একটা খুনের খবর

মতি নন্দী

বিভারা ইংরিজি কাগজ নেয়, তাছাড়া কাগজটাও সে ছবি আর হেডিং দেখা ছাড়া বিশেষ পড়ে না। তাই খবরটার কথা সে জানেই না। দুপুরে পাশের বাড়ির বৌ মানসী খুব একচোট হেসে নিয়ে বারান্দা থেকে বলল, ''ওম্মা, আপনি এখনো দেখেননি? আচ্ছা আমাদের কাগজটা আপনাকে দিচ্ছি। অ্যাকেবারে আপনার নামেই একজন খুন হয়েছে। আর মিল কীরকম। উত্তর কলকাতায় শ্যামপুকুর থানার অধীন, গৃহবধূ, এক ছেলের মা, বয়স চল্লিশ। পড়েই তো চমকে গেলুম। অবশ্য উনি আগেই পড়ে নিয়ে আমাকে ডেকে দেখালেন। বললেন, দ্যাখো তো একবার পাশের বাড়িতে উঁকি মেরে, বেঁচেটেচে আছেন না খুন হয়েছেন। আমি দৌড়ে জানলায় গিয়ে দেখি দাদা কল থেকে বেরোচ্ছেন, আপনি উঠোনে দাঁড়িয়ে বলাইকে কিসের জন্য যেন ধমকাচ্ছেন। তারপর আমাদের সে কী হাসি!''

বিভার কৌতূহল হল! বলল, ''কাগজটা দাও তো।''

মানসী কাগজটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ''ওনার সব পড়া হয়নি এখনো।''

''আমি এখুনি দিয়ে দিচ্ছি।''

তিন থাক বেশ বড় টাইপে হেডিং: ''গৃহবধূ বিভা দাস খুন। আততায়ী গহনা, টাকায় হাত দেয়নি। ভৃত্য পলাতক।''

খবরটা ছোটই। সেটাকে টেনে লম্বা করা হয়েছে পাঠকদের রোমহর্ষণের জন্য। আর সত্যি সত্যিই বিভার গায়ে কাঁটা দিল, বুক ছমছম করে উঠল।

আঠারো বছরের উচ্চচমাধ্যমিক পড়া ছেলে স্কুলে গেছে। বিভা দাস দুপুরে একা বাড়িতে। সেই সময় গলা টিপে তাকে কে বা কারা খুন করে রান্নাঘরে ফেলে রেখে যায়। মৃতার দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। বালিশের নিচে আলমারির চাবি ছিল কিন্তু আলমারি খোলা হয়নি। গহনা বা টাকাকড়িতেও হাত দেওয়া হয়নি। ছেলে স্কুল থেকে ফিরে দেখে সদর দরজা খোলা। বাড়িতে ঢুকে সে চাকরের নাম ধরে ডাকাডাকি করে। দোতলায় এসে দেখে মা রান্নাঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। গায়ে ব্লাউজ নেই। শাড়ি উঠে রয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত নয় ধর্ষণ করার পর খুন করা হয়েছে কি না। চাকরের বয়স চব্বিশ, দু'বছর হল কাজ করছে। সে নিপাত্তা।

কাগজটা ফেরত দেবার সময় বিভা বলল, ''কোথায় হয়েছে সেটা আর দেয়নি। কাছাকাছি হবে।''

''আমাদের তো শ্যামপুকুর থানা। খোঁজ করলেই বেরিয়ে যাবে।'' মানসী জানিয়েও দিল সে খোঁজ করবে।

একটু পরেই টেলিফোন করল বিভার স্বামী নির্মল। ''আজকের কাগজে একটা খুনের খবর বেরিয়েছে।''

''হ্যাঁ, এইমাত্র পাশের বাড়ির মানসী আমায় দেখাল।''

''বলাই কী কচ্ছে?''

''নিচে, বোধহয় ঘুমোচ্ছে।''

''দোতলার সিঁড়ির দরজাটায় খিল দিয়ে দাও।''

''আমিও তাই ভাবছিলুম।''

''অফিসের দু—তিনজন তোমার নামটা তো জানে। সুকুমারবাবু এসে খোঁজ নিলেন। খুব দুর্ভাবনায় নাকি পড়েন সকালে খবরটা পড়ে। বললেন, দুপুরে কেউ থাকে না শুধু একটা জোয়ান চাকর ছাড়া আর মিসেস দাসকেও তো দেখতে শুনতে ভাল।''

''না না, বলাইয়ের স্বভাব—চরিত্র ভাল। তিন বছর তো দেখছি।''

স্কুল থেকে ফিরেই সৌমিত্র বলল, ''আজ কাগজে একটা খবর বেরিয়েছে—''

''পড়েছি।''

''কী বিশ্রীভাবে যে লেখে! গায়ে নাকি ব্লাউজ নেই। এই নিয়ে দুটো ছেলের সঙ্গে তর্ক হল। আমি বললুম, এই প্যাচপ্যাচে গরমে বহু বাড়িতেই মেয়েরা দুপুরে ব্লাউজ খুলে রাখে। ওরা তা বিশ্বাস করবে না।... যেতে দাও।''

''এইসব জিনিস নিয়ে তোরা তর্ক করিস কেন?''

''তাহলে কাগজেই বা লেখে কেন? তোমাকে তো আমার ক্লাসের চার—পাঁচজন দেখেছে। তাদেরই যত মাথাব্যথা।''

''কীজন্য?''

''এই দুপুরে একা থাকো...তাড়াতাড়ি দাও।''

সন্ধ্যার পর নির্মল অফিস থেকে ফিরে কোনো ভণিতা না করেই বলল, ''দুপুরে তুমি বরং দোতলায় চাবি দিয়ে পাশের বাড়িটাড়ি চলে যেও। একা থাকাটা মনে হচ্ছে ঠিক নয়। কলকাতায় এখন এই রকম খুন খুব হচ্ছে। বিশেষত সুন্দরী বৌ—মেয়েদের সংখ্যাটাই নাকি বেশি।''

''এমন করে তুমি বোলো না, ভয় ধরে যাচ্ছে।'' বিভা গলাটা আদুরে করতে গিয়ে পারল না। সত্যিই সে ভয় পাচ্ছে।

নিচের থেকে বলাই, ''বৌদি বৌদি'' বলে বিভাকে ডাকছে। সে নিচে যাবার জন্য সিঁড়ির দিকে এগোতেই নির্মল বলল, ''আচ্ছা, বলাইয়ের দেশের ঠিকানাটা কি রাখা হয়েছে?''

''আমি তো রাখিনি।''

''নিয়ে রাখো, আজই নিয়ে রাখো।''

পরের দিন মানসী নিজেই ডেকে বিভাকে খবরের কাগজটা দিয়ে বলল, ''দেখুন কী কাণ্ড! ছ্যা ছ্যা, এই বয়সে, অত বড় ছেলে রয়েছে আর কিনা চাকরের সঙ্গে লটঘট!''

কালকের মতই বড় বড় অক্ষরে হেডিং—চাকরের সঙ্গে বিভা দাস অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত ছিলেন।

''আপনার নাম যারা জানে, তারা এটা পড়লেই প্রথমে আপনার কথাটাই...মানে এত মিল রয়েছে আপনাদের দুজনের মধ্যে। আমাদের পেছনের বাড়ির মেয়েটি স্কুলে পড়ায়, ও বলছিল।''

''কী বলছিল?'' বিভার হাত—পা অবশ হয়ে আসছে। এসব কি সর্বনেশে কথা।

''খারাপ কিছু নয়। বলছিল, হেডিংটা দেখেই প্রথমে ওনার চেহারাটা চোখে ভেসে উঠল। দুজন বিভা দাসের মধ্যে শুধু তো নামেরই নয়, আর সবেরও মিল রয়েছে।''

''আর সবের? তার মানে?''

''মানে, ও বোধহয় বলতে চেয়েছে, বয়স, বাড়ির ধরন, এক ছেলে, অল্পবয়সী চাকর এইসব আর কি! উনিও ঠিক এই কথাটাই বললেন। একটা কেমন বিচ্ছিরি নোংরা ভাব এই খবরটা পড়লেই মনে জাগে, তাই না?''

''তা তো জাগবেই।''

''আপনি পড়ে দেখুন, বিকেলে কাগজটা নেবো।''

এ কী বিপদে পড়লুম! কাগজটা হাতে নিয়ে বিভা ধপ করে খাটে বসে পড়ল। হতচ্ছাড়ি বিভা দাস যে কী ডোবান ডুবিয়েছে! মানসী আর তার পিছনের বাড়ি মানেই তো সারা পাড়া। ঘরে ঘরে নিশ্চয় তাকে নিয়েই এখন কথা হচ্ছে। যদি একটা না হয়ে তার দুটো তিনটে চারটে ছেলে থাকত। নির্মলই তাকে কুপরামর্শটা দিয়েছিল—একটাই যথেষ্ট, তাহলে ভালভাবে মানুষ করা যাবে।

বিভা অস্থির হয়ে পায়চারি শুরু করল। চেনা পরিচিত সবারই এখন নামটা শুনলেই তার কথা মনে আসবে। আর কী আশ্চর্য দুপুরে সে একা থাকে, বলাইও ছোকরা। অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত কথাটাই কী ভয়ঙ্কর।

ফোন বেজে উঠল। বিভা ছুটে গিয়ে রিসিভার তুলল। কারুর সঙ্গে কথা বললে নিজেকে তখন একলা মনে হয় না।

''কে বিভা? আমি ন'পিসিমা বলছি। কেমন আছ? নিমু কেমন আছে?''

''ভাল, ন'পিসিমা আমরা সবাই ভাল আছি।''

''কাগজে একটা খবর পড়ে বুকের মধ্যে কী রকম করে উঠল। দেখেছ খবরটা?''

''ওই একটা খুনের খবর তো?''

''হ্যাঁ। শুধু তো খুন নয়, পিছনে যে আরো সব ব্যাপার রয়েছে।''

''ন'পিসিমা, আমার এখানে ওসব কোনো ব্যাপার নেই, মানে আমার সম্পর্কে আপনি—।''

''তোমার একটা চাকর দেখেছিলাম যেন? এখনো আছে?''

''না তো! বলাইকে তো অনেকদিন হল ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ছ'মাস, না না এক বছর। এখন একটা মেয়ে কাজ করছে।''

''খুব ভাল করেছ। এইসব ছোকরা চাকরদের বিশ্বাস নেই। সৌমিত্র তো এবারই হায়ারসেকেন্ডারি দেবে?''

''হ্যাঁ।''

''অনেকদিন যাইনি, একদিন যাব তোমাদের বাড়ি।''

''আসবেন।''

রিসিভার রেখেই বিভা শিউরে উঠল। ন'পিসিমা এসে তো বলাইকেই দেখবেন! খাটে বসে বিভা কপালে হাত দিল। ঝিমঝিম করছে সারা শরীরই।

আবার ফোন বাজল। বিভা ছুটে গেল।

''আমি নির্মল। সিঁড়ির দরজা দিয়েছ?''

''হ্যাঁ।''

''কাল যে বললুম বলাইয়ের দেশের ঠিকানাটা নিয়ে রাখতে?''

''নিয়ে রাখছি।''

''এখন নয়, এখন নয়। ও এখন নিচে একলা রয়েছে...এইসব দরকারি ব্যাপারে কেন যে ভুল হয়।'' নির্মলের স্বর বিরক্তিতে ঝাঁঝালো।

হঠাৎ বিভারও মাথা গরম হয়ে উঠল। সে—ও রুক্ষস্বরে বলল, ''কেন নিচে এখন গেলে কী সর্বনাশটা হবে শুনি? বলাই খুব ভাল ছেলে।''

''বিভা দাসকে যে খুন করেছে সে—ও খুব ভাল ছিল বিভা দাসের কাছে।''

রিসিভার রাখার শব্দটা খটাং করে বিভার কানে আঘাত করল। চোখ বুজে দাঁড়িয়ে সে টলতে লাগল। হাত বাড়িয়ে দু'পা এগিয়েই খাটের বাজু ধরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল খবরের হেডিংটার দিকে।

সৌমিত্র ফিরে যথারীতি ''খেতে দাও'' বলে আজ মায়ের কাছে আর এল না। বিভা শূন্য দৃষ্টিতে জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, ''নিচে বলাইয়ের কাছ থেকে চেয়ে খেয়ে নে...আচ্ছা দাঁড়া, আমি এনে দিচ্ছি।''

''না।'' সৌমিত্র প্রায় চিৎকার করে উঠল। ''তোমাকে নিচে যেতে হবে না, আমিই যাচ্ছি।''

বিভার ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল। সে বারান্দায় গিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। আশপাশের বাড়ির লোক, রাস্তার লোক তাকে দেখুক। সে খুন হয়নি, অবৈধ প্রণয়েও লিপ্ত নয়। বিড়বিড় করে বলল, ''এই দেখুন আপনারা, আমি একাই।''

অফিস থেকে ফিরে নির্মল রোজকারমতো সোজা দোতলায় না উঠে বলাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। বিভা নিচে নেমে আসছিল দুজনের গলা শুনে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পড়ল।

''আমি কী করলুম দাদা যে ছাড়িয়ে দিচ্ছেন? এখন আমি কোথায় কাজ খুঁজব? এই মাসটা সময় দিন।''

''না না, কালই এ বাড়ি ছাড়। বললুম তো এখন অসুবিধে আছে তোকে রাখার। মুশকিল কেন হবে, পুরো মাসের মাইনেই তো দোব বললুম।''

সিঁড়ির দিকে নির্মলের জুতোর শব্দ এগোতেই বিভা দোতলায় উঠে গেল।

বারান্দায় বসে ছিল বিভা। দুটি ঝি কাজে যাচ্ছে। এখন কলে জল আসার সময়। ওদের দেখে বিভা দোতলা থেকে চেঁচিয়ে বলল, ''ওগো মেয়ে, একটু দাঁড়াও না।''

ওরা দুজন একবার থমকে আবার চলতে শুরু করল।

''একবারটি শোনো না। কাজ করবে আমাদের বাড়ি? ওগো শোনোই না।''

ঝি দুজন দাঁড়াল না। শুধু একজন অপরজনকে বলল, ''ছ'মাসে পাঁচজন কাজ করেছে, একজনও দশ দিনের বেশি টিকল না। মাথাটা কীরকম খারাপ হয়ে গেছে বৌটার।''

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%