মতি নন্দী
''স্পোর্টস এডিটর আছেন কি?'' একতলা থেকে রিসেপশনিস্টের ফোন এল।
''বলছি।'' তিনতলায় নিজের টেবল থেকে চিত্তরঞ্জন ঘোষাল জানালেন। এখন তিনি রীতিমতো বিব্রত। বিজ্ঞাপন বিভাগ হঠাৎ জানিয়েছে, দেড় কলাম জায়গা বেশি পাওয়া যাবে। দেবব্রতর ইন্টারস্টেট অ্যাথলেটিক্সের ডেসপ্যাচ এখনও দিল্লি থেকে এসে পৌঁছায়নি। রবির আজ অফ—ডে। সুশান্ত দুদিন ক্যাজুয়াল নিয়েছিল। আজ জয়েন করার কথা, কিন্তু আসেনি।
''অবিনাশ মজুমদার নামে এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।''
চিত্তরঞ্জন তিন—চার সেকেন্ড ভেবে নিয়ে বললেন, ''পাঠিয়ে দিন।''
রিসিভার নামিয়ে সামনের টেবলে দিব্যেন্দুকে উদ্দেশ করে চিত্তরঞ্জন বললেন, ''হাতে কোনো স্টোরি আছে কি? সাড়ে চার কলাম জায়গা ভরাবার মতো ম্যাটার তো ওপরে ফোটো লাইব্রেরিতে গিয়ে একবার খোঁজ নাওতো, ছবিটবি কিছু পাও কিনা। আমি এই পুরনো কপিগুলো দেখছি যদি দেবার মতো কিছু পাওয়া যায়।''
টেলিপ্রিন্টারে গত দু—তিনদিনে আসা অব্যবহৃত বিভিন্ন এজেন্সি কপি থেকে পরে ব্যবহার করা যাবে এই আশায়, কিছু কপি একটা ফাইল বাক্সে জমিয়ে রাখা হয়। চিত্তরঞ্জন বাক্সটা খুলে একগোছা কপি বার করে পড়তে শুরু করলেন।
কপি পড়ার মধ্যে ডুবে গেছলেন তাই খেয়াল করেননি টেবল থেকে পাঁচ—ছ হাত দূরে একটি লোক এসে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ তুলে লোকটিকে দেখে চিত্তরঞ্জন ভ্রূ কোঁচকালেন।
''কাকে চাই?''
''আপনার কাছে এসেছিলাম।''
চিত্তরঞ্জন লোকটিকে খুঁটিয়ে দেখে নিলেন। লম্বায় ছ'ফুটের ওপর, জিরজিরে স্বাস্থ্য, দিন তিনেকের পাকা দাড়ি, কোটরে ঢোকা চোখ, চওড়া কাঁধ আর তাতে হ্যাঙ্গারে ঝোলানো জামার মতো একটা আধ ময়লা ফিকে নীল হাওয়াই শার্ট, খয়েরি প্যান্ট। লোকটি দু হাত তুলে নমস্কার করেছিল। চিত্তরঞ্জন মাথাটা ইঞ্চি দুয়েক সামনে ঝুঁকিয়ে ছিলেন।
''আপনাদের কাগজে পরশু একটা খবর বেরিয়েছিল, মানে হরষিত চ্যাটার্জির একটা ইন্টারভিউ, তাতে উনি বলেছেন ফর্টি এইট লন্ডন অলিম্পিকের জন্য বোম্বাইয়ে সিলেকশন ট্রায়ালে উনি হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্পে সাড়ে আটচল্লিশ ফুট লাফিয়ে ইন্ডিয়া টিমে এসেছিলেন। কথাটা ভুল, একদমই মিথ্যে।'' ঠাণ্ডা, দ্বিধাশূন্য স্বরে কথাগুলি বললেন, তবে যথেষ্ট বিনীতভাবেই।
চিত্তরঞ্জন চেয়ারে হেলান দিলেন। এই আবার বাদ প্রতিবাদ শুরু হল। বুড়ো লোকদের কথাবার্তা ছাপাবার তিনি ঘোর বিরোধী। ওঁদের স্মৃতিভ্রংশ ছাড়াও নিজেকে বাড়িয়ে বলার একটা প্রবণতাও থাকে। এখানকার ছেলেছোকরারা চিনুক, জানুক কি তাঁরা ছিলেন, এই বাসনাটা থাকা স্বাভাবিক। চিত্তরঞ্জন এটা বোঝেন। কিন্তু ওঁরা এমন সব দাবি করেন যা প্রমাণ করার জন্য কোনো বইপত্র পাওয়া যায় না। কোনো খেলার কোনো রেকর্ড রাখা নেই, কোনো ইতিহাসও কেউ লেখেনি। যে যা বলেন, বিশ্বাস করে তাই ছাপাতে হয়, আর প্রতিবাদ এলে, যা প্রায়ই আসে, সেটা ছাপিয়ে খেলার পাতার দুর্লভ জায়গাটুকু থেকে খানিকটা নষ্ট করতে হয়।
চিত্তরঞ্জন কিছুটা বিরক্ত স্বরেই বললেন, ''তা আমি কী করব! উনি বলেছেন যখন, তখন নিশ্চয় সাড়ে আটচল্লিশ ফুটই লাফিয়েছেন। নাহলে সিলেকশন পেলেন কী করে? আপনি কি তখন ওখানে ছিলেন?''
''ছিলাম।''
চিত্তরঞ্জন সিধে হয়ে বসলেন।
''কী জন্যে ছিলেন?''
''কম্পিটিটর হিসেবে ছিলাম। সাড়ে আটচল্লিশ ফুট লাফিয়েছিল বোম্বাইয়ের হেনরি রেবেলো। তখন ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ছিল জাপানের তাজিমার, সাড়ে বাহান্ন ফুট, বার্লিন অলিম্পিকে করা।''
''হরষিত চ্যাটার্জি, আপনি বলছেন সাড়ে আটচল্লিশ ফুট লাফাননি?''
''না, আমি আর হরষিত দুজনেই সাড়ে চুয়াল্লিশ লাফিয়েছিলাম। তাই ডিসট্যান্সটা মনে আছে। রেবেলোর ধারেকাছে আমরা যেতে পারিনি।''
''অ।'' চিত্তরঞ্জন বুঝে গেছেন আর একটা মূর্তিমান বিসম্বাদ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে, এবার পকেট থেকে চার পাতার একটা চিঠি বেরবে আর তারপর সেটা ছাপিয়ে বার করার জন্য দিনের পর দিন তাগাদা চলবে।
দিব্যেন্দু একটা ছবি নিয়ে এল।
''চিত্তদা এইটে দেখুন, এডুইন মোজেস। ক'দিন আগে টানা একশো উনিশতম জিত হয়েছে।''
''ছবিটা কবেকার?''
''পুরনোই, বছর চারেক আগে একবার বেরিয়েছিল। চালিয়ে দিই, কেউ বুঝতে পারবে না কবেকার।''
ছবিটা দিব্যেন্দুর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে, ''দাও'' বলে চিত্তরঞ্জন সামনে দাঁড়ানো অবিনাশ মজুমদারকে বললেন, ''তা কি করতে হবে? আপনি কি প্রতিবাদ জানাতে চান?''
''না। এমন কিছু বিরাট ব্যাপার এটা নয়। আমি কতটা লাফিয়েছিলাম তা জেনে এখন কার কী লাভ, আর জানলেও তাতে আমার এক ছটাকও সম্মান বাড়বে না।''
''কেন? ছেলেমেয়ে, নাতি—নাতনি তারা অন্তত গর্ব বোধ করতে পারবে এই বলে যে...''
অবিনাশ মজুমদারের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। ডান হাতটা আলতো নেড়ে বললেন, ''আমার বিয়ে—থা হয়নি, সংসারে কেউ নেই।''
''অ।'' চিত্তরঞ্জন অপ্রতিভ হওয়ার জন্য বিরক্ত হলেন। ''সম্মান—টম্মানের দরকার নেই ভাল। তা কী চান?''
রেবেলোর সম্মান। আসল সাড়ে আটচল্লিশ যে লাফিয়েছিল তাকে তাঁর প্রাপ্যটা দেওয়া হোক। এটাই চাই।''
লোকটা বলে কী। চিত্তরঞ্জন কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়েই রইলেন।
''প্রমাণ আছে কি যে ওই লাফ রেবেলো দিয়েছিল?''
''হরষিত চাটুজ্জে কি প্রমাণ দিয়েছে সেই ওই লাফটা দিয়েছে?''
চিত্তরঞ্জন আবার বিব্রত হলেন। ইন্টারভিউটা নিয়েছিল সুশান্ত, সে তো আজও অফিসে আসেনি। তবে সে প্রমাণ ছাড়াই নিশ্চয়ই এটা লেখেনি। গলাটাকে গম্ভীর করে চিত্তরঞ্জন বললেন, ''পেপার কাটিং দেখেই ওটা লেখা হয়েছে।''
অবিনাশের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। বিশ্বাস হচ্ছে না যেন। ''কোন পেপারের কাটিং?''
''টাইমস অফ ইন্ডিয়া।'' নিঃসঙ্কোচে মিথ্যা কথাটা বলেই তিনি টেবলের কপিগুলো তুলে দেখা শুরু করলেন। কিন্তু অবিনাশ এবার যা বললেন সেটা চিত্তরঞ্জনের মাথায় বাজ পড়ার মতোই।
''আমার কাছে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার কাটিং আছে।''
''য়্যাঁ, আছে নাকি?''
''হ্যাঁ, তবে এই মুহূর্তে ঠিক আমার কাছে নেই। এনে দেখাতে পারি।''
হাঁপ ছাড়লেন চিত্তরঞ্জন। যদি পকেট থেকে বার করত, তাহলেই মুখটা পুড়ে যেত।
''দেখাবেন এনে।'' রীতিমতো কঠোর গলায় প্রায় চ্যালেঞ্জের সুরে চিত্তরঞ্জন বললেন।
বেয়ারা নতুন কিছু কপি দিয়ে গেল। তিনি সেগুলো পড়তে শুরু করে দিলেন অবিনাশ ইতস্তত করে বললেন, ''আচ্ছা আসি, নমস্কার।''
চিত্তরঞ্জন গমনোদ্যত অবিনাশকে চশমার উপর দিয়ে লক্ষ্য করে বললেন, ''ধরে নিচ্ছি ওটা রেবেলোই লাফিয়েছিল, কিন্তু সেটা এখন না বললে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে? আপনারই বা ওঁর জন্য মাথাব্যথা কিসের? আটত্রিশ বছর আগে কে সাড়ে আটচল্লিশ সাড়ে চুয়াল্লিশ লাফিয়েছিল তাই নিয়ে কার কী এসে যায়? ওয়ার্ল্ড রেকর্ড তো হয়নি?''
''কিন্তু ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ডের পারফরমেন্স ওটা। রেবেলো অলিম্পিক গোল্ডও পেতে পারত, ফাইনালে উঠেছিল। এটা কি কম কথা?''
''অলিম্পিকের কথা হচ্ছে না। প্রশ্নটা হল, আপনি ওর হয়ে ওকালতি করছেন কেন?''
''করব না? একজনের কৃতিত্ব অন্য লোক নিয়ে নেবে?'' প্রশ্ন নয়, আহত বিস্ময় অবিনাশের চোখেমুখে ফুটে উঠল। ''কত বাসনা নিয়ে একজন অ্যাথলিট মাঠে আসে, প্র্যাকটিস করে, দিনের পর দিন কষ্ট সয়ে, ডিসিপ্লিন্ড থেকে, কত সাধ আহ্লাদ বর্জন করে সে একটু একটু করে এগোয়। তার এগোনো মানে দেশের এগোনো, জাতির এগোনো। এজন্য তাকে সম্মান, শ্রদ্ধা দেওয়া উচিত। চুরি করে সেটা একজন নিয়ে নেবে আর তাতে আপনারা সাহায্য করবেন?'' অবিনাশ এই প্রথম বিচলিত এবং ঈষৎ উচ্চচস্বরে কথা বললেন, ''রেবেলো আপনার কাগজ নিশ্চয় পড়বে না, বাংলা জানে না, তাছাড়া সে কোথায় এখন আছে, বেঁচে আছে কিনা তাও জানি না। কিন্তু আমি তো আছি, আমি তো জানি। অ্যাথলিটের সম্মান আর এক অ্যাথলিট রাখবে, এটা কর্তব্য।''
অবিনাশের চোখ জ্বালা করছে। চিত্তরঞ্জনের টেলিফোন ডাইরেক্টরি থেকে হরষিত চ্যাটার্জির বাড়ির ফোন নম্বর খুঁজে বার করে অপারেটরকে লাইন দিতে বললেন। হরষিত নামী কোম্পানিতে এঞ্জিনিয়ার ছিলেন, অবসর নিয়ে কনসালটেন্সি অফিস খুলেছেন।
''হরষিতবাবু নাকি, আমি চিত্তরঞ্জন ঘোষাল...হ্যাঁ হ্যাঁ নমস্কার, ভাল লিখেছে? হ্যাঁ জানিয়ে দেব... খুব টেলিফোন পাচ্ছেন! দেখুন লোকে কেমন গুণগ্রাহী, অত বছর আগে কী করেছিলেন আজও সেজন্য...তবে বলছিলাম কি একটা তথ্যের ব্যাপারে ডাউট দেখা দিয়েছে। আপনি বলেছেন বোম্বাইয়ে ট্রায়ালে সাড়ে আটচল্লিশ ফুট লাফিয়েছিলেন, জাপানিরা ছাড়া এশিয়ায় তখন পর্যন্ত অতটা কেউ ট্রিপল জাম্প দেয়নি। কিন্তু এখন দেখছি, ওই লাফটা দিয়েছিল রেবেলো, হেনরি রেবেলো, য়্যাঁ একটু জোরে বলুন...''
চিত্তরঞ্জন মন দিয়ে শুনতে লাগলেন। চোখ বুজে, ঠোঁট কামড়ে কী যেন ভেবে নিয়ে ফাটকা খেলার মতো তিনি আর একবার মিথ্যা কথা বললেন, ''দেখুন তখনকার টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটা কাটিং আমাকে একজন দেখাল...হ্যাঁ অরিজিনালই, তাতে দেখছি রেবেলোই ওই ডিসট্যান্স কভার করেছে, আপনি আর অবিনাশ মজুমদার নামে একজন, দুজনে জাম্প করেছিলেন সাড়ে চুয়াল্লিশ।''
চিত্তরঞ্জনের মুখে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল। কাঠগড়ায় জেরার মুখে আসামীকে ভেঙে পড়তে দেখলে উকিলের মুখে এই রকম হাসিই ভেসে ওঠে।
''আপনি ব্যস্ত মানুষ, ভুলটুল হতেই পারে...তা তো বটেই, এত বছর আগের কথা মনে রাখাও... রেবেলোর নামই শুনেছি, তখন তো আমি স্কুলে...কাটিং কোথায় পেলাম?'' চিত্তরঞ্জন আড়চোখে দিব্যেন্দুকে দেখে নিয়ে বললেন, ''আমাদের দিব্যেন্দু ওটা নিয়ে এসেছে, ওকে দিয়েছে অবিনাশ নামে একজন। কে বলুন তো লোকটা?''
দিব্যেন্দু শুনছিল। মুচকি হাসল সে। চিত্তরঞ্জনের এই সব কায়দায় সে অভ্যন্ত।
''অ। ...হ্যাঁ হ্যাঁ ধরাধরি করে ট্রায়ালে গেছল? রানিং শু্যটাও আপনি দিয়েছিলেন? কাটিংয়ে দেখলাম আপনারা দুজনেই সমান ডিসট্যান্স জাম্প করেছেন... আপনার অ্যাঙ্কলে চোট ছিল? ...ওহ প্র্যাকটিসে আটচল্লিশ করতেন।...না মানে, কারেকশন ছাপার কথা এখন অবশ্য উঠছে না, কেউ তো প্রতিবাদ করে চিঠি দেয়নি, দিলে তখন...অনেক কথা আপনার বলার আছে? ...ডিনার...জানেনই তো আমাদের রাত্রে কাজ, নেমন্তন্ন রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না... হ্যাঁ, নিশ্চয়...পরে একদিন হবে।''
রিসিভার রাখার পর চিত্তরঞ্জন আপন মনেই বললেন, ''ভয় পেয়ে গেছে...ড্যাম লায়ার।''
এক সপ্তাহ কেটে গেল অবিনাশ মজুমদার আর আসেননি। চিত্তরঞ্জনও ভুলে গেছলেন। একদিন সকালে বাড়িতে দুটি যুবক এসে হাজির, তাদের পাড়ার রবারের বল প্রতিযোগিতার ফাইনালে সভাপতি হবার প্রস্তাব নিয়ে।
''উল্টোডাঙা থেকে এই শোভাবাজার পর্যন্ত এসেছেন সভাপতি খুঁজতে, পাড়ায় কি লোক পেলেন না? কত বড় বড় খেলোয়াড় ওই অঞ্চলে রয়েছেন।''
চিত্তরঞ্জন ওদের নিরুদ্যম করতে চাইলেন। কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা। তাঁকেই চাই। তিনি অবশ্য ভালই জানেন, খবরের কাগজের লোক বলেই চাইছে, যদি দু—চার লাইন খবর বেরয়, নয়তো পুঁছতও না।
তিনি সেই ফাইনালে গেলেন। রাস্তার বড় বড় আলো জ্বালিয়ে খেলা হল। পুরস্কার দেওয়া, বক্তৃতা করার পর তাঁকে একটা ঘরে বসিয়ে প্লেট—ভরা খাবার দেওয়া হল। কয়েকজন প্রবীণ তাঁর সঙ্গে বসে খেলার নানান বিষয়ে কথা বলতে লাগলেন। এক সময় কথা উঠল, একালের প্লেয়াররা অনেক কিছু পাচ্ছে, কিন্তু সেকালে কিছুই না পেয়ে যা নিষ্ঠা তখনকার প্লেয়ারদের মধ্যে ছিল, এখন তা দেখা যাচ্ছে না।
কথাটা ঘুরতে ঘুরতে এমন এক জায়গায় এল যখন এক প্রবীণ বললেন, ''এই তো অবিনাশ এককালে নামী কত বড় অ্যাথলিট ছিল, এখন তার অবস্থাটা কি? হ্যারিকেন—স্টোভ সারাবার একটা দোকান দিয়ে পেট চালাচ্ছে।''
''কোন অবিনাশ, ট্রিপল জাম্পার? কোথায় থাকেন?'' চিত্তরঞ্জন কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।
''থাকে দুটো গলি পরে জয়রাম দত্ত লেনে।''
নামটা মনে রাখলেন এবং পরের রবিবার সকালে ফড়েপুকুরে এক নিকটাত্মীয়ের শ্রাদ্ধে যাবার পথে, চিত্তরঞ্জন জয়রাম দত্ত লেনে হাজির হলেন। বাড়ির নম্বর জানেন না, রাস্তায় চার—পাঁচটি কিশোর আড্ডা দিচ্ছে, তিনি তাদের কাছে জানতে চাইলেন, ''অবিনাশ মজুমদার নামে একজন, ত্রিশ—চল্লিশ বছর আগে অ্যাথলিট ছিলেন, তার বাড়িটা কোথায় বলতে পারবে?''
ওদের মুখ দেখেই তিনি বুঝলেন, নামটা এই প্রথম শুনল। চেহারার বর্ণনা দিলেন, ''খুব রোগা, লম্বা, মাথায় কাঁচাপাকা রুক্ষ চুল।''
ওরা মাথা নাড়ল। এমন লোককে তারা চেনে না।
''হ্যারিকেন আর স্টোভ সারাইয়ের একটা ছোট্ট দোকান আছে।''
''একটা লোক যার অমন দোকান আছে, আমি একবার হ্যারিকেনের ফুটো সারিয়ে এনেছিলাম। আর একটু ভিতরে গিয়ে মাঠকোঠার বাড়িটায় খোঁজ নিয়ে দেখুন।''
মাঠকোঠার বাড়িতে অন্তত বারো—চোদ্দটা পরিবার, কিন্তু চিত্তরঞ্জনের অসুবিধা হল না অবিনাশের ঘরের হদিস পেতে। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠেই সামনের ঘর।
বিছানায় অর্থাৎ মাদুরপাতা তক্তপোশে লুঙ্গি পরে খালি গায়ে শুয়ে ছিলেন অবিনাশ। একটা পুরনো পাঁজি পড়ছিলেন। চিত্তরঞ্জন দরজার বাইরে থেকে গলাখাঁকরি দিতেই, পাঁজি নামিয়ে তাকালেন তারপর ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন।
''আরে আসুন আসুন, আমার ঠিকানা জানলেন কী করে?''
''এদিকে দিয়ে যাচ্ছিলাম, না বসব না, ভাবলুম খোঁজটা নিয়েই যাই...সেই পেপার কাটিংয়ের কি হল? বলে তো এলেন হরষিত চ্যাটার্জি জোচ্চচর, প্রমাণটা কই?''
অবিনাশ কুঁকড়ে একটু কুঁজো হয়ে গেলেন। মুখে অসহায় লজ্জার ছাপ পড়ল।
''বলেছিলাম ঠিকই, সেদিন ঘরে এসেই অনেক খুঁজলাম কিন্তু কোথায় যে গেল সেটা...'' অবিনাশের সঙ্গে চিত্তরঞ্জনও ঘরের সর্বত্র চোখ বোলালেন। এমন কিছু আসবাব নেই যে কাগজের টুকরো লুকিয়ে থাকতে পারে। দেওয়ালে দুটো জামা ঝুলছে, এককোণে কেরোসিন স্টোভ, আর জলচৌকিতে হাঁড়ি, কড়া, থালা, গ্লাস। কুলুঙ্গিতে কয়েকটা কৌটো আর শিশি। তক্তপোশের নিচে হয়তো বাক্স থাকতে পারে।
''একটা খাতায় ওটা সাঁটা ছিল, খাতাটাই খুঁজে পাচ্ছি না।'' নিরুপায় দুটো হাতের মুঠো বুকের কাছে রেখে অবিনাশ প্রায় কাতরে উঠলেন। ''কিন্তু সত্যিই আমার কাছে ছিল। বিশ্বাস করুন, ছিল।''
''তা বললে হবে কী করে। দেখাতে না পারলে তো আপনি শুধু মিথ্যাবাদীই নয়, হিংসুটেও প্রমাণিত হবেন। যদি বলি হরষিত চ্যাটার্জির কৃতিত্বকে ছোট করার জন্য ধাপ্পা দিয়েছেন, তাহলে কি ভুল বলা হবে?''
''না না, আমি ধাপ্পা দিইনি।''
যন্ত্রণায় ঝলসানো মুখটা উপভোগ করতে করতে চিত্তরঞ্জন বললেন, ''খুব তো তেজ দেখিয়ে বলে এসেছিলেন, ''অ্যাথলিটের সম্মান আর এক অ্যাথলিট রাখবে, এটাই কর্তব্য, কিন্তু অ্যাথলিটের গায়ে কাদা ছিটোবে আর এক অ্যাথলিট, এটাও কি কর্তব্য?''
''আমার কিছু বলার নেই। আপনার কথার জবাব দেওয়ার মুখ আমার নেই।''
''যেখান থেকে পারুন প্রমাণ এনে দিন, লিখিত প্রমাণ, সাতদিন অপেক্ষা করব। তার মধ্যে দিতে পারলে আমি এটা নিয়ে একটা স্টোরি করব, ছাপাব।''
চিত্তরঞ্জন কথাটা বলেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলেন, রাস্তায় পা দিয়ে একবার মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। অবিনাশ সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ নেমে এসে তাকিয়ে আছে। চোখের চাহনি উদভ্রান্তের মতো। বিনা দোষে চড়—খাওয়া শিশুরা এইভাবে তাকায়।
চিত্তরঞ্জন দুঃখ পেলেন। এইভাবে অভিযুক্ত করাটা তাঁর উচিত হয়নি। নিছকই মজা করার জন্য এসেছিলেন। মনে—প্রাণে তিনি বিশ্বাস করেন, অবিনাশ মিথ্যা বলেননি, ধাপ্পাটা হরষিতই দিয়েছেন। আসলে এইভাবে লোকের পিছনে লাগার ছেলেমানুষি স্বভাবটা আজও গেল না। চিত্তরঞ্জন মাথা নেড়ে নিজেকেই বললেন, এবার নিজেকে শোধরাতে হবে।
ব্যাপারটা তিনি একদমই ভুলে যেতেন দিন কুড়ি পর বোম্বাই থেকে যদি না চিঠিটা পেতেন। অপরিচ্ছন্ন হস্তাক্ষরে লেখা চিঠিটায় ছিল: ''মাননীয়েষু, সাতদিনের মধ্যে প্রমাণ দাখিল করিতে না পারার জন্য আমি লজ্জিত। এখানে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার অফিসে দুইদিন গিয়াছি। ৩৮ বছরের পুরানো কাগজ বাহির করিয়া দিতে খুবই ইহাদের গড়িমসি। আমি দেখিতে চাহিবার কারণটি বলায় লাইব্রেরিয়ানের মন গলিয়াছে। তিনি ছবি তুলিয়া দিবারও ব্যবস্থা করিবেন। আগামীকাল আবার যাইব। দয়া করিয়া ইতিমধ্যে লিখিবেন না যে কাদা ছিটাইবার জন্য আমি মিথ্যা কথা আপনাকে বলিয়াছি। আশা করিতেছি আমার প্রার্থনা রাখিবেন। নমস্কার জানিবেন। ইতি, বশংবদ শ্রী অবিনাশ মজুমদার।'' চিঠিতে কোনো ঠিকানা নেই।
চিত্তরঞ্জন প্রথমে বেশ জোরেই হেসে উঠলেন তারপর খেলার বিভাগের সবাইকে ব্যাপারটা বলে চিঠিটা চেঁচিয়ে পড়ে বললেন, 'পাগল! লোকটা কী সিরিয়াসলি জিনিসটাকে নিয়েছে দেখেছ?''
এক সপ্তাহ পর বোম্বাই থেকে একটা খাম এল, তাতে অলিম্পিক টিম সিলেকশন ট্রায়ালের একদিনের রিপোর্টের পুরোটাই ফোটোস্ট্যাট। চিত্তরঞ্জন আবার সেটা সবাইকে দেখিয়ে বললেন, ''একদমই মাথা খারাপ হয়ে গেছে, নইলে এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে এত কাণ্ড কেউ করে।'' ফোটোকপিটা তিনি ড্রয়ারে রেখে দিলেন। ''কী হবে এটা দিয়ে। কোনো স্টোরি তো আর করব না।''
চিত্তরঞ্জন সল্টলেকে বাড়ি তৈরি করবেন। আর্কিটেক্ট থাকেন উল্টোডাঙায়। রবিবার সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে কথা বলে ফেরার সময় ভাবলেন অবিনাশের সঙ্গে একবার দেখা করে যাই। মাঠকোঠার সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গিয়ে তিনি ঘাবড়ে গেলেন। ঘরের মধ্যে একজন স্ত্রীলোক বাটনা বাটছে, উবু হয়ে একটি বছর দশেকের ছেলে লেই মাখিয়ে ঘুড়িতে তাপ্পি দিতে ব্যস্ত। চিত্তরঞ্জন জিজ্ঞাসা করে জানলেন ওরা দু'সপ্তাহ আগে ভাড়া এসেছে।
নিচে নেমে এসে একটি প্রৌঢ় লোককে তিনি অবিনাশের কথা জিজ্ঞাসা করলেন।
''অবিনাশ তো ঘর ছেড়ে দিয়েছে। বোম্বাইয়ে গেল কী একটা দরকারে। হাতে টাকা তো নেই, তাই দোকানটা বাঁধা দিয়ে টাকা নিয়ে চলে গেল। ফিরে এসে দোকান আর ছাড়াতে পারেনি, বিক্রি করে দিয়ে চলে গেছে। না, কোথায় গেছে বলতে পারব না। বুড়ো বয়সে কী যে দরকার পড়ল ওর বোম্বাই যাবার ভগবানই জানে, মিছিমিছি নিজের সর্বনাশটা করল।''
প্রৌঢ় আরো কিছু বলেছিল, কিন্তু চিত্তরঞ্জনের কানে তার এক বর্ণও ঢোকেনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন