প্রত্যাবর্তন

মতি নন্দী

লোকটা আজও এসেছে। এই নিয়ে পরপর পাঁচদিন।

''কী জন্য আসে বলতো এই ভোরবেলায়?'' পল্টুকে বললাম। ''কাল দেখছিলাম আমাদের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে আবার হাসছিলও।''

ফুটবলটা মাটিতে ধাপাতে ধাপাতে পল্টু নিমগাছতলাটার দিকে তাকাল। লোকটা ওইখানে বসে রয়েছে। ওইখানেই আমরা পোশাক বদলাই, বুট পরি ও খুলি, প্র্যাকটিসের পর বিশ্রাম নিই, সঙ্গে নিয়ে আসা খাবার খাই। এত ভোরে কারখানার এই মাঠটায় আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ আসে না। অবশ্য আসার উপায়ও নেই। সারামাঠ পাঁচিলে ঘেরা। শুধু এক জায়গায় পাঁচিলটা ভাঙা। শ্রম ও সময় বাঁচাবার জন্য আমরা সেই ভাঙা জায়গা দিয়েই মাঠে ঢুকি। মাঠ থেকে লোকালয় প্রায় সিকি মাইল দূরে। এ তল্লাটে চার—পাঁচ মাইলের মধ্যে ফুটবল খেলার এতবড় মাঠ আর নেই। আমার দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় এই লোহা—কারখানার ফোরম্যান। তার সুপারিশে ম্যানেজারের কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছি সকালের প্র্যাকটিসের। এ বছর থেকে আমরা দুজনেই ফার্স্ট ডিভিশনে খেলব তাই উৎসাহটা বেশিই। গরম পড়তে না পড়তেই প্র্যাকটিস শুরু করে দিয়েছি।

''পাগল—টাগল হবে বোধহয়।'' পল্টু এর বেশি কিছু বলল না।

গাছতলায় দুজনের ব্যাগ আর বলটা রেখে লোকটাকে গ্রাহ্যের মধ্যে না এনে আমরা প্রায় নগ্ন হয়েই খাটো প্যান্ট পরলাম। বুট পরতে পরতে একবার তাকালাম খোঁচা খোঁচা আধপাকা দাড়িওয়ালা, অপরিচ্ছন্ন শীর্ণকায় আধবুড়ো লোকটির দিকে। দুজেনই ঘড়ি খুলে ব্যাগে রেখেছি। আমরা মাঠের মধ্যে থাকব আর এই লোকটা থাকবে ব্যাগ দুটোর কাছে, মনে হওয়া মাত্র অস্বস্তি বোধ করলাম। ঘড়ি পরেই থাকব কিনা ভাবলাম। পল্টুর পক্ষে অবশ্য সম্ভব নয় কেন না সে গোলকিপার খেলে। ওকে প্রায়ই মাটিতে ঝাঁপ দিতে হয়। লোকটাকে যে অন্য কোথাও বসতে বলব, তাতেও বাধো বাধো ঠেকল। ওর সর্বাঙ্গে দারিদ্র্যের তকমা আঁটা থাকলেও, বসার ঋজু ভঙ্গিতে ঝকঝকে চাহনিতে বা গ্রীবার উদ্ধত বঙ্কিমতায় এমন একটা সহজ জমকালো ভাব রয়েছে, যেটা ছিঁচকে—চোর সম্পর্কে আমার ধারণার সঙ্গে একদমই মেলাতে পারলাম না।

লোকটি শিশুর কৌতূহল নিয়ে আমাদের বুটপরা দেখছে। এই ক'দিন খয়েরি লুঙ্গি আর সাদা হাওয়াই শার্ট পরে আসছিল, আজ দেখি পরনে ঢলঢলে কিন্তু ঝুলে খাটো, মোটা জিনের নীল পাজামা। বয়লার বা মেসিনঘরের শ্রমিকরা যে—রকমটি পরে। চকোলেট রঙের কলার দেওয়া ফ্যাকাসে হলুদ রঙের সিল্কের যে গেঞ্জিটা পরেছে সেটাও ঢলঢলে। মনে হয় অন্য কারুর পাজামা ও গেঞ্জি পরে এসেছে।

''আপনারা অ্যাংক্লেট পরলেন না যে?'' লোকটির হঠাৎ প্রশ্নে আমরা দুজনেই মুখ ফেরালাম। পল্টু গম্ভীর স্বরে বলল, ''পরার কোনো দরকার নেই, তাই। ওতে সুবিধের থেকে অসুবিধে বেশি হয়।''

লোকটির চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। আমাদের পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ''কে বলল সুবিধে হয় না, পরে কখনো খেলেছেন?'' কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা না করেই আবার বলল, ''বড় বড় প্লেয়াররা সবাই অ্যাংক্লেট পরেই খেলেছে—সামাদ, ছেনে, জুম্মা, করুণা—কই ওদের তো অসুবিধে হয়নি! ওদের মতো প্লেয়ারও তো আর হল না।''

''আর হবেও না, কেন না খেলার ধরনই বদলে গেছে।'' এবার আমিই জবাব দিলাম।

''গেলেই বা! শু্যটিং, হেডিং, ড্রিবলিং, ট্যাকলিং, পাসিং, এসব তো আর বদলায়নি!'' লোকটি মিটমিট করে হেসে আবার বলল, ''আজকাল হয়েছে শুধু রকমারি গালভরা নামওলা সব আইডিয়া। সেদিন এক ছোকরা আমায় ফোর—টু—ফোর বোঝাচ্ছিল। আরে এতো দেখি সেই আমাদের আমলের টু—ব্যাকেরই খেলা! হাফ—ব্যাক দুটো নেমে এলেই তো ফোর ব্যাক—''

ওর কথা শেষ হবার আগেই আমি আর পল্টু নিজেদের মধ্যে চাওয়া—চাওয়ি করে মাঠে নেমে পড়েছি। রোজই প্রথমে আমরা মাঠটাকে চক্কর দিয়ে কয়েক পাক দৌড়ই। শুরু করার আগে পল্টু চাপা স্বরে বলল, ''গুলিখাওয়া বাঘ। অ্যানাদার ফ্রাসট্রেটেড ওল্ড ফুটবলার।''

পাশাপাশি ছুটতে ছুটতে ঘাড় ফিরিয়ে দুজনেই লক্ষ্য করছিলাম লোকটাকে। এক সময় দুজনেই থেমে পড়লাম। বলটা গাছতলাতে রেখে আমরা দৌড়তে নেমেছি। ইতিমধ্যে সেটিকে নিয়ে লোকটা কাল্পনিক প্রতিপক্ষদের কাটাতে ব্যস্ত। প্রায় ছ'ফুট লম্বা লগবগে শরীরটাকে একবার ডাইনে আবার বাঁয়ে হেলাচ্ছে, পায়ের চেটো দিয়ে বলটাকে টানল, বলটাকে লাফিয়ে ডিঙিয়ে গেল, ঘুরে গিয়ে প্রচণ্ড শট করার ভান করে পা তুলে আলতো শটে বলটা ডানদিকে ঠেলে দিয়ে ঝুঁকে যেন সামনে দাঁড়ানো কাউকে এড়িয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে দেখতে লাগল বলটা গোলে ঢুকছে কিনা। বলটা গড়াতে গড়াতে থেমে যেতেই দু'হাত তুলে হাসতে শুরু করল। মনে হল প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের ভ্যাবচ্যাক মুখগুলো দেখে হাসি সামলাতে পারেনি।

পল্টুকে বললাম, ''বোধহয় এককালে খেলত।''

নকল আতঙ্ক গলায় ফুটিয়ে পল্টু বলল, ''সেরেছে। মিলিটারিদের সঙ্গে খেলার গপ্পো শুরু করবে না তো!''

''তোর এইসব বাজে ধারণাগুলো মাথা থেকে তাড়া।'' ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললাম, ''সে আমলে সত্যিই অনেক ভাল ভাল প্লেয়ার ছিল।''

''হ্যাঁ ছিল। গোরারা তাদের ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপত। তারা তিরিশ—চল্লিশ গজ দূর থেকে মেরে মেরে গোল দিত। রেকর্ডের খাতা খুলে দ্যাখ সেই সব শটের কোনো পাত্তাই মিলবে না। বড়জোর এক গোল কি দুগোল, আর বাবুরা খেতেন পাঁচ—ছ গোল।'' এই বলে পল্টু আমার জন্য অপেক্ষা না করেই আবার ছুটতে শুরু করল।

আমি মাঠের বাইরে লোকটার দিকে তাকালাম। এক পায়ে দাঁড়িয়ে অন্য পায়ে বলটাকে মেরে মেরে শূন্যে রাখার চেষ্টা করছে। তিন—চার সেকেন্ডের বেশি পারছে না। অবশেষে বিরক্ত হয়ে বলটাকে লাথি মেরে মাঝখানে পাঠিয়ে দিল। যখন শু্যটিং প্র্যাকটিস শুরু করলাম লোকটা মাঠে এসে দাঁড়াল। কারখানার মেল্টিং শপের দেয়ালটায় খড়ির দাগ টেনে পোস্ট এঁকে নিয়েছি। ক্রসবারটা কাল্পনিক। যে সব বল পল্টু ধরতে পারে না, দেয়ালে লেগে মাঠে ফিরে আসে। লোকটা তুমুল উৎসাহে ছোটাছুটি করে সেই বল ধরে, যেন ছাত্রদের সামনে শু্যটিং—এর টেকনিক বোঝাচ্ছে এমন কায়দায় পা দিয়ে মেরে আমায় ফিরিয়ে দিতে লাগল আর সমানে বকবক করে চলল।

''উঁহুঁহুঁ, উপর দিয়ে নয়, মাটিতে সবসময় মাটিতে রাখতে হবে... উপরে তোলা মানেই গেল, নষ্ট হয়ে গেল!'' ঊর্ধ্বশ্বাসে বল ধরতে ছুটে গেল। ''আজকাল তো সেইসব ক্ল্যাসিক থ্রু পাস দেখতেই পাই না, কুমারবাবু দিতেন।'' আবার ছুটে গেল। ''সেদিন ছোকরাটাকে বলছিলুম, যে ফোর—টু—ফোর বোঝাচ্ছিল... আরে বাবা ছক কষে কি ফুটবল খেলা হয়... মাটিতে মাটিতে, তুলে নয়... হ্যাঁ এখন অনেক বেশি খেলতে হয় বটে, সে কথা আমি মানি, খাটুনি বেড়েছে... হল না হল না থ্রু দেবার সময় পায়ের চেটোটা ঠিক এইভাবে, দিন বলটা আমায় দিন দেখিয়ে দিচ্ছি।''

বলটা ওকে দিলাম। দূর থেকে পল্টু খিঁচিয়ে উঠল, ''আমি কি হাঁ করে ভ্যারেন্ডা ভাজব? শট কর শট কর।''

লোকটি অপ্রতিভ হয়ে তাড়াতাড়ি বলটা আমার দিকে ঠেলে দিল। ''দমাদম গোলে বল মারলেই কি ফুটবল খেলা হয়, স্কিলও প্র্যাকটিস করতে হয়।'' এই বলে লোকটি ক্ষোভ প্রকাশ করল বটে কিন্তু বল ধরে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ বন্ধ করল না। পা ফাঁক করে কুঁজো হয়ে দৌড়ে, বলটাকে ধরেই কাউকে যেন কাটাচ্ছে এমন ভঙ্গিতে পায়ে খেলিয়ে নিয়ে যেন মহার্ঘ একটি পাস দিচ্ছে, আমার সামনে বলটা বাড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করল, ''শু্যট শু্যট।'' গড়ানে বলেই শট করলাম, ঝাঁপিয়ে পড়া পল্টুর বগলের তলা দিয়ে বলটা প্রচণ্ড গতিতে দেয়ালে লেগে মাঠে ফিরে এল। ''গো—ও—ল...ল।'' বলে লোকটি হাত তুলে লাফিয়ে উঠল। শটটির নিখুঁতত্বে আমি তখনও চমৎকৃত। লোকটি উত্তেজিত স্বরে চেঁচিয়ে বলল, ''কাকে থ্রু বলে দেখলেন তো। আর এই জিনিস আপনারা খেলা থেকে কিনা তুলে দিয়েছেন! আজকাল কী যে ম্যান—টু—ম্যান খেলা হয়েছে, বিউটিই যদি না থাকে তাহলে—''

আমি দেখলাম পল্টু মুখ লাল করে ছুটে আসছে। শিউরে উঠলাম। পল্টুর মাথা অল্পেই গরম হয়। সামান্য উস্কানিতেই ঘুষোঘুষি শুরু করে।

''আমরা এখানে এসেছি প্র্যাকটিস করতে,'' ভারী গলায় পল্টু বলল। ''আপনাকে তো আমরা ডাকিনি তবে কেন গায়ে পড়ে ঝামেলা করছেন। খেলা যদি শেখাতে চান, তবে অন্য কাউকে ধরে শেখান। প্লিজ আমাদের বিরক্ত করবেন না।''

পল্টু গটগট করে ফিরে গেল নিজের জায়গায়। লোকটি অবাক হয়ে পল্টুর দিকে তাকিয়েছিল। দেখলাম ক্রমশ মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে এল। মাথা নামিয়ে গাছতলার দিকে যখন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ওর ঢলঢলে নীল পাজামা আর কুঁজো পিঠটার দিকে তাকিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া শ্যাওলাধরা একটা পাথরের কথাই মনে এল। আমরা যখন নিমগাছতলায় বসে খাচ্ছিলাম, লোকটি তখন উঠে গেল। খেতে খেতে পল্টু শুরু করল আমাদের নতুন ক্লাবের ফুটবল সেক্রেটারির মেয়ের গল্প। নিয়মিত খেলা দেখে। প্লেয়ারদের সঙ্গে এখানে—ওখানে ঘোরে এবং কার কার সঙ্গে তাকে কোথায় কখন দেখা গেছে, পল্টু যখন তার ফিরিস্তি দিচ্ছিল তখন হঠাৎ চোখে পড়ল লোকটি ধীরে ধীরে ছুটতে শুরু করেছে মাঠটাকে পাক দিয়ে। ঠিক আমরা যেভাবে ছুটি। আমার সঙ্গে পল্টুও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।

একপাক শেষ করে যখন আমাদের সামনে দিয়ে ছুটে গেল, দেখি জ্বলজ্বলে চোখ দুটি কঠিন দৃষ্টিতে সামনে নিবদ্ধ। আমাদের দিকে বারেকের জন্যও তাকাল না। সরু বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। নিঃশ্বাস নেবার জন্য মুখটা খোলা। পিছন থেকে শীর্ণ ঢ্যাঙা দেহের উপরে কালির পোঁচড়ার মতো চুলভর্তি মাথাটাকে নড়বড় করতে দেখে হাসিই পেল। কিন্তু পরক্ষণেই কষ্ট হল আধবুড়ো লোকটির ওই ধরনের ছেলেমানুষী প্রয়াস দেখে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, ও নিজেকে আমাদের সমান প্রতিপন্ন করতে যেন চ্যালেঞ্জ দিয়েই ছুটছে বয়সের বাধা ঠেলে ঠেলে। মনে মনে চাইলাম, ছেলেমানুষের মতো এই অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ত্যাগ করে এখান থেকে ও চলে যাক।

''টেঁসে না যায়, তাহলে আবার হুজ্জুতে পড়তে হবে।'' পল্টুর স্বরে সত্যিকারের উৎকণ্ঠা কিছুটা ফুটল। লোকটা দেড় পাক ছুটেই দাঁড়িয়ে পড়েছে। মুখ তুলে হাঁ করে আছে। চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। মনে হল আমাদের দিকে বারকয়েক আড়চোখে তাকালও। হয়তো কোলাপস করে পড়ে যেতে পারে ভেবে আমি উঠে দাঁড়ালাম। লোকটি সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হাঁটার ভঙ্গিতে পাঁচিলের ভাঙা জায়গাটার দিকে এগিয়ে গেল। তাই দেখে আবার কষ্ট পেলাম। পল্টু হো হো করে হেসে উঠল।

দিন ছয়—সাত লোকটি এল না। আশ্বস্ত হয়ে ভাবলাম আর বোধহয় আসবে না। কিন্তু লোকটি এল, সঙ্গে তিন—চারটি তালিমারা ঢ্যাবঢেবে একটি ফুটবল নিয়ে। আমরা যথারীতি প্র্যাকটিস করতে লাগলাম আর তখন সে মাঠের অপরদিকে নিজের বলটা নিয়ে কাল্পনিক প্রতিপক্ষদের নাজেহাল করায় ব্যস্ত রইল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই দেখলাম, বলটিকে পায়ের কাছে রেখে সে আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। একবার বলটা ওর দিকে গড়িয়ে যেতেই চোখদুটো চকচক করে উঠল। সামনে ঝুঁকে এগোতে গিয়েও প্রাণপণে নিজেকে যেন ধরে রাখল।

''কদিন দেখিনি যে আপনাকে?'' বললাম নিছকই সৌজন্যবশত।

''শরীরটা খুব খারাপ হয়েছিল।'' গম্ভীর হয়ে বলার চেষ্টা করল।

ওকে খুশি করার জন্য বললাম, ''দেখুন তো থ্রুগুলো ঠিক হচ্ছে কিনা।''

একটু পরেই ও চেঁচিয়ে উঠল, ''ওকি ওকি! হচ্ছে না।'' আমি ফিরে তাকাতেই আবার বলল, ''চটপট করতে হবে, কিন্তু কম স্পিডে। কিক করার সময়ও তাই। পায়ের পাতার ওপর দিক দিয়ে। বুটের ডগা মাটির দিকে—এইরকম ভাবে। তারপর ফলো—থ্রুটা হবে—এই রকম! করুন তো একবার।''

ফার্স্ট ডিভিশনে খেলতে যাচ্ছি আর এখন কিনা শু্যট করার প্রাথমিক নিয়ম এইরকম একটা লোকের কাছ থেকে শিখতে হবে ভাবতেই বিরক্তিতে মন ভরে উঠল। ওকে অগ্রাহ্য করে আগের মতনই শু্যট করতে লাগলাম। বার দুয়েক চেঁচিয়ে ও চুপ করে গেল। বুঝতে পারছি লোকটির একজন চেলা দরকার, যে ওর উপদেশ শুনবে, মান্য করবে, আমরা যে ওর কথা অনুযায়ী কাজ করব না সেটা নিশ্চয়ই বুঝে গেছে।

পরদিন সকালে বৃষ্টি পড়ছিল। আমরা মাঠে এসে দেখি চেলা জুটে গেছে। থপথপে বোকা চেহারার একটা ছেলে বৃষ্টির মধ্যে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে, বল নিয়ে লোকটার লম্ফঝম্ফ মনোযোগ করে দেখছে। ওর পাগলামি আর উৎসাহ দেখে অবাক হলাম। কিন্তু বৃষ্টির জল গায়ে বসবার স্বাস্থ্য বা বয়স ওর নয়। পল্টুকে বললাম, ''নির্ঘাত নিউমোনিয়া হবে লোকটার।''

''হোক। কিন্তু এটাকে কোত্থেকে ধরে আনল, একটা হাঁদা গোবর—গণেশ! সারা জীবনেও তো খেলা শিখতে পারবে না।''

দূর থেকেই আমরা শুনতে পেলাম লোকটির নির্দেশ দেওয়া। যেন ক্লাস লেকচার দিচ্ছে। ''বলের উপর দিয়ে যদি এইভাবে যাও''—ছোট্ট একটা লাফ—''তাহলে কিসসু হবে না। তোমায় করতে হবে কি এইভাবে... তারপর এইভাবে নিয়ে যাবে। তাহলে দোনামনায় পড়বে তোমার অপোনেন্ট।''

ছেলেটি একাগ্র হয়ে দেখছে আর প্রত্যেক কথায় ঘাড় নেড়ে যাচ্ছে কিন্তু লোকটি ওকে বল নিয়ে চেষ্টা করতে বলছে না। ''এইবার দেখাচ্ছি কিভাবে পায়ের চেটো দিয়ে পাস দিতে হয়।'' ঢ্যাপঢ্যাপে বলটা কাদায় আটকে গেল। লোকটি ছুটে গিয়ে ড্রিবল করতে করতে বলটাকে আনল। ছেলেটি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। বৃষ্টির ফোটা থুতনি দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। চুল কপালে লেপটে। শার্টের ভিতর থেকে গায়ের সাদা চামড়া ফুটে উঠেছে। ''এইবার দেখো ডগা দিয়ে কী করে বল তুলতে হয়।'' তুলতে গিয়ে পা পিছলে লোকটি পড়ে গেল। ছেলেটি কিন্তু হাসল না। বরং লোকটিই হেসে উঠল। এই সময় হঠাৎ বৃষ্টির বেগ বাড়তে আমরা প্র্যাকটিস বন্ধ করে ফিরে গেলাম। যাবার সময় দেখি লোকটি ছেলেটির চারপাশে বল নিয়ে ঘুরছে আর নাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে।

পরদিন পল্টু প্র্যাকটিসে এল না। চোট পেয়ে ওর হাঁটু ফুলে উঠেছে। একাই হাজির হলাম মাঠে। নিমগাছতলায় লোকটি বসে। চেলাটি তখনো আসেনি। আমায় দেখে হেসে বলল ''আর একজন কই?''

কারণটা বললাম। তারপর কথায় কথায় ওর কাছে জানতে চাইলাম, কী করেন কোথায় থাকেন এবং ফুটবল খেলতেন কোন ক্লাবে। উত্তর দিতে ওর খুব আগ্রহ দেখলাম না। শুধু জানলাম মাইলদুয়েক দূরে ভটচায পাড়ায় ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন। অবিবাহিত। যুদ্ধে গেছলেন। ফিরে এসে কারখানায় ওয়েল্ডারের কাজ করেন। প্লুরুসি হওয়ায় কাজ ছেড়ে দেশের বাড়িতে গিয়ে যৎসামান্য জমিজমা নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। এখন আর ভাল লাগছে না তাই ছোটভাইয়ের কাছে এসেছেন, কিন্তু এখানেও নানান অসুবিধা—অশান্তি। ভাবছেন, আবার দেশেই ফিরে যাবেন।

''হাঁ খেলতুম।'' কাশতে শুরু করল। পিঠটা বেঁকে গেল কাশির ধমকে। বারকয়েক থুথু ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। ''বরাবর বুট পরেই খেলেছি। একবছর কালীঘাটেও ছিলুম, জোসেফ খেলত তখন। নাম শুনেছেন ওর?''

আমি মাথা নাড়লাম। কী একটা বলতে যাচ্ছিল আবার কাশি শুরু হতেই থেমে গেল। গতকাল বৃষ্টিতে ভেজার মাশুল। এই দুর্বল শরীরে আজ যদি খেলা দেখাতে মাঠে নামে তাহলে নির্ঘাত মারা পড়বে, এই ভেবে ওকে বললাম, ''আজ বোধহয় আপনার শিষ্যটি আসবে না। বরং আপনি বাড়িই ফিরে যান।''

''না, না, আসবে, ঠিক আসবে। বলেছি ওকে ফুটবলার তৈরি করে দেবই, তাতে যদি জীবন যায় তো যাবে। আমি যে পদ্ধতি নিয়েছি তার আর মার নেই। বুঝলেন, যে—কোনো বস্তুর উপরে যদি ইচ্ছার প্রভাব ছড়ানো যায় তাহলে সফল হবেই।'' দুবার কেশে নিয়ে আবার বলল, ''বস্তুটি যদি কাঁচা হয়, তার মানে যদি অল্পবয়সী হয় তাহলে যে কাউকেই দুর্দান্ত প্লেয়ার করা যাবে। আমার এখন বয়স হয়ে গেছে, নয়তো নিজের উপরই পদ্ধতিটা পরখ করতাম।''

ছেলেটিকে ভাঙা পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে আসতে দেখলাম। লোকটি তখন মাঠের অন্যধারে প্রায় পত্রহীন একটা শিমুল গাছের দিকে তাকিয়ে বলল, ''আচ্ছা, গাছ তো তার পাতার মধ্য দিয়ে যা শুষে নেয় তাই দিয়েই খাদ্য তৈরি করে বেঁচে থাকে। তাই যদি হবে তাহলে ওই গাছটা কি করে বেঁচে রয়েছে?'' ওর কণ্ঠস্বরে যেন ব্যক্তিগত সমস্যার দায় ধ্বনিত হল—''পাতাই নেই তাহলে বেঁচে আছে কী করে?''

হঠাৎ লোকটিকে আমার ভাল লাগতে শুরু করল এবং দুঃখও বোধ করলাম। যে পদ্ধতিতেই খেলা শেখাক এই গাবদা চেহারার ছেলেটি যে কোনোদিনই ফুটবলার হতে পারবে না, তাতে আমি নিঃসন্দিগ্ধ। ছেলেটাকে একবারও বলে লাথি মারতে না দিয়ে লোকটি নিজেই লাফালাফি করে যাচ্ছে। ছেলেটি সামান্য চনমনে হলে নিশ্চয় এভাবে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না। বস্তুত, এরকম হাঁদা ছেলে না পেলে লোকটি তাকে শিষ্যও বানাত না।

প্রায় আধঘণ্টা বসে থেকে লোকটির কর্মকাণ্ড দেখলাম। ছেলেটি চলে যেতেই আমার খাবারটা ওর দিকে এগিয়ে ধরে বললাম, ''আমি তো আজ প্র্যাকটিস করলাম না, তাছাড়া খিদেও নেই।''

ভ্রূ কুঁচকে বলল, ''করুন না, আমি গোলে দাঁড়াচ্ছি।''

''না থাক, আজ মন লাগছে না।''

লোকটি আর কথা বাড়াল না। খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে পকেটে রাখল। কোনো কুণ্ঠা দেখলাম না। বিনয় দেখিয়ে ধন্যবাদও জানাল না। আমরা একসঙ্গেই মাঠ থেকে বেরোলাম, হাঁটতে হাঁটতে লোকটি একসময় বলল, ''আমার কি মনে হয় জানেন, ফুটবলের তুল্য আর কোনো খেলা পৃথিবীতে নেই। ক্রিকেট হকি ব্যাডমিন্টন টেনিস যাই বলুন, সবই একটা ডাণ্ডা নিয়ে খেলতে হয়। ডাণ্ডা হাতে মানুষ। তার মানে প্রায় সেই বনমানুষের যুগের ব্যাপার। ফুটবল হচ্ছে সভ্যমানুষের খেলা, এর মধ্যে অনেক সায়েন্স আছে। সেটা রপ্ত করতে পারলে...ভাল কথা আপনার কি কোনো বাতিল ছেঁড়া বুট আছে? কাল দেখলেন তো কেমন পিছলে পড়ে গেলুম। বুট হলে আরও ভাল করে ডিমনস্ট্রেট করতে পারি।''

মাথা নেড়ে জানালাম, দেবার মতো বুট আমার নেই। শুনে আফসোসে টাগরায় জিভ লাগিয়ে শব্দ করল। ওর গাল দুটি লক্ষ্য করলাম, আগের থেকে পাণ্ডুর এবং বসে গেছে। ঢলঢলে নীল পাজামাটায় গতদিনের কাদা শুকিয়ে আটকে রয়েছে। তালিমারা বলটা দুহাতে বুকে চেপে ধরে মাথা ঝুঁকিয়ে ওর হাঁটা প্রায় বাচ্চাছেলের মতো দেখাচ্ছে। কিন্তু চোখ দুটিতে দারুণ উত্তেজনা। মনের মধ্যে হয়তো প্রতিপক্ষকে একের পর এক ড্রিবল করে এখন কাটিয়ে চলেছে। আমাকে কোনোরকম বিদায় না জানিয়েই মোড়ে পৌঁছে আপন মনে সে নিজের বাড়ির পথ ধরল।

পরের সপ্তাহে ছেলেটিকে প্রথমবার বল নিয়ে নড়াচড়া করতে দেখলাম। দেখে মনে হল ওর থেকে এই আধবুড়ো লোকটি জোরে কিক করতে পারে, ছুটতে পারে, লাফাতে পারে। ছেলেটি কেন যে এত জিনিস থাকতে ফুটবল খেলা শিখতে এল ভেবে অবাক হলাম। আধঘণ্টা পরে, ছেলেটি চলে যাওয়ামাত্র বললাম, ''কি রকম মনে হচ্ছে, হবে—টবে কিছু?''

''নিশ্চয়।'' লোকটি প্রচণ্ড উৎসাহে বলল, ''ঠিক করেছি এবার ওকে নামাব। যা কিছু শিখিয়েছি, সেগুলো খেলায় ব্যবহার করার মতো উপযুক্ত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ওর স্কুলের একটা ট্রায়াল ম্যাচ আছে এই শনিবার, ও খেলবে। আমি টাচ লাইন থেকে দরকার মতো বলে বলে দেব।''

''ওকে আগে কখনো কি খেলতে দেখেছেন?''

''না, তার দরকারই বা কী! এতদিন ধরে যা যা শিখিয়েছি সেটাই আমার দেখা দরকার। উন্নতি করেছে তাতে সন্দেহ নেই, নইলে ট্রায়াল ম্যাচে চান্স পাবে কেন!''

এবার আমি লোকটির জন্য হতাশা বোধ করলাম। নিজের কল্পনার জগৎকে আরোপ করার চেষ্টা করছে বাস্তব জগৎ—এর উপর। ফলাফল ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। মনশ্চক্ষে দেখলাম, কুঁজো হয়ে, পা ফাঁক করে লোকটি টাচ লাইন ধরে ছুটোছুটি করছে আর বিচ্ছু ছেলেরা ওর পিছনে ছুটছে, ভ্যাংচাচ্ছে, হাসছে জামা ধরে টানছে। মাস্টারমশাইরা বলছেন, পাগলটাকে সরিয়ে দিতে। দেখতে পেলাম, অপমানে লজ্জায় ওর জ্বলজ্বলে চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছে। মাঠ থেকে চলে যাচ্ছে মাথা নামিয়ে আর একপাল ছেলে ওর পিছু নিয়েছে।

''এখনই ওকে ম্যাচে নামানোটা কি একটু তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?'' যথাসম্ভব নম্রকণ্ঠে বললাম। ''মাত্র ক'দিন তো শেখাচ্ছেন?''

''আমি হিসেব রেখেছি, মোট পঁচিশ ঘণ্টা ওকে কোচ করেছি। ছেলেদের ফুটবলে ভাল স্টান্ডার্ডে রিচ করতে পঁচিশ ঘণ্টার কোচিংই যথেষ্ট।''

''কিন্তু এ ছেলেটাকে তো পাঁচশো ঘণ্টা কোচ করলেও কোনো স্ট্যান্ডার্ডে পৌঁছতে পারবে না।''

প্রথমে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। তারপর হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ''ইচ্ছেটা যে কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার আপনি বুঝবেন না। আপনি ইচ্ছে করুন সামাদ কি ছোনে কি গোষ্ঠ পালের মতো খেলবেন... কিংবা আজকাল যাদের খুব নাম শুনি—পেলে, ইস্যুবিও... তাহলে ঠিক তৈরি হয়ে যাবেন।''

এই নিয়ে আর কথা বাড়ালাম না। ভাবলাম, যা খুশি করুক আমার তা নিয়ে মাথাব্যথার দরকার নেই। বরং শিক্ষা পেলে ওর জ্ঞানচক্ষু ফুটবে। লোকটি এরপর এক সপ্তাহ অনুপস্থিত রইল। রোজই পল্টুর সঙ্গে প্র্যাকটিসের সময় ভাঙা পাঁচিলটার দিকে তাকাতাম। এই বুঝি আসে। পরে মনে হত, ছেলেটা নিশ্চয় ওকে ডুবিয়েছে তাই আমাদের কাছে মুখ দেখাতে লজ্জা পাচ্ছে বলেই আসছে না।

একদিন লোকটিকে আবার দেখলাম। নিমগাছতলায় দাঁড়িয়ে আমাদের প্র্যাকটিস দেখছে। পরনে লুঙ্গি আর হাওয়াই শার্ট মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ওকে দেখতে পেয়েছি বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিল, দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ''সেদিনকার ট্রায়াল ম্যাচের খবর কী?''

লোকটি একবার থমকাল তারপর চলতে চলতেই বলল, ''শুধু ইচ্ছাতেই হয় না, কিছুটা প্রতিভাও থাকা দরকার। আমারই ভুল হয়েছে।'' এরপর ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে একবার তাকাল। আমি ওর চোখে গাঢ় প্রত্যাবর্তন কামনা দেখতে পেলাম। ওর চলে যাওয়া দেখে মনে হল, একটা আহত জন্তু গভীর অরণ্যের নির্জনে প্রাণ বিসর্জন দেবার জন্য যেন হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে।

কিছুদিন পর বাজার যাবার পথে ছেলেটিকে দেখতে পেলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওর থেকেও কমবয়েসী ছেলেদের ডাংগুলি খেলা দেখছিল। লোকটির খবর জিজ্ঞাসা করতেই ও বিরক্ত স্বরে বলল, ''কে জানে। বোধহয় আবার অসুখ—বিসুখ হয়েছে।''

''কোথায় থাকে জান?''

''জানি, তবে আমি কিন্তু নিয়ে যেতে পারব না। আমায় দেখলেই এমনভাবে তাকায় যেন ভস্ম করে ফেলবে। আচ্ছা কী দোষ বলুন তো, মাঠে এমন কাণ্ড শুরু করল যে ছেলেরা ওর পেছনে লাগল। এজন্য কি আমি দায়ী?''

''মোটেই না।''

''তাহলে! আমি যদি খারাপ খেলি তাই বলে সকলের সামনে অমন হাউ হাউ করে কাঁদবে একটা বুড়ো লোক?''

''তুমি বরং দূর থেকে বাড়িটা দেখিয়ে দাও। সেটা পারবে তো?'' অধৈর্য হয়ে বললাম।

''তা পারব।'' ছেলেটি দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বলল।

কথামতো দূর থেকে বাড়িটি দেখিয়ে ছেলেটি চলে গেল। জায়গাটা আধাবস্তি। তিনদিকে টালির চাল দেওয়া একতলা ঘর, মাঝখানে উঠোনের মতো খোলা জায়গা। অনেকগুলো বাচ্চা হুটোপাটি চিৎকার করছে। তার পাশেই খোলা নর্দমা, থকথকে পাঁকে ভরা। একধারে লাউয়ের মাচা। চিটচিটে ছেঁড়া তোশক বাঁশে ঝুলছে। আস্তাকুঁড়ে একটা হাঁস ঠোঁট দিয়ে খুঁচিয়ে খাদ্য বার করছে। একজন স্ত্রীলোক এসে একটি বাচ্চার পিঠে কয়েকটি চড় মেরে তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছিল। আমার প্রশ্নে, ব্যাজার মুখে একটা ঘরের দিকে আঙুল দেখিয়ে চলে গেল। একটু কৌতূহলও প্রকাশ করল না।

ঘরের দরজাটি পিছন দিকে। ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে তাকালাম। দেয়ালে অজস্র ক্যালেন্ডার আর তোরঙ্গ, কৌটো, ঘড়া, বিছানা, মশারি প্রভৃতিতে বিশৃঙ্খল ঘরের কোণায় তক্তপোশে লোকটি দেয়ালে ঠেস দিয়ে খাড়া হয়ে বসে। তাকিয়ে রয়েছে সামনের দেয়ালে। পাশ থেকে দেখতে পেলাম থুতনিটা এমনভঙ্গিতে তোলা যেন কিছুই ধর্তব্যের মধ্যে আনছে না। গালের হাড় উঁচু হয়ে চোখ দুটিকে আরো ঢুকিয়ে দিয়েছে। মৃত্যু ওর শরীরে কোমল স্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছে এবং লোকটি আরামে আচ্ছন্ন হয়ে আছে মনে হল।

হঠাৎ ও ঘাড় ফেরাল। চোখাচোখি হল আমার সঙ্গে। মাত্র কয়েক হাত দূরেই দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু ওর চোখে কোনোরূপ ভাবান্তর প্রকাশ পেল না। রিক্ত কৌতূহলবর্জিত শূন্য চাহনি। মনে হল নিষ্পত্র প্রাচীন এক শিমুলের কাণ্ড, ক্ষয়প্রাপ্ত পাথরের মতো যার বর্ণ, গতিহীন সঞ্চরণে প্রত্যাবর্তনরত। আমি পরিচিতের হাসি হাসলাম। ওর চোখে তা প্রতিফলিত হল না।

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%