার ছাড়া?''
''আবার কী করব?''
হঠাৎ অনন্ত চিৎকার করল, ''এই নির্মল শুনে যা একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তোর প্রতিবেশিনী সম্পর্কে।''
চমকে উঠল নির্মল। এরকম আসরে মিসেস গুহর কথা উঠল কী করে! বলল,—''তুই তো আমার প্রতিবেশিনীকে সেদিন এক মিনিট মাত্র দেখলি।''
''আমাদের আগের পাড়ায় ওরা যে ভাড়া থাকত। বেশ অবস্থাপন্ন, বাপ কোলিয়ারির ম্যানেজার ছিল।''
অনন্তর বন্ধু বলাই যোগ করল—''ওর বড় ভাই তখন বিলেতে গেছে ডাক্তারি পড়তে।''
''তখন ও মালতী দত্ত।'' অনন্ত শুরু করল। ''এখন যেরকম দেখতে তখনও ঠিক হুবহু তাই ছিল। প্রায় কুড়ি বছর তো হল। চেহারা কিন্তু একটুও বদলায়নি। ইন্টারমিডিয়েট পড়ত, ভবদেব নামে একটা ছেলে তখন এম এ পড়ছে, ওকে পড়াত, ছাত্র ভাল। স্কলারশিপের টাকায় পড়ছে।''
''দেখতেও সুন্দর ছিল।'' বলাই যোগ করল।
''তারপর যা হয় প্রেমে পড়ল দুজনেই। জানতে পেরে ধানবাদ থেকে বাপ ছুটে এল। ভবদেবের চাকরি গেল। কলেজে গিয়ে দেখা করত সে সুতরাং মালতীকে তখন পাটনায় পিসির কাছে পাঠানো হল। সেখান থেকেই একদিন ভবদেবের সঙ্গে সটকান দিল।''
''এই তোর গপ্পো! দ্যাখ, ওদিকে কদ্দূর, নটা বেজে গেল।'' বক্তা হাতঘড়ি দেখল। অন্যরাও ব্যস্ততা দেখাল। এইভাবে থামিয়ে দেওয়ায় অনন্ত অপ্রতিভ হয়ে পড়েছিল। এদের খেতে বসানোর উদ্যোগ করতে, তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নির্মল ঠিক করে ফেলল, বলাইয়ের পাশে বসে খেতে খেতে বাকিটুকু জেনে নেবে।
ফিরতে রাত হল। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ই নির্মল টের পেল গুহদের ফ্ল্যাটে গ্রামাফোন বাজছে। ওদের দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলল বাচ্চা চাকরটা।
''সায়েব আছে?''
নেই শুনে নির্মল ভাবল মালতী গুহর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলবে কি না। অনন্তর বাড়ি থেকে এতটা পথ হেঁটে এসে ফুরফুরে লাগছে। গ্রামাফোন বন্ধ হল। খসখস চটির শব্দ। মিসেস গুহ এলেন।
''কী ব্যাপার, উনি তো এখনও আসেননি। অফিসে মিটিং আছে।''
নির্মল এই প্রথম লক্ষ্য করল মালতী গুহ বাড়িতেও ঠোঁটে রং ব্যবহার করেন।
''না, খুব কিছু দরকার নয়। সেদিন আপনার পায়ে লাগল, কেমন আছেন?''
''কোথায় লাগল!'' মালতী গুহ বিস্মিত হলেন। ''ওঁর কথা আর বলবেন না। বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি, ভেতরে আসুন।''
নির্মল দেখল, বসবার ঘরে আগেরবার আসবাবের অবস্থান যেরকম দেখেছিল, এখন আর তা নেই।
''দেখছি, অন্য রকম করে সাজিয়েছেন।''
''হ্যাঁ, এক রকম দেখতে দেখতে চোখ পচে যায়। নতুন করে অ্যারেঞ্জ করলে হয় কি নিজেকেই নতুন লাগে, তাই না?''
জবাব না দিয়ে নির্মল ঘরটাকে খুঁটিয়ে দেখতে থাকল।
''মিস্টার গুহর শিকারের শখটখ এখন আর নেই বোধহয়?''
মালতী গুহও ছবিটার দিকে তাকালেন। বন্দুক হাতে বীরোচিত ভঙ্গিতে তাঁর স্বামী একটা মৃত চিতার মাথায় পা দিয়ে। লক্ষ্য করার বিষয়, গুহর মাথা তখন চুলে ভরা।
''আমিই ওর শখটা ছাড়িয়েছি। আপনিই বলুন বিশ্রী নয় কি, এই অর্থহীন হত্যা?''
''অর্থহীন বলছেন কেন, ওরা তো হিংস্র।''
''ওটা একটা অজুহাত মাত্র। বিবেককে সান্ত্বনা দেওয়া।''
উনি মিটমিট করে হাসছেন। বারান্দা থেকে নিখিল এক সন্ধ্যায় দেখেছিল, গুহ শোবার ঘরের মেঝেয় বাঘ হয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে। খাটে দাঁড়িয়ে মালতী গুহ বন্দুকের মতো ছড়িটাকে বাগিয়ে দুম করলেন। গুহ লুটিয়ে পড়লেন।
খাওয়াটা ভরপেটে হয়ে গেছে।
এখন বিবেক—টিবেক নিয়ে তর্ক পোষায় না। ওটা তো বাইরের জিনিস নয় যে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া চলে।
''বুঝলেন, মিস্টার গুহ আমার ওপর খুব চটেছেন।''
''কেন?''
''ওঁকে বলেছিলাম মানুষমাত্রেই কোনো না কোনো সময়ে মরতে চায়। বিশেষত যারা সুখী। তাইতেই উনি চটেমটে বেরিয়ে গেলেন।''
''ওর কথা আর বলবেন না।''
মালতী গুহ উঠে গেলেন ঘরের কোণে টেবলে রাখা কাচের খাঁচার কাছে। ঝুঁকে রঙিন মাছগুলিকে দেখতে থাকলেন। নির্মলের মনে হল, স্বামীর কথায় অস্বস্তিতে পড়েছেন।
''তখন কী রেকর্ড বাজাচ্ছিলেন? আমি অবশ্য ক্লাসিক গানের কিছুই বুঝি না।''
''আব্দুল করিমের ঠুংরি।''
উনি সিধে হয়ে দাঁড়ালেন। দীর্ঘ দেহ, ঋজু। পাতলা বাদামী চামড়া। দুটি হাত যেন রাজহাঁসের গলা। কুড়ি বছর আগে এই মহিলাটি কতটা আকর্ষণীয়া ছিলেন নির্মল তা অনুমানের চেষ্টা করল। ভবদেবকে দোষ দিলে অন্যায় হবে। ওঁর জন্যে এখনও মৃতেও চোখ খুলবে, কাপুরুষেও আত্মহননের সামর্থ্য দেখাবে।
নির্মলকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে মালতী গুহ আঁচলটাকে বুকে আরও জড়িয়ে বাম বাহু পর্যন্ত টেনে নিলেন। চাবুক খেল নির্মল। কুঁকড়ে গেল সে। সন্দেহ নেই উনি ভেবেছেন এই লোকটা কলুষ চিন্তা করছে। সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা ভারি ভিজে কাঁথায় সে জড়িয়ে গেল। প্রাণপণে তা টেনে ফেলার চেষ্টায় বলল, ''আপনার মতো আমার এক বোন ছিল। মারা গেছে।''
''আহ।''
মালতী গুহ যেন আঘাত পেলেন। ''কী হয়েছিল?''
''নিউমোনিয়া। তখন আঠারো—উনিশ বয়েস। কলেজে পড়ত।''
''ভারি দুঃখের কথা। কেউ মারা গেছে শুনলে এত কষ্ট হয়।''
উনি আলতোভাবে সোফায় বসলেন। চোখে স্নিগ্ধ সহানুভূতি।
''আপনাকে দেখলেই ওর কথা মনে পড়ে। ওর মরার মুহূর্তে আমি পাশে ছিলাম।''
নির্মলের দম বন্ধ হয়ে আসছে। উনি কি বুঝতে পারছেন তার সামনে একটা লোক ভরপেট খেয়ে এসে ডাহা মিথ্যা বলে যাচ্ছে! প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে সে সচ্চচরিত্র।
''আপনাকে খুব ভালবাসতো?''
''হ্যাঁ।''
''এখন কত বয়স হত?''
''আপনারই বয়সি। ঠিক আপনার মতোই লম্বা, গলার স্বর, কথা বলার ভঙ্গিটাও। যখন ওখানে ঝুঁকে মাছ দেখছিলেন, চমকে উঠেছিলাম। মনে হল ও এসে যেন দাঁড়িয়েছে। ভীষণ ভয় লেগেছিল। প্রায় কুড়ি বছর আগে শেষ দেখেছি।''
নিজেকে মুক্ত করতে গিয়ে সে যেন আরও জড়িয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করলে বানিয়ে বানিয়ে এক ঘণ্টা ধরেও বলা যায়। কিন্তু কেন তা বলতে হবে! নির্মল নিজের ওপর রাগতে শুরু করল। এ ধরনের দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। কৈফিয়তের মতো এত কথা বলতে হচ্ছে কেন?
''আপনার বোনের নাম কী ছিল?''
''মিনু, মৃন্ময়ী।''
''অসুখ হল কেন?''
''যেভাবে হয়, ঠাণ্ডা লেগে। রাগ করে সারারাত ছাদে শুয়েছিল। ঝগড়াটা হয়েছিল আমার সঙ্গেই, একটা গল্পের বই নিয়ে।''
''খুব অভিমানী ছিল?''
''হ্যাঁ। জেদীও।''
''নিশ্চয় খুব আদর পেত।''
''বাড়ির একমাত্র মেয়ে ছিল।''
বলেই নির্মল উঠে দাঁড়াল। একটা পচা গন্ধ পেটের মধ্যে পাক দিচ্ছে।
''যাচ্ছেন।''
মালতী গুহও উঠে দাঁড়ালেন। নির্মল অন্যত্র দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। ওঁর কাঁধ রাজহাঁসের গলার মতো। তবে এখন তাকালে ভাববেন না যে লোকটার দৃষ্টিতে নোংরামি আছে। বরং ভাববেন আহা, মৃত বোনকেই দেখছে। এই দেখায় সাহায্য করে বেশ খুশিও বোধ করবেন।
''হ্যাঁ যাই।''
''চা—ও দেওয়া হল না।''
''তাতে কী হয়েছে? তাছাড়া এইমাত্র একটা নেমন্তন্ন খেয়ে আসছি।''
মালতী গুহ দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসে বললেন, ''মাঝে মাঝে তো আসলেই পারেন।''
নির্মল হাসল মাত্র।
গয়ারাম দরজা খুলে দিল। নির্মল ফিরে এসে শুয়ে পড়ল।
সে মাঝরাতে অন্ধকার হাতড়ে টেবলল্যাম্প জ্বালল। ড্রয়ার থেকে নীল প্যাড ও লাল কালির কলম বার করল। কয়েক মুহূর্ত ভেবে বাঁ হাতে ধরে ধরে কয়েকটা কথা লিখল : মালতী, শান্তি পাচ্ছি না কেন। বারবার তোমাকেই শুধু মনে পড়ে। ভবদেব।
শুধু এই কটি কথা। লেখাটার দিকে তাকিয়ে নির্মল হাসছে। কুড়ি বছর আগে ভবদেব আত্মহত্যা করে মরেছে নারীহরণ মামলার আসামী হতে না চেয়ে। মালতী এ চিঠি পাওয়ামাত্রই জানবে অন্য কেউ লিখেছে। অভিধানের খোলা পাতায় চোখ পড়তেই থেমে গেল। দ্রুত বইগুলো বন্ধ করে আলো নিবিয়ে দিল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর তার মনে হল, কেউ যখন দেখতে পাচ্ছে না তখন ভয় পাওয়াটা অহেতুক।
সকালে গুহ এলেন। ভারি চিন্তিত।
''ট্যুরে যেতে হবে কিন্তু কী মুশকিলে পড়লুম বলুন তো! রানু কান্নাকাটি শুরু করেছে।''
''কেন এর আগেও তো গেছেন।''
''তাই তো বললুম। কিন্তু কি হয়েছে, কিছুতেই যেতে দেবে না। খুব জরুরি ব্যাপার। মার্কেটিং কন্ট্রোলার নিজে কাল বাড়িতে ডেকে পাঠিয়ে বললেন।''
গুহ শিশুর মতো তাকিয়ে রইলেন। রাগ চড়তে শুরু করেছে নির্মলের। কিন্তু হেসে বলল, ''কারণটা কী?''
''কী জানি। এরকম মাঝে মাঝে একগুঁয়ে হয়ে যায়। কিছুতেই আমাকে ছাড়তে চায় না। তাছাড়া জানেনই তো ভূতের ভয় আছে। প্রত্যেক রাতেই চমকে চমকে ওঠে।''
''নির্দিষ্ট কারণ যখন নেই, এক্ষেত্রে আমিই বা আপনাকে কী সাহায্য করতে পারি।''
গুহ চলে গেলেন। নির্মল ড্রয়ার তন্ন তন্ন করেও একটা খাম পেল না। নীল চিঠিটা নিয়ে সে বেরোল ডাকঘরের দিকে।
ডাকপিওন সকাল দশটা নাগাদ এ বাড়িতে চিঠি বিলি করতে আসে। পরদিন সাড়ে নটা থেকে নির্মল বারান্দায়। রাত্রে চমৎকার ঘুম হয়েছে। সকালটাও ঝরঝরে। তাছাড়া এইমাত্র একটা স্কুলের বাস গেল। ফুটফুটে একটা ছেলে তার দিকে হাত নেড়ে গেছে।
পিওন আসছে। এ বাড়িতে না ঢোকা পর্যন্ত নির্মল বারান্দায় রইল। তারপরেই ছুটে এসে দরজা প্রায় সিকি ইঞ্চি ফাঁক করে অপেক্ষা করতে লাগল। গুহদের দরজায় লেটার বকসটা দেখা যাচ্ছে।
দোতলায় কলিংবেলের শব্দ হচ্ছে। সায়গলদের চিঠি, ডেকে দিতে হয়। হঠাৎ দরজাটা খুলে যেতেই নির্মল চমকে সরে গেল। গুহ অফিস যাচ্ছেন। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে সে আবার দরজার ফাঁকে চোখ রাখল। তার এই উপস্থিতি বাইরে থেকে টের পাওয়া সম্ভব নয়।
মালতী গুহ দাঁড়িয়ে। খসখসে শব্দটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। ওদের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। নির্মল পিওনের পায়ের শব্দের অপেক্ষায় থেকে বুঝল এতক্ষণে তার ওপরে আসা উচিত ছিল। হতাশ হয়ে সরে আসামাত্র রাস্তা থেকে গুহর চিৎকার শুনল। পা টিপে বারান্দায় এসে নির্মল উঁকি দিল। পিওন চলে যাচ্ছে। গুহর হাতে একটা খাম।
''তোমার চিঠি।''
গুহ খামটা মাথায় তুলে নাড়লেন। মিসেস গুহ বারান্দায়। নির্মল ভিতরে সরে এল। একটা বুরুশ যেন শিরাগুলোর মধ্যে ঘষে যাচ্ছে। ময়লা পলি সাফ হয়ে যাওয়ায় রক্তের ছোটাছুটি বেড়ে গেছে, তাই ঠকঠক করে তার হাত পা কেঁপে উঠল। চেয়ারে হেলান দিয়ে কাঁপাগলায় আর এক কাপ গরম চা দেবার জন্য গয়ারামকে হুকুম দিল।
গুহ আবার এলেন সন্ধেবেলায়। খুব ব্যস্ত।
''আপনার ওডিকোলন আছে? দুপুর থেকেই রানুর ভীষণ মাথা ধরেছে। উঠতে পারছে না।''
''না, নেই।''
গুহ দ্রুত চলে গেলেন। নির্মল মুচড়ে পাক দিয়ে টেবিলের উপর মুখ গুঁজরে পড়ল। কাকপক্ষীতেও ওর হাসি টের পেল না। ঘড়িতে সাতটা বাজল। নির্মল খবরের কাগজ খুলে সিনেমার পাতাটা খুঁটিয়ে দেখতে থাকল। আধঘণ্টা পর শিস দিতে দিতে সে ফ্ল্যাট থেকে বেরোল।
ফিরল প্রায় বারোটায়। রাস্তা থেকে দেখল গুহদের শোবার ঘরে সাদা আলো জ্বলছে। বোধহয় মাথাধরাটা সারেনি। সিঁড়ি দিয়ে পা টিপে টিপে উঠল। টের পেলেই গুহ হয়তো মাথাধরা সারানোর পরামর্শ চাইতে বেরিয়ে আসবে। নির্মল ওদের লেটার বকসটায় আস্তে একটা টোকা মারল।
শুতে যাবার আগে সে নীল প্যাড আর লাল কলম নিয়ে বসল। আটটি খাম কিনেছিল, সাতটা রয়েছে। বাঁ হাতে ধরে ধরে সাতটি চিঠি লিখল। প্রতিটিতে একই কথা। দুদিন অন্তর একটি করে ডাকে ফেললেই দু—সপ্তাহ কেটে যাবে। নির্মল একটি ব্যাপারে ফাঁপরে পড়ল। গুহ ফ্ল্যাটে থাকাকালীন যদি দেখেন দুদিন অন্তর বউয়ের নামে চিঠি আসছে তাহলে নিশ্চয় জিজ্ঞাসা করবেন, নিশ্চয় কৌতূহলী হয়ে লুকিয়ে পড়বার চেষ্টা করবেন। নির্মলের তা মোটেই অভিপ্রেত নয়। দুপুরের শেষে একবার পিওন আসে। সেই ডাকটাকে কাজে লাগাতে হলে কোন সময়ে চিঠি ফেলা দরকার সেটা আবিষ্কার করতে হবে।
বিছানায় শুয়ে নির্মল এই সমস্যাটির কথা ভাবছিল তখন খুব শব্দ করে একটা জেটবিমান উড়ে গেল। বহুক্ষণ ধরে বেহালার যে ক্যানক্যানে সুরটা আসছে তার অবশ্য কোনো হেরফের ঘটল না।
এরপর নির্দিষ্ট দিনগুলিতে পিওন আসার সময় হলেই নির্মল বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দরজাটা সামান্য ফাঁক করে চোখ পেতে দেয়। পিওন বাকসে খামটা ফেলে যায়। উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে সে। ঘরের মধ্যে দ্রুত পায়চারি শুরু করে। আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। বাকসের পাল্লায় চৌকো একটা কাচ লাগানো। ফিকে নীল খামটা রয়েছে বোঝা যায়। নির্মলের তখন ইচ্ছে করে ওদের দরজায় টোকা দিয়ে বলে আসে আপনাদের একটা চিঠি এসেছে। কিংবা একটু পরেই হাজির হয়ে বলে, এই যে এলাম। না এসে থাকতে পারি না। আপনাকে হুবহু আমার বোনের মতো দেখতে।
এর মধ্যে একদিন সে লক্ষ্য করল মিসেস গুহ দুপুর থেকে তাঁদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। স্নান করেননি। চুলে জট। মুখে প্রসাধনের স্পর্শ নেই। দেহটি নুয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে চোখ সরু করে রাস্তার বহুদূর পর্যন্ত দেখছেন। চোখের কোলে অনিদ্রার কালি। রৌদ্রে পুড়তে পুড়তে তিনি কয়েকবার চোখ বুজলেন।
নির্মলের মনে হল, মালতী গুহের অজস্র বয়স। যেন পোকা লেগেছে। ভেতরটা ফোঁপরা হলেও কোনো রকমে খাড়া রয়েছেন। কিন্তু টের পেয়ে গেছেন আর প্রয়োজন নেই। ধীরে ধীরে অলক্ষ্যে চলে যাবার তোড়জোড় চোখের চাউনিতে।
নির্মল ওঁর অবয়বটিকে চোখে ধরে রেখেছে। হঠাৎ মনে হল ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে ওঁর মুখ। চোখদুটি অনুসরণ করছে ক্রমশ এগিয়ে আসা মানুষটিকে। নির্মল বুঝল ডাকপিওন। চতুর্থ চিঠিটি নিয়ে আসছে। প্রবলভাবে রেলিংটা আঁকড়ে ধরেছেন। মাথাটা একটু একটু করে ঘুরে হেঁট হচ্ছে।
তারপর অনেকক্ষণ মিসেস গুহ মাথা তুললেন না। নির্মল স্পষ্ট দেখল, হাঁপাচ্ছেন। একটু পরে হাতে বুক চেপে টলতে টলতে ঘরে চলে গেলেন। নির্মল বারান্দায় এসে বাড়ি থেকে বেরোতে দেখল পিওনকে।
পরদিন দুপুরে গুহ হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলেন। নির্মল তখন বেরোচ্ছিল।
''কী ব্যাপার আপনি এখন?''
''ডক্টর সেনগুপ্তকে কল দিয়ে অফিস থেকে চলে এলাম। রানুর হার্টের ট্রাবলটা আবার...।''
লাফাতে লাফাতে গুহ উঠে গেলেন।
ট্রাম স্টপ থেকে নির্মল ফিরে এল। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঠায় বসে থেকে ঠিক করল কয়েকদিন একদম কাজে বসা হয়নি, শুরু করা যাক। বইগুলো বন্ধ। প্রতিটির পাতা উল্টিয়ে খুঁজে খুঁজে ডেথ বার করল। উদাহরণ প্রয়োগ করে দেখানো হয়নি। উঠে এগিয়ে খুঁজে খুঁজে শেকসপিয়র বার করল। চেয়ারে বসে পাতা উল্টাতে উল্টাতে মনে হল বোধহয় আমার জন্যই মিসেস গুহ অসুস্থ হয়েছেন। কুঁজো হয়ে বসেছিল, মাথাটা টেবলে ঠেকাল। তারপর সে ঘুমিয়ে পড়ল।
তখন রাত প্রায় একটা। দরজার করাঘাতে নির্মলের ঘুম ভাঙল। খুলে দেখে গুহ।
''কীরকম যেন কচ্ছে।''
নির্মলের চোখে তখনও ঘুম। গুহর টাকটাকে তার টুপির মতো মনে হল। বুকে পিঠে লোমগুলো যেন আঠা দিয়ে আঁটা।
''এখন কী করি?''
''ডাক্তারকে কল দিন।''
''দুপুরে গিয়েছিলাম, পাইনি। সকালেই রুগী দেখতে পাটনা চলে গেছেন।''
''আরও তো ডাক্তার আছে। আমাদের এই রাস্তাতেই তো গোটা পাঁচ—ছয় বাড়ির পর একজন আছে। চটপট ডেকে আনুন।'' নির্মল ওঁকে কাঁধ ধরে ঘুরিয়ে দিল। ''রাতটা তো কাটুক। কালকে স্পেশালিস্ট আনবেন।''
ঠেলে দিল সিঁড়ির দিকে। কলের পুতুলের মতো গুহ নেমে গেলেন। ওঁদের ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। নীল আলোগুলো জ্বলছে। সিধে দালানটা অন্ধকার প্রায়। শোবার ঘরে জানালার পর্দায় ছেঁকে সাদা আলোর তলানি দালানে পড়েছে। নির্মলকে পেছন থেকে ঠেলতে ঠেলতে কেউ গুহদের ফ্ল্যাটে ঢুকিয়ে দিল।
পর্দার নিচে কিছুটা ফাঁক রয়েছে। পর্দা সরিয়েই দেখা যেত কিন্তু তা না করে সে উবু হয়ে বসল। খাটটা জানালা থেকে দূরে। বালিশে হেলান দিয়ে মালতী গুহ আধশোয়া। চোখ বন্ধ। দু—হাত বুকে জড়ো করা। মাথা নামানো।
খাঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করার দরকার বোধ করল নির্মল। বদলে ঢোক গিলল। মুখ বিকৃত করে বুক চেপে মালতী গুহ কাত হলেন। অস্ফুট কয়েকটা শব্দ হল। শরীর শ্বাস প্রশ্বাসে কাঁপছে।
নির্মল অকারণে নিজের পিছন দিকে তাকাল। মনে হয়েছিল কেউ যেন পিছনে। খোলা দরজা দিয়ে সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ওখানকার আলো ম্লান।
আর একবার কাতরালেন মালতী গুহ। নির্মল শিউরে উঠল। হঠাৎ ওর মনে হল, যদি মরে যায়। ভাবামাত্রই সে অবশ হতে শুরু করল। শিরাগুলোকে যেন বেছে বেছে আঁটি বেঁধে আলাদা করে রাখা হয়েছে। হাড় আর মাংসের স্তূপ এখন সে। এখন যদি ওকে জানিয়ে দিই, নির্মল ভাবল, আসলে চিঠিগুলো পাশের ফ্ল্যাটের নির্মলবাবুর লেখা। বিশ্বাস না হয় ওর বাঁ হাতের লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেন। ওর ড্রয়ার খুলে নীল প্যাড আর লাল কালির কলম পাওয়া যাবে। এখনও তিনটে চিঠি ওর তোশকের নিচে ডাকে দেবার জন্য রয়েছে। তাতে মালতী গুহর নাম লেখা। এই তথ্যগুলো জানালে কি ওর অসুখ সেরে যাবে?
নির্মল বুঝতে চেষ্টা করল, মারা যাচ্ছেন কিনা। এত বোকা হয় মানুষ, একটুও বুঝল না এ চিঠি কোনো নষ্ট—ভ্রষ্ট জীবিতের লেখা।
''শুনছেন।''
নির্মল আস্তে ডাকল। মনে হচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে কারা উঠে আসছে। দরজার দিকে তাকাল। করিডোরে ম্লান আলো, বিবর্ণ দেওয়াল। সারা বাড়িটা নিঝুম।
''শুনছেন, আমি নির্মল, পাশের ফ্ল্যাটের।''
এবার আর একটু জোরে বলল। বলার সময় মাথাটা দুই গরাদের ফাঁকে চেপে ধরল।
''কে, কে?''
উঠে বসেছেন মালতী গুহ। বিস্ফারিত চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে। বাহিনীর অগ্রবর্তী ড্রামবাদকের মতো পদধ্বনি সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। উত্তেজিত গুহর কণ্ঠস্বর চেনা যায়।
মালতীর চোখ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। ঝিমোবার মতো হয়ে মাথাটা নেমে এল বুকের দিকে। খুঁজে খুঁজে হাত বাড়িয়ে বালিশটাকে কোলের উপর রেখে কুঁজো হয়ে রইলেন।
''আমি নির্মল। আমিই—আমিই।''
''নাহ!'' মালতী মুখ তুললেন। ''আমি বড় ক্লান্ত ভবদেব। আমি অনেক দিন আগলে রেখেছি তোমায়, আর পারছি না।''
মাথাটা আবার বালিশে উনি নাড়তে থাকলেন। নির্মল ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ডাক্তারকে নিয়ে গুহ ফ্ল্যাটে ঢুকেছে।
সেই রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নির্মল দেখল, প্রায় ষাট ফুট গভীর অন্ধকার খাদ বারান্দা থেকে রাস্তা পর্যন্ত নেমে গেছে। লাফিয়ে পড়ার কি কোনো যুক্তি আছে? নির্মল বহুক্ষণ ভেবেও বুঝে উঠতে পারল না, নিশ্চিত নির্বিঘ্নে সুখের আশ্রয় নেবার মতো আদৌ সে ক্লান্ত কিনা!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন