মতি নন্দী
আগের রাতে বাড়ি ফিরে সদরদরজা বন্ধ করতে করতে সুভাষ বলেছিল, ''দালানের আলোটা নিবানো কেন রে?''
''বিকেলে জ্বালতে গিয়ে দেখি জ্বলছে না, বোধহয় বালব কেটেছে।''
ছোট ভাই বিভাস ঘর থেকে চেঁচিয়ে জানায়। একতলার দালানটা দিনের বেলায়ও অন্ধকার, সারাদিনই প্রায় আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এই দালানেরই একধারে রান্না হয়। আলো না থাকলে খুবই মুশকিল।
''একটা নতুন বালব লাগাতে পারিসনি?''
এর কোনো জবাব আসেনি।
''টর্চটা আন তো, দেখি কী হল।''
দেখা গেল বালব ঠিকই আছে। অতঃপর সুইচের ঢাকনা না খুলে দেখাদেখি করতে গিয়ে সুভাষ শক খেল। চমকে উঠে হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বিরক্ত স্বরে বলে, ''সকালে দেখব।''
প্রতিদিন সুভাষ বাজারে যায়। গত সাত আট বছর যাচ্ছে, এখন নেশার মতো হয়ে গেছে। যাবার আগে, মেইন সুইচ বন্ধ করে সুইচটায় পরীক্ষা চালিয়ে জানতে পারল, বোতাম নামাওঠা করলে পিতলের পাতলা চ্যাপ্টা যে দুটো দাঁড়া তারে এসে স্পর্শ করে, তার একটা ভেঙে গেছে। নতুন সুইচ কিনতেই হবে। সঙ্গে সঙ্গে তার মেজাজ অপ্রসন্ন হল।
''ঠিকমতো টিপে জ্বালালে নেবালে এটা আর ভাঙত না। তা তো কেউ—।''
বাবা—মা—ভাই—বোন সবাই বাড়িতে কিন্তু কেউ কথা বলল না। বললেই তর্ক শুরু হয়ে যাবে। বাবা রিটায়ার করার পর সুভাষই এখন পরিবারের কর্তা হিসাবে গণ্য হতে শুরু করেছে। বাজে বা অযথা খরচ কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই সে পছন্দ করে না।
বাজারের বাইরে ট্রাম রাস্তায়ও একটা বাজার বসে। সুভাষের ধারণা সেখানে টাটকা সবজি সস্তায় পাওয়া যায়। আজ সে রাস্তায় বসা এক ডিমওয়ালার কাছ থেকে ছ'টি ডিম কিনল। ঝুড়ির প্রায় গুটি পনেরো ডিমের মধ্য থেকে নিজে হাতে সে বেছে নিল, যেগুলি তার চোখে বৃহদাকার মনে হয়। ফেরার পথে একটি সুইচ কিনল, তিন চার রকম দামের মধ্য থেকে মাঝারি দামের একটি। তখন তার মনে হয়েছিল, এই আড়াই টাকা ফালতু খরচ হত না যদি ঠিকমতো সুইচটা ব্যবহার করা হত।
বাড়িতে ইলেকট্রিকের, কাঠের, জলের পাইপ, কলকব্জা সিমেন্টের ছোটখাট মেরামতি কাজ সুভাষ নিজেই করে। এতে সে আনন্দ পায়। তাছাড়া মিস্ত্রি খরচও বাঁচে। সুইচটা মিনিট পনেরোতেই সে বদলে ফেলল।
তারপর খবরের কাগজে প্রথম পাতা ও খেলার পাতায় চোখ বুলিয়েই স্নান করতে গেল। কলঘর থেকেই তার কানে এল মায়ের বিস্মিত খেদোক্তি ''হায় পোড়া কপাল, কী ডিম এনেছে—দুটো পচা বেরোল—'' মিনিট খানেকের মধ্যেই, ''ওমা এটাও যে পচা!''
ছ'টির মধ্যে তিনটি পচা। ঠকে যাওয়া তার জীবনে এই প্রথম নয়, কিন্তু শতকরা পঞ্চাশ, এটা যথেষ্ট বড় আকারেরই ঠকা। যখন থেকে সে নিজেকে পরিণত, বুদ্ধিমানরূপে মনে করতে শুরু করেছে, তারপর এতবড় অপ্রতিভতা সে বোধ করেনি।
গা মুছতে মুছতে সে ডিমওলার মুখটা মনে করার চেষ্টা করল। গৌরবর্ণ, লম্বাটে, বড় চোখ; দাড়ি গোঁফ নেই, সাদা শার্ট আর সবুজ লুঙ্গি, বছর আঠাশ কি ত্রিশ। অত্যন্ত সরল মুখ, কম কথা বলে। চাহনি দেখে মনে হয়েছিল শহরের সঙ্গে যথেষ্ট সড়গড় নয়। ডিমের জোড়া বলেছিল বাজারের থেকে দশ পয়সা কম। তাইতেই সে প্রলুব্ধ হয়। এবং অভ্যাসমতো আরও পাঁচ পয়সা কম দর দেয়।
ডিমওলা মাথা নাড়ে।
''না বাবু ও দামে দিতি পারব না।''
সুভাষ চলে যাবার জন্য, অবশ্যই ভান করে, মন্থরভঙ্গিতে কয়েক পা এগিয়ে যখন প্রত্যাশিত 'নিয়ে যান বাবু' ডাকটি শুনতে পেল না তখন নিজেই ফিরে আসে।
কলঘর থেকে বেরোবার আগে সে নিজের মন্দ কপালকেই দোষ দিল। তার ভাগ্যই তাকে নিয়ে গেল ঠকার দিকে। কিন্তু সে নিজের উপর রেগে উঠল এইভাবে চিন্তা করার জন্য। ভাগ্য, বরাত, কপাল এসব শব্দগুলো তার কাছে দুর্বল মনের সাফাই ছাড়া কিছু নয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সে একটা যুক্তি খাড়া করল।
পনেরো কুড়িটা ডিমের মধ্যে, পচা একটা বা দুটো থাকতেই পারে। সেটাকে দুর্ঘটনা বলা যেতে পারে কেন না ডিম এমনই জিনিস বাইরে থেকে তার ভালমন্দ বোঝা যায় না অবশ্য জলে ফেলে দিয়ে বা মুঠোর মধ্যে রেখে আলোর দিকে দূরবীনের মতো ধরে একরকম পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু শতকরা পঞ্চাশই খারাপ পাওয়াটা দুর্ঘটনা নয়, এটা ভাগ্যের ব্যাপার নয়, জেনেশুনে ইচ্ছাকৃতই।
কলঘর থেকে যে রাগটা নিয়ে সে বেরোল, তার বশেই সে ডিম খেল না।
''কালই ও বেটার কাছ থেকে তিনটি তুলে নিয়ে আসব। দেখে বোঝার উপায় নেই—কি গোবেচারা মুখ। চাষাভূষোরা নাকি সরল হয়! বোগাস।''
ঘরের ভিতর থেকে বাবা চেঁচিয়ে বলল, ''ব্যাটারা সব চালাক হয়ে গেছে।''
বাবা সওদাগরি অফিস থেকে অবসর নিয়ে যে টাকা পেয়েছে তার এক চতুর্থাংশ এম এস সি পাঠরতা ঝর্নার বিয়ের জন্য রেখে বাকিটা মানিকতলায় এক কো—অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির সদস্য হয়ে দফায় দফায় জমা দিয়েছে একটি ফ্ল্যাটের মালিক হবার জন্য। তিন দফায় মোট সত্তর হাজার টাকা ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়ে গেছে। বাড়িটি হবে চারতলা, এখন তিলতলার ছাদ ঢালাই চলছে। চিঠি এসেছে আরো দশ হাজার টাকা অবিলম্বেই চাই, পনেরো দিনের মধ্যে। এর জন্য অবশ্য সুভাষ প্রস্তুতই ছিল কেন না, সে বিবেচক ও হিসেবি, সে জানে, গৃহনির্মাণের জিনিসের দাম যে হারে বাড়ছে তাতে এই ফ্ল্যাট তৈরির ব্যয় নব্বুই হাজার থেকে সওয়া লক্ষ টাকায় পৌঁছবেই। এবং সোসাইটিও ঘন ঘন টাকা চাইবেই। তাই সে দুমাস আগেই অফিস থেকে তিরিশ হাজার টাকা ঋণ পাবার জন্য দরখাস্ত করে এবং গত সপ্তাহে তা মঞ্জুরও হয়ে গেছে।
বাবা এখন প্রতি দুপুরেই ফ্ল্যাট বাড়ি নির্মাণের কাজ পর্যবেক্ষণ ও সোসাইটির কর্মকর্তাদের নানাবিধ পরামর্শ দিতে যায়। সাংসারিক খরচ কমিয়ে সুভাষের অফিসের ঋণ শোধ দেওয়ার জন্য কি কি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সে সম্পর্কেও অবিরত টিকটিক শুরু হয়েছে। বি এ পড়া বিভাস জিনসের ট্রাউজার্স কেনার জন্য দুশো টাকা চাওয়ায় বাবা এবং সুভাষও মর্মাহত হয়েছিল।
দুই ভাই পাশাপাশি ভাত খাচ্ছিল। বিভাস এতক্ষণ পর কথা বলল, ''ইচ্ছে করেই যে ঠকিয়েছে কী করে জানলে? ও লোকটাও কিনে এনে বেচছে, ওকেও ঠকিয়েছে। ডিমের ভাল খারাপ দেখে কি কেনা সম্ভব?''
''কে বলল সম্ভব নয়। জলে ফেললেই বোঝা যাবে, ভালগুলো ভাসবে আর পচাগুলো ডুববে। কিন্তু জলের বালতি নিয়ে আমার পক্ষে তো বাজার করা সম্ভব নয়।''
''ও লোকটার পক্ষেও সম্ভব ছিল না।''
ভিতর থেকে বাবার স্বগতোক্তি শোনা গেল, ''বিভু বাজে তর্ক করে।''
তিনটে ডিমের ওমলেট বানিয়ে টুকরো করে তাই দিয়ে ঝোল রান্না হয়েছে। মা'র অনুনয়ে কর্ণপাত না করে সুভাষ উঠে পড়ল।
''ব্যাটা জেনেশুনেই পচা ডিম এনে বেচেছে, কাল ধরব।''
হাত ধোবার সময় সুভাষ আবার বলল, ''যাদের কাছ থেকে কিনেছে তারাও নিশ্চয় জেনেশুনেই ওকে দিয়েছে, অত ডিম তো আর ওর নিজের ঘরের নয়—তার মানে ঠকানোর ব্যাপারটা দুহাত ঘুরে এল। আমিই শেষ লোক, আমি আর কাউকে ঠকাতে পারছি না।''
সুভাষ হাসবার চেষ্টা করল। ডিমওলার উপর রাগের সঙ্গে নিজের জন্য এক ধরনের করুণা, অসহায়তা ও অনিশ্চিতবোধ পলকের জন্য অনুভব করল। সেই সময় 'আমিই শেষ লোক' এই বাক্যটি তার মাথা থেকে নেমে এসে শিরা উপশিরার মধ্য দিয়ে তার অস্তিত্বে ছড়িয়ে গেল। সে আবছাভাবে ভয় পেল। একসময় সে শেয়ার ট্যাক্সিতে অফিস যেত। কিন্তু ফ্ল্যাটের জন্য ব্যয়সঙ্কোচ করতে আর ট্যাক্সি চড়ে না। এতে সে মাসে প্রায় চল্লিশ টাকা বাঁচাতে পারছে। বাসে ওঠার সময় সুভাষের স্বতঃস্ফূর্ত সজীবতা নষ্ট হয়ে প্রবল বিরক্তিতে এবং মানুষের প্রতি বিদ্বেষে মনপ্রাণ প্রতিদিনই ভরে ওঠে। আজও তাই হল। নিজে ঠেলে এবং অপরের ঠেলায় সে এবং অন্য আরোহীরা মিলে একটা মাংসের চাপ বাঁধা জমাট কিমায় পরিণত হয়ে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য এবং ব্যক্তিত্ববোধ হারাবার পর সুভাষের ঝিমোনি আসে, নানাবিধ গন্ধে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ প্রণালীগুলি অসাড় হয়ে যায়।
কন্ডাক্টরকে দু'টাকার একটা নোট সে দিল। ফেরতে খুচরোর সঙ্গে হাতে পেল টিকিট এবং ময়লা ন্যাতার মতো জীর্ণ এক টাকার একটি নোট।
''এটা বদলে দাও।''
কন্ডাক্টর নোটটির দিকে তাকালও না। কাঁধের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে আর একজনের কাছ থেকে ভাড়া নিতে নিতে বলল, ''কেন, খারাপ কি আছে? আমিও তো ওটা প্যাসেঞ্জারের কাছ থেকেই পেয়েছি। ছেঁড়া তো নয়। আপনাদের দেওয়া জিনিস আপনারাই যদি না নেন....''
সুভাষের পিছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর বলল, ''আজকাল একটাকা, দু'টাকার এত ময়লা যাচ্ছেতাই নোট বাজারে হঠাৎ যে কোথা থেকে এল!''
সুভাষ কোনো তর্ক বিতর্কে গেল না। একটা চিন্তায় সে কাঁটা হয়ে রইল। এই নোটটা তাকে গছাতে হবে। সে যেন এর শেষ মালিক না হয়।
বাস থেকে নেমে অফিস পর্যন্ত, দুটি পান সিগারেটের দোকান। দুটিতেই দোকানি এবং তাদের সহকারীরা সুদর্শন ও সুবেশ, ব্যবহার বিনীত, নম্র এবং ক্ষিপ্র। সুভাষের আড়ষ্টতা এল এদের সামনে নোংরা নোটটি বাড়িয়ে দিতে হবে ভেবে।
সিগারেট বা পান সে কদাচিৎ খায়। শুধু নোটটি ভাঙাবার বা এর থেকে রেহাই পাবার জন্যই সে প্রথম কিছু কিনতে চায়। অফিসের গেটের ধারে একটা কাঠের ডালায় সিগারেট নিয়ে বসেছে যে রুগণ যুবকটি তার পোশাক, স্বাস্থ্য ও সওদার দারিদ্র ও মুখের সরল অসহায়তা দেখে সুভাষ নোটটি ব্যবহার করতে মায়া বোধ করল। হয়তো ও ইতস্তত করে ভয়ে ভয়ে নোটটি প্রত্যাখ্যান করবে, তখন তো কন্ডাক্টরের সংলাপই তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসবে।
সুতরাং নোটটি তার কাছে রয়েই গেল হয়তো বরাবরের জন্যই। চিন্তাটা মাঝেমাঝে খচ খচ করল টিফিন পর্যন্ত।
সুভাষ বাড়ি থেকে কিছু আনে না টিফিন সময়ে খাওয়ার জন্য। অফিসে একতলায় সিঁড়ির পাশে ছোট দোকান থেকে প্রতিদিনের মতো দুটি টোস্ট এবং আলুরদম তাকে দিয়ে গেল। খেতে খেতে সে লক্ষ্য করল কিছুদূরের টেবলে প্রবীণ শৈলেশ ঘোষাল অ্যালুমিনিয়াম কৌটো থেকে চামচে করে ছানা তুলে মুখে দেবার আগে প্রতিবার বিড়বিড়িয়ে কিসব বলে নিচ্ছে। ব্যাপারটা সে আগে কখনও লক্ষ্য করেনি।
হঠাৎ তার সঙ্গে ঘোষালের চোখাচোখি হল। আধ মিনিট পর আবার। বিব্রত হয়ে ঘোষাল বলল, ''আজ দুধ পেয়েছ?''
''কী দুধ?''
''গরমেন্টের হরিণঘাটার দুধ।''
''আমরা নিই না। বাড়িতে দিয়ে যায় গয়লা।''
''আজ আমরা দুধ পাইনি।''
কিছুক্ষণ পর ঘোষাল একই স্বরে বলল, ''তোমাদের ফ্ল্যাট কত করে পড়ল?''
''শেষ হোক, তখন বলা যাবে। তবে যেভাবে বিলডিং মেটিরিয়ালের দাম বাড়ছে...''
সুভাষ থেমে গেল, বহুবার এসব কথা সে বলেছে।
''হুঁ, শুধু সিমেন্ট লোহা কেন সব জিনিসেরই। আজ দোকান থেকে ছানা কিনলুম, কেমন যেন বাসী টক টক লাগছে। তুমি অবাক হবে শুনলে, কত দর জানো এখন?''
সুভাষ ক্লান্ত বোধ করল। এসব কত জায়গায় কতবার শুনতে হয়।
''ঘোষালদা আপনি ছানা খাবার সময় মনে মনে কি বলছিলেন যেন?''
''হুঁ।''
''মন্তরটন্তর?''
''ওই, সেই রকমই। এই হপ্তাটা বৃষরাশির পক্ষে ভাল নয়। তোমার কী রাশি?''
''জানি না।''
''কোষ্ঠি নেই তোমার?''
''না।''
''জন্মতারিখ আর সময়টা জান?''
''মা জানে সময়টা—কিন্তু বৃষরাশির পক্ষে হপ্তাটা ভাল নয় কেন?''
শৈলেশ ঘোষাল জবাব না দিয়ে কৌটোটা ধুতে গেল। ফিরে আসতেই সুভাষ বলল, ''আমার কি রাশি বলতে পারেন?''
''কী করে বলব!''
''আমার আজ দিনটা ভাল যাচ্ছে না। গচ্চচা দিয়েছি।''
শৈলেশ ঘোষাল ভ্রূ তুলে প্রশ্ন করল চোখ দিয়ে।
''আজ সকালে একটা ডিমওয়ালা....'' মিনিট তিনেকের মধ্যে সুভাষ, বাজার—ডিমকেনা, রাতে শক খাওয়া, সুইচ কেনা, বাসের কন্ডাক্টর এবং একটু ইতস্তত করে সিগারেট না কেনার কারণগুলো বলে দিল।
''তোমার উপর চন্দ্রের আর বুধের প্রভাব আছে তাই এত সফট হার্টেড।''
শুনে ভাল লাগল তার।
শৈলেশ ঘোষাল বুকপকেট থেকে একটা ফর্দের মতো লম্বা কাগজ বার করে কিছুক্ষণ ধরে চোখের সামনে ধরে রইল।
''শরীরে কোনো উৎপাত তিন চারদিনের মধ্যে হয়েছে কি?''
সুভাষ দ্রুত 'না' বলেই যোগ করল, ''উৎপাত বলতে কী বোঝাচ্ছেন?''
''মাথাধরা, হাড়গোড় ব্যথা, অর্শ, সর্দি—ইনফ্লুয়েঞ্জা, পেটখারাপ?''
পেটখারাপ শব্দটা সুভাষ অপছন্দ করে। পাকস্থলির অপটুতার সঙ্গে খাদ্যের প্রতি লোভের যোগাযোগ থেকে উৎপন্ন একধরনের দুর্বলতা এই পেটখারাপ থেকে বেরিয়ে আসে।
''আজ শরীর ঠিক আছে। শুধু বাস থেকে নেমেই একটা ঢিবিতে ঠোক্কর খেয়ে আঙুলে ব্যথা হয়েছিল, এখন নেই।''
শৈলেশ ঘোষাল কয়েক সেকেন্ড সপ্তর্পণে ভেবে নিয়ে বলল, ''মানসিক আঘাতটাঘাত?''
''এই আজ হল।''
''না না এ ধরনের নয়, এটা তো আর্থিক ক্ষতির ব্যাপার। কারুর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি, মনোমালিন্য?''
''প্রেমট্রেম? কোনো মেয়ের সঙ্গে আমার আলাপই নেই।''
''ভুল বোঝাবুঝি কি শুধু মেয়েদের সঙ্গেই হয়? তুমি বাংলা নভেল পড় নাকি?''
''তাহলে আর কার সঙ্গে হবে?''
''আমার সঙ্গে হতে পারে, ইউনিয়নের সঙ্গে, জি—এমের সঙ্গে, বাবা—মা'র সঙ্গে।''
''তা হতেই পারে।''
ফর্দটার সঙ্গে আবার কিছুক্ষণ পরামর্শ করে বলল, ''নতুন কোনো লোকের সঙ্গে গত দুদিনের মধ্যে আলাপ পরিচয় হয়েছে?''
''না।''
বলেই সুভাষ ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবল, সত্যিই কারুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে কি না। বেঁটে চশমাপরা রুগণ একটা লোকের সঙ্গে বাজারে প্রায়ই চোখাচোখি হয়। গতকালই লোকটা স্তম্ভিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ''দশ পয়সায় ছ'টা কাঁচালঙ্কা....মানে হয়? কোন দেশে বাস করছি?'' তাইতে সে বলেছিল, ''তাও দেখবেন ঝাল নেই।''
একে কি আলাপ পরিচয়ের পর্যায়ে ধরা যায়? এর আগে একদিন লোকটা নিজের মনেই দমদম দাওয়াই দেবার জন্য সুভাষের পাশের একটি লোককে বলছিল : ''সবাই মিলে না করলে একা একা হয় না। এভাবে চললে বাঁচব কী করে মশাই!'' তখন লোকটা বারকয়েক তার দিকে তাকিয়েছিল। সে অবশ্য চোখ সরিয়ে নেয়।
''আচ্ছা সুভাষ, বিশেষ কোনো সূত্র থেকে কোনো উপকার পেয়েছ কি, তিন—চারদিনের মধ্যে?''
''উপকার বলতে কী বোঝাচ্ছেন?''
''ধারটার পাওয়া, কি কোনো ফেভার! আজই বাসে এক চেনা লোককে দেখলুম পিছন দিকের লম্বা সিটে। আমাকে চোখের ইশারায় ডাকল, ভিড় ঠেলে গেলুম তার কাছে। জানাল এক্ষুণি নামবে। আমিও তৈরি হলুম। যেই উঠল টুক করে বসে পড়লুম। এটাও এক ধরনের উপকার। কিংবা বোনের জন্য পাত্র খুঁজছ, কেউ হয়তো খোঁজ দিল।''
''তিন চারদিন আগে গ্লোবের করিডোরে দাঁড়িয়ে ফোটোগুলো দেখছি, হাউসফুল। এক ভদ্রলোক বলল তিন আশির টিকিট আছে। ব্ল্যাকে নয় ঠিকদামেই, নিয়ে ফেললুম। কী দুর্দান্ত অভিনয়—আর ফোটোগ্রাফি!''
''তোমার রাশি বোধহয় বৃষ।''
''তাহলে?''
''তাহলে আর কি....''
শৈলেশ ঘোষাল ফর্দটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ''এই হপ্তায় যা যা হবার তার অনেকগুলোই মিলে গেছে। শুধু অনর্থক ঝামেলায় জড়িয়ো না আর অপ্রত্যাশিত কোনো সুযোগ আসার যোগ রয়েছে।''
সুভাষের মনে হল, ময়লা একটাকার নোটটা চালাবার সুযোগ হয়তো সে পাবে আর অনর্থক ঝামেলা মানে বাজারে দেখা হওয়া বেঁটে লোকটার কথাবার্তা শোনা। দল পাকাতে চায় দমদম দাওয়াই দেবার জন্য। লোকটাকে অত্যন্ত রাগীই মনে হয়। জিনিসের দাম বাড়লে কী আর করা যাবে!
প্রডাকশন কি ডিস্ট্রিবিউশনের ভার তো মাছওলা, আলুওলা, লঙ্কাওলার হাতে নয়। পলিটিক্যাল নেতারা যদি কোরাপ্ট হয় তাহলে তো এরকম হবেই।
টিফিনের পর সুভাষ বাকি সময়টা নিজের সঙ্গেই মনে মনে তর্কবিতর্ক করল এবং অনর্থক ঝামেলা ও অপ্রত্যাশিত সুযোগ সম্পর্কে তীক্ষ্ন হয়ে উঠল।
শৈলেশ ঘোষাল আর সে এক সঙ্গেই ছুটির পর বেরোল।
''ঘোষালদা, যে কাগজটা দেখে বলছিলেন সেটা কী?''
''পাঁচ—ছ'টা খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনে যে রাশিফল বেরোয় তাই থেকে কনসাল্ট করে কমন ফ্যাক্টরগুলো মিলিয়ে আমি একটা তৈরি করি।''
''মেলে?''
''দেখ না দু—তিনটে দিন কী হয়।''
''ঘোষালদা আপনারও বৃষ?''
''হ্যাঁ।''
''অনর্থক ঝামেলায় পড়ার ভয় তাহলে আপনারও রয়েছে।''
''ছানাটা মনে হচ্ছে ভাল ছিল না। অম্বল হতে পারে।''
বিরক্ত সন্ত্রস্ত মুখ নিয়ে শৈলেশ ঘোষাল রাস্তার ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হল।
এবার সে ধীরগতিতে হেঁটে যাবে বিবাদী বাগ। মিনিবাসের লাইনে দাঁড়াবে এবং বাসে চড়ে বাড়ি যাবে। তার নিত্যদিনের সূচি এটাই।
''কী রে সুভাষ।''
চমকে সে তাকিয়ে দেখল তার কলেজের বন্ধু ধীরেন একটু ঝুঁকে একটা অ্যাম্বাসাডার মোটরের জানালা দিয়ে তাকে দেখছে। দুটো হাত স্টিয়ারিংয়ে।
''বাড়ি যাবি তো তাহলে উঠে আয়। আমি এয়ারপোর্ট যাব।''
প্রথমেই তার মনে পড়ল, এটাই সেই অপ্রত্যাশিত সুযোগ। সে গাড়িতে উঠে ধীরেনের পাশে বসল।
''কাউকে রিসিভ করতে যাচ্ছিস নাকি।''
''বউ ছেলেমেয়ে আসছে দিল্লি থেকে। ওখানেই শ্বশুরবাড়ি। বল আছিস কেমন, প্রায় বছর সাত—আট পরে দেখা, তাই না?''
এইভাবে ধীরেন শুরু করল এবং গাড়ি চালাতে লাগল। শরীর, চেহারা, বয়স, সংসার, বিয়ে ইত্যাদি নিয়ে কথাবার্তা হতে হতেই সুভাষ বুঝে নিল ধীরেন এখন স্ত্রী পুত্রকন্যা নিয়ে খুবই ভাল আছে। যথেষ্ট অর্থ নিয়ে নাড়াচাড়া করে।
''কচ্ছিস কী, ব্যবসা?''
''কেমিক্যালস।''
''বাড়ি করেছিস?''
''ফ্ল্যাট কিনেছি গড়িয়াহাটায়, আয় না একদিন। তবে এই সপ্তাহে নয় কালই বাঙ্গালোরে যাচ্ছি।''
সময় করাই তো মুশকিল, তুই থাকিস দক্ষিণে আমি উত্তরে। রোববারটা কাটাই..., আমি একটা ফ্ল্যাট নিচ্ছি, এখন হাফওয়ে স্টেজে, ওখানেই কাটাই।''
''কত পড়ল?''
''কমপ্লিট হলে জানা যাবে?''
সুভাষ এরপর কিছুতেই আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না এতক্ষণ যে হীনভাব দ্বারা আচ্ছন্ন হচ্ছিল তাই থেকে বেরিয়ে আসতে।
''সোয়া লাখ তো অলরেডি দিয়েছি।''
''কত স্কোয়ার ফিট?''
''চোদ্দশো।''
''বেশ বড়ই!''
''মোটামুটি। .....গাড়িটা কি সেকেন্ডহ্যান্ড কিনেছিস? আমি একটা খুঁজেছি।''
''এটাই নে না। আমি একটা সেভেনটিসেভেন মডেলের পাচ্ছি। নতুনের যা দাম আমাদের মতো লোকেদের পক্ষে আর কেনা সম্ভব নয়। ছোট শালা একটা কিনল, প্রায় আশি হাজারের মতো পড়েছে। নিস তো চল্লিশেই দেব।''
সুভাষ স্বচ্ছন্দভাবেই ব্যাপারটাকে এতক্ষণ ধরে রেখেছিল। ধীরেনের প্রস্তাবটা সে আশা করেনি।
''তোকে পরে জানাব।''
ধীরেন এই নিয়ে আর কথা বাড়ায়নি। তাইতে সুভাষ অনর্থক এক ঝামেলা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেল। তাকে নামিয়ে দিয়ে ধীরেন দমদমের দিকে চলে গেল। বাস ও ট্রামের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, ধীরেনের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং লিফট পাওয়া নিশ্চয়ই অপ্রত্যাশিত ঘটনার অন্তর্গত হওয়া উচিত। ঘোষালদা মোটামুটি ঠিক।
সন্ধ্যাবেলায় সে খবরের কাগজ খুলে বার করল সেই জায়গাটা যেখানে সপ্তাহের রাশিফল ছাপা হয়। বৃষরাশিতে দেখল ঘোষালদা যা যা বলেছে তাই রয়েছে, এমনকি 'অনর্থক ঝামেলা এড়িয়ে চলুন' কথাটা পর্যন্তও। শুধু একটা নতুন কথা সে পেল, 'আপনার দ্বারা কেউ উপকৃত হবে।'
কে উপকৃত হবে এবং কিভাবে সে উপকার করবে! সুভাষ খুবই ধাঁধায় পড়ে গেল। সে গত সোমবার থেকে খতিয়ে দেখার চেষ্টা করল, কারুর উপকার করেছে কি না। সে কোনো বৃদ্ধকে বাসে সিট ছেড়ে দেয়নি, কোনো অন্ধকেও হাত ধরে রাস্তা পার করে দেয়নি কেন না এরকম সুযোগ সে পায়নি। এমনকি কোনো আহতকেও পায়নি হাসপাতালে পৌঁছে দিতে। সে কোনো ডুবন্তকে জল থেকে তোলেনি, অবধারিত গাড়ি চাপা থেকেও কাউকে রক্ষা করেনি। কেউ তার কাছে টাকা ধার চায়নি, কোনো কাজ উদ্ধারের বা তদ্বিরের জন্যও কেউ তাকে বলেনি।
পচা ডিম কিনে ডিমওলাকে লাভবান হবার সুযোগ দেওয়া কি, প্রায় অচল নোট নিয়ে কন্ডাক্টরকে রেহাই দেওয়ার মতো ব্যাপারকে সে উপকারের পর্যায়ে ফেলবে কি না বুঝে উঠতে পারল না। তাহলে আর কিভাবে অন্যকে উপকৃত করা যায়? অবশ্য এখনও এই সপ্তাহের একটা দিন বাকি রয়েছে।
এমন সময় মা ঘরে ঢুকে দ্বিধাভরে কাছে এল।
''তাহলে কী বলব? একেবারে স্পষ্টাস্পষ্টি তো বলা যায় না মেয়ে পছন্দ হয়নি।''
''বলে দাও না ছেলে বলেছে, বোনের বিয়ে না দিয়ে বিয়ে করবে না, তাহলেই ল্যাঠা চুকে যায়।''
''যদি বলে, আমরা অপেক্ষা করব!''
''করে করুক।''
''তাই কখনো হয়....মেয়ে কিন্তু খারাপ নয়, আমি তো দেখে এসেছি, গড়নপেটন ভাল, লম্বা, চুলও খুব, রঙও ফর্সা। ...কত দেবে থোবেও, ছ'ভরি সোনা, স্টিলের আলমারি, খাবার টেবল, খাট—বিছানা, সোফা, ফ্রিজ কিংবা টিভি—র যে কোনো একটা, তাছাড়া বৌভাতের খরচ পাঁচ হাজার টাকা নগদ। আজকালকার দিনে এও জিনিস। বাপের এক মেয়ে তো দিতে কার্পণ্য করবে না।''
এরপর মা নিগূঢ় এক রহস্য উন্মোচনের মতো ফিসফিস করে বলল, ''ঝর্নার বিয়েতে আমাদের যা দিতে হবে সেগুলো তো পেয়ে যাচ্ছি। কম উপকার হবে?''
উপকার শব্দটা ঢং করে ঘড়ির মতো সুভাষের মাথার মধ্যে বেজে উঠল। আশ্চর্য, রাশিফলেও বলেছে কেউ উপকৃত হবে! উপকার হবে সংসারের। ঝর্নার জন্য ওই সব জিনিসের অনেকগুলো কিনতে হবে না আর। কম করে হাজার বারো—চোদ্দ টাকা তো বেঁচে যাবে! সেটা লাগানো যাবে ফ্ল্যাটে।
টিক টিক করে চিন্তা শুরু হয়ে গেল সুভাষের। দুমাস আগে এই সম্বন্ধটা নিয়ে এসেছিল পিসিমা। সদ্য তখন সে অফিসার গ্রেডে প্রমোশন পেয়েছে। শুনেই 'না' বলে দিয়েছিল কেন না সে নিজেকে রুচিমান, আধুনিক, পরিশীলিত রূপে গণ্য করে। যারা পণ নেয় তাদের সে বর্বর ছাড়া আর কিছু ভাবে না। কিন্তু সেটা তো দুমাস আগের কথা।
এখন সে যদি শুধুমাত্র 'হ্যাঁ' কিংবা 'আচ্ছা' একটি মাত্র শব্দ মুখ থেকে বার করে তাহলেই একটা পরিবার উপকৃত হয়ে যায়। এটা তাকে চমৎকৃত এবং মুগ্ধ করল।
মা অপেক্ষা করছে।
সুভাষ অত্যন্ত গম্ভীরতর অথচ উদাসীনভাবে বলল, ''দুর্গাপুর থেকে ছেলেপক্ষ আর কিছু জানিয়েছে কি?''
''আর কী জানাবে, সব তো পাকা হয়েই আছে। ঝর্নার পরীক্ষাটা হলেই...বলছিলুম কী ওর বিয়েটা একটু পিছিয়ে তোরটা আগে হলে উপকারটা হয়।''
আবার উপকার! সুভাষ মনে মনে নড়েচড়ে উঠল। এখন তার মনে হচ্ছে পরিবারের উপকারের জন্য পণ বা যৌতুক না নেওয়ার নীতি ত্যাগ করলে কিছু আসে যায় না। সে না নিলে অন্য কেউ তো নেবেই। তাছাড়া সে নিজের আরাম বিলাসের জন্য তো নিচ্ছে না! ওসব দুর্গাপুর যাবে।
''আচ্ছা, কাল জানাব। আজ রাতটা ভেবে দেখি।''
মা খুশি হয়েই দ্রুত বেরিয়ে পাশের ঘরে অপেক্ষমাণ বাবার কাছে গেল। সুভাষও নিশ্চিন্ত হল রাশিফল অনুযায়ী উপকার করার সুযোগ হাতে পেয়ে।
পরদিন সকালে সে বাজার যাবার পথে ভাবল, ডিমওলাকে দেখলেই তো তার মাথার রক্ত চড়ে যাবে এবং ঝুড়ি থেকে গোটা চার পাঁচ ডিম তুলে নিয়ে কি ফাটিয়ে ফুটিয়ে সে অনর্থক ঝামেলায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে। ব্যাপারটা ভাবতেই সে নিজেকে নিয়ে ভয় পেল। রাশিফল বলেছে না জড়াতে। অনেকগুলোই তো মিলে গেছে সুতরাং এটাও এড়িয়ে যাওয়া ভাল। এইভাবে সে অন্য পথে বাজারে ঢুকল।
আলু, মাছ, পান ইত্যাদি কিনতে কিনতে সে বাজারের এক প্রান্ত থেকে যখন অন্য প্রান্তের দিকে এগোচ্ছে তখন সেই বেঁটে চশমপরা রুগণ লোকটিকে চিৎকার করতে দেখল।
''নিশ্চয় ওজন মেরেছে, এই কটা পেঁয়াজ আড়াইশো গ্রাম হতেই পারে না।''
''যান না মশাই, অন্য জায়গা থেকে ওজন করিয়ে দেখুন না।''
''বেশ তাই দেখব।''
লোকটা রাগে কাঁপতে কাঁপতে সামনের ডালের দোকানে যেতেই ডালওলা হাত নেড়ে বলল, ''অন্য কোথাও যান, ওজনটোজন করতে পারব না।''
লোকটা তারপাশে মুদির দোকানে গেল। সে শুধু মাথা নেড়ে, নিরাসক্ত চোখে তাকিয়ে রইল। লোকটা এবার পর পর তিনটি দোকানে গেল এবং প্রত্যাখ্যাত হল। তার আড়াইশো গ্রাম পেঁয়াজ ওজনে ঠিক না কম সেটা কেউ তাকে মেপে দিতে রাজি নয়।
অদ্ভুত অসহায় অপ্রতিভ চোখে লোকটা ফ্যালফ্যাল করে চারধারের লোকেদের মুখে একের পর এক তাকিয়ে বিড়বিড় করল। তারপর হঠাৎ থলির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে এক মুঠো পেঁয়াজ বার করে পেঁয়াজওলার মুখে ছুঁড়ে মারল।
এরপর যা ঘটল তা মোটেই অভাবনীয় নয়। পেঁয়াজওলা লাফিয়ে তার মাচার মতো জায়গাটা থেকে নামল। তার পাশের দু—তিনটে দোকান থেকেও লোক নামল এবং লোকটার মুখে বুকে পেটে তারা ঘুষি মারতে থাকল।
সুভাষ খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটাকে রক্ষা করার জন্য দু তিন পা এগিয়েও সে থেমে পড়ল। এগুলোই অনর্থক ঝামেলা, লোকটা নিজেই ডেকে এনেছে সুতরাং ও একাই ঝামেলাটা পোহাক।
এই ভেবে সে বাকি কেনাকাটা সেরে রাস্তায় বেরিয়েই দেখল সামনেই বসে গতকালের ডিমওলাটা। ওকে দেখে তার একফোঁটাও রাগ হল না, এমন এক বিস্ময়কর বোধের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে সে দেখল ডিমওলাটা সরলভাবে হেসে তাকে বলছে, ''বাবু, আজ ডিম নেবেন না?''
সুভাষ ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে বলল, ''কাল তোমার তিনটে ডিম পচা ছিল।''
ডিমওলার মুখ যেন লজ্জায় ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
''বাবু আমি কী করবো....আমারে দ্যাছে আমি তাই আনি বেচতিছি। আমার মাফ করে দ্যান বাবু। আপনি বরং আজ নে যান ডিম, দাম দিতি হবে না।''
ওর ভীত সন্ত্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে এবং কথাগুলো শুনে সুভাষের মনে হল রাশিফল সত্যিই মিলে যাচ্ছে। এই একটা অপ্রত্যাশিত সুযোগ যা সে কদাচিৎ পায়।
''থাক, ডিম আজ দরকার নেই। আর একদিন নেব তবে পুরো পয়সা দিয়েই।''
সুভাষ অপ্রত্যাশিত একটা সুখ নিয়ে বাড়ি ফিরল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন