মতি নন্দী
ট্রেন ছাড়ার কয়েক মুহূর্ত আগে ওরা ছুটে এসে কামরাটায় উঠল। হাঁপাতে হাঁপাতে কিছুক্ষণ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে তারা সাফল্যের বিস্ময় কাটিয়ে উঠেই ঝগড়া শুরু করল।
''জানি, তুমি এমন কাণ্ড করবে। ঠিক সময়ে কোনোদিনই হাজির হতে পার না।'' ছেলেটি উত্তেজিত হয়ে বলল।
''আচ্ছা আমি কি করতে পারি যদি বাবার হঠাৎ অসুখ করে, মা যদি রান্নাঘরে না যায়, দাদা যদি প্রশ্ন করে বসে আজ তো ছাত্র ধর্মঘট তাহলে কলেজ যাচ্ছিস কেন!'' কৈফিয়ৎ দিল মেয়েটি।
ছেলেটি কামরার ভিতর চোখ বোলাতে বোলাতে আপন মনে বলল, ''এক্সকিউজ একটা না একটা ঠিক তৈরিই থাকে। এক সেকেন্ড দেরি হলেই আর ওঠা যেত না। তাও তো দশ মিনিট কমিয়ে দশটা চল্লিশের জায়গায় সাড়ে দশটায় ট্রেন ছাড়বে বলেছিলাম। তাও লেট। বড্ড নিড়বিড়ে তুমি।''
মেয়েটিও কামরার লোকগুলির উপর চোখ বোলাচ্ছিল, ফিসফিস করে বলল, ''আমার চেনা কেউ নেই, তোমার?''
''দেখছি না কাউকে। টিকিট আমাদের ফার্স্ট ক্লাসের, এখানেই থাকবে?''
''না না, এই ভিড়ই ভাল।''
ভিড়ের মধ্যে ছেলেটি মেয়েটির গা ঘেঁষে দাঁড়াল। মেয়েটি ঘাড় ফিরিয়ে ভ্রূভঙ্গি করে ধমকাল, চারপাশের লোকেদের ইশারায় দেখাল, ছেলেটি ঠোঁট মুচড়িয়ে বেপরোয়া ভাব প্রকাশ করল।
''খেয়ে এসেছ?''
''অল্প। ইচ্ছে করছিল না খেতে। তুমি?''
''না। বাবা টাকা যোগাড় করতে বরানগর গেছে, ফিরে বাজার করবে তারপর রান্না হবে।''
''ওঁদের স্ট্রাইক আর কতদিন চলবে?''
''কি জানি।''
''তাহলে তুমি ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কাটলে কেন, পয়সা পেলে কোথায়?''
''যেখান থেকেই পাই না।''
''আমার খারাপ লাগছে।''
''তা তো লাগবেই, আমার সঙ্গে থাকলেই তোমার খারাপ লাগে।''
''তাই বললাম! তুমি সব কথায় উল্টো মানে কর, বিচ্ছিরি স্বভাব তোমার।''
''জানি। আমি দেখতেও বিচ্ছিরি, পড়াশুনোয়ও ভাল নয়, ফেল করেছি, গান জানি না, পদ্য লিখতে পারি না, গুণ্ডামি করে বেড়াই—''
''এই এই, এই শুরু হল পাগলামি। চুপ করে থাক তো এখন। ঝগড়ুটে, ভীষণ ঝগড়ুটে তুমি।'' এই বলে মেয়েটি পিঠ দিয়ে ছেলেটির বুকে চাপ দিল। কাছের কয়েকজন মুখ ভাবলেশহীন দেখে ছেলেটি বুঝল তারা মন দিয়ে ওদের কথা শুনছে এবং শোনার ভান করছে। মনে মনে রেগে উঠে, কতকগুলো কড়া কথা বিড়বিড় করল।
''কি বলছ?''
''কিছু না। বসার চেষ্টা করতে হবে, তুমি বরং ওই দিকটায় গিয়ে দাঁড়াও।''
''জানলা না হলে ভাল লাগে না ট্রেনে।''
''ওই জানলাটার কাছে দুই বুড়োবুড়ি, দেখছ? বোধ হয় বেশি দূর যাবে না, কাছে গিয়ে দাঁড়াও।''
''কি রকম দেখায় দেখেছ, পাকা চুলের মধ্যে টকটকে সিঁদুর! কত বয়স বল তো?''
''ষাট—পয়ঁষট্টি হবে। বুড়ো বেশ শক্ত সমর্থ রয়েছে।''
''পাশাপাশি কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে। ওই দেখ আমাদের দেখছে।''
''তাকিও না।''
''ডাকছে আমায়, পাশে একটুখানি জায়গা আছে।''
''আমি একা ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকব!''
''ওরা বেশি দূর যাবে না বোধহয়, মালপত্র তো দেখছি না। এখনই জায়গা রিজার্ভ করে রাখি।''
মেয়েটি সন্তর্পণে গিয়ে জানলায় বসা বৃদ্ধার পাশে কোনোমতে বসল। বৃদ্ধা হেসে বললেন, ''কতদূর যাবে?''
ইতস্তত করে মেয়েটি বলল, ''কাছেই। আপনি?''
''আমরা আসানসোল যাব, বড় মেয়ের ছেলের পৈতে হচ্ছে।''
শুনে মেয়েটি মুষড়ে পড়ল। ঘণ্টা ছয়েকের আগে এরা তা হলে নামবে না। বসে লাভ কি!
''তুমি কি পড়ো?''
''বি এ ফার্স্ট ইয়ার।''
''বাড়ি কোথায়।''
''বাগবাজারে।''
''এখন যাচ্ছ কোথায়?''
মেয়েটি কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলল, ''পিসিমার বাড়ি। খুব অসুখ করেছে, বোধহয় ক্যানসার।''
''আহা, বড় শক্ত রোগ। আমার শ্বশুর ওতে মারা গেছলেন। বড় কষ্ট পেয়েছিলেন।''
''হ্যাঁ, এর তো কোনো চিকিৎসা নেই।'' বলতে বলতে মেয়েটি দেখল ছেলেটি ব্যাজার মুখে তাকিয়ে। সে ভাবল, আর বসে থেকে লাভ কি।
''সঙ্গে ও কে? দাদা?''
মেয়েটি বিমূঢ়ের মতো বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নামিয়ে হাসি চাপল।
''মেজদা।'' বলেই সে ছেলেটির দিকে তাকাল। সিগারেট ধরিয়ে মুখ উপরে তুলে ধোঁয়া ছাড়ছে, আর বিরক্ত হয়ে পাশের লোকের দিকে ভ্রূ কোঁচকাচ্ছে।
''কি করে, পড়ে?''
''চাকরি করে, এনজিনিয়ার।''
''আমার বড় জামাইও এনজিনিয়ার বার্নপুরে। তোমার দাদা কোথায় কাজ করে?''
মেয়েটি থতমত হয়ে বলল, ''একটা বিদেশি কোম্পানিতে, নামটা খটমটে মনে থাকে না।'' বলেই সে উঠে দাঁড়াল।
''এসে গেছে বুঝি।''
''হ্যাঁ এইবার নামব।''
ছেলেটির কাছে এসে বলল, ''চলো এখানে নেমে অন্য কামরায় উঠি। বুড়ির বড্ড কৌতূহল।''
একটা স্টেশনে ট্রেন থামতেই ওরা নামল। তাড়াহুড়ো করে পরের কামরায় উঠে দেখল ভিড় কম। বসার জায়গা আছে। ঘেঁষাঘেঁষি করে দুজনে বসল।
''কতদূর পর্যন্ত আমরা যাচ্ছি?'' মেয়েটি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল।
''দু' ঘণ্টা যাওয়া আর দু' ঘণ্টা আসা। ঠিক পাঁচটায় তুমি বাড়ি পৌঁছে যাবে।''
''মোটে চার ঘণ্টা!'' মেয়েটি বিষণ্ণ চোখে বাইরের সবুজ ধান খেতের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর জানলায় রাখা আঙুলে ছেলেটি আলতো করে তার করতল রাখল। মেয়েটি মুঠোয় চেপে ধরল।
''দেখেছ, কত ধান হবে এবার।''
''অনেক। দাম তো এখনই কমতে শুরু করেছে।''
মেয়েটি জানলায় মাথা রেখে ঘাড় কাত করে ছেলেটির মুখের দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে রইল। হাওয়ায় চুলগুলো উড়ে কপালে চোখে পড়ছে। ছেলেটি আঙুল দিয়ে সেগুলি যথাস্থানে ফিরিয়ে দেবার চেষ্টা শুরু করল। মেয়েটির চোখের পাতা মুদে এল।
''এবার সবাই পেট ভরে খেতে পাবে।'' মেয়েটি বলল।
ছেলেটি তার আঙুল গালের উপর আলতো বোলাল।
''এখন কি বলতে ইচ্ছে করছে জান?'' ছেলেটি বলল।
''কি?'' বন্ধ চোখে মেয়েটি জানতে চাইল। তার ঠোঁটদুটি ঈষৎ প্রস্ফুটিত ফুলের পাপড়ির মতো খুলে রয়েছে।
''বলব?''
''বলো।''
''কে, নীলিমা না?''
মেয়েটি চমকে সিধে হয়ে বসল। হাত দশেক দূর থেকে বছর চল্লিশের এক বিবাহিতা ওর দিকে তাকিয়ে, মেয়েটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল।
''চিনতে পার আমায়? গীতাদিকে মনে আছে? বানান ভুলের জন্য মার পর্যন্ত দিয়েছি তোমায়। এইবার মনে পড়ে?'' বিবাহিতা তড়বড়িয়ে বলে গেলেন। মেয়েটি ঘাড় নাড়ল।
''আর বানান ভুল হয় না তো? বেশ চেঁচিয়েই দূর থেকে তিনি বললেন, ''করছ কি এখন, কলেজে পড়ছ? এ লাইনে কোথায় চলেছ?''
''পিসিমার বাড়ি যাচ্ছি, এই পরের স্টেশনেই নামব। কতদিন পর দেখা হল বলুন তো, তিন বছর প্রায়।'' মেয়েটি খুব উৎসাহিত হওয়ার চেষ্টা করল।
''একা যাচ্ছ?''
''মেজদা রয়েছে। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?''
''বর্ধমান। উনি তো ওখানেই চাকরি করেন। তোমাদের ক্লাসের আর সকলের খবর কি, এসো না এদিকে।''
মেয়েটি একবার দেখল ছেলেটির কাঠের মতো মুখ, তারপর উঠে গিয়ে বিবাহিতার পাশে বসল।
পরের স্টেশন আসতে দুজনে নেমে পড়ল।
''এবার ফার্স্ট ক্লাসে।'' এই বলে ছেলেটি ছুটতে শুরু করল, মেয়েটিও। ওরা ফার্স্ট ক্লাসে ওঠামাত্র ট্রেন ছেড়ে দিল।
কামরাটি ফাঁকা, তবে চারটি শীর্ণ, রুক্ষ যুবক চারটি বেঞ্চে চিত হয়ে শোয়া। তাদের পরনে আঁটো ট্রাউজার্স ও রঙিন গেঞ্জি। সঙ্গে ছোট ছোট ব্যাগ। চারজন ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ওদের দিকে। ছেলেটি এক যুবককে বলল, ''উঠে বসুন।''
''কেন?'' মেয়েটির মুখের দিকে বিশ্রীভাবে তাকিয়ে থেকে যুবকটি জানতে চাইল ঔদ্ধত্য দেখিয়ে।
''কেন আবার বসব।'' বিরক্ত স্বরে ছেলেটি বলল।
''অ।'' যুবকটি তাচ্ছিল্যভাবে উঠে বসল। বাকি তিনজন শিস দিয়ে উঠল, গান ধরল এবং নিজেদের মধ্যে গল্প জুড়ল।
''না উঠলেই হত।'' মেয়েটি চুপি চুপি বলল।
''কেন! আমরা কি টিকিট কাটিনি?'' ছেলেটি একটু জোরে বলল। ওরা চারজন তা শুনতে পেল এবং ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল।
''আপনারা বুঝি টিকিট কেটে উঠেছেন?'' এক যুবক ব্যঙ্গ করে বলল।
এরা দুজন চুপ রইল। ওরা নিজেদের মধ্যে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে আলাপ করতে লাগল।
''আমার বিশ্রী লাগছে।'' মেয়েটি ফিসফিস করে বলল।
ছেলেটি উত্তেজিত হয়ে যুবক চারজনকে উদ্দেশ করে বলল, ''এখানে একজন মহিলা রয়েছেন তার সামনে আপনারা নোংরা কথা বলছেন কেন?''
''কে মহিলা? উনি কি মহিলা?'' একজন গম্ভীর হবার ভান করে বলল।
''তার মানে?''
''মানে অন্য কিছুও তো হতে পারে।''
''কি হতে পারে?''
মেয়েটি অস্ফুটে বলল, ''চুপ করো, এদের সঙ্গে কথা বোলো না।''
''আসুক পরের স্টেশন চেকারকে ডাকব, যত্তোসব লোফার ফার্স্ট ক্লাসে ওঠে।'' ছেলেটি রাগে গরগর করে বলল।
''কি বললেন, আমরা লোফার?'' একজন উঠে দাঁড়াল।
''আমরা লোফার? রোয়াব দেখানো হচ্ছে।'' আর একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল এবং তৃতীয় জন হঠাৎ ছেলেটির গালে চড় কষিয়ে দিল। বজ্রাহতের অনুরূপ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার পরই ছেলেটি ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং এক মিনিটের মধ্যেই কামরার কোণে ছিটকে তলপেট চেপে বসে পড়ল। চার যুবক হাত ঝেড়ে হাসতে শুরু করল। ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে ঘুষি ছুঁড়ল।
''লোফার, লোফার।'' চিৎকার করে ছেলেটি থুথু ছিটোল একজনকে মুখে। এবার যুবক চারজন ওকে ঘিরে ধরল। মেয়েটি এতক্ষণ বুঝতে পারছিল না কি করবে। এইবার সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
''ছেড়ে দিন, ওকে ছেড়ে দিন আমরা নেমে যাব এখুনি। ওকে মারবেন না আর।''
তাই শুনে যুবক চারজন হাত ঝেড়ে হাসতে হাসতে আসনে বসল। শূন্য প্রান্তরে মৃত একটি তাল গাছের মতো ছেলেটি দাঁড়িয়ে রইল। তার দুটি চোখ মেয়েটির চোখে নিবদ্ধ। তার দৃষ্টিতে স্ফটিকের ভাবলেশহীনতা।
স্টেশনে ট্রেন থামতেই মেয়েটির সঙ্গে ছেলেটি মাথা নিচু করে নামল। ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার সময় ওরা চাপা হাসি শুনল। দুপুরের নির্জন স্টেশনে ওরা একটি বেঞ্চে বসল। কলের জলে রুমাল ভিজিয়ে ছেলেটির মুখের রক্ত মুছিয়ে দিল মেয়েটি। একটি চোখ ফুলে উঠে প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। নিচের ঠোঁট থেঁতলে ঝুলে পড়েছে। জামায় গাঢ় রক্তের ছিটে। মেয়েটি হাত ধরল ছেলেটির। এবং কেউ কোনো কথা না বলে বসে থাকল।
সবুজ ধান খেতের ওপাশে বহুদূরে গ্রাম দেখা যায়। গ্রামের মাথায় কিনার ঘেঁষে সূর্য নেমে এসেছে। দুটি মেল ট্রেন ইতিমধ্যে চলে গেছে। মেয়েটি মুঠো শক্ত করে ধরে বলল, ''তখন তুমি যেন কি বলবে বলছিলে।''
ছেলেটি ওর মুখের দিকে তাকাল। হাসবার জন্য ঠোঁট দুটি মেলে ধরতে গিয়ে যন্ত্রণায় পারল না। একটি চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। কোনোরকমে একটি হাত তুলে মেয়েটির গালে আঙুল বুলিয়ে সে বলল, ''ইচ্ছে করেছিল বলি, এখন আমি সারা পৃথিবীর রাজা।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন