মতি নন্দী
মাঘের দুপুরে যদি তকতকে ঘাসে পা দিয়েই মৃদু তাপ লাগে, পোড়া পেট্রলের গন্ধ আসে, একটি কি দুটি লোক বিরাট মাঠটা একাকী পার হতে থাকে, উবুড় হয়ে পুকুরধারে কেউ ঘুমোয় এবং হঠাৎ শঙ্খচিলের ডাক শোনা যায়—তখন ইচ্ছা করে 'এবার একটু বসা যাক।' বিনোদ গড়ের মাঠের দিকে মুখ—করা বেঞ্চটা দেখিয়ে বলল।
''হ্যাঁ, অনেক হেঁটেছি।'' বলেই কমলা আগে গিয়ে বসল। সিঁথিতে, কপালে দগদগে তেল—সিঁদুর। খোকা এবার স্কুল—ফাইনাল দেবে। তার জন্যই কালীঘাটে পুজো দিতে কলকাতায় আসা। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে জাদুঘর পর্যন্ত সবাই হেঁটে গেছে। এবার মনুমেন্ট দেখার কথা। সীতা আঙুল দিয়ে পীতু—নীতুকে তা দেখিয়ে দিল, ''ওই যে।''
একজন ফিসফিস করে বলল, ''আমরা ওর কাছে যাব না?''
''এখান থেকেই তো দেখা যাচ্ছে।''
ওরা দুজনে আর কথা বলেনি। মুখ ফিরিয়ে বসে রাস্তায় গাড়ি চলাচল দেখতে লাগল। কিছুদূরে গাছের ছায়ায় একজোড়া ছেলে—মেয়ে গল্প করছে আর মেয়েটি খুব হাসছে। সীতা তাদের দিকে মুখ করে বসল। কমলা ঠেস দিয়ে মুখটা আকাশমুখো করে চোখ বন্ধ করল। তার সারা অঙ্গে ক্লান্তি। খোকা একটু অধৈর্য হয়েই বলল, ''কতক্ষণ বসবে?''
বিনোদ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ''যাবই বা কোথায়?''
খোকা উঠে দাঁড়াল। পকেটে হাতভরে কয়েক পা এগিয়ে একটা ভাঁড়কে লাথি মারল। সেটা ভেঙে যেতে আর কোনো কাজ না পেয়ে মাঠের মধ্যে এগিয়ে গেল।
খোকার থুতনিতে কেশ দেখা দিয়েছে, কণ্ঠস্বরে কর্কশতা এসেছে, দুই পায়ে ঘনরোম। বাহুর পেশী আকৃতি নিচ্ছে। এবার প্রথম একটা বড় পরীক্ষায় বসবে। এখন ও কিরকম বোধ করছে, সেইটা জানতে বিনোদের সাধ হল। তাই সেও উঠে পায়চারি করতে করতে খোকার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
''তোর মা বড্ড হাঁপিয়ে পড়েছে, একটু জিরোক। তুইও বস না। সকাল থেকে তো বসতে দেখলুম না।''
খোকা কথাটা গায়ে মাখল না। দূরে রাস্তার ওপারে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে সেই দিকে তাকিয়ে। একদল মেয়েপুরুষ, বিনোদের মনে হল তারা বেহারী, এমনভাবে বাসে উঠল যেন স্টেশনে এক মিনিটের জন্য থামা ট্রেনে উঠছে। বাস ছাড়ার পর দেখা গেল একজন চেঁচিয়ে বাসের পিছনে ছুটতে শুরু করেছে। বিনোদের ভারি হাসি পেল।
''খোকা দেখলি না, একটা ব্যাপার।''
ঘটনাটা বিনোদ বলল। খোকা প্রয়োজনমতো হেসে খেলায় মুখ ফেরাল বিনোদও সেই দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শ্রান্ত বোধ করতে শুরু করল। তার ইচ্ছে হল ঘাসে পা ছড়িয়ে বসতে।
''কলকাতাতেই খেলার সুবিধে, কত ক্লাব।'' খোকা স্বগতোক্তির মতো করে বললেও বিনোদ জবাব দিল, ''আমাদের ছেলেবেলায় এত কিছু ছিল না। ঘোষেদের মস্ত উঠোন ছিল, সেখানে ব্যাডমিন্টন থেকে শুরু করে সব খেলা হত। পাড়ার বাইরে যাওয়ার দরকারই হত না।''
খোকা শুনছিল, হঠাৎ খেলার মাঠ থেকে চিৎকার উঠল। একজন আউট হয়ে ফিরে যাচ্ছে। আউটের পদ্ধতিটা দেখতে পায়নি তাই বিরক্ত হয়ে খোকা বলল, ''তুমি বরং ওদের কাছে গিয়ে বস।''
বিনোদ অপ্রতিভ বোধ করল। কথা না বলে গুটিগুটি ফিরে এল।
পীতু ফিসফিস করে সীতাকে জিজ্ঞাসা করল, ''দিদি, এবার আমরা কী দেখতে যাব?''
''চিড়িয়াখানা?'' নীতু বলল।
''জানি না, বাবাকে জিগ্যেস কর।'' সীতার হাই উঠছে! ছেলেমেয়ে দুটো খালি কথাই বলে যাচ্ছে। দেখে দেখে আর দেখতে ভাল লাগছে না।
''চিড়িয়াখানা আরও সকালে যেতে হয়।'' বিনোদ উত্তরটা দিয়ে দিল। কিন্তু ছেলেদুটির মুখ দেখে তার মায়া হচ্ছে। বলল, ''অন্য কোথাও অবশ্য যাওয়া যায়।''
''সিনেমা?'' সীতা চট করে বলল।
''এখন শো আরম্ভ হয়ে গেছে। তাছাড়া এখানে তো ইংরিজি বই দেখায়।''
বিনোদ মুখ ফিরিয়ে নিল, যাতে সীতা প্রসঙ্গটা টানতে না পারে। খোকাকে দেখতে পেল সে। একটা ঢিল কুড়িয়ে সামনে জোরে ছুঁড়ল। ঘাড় ফিরিয়ে এদিকেই তাকাল। ও যেন প্রস্তুত ঘোড়ার মতো ছটফট করছে। শুধু গন্তব্যটা জানতে পারলেই হয়।
পীতু ফিসফিস করে বলল, ''আমরা কি এবার বাড়ি ফিরব?''
বিনোদ উঠে দাঁড়াল।
''চল একটা জিনিস দেখাব।''
ওরা তাকাল।
''আমাদের বাড়ি দেখাব, খোকাকে ডাক।''
কমলা কথা বলেনি এতক্ষণ। এবার বলল, ''কোন বাড়ি? যেটা ছিল?''
কথা না বলে বিনোদ বাস স্টপের দিকে এগিয়ে গেল।
''ও—ছাই দেখে কী লাভ। তারচেয়ে আর একটু বসে থাকলেই হত।''
গজগজ করে কমলা উঠে দাঁড়াল। পীতু ছুটে গেছে খোকাকে ডাকতে। সীতা বলল, ''সেদিন মেট্রোয় সিনেমা দেখে গেছে বি—ডি—ও'র বড় মেয়ে।'' বাস স্টপে দাঁড়িয়ে খোকা বলল, ''এসব ক্লাবে আমিও খেলতে পারি।''
বাসে ওঠা পর্যন্ত বিনোদ কারুর দিকে তাকাল না।
এখনও অফিস ছুটির ভিড় আসেনি। বিনোদ বাসে জানালার ধারে বসল। ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বাসটা চলেছে। দুলুনি লাগছে। সে যে কত ক্লান্ত এইবার টের পেল। আরাম পাবার জন্য চোখ বুজল। মাঝে মাঝে খুলে দেখে একটা—দুটো গাছ, একটু ঘাস—মাটি, জমাটবাঁধা ধূসর বাড়ি। কানে বাজছে বাসের ঘণ্টি এঞ্জিনের শব্দ আর অনবরত প্রবল এক সাঁইসাঁই অতিক্রম ধ্বনি। বিনোদ ভিতরে ভিতরে ভার বোধ করতে শুরু করল, যেন দমে যাচ্ছে। পিছিয়ে যাচ্ছে।
''জানলা দিয়ে মুখ বার কোরো না, পীতু নীতু।''
কমলার গলা শোনা গেল। চোখ খুলে বিনোদ দেখল সামনের লোকটি ঘাড় হেঁট করে কী যেন পড়ছে। পাশের জন জর্দা—পান চিবোতে চিবোতে শূন্যচোখে সামনে তাকিয়ে। ব্যস্ত হয়ে একজন উঠে গেল, সঙ্গে সঙ্গে আর একজন সেখানে বসল। বাইরে ট্র্যাফিকের লাল আলোটা জ্বলজ্বল করছে। স্থির বাসটার গোটাদেহ এঞ্জিনের ধকধকানির সঙ্গে কাঁপছে। বিনোদের মনে হল, সপরিবারে কোথায় যেন চেঞ্জে চলেছে। স্টেশনের পর স্টেশন পার হয়ে যাচ্ছে। যাত্রীদের ওঠা—নামা চলেছে। জানালা দিয়ে মুখ বাড়াতেই কয়লার গুঁড়ো চোখে পড়ল। মা তখন বললেন, ''বারণ করেছিলুম জানলা দিয়ে মুখ বার করিস না।'' আঁচলটাকে সলতের মতো পাকিয়ে চোখের মধ্যে অনেক খুঁজলেন। ফুঁ দিলেন। শেষে কাপড় দলা করে মুখের ভাপ দিয়ে চোখে চেপে ধরলেন। মা জর্দা খেতেন। গন্ধটা তখন সুন্দর লাগছিল।
''তোর মেজকাকার চোখে একবার কয়লার গুঁড়ো পড়ে, সেকি কাণ্ড!'' এই বলে জানালার কাচ নামিয়ে দিয়ে মা হেসে বললেন, ''আর ভয় নেই।'' তারপর একটা পান মুখে দিয়ে পাশে বসলেন। আমরা দুজনে একই জানালা দিয়ে দৃশ্য দেখতে লাগলাম। পিচ ফেলার জন্য মা একবার কাচটা তুলেছিলেন। বাবা চুরুট মুখে একটা ইংরিজি বই কখন থেকে পড়েই চলেছেন। মা ফিসফিস করে বললেন, ''নদু, তোর বাবাকে বল না, বই রেখে এখানে এসে বসতে।'' বাবাকে বলতেই হেসে কেমন করে যেন মা'র দিকে তাকালেন। মা ঘোমটা বাড়িয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন। তারপর তিনজনে সেই কাচফেলা জানলাটি দিয়ে বাইরের গাছ, চাষি, কুঁড়েঘর, মেঠোপথ আর পথিকদের দেখতে লাগলাম। এইভাবেই একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম মা'র কোলে।
অন্ধকারে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে স্টেশনে নামলাম। ওয়েটিং রুমে মা মাথা মুছিয়ে দিয়ে চা খেতে চাইলেন। বাবা বাইরে বেরিয়ে চা আনলেন। আমিও খেলাম। বাবা বললেন, ''নদু, আর একটা জিনিস দেখাব, কখনো দেখিসনি।''
প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এলেন। কী অন্ধকার চারিদিক। বাবার চশমার কাচে বৃষ্টির জল লেগেছে। স্টেশনের ফিকে আলোয় তা জ্বলজ্বল করে উঠল।
''তাকা সামনে।''
তাকালাম। গাঢ় অন্ধকার চোখের সামনে ওৎ পেতে। তাকিয়ে তাকিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলাম।
''এবার উপর দিকে চোখ তোল।''
তাই করলাম। চোখ তুলতেই হঠাৎ ঠকঠক করে কেঁপে গেলাম। সেই অন্ধকার এক জায়গায় শেষ হয়ে গেছে। সুতোর মতো আঁকা—বাঁকা ঘোলাটে আকাশ সেই অন্ধকারের মাথায় চর ফেলেছে। অন্ধকারটা মনে হল ভেঙে পড়বে বুঝি।
বাবা আঙুল তুলে বললেন, ''ওটা হচ্ছে পাহাড়। ওখানে ঝরনা আছে। আমরা একদিন দেখতে যাব।'' গানের সুরের মতো করে বাবা কথা বলেছিলেন।
অবাক হয়ে ছেলেমেয়েরা তাকাল। আঙুল তুলে বিনোদ বলল, ''ওইটেই ছিল আমাদের বাড়ি।''
''কী আছে ওখানে?'' নীতু জিজ্ঞাসা করল।
''লোকেরা থাকে।'' সীতা বুঝিয়ে দিল। লোহার গেটের একটি মাত্র পাল্লা। দুপাশের পামগাছ দুটি ন্যাড়া। ফুলবাগানটায় পুরনো ড্রাম স্তূপ হয়ে রয়েছে। দোতলার বারান্দায় কাঠের পার্টিশন। রেলিঙে নানান ধরনের কাপড় শুকোচ্ছে। বাড়িটার বহুবছর কলি হয়নি, কিন্তু দাগরাজি দেখা যাচ্ছে। ভাঙা পাইপ দিয়ে তিনতলা থেকে ছড়ছড় করে জল পড়ল। দোতলার কার্নিসে একটা বেড়াল মাথা বাঁকিয়ে কী চিবোচ্ছে, সম্ভবত চড়াই। সদর দরজা খোলা। রাস্তা থেকেই দেখা যায়, অনেকগুলি মেয়েমানুষ বাসনমাজা, কাপড়কাচার কাজ করছে। উঠোনে আগে জলের কল ছিল না। দোতলায় হঠাৎ চিৎকার করে কে খিস্তি করল।
''দোতলার ওই বারান্দার পেছনেই হলঘর। বাবা বসতেন।''
''বসে কী করত?'' পীতু জানতে চাইল।
''গান হত, রিহার্সাল হত, পাড়ার পুজোর মিটিং হত। একতলার ওই ঘরটা ছিল মেজকাকার সেরেস্তা। ছোটকাকা মরে যেতে ওর বৈঠকখানাটা মেজকাকা নেয়। তখন খুব মক্কেল হয়ে গেছে।''
বাড়ি থেকে একটা লোক ওদের লক্ষ্য করছিল। বিনোদ আঙুল দিয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট করে দেখাচ্ছিল। তার দিকে আঙুল তুলতে দেখে বেরিয়ে এসে প্রশ্ন করল, ''কাকে খুঁজছেন?''
বলার ভঙ্গিতে বিনোদ হকচকাল। পীতুই বলে ফেললে, ''আমাদের বাড়ি দেখতে এসেছি।''
ভ্রূ কুঁচকে লোকটি সপরিবারে বিনোদকে দেখল। চোখেমুখে বিস্ময় ও অস্বস্তি ফোটাল। কিন্তু যখন বিনোদ বলল, ''এটা এককালে আমাদেরই বাড়ি ছিল?'' লোকটি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
''বেচে দিয়েছেন।''
বিনোদ ঘাড় কাত করল।
''বেচবার আর লোক পেলেন না? খোঁয়াড়, মশাই খোঁয়াড়। জানোয়ার হয়ে বাস করছি। এদিকে ভাড়া নেয় সত্তর টাকা করে।''
ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে করতে লোকটি বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল। বিনোদ রেগে গেল।
''বেলে পাথরের উঠোন আর সিঁড়ি, মার্বেল পাথরের হলঘর, কত বড় বড় জানালা দক্ষিণমুখো—''খোকার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ''এই বাড়িকে বলে কিনা খোঁয়াড়! এরকম বাড়িতে যে বাস করছে এটাই ব্যাটার বাবার ভাগ্যি।''
কমলার দিকে সে তাকাল। আশ্চর্য, পিছন ফিরে কী যেন দেখছে। ধমকের মতো করে বিনোদ বলল, ''এদিকে দেখ না। ওই যে তিলতলায় খড়খড়ির জানলা, ওটা ঠাকুরঘর। ওর পিছনে ছাদ, দুটো ব্যাডমিন্টন কোর্ট হয়ে যায়।''
এক বুড়ো কাশতে কাশতে জানালাটায় এসে দাঁড়াল। কমলা মুখ ফিরিয়ে নিল। নিচুস্বরে সীতাকে বলল, ''সকাল থেকেই ধকল চলেছে, আয় রকটায় বসি।''
''এভাবে এখানে বোস না।'' বিনোদের কথায় কমলা তাড়াতাড়ি পা নামিয়ে নিল। কিন্তু উঠল না। এক বৃদ্ধ তখন যাচ্ছিল। বিনোদকে দেখে ইতস্তত করে কাছে এগিয়ে এল।
''হরিকা, আমি বিনোদ। নদু।''
''চিনতেই পাচ্ছিলুম না। চোখে তো আর ভাল দেখছি না। তা তুমি যে দেখছি বুড়িয়ে গেছ।''
''বয়স তো হচ্ছে।'' বিনোদ হেসে বলল।
ফোকলা মুখে বুড়ো হাসল। পরমুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে বলল, ''একটা লোক ছিলেন বটে তোমার বাবা। কী অন্তঃকরণ! সারাজীবন শুধু দিয়েই গেলেন। একফোঁটা সাহায্যও কারুর কাছ থেকে নিলেন না। ভায়েদের মানুষ করলেন, তারা গাড়ি বাড়ি করল, আর তিনি?'' দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুড়ো চুপ করল। বুকটা ফুলে উঠে টসটস করছে বিনোদের। খোকার দিকে তাকাল। শুনে নিক। হরিকাকে তো আর সে বলতে শিখিয়ে দেয়নি।
''এইটি আমার বড় ছেলে, এবার স্কুল ফাইনাল দেবে।''
বিনোদ আশা করেছিল খোকা প্রণাম করবে। হরিকা হাজার হোক ব্রাহ্মণ। কিন্তু খোকা তার চোখ—ইশারা অগ্রাহ্য করল।
''বেশ বেশ, বংশের মুখোজ্জ্বল কর বাবা। আমার ছোটনাতি গতবার বি এসসি পাস করল। তোমার মেজকাকার ছেলে ঘুনুকে ধরে কারখানায় ঢুকিয়ে দিয়েছি। লোক ভাল। পাড়ার সক্কলের কথা জিজ্ঞেস করল। তোমাদের কথাও। যাও না বলে দুখ্যু করল।''
''বাবা কখনও কারও কাছে হাত পাতেননি। সেই রক্ত আমার গায়েও তো আছে।''
''তা বটে, তা বটে।''
সীতা এসে বিনোদকে ফিসফিস করে বলল, ''মা বলছে, কখন ফিরবে?''
ট্রেনে ফেরার সময় কমলা বলল, ''তোমার হরিকা রাস্তায় দাঁড়িয়েই কথা বলল, বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বসাতে তো পারত।''
''অবস্থা তেমন ভাল নয়, নইলে কি আর বলত না। ওর বড় মেয়ের বিয়েতে সেকি কাণ্ড! পালঙ্ক দেওয়ার কথা ছিল দিতে পারেনি। বরকে তো সভা থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল বরের বাপ। কান্নাকাটি পড়ে গেল। বাবা তখন জামিন থেকে নিজে দাঁড়িয়ে বিয়ে দেওয়ালেন। পরদিন বরের বাপের হাতে চারশো টাকা গুনে গুনে দিলেন। বুঝে দ্যাখ, সে আমলের চারশো টাকা মানে আজকের দু'হাজার টাকা।''
এতক্ষণ পরে খোকা মুখ খুলল, ''দিয়ে কি লাভটা হল!''
শোনামাত্রই ঝিমঝিম করে উঠল বিনোদের মাথা। চুপ করে রইল সে। কিছুক্ষণ পরে নিজেকে শুনিয়ে একবার শুধু বলল, ''ঘুনু আর আমি একই ক্লাসে পড়তুম।''
কেউ শোনার জন্য আগ্রহ দেখাল না। নীতু মা'র কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঠাণ্ডা লাগছে তাই পীতু কুঁকড়ে বসে। কিন্তু বাবার কাছে গল্প শোনার জন্য জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে। বিনোদ আর কথা বলেনি।
স্টেশন থেকে রেললাইন ধরে প্রায় আধমাইল গিয়ে লোহা কারখানার পাশ দিয়ে গোপাল কুণ্ডু রোড। সেখান থেকে বিনোদের বাড়ির গলি তিন মিনিটের পথ। ওরা ট্রেন থেকে নামল তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেছে। দূরে সিগন্যালের লাল আলোটা জ্যাবড়া দেখাচ্ছে। লাইনের দুহাত উপরে কুয়াশা চাপ বেঁধে। ঘুমন্ত নীতুকে কোলে নিয়ে কমলা মন্থর হয়ে পড়েছে। পীতুর হাত ধরে বিনোদ স্লিপারে পা রেখে ধাপে ধাপে এগোতে লাগল। এক একটা স্লিপারের মধ্যে ফাঁক বেশি। পীতু পারছে না দেখে ওকে সীতার কাছে গছিয়ে দিল। তখন কমলা বলল, ''এখানেই তো পুরুতমশাই কাটা পড়েছে।''
খোকা বলল, ''আরও এগিয়ে, ফুটবল মাঠের কাছে।''
কমলা বলল, ''কী সাহস!''
বিনোদ বলল, ''কিসের সাহস, মরার?''
''না গো, রাধামাধবের সোনার মুকুট চুরি করা কম সাহসের কাজ! একটুও বুক কাঁপল না! ধরা পড়ে গেল তাই, নয়তো কুষ্ঠ হয়ে যেত ওই হাতে।''
খোকা কমলার দিকে ফিরে বলল, ''তুমি কি করে জানলে যে হত?''
''তুই থাম। পাপ করলে ভগবান শাস্তি দেবেনই। আত্মহত্যা করে ফাঁকি দিল তাই। কিন্তু ফাঁকি দিয়ে যাবে কোথায়, যমের দরবারে তো যেতেই হবে!''
বিনোদ কথা বলল না। ভাবতে শুরু করল ললিত ভটচাযের কথা। একদিন এসে ভোট চাইল মিউনিসিপ্যালিটির ইলেকশনের সময়। বিনোদ বলেছিল, ''ঠাকুরদেবতার সেবা নিয়ে থাকবে, তুমি আবার এই সবে মাতলে কেন?'' ললিত বলে, ''ঠাকুর তো দেশের মানুষ। তাঁদের সেবাই তো করতে চাই। খাসা বলেছিল। সবাই ওকে মান্য করত, কথা শুনত! চুরি করে ধরা পড়ে অপমান এড়াতে ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেনে গলা পেতে দিল। দেমাকী ছিল, দেমাক দেখিয়েই চলে গেল। এসব মানুষ আজকাল বড় একটা চোখে পড়ে না।
খপ খপ আওয়াজ হচ্ছে সকলের পা ফেলার। পাথরে আঙুল ঠুকে সীতা একবার যন্ত্রণায় কাতরে উঠল। কমলা ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে। দেখে দেখে সবাই পা ফেলছে।
''প্রিন্সিপল থাকা দরকার নাহলে এলোমেলো হয়ে জীবন কাটে।'' চাপাস্বরে বিনোদ বলল খোকাকে। বাবা একবার বলেছিলেন, তখন আমি খুব ছোট। মেজকাকার ভায়রা—ভাই যোগেন ঘোষ কর্পোরেশন ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিল। বাবার কাছে এলেন ভোট চাইতে। কুটুম বলে তো খুব আদর—যত্ন করে বসালেন। কিন্তু জানিয়েও দিলেন, কংগ্রেস ছাড়া আর কাউকে ভোট দেবেন না। মেজকাকাও অনেক করে বললেন কিন্তু বাবা অটল। সারারাত ঘুমোলেন না, দোতলার বারান্দায় পায়চারি করলেন। পরদিন মেজকাকা কোর্টে বেরোচ্ছেন তখন ডেকে বললেন, ''যোগেনবাবু নিজে এসেছিলেন, কুটুম, তাঁর মর্যাদা আছে, সেটা রাখতেই হবে। ওঁকে জানিয়ে দিও আমি কাউকেই ভোট দেব না।''
একটানা গল্পটা করে বিনোদ প্রফুল্ল বোধ করল। খোকা মাথা নিচু করে দেখে দেখে হাঁটছে। পিছন থেকে সীতা চেঁচিয়ে বলল, ''বাবা একটু দাঁড়াও, বড্ড এগিয়ে গেছ।''
কারখানার কাছে ওরা এসে পড়েছে। একটা পুরনো ঝাঁকড়া বটগাছের পাশ দিয়ে রাস্তাটা পুবে চলে গেছে। বিনোদ খোকাকে নিয়ে গাছটার নিচে দাঁড়াল।
কমলার প্রায় এলিয়ে পড়ার দশা। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ''তোমরা তো জিন লাগিয়ে ছুটছ। আমি ওদিকে ভয়ে মরি।''
সীতা বলল, ''ছ'টা পঁয়তাল্লিশের গাড়ি আসার সময় হয়েছে, মা'র খালি ভয় যদি আমরা কাটা পড়ি।''
''না বাপু, গাড়িটাড়ি নিয়ে খেলা নয়। ও হচ্ছে নিয়তির মতো। হাত দেখালেও থামবে না, পাশ কাটিয়েও যাবে না।''
কমলার বলার ভঙ্গিতে বিনোদের কৌতুক করার ইচ্ছা হল। সিগন্যালের রঙ সবুজ হয়ে রয়েছে। সে বলল, ''তাহলে একটু দাঁড়াও। তোমার নিয়তি আসছে তাকে দেখে যাও।''
''না, না, চলো। ঠাট্টা করতে হবে না।''
বিনোদ ওকে হাত ধরে টেনে রাখল। ছেলেমেয়েদের লক্ষ্য করে কমলা ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় দূরে এঞ্জিনের হুইসেল বাজল।
সকলে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। গুম গুম শব্দ হচ্ছে। লাইনের উপরে পিছলে যাচ্ছে আলো। মাঠের মাঝে ইলেকট্রিকের লম্বা খুঁটির মাথা ঝকঝক করে উঠল। একটা শেয়াল ওদের কাছ দিয়ে ছুটে গেল।
''এসে গেছে, এসে গেছে।'' বিনোদ কাঁপাগলায় অন্ধকারের মধ্যে বলল। ফিসফিস করে পীতু বলল, ''কী এসে গেছে বাবা?''
''নিয়তি।''
বিনোদ কয়েক পা এগিয়ে গেল। পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া চাঙড়ের মতো দুড়দাড় করে ট্রেনটা এসে পড়েছে। বিনোদ দুহাত বাড়িয়ে শিশুর মতো কলধ্বনি দিয়ে লাইনের দিকে এগিয়ে গেল। কমলা ভয়ঙ্কর স্বরে চিৎকার করে উঠল। খোকা ছুটে গিয়ে বিনোদের কোমর জড়িয়ে ধরল। যখন, কামরাগুলোর আলো ওদের দেহ থেকে অদৃশ্য হল, মাটি স্থির হল, বাতাস শান্ত ভাবে বয়ে গেল, বটগাছের পাখিরা চিৎকার বন্ধ করল, নক্ষত্রের মালিন্যও ঘুচল, তখন বিনোদ বলল, ''ভয় নেই রে, ও লাইন ধরে চলে। আমি ওর লাইনে যাচ্ছি না।''
কমলা ফুঁপিয়ে বলল, ''কবে তোমার পাগলামি থামবে?''
হা হা করে হেসে বিনোদ বলল, ''চল চল, এবার যাওয়া যাক।''
বাড়ি পৌঁছে খোকা পড়তে বসল। আধাদামে কেনা গতকালের খবরের কাগজ নিয়ে বিনোদ ওর কাছে বসে পড়ছে আর মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। খোকা কিছু একটা মনে করে রাখতে ভ্রূ কোঁচকাচ্ছে থুতনিতে হাত রেখে ঠোঁট কামড়ে টেরিয়ে রয়েছে, হুবহু ওর ঠাকুরদার মতো। সারা মুখ এ সময় একটা দম্ভের মতো দেখায়। আত্মপ্রত্যয়ে কঠিন মনে হয়। বিনোদ মুগ্ধ চোখে খোকাকে দেখছিল। হঠাৎ তা খোকার নজরে পড়ল। কুঁকড়ে গেল সে।
''তোকে একটা কথা বলব, শুনবি?''
খোকা অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে রইল। ইতস্তত করে বিনোদ বলল, ''তোর ঠাকুরদার পর মান—সম্মানের মুখ আর দেখিনি। তুই আবার দেখা, পারবি না?''
কথাটা বোঝবার জন্য খোকা কিছু সময় নিল। ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে এল ওর মুখ। বিনোদ ঝুঁকে ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ''মনের মধ্যে সদাসর্বদা বলবি, বড় হব বড় হব। ফাঁকি দিবি না, ছোট কাজ করবি না, একবার নিচু হলে উঠে দাঁড়ানো ভারি শক্ত কাজ রে।''
ভয়ঙ্কর এক ক্ষুধার্তের মতো সে অপেক্ষা করতে লাগল। খোকা অন্তত একবার মাথাটাও হেলাক বা একছিটে হ্যাঁ বলুক।
সেইসময় ভিতরের ঘরে পীতু নাকি সুরে টেনে টেনে কান্না জুড়ল। বিনোদ বিরক্ত হয়ে ভিতরে গেল। ওর ক্রুদ্ধ মুখ দেখে পীতু চুপ করল। সীতা দ্রুত বেরিয়ে গেল। পীতুও বেরোতে যাচ্ছিল, বিনোদ ওর কান ধরল। ''কাঁদছিস কেন, দাদা পড়ছে না ও ঘরে?''
সেইসময় নীতু বলল, ''দিদি চপ খাচ্ছিল। ওকে দিয়েছে তবু দেখ না, আবার চাইছে।''
''পেল কোথায় তোর দিদি?''
নীতু চুপ করে রইল। সীতা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। বিনোদ তাকে দুবার জিজ্ঞাসা করল। সীতা তবু চুপ। এবার কঠিন ভঙ্গিতে বিনোদ এগিয়ে গেল, ''পয়সা পেলি কোথায়, কে এনে দিল?''
''কেউ না।''
হঠাৎ পীতু বলল, ''সুশীলদা জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল।''
কিছুক্ষণ কেউই কথা বলল না, চোখের পাতাটুকু পর্যন্ত ফেলল না। তারপর বিনোদের চড়ে সীতা ছিটকে পড়ল কমলার পিঠের উপর। লাথি মারতে যাচ্ছিল, কমলা দুহাতে আগলে বলল, ''বিয়ের যুগ্যি মেয়ের গায়ে হাত তুলতে লজ্জা করে না?''
বিনোদ থরথর করে কাঁপছে, গলায় কথা আটকে গেছে। কণ্ঠস্বর দুমড়ে মুচড়ে কমলা বলল, ''বড় বংশের ছেলে যদি, বস্তির লোকের মতো আচরণ কেন?''
দিশেহারা হয়ে বিনোদ চারধারে তাকাল। ছুটে ঘরের মধ্যে গিয়ে খোকাকে বলল, ''সুশীলকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে? এ সব কী ব্যাপার?''
চোখ সরু করে খোকা বলল, ''কেন, কী করবে?''
''ভেবেছে কী সে? বখামি করার জায়গা পায়নি?''
''সুশীলদা আমায় সাজেশন এনে দেবে কলকাতা থেকে।''
''তাতে কী হয়েছে, তা বলে—''
বিনোদের কণ্ঠস্বর মৃতের শেষকম্পনের মতো কেঁপে উঠে থেমে গেল। খোকার সারামুখে ঔদ্ধত্য মাখানো। কঠিন দেখাচ্ছে। দাঁড়িয়েছে গোঁয়ারের মতো। বিনোদ চোখ নামিয়ে নিল। সন্তর্পণে খোকার পাশ কাটিয়ে বাইরের রকে এসে দাঁড়াল। একবার মুখ ফিরিয়ে ঘরের দিকে তাকাল যেন এইমাত্র তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জামা পরে খোকা হন হন করে ওর পাশ দিয়েই বেরিয়ে গেল। তখন সে মনে মনে বলল, খোকা ফিরে আয়।
তারপর বিনোদ হাঁটতে শুরু করল। গলি ধরে সে ঘুরতে ঘুরতে চৌরাস্তায় পৌঁছল। তখন সিনেমা ভেঙেছে। মানুষের ভিড় আর সাইকেল—রিকশার ভেঁপুতে বিরক্ত হয়ে কাছের গলিটায় ঢুকতে যাচ্ছে, দেখল চায়ের দোকানে সুশীল আড্ডা দিচ্ছে। সে থমকে দাঁড়াল। তখনই খোকা এসে ওর সামনে জুড়ে বলল, ''কেন এসেছ এখানে? আমি জানতুম তুমি আসবে। তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে মান—সম্মানের কথা ভেবে ভেবে।''
বিনোদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। আমার ছেলে, আমারই ছেলে খোকা! ওকি ভাবছে আমি পাগল? মাথা নামিয়ে সে ভিড়ের মধ্যে দ্রুত মিশে যাবার জন্য লোকেদের ধাক্কা দিতে শুরু করল।
ফুটবল মাঠের ওধারে রেললাইন। এধারে শিবমন্দির, বেশ্যাপাড়ার গলি, মিউনিসিপ্যালিটির দিঘি, বি ডি ও অফিস, তার পাশে ললিতের ঘর। রাস্তার ইলেকট্রিক আলো ঘরের দরজায় কোনোক্রমে আসে।
খসখস শব্দ হচ্ছে। অন্ধকার ঘর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে ললিতের বুড়ো বাপ বেরিয়ে এল। ''কে?''
''আমি বিনোদ। রথতলার বিনোদ।''
বুড়ো আন্দাজে তাকাল। হাত দিয়ে মাটি থাবড়ে বলল, ''বস। কী জন্যে?''
''এমনি।''
''আঃ।''
মাথায় টাক। মুখভরতি দাড়ি। গায়ের চামড়া প্রাচীন পাথরের মতো কর্কশ, কুঞ্চিত। হাঁ করে নিশ্বাস নিচ্ছে।
''ছ'দিন হয়ে গেল। একাদশী থেকে আজ। সবাই বলল, একটু আগেই ছ'টার গাড়ির অনেকে ওখান দিয়েই হেঁটে গেছে, তখন কাউকে দেখেনি।''
বিনোদ টের পেল তার শীত করছে। এগিয়ে বুড়োর মুখোমুখি হয়ে বসল। ওর শরীর থেকে বন্য গন্ধ আসছে।
''আমাকে ওরা চলে যেতে বলেছে। নয়তো বার করে দেবে। ললিতকে থাকতে দিয়েছিল, আমাকে কেন দেবে?''
''কোথায় যাবেন?''
আঙুল তুলে বুড়ো ফুটবল মাঠের ওপারে রেললাইনের উদ্দেশে দেখাল।
''কেন?'' ফিসফিস করে বিনোদ বলল।
ও এমনভাবে মুখ তুলল যেন বিনোদের কথাটার অর্থ জানতে চায়। তারপর মাথা নাড়তে শুরু করল। ওর ঘন ভ্রূ, দাড়িতে ভরা মুখটা রাস্তার আলোয় বিক্ষত দেখাল।
''জানো, আমি আর কিছু বুঝতে পারি না, টের পাই না। গলির একটা মেয়ে কাল ভাত দিল, খেলুম, স্বাদ পেলুম না। লংকা ঘষে আচার দিয়ে খেলুম, তবুও।'' ছলছল করে উঠল বুড়োর স্বর, ''কাল পেচ্ছাপ করে ফেললুম, তাতেই সারারাত শুয়ে রইলুম। বুঝলে, আমার শীত করল না।''
বুড়ো হাতড়াতে লাগল। বিনোদ ডান হাতটা এগিয়ে দিতেই খপ করে ধরে কাছে টানতে লাগল। বিনোদ ঝুঁকে ওর বুকের কাছে মুখ এগিয়ে আনল।
''ছ'টা পঁয়তাল্লিশের গাড়িতে চলে গেল, আমাকে ফেলে। ও কি আমাকে ঘেন্না করত? ইদানীং আমি আর কথা বলতুম না।'' বুড়োর স্বর রুদ্ধ হয়ে এল।
''আজ কিছু খেয়েছেন?''
কথাটার অর্থ বুঝতে বুড়ো আবার মুখ তুলল।
''ও আমার কথা একদম ভাবলই না।'' বুড়োর নিচের ঠোঁট ঝুলে পড়ল। বিনোদের মনে হল, চোখ দিয়ে জল নামছে। ভাল করে দেখার জন্য সে মুখটা বুড়োর মুখের কাছে আনল। মুখ দাড়িতে ভরা।
বিনোদ বন্য গন্ধ পেল। আগাছা আর ঝোপ।
গাছের পাতা ধূসর। খসখস শব্দে তিতির ছুটে গেল। দূর থেকে দূরের দিকে মহিষের গলায় বাঁধা ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে চলে যাচ্ছে। উপরে বৃক্ষহীন মসৃণ ঢালু পাথরে পশ্চিম থেকে রোদ পড়েছে। বাবা বললেন, ''ঝরনা কোন দিকে বল তো?''
মা চিবুক তুলে একটা দিক দেখালেন। বাবা হাসলেন, ''নদু, তুই বল।''
বোকার মতো চারধারে তাকালাম। তখন বাবা বললেন, ''আয় আমরা খুঁজে বার করি, পারবি?'' আমি মাথা নাড়লাম; বাবা আর মা দুধারে চলে গেলেন। সর্বত্র আলগা পাথর, হাঁটু—সমান ঝোপ। একটু নিচে বড় বড় গাছ। মনে হল ওই দিকেই ঝরনা। পা টিপে নিচের দিকে নেমে এলাম। একটা উঁচু পাথরে উঠে দাঁড়িয়েছি, দেখি মা'র হাত ধরে বাবা তাড়াতাড়ি নেমে আসছেন। আমায় দেখে হাত তুললেন। কাছে এসে বললেন, ''নদু, এখুনি ফিরতে হবে। এখানে কাল চিতাবাঘ দেখা গিয়েছিল। এক রাখাল বলল।''
ফেরার সময় বলেছিলাম, ''তোমরা ঝরনা পেলে না?'' কিন্তু ওরা খুব উদ্বিগ্ন থাকায় জবাব দিলেন না। প্রায় নিচে পৌঁছে গেছি। তখন মনে হল কাছাকাছিই কোথাও ঝরনা রয়েছে, শব্দ শুনতে পাচ্ছি। বাবাকে বললাম। তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, ''না, না, বেলা পড়ে আসছে, এখন ঝরনার ধারে যায় না। বাঘে জল খেতে আসবে।'' মা খুব শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরলেন। তখন খুব সুন্দর সূর্যাস্ত হচ্ছিল; অনেক দূরে গিয়ে একবার পিছু ফিরে তাকিয়েছিলাম। পাহাড়টা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। ওর মধ্যে ঝরনা আছে, সেটা আর দেখা হল না। তবু বিনোদ মুখটা আরও কাছে আনল। আঙুলটা বুড়োর চোখে স্পর্শ করিয়ে আলোর দিকে বাড়িয়ে দিল। চিকচিক করে উঠল আঙুলের ডগাটা।
বুড়ো মুখ তুলে তাকিয়ে। মসৃণ, ধূসর দাড়ি পাথরখণ্ডের মতো কঠিন চাউনি। হামা দিয়ে ঘরের অন্ধকারে খসখস শব্দ করে চলে গেল।
ফুটবল মাঠ পার হয়ে বিনোদ রেললাইনের ধারে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ চিৎকার করতে করতে খোকা ছুটে এল, ''বাবা বাবা, একি পাগলামি হচ্ছে।'' সারাক্ষণ ও পিছু নিয়ে রয়েছে। বিনোদ ভাবল, ওকি আমায় এখন পাগল ভাবছে! কিন্তু ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন তো আজ আর আসবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন