সেই আবছা মুখগুলো

মতি নন্দী

ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দুজন ইতস্তত করল। উপুড় হয়ে, মাথাটা হাড়িকাঠের মতো দুই বাহুর মধ্যে রেখে গীতা মেঝেয় শুয়ে, সন্ধ্যা থেকেই এইভাবে শুয়ে থাকে কিছু করার না থাকলে। ওরা দুজন তাক থেকে পড়ার বই নিয়ে, ঘরের কোণে খাট আর দেয়ালের মধ্যে অল্প জায়গাটুকুতে বসল, খাটটা ইট দিয়ে উঁচু করা, সংসারের তিন—চতুর্থাংশ বস্তু রাখা, ঘরের বাইরে দালানটায় রান্না হয়, রাত্রে ক্যাম্পখাট পেতে অসীম শোয়।

বিড়বিড় করে ওরা পড়ছে। গীতা ওদের দিকে না তাকিয়েই বলল, ''সারাদিনই তো শুধু খেলা, হাত—পায়ের নোংরা কাদা ধোবে কে?''

ওরা দুজন গুটিগুটি ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, গীতা আবার বলল, ''নন্দুকে বলো বাড়ি ফিরতে, দীপ্তিদের বাড়ি গেছে।''

নীলু আর বাচ্চু রাস্তার টিউবওয়েলে পরিষ্কার হয়ে, পেট ভরে জল খেল।

''হারুদাদের রকে ক্যারাম খেলছে, যাবি?''

''দেরি হয়ে যাবে, দিদিকে ডাকতে হবে না?'' নীলু এক বছরের বড়, স্বরে তা ফুটে উঠল।

দীপ্তিদের সদরে দাঁড়িয়ে নীলু চিৎকার করে ডাকতেই ছাদ থেকে ঝুঁকে নন্দু বলল, ''একটু পরে যাচ্ছি বল গিয়ে।'' নীলু ওর মুখটা দেখার চেষ্টা করল, অন্ধকারে দেখতে পেল না, ফেরার সময় হঠাৎ বাচ্চু হেঁচকি তুলে কুঁজো হয়ে বমি করল! শুধু টিউবওয়েলের জলটুকু বেরোল। কাতর হয়ে বার বার সে বলল, ''মাকে বলবি না তো।''

ঘরে এসে ওরা এবার চেঁচিয়ে পড়তে শুরু করল। গীতা একইভাবে শুয়ে। সাতদিন ধরে একই পদ্য চিৎকার করে পড়ে চলেছে বুঝেও সে চুপ রইল। ভাবনা নন্দুকে নিয়ে। আড্ডা দিয়ে এখনো ফিরল না। কদিন আগে দীপ্তির মেজদাকে অন্য পাড়ার ছেলেরা নাকি মেরেছে, মেয়ে স্কুলের কাছে কী করেছিল বলে। ও—বাড়িতে রোজ রোজ যেতে মানা করা সত্ত্বেও যাবেই। শরীরটাকে হিঁচড়ে তুলে গীতা ভাবল, মারতে মারতে ওকে বাড়ি আনব।

তখনই নন্দু ফিরল। গীতা তীব্রভাবে তাকাল ওর দিকে। চোখ ছলছলে, উত্তেজনায় মুখে লাবণ্য ধরেছে বলে গীতার মনে হল। তাইতে বুক কেঁপে উঠল। নন্দুর ব্লাউজের বোতাম, খোঁপা, শাড়ির ভাঁজগুলো উপযুক্তভাবে আছে কিনা একপলকে দেখেই গীতা চড় মারতে হাত তুলল। ''ও বাড়িতে এতক্ষণ পর্যন্ত থাকার কী আছে? ডাকলে গ্রাহ্য হয় না, সঙ্গে সঙ্গে আসতে পার না?''

''আসছিলুম তো। বুড়িদির শ্বশুরবাড়ি থেকে কাঁঠাল পাঠিয়েছে, জেঠিমা বলল অত বড় কাঁঠাল কে খাবে?''

পড়া বন্ধ করে নীলু, বাচ্চু তাকাল। গীতা উদ্যত হাতটা নামিয়ে বলল, ''খেয়ে এসেছিস।''

''গোটাটা খেলি?'' নীলু বিশ্বাস করতে পারছে না। বাচ্চু বলল, ''দিদির পেট খারাপ হবে, না মা?''

গম্ভীর হয়ে নন্দু শাড়ি বদলাতে লাগল। পড়া ভুলে ওরা তাকিয়ে! গীতা ক্লান্ত স্বরে বলল, ''কাপড়গুলো সকাল থেকে সেদ্দ হয়ে পড়ে আছে, কাচবি কখন।''

''চৌবাচ্চায় কি জল আছে। ওপরের ওরা তো সবাই বিকেলে হুড় হুড় করে জল ঢেলে গা ধুল।''

''না থাকে নীলু টিউকল থেকে এনে দেবে।''

সঙ্গে সঙ্গে নীলু দাঁড়িয়ে পড়ল। বাচ্চু বলল, ''আমি কল টিপব।''

কলঘরে যাবার সময় কাপড়ের ছেঁড়া জায়গাগুলো ঢাকার চেষ্টা করতে করতে নন্দু বলে গেল, ''বেরোবার একটা ভাল কাপড় নেই, ঘরেও যে পরব তাও নেই।'' ওর সঙ্গে নীলু বাচ্চুও বেরিয়ে গেল, গীতা দুই বাহুর হাড়িকাঠে মাথা রেখে আবার শুয়ে রইল।

নিঃসাড়ে ঘরে ঢুকে নৃসিংহ জামা খুলছে টের পেয়েই গীতা উঠে বসল। তাকাচ্ছে না নৃসিংহ তার দিকে। চশমাটা ঘামে পিছলে নেমে এসেছে অনেকখানি। লুঙি পরে চশমাটা আঙুল দিয়ে ঠেলে তুলে দিল।

''কাল রেশন আসবে কি?''

গামছা নিয়ে নৃসিংহ সাবানের বাক্সটা খুলে দেখার ছলে গীতার দিকে তাকিয়েই বেরিয়ে গেল দ্রুত। নন্দুর কাপড় কাচার ধপধপ শব্দ আসছে। গীতা বসে থাকল দেয়ালে ঠেস দিয়ে। নীলু চেঁচাচ্ছে, ''দিদি বালতি দে, বাবা টিউকলে চান করবে।''

চোখ বুজে গীতা বসে আছে। সদরে কড়া নেড়ে কে বলল, ''অসীম ফিরেছে?''

''না।'' নন্দু চেঁচিয়ে বলল।

''ফিরলে বলবেন পটাদা খোঁজ করছিল, যেন বাড়ি থাকে। আমি আবার আসব।''

গীতা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বছর চল্লিশের কালো, বেঁটেখাটো একটি লোক। হাতে ফোলিও ব্যাগ। পাঞ্জাবির বুক পকেটে ঝুলে রয়েছে চশমার একটি ডাঁটি। গলায় প্রচুর চর্বি—তার মধ্যে বসে আছে পাতলা সোনার চেন।

''অসীমকে খুঁজছি।''

''আমি অসীমের মা।'' সন্তর্পণে গীতা বলল। লোকটা তখুনি দোকানদারের মতো নমস্কার করে বলল, ''আগে একবার ঘুরে গেছি বৌদি। আমাদের গ্রামে কাল ফাইনাল খেলা, আমার টিম উঠেছে।'' লোকটির মুখ সুখে ভরে উঠল। তারপরই অসহায় কণ্ঠে বলল, ''আমার স্টপার ছেলেটার মা আজ সকালেই মারা গেছে।'' বলে তাকিয়ে রইল গীতার দিকে। অস্বস্তি বোধ করল গীতা। ভেবে পেল না কী বলা উচিত।

''অসীমই আমায় উদ্ধার করতে পারে।'' লোকটি হাঁফ ছেড়ে উঠল।

''ও তো হাবড়া না কোথায় যেন খেলতে গেছে। আসার তো কিছু ঠিক নেই।''

''তাইতো,'' লোকটি মুষড়ে পড়ল। ''হঠাৎ এমন বিপদেই পড়ে গেলুম, মৃত্যুর ওপর তো আর হাত নেই কারু। গেছলুম এক ফাস্ট ডিভিশন প্লেয়ারের কাছে। তিরিশ টাকা আগাম দোব বলে কবুল করলুম। বলল, আজ সকালেই আর এক জায়গা থেকে টাকা খেয়ে বসে আছে, না গেলে তারা পিঠের চামড়া তুলে নেবে।''

লোকটা জোরে কথা বলে, তড়বড়িয়ে বলে, বেশি বলে। গীতা অভ্যস্ত নয় এইসব কথাবার্তায়! চুপ করে রইল।

''আমি বরং একটু ঘুরে আসছি। দাদা কোথায়?''

''উনি চান করছেন।''

''আচ্ছা আচ্ছা, অসীমকে আমার হয়ে একটু বলবেন। বড্ড বিপদে পড়ে গেছি, মৃত্যুর ওপর তো আর হাত নেই।''

নৃসিংহ ফেরামাত্র গীতা কথাগুলো তাকে জানাল।

''বসতে বললে না কেন? আজই তাহলে খোকা তিরিশ টাকা পেয়ে যেত। ঘুরে আসছি মানে ততক্ষণ আর কাউকে ধরতে গেল। পেয়ে গেলে আর আসবে না।''

হতাশায় নৃসিংহ খাটে গা এলিয়ে দিল। গীতা ব্যস্ত হয়ে নীলুকে বলল, ''দেখ তো লোকটা বেশি দূর হয়তো যায়নি। দেখলে ডেকে নিয়ে আসবি!''

নীলুর সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চুও ছুটে বেরিয়ে গেল। বিরক্ত স্বরে নৃসিংহ বলল, ''বুদ্ধি করে আটকে রাখবে তো।''

''কীভাবে আটকাবো? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করব না ঘরে এনে বসাব? এক কাপ চা—ও তো দিতে হবে।''

রেগে উঠল গীতা, সদরে এসে ডাক দিয়ে দেখল। উঠোনের তারে ভিজে কাপড় মেলতে মেলতে নন্দু গুনগুন করছে। একটু পরেই নীলু বাচ্চু ফিরল মাথা নাড়তে নাড়তে।

''তিরিশ টাকা হাতে না নিয়ে খোকার যাওয়া উচিত হবে না।'' গীতা ঘরে ঢোকামাত্র নৃসিংহ বলল।

''অত কি দেবে, নবদ্বীপে গিয়ে তো কুড়ি পেয়েছিল।''

''কত বড় একটা মাছ এনেছিল!'' বাচ্চু দ্রুত যোগ করল।

''বিপদে পড়ে এসেছে বলেছে যখন, তিরিশ চাইলে তিরিশই দেবে। ফার্স্ট ডিভিশনের যা সব প্লেয়ারের ছিরি, খোকা তাদের থেকে কিসে কম!'' নৃসিংহ উঠে বসল, ''ওসব নামকা ওয়াস্তেই ডিভিশনের প্লেয়ার, এই বয়সে আমি যা থ্রু দোব পারুক দেখি কেউ।''

''গৌতমের সঙ্গে পারবে?'' বাচ্চু ফিসফিসিয়ে নীলুর কাছে জানতে চাইল। আড়ে বাবাকে দেখে নিয়ে নীলু ঠোঁট ওলটাল, ''দাদার সঙ্গেই পারবে না।'' বাচ্চু সায় দেবার মতো চোখ করল।

''আমরা শিখেছিলুম মুখে রক্ত তুলে। তখন তো পাঁচ দশ হাজারের ব্যাপার ছিল না যে টাকার মুখ চেয়ে খেলব। ট্রামভাড়া পেলেই বর্তে যেতুম। তবুও তো খেলেছি।''

নৃসিংহ চিবুক তুলে এমনভাবে তাকাল যে ছাব্বিশ বছরের চেনা স্বামীকে গীতার মনে হল এই প্রথম দেখছে। নন্দু গল্পের বই নিয়ে বসেছে। গীতা বলল, ''দেখ না নন্দু একটু ভাল চা পাওয়া যায় কি না, ভদ্রলোক এলে দিতে হবে তো।''

''দীপ্তিদের বাড়ি থেকে?'' চোখ না তুলেই নন্দু বলল। ''পারব না। কেরোসিন এনেছিলুম এখনো শোধ দেওয়া হয়নি। আর আমি কিছু চাইতে পারব না।''

''তা পারবে কেন, শুধু লোকের বাড়ি খেয়ে আসতে পারবে। সংসারে উপকার হয় যে কাজে তা করবে কেন।''

''করি না? ঝিয়ের মতো শুধু তো খেটেই চলেছি। ভাল একটা কাপড়ও জোটে না, একটা সিনেমা পর্যন্ত দেখতে পাই না। শুধু গালাগাল আর মার, এবার যেদিকে দু—চোখ যায় চলে যাব।''

নন্দু গলা কাঁপিয়ে তারপর দপদপিয়ে বেরিয়ে গেল। বিকৃত করা ছাড়া নৃসিংহ মুখটাকে নিয়ে আর কিছু করতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ''রকে গিয়ে বসছি।''

থম হয়ে বসে রইল গীতা। নীলু কিছু বলতে যাচ্ছিল, ধমকে উঠল, ''তোদের কি পড়াশুনো নেই?''

রকের একপ্রান্তে কয়েকজন যুবক তাস খেলছে। কর্পোরেশনের রাস্তার আলোটা দিনেও জ্বলে। বালবটা কয়েক হপ্তা অন্তর কেটে যায়। এবার কবে কাটবে তাই নিয়ে নৃসিংহ ও পরিমলবাবু কথা শুরু করে গাফিলতি, ঘুষ, ভেজাল ইত্যাদির বহুবিধ উদাহরণ দিয়ে মানুষ কী পরিমাণ চরিত্রভ্রষ্ট হয়েছে প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে উঠল। নৃসিংহ বলল, ''টাকা না দিলে আজকাল কোনো কাজই করানো যায় না। খেলবে, তাও টাকার জন্য। আমাদের সময় কী ছিল? ইজ্জৎ। ট্রফি নোব, ক্লাবের নাম বাড়াব, তার জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারতুম, আর আজকালকার ছেলেরা?''

রকের প্রান্ত থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে কে বলল, ''রামায়ণ পাঠ শুরু হল।''

''মনে আছে পরিমলবাবু কে ও এস বি—র সঙ্গে সেমি ফাইনাল?''

''দু দিন ড্র হয়েছিল।''

''লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে, হাঁটতে পারছি না।'' নৃসিংহ উত্তেজনায় সিধে হয়ে গেল। গলা কাঁপছে।

পরিমলবাবু একটা বিড়ি এগিয়ে ধরল। নৃসিংহ ভ্রূক্ষেপ করল না।

হারুবাবু এসে দুটো হাত চেপে ধরে বললেন, ক্লাবকে ফাইনালে তুলে দে। এত বড় সম্মান আগে ক্লাবের সামনে কখনো আসেনি। হাতছাড়া হয়ে যাবে নৃসিংহ তুই থাকতে? কথাগুলো বুকে গেঁথে গেল। বুঝলেন পরিমলবাবু তখন মনের মধ্যে যা হল কী বলব। অত বড় ক্লাব যেন আমার মুখ চেয়ে রয়েছে।''

''সেই খেলাই তো আপনার কাল হল। পা—টা চিরকালের মতো গেল। যাই বলুন, আপনার নামা উচিত হয়নি।''

হা হা করে নৃসিংহ হেসে উঠল।

''ফাইনালে ক্লাব উঠল। আমার থ্রু থেকেই নেট করল বিশু সামন্ত, এখনও দেখা হলে বিশু বলে—'' নৃসিংহ লোকটিকে দেখে উঠে দাঁড়াল। ''আপনি কি অসীমকে খুঁজছেন?''

ঘাড় নেড়ে লোকটি কিছুক্ষণ ধীরে ধীরে বিস্ময় দ্বারা আবিষ্ট হবার পর বলল, ''ইস একি চেহারা হয়েছে দাদা। চিনতেই যে পারা যায় না। সেই ছোটবেলায় কবে দেখেছি আর এই। ওহ গোরা টিমগুলোর সঙ্গে আপনার সেইসব খেলা। এখন তো আর মাঠেই যেতে ইচ্ছে করে না।''

চশমাটা উপরের দিকে ঠেলে দিয়ে নৃসিংহ বলল, ''থাক থাক, ওসব কথা ভাই আর তুলে লাভ কি! দিন তো কারু জন্য বসে থাকে না।''

ঝরঝর করে হেসে নৃসিংহ লোকটিকে নিয়ে যেতেই তাসের দলের একজন চেঁচিয়ে বলল, ''পরিমলবাবু, গপ্পো করার যদি দরকার হয় অন্য কোথাও বসে করুন। পাঁচ লক্ষবার ওর গপ্পো শুনেছি, আমাদের বাবারাও শুনেছে। আর পারা যায় না।''

''না না, তোমরা ঠিক জান না। সত্যি কথাই বলে লোকটা। আমরা যে দেখেছি ওর খেলা।'' পরিমলবাবু দ্রুত স্থান ত্যাগ করলেন।

ঘোমটা দিয়ে গীতা খাটের ধারে দাঁড়াল। নৃসিংহ ওর দিকে তাকিয়ে লোকটিকে বলল, ''যাবে কি না তা তো বলতে পারব না। বলছিল না গো কাল কোথায় যেন যেতে পারে?''

গীতা কিছু একটা বলল অস্ফুটে। লোকটি দুজনের দিকে ঘন ঘন তাকিয়ে কাতর হয়ে পড়ল।

''গ্রামের টিম, কিছুই খেলতে পারে না! একজন অন্তত ডিফেন্সটা যদি সামলে না রাখে তা হলে একেবারে ডুবে যাবে। ওরা পাঁচজনকে হায়ার করে নিয়ে যাচ্ছে কলকাতা থেকে।''

''জানি না, ইতিমধ্যে খোকা অ্যাডভান্স নিয়ে ফেলেছে কিনা।'' নৃসিংহ চিন্তান্বিতমুখ লোকটিকে দেখাল।

''তাহলে ফেরত দিয়ে দিক, আমি তিরিশ টাকা দিয়ে যাচ্ছি। বলে দিক পায়ে চোট লেগেছে। এর ওপর তো আর কথাই নেই?''

লোকটি সড়াৎ করে চেন টেনে ব্যাগ খুলল। তিনটে দশ টাকার নোট নৃসিংহর দিকে এগিয়ে ধরতেই গীতা চাপা গলায় বলল, ''খোকার হাতে দিলেই তো ভাল হয়।''

''তাতে কী হয়েছে। বাবা—মা কি পর?''

লোকটি যে দ্রুত টাকা ধরিয়ে দিতে চায়, নৃসিংহর হাতে গুঁজে দেওয়ার ব্যস্ততার মধ্যে গীতা টের পেল।

''তা ছাড়া কার হাতে দিচ্ছি সেটাও তো দেখতে হবে বৌদি! দাদাদের কাছে শুনেছি, গোল করে তারপর রেফারিকে জানিয়ে দিলেন হাতে ঠেলে গোল করেছি। সোজা ব্যাপার নয়, মহামেডানের সঙ্গে খেলা ছিল! হাফটাইমে সাপোর্টাররা সব গ্যালারির থেকে নেমে এল ওকে মারবার জন্য। জুতো ছুঁড়ছে, ঢিল মারছে। তখন উনি বললেন, 'ধৈর্য হারাচ্ছেন কেন?' —হ্যাঁ দাদা, বলুন না কি বলেছিলেন?''

''থাক থাক ওসব কথা।'' নৃসিংহর গলা ভারী হয়ে এল। চশমাটা ঘামে নেমে এসেছে। হাতে নিয়ে বাচ্চুর জামায় ডাঁটিটা মুছতে মুছতে বলল, ''ঠকিয়ে জিতে দুটো পয়েন্টই নয় পাওয়া যায়, কিন্তু আনন্দ?''

''শুনলেন তো বৌদি, শুনলেন, এই লোকের হাতে তিরিশ কেন তিন কোটি টাকাও আমি তুলে দিতে পারি। এর ওপর আর কোনো কথা চলতে পারে না।''

লোকটি খুব হাসতে থাকল। নৃসিংহ দেখল গীতা একদৃষ্টে বিহ্বল হয়ে তার দিকে তাকিয়ে। চোখে চোখ পড়তেই প্রথম শাড়ি পরা কিশোরীর মতো নিজেকে সামলাতে শুরু করল।

''চা হচ্ছে খেয়ে যাবেন।'' দরজার বাইরে নন্দুকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে দেখে গীতা বলল।

''না না আমাকে এখুনি ট্রেন ধরতে হবে।'' ঘড়ি দেখতে দেখতে উঠে দাঁড়াল। ''কাল সকালে ঠিক ন'টায় আসব। ওকে রেডি হয়ে থাকতে বলবেন।'' লোকটি চলে যাবার পর নোটগুলো গীতার হাতে দেবার সময় আঙুলের ছোঁয়া লাগল। নৃসিংহ উত্তেজনা বোধ করল তাইতে। কিছুক্ষণ গীতার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বুঝতে পারল, কিছু একটা হচ্ছে তার দেহে, মনে। বহুদিন এমন হয়নি। আনন্দ সহকারে সে বলল, ''ওদের খেতে দাও।''

নীলু বাচ্চুর খাওয়া দেখতে দেখতে নৃসিংহ বলল, ''শুকনো রুটি খেতে ওদের ভাল লাগছে না, একটু বোঁদে আনলে কেমন হয়?''

''না না, ওর থেকে এক পয়সাও নয়।'' গীতার স্বরে দু জোড়া চোখের উত্তেজনা দপ করে নিভে গেল। ''নীলু কাল সকালেই রেশন দোকানে যাবে। না হলে বাবা দাদা কেউ ভাত খেয়ে বেরোতে পারবে না।''

''মা জানো,'' গল্পের বই থেকে মুখ তুলে নন্দু বলল, ''দীপ্তির কাকা আজ সাড়ে চার টাকা কিলো চাল কিনেছে।''

''ওদের কথা বাদ দে।''

রাত হয়ে গেছে, অসীম এখনো ফেরেনি। নৃসিংহ রাস্তায় পায়চারি করে ফিরে আসতেই গীতা বলল, ''দূরে গেলে এই রকম দেরি তো হয়ই! কোনোদিন কি লক্ষ্য করেছ? মুখ ফুটে একদিনও কি জিজ্ঞেস করেছ, কেমন খেলছিস?''

''কেন কেন, বলেছে নাকি কিছু?''

''বলবে আবার কেন, দেখে বুঝতে পারি না? নয় বাপের মতো ওর অত নামই হয়নি।''

গীতার চিবুক ফিরিয়ে নেওয়ার গতিপথটুকুর দিকে তাকিয়ে নৃসিংহ বলল, ''ওর খাওয়ার দিকে একটু নজর দিতে হবে। ডিম দুধের ব্যবস্থা করতে হবে।''

''থাক, খুব দরদ দেখানো হচ্ছে, দেখো ও তোমার থেকেও ভাল খেলবেখন।''

শুনে নৃসিংহের শরীর চুঁইয়ে সুখ নামতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সে আনমনা হয়ে গেল।

অবশেষে অসীম ফিরল। ছেলেরা ঘুমিয়ে পড়েছে, নন্দুও। নৃসিংহ ওর চলন দেখে এগিয়ে এসে হাত ধরল।

''কোথায় লেগেছে?''

''আবার সেইখানটায়।'' ডান ঊরুতে, হাতের ভর দিয়ে নিচু হয়ে অসীম খাটে বসল। প্যান্ট তুলে বাঁ পা ছড়িয়ে বড় করে হাসল। ''চুন হলুদ গরম করো তো!''

পায়ের গোছে হাত বুলিয়ে বলল, ''দুটো খাস্তা উইং ব্যাক দু পাশে। হুড়হুড় করে ইনসাইড দুটো ঢুকে আসছে, স্টপার কী করবে?''

''হেরে এসেছিস?''

''খেয়ে এসেছিস?''

''আর খাওয়া! টাকা পর্যন্ত দেয়নি। দুটো উল্লুক ব্যাক নিয়ে স্টপার কী করবে? মাইল খানেক প্রায় অন্ধকারে ছুটেছি।''

ঝুঁকে হাত বোলাচ্ছে অসীম। টেরিলিন শার্টের গলা দিয়ে বুকের রোম নৃসিংহের চোখে পড়তে তার মনে হল, পুরোদস্তুর পুরুষ হয়ে উঠেছে ছেলেটা।

''এখনো মিষ্টির দোকান খোলা আছে, আনব?''

''বাড়িতে কিছু নেই?''

''আমি তো জানি খেয়েই আসবি।''

নৃসিংহের হাতে টাকা দেবার সময় গীতা লক্ষ্য করল, অসীম দেখছে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। ও জানে না এটা কিসের টাকা। এখন জানানো উচিত হবে কী! তাড়াতাড়ি সদরে গিয়ে নৃসিংহকে দাঁড় করাল।

''কাল তাহলে কী হবে?''

''এখন কিছু বোলো না।''

কাগজ জ্বেলে গীতা চুন হলুদ গরম করে লাগিয়ে দিল।

''জিতলে ব্যাটারা মুরগির ঝোল খাওয়াবে বলেছিল।'' মুখটাকে বেঁকিয়ে অসীম হাঁ করে চিৎ হয়ে পড়ল। ঝুঁকে গীতা বলল, ''হ্যাঁরে খুব বেশি লেগেছে কি? একটা লোক এসেছিল, পটাদা নাম বলল। কাল তারকেশ্বরের কাছে ওদের খেলা।''

''রাখো তোমার খেলা। এই পা এখন কী ভোগায় কে জানে।''

''তিরিশ টাকা দেবে বলেছে।'' গীতা আর একটু ঝুঁকল। অসীমের মুখটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। চামড়া রুক্ষ, গাল চোপসানো, কানের পাশের হাড় উঁচু, বুক চ্যাপ্টা, কনুইয়ে শিরার জট। গীতার মনে হল এই বয়সে একটা ছেলের যেমন দেখতে হওয়া উচিত খোকা তা নয়। যেমন করে কথা বলা উচিত তা বলে না। গীতা দুঃখে ভরে উঠল।

অসীম পায়চারি শুরু করল। ''লাগছে বেশ।'' উবু হয়ে বসার চেষ্টা করতে করতে দাঁড়িয়ে পড়ল নৃসিংহকে ঢুকতে দেখে।

''এর আগেও তো এমন কত লেগেছে, আবার লাফালাফিও করেছিস।'' গীতা লঘু স্বরে বলল, ''তোর মতো সহ্যশক্তি আমি বাপু কারুর দেখিনি। আর ফোলাটোলাও তো দেখছি না!''

অসীমের মুখ থেকে এক পরত রুক্ষতা মুছে গিয়ে তরলতা ভেসে উঠল। জোড় পায়ে কয়েকবার লাফাল, কাল্পনিক বলে শট করল, তারপর বলল, ''ফোলা আছে তো। সাবধান না হলে জন্মের মতো খতম হয়ে যাব।''

নৃসিংহ পান খাচ্ছে, হাতে সিগারেটের নতুন প্যাকেট। খাটে বসে বলল, ''মিলিটারি টিমগুলোর কাছে কি কম মার খেয়েছি।'' লুঙিটা পর্যন্ত তুলে সে মারের দাগ খুঁজতে শুরু করল। তারপর অপ্রতিভ মুখে গীতাকে বলল, ''দই ছাড়া আর কিছু পেলুম না।''

''খাটটা পেতে দাও তো মা শোব।'' অসীম উঠে দাঁড়াল, গীতা দালানে ক্যাম্প খাট পাতছে সেই সময় নৃসিংহ বলল, ''তোকে নেবার জন্য একজন এসেছিল।''

''জানি জানি।''

নৃসিংহ ওকে সাহায্যের জন্য কাঁধ ধরতে হাত বাড়াল।

''ঠিক আছে, এমন কিছু লাগেনি।''

হাতটাকে অগ্রাহ্য করে অসীম দালানে গিয়ে ক্যাম্প খাটে বসল। নৃসিংহ সিগারেট ধরিয়ে তারপর কয়েকটা টান দিল। শুনতে পাচ্ছে অসীমের দই খাওয়ার শব্দ। গলা চড়িয়ে সে বলল, ''কী দাম হয়েছে জিনিসের, দই সাত টাকা! আমরা আট আনা সেরের রুই দেখেছি, টাকায় চারসের দুধ, খাবে কী, খেলবেই বা কোত্থেকে!''

কোনো সাড়া না পেয়ে নৃসিংহ চুপ করে গেল। চাপা স্বরে অসীম বলল, ''বাবাকে ভ্যাজভ্যাজ করতে বারণ করো তো মা।''

''বলুক না, তুই অমন কচ্ছিস কেন? মিথ্যে কথা তো আর নয়।''

''জান গো'' নৃসিংহ আবার বলতে শুরু করল, ''শক্তিবাবু আজ দুখ্যু করে বলছিল—মাইনের টাকায় দশদিনের বেশি চলে না, ছেলেটা এম এস সি পড়া ছেড়ে চাকরি নিয়েছে। পই—পই করে বললুম যেভাবেই হোক তোর পড়ার খরচ চালাবোই, ছাড়িসনি পড়া, ছেলে শুনল না। মুখের ওপর বলল, ভাইবোনেদের ভাত থেকে বঞ্চিত করে বিদ্বান হয়ে আমার কাজ নেই।''

নৃসিংহ অপেক্ষা করল, দালান থেকে কোনো কৌতূহল আসে কিনা! তারপর সিগারেটে টান দিয়ে বলল, ''বলতে বলতে শক্তিবাবু হাউহাউ করে কী কান্না। একটা কথাই বার বার বলল, বাপের মুখ চেয়ে ভবিষ্যৎকে বিসর্জন দিল আমার ছেলে।''

গভীর রাত্রে গীতা বলল, ''ওসব গল্প খোকার সামনে কোরো না। কষ্ট পায় শুনে। কাল যদি খেলতে না যায় তাহলে কী হবে, টাকা তো নিয়ে রাখলে।''

''টাকা কি আমি নিজের জন্য নিয়েছি?''

''যদি ভাল না হয়? টাকা সকালেই ফেরত দিতে হবে তো!''

দুজন চুপ করে রইল। ভারি নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে দুজন কাঠ হয়ে যেতে লাগল। দুজনকে ক্রমশ ভয়ে ধরল। দুজন ধীরে ধীর ফোঁপরা হতে শুরু করল।

''বলছিল আবার লাগলে জন্মের মতো খতম হয়ে যাবে।''

''জানি, আমারও তাই হয়েছিল।''

''কাল টাকা ফেরত দিয়ে দাও। যা খরচ হয়েছে পরে দিয়ে দোব।''

''কাল সকালেই ও ঠিক হয়ে যাবে।''

''ওর ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে।''

''তুমি কি শুধু ওর মুখ চেয়েই কথা বলবে? কাল লোকটা এসে যখন আমায় অপমান করবে?''

''নয় সইলে।'

''তোমার গায়ে লাগবে না?''

উত্তরের আশায় সারারাত জেগে রইল নৃসিংহ।

পরদিন সকালে রাস্তায় ভিড় জমে গেল, লোকটি চিৎকার করছে—''ওসব চালাকি আমার জানা আছে।

ভিড়ে যারা নবাগত তাদের কৌতূহল মেটাতে লোকটি বৃত্তান্ত বর্ণনার আগে ভূমিকা শুরু করল। —''মশাই, নামকরা প্লেয়ার ছিল কত ভক্তি শ্রদ্ধা করতুম আর সেই মানুষের কী অধঃপতন দেখুন—''

ঘরে নৃসিংহ মাথা নামিয়ে বসে, বাইরে থেকে লোকটির গলা ভেসে আসছে। ঘরে কেউ কারুর দিকে তাকাচ্ছে না। উপর তলার লোকেরা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় প্রাণপণে এ ঘরের দিকে না তাকিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। বাচ্চু বাইরে উঁকি দেবার চেষ্টা করেছিল, নন্দু কান ধরে বসিয়ে দেয়।

''টাকা নিয়েছিলে কেন? কে নিতে বলেছে?'' ঠকঠক করে অসীম কাঁপছে।

আস্তে আস্তে মাথা তুলে নৃসিংহ তাকাল গীতার দিকে। এটা যৌথ দায়িত্ব, তোমারও অংশ নেওয়া উচিত, তুমি কিছু বলো—এই কথাগুলোই সে যথাসম্ভব চোখে ফুটিয়ে তুলল। দেওয়ালে গীতা স্থিরদৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে। সরাল না।

''তুমি ফুটবল খেলেছ না ঘোড়ার ডিম খেলেছ। জান না আবার লাগলে আমার কি হবে?''

নৃসিংহ আবার তাকাল গীতার দিকে। এ সংসার কি একা আমারই, নিষ্ঠুর আমাকেই হতে হবে, তোমার ভাগ কি শুধু স্নেহের?—এই অভিযোগ তার চাহনিতে উচ্চচারিত হল। গীতা শোনার চেষ্টা করল না।

''গালাগালি দিক, থুথু দিক, জুতো পেটা করুক। আমি যাব না।'' দু হাতে মুখ ঢেকে অসীম নুয়ে পড়ল।

বাইরে থেকে চিৎকার করে লোকটি অসীমকে ডাকছে। ঘরে সকলেই শুনতে পেল তবু বাচ্চু বলল, 'দাদাকে ডাকছে।'' নন্দু ধমকাল ওকে। নীলু ফিসফিসিয়ে বলল, ''তোর সবতাতেই ওস্তাদি।''

উঠে দাঁড়াল নৃসিংহ। সব কটা চোখ ঝাপটা দিয়ে তার মুখে এসে পড়ল।

''কোথায় যাচ্ছ।'' গীতার কাঁপা স্বরে শিউরে উঠল অন্যরা।

''বাবা যেও না,'' নন্দু হাত ধরল নৃসিংহের। ''যে কটা কম পড়েছে আমি দিচ্ছি, আমার জমানো আছে।''

''না।'' মাত্র একটি শব্দ মহীরুহ পতনের মতো ঘরে ছড়িয়ে গেল।

বাচ্চু অনিশ্চিতভাবে নীলুর কাছে জানতে চাইল, ''লোকটা কি বাবাকে মারবে?''

নৃসিংহকে দেখামাত্রই রাস্তাটা চুপ করে গেল। অলসভাবে সে দুধারে তাকাল। পরিচিতরা তাকে লজ্জা থেকে রেহাই দিতে ঔদাসীন্য দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বারান্দায় মেয়েরা এক পা পিছিয়ে গেল। শিশুরা এগিয়ে এল কৌতূহলে। পথিকেরা কিছু একটা ঘটবে আঁচ করে মন্থর হতে লাগল।

''আপনার সঙ্গে কি শত্রুতা করেছি যে এমন জব্দে ফেললেন? বলুন বলুন কী করেছি?'' লোকটি চিৎকারের বদলে আর্তনাদ করে উঠল, ''বিপদে পড়েই এসেছি প্যাঁচ কষে যদি আরও টাকা আদায় করতে চান, করুন।'' পাগলের মতো ব্যাগের চেন টানল সে, পাঁচ টাকার একটা নোট বার করে এগিয়ে ধরল। ''নিন, নিন, উদ্ধার করুন আমায়।'' ঠোঁটের কোণে ফেনা জমেছে লোকটির। চোখে বেপরোয়া চাউনি। ''আরও চাই? বলুন লজ্জার কী, কত দিলে অসীমের পা ভাল হয়ে যাবে?'' ব্যাগ থেকে একটা দশ টাকার নোট বার করল। নৃসিংহের হাতটা টেনে নিয়ে নোটটা মুঠোর মধ্যে গুঁজে দিতে গেল। ভাঙা ডালের মতো হাতটা ঝুলে পড়ল। নৃসিংহ নিজেকে টানতে টানতে রকে এনে বসিয়ে দিল। কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে চশমার কিনারে পৌঁছে গেছে। উদাসীনরা স্বাভাবিক হয়ে উঠল। মেয়েরা রেলিং—এ ঝুঁকে।

''বিশ্বাস করছেন না? নিজেই তো দেখলেন ও খোঁড়াচ্ছে। আপনার টাকা থেকে যেটুকু খরচ করে ফেলেছি শোধ করে দোব, ঠিক দোব। এই কৃপাটুকু অন্তত করুন।''

নৃসিংহ দুই হাত জোড় করে তুলে ধরতেই কুড়ুলের মতো দশ টাকার নোট ধরা একটি হাত নেমে এল। অসহায়ভাবে সে চারপাশ, উপরে এবং সদর দরজায় দাঁড়ানো গীতার দিকে তাকাল। ঘাম গড়িয়ে নামছে কাচের উপর। মুখগুলো ক্রমশ আবছা হয়ে এল। কাচ ভেদ করে তাকাবার চেষ্টায় কুঁচকে গেল মুখের চামড়া, হাত দুটো ঝুলে পড়ল। মাথা নেড়ে নেড়ে সে বলল, ''আমি ধর্মপথে থাকতে চাই! জোচ্চচুরির কলঙ্ক এই বয়সে আর আমার মাথায় তুলে দেবেন না।''

''কিন্তু এখন আমি ওর বদলে কাকে পাব? সময়ই বা কোথা। এইভাবে আমার টিমকে ডোবাবেন না, দয়া করুন। আপনি বললেই হবে।''

কে একজন বলল, ''অত করে বলছেন ভদ্রলোক, ছেড়ে দিন না ওকে। যা পাচ্ছেন নিয়ে নিন না!''

আর একজন বলল, ''ওকেই নিয়ে যান না। এমন থ্রু পাস দেবে, গোল অবধারিত।''

কয়েকটি শিশু হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ''গোল, গোল, গোল।''

নৃসিংহ আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না। বহু দূরের অস্পষ্ট ঢেউয়ের মতো হাজার হাজার চিৎকার মাথার মধ্যে উঠছে আর পড়ছে। মুখের কাছে এনে লোকটি কী সব বলছে। ঝাপসা কাচের মধ্য দিয়ে বহুদিনের বাসি পুরানো লাগছে মুখটা। গ্যালারি থেকে ধাপে ধাপে যেন নেমে এল। নৃসিংহ বুঝতে পাচ্ছে না মুখটা কী চায়। থুথু দেবে, জুতো ছুঁড়বে, ফালাফালা করে চিরবে?

''অনেক খেলাই তো যৌবনে দেখিয়েছেন, বুড়ো বয়সে খেল আর নাই বা দেখলেন।''

''কেন দেখাব না? নৃসিংহ কথা বলার চেষ্টা করল। গলা বুজে গেছে। চেষ্টা করেও গীতার কাপড়ের রঙ ঠাওর করতে পারল না। লোকটা কি বলছে আর শোনা যাচ্ছে না। শুধু আবছা মুখ গ্যালারিতে। চোখ বন্ধ করে নৃসিংহ মনের মধ্যে উঠে দাঁড়াল। আমার থেকেও খোকার ভবিষ্যৎ বড়। ওকে পাঠাব না। থাকো সবাই দাঁড়িয়ে। দেখবে খোকা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরবে।

কে একজন বলল, ''ওকে বলে কিছু হবে না মশাই, দেখছেন না স্যায়নার মতো কেমন বিড়বিড় করছে। ওর বৌকে গিয়ে বলুন না, ওই তো দাঁড়িয়ে।''

অনেকক্ষণ পর নৃসিংহের মনে হল কে তাকে বাবা বাবা বলে ডাকছে।

''কে খোকা?'' ধড়মড়িয়ে সে উঠে দাঁড়াল। রাস্তায় পথিকের আনাগোনা, শিশুরা খেলা করছে আর বাচ্চু অবাক হয়ে তাকিয়ে।

''দাদা তো খেলতে চলে গেছে। ভাত খেয়ে অফিস যাবে না? মা ডাকছে।''

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%