একচক্ষু

মতি নন্দী

হাতব্যাগ থেকে কাগজপত্তর বার করে কণিকা এগিয়ে ধরল। সমন আর পিটিশনের নকল।

''আজ দুপুরে বেলিফ এসে কলেজেই আমায় সার্ভ করে গেছে।''

উকিল কথা না বলে পড়তে শুরু করেছে। কণিকা স্থির দৃষ্টিতে ওর মুখভঙ্গি লক্ষ্য করে যাচ্ছে। চোখ ভ্রূ বা গালের পেশীতে কোনো পরিবর্তন ঘটছে না। তাতে অবশ্য আশ্বস্ত বোধ করল না। পড়া শেষ করে উকিল বলল, ''এক হপ্তা সময় আছে, কোর্টে হাজিরা দেওয়ার।''

কণিকা তা জানে, সমনেই লেখা আছে।

''তারপর সময় নিয়ে, আপনার আপত্তি অর্থাৎ বক্তব্য ফাইল করতে হবে।''

''হ্যাঁ।''

''আপনি নিশ্চয় স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চান না।''

''না।''

''নিশ্চয় তার কারণ আছে।''

''আছে, বলছি আপনাকে।''

প্রফেসরস রুমে বসে সারা দুপুর কণিকা ব্যাপারটা ভেবেছে। উকিল জিজ্ঞাসা করবেই এবং সব কথা তাকে বলতেই হবে। শুরু করল সে এইভাবে—

''বিয়ের ন'বছর পর আমি আলাদা হই। সে আজ প্রায় এগারো বছরের কথা। এতদিন পর যে এই রকম ব্যাপার ঘটবে, সত্যিই ভেবে পাচ্ছি না।''

''বিয়ের সময় আপনার বয়স কত ছিল?''

''তখন ফোর্থ ইয়ারে পড়ি, কুড়ি বছর বয়স ছিল। ওর সঙ্গে আলাপ তার এক বছর আগে ক্লাসের একটি মেয়ের বাড়িতে।''

''আপনার স্বামী দেখতে তখন কেমন ছিল? কী করত?''

কণিকা বুঝতে পারল উকিল কোনদিক থেকে খোঁজ চালাতে চায়। হেসে বলল, 'খুব স্মার্ট ছিল, দেখতে ভালই। আলাপের অল্পদিনের মধ্যেই আমাদের হৃদ্যতা হয়। ও—খুব ভাল গিটার বাজাত। খরচও করত যথেষ্ট। বাড়ি বলেছিল বরিশালে, তখনও পাকিস্তান হয়নি। সেখানে অনেক জমিসম্পত্তি আছে, টাকা নাকি সেখান থেকেই আসে।''

''বিয়েতে আপনার বাপের বাড়ি থেকে আপত্তি হয়নি?''

''আমার বাড়ি থেকে শুধু আপত্তিই নয়, বাবা বলেছিলেন তা হলে আর মুখ দেখবেন না। দেখেননি। আজ তেরো বছর হল স্বর্গে গেছেন।''

কণিকার গলা ভারী হয়ে থেমে গেল। স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে নিস্পৃহ স্বরে উকিল বলল, ''বিয়ে তা হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে করেন?''

''হ্যাঁ।''

''হিন্দুমতে, মানে অগ্নিসাক্ষী করে?''

''হ্যাঁ।''

উকিলের ভ্রূ—কুটি এতক্ষণে নড়ে উঠতেই, কণিকা থেমে গেল। উকিল পেন্সিল দিয়ে একটা কাগজে আঁকিবুকি কাটছে, কণিকা কথা বলে ওর চিন্তায় ব্যাঘাত না করার জন্য চুপ রইল।

''তারপর?'' উকিল হঠাৎ যেন ঘুম থেকে উঠল, ''তারপর আপনারা স্বামী—স্ত্রীর মতো বসবাস করতে লাগলেন?''

ঝাঁ করে কণিকার মাথা গরম হয়ে গেল। স্বামী—স্ত্রীর মতো মানে? স্বামী—স্ত্রীই তো। মতো আবার কেন?

''হ্যাঁ, আমার স্বামীর সঙ্গে আহিরিটোলায় এসে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সংসার পাতলাম।'' প্রতিটি শব্দে বেশ জোর দিয়ে কণিকা বলল। উকিল তা লক্ষ্য করল কিনা সেটা অবশ্য বোঝা গেল না।

''এই লোকটি কী করেন বা তখন কী করতেন?''

''আমার স্বামীকে চাকরি করতে, আমি অন্তত দেখিনি। দেশ থেকে টাকা আসত। আর গিটারের টিউশানি করতেন। তখন অবশ্য দেড়শো দুশো টাকায় বেশ ভালভাবেই দু—তিনজনের সংসার চলে যেত।''

''তৃতীয় জন কে?''

''একজন ঝি ছিল। বিধবা অল্পবয়সী—নাম গীতা। আমি বি—এ পাস করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই। গীতাই রুনুকে, অর্থাৎ আমার মেয়েকে দেখাশোনা করত। পরে অবশ্য ওকে ছাড়িয়ে একজন বুড়িকে রাখি।''

''কেন?''

''গীতাকে খুব সুবিধের মনে হল না। তা ছাড়া আমার স্বামীর প্রতি মেয়েদের কেমন যেন একটা আকর্ষণ হয় লক্ষ্য করেছি। গীতাও ব্যতিক্রম নয়। দুটি মেয়ে বাড়িতে এসে গিটার শিখত। তাদেরও এইরকম হতে লক্ষ্য করেছি।''

''আপনি স্বামীকে সন্দেহ করতেন?''

কণিকা এবার ইতস্তত করল। সন্দেহ করি বললে নিশ্চয়ই ধরে নেবে হীন বা কুচুটে। কিন্তু উকিলের কাছে কিছু গোপন করাও উচিত নয়। বিশেষত যা সত্যি।

''সন্দেহ করার কারণটা বলুন।''

অত্যন্ত সাদামাঠা কণ্ঠস্বর। কুণ্ঠাবোধ করার মতো কিছু তাতে নেই। কণিকা অসুবিধা বোধ করল। রুচির মান বজায় রেখে এসব বিষয় বিবৃত করা, বেশ কঠিন। কোথা থেকে কীভাবে শুরু করবে ভেবে না পেয়ে সে বলল, ''সন্দেহ তো গোড়া থেকেই ছিল। বিয়ের আগে থেকেই। যে মেয়েটি মারফত ওর সঙ্গে আলাপ হয়, তার সঙ্গেই অ্যাফেয়ার ছিল। তা ছাড়া বিয়ের পরও দেখেছি মেয়েদের সম্পর্কে কেমন ছোঁক—ছোঁক ভাব। এতে বেশ বিরক্তই বোধ করতাম। গীতাকে তাড়ালাম। ওর সঙ্গেও ঝগড়া হল। কিন্তু ও নির্লজ্জ নির্বিকার রয়ে গেল। বলল, পুরুষ মানুষ এরকম হয়ই, নয়তো পুরুষ আবার কীসের। তাই শুনে নিজের উপর ঘেন্না ধরল, এই লোকটাকে কিনা পছন্দ করে বিয়ে করেছি। এম—এ পাস করে একটা স্কুলে চাকরি নিই। তারপর আসি কলেজে। রুনু বড় হয়েছে, ইতিমধ্যে ওকে স্কুলে ভর্তি করে দিই। আমরা দুজন একসঙ্গেই বেরোতাম। একদিন কি কারণে যেন রুনুর স্কুল হাফ—হলিডে হয়ে যায়, ও বাড়ি ফিরে দেখে সদর খোলা আর শোবার ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ধাক্কা দিতেই ওর বাবা বেরিয়ে আসে। ওকে ধমকায় তারপর বসবার ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। দরজার তক্তায় ফাটা ছিল। রুনু দেখে শোবার ঘর থেকে গীতা বেরিয়ে যাচ্ছে। রাত্তিরে চুপিচুপি রুনু ঘটনাটা আমায় বলে। তখন আমি ভাবলাম, রুনু বড় হচ্ছে, বয়স সাত পেরিয়েছে, একদিন না একদিন এই ঘটনার অর্থ ওর কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। তখন নিশ্চয় ভাববে, একটা আনফেথফুল স্বামীর সঙ্গে কী করে তার মা দিনের পর দিন কাটিয়েছে। বিন্দুমাত্র শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, রুচি কি তার ছিল না! তখন ও আমায় ঘেন্না করবে, আমার মনে হল রুনু হয়তো এমন প্রশ্ন কোনোদিন করে বসবে যার কোনো জবাব দিতে পারব না। আমার জীবনে রুনু ছাড়া আর কিছু নেই, তখন ছিল না, এখনও নেই। ওই আমার সবকিছু। মনে হল, এইসব ঘটনা বা দৃশ্য ওকে কলুষিত করবে। যে কৌতূহলে সেদিনকার ব্যাপারটা আমায় বলেছিল, ওর বয়সের পক্ষে সেটা স্বাভাবিকই, কিন্তু রাগে দুঃখে ইচ্ছে করছিল খুব করে ওকে পেটাই। এইসব নোংরা জঘন্য স্মৃতি আমি ওর মন থেকে মুছে দিয়েছি। তার জন্য এগারো বছর ধরে চেষ্টা করেছি। আর দেখুন কি শয়তানি, আমাকে অপদস্থ করতে এই মামলা করেছে। আমি সিঁথিতে সিঁদুর দিই না, বিধবার মতো থাকি। রুনু জানে তার বাবা মৃত। যদি স্বামীর কাছে ফিরে যেতে হয়, তা হলে মেয়েকে কী বলব? ওর বয়স হয়েছে, ডিগ্রি ক্লাসে পড়ছে। কত সাবধানে ওকে এত বড়টি করে তুলেছি। সব ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমায় ফিরে যেতে হয়।''

উকিলের মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। কিন্তু কণিকার দুই চোখ ছলছল। গলা বসে গেল শেষ দিকে। দেয়াল ঘড়িতে আটটা বাজছে। উকিল টাইপ করা কপিটা তুলে নিয়ে আবার পড়তে লাগল।

কণিকা টেবলে ঝুঁকে নিচু গলায় বলল, ''আমার তরফ থেকে বক্তব্য কী হবে তা আপনিই বলুন।''

''এ কেস কি আমায় দিয়ে করাবেন?''

উকিল এখনও মুখ তুলল না। কণিকা বলল, ''নিশ্চয়। তাইতো আপনার কাছে এলাম।''

উকিল কাগজটা রেখে কণিকার দিকে তাকাল। ''আপনার স্বামী এখন কী করেন? কোনো মেয়েছেলের সঙ্গে বসবাস বা গীতার সঙ্গে তার কোনো রকম সম্পর্ক... অর্থাৎ ব্যভিচারের সম্পর্ক আছে কি না, তাকি জানেন?''

''আমি কিছু জানি না। আলাদা হবার পর ও নিয়ে কোনো মাথা ঘামাইনি, খোঁজ নিইনি। তবে শুনেছিলাম সেই বাসা ছেড়ে তালতলার দিকে উঠে গেছে। আমাদের খোঁজও কোনোদিন করেনি।''

''আপনার স্বামীর ব্যভিচার প্রমাণ করতে পারবেন?''

কণিকা এইবার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। তাই দেখে উকিল বলল, ''জজের কাছে প্রমাণ দিতে হবে তো, আসলে তাকেই বোঝাতে হবে কেন স্বামীকে ত্যাগ করেছেন, তার কাছে আর কেন যেতে চান না।''

''কীভাবে প্রমাণ হয়?'' কণিকা অসহায় বোধ করল, উকিল তখন ফোন তুলে কার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছে, কণিকা সেই অবসরে ভাববার চেষ্টা করল। উকিল ফোন রাখতেই বলল, ''আমি বলব ব্যভিচার করেছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি, নয়তো কেন আলাদা হবে বলুন!''

উকিল হাসল। ''আপনার কথা জজ বিশ্বাস করবে কেন? কোনো রকম চিঠিপত্তর দেখাতে পারবেন, লাভ লেটার যাতে বোঝানো যায় সে অন্য মেয়ের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত।''

কণিকা মাথা নাড়ল।

''কোনো রকম ছবি, আপনার স্বামীর সঙ্গে অন্য কোনো মেয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বোঝায় এমন পোজে?''

এবারও কণিকা মাথা নাড়ল। ''না। একবার বিয়ের আগে পিকনিকে গেছলাম। অন্য কয়েকটি মেয়েও ছিল। ছবিও তোলা হয় কিন্তু সেসব ছবি তো ওঁর কাছে।''

''কেউ সাক্ষী দিতে পারবে, ব্যভিচার করতে দেখেছে এমন কেউ।''

কণিকার প্রথমেই মনে পড়ল রুনুকে। সঙ্গে সঙ্গে শিউরে উঠল। অসম্ভব, সেই নোংরা ব্যাপার খুঁচিয়ে আবার ওর মনে জাগিয়ে তোলা অসম্ভব। উকিল একদৃষ্টে তাকিয়ে। কণিকা মাথা নাড়ল।

''আপনার মেয়ে দেখেছে।''

''না, না উকিলবাবু।'' কণিকা হুমড়ি খেয়ে পড়ল টেবলে। ''আমি পারব না ওকে সাক্ষী করতে। বরং আমি হেরে যাব।''

''অর্থাৎ স্বামীর কাছেই ফিরে যাবেন?''

কণিকা ধীরে ধীরে চেয়ারে বসল। স্থির দৃষ্টিতে টেবলের পায়ার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল। কিন্তু কোনো ভাবনাই স্পষ্ট নয়, আবছা মনের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

''মামলা জেতার জন্য আমায় চেষ্টা করতেই হবে। সেজন্য যে পথ অবলম্বন করা দরকার, আমি তাই বললাম। এখন আপনার ইচ্ছে। আপনি বরং ভেবে ঠিক করুন। এখনও তো যথেষ্ট সময় আছে।''

কণিকা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। কাগজগুলো নিয়ে যাবে কিনা একবার ভাবল তারপর নমস্কার করে বেরিয়ে এল।

বাড়ি ফিরে দেখল রুনু নেই। ঝি জানাল কলেজ থেকে ফিরে বিকেলেই বেরিয়ে গেছে। এ রকম সে যায় কিন্তু রাত ন'টা পর্যন্ত বাইরে থাকে না। কণিকা বিরক্ত হয়ে চিন্তিত হল। রুনুর পড়ার ঘরে এসে টেবলের কাগজগুলো খুলে দেখতে শুরু করল। কিছু নেই। স্তূপ করা বইগুলো দেখতে দেখতে একটা বই খুলে তার শরীর হিম হয়ে গেল। যৌন বিজ্ঞানের বই। আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল কণিকা। একটার পর একটা সমস্যা। উকিল বলেছে হয় রুনুকে দিয়ে সাক্ষী দেওয়ানো নয় তো ফিরে যাওয়া। আর রুনু এদিকে গোল্লায় যেতে বসেছে। চোখ ফেটে জল এল তার। বালিশে মুখ চেপে সে কাঁদল।

কিছুক্ষণ পর তার মনে হল, এ বই রুনু পেল কোথা থেকে। লাইব্রেরি, নাকি ক্লাসের কোনো মেয়ের থেকে? লাইব্রেরির ছাপ আছে কিনা দেখার জন্য উঠে গিয়ে বইটার মলাট ওলটাতেই দেখল সূচিপত্রের নিচের দিকে লেখা একটা নাম : পরিমল ভট্টাচার্য।

কাঁপতে কাঁপতে কণিকা ফিরে এল। ন'টা বেজে গেছে রুনু ফিরছে না। ওর টেবলে খারাপ বই। তাতে একটা পুরুষের নাম লেখা। বইটা কি ও পড়েছে? আজ সকালেও, কণিকার যতদূর মনে পড়ছে, বইটা ওখানে ছিল না। বোধহয় বিকেলেই পেয়েছে। তাড়াহুড়োয় লুকিয়ে রাখতে ভুলে গেছে। আবার উঠল বিছানা থেকে। দ্রুত ও ঘরে গিয়ে বইটা নিয়ে এসে, চেয়ার টেনে তার ওপর উঠে রুনুর বাঁধানো ছবিটার পিছনে লুকিয়ে রাখল।

একটা সমস্যা মিটল। কিন্তু ন'টা যে অনেকক্ষণ বেজে গেছে। জানলায় দাঁড়াল কণিকা। রাস্তার অনেকখানি দেখা যায়, কোথাও রুনুর চিহ্ন নেই। ঝি এসে জানতে চাইল খাবার ঢাকা দিয়ে রাখবে কি না।

''খাব না, শরীর ভাল নেই।''

''দিদিমণির ঢাকা দিয়ে রাখি?''

''জানি না।''

কণিকা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। একটা কালো মোটর এসে বাড়ির সামনে দাঁড়াল। রুনু নামল। শুনতে পেল গাড়ির মধ্য থেকে কে যেন বলছে, ''মাসিমাকে কি তাহলে বলে আসব যে আমার জন্যই তোর এত রাত হল, ওকে বকবেন না।'' রুনু জবাব দিল, ''না না, মা মোটেই ওরকম নন। তোকে আর নামতে হবে না, আচ্ছা চলি।'' ''বাই বাই।''

গাড়িটা চলে গেল। কণিকা নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল। ঝি দরজা খুলে দিয়েছে। রুনু ঘরে এল। দেখল গভীর মনোযোগে কণিকা মোটা একটা বই পড়ছে বিছানায় কাত হয়ে। কথা না বলে সে আলনা থেকে কাপড় নিয়ে বদলাতে শুরু করল।

''জানলাটা বন্ধ করে দাও রুনু পাশের বাড়ির ছাদের কোণ থেকে দেখা যায়।'' কণিকা বই থেকে চোখ না সরিয়েই বলল। জিভ কেটে রুনু তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করল।

এখনও পর্যন্ত সে ফিরে তাকায়নি! তার দরকারও বোধ করল না, কেন না সে জানে রুনুর মুখের ভাব এখন কেমন এবং কী ভঙ্গিতে সে দাঁড়িয়ে আছে।

''আমি যেতে চাইনি। হেনা জোর করে নিয়ে গেল। কলেজ থেকে একসঙ্গে বাড়িতে এসেছে। এখানেই গাড়ি এসে আমাদের নিয়ে গেল।''

''কার গাড়ি?''

''ওর দাদার বন্ধুর। বোম্বাইয়ে অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনে বড় চাকরি করেন। গাড়ি করেই কলকাতায় এসেছেন, বেড়াতে।''

''কোথায় গেলে তোমরা?'' কণিকা বারবারই আলটপকা ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছে। যেন জবাব না পেলেও তার কিছু এসে যায় না। রুনু কিন্তু চুপ রইল।

''আগে কিন্তু তুমি এমন ছিলে না রুনু।''

''আমরা সিনেমায় গেলাম তারপর একটা চীনে রেস্টুরেন্ট।''

''কে কে ছিল?'

''আমি হেনা ওর দাদা আর দাদার বন্ধু।''

''তা হলে খাবে না?''

রুনু চুপ। করিকা আড়চোখে দেখল মাথা নিচু করে পায়ের আঙুল মেঝেয় ঘষছে। অত্যন্ত মায়া হল। কিন্তু শুধু স্নেহ নয় শাসনও দরকার এই ভেবে সে একটু রুক্ষ স্বরে বলল, ''এইভাবে কে চুলবেঁধে দিল, কতদিন বলেছি না বাঁকাসিঁথি কাটবে না!''

''হেনা বেঁধে দিয়েছে।'' রুনু ভয়ে ভয়ে বলল।

''কোথায় সিনেমা দেখতে গেছলে?

''মেট্রোয়।''

কণিকা বইটা ধীরে বন্ধ করে পাশে রাখল। বাঁ হাত কপালে রেখে চোখবন্ধ করে বলল, ''আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ো। আমার শরীর খারাপ লাগছে।''

ঘরটা অন্ধকার হতেই কণিকা অস্ফুট আর্তনাদ করল। রুনু বেরিয়ে যাচ্ছিল ঘর থেকে তাড়াতাড়ি কাছে এসে দাঁড়াল।

''শরীর খারাপ মা?''

''না। কোথায় যাচ্ছ?''

''বাথরুম।''

''চটি পরে যাও।'' পাশ ফিরে শুল কণিকা। ইংরিজি বই দেখে এসেছে রুনু। কথাগুলো নিশ্চয় বুঝতে পারেনি, কিন্তু ইংরিজি বইয়ে যা ঘটে তাতো অন্ধকার ঘরে চোখ দিয়ে দেখেছে! পাশেই ছিল দুটো পুরুষ! হায় ঠাকুর! কণিকার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল! অশ্লীল দৃশ্য রুনু দেখেছে, অসভ্য বই পড়েছে বা পড়ার জন্য এনেছে।

প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে কণিকা উকিলের বাড়ি পৌঁছল সকালেই। দু'তিনজন মক্কেল বসে। উকিল ব্রিফ পড়ছে।

''উকিলবাবু আপনি অন্য সাক্ষী দেখুন। রুনুকে দিয়ে সাক্ষী দেওয়াতে পারব না।''

উকিল স্পষ্টই বিরক্ত হল। কণ্ঠস্বরে তা গোপন না করে বলল, ''আমি সাক্ষী দেখব কী, আপনি নিয়ে আসুন!''

''কাকে আনব?'' কণিকা উদ্বিগ্নতার চূড়া থেকে কথা বলল। কথা না বলে উকিল ব্রিফে ডুব দিল। অপ্রতিভ হয়ে কণিকা ভাবল এইভাবে কাজের মধ্যে আসা অন্যায় হয়েছে, চলে যাওয়াই উচিত। উঠে দাঁড়াতেই উকিল বলল, ''আপনি একটি মেয়ের নাম করেছিলেন, যাকে নিয়েই গোলমালটা বাঁধে।''

''গীতা।''

''সে কোথায়?''

''জানি না।''

''তাকে খুঁজে বার করুন। তাকে রাজি করান। সে যদি সাক্ষী দেয় সবচেয়ে ভাল।''

এই বলে উকিল ব্রিফ পড়তে শুরু করল। কণিকা আর কথা বলার ভরসা পেল না।

সেইদিনই কলেজে গিয়ে কণিকা এক মাসের ছুটি নিল। রুনুকে জানাল, কলেজ ছুটির পর সোজা বাড়ি চলে আসবে। পরীক্ষার আর বেশি দেরি নেই। এবার পড়ায় মন দাও। আমার শরীর খারাপ ছুটি নিয়েছি এক মাস।

কথাগুলো বলেই এমনভাবে একটা বই নিয়ে পড়তে শুরু করল যে রুনু আর কথা বলার ভরসা পেল না। ও বেরিয়ে যেতেই কণিকা ঘরের কোণে গিয়ে ডিঙ্গি দিয়ে দেখল, ছবির পিছনে বইটা ঠিকমতোই রয়েছে।

পরদিন দুপুরে কণিকা বেরোল আহিরিটোলার উদ্দেশে। প্রায় এগারো বছর পর এদিকে আসা। যে বাড়িটায় থাকত তার সামনে কাঠা দুয়েক জমি ছিল। বাড়ি উঠেছে চারতলা। পুরনো ভাড়াটেরা যাতে না দেখে সন্তর্পণে কণিকা দোতলায় উঠে এল। পূর্ণবাবু এবং তার বৌ জয়া ছিল পাশের ভাড়াটে। জয়া খুব খুশি হল ওকে দেখে। নানান কথার পর কণিকা জানতে চাইল গীতার খবর।

''ওম্মা, সে তো কবে বিয়ে করেছে। তার কাণ্ড জানেন না বুঝি! আপনারা তো ছাড়িয়ে দিলেন, তারপর এ পাড়ার চব্বিশ নম্বর বাড়িতে কাজ নিল। সে বাড়ির মেজছেলের সঙ্গে শুরু করল ঢলাঢলি। দিল সেখান থেকেও খেদিয়ে, তারপর কাজ নিল একটা চায়ের দোকানে। আজকাল তো অনেক চায়ের দোকানেই মেয়েরা কাজ করে। উনিই একদিন অফিস থেকে ফিরে বললেন, জানো ট্রামে যেতে যেতে সেই গীতাকে দেখলাম ধর্মতলার কাছে একটা পাঞ্জাবীর দোকানে খদ্দেরদের চা দিচ্ছে। মা ভাই বোন সব বস্তিতে থাকত। আপনি তো তা জানতেনই, ওই যে গঙ্গা যাবার রাস্তায় পোস্টাপিসের কাছে। তা শুনলুম একদিন, ওখান থেকে উঠে গেছে। চটক তো কম ছিল না, রোজগারপাতি বোধহয় ভালই হচ্ছিল। তারপর একদিন উনি এসে বললেন, সেই দোকানটায় আর ওকে দেখছেন না কদিন ধরে, বোধহয় ছেড়ে দিয়েছে কি অন্য কোথাও কাজ নিয়েছে।''

জয়ার কাছ থেকে তার স্বামীর অফিসের ঠিকানা নিয়ে কণিকা তখুনি বেরিয়ে পড়ল ডালহৌসির দিকে। এক সরকারি অফিসের তিনতলায় বিরাট একটা ঘরে পূর্ণকে সে খুঁজে পেল। দেখামাত্রই কণিকাকে সে চিনল, যখন শুনল গীতার খোঁজ নেবার জন্য তার কাছে এসেছে, পূর্ণ অপ্রতিভ হয়ে বলতে শুরু করল, ''ধর্মতলার দিকে একবার গেছলাম সে অনেক দিন আগে, এখনও আছে কিনা অবশ্য'' ইত্যাদি। কণিকা ধরে নিয়েছিল নিশ্চয় প্রশ্ন করবে হঠাৎ গীতার ঠিকানা চান কেন। তাই নিজে থেকেই বলল, ''ওর হাত দিয়ে আমার সাড়ে চার ভরির সোনার হার বাঁধা দিয়েছিলুম। যত টাকা লাগুক হারটা এখন ছাড়াতে চাই। আমার শাশুড়ির দেওয়া, তিনি পেয়েছিলেন তাঁর শাশুড়ির কাছ থেকে। ওটা আমার মেয়ের বিয়েতে যৌতুক করব। কিন্তু গীতা না হলে তো ওটা ছাড়ানো যাবে না, দোকানটা কোথায় বলুন।''

পূর্ণ ওকে সঙ্গে করে সেই দোকানে নিয়ে গেল। মালিক জানাল, গীতা নামে কেউ কাজ করত কিনা মনে পড়ছে না। আট—ন'বছর আগের কথা। তবে খাতা দেখে বলতে পারবে। দু—তিন দিন পরে আসুন।

তিন দিন পর কণিকা হাজির হল। মালিকের কাছ থেকে মানিকতলার একটা ঠিকানা পেয়ে সে তখুনি রওনা দিল। ঠিকানা মতো বাড়ি খুঁজে বার করে দেখল সেখানে গীতার মা—ভাই থাকে। তারা জানাল, গীতা আজ প্রায় আট বছর বিয়ে করে ঘর—সংসার করছে। থাকে বেলগাছিয়ায়। কণিকা ঠিকানা নিয়ে পরদিন খুঁজে বার করল গীতার বাড়ি।

''বৌদি!'' গীতা ভীষণ অবাক হয়ে গেল। এত বছর পর কণিকার আবির্ভাব অনেক প্রশ্ন ও কৌতূহলের সমাবেশে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মতো। কিন্তু গীতা বেশ শক্ত মেয়ে। তাড়াতাড়ি কণিকাকে ঘরে এনে বসাল। কণিকা আগেই ঠিক করে রেখেছিল কী কী বলবে।

''তোকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে গীতা। আমারই বয়সি তো অথচ আমায় দেখ!''

''কী যে বল তার ঠিক নেই, তোমার নখের যুগ্যি নাকি।''

এবার কণিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গম্ভীর হয়ে গেল। চোখ ছলছল করছে।

''স্বামী—সংসার, ছেলেপুলে নিয়ে যে রয়েছে তার সঙ্গে কি কোনো তুলনা হয়!''

গীতা গম্ভীর হয়ে গেল। লক্ষ্য করে কণিকা আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ''তোর ছেলেমেয়ে কটি?''

''চারটি। বড়ছেলে স্কুলে গেছে, সাত বছরের। পরের দুটি মামারবাড়ি। আর ছোটটি আট মাস, বাইরে দোলনায় ঘুমুচ্ছে।''

কণিকা ঘরটা নজর করল। শস্তা জিনিসে সাজানো; কিন্তু অসম্ভব পরিপাটি। ঘরের মেঝে তকতকে, বিছানায় বালিশগুলো সাজানো, ওয়াড় পরিষ্কার; সিলিং পাখা বা তাকে রেডিও ছাড়া হিটারও দেখা যাচ্ছে। কণিকা অনুমান করল গীতা ভালভাবেই আছে। একদা যে ঝিয়ের কাজ করত তা বোঝা যায় না।

''চা করে দি।'' গীতা ব্যস্ত হয়ে উঠল। কণিকা যতটুকু আপত্তি করা দরকার করল। চা—করা দেখতে দেখতে কণিকা শুরু করল, ''বর কী করে?''

''ঠিকেদারি। সেই ভোরে বেরোয়, ফিরতে রাত আটটা—নটা। শুধু রোববারটাই যা সারাদিন বাড়ি থাকে।''

''শ্বশুর—শাশুড়ি?''

''কেউ নেই।''

গীতার বলার ভঙ্গিতে কণিকা বুঝল না থাকাতে সে খুশিই। সেও বলল, ''ভালই। শ্বশুর—শাশুড়ি নিয়ে ঘর করা যা ঝামেলা। মনে আছে আহিরিটোলার ব্যানার্জিবাবুর বৌকে। শেষে বেচারা কাপড়ে আগুন লাগিয়ে জ্বালা জুড়োল।'' বলতে বলতে কণিকা ঘরে নজর বুলোচ্ছিল। আলমারির মধ্যে একটা চ্যাপ্টা বেঁটে শিশি দেখে তার মনে হল মদের। নিশ্চয় গীতার স্বামী খায়।

''তোর বর কেমন হয়েছে তাই বল।''

''বলব কেন। নিজে এসে বরং একদিন দেখে যেও।'' চায়ে চিনি দিয়ে চামচ নাড়ছে গীতা। কণিকা এবার নজর করল গীতার দেহে। গা—গতর বেশ ভারী। গলায় হাতে কম করে ছ'সাত ভরি সোনা।

''তোমার খবর কী। রুনু কতবড় হয়েছে? পড়ে?''

চায়ে চুমুক দিয়ে কণিকা বুঝল অন্তত ত্রিশ টাকা কিলোর চা।

''রুনু এবার ডিগ্রি পরীক্ষা দেবে। আমি একা, মেয়ে বড় হয়েছে। এতদিন সামলে তো চালালাম। এবার ওর বিয়ে দিতে হবে। তোর মতো ভাগ্য করলে আজ কি আমার মেয়ে পড়িয়ে পড়িয়ে বেড়াতে হয়, না রোজগারের ধান্দায়—'' কণিকার গলা থেকে আর স্বর বেরোল না!

''কেন তুমি তো ভাল আছ।'' মৃদু স্বরে গীতা সান্ত্বনা দিল। ''পরের হাত তোলা নও, নিজের ইচ্ছেমতো চলাফেরা কর।''

কণিকা গুম হয়ে বসে রইল। গীতা ওর ডানহাতটা নিজের হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল।

''আজ এগারো বচ্ছর যে কীভাবে কেটেছে। কত অপমান, গঞ্জনা, কত বদনাম যে সয়েছি তবু একটুও টলিনি, মাথা নোয়াইনি। আর আজ সব ব্যর্থ হতে বসেছে। গীতা, তুই আমাকে বাঁচা।'' কণিকা ওর দুটি হাত জড়িয়ে ধরল। ''গীতা, ও আমাকে ফিরিয়ে নিতে মামলা করেছে। একমাত্র তুই জানিস কেন আমি আলাদা হয়েছি। আর আমার পক্ষে ফেরা সম্ভব নয়। মেয়ে বড় হয়ে গেছে সে কী ভাববে?''

গীতার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। শূন্য দৃষ্টিতে কণিকার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর হাত ধরে ঝাঁকি দিয়ে কণিকা বলল, ''এর মূলে তুই। তোর জন্যই এসব ঘটেছিল। আজ তুই স্বামী—পুত্র নিয়ে সুখে আছিস আর আমায় কি সেই শয়তানটার কাছে ফিরে যেতে হবে?''

গীতা দাঁড়িয়ে উঠল, ''এসব কথা আজ আর তুলো না বৌদি। তুমি বরং চলে যাও।''

থমথম করছে মুখ। গীতা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কণিকা হাত টেনে ধরল। ''আজ আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী কে, গীতা তুই বল, কে দায়ী?''

''অতশত বুঝি না, তুমি এখন যাও?'' মোচড় দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গীতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কণিকা কিছুক্ষণ বসে থেকে ঘরের বাইরে এসে চারধারে তাকাল। সদর দরজা খোলা। গীতা সম্ভবত বেরিয়ে গেছে। কণিকা বুঝল অপেক্ষা করা বৃথা, সে চলে না যাওয়া পর্যন্ত গীতা ফিরবে না।

ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছে কণিকার। বাড়ি এসে শুয়ে পড়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙল একটা স্বপ্ন দেখে। চেয়ারের উপর উঠে রুনু ছবির পিছন থেকে বইটা পেড়ে চুপিচুপি বেরিয়ে গেল বাইরের ঘরে, দু—তিনটি পুরুষ কণ্ঠস্বর শোনা গেল বাইরের ঘর থেকে। একজন বলল, ''চল সিনেমায় যাই।'' রুনু বলল, ''মা রাগ করবেন'' অন্যজন বলল, ''তোমার মা এত চোখেচোখে রাখেন কেন তোমায়?'' রুনু বলল, ''মা ঠকেছিলেন কিনা, তাই চান না আমি ঠকি।'' ওরা সমস্বরে বলল, ''না না আমরা তোমায় ঠকাব না। চল বেড়াতে যাই, বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।'' রুনু যাবে না বলায় এরা পীড়াপীড়ি শুরু করল। শেষ রুনুকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাবার উপক্রম করতেই, ওদের বাধা দেবার জন্য কণিকা ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল।

সন্ধ্যা অনেকক্ষণ নেমেছে। ঘর অন্ধকার। বাইরের ঘরে আলো জ্বেলে রুনু পড়ছে। নিঃশব্দে কণিকা ওর পিছনে এসে দাঁড়াল। চমকে উঠেই রুনু হেসে ফেলল, ''কী ভয়টাই পেয়েছিলুম।''

কণিকা হাসল মাত্র। ঘরে এসে আলো জ্বেলে, ডিঙ্গি দিয়ে দেখল ছবির পিছনে বইটা একভাবেই রয়েছে। তখন সে ভাবতে লাগল উকিলের বাড়ি যাবার জন্য কাপড়টা বদলাবে কিনা।

রবিবারের বিকেল শুরু হচ্ছে, তখন কণিকা হাজির হল গীতার বাড়ি। দরজা খুলে যে লোকটা অবাক হয়ে কিন্তু কিন্তু করতে লাগল, সে যে গীতার স্বামী তাতে কণিকার সন্দেহ রইল না। খালি গা, পরনে লুঙি কোলে বাচ্চা। বয়স ষাটের কাছাকাছি, টাক অর্ধেক মাথায়। মুখের আকৃতিতে যেসব আঁচড় পড়েছে দেখলেই মনে হয় লোকটি নিষ্ঠুর, পরিশ্রমী এবং অশিক্ষিত।

''আমি আর একদিন এসেছিলাম, গীতার বৌদি হই।''

কণিকার উচ্চচারণ, বলার ভঙ্গি এতই মার্জিত, লোকটি অসহায় ভাবে পিছনে তাকিয়ে কিছু একটা অবলম্বন খুঁজল। পায়ে পায়ে দরজা থেকে পিছিয়ে গিয়ে বলল, ''ভেতরে আসুন।''

গীতা গম্ভীর হয়ে গেল। সেই একই ঘরে কণিকা বসল। লোকটা ইতিমধ্যে একটা শার্ট পরে ফেলেছে। ফিসফিস করে গীতার সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে, কণিকার অনুমান খাবারের দোকানে। গীতা ঘরে এসে চাপা সুরে বলল, ''এসেছ যে!'' কণিকা ওর দু—হাত জড়িয়ে ধরল। ''তোকে কিচ্ছুটি করতে হবে না গীতা, শুধু একবার কোর্টে দাঁড়িয়ে বলবি যা ঘটেছিল। মিথ্যে কথা বলতে হবে না। যা সত্যি তাই বলবি।''

''পাগল হয়েছ বৌদি। আজ আমার মান ইজ্জত নেই? আমি ওই হাটের মাঝে দাঁড়িয়ে বলব আমার কলঙ্কের কথা। আমি খারাপ মেয়ে ছিলুম তা তুমি নয় জানো, কিন্তু ছেলে বড় হচ্ছে সে জানলে আমার কী অবস্থা হবে, উনি জানলে আমি কোথায় দাঁড়াব।''

''আমি কোথায় দাঁড়াব আর আমি কোথায় দাঁড়াব।'' হঠাৎ ফেটে পড়ল কণিকা, ''কোথায় দাঁড়াবি সেটা তখন মনে ছিল না যখন আমার সব্বোনাশ করেছিলি। আজ আমার এই বিপদ তোর জন্যই, তোকে কোর্টে যেতে হবেই।''

সিঁটিয়ে গিয়ে গীতা দেখছিল কণিকার শরীরটা গুড়ি মেরে লাফিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। পিছিয়ে গেল সে। মাথা নাড়তে লাগল, ''না না বৌদি, আমার সব্বোনাশ আমি করতে পারব না।'' বলতে বলতে গীতা আগের দিনের মতো বেরিয়ে গেল। কণিকা একা ভাবতে লাগল, এবার কী করা যায়।

গীতার স্বামী ফিরেছে। রান্নাঘরের মধ্যে গীতা। কণিকা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরোল। ''একি শালাজ ঘরে একা বসে আর নন্দাই বৌয়ের আঁচল ধরে রান্নাঘরে।'' কণিকা হাত বাড়িয়ে বাচ্চাকে কোলে নিল।

''গীতা দেখছি খুব পোষ মানিয়ে ফেলেছে।''

কণিকা হাসছে আর প্রায় ষাট বছরের লোকটা শরীরটাকে পাক দিয়ে লাজুক স্বরে বলল, ''আপনার ননদ খুব ভাল মেয়ে।''

গীতা উনুনে হাওয়া করে যাচ্ছে। হাত পাখার খটখট শব্দ ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু শোনা গেল না।

''ভাল মেয়ে মানে! আপনার বহু ভাগ্যি তাই এমন বৌ পেয়েছেন।'' লোকটা ঘাড় নামিয়ে হেঁ হেঁ করছে দেখে বলল, ''কম সম্বন্ধ তো আসেনি। সবই ও রিজেক্ট করে দেয়। শেষে মালা দিল আপনার গলাতেই''। কণিকা ঠিক করে ফেলেছে দু—চারটে ইংরিজি শব্দ বলবে, নয়তো খাতিরটা বাড়ে না।

''আর যা দিনকাল, ভাল মেয়ে পাওয়াই দায়।'' বাচ্চাটার গাল টিপতে টিপতে কণিকা কথা চালিয়ে যেতে থাকল। লোকটা এতক্ষণ বাদে যেন বলার মতো কিছু একটা খুঁজে পেল। ''ভেজালের যুগ পড়েছে।''

বিরাট রসিকতা যেন, কণিকা শব্দ করে হেসে উঠল। উৎসাহ পেয়ে লোকটা বলল, ''আমি তো অ্যাদ্দিন আইবুড়ো ছিলুম ওই জন্যই। কোনোদিন কোনো মেয়েকে পর্শ করিনি, চোখ তুলে পর্যন্ত তাকাইনি। আমাদের যা বিজনেস, বুঝলেন বৌদি, একটা লোকও ভাল থাকে না। ঘুষ, মদ, চুরি, মেয়েমানুষ এইসব নিয়েই জীবন কাটে। আমি গোড়াতেই ঠিক করি ও সব লাইনই ধরব না। কপিলহাটের হালদারদের নাম শুনেছেন তো?''

কণিকা চোখ বড় করে বলল, ''ওমা সে তো বিরাট বনেদি বংশ।''

গর্বে গলে পড়ার মতো অবস্থা লোকটার। ''বুঝুন, আমার পক্ষে ও লাইনে যাওয়া কি সম্ভব? ইমপসিবল। বংশের নাম ডোবানো ইমপসিবল। গুরুবল আর বাপ—মার আশীর্বাদে চরিত্র আমি রক্ষে করে গেছি। ওটাই তো দুনিয়ায় সব থেকে বড় জিনিস, তাই নয়?''

''নিশ্চয়। তাই তো ভগবান এমন বউ পাইয়ে দিয়েছেন।'' কণিকা আড়ে দেখল গীতা তার দিকে তাকিয়ে, চোখে চাপা ভয়। কণিকা প্রসঙ্গ বদলে ছেলেদের পড়াশুনোর কথা তুলল।

বাড়ি ফিরে দেখে রুনুর বন্ধু হেনা তার জন্য বসে। ''মাসিমা একটা খুব দরকারি কথা ছিল।'' হেনা উৎসাহে টগবগ করছে। কণিকার সঙ্গে সে শোবার ঘরে এল। ''দাদার বন্ধু, আড়াই হাজার টাকা মাইনে পায়, থাকে বোম্বাইয়ে। তার খুব পছন্দ হয়েছে রুনুকে।''

''কী নাম তার, পরিমল ভটচাজ?''

রুক্ষস্বরে কণিকা জিজ্ঞাসা করতেই হেনার ঝকমকে বুদ্ধিদীপ্ত মুখটা মুহূর্তে নির্বোধ হয়ে গেল। ''নাতো, সুহাস ঘোষাল নাম।''

কণিকা বিন্দুমাত্র মোলায়েম না হয়ে তীক্ষ্ন চোখে কিছুক্ষণ হেনার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল। মিথ্যা বলছে কিনা। তারপর আবার প্রশ্ন করল, ''রুনুকে কোথায় দেখল, কিভাবে আলাপ হল? তোমাদের বাড়িতে?''

হেনা ঘাড় নাড়ল। তার নির্বোধ হয়ে যাওয়া মুখটা এতক্ষণেও স্বাভাবিক হয়নি।

''ছেলের কে কে আছে? বাবা মা ভাই বোন?''

''গৌহাটিতে মামারা আছে। বাবা—মা নেই।''

''ওহ।'' শুধু একটি শব্দেই কণিকা আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করে ঘরমোছা হয়নি কেন, ঝিয়ের কাছ থেকে সেই কৈফিয়ত চাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হেনার চলে যাওয়াটা সে দেখেও দেখল না। ঘণ্টাখানেক পর রুনু বাড়ি ফিরল থমথমে মুখে। কণিকা তা লক্ষ্য করল। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে শুনল রুনু ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শুনতে শুনতে বিষণ্ণ বোধ করল কণিকা। ইচ্ছে করল, ওকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। তারপরই ভাবল, দুর্বলতা দেখানো উচিত হবে না।

পরদিন সকালে কণিকা উকিলবাড়ি গেল। সেখান থেকে ডাক্তারের কাছে গেল সার্টিফিকেট নিতে। ছুটি আরও এক মাস বাড়াতে হবে। বাড়ি ফিরে দরখাস্ত লিখতে বসেছে তখন রুনু পাশে এসে দাঁড়াল। কলেজ যাবার জন্য সে তৈরি। কণিকা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই বলল, 'মা বইটা দাও।''

কণিকা ঘাড় তুলে তাকিয়ে থাকল, রুনুকে অবিশ্বাস্য ঠেকছে।

তর্ক করা বৃথা এবং রুনুর অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরের আড়ালে বিদ্রোহ লুকিয়ে আছে তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। ঘৃণা থেকেই বিদ্রোহের উৎপত্তি, কণিকার মাথায় শুধু এই কথাটাই খেলতে লাগল, চুপ করে সে বসে রইল।

''তাড়াতাড়ি দাও আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।''

ভর্ৎসনা, ধমক মিশিয়ে রুনুর কণ্ঠস্বর বীভৎস হয়ে উঠেছে। কথা না বলে কণিকা চেয়ারটা টেনে নিয়ে গেল ছবির নিচে। বইটা পেড়ে রুনুর হাতে দিতেই সে দ্রুত বেরিয়ে গেল। ধীরে ধীরে এলোমেলো হয়ে যেতে লাগল কণিকার চিন্তাগুলো। প্রচণ্ড একটা রাগ শুধু দাপাদাপি করে যাচ্ছে তার ভিতর যার তাড়নায় সে ঘরে পায়চারি শুরু করল। হঠাৎ থেমে আধলেখা দরখাস্তটা ছিঁড়ে ফেলে নতুন কাগজে সে লিখতে শুরু করল : গীতা তোমাকে সাক্ষী দিতে যেতে হবে ২০শে মার্চ। সকাল দশটায় ট্যাক্সি নিয়ে আমি যাব। যদি না আস তাহলে....

ট্যাক্সি হাজির হওয়া মাত্র গীতা আট মাসের বাচ্চাটাকে নিয়ে বেরিয়ে এল। ট্যাক্সিতে উঠতেই কণিকা বাচ্চাকে নিজের কোলে নিয়ে হেসে বলল, ''জামিন রইল।''

গীতা পাথর—মুখ করে বসে। কণিকা এক সময় বলল, ''যা—যা বলতে হবে বলে লিখে দিয়েছিলুম মনে আছে?'' গীতা ঘাড় নাড়ল।

কোর্টঘরের বাইরে লম্বা বারান্দায় কণিকা বাচ্চাকে নিয়ে পায়চারি করছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে উকিলের সঙ্গে গীতা ওই ঘরে ঢুকেছে। কয়েকবার ঘরের দরজার কাছে গিয়েও সে ফিরে এসেছে, উঁকি দিতে সাহস হয়নি। বাচ্চা ঘুমিয়ে পড়েছে। একটা বেঞ্চে জায়গা পাওয়া মাত্র সে বসে পড়ল। বসে থাকতে থাকতে তার ঝিমুনি এল। চোখ বুজে আসছে, প্রাণপণে খুলে রাখার চেষ্টা করল। কোর্টঘর থেকে উকিলের সঙ্গে গীতা বেরোচ্ছে। উকিলের মুখে হাসি, গীতা ফ্যাকাসে। উকিল ইশারায় কণিকাকে ডাকল।

''খুব ভাল সাক্ষী দিয়েছে।''

''রুনুকে আর দরকার হবে না?''

''না। আপনি বরং কাল কি পরশু সন্ধেবেলা আসবেন। মনে হচ্ছে আপনাকে আর স্বামীর কাছে ফিরে যেতে হবে না।''

কণিকা শুকনো হাসল। শরীরের প্রতি জোড় খুলে আসছে। হুড়মুড় করে হয়তো ভেঙে পড়বে এখানেই, আবার সে জিজ্ঞাসা করল, ''উকিলবাবু রুনুকে এইসব ব্যাপারে দরকার হবে না তো?''

''এর সাক্ষীতেই হবে বলে মনে হচ্ছে।''

কণিকা তাকাল গীতার দিকে। ঘুমন্ত বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে।

ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। পড়ার ঘরের টেবলে বইগুলো অগোছাল। ধুলো জমেছে টেবলক্লথে। কণিকা চেয়ারে বসে দু' হাতে কপাল টিপে ধরল। এইভাবেই বসে থাকল সে। এক সময় ঝি এসে বলল, ''খাবার ঢাকা দিয়ে রাখব?'' মাথা নাড়ল। ঝি চলে যেতে উঠে এসে উঠে এসে দাঁড়াল জানলায়। একটা কালো মোটর আসছে দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ করে সে গরাদ আঁকড়ে ধরল। মোটরটা অদৃশ্য হতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%