অস্থায়ী পলায়ন

মতি নন্দী

শীতে কলকাতায় ক্রিকেট শুরুর সঙ্গে সঙ্গে অনাদিও সাদা ট্রাউজার্স, সাদা শার্ট আর সাদা কেডস পরে হাতে কিট ব্যাগ ঝুলিয়ে ময়দানে এ মাঠ ও মাঠ ঘুরে বেড়ায় আর সুযোগ পেলেই চুরি করে। ওর চাল—চলন বা কথায় কেউ সন্দেহ করে না। সহজভাবে খেলোয়াড় বা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মেশে, টেন্টের মধ্যে ঢুকে যায়। যখন মাঠে খেলা চলে এবং দু—দলের লোকেরা মাঠের ধারে খাটানো শামিয়ানার নিচে, বা টেন্টের মধ্যে যখন ঢিলেঢালা পাহারা, অনাদি তখন কাজ হাসিল করে। হাতঘড়ি, ফাউন্টেন পেন, মানিব্যাগ, টেরিলিন শার্ট বা ট্রাউজার্স, দামি ব্যাট, জুতো যা পায় হাতিয়ে নিয়ে সরে পড়ে।

সেদিন অনাদি ব্যাগ হাতে একটু ব্যস্ততার সঙ্গে মালিকে জিজ্ঞেস করল, ''এটা কোন ক্লাবের মাঠ?''

''ইউনাইটেড ক্লাবের।''

''এ মাঠে আজ হাতিবাগান স্পোরটিংয়ের খেলা না?''

মালি ঘাবড়ে গেল, তারপর বিরক্ত হয়ে বলল, ''কি জানি, বাবুদের জিজ্ঞাসা করুন।'' অনাদি লক্ষ্য করল, টেন্টের দরজায় দাঁড়িয়ে ধুতির মধ্যে শার্ট গোঁজা, টাকমাথা এক মাঝবয়সী লোক খুবই উৎকণ্ঠিত হয়ে এধার—ওধার তাকাচ্ছে। টেন্টের মধ্যে বুট পরে সিমেন্টের মেঝের উপর চলাফেরার শব্দ হচ্ছে খড়মড় খড়মড়। ড্রেস—করা একজন ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে টাকমাথাকে কি যেন বলতেই লোকটি রেগে উঠে চেঁচিয়ে বলল, ''আসবে কি আসবে না, সেটা ঠিক করে বললেই তো পারত। এখুনি তো টিমের নাম সাবমিট করতে হবে।''

টেন্টে এবং তার সংলগ্ন কাঠা তিনেক জমি নিচু ফেন্সিং—এ ঘেরা। তার মধ্যে রয়েছে ঘাসে ঢাকা একফালি জমি। কিছু গাঁদাফুলের গাছ। দুটো বেঞ্চ। টিউবওয়েল। অনাদি এগিয়ে গেল টাকমাথা লোকটির দিকে।

''আচ্ছা আজ কি এখানে হাতিবাগানের খেলা আছে?''

''হাতিবাগান!'' লোকটি অবাক হয়ে গেল। ''ও নামের কোনো ক্লাব খেলে নাকি?''

''তা তো জানি না।'' আমতা—আমতা করে অনাদি বলল, ''আমার এক বন্ধু বলেছিল কিন্তু খেলাটা যে কোন মাঠে সেটাই ভুলে গেছি। লিগের নয়, এমনি ফ্রেন্ডলি খেলা।''

''তাহলে এতবড় গড়ের মাঠে আর কি করে বার করবেন।'' লোকটিকে অনাদির থেকেও বেশি হতাশ মনে হল। ''আপনি খুঁজছেন ক্লাব, খেলবেন বলে, আর আমার ক্লাব খুঁজছে তার প্লেয়ারদের! কাল তিনজন এক সঙ্গে বরযাত্রী গেছে রানাঘাটে, বলে গেছে ঠিক সময় মাঠে পৌঁছব। আর এখন দশটা বাজতে.....''

টেন্টের মধ্যে থেকে সাদা—কোট পরা আম্পায়ারকে বেরিয়ে আসতে দেখে টাকমাথা চুপ করে গেল। ''আর দু—মিনিট স্যার। আমি আপনার হাতে লিস্ট দিয়ে আসব। জাস্ট দু—মিনিট। বুঝতেই তো পারছেন কি মুশকিলে পড়েছি।''

আম্পায়ার হাতঘড়ি দেখে আবার ভিতরে ঢুকে গেল। লোকটি কিছুটা আপন মনে কিছুটা অনাদিকে উদ্দেশ করে কাতর স্বরে বলল, ''সাত সকালে মাংস রান্না করে, হাঁড়ি—কুড়ি কাপ—ডিস—প্লেট, খেলার ব্যাট—প্যাড—এত লটবহর নিয়ে যদি ইছাপুর থেকে আসতে পারি, আর বাবুরা নেমন্তন্ন খেয়ে....ঘণ্টু ছাড়া তো মোটে ন'জন হাজির হয়েছে, ঘণ্টু স্কোর লিখবে, আর.....ধ্যেৎ এভাবে কি ক্লাব চালানো যায়।''

টেন্ট থেকে চারটি ছেলে ব্যাট আর বল নিয়ে বেরিয়ে গাঁদাগাছের পাশে খুটখাট প্র্যাকটিস শুরু করল। মাঠের ধারে খাটানো শামিয়ানার পাশে কয়েকজন বল লোফালুফি করছে। পাশের মাঠের সাইট স্ক্রিন বাতাসে খুলে বাঁশে ঝুলছে। পাশের টেন্ট থেকে ভারী গলায় মালিকে ধমক দেবার শব্দ এল। অনাদির শীত করছে। রোদ্দুরে মাঠের ধারে ঘাসের উপর এখন উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে আরাম।

''বকুদা তাহলে কি হবে?'' কাগজ আর কলম হাতে, বুটের খড়মড় আওয়াজ তুলে একজন এসে দাঁড়াল। ''ইউনাইটেড তো অনেকক্ষণ টিম সাবমিট করে দিয়েছে।''

অনাদি এগিয়ে গেছে খানিকটা। টাকমাথা লোকটি অর্থাৎ বকুদা ছুটে এসে ওর হাত ধরল। ''কোথায় আর হাতিবাগান স্পোরটিংকে খুঁজে বেড়াবেন, তার চেয়ে আজ আমাদের হয়েই খেলে যান। নামটা কি বলুন তো, লিগে আর কোনো ক্লাবের হয়ে খেলেননি তো? আর খেললেই বা কেউ ধরতে পারবে না। বরং একটা ফলস নামেই খেলুন, কেমন?''

অনাদিকে কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে বকুদা ঘসঘস করে কাগজে নাম লিখে, ''অঞ্জন বিশ্বাস, কেমন? তবু তো দশজন হল।'' বলতে বলতে ছুটে টেন্টের মধ্যে ঢুকল।

ইউনাইটেড ১৫৭ রান তুলল চার উইকেটে। অনাদি প্রথম আধ ঘণ্টার মধ্যেই তিনটি ক্যাচ ফেলল। প্রথমটি স্লিপে, দ্বিতীয়টি মিড—অনে, তৃতীয়টি ডিপ—স্কোয়ার লেগে। পাড়ার রাস্তায় ক্যাম্বিস বলে ক্রিকেট খেলার বেশি অনাদি আর খেলেনি। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কখনো ভাবেনি সে। তার দলের প্রত্যেকের মুখের বিস্ময়, অসহায় বিরক্তিতে রূপান্তরিত হল। মাঠের বাইরে দুটো চ্যাংড়া ছেলে কিছুক্ষণ ওর পিছনে লেগে অবশেষে একঘেয়ে বোধ করে চলে গেল। অনাদিকে কোথায় যে দাঁড় করাবে, ভেবে পাচ্ছে না অধিনায়ক। লং লেগ থেকে লং অন তারপর ডিপ একস্ট্রা কভার, অবশেষে ডিপ থার্ড—ম্যান। উবু হয়ে ভয়ে ভয়ে দুহাতে থাবড়ে বল আটকাতে গিয়ে আটটা বাউন্ডারি দিল অনাদি। ওর কাছে বল গেলেই ব্যাটসম্যানরা নির্ভাবনায় রান নেয়। মাঠের বাইরে ইউনাইটেডের লোকেরা তখন হইচই, হাসাহাসি করে। মাঠের মধ্যে একজন, ওভার শেষে অনাদিকে শুনিয়েই বলল, ''বকুদা আর লোক পেল না, একটা পাঁঠাও যে এর থেকে ভাল ফিল্ডিং দেবে।'' শুনে হাসি লুকোবার চেষ্টাও করল না বোলারের দিকের আম্পায়ার। একজন ব্যাটসম্যান খুবই সহানুভূতির সঙ্গে উইকেট—কিপারকে বলল, ''এখন আর কিছু বলবেন না দাদা, তাহলে আরো ঘাবড়ে যাবে।''

এরপর অনাদি ক্ষ্যাপার মতো ছোটাছুটি শুরু করল। বুক দিয়ে হাঁটু দিয়ে, এমনকি ঝাঁপিয়ে মাথা দিয়েও বল আটকাল এবং সবাইকে তাজ্জব বানিয়ে রান আউটও করল ত্রিশ গজ দৌড়ে এসে, কভার থেকে সোজা উইকেটে বল মেরে। তিন চারজন ফিল্ডার ছুটে এসে ওর পিঠ চাপড়াল, আউট হওয়া ব্যাটসম্যানটিও হেসে ''গুড থ্রো'' বলে গেল। অনাদি অভিভূত হয়ে বোকার মতো হাসল মাত্র এবং পরের ওভারই অতি সহজ ক্যাচটি ফেলে দিল। মাঠের নয়জনের কণ্ঠ থেকে চাপা একটা আর্তনাদ উঠেই সেটা ক্রুদ্ধ গর্জনে পরিণত হল। ওভার শেষে অধিনায়ক অনাদির কাছে এসে উঁচু গলায় বলল, ''দেখি তো, আপনার আঙুলে বোধহয় লেগেছে।'' ওর হাতটা তুলে আঙুল পরীক্ষা করতে করতে তারপর দাঁতে দাঁতে চেপে বলল, ''আমরা ন—জনেই খেলব, আপনি দয়া করে বেরিয়ে যান।''

মাথা নামিয়ে মুখটা কালো করে অনাদি মাঠ থেকে বেরিয়ে এল, সবাই ওর দিকে তাকিয়ে। মুখ টিপে কেউ কেউ হাসল, বকুদা শুকনো স্বরে বলল, ''চলে এলেন কেন?''

অনাদি বলল, ''আঙুলে লেগেছে, খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।''

বকুদা মুখ ফিরিয়ে মাঠের দিকে তাকাল। অনাদি ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে গেল। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রান আউট হওয়া ব্যাটসম্যানটি এক সুরূপা তরুণীর সঙ্গে হাসাহাসি করছে। একটি বছর দশেকের ছেলে ওর ব্যাটটি নিয়ে ড্রাইভ করায় ব্যস্ত। অনাদি আর টেন্টের দিকে গেল না।

লাঞ্চের পর ইছাপুর ব্যাট করতে নামল। চটপট ১৯ রানে তিনটে উইকেট পড়ে যাবার পরই জেতবার আশা ছেড়ে, ড্র—এর জন্য খেলতে লাগল। চতুর্থ উইকেটে দুই ব্যাটসম্যান সওয়া ঘণ্টা কাটিয়ে ৪৩ রান তুলেছে। অনাদির নাম সবার শেষে দশ নম্বরে। ইতিমধ্যে ও ঠিক করে ফেলেছে, চলে যাবে ব্যাট না করেই। লাঞ্চের সময় দেখে রেখেছে একটা সোয়েটার, যার দাম অন্তত আশি—নব্বই টাকা। প্রাকৃতিক কাজের ছুতোয় টেন্টের মধ্যে বার দুয়েক ঘুরে এসে গাঁদাগাছের ধারে বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে করতে অনাদি ভিতরে নজর রাখল। মাঠে তখন লড়াই জমতে শুরু করেছে। কাজ হাসিল করে এইবার পালাতে হবে।

তখন সেই তরুণীটিকে টানতে টানতে বাচ্চা ছেলেটি ব্যাট হাতে হাজির হল। অনাদি অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেও কৌতূহলে তাকিয়ে রইল। ওকে দেখে তরুণীটি ঈষৎ বিব্রত হয়ে ছেলেটিকে বলল, ''বুলু অসভ্যতা কোরো না। হাত ছাড়ো, বলেছি তো খেলব।''

''আগে তুমি ব্যাট করো।''

তরুণী তার হাতের ব্যাগটি কোথায় রাখবে ভেবে চারিদিকে তাকিয়ে ইতস্তত করছে; ছেলেটি ছোঁ মেরে তার হাত থেকে নিয়ে ছুটে অনাদির কাছে বলল, ''দিদির ব্যাগটা রাখুন তো।''

''আমি যে এখুনি যাব ব্যাট করতে।'' অনাদি ঝুটঝামেলা এড়াবার জন্য বলল। ছেলেটি ওর কথায় কর্ণপাত করল না। ঘাড় ফিরিয়ে অনাদি খুবই বিরক্ত চোখে ওদের এলেবেলে খেলা দেখতে লাগল। তরুণীর প্রত্যেকটি বলই ফস্কে যাচ্ছে, ছেলেটি কুড়িয়ে আনছে, তরুণী মুখ লাল করে আবার ব্যাট হাতে দাঁড়াচ্ছে। দেখতে দেখতে অনাদি অন্যমনস্কের মতো ব্যাগটির ঢাকনার স্প্রিং—এ চাপ দিতেই মুখটা ফাঁক হয়ে গেল। চমকে সে ঢাকনাটা বন্ধ করে এধার—ওধার তাকাল। কেউ দেখছে না তাকে, তবু দুরদুর করে উঠল ওর বুকের মধ্যে। অবশ হাতের ব্যাগটা কোলের উপর রেখে অনাদি ওদের খেলার দিকে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পরই তার আঙুলগুলো কেঁপে উঠল। ঢাকনার স্প্রিং টিপল সন্তর্পণে। রুমাল, চিরুনি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে তার আঙুল দ্রুত ব্যাগের তলদেশে পৌঁছল। বৃত্তাকার, কঠিন একটি জিনিসের স্পর্শ পেতেই তার মনে হল নিশ্চয় আংটি! দুই আঙুলে সেটিকে চিমটের মতো ধরে, তরুণী ও ছেলেটির খেলার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে, টেনে বার করে এনেই ট্রাউজার্সের পকেটে রেখে ব্যাগটি বন্ধ করল। তারপর সতর্ক দৃষ্টিতে চারধারে তাকিয়ে আশ্বস্ত বোধ করতে করতে উত্তেজনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। খেলার মাঠ থেকে শোরগোলের যে শব্দটা অনাদি এতক্ষণ শুনতে পাচ্ছিল না, ক্রমশ সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।

''একি আপনি এখানে! হন্তদন্ত হয়ে বকুদা হাজির হল। ''ছটা উইকেট পড়ে গেছে জানেন না? এখনো প্যাড পরেননি!''

''হ্যাঁ এই যাই'' অনাদি ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। ''খোকা ব্যাগটা রইল।''

শামিয়ানার তলায় প্যাড পরতে পরতে অনাদি খুব ঝরঝরে বোধ করল। বকুদা ওর পাশে বিড়বিড় করে যাচ্ছে—''আর কুড়ি মিনিট বাকি। কাটিয়ে দাও মদনমোহন। বুঝলেন, রানের কোনো দরকার নেই। কোনো রিস্ক নেবেন না। স্টাম্পের বাইরের বলে একদম ব্যাট ঠেকাবেন না। হে মদনমোহন আর আঠারো মিনিট। অনেকক্ষণ টাইম নেবেন ফিল্ড দেখার জন্য, মাঝে মাঝে প্যাডের বকলস ঠিক করবেন, বদলাবার জন্য ব্যাট চাইবেন। আর—'' মাঠের মধ্যে হঠাৎ একটা বীভৎস চিৎকার ওঠায় বকুদার কথা থেমে গেল। ইছাপুরের সপ্তম উইকেটটি পড়ল লোপ্পাই ক্যাচ দিয়ে। নবম ব্যাটসম্যান নামতে চলেছে, বকুদা ভগ্নস্বরে বলল, ''আর পনেরোটা মিনিট আছে রে।''

অনাদি দেখছিল, আড়ষ্ট পায়ে, ভীত চোখে এধার—ওধার তাকাতে তাকাতে কেমন করে ব্যাটসম্যানটা উইকেটের দিকে চলেছে। ওর হাসি পেল। ভাবল, আমার তো আসল কাজ হয়েই গেছে। উইকেটে যাব আর চলে আসব। হার—জিত নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আসলে ব্যাট করবে তো অঞ্জন বিশ্বাস। স্কোর—বুকে ওই নামই তো লেখা আছে।

''আমার স্পষ্ট মনে আছে, ব্যাগের মধ্যেই রেখেছিলাম।''

অনাদি চমকে উঠল, পিছন থেকে বলা সেই তরুণীর কণ্ঠস্বরে।

''তাহলে যাবে কোথায়!'' ভারী একটি পুরুষ কণ্ঠ উদ্বেগ ও বিরক্তি সহকারে বলল, ''আর একবার ভাল করে ব্যাগটা দেখ।''

''তিন—চারবার তো দেখলাম।''

''ব্যাগটা কোথায় রেখেছিলিস?''

অনাদি মূর্তির মতো বসে। ওর মনে হল, একজোড়া চোখ তার দিকে তাকাচ্ছে। ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকালেই চোখাচোখি হবে। চোখ দুটো নিশ্চয় তাকে সন্দেহ করছে। এইবার হয়তো বলবে, উঠে আসুন তো, আপনাকে আমরা সার্চ করব। আপনি ছাড়া আর কে নিতে পারে? তারপর ওরা শেষ ব্যাটসম্যানকে যেভাবে ফিল্ডাররা ঘিরে ধরে সেইভাবেই গোল হয়ে ঘিরে ধরবে। তারপর ওদের একজন এগিয়ে আসবে।

পালাতে হবে। এই মুহূর্তে এখান থেকে পালাতে হবে। অনাদির মাথার মধ্যে শুধু কথাটিই পাগলাঘণ্টির মতো বেজে চলল। কিন্তু কোন দিক দিয়ে, কিভাবে পালাবে! এতদিন একবারও সে ধরা পড়েনি।

মাঠে আবার একটা হিংস্র উল্লাস ফেটে পড়ল। বকুদা অস্ফুট একটা আর্তনাদ করে বলে উঠল, ''আর, বারোটা মিনিট মাত্র।'' অনাদি ছিটকে উঠে দাঁড়াল। ব্যাটটা হাতে তুলে নিয়ে, শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে, মাঠের মাঝখানে যাবার জন্য সে প্রায় ছুটতে শুরু করল।

ওভারের চারটি বল বাকি ছিল। বুক এবং পেট দিয়ে দুটি বল সে আটকাল এল বি ডবলুর ফাঁড়া কাটিয়ে। তৃতীয় বল ওর ব্যাট ছুঁয়ে দুজন স্লিপ ফিল্ডারের মধ্যে দিয়ে গলে যেতেই অপর ব্যাটসম্যানের নিষেধ অগ্রাহ্য করেই ছুটল এবং অল্পের জন্য রান আউট হওয়া থেকে বাঁচল। চতুর্থ বলটি স্টাম্পের বাইরে ছিল, খেলার চেষ্টা করল না।

এরপরই অবিশ্বাস্য এবং হাস্যকর ব্যাপার ঘটে গেল। অনাদি তেত্রিশ রান করল এই ওভারে। পাঁচটি ওভারবাউন্ডারি ও একটি তিন। পরের ওভারের ত্রিশ রান। পাঁচটি ওভারবাউন্ডারি। শেষ বলটি ব্যাটে লাগেনি এবং উইকেট—কিপারও ফস্কায়, তাইতে ওরা একটি বাই রান নেয়। খেলার শেষ ওভারে অনাদি আরো দুটি ওভারবাউন্ডারি মারার পরই দেখল মাঠের বাইরে থেকে ইচ্ছাপুরের খেলোয়াড়রা তার দিকে ছুটে আসছে পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে।

ওরা কাঁধে করে অনাদিকে টেন্টে আনল। ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় বকুদার চোখ দিয়ে শুধু জল ঝরছে। ইউনাইটেডের খেলোয়াড়রা অবাক চোখে বার বার এখনো তার দিকে তাকাচ্ছে, আর খেলার প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে নিজেদের মধ্যে আবোল—তাবোল কথা বলে যাচ্ছে। ওরা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না ব্যাপারটা! কে একজন বলল, ব্র্যাডম্যানের চব্বিশ বলে সেঞ্চুরি করার রেকর্ডটি নিশ্চয়ই ভাঙতে পারতেন, যদি না উইন হয়ে যেত। আর একজন বলল, এ খেলার গল্প কাউকে করলে বলবে গাঁজায় দম দিয়ে বলছি। ফ্যান্টাস্টিক! আজ কার মুখ দেখে যে উঠেছিলুম, সতেরো বলে ছিয়াত্তর রান!

অনাদি চুপ করে বসে আছে। বিরাট এক বিস্ময়ের কেন্দ্রমধ্যে অবস্থান করার অনুভব সে বোধ করছে। এক বিচিত্র ঘূর্ণিতে পাক খাওয়ার আনন্দে তার ভিতরটা টলছে। হঠাৎ তার চোখে পড়ল, টেন্টের বাইরে বেঞ্চে তরুণীটি বিষণ্ণ মুখে বসে, পাশে বাচ্চা ছেলেটি। আনন্দের রেশটা ওই বিষণ্ণ মুখ ছিঁড়ে দিচ্ছে। মুখ ফিরিয়ে অন্যত্র দৃষ্টি নিবদ্ধ করেও সে রেহাই পেল না। একটা পাষাণভার ক্রমশই বুকে চেপে বসছে।

অবশেষে অনাদি তরুণীর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে আংটিটি বার করে এগিয়ে ধরে বলল, ''এটা কি আপনার?''

''হ্যাঁ, এই তো!'' বিষণ্ণতা মুহূর্তে খুশিতে ফেটে পড়ল। ''পেলেন কি করে? বাবা বাবা, পেয়েছি।'' চিৎকার করে উঠল তরুণী।

''এই বেঞ্চের তলাতেই পড়েছিল। তখুনি বলব ভেবেছিলুম, কিন্তু এমন তাড়াহুড়োর মধ্যে ব্যাট করতে যেতে হল যে—''

''ওহ, কি দারুণ যে ব্যাট করেছেন, ভাবাই যায় না...অকল্পনীয়, সত্যি বলছি আংটির কথাটা তখন একদম ভুলেই গেছলাম।''

বাচ্চা ছেলেটি বলল, ''কাল কাগজে আপনার নাম বেরোবে, না?''

অনাদি মাথা নামিয়ে মৃদু মৃদু হাসল, তারপর ফিরে এল। বকুদা চায়ের কাপ এগিয়ে ধরে বলল, ''সামনের রোববার শোভাবাজারের সঙ্গে খেলা, আসছেন তো?''

অনাদি উত্তর দেবার আগেই একজন ডাকল, ''বকুদা একটুখানি আসুন তো, কাগজের জন্য খবরটা কিভাবে লিখব বলে দিয়ে যান।''

ব্যস্ত হয়ে বকুদা স্থান ত্যাগ করতেই অনাদি আপনমনে হাসল। ভেবেছিল সকলের হাতে ধোলাই খাবে, কিন্তু বদলে পাচ্ছে তারিফ আর আপ্যায়ন। এখন নিজেকে একদম অন্য মানুষ বোধ হচ্ছে, সম্পূর্ণ অপরিচিত। নিজেকে অদ্ভুত রকমের ভাল লাগছে তার। আংটিটা ফেরত না দিলে, বিক্রি করে কয়েকটা টাকা পাওয়া যেত বটে, কিন্তু এই অনুভবের মধ্যে মহৎ না হয়ে উপায় কি!

নিজের ব্যাগটা হাতে নিয়ে অনাদি যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল। তখন তার কানে এল বকুদার কথাগুলো—''ভালভাবে রিকোয়েস্ট করে বোলো, যাতে অঞ্জন বিশ্বাস নামটা বোল্ড টাইপে ছাপায়।''

শুনে অবাক হয়ে গেল অনাদি। কে অঞ্জন বিশ্বাস? তারপরই মনে পড়ল, আর সঙ্গে সঙ্গে নিজের সম্পর্কে বিস্ময়জনিত যাবতীয় অনুভব থেকে বঞ্চিত হয়ে সে বোকার মতো হাসল এবং নিজেকে শুনিয়ে বলল, ''যাচ্চচলে, আমার লোকসান করিয়ে মাঝ থেকে সব ক্রেডিট নিয়ে বেরিয়ে গেল ব্যাটা!''

এরপর অনাদি কাউকে কিছু না বলে টেন্ট থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল।

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%