মতি নন্দী
খেঁকুরে চেহারার লোকদুটো এতক্ষণ গুজগুজ করছিল আর তাকাচ্ছিলো। শেষে তাদের একজনকে এগিয়ে আসতে দেখে ঘাসের শীষটা থু—থু করে ফেলে, নিমাই তৈরি হয়ে বসল।
'আপনার কি এই মাঠেই খেলা আছে?'
বিনীত, প্রায় বিগলিত প্রশ্ন। আড়মোড়া ভাঙার মতো কসরত করে নিমাই বলল, 'ননাঃ, ইউনিভার্সিটি মাঠে ছিল, গিয়ে দেখি প্রফেসর মারা গেছে বলে খেলাটা বন্ধ। ফেরার পথে ভাবলুম কোথাও বসে খেলা দেখি, তাই।'
'আপনি কোন ক্লাবে খেলেন?'
'কোথাও না। কিন্তু এত কথা জিজ্ঞাসা করার মানে?'
নিমাই অল্পবিস্তর মেজাজ দেখাতে চাইলো। লোকটা প্রায় গলে যাবার যোগাড়।
'তাহলে তো ভালোই হল। একটা অনুরোধ করব যদি রাখেন।'
নিমাইয়ের হাত চেপে ধরল লোকটা, 'আমাদের আজ একজন কম আছে, লীগের খেলা ইম্পর্ট্যান্ট ম্যাচ, আপনি যদি দয়া করে আমাদের সাহায্য করেন।'
'বারে, তা কী করে সম্ভব!'
'খুব সম্ভব, সে ভার আমাদের। আপনাকে তো আর অপোনেন্ট টিম চেনে না, ওরা আসছে নৈহাটি থেকে; আমাদের টিমে যে আসেনি তার নামেই আপনি খেলুন। খেলতে এসেছিলেন খেলেই ফিরুন।'
হেঁ হেঁ করে লোকটা হেসে উঠল। অন্য লোকটা ব্যস্ত হয়ে মালির সঙ্গে ঘোরাঘুরি করছিল, তাকে ডাকল। যেন অপেক্ষাতেই রয়েছে, ছুটে এলো।
'কী হলো হাবলো, উনি খেলবেন তো।'
'নিশ্চয়।' হাবলো হেঁ হেঁ করে হাসল। 'খেলা পোস্টপন হয়ে গেছে তাই ফিরছিলেন, কলেজ টিমের প্লেয়ার।'
'কোন কলেজ?'
'সিটি।' ঘাসের শীষ ফেলার মতো করে নিমাই উচ্চচারণ করল।
'কাল সন্ধ্যায় এত জল ঢেলেছে পীচে যে এখনো জবজবে হয়ে রয়েছে। মালীটাকে দিয়ে বারকতক টানিয়েনি।'
লোকটা চলে গেল। হাবলো ঘড়ি দেখল।
'এখনো সময় আছে, অপোনেন্ট টিমও পৌঁছয়নি, চলুন টেন্টে যাওয়া যাক।' যেতে যেতে হাবলো বিশেষ গোপনীয় কথা বলার সুরে বলল, 'যার খেলার কথা ছিল, আজ সকালেই ফোন করে বলেছে, পিকনিকে যাচ্ছি; বড়োলোক মানুষ, বাপের পয়সা আছে, নিজেও ব্যবসা করে।'
তাঁবুতে পৌঁছে গেছে ততক্ষণে। হাবলো তাকে পরিচয় করিয়ে দিলো পালমশায়ের সঙ্গে। আজকের খেলার অধিনায়ক পালমশাই। ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ। হেসে কথা বলেন।
'বল করতে পারেন তো?'
'না, ব্যাটসম্যান, ফোর ডাউন।' বেঞ্চে বসে নিমাই চারধারে তাকালো। পোশাক বদলে তৈরি হচ্ছে কয়েকজন। খেলার পোশাক তার পরাই আছে। সাদা জামা, সাদা প্যান্ট। ক্যাম্বিসের ছোট্ট ব্যাগ থেকে বুট বার করে পরতে শুরু করলো।
'ঘড়ি কিম্বা টাকাকড়ি সাবধানে রাখবেন কিন্তু।' মুখ তুলল নিমাই। পালমশাই বলছেন, 'খেলার সময় তাঁবুতে বিশেষ কেউ তো থাকে না, কিছুদিন আগেই একজনের শেফার্স চুরি গেছে। তার কিছুদিন আগে একটা নতুন লেন হাটন ব্যাট।'
'চুরি যাবার মতো কিছুই আমার নেই।'
'ভালো' হেসে, কাগজে তামাক ঢেলে পালমশাই পাকাতে শুরু করলেন।
তাঁবুর মধ্যে গুমোট। নিমাই বেরিয়ে এলো। মাঠের ধারে চাঁদোয়া টাঙানো। তার নীচে খানচারেক বেঞ্চ, একটা টেবল, জলের ড্রাম আর স্কোর জানাবার বোর্ড।
রোদ্দুরে এসে নিমাইয়ের হাত পা আলগা বোধ হতে লাগল। ছায়ায় বেঞ্চটাকে টেনে নিলো। হাওয়া দিচ্ছে, মাঠের চারধারে ছোট্ট ফ্ল্যাগগুলো টান হয়ে কাঠি কাঁপাচ্ছে। বগলের নীচে হাত চেপে নিমাই কুঁকড়ে বসল। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি। পাউরুটি, মাংস, ডিম আর, পালমশায়ের কথাটা মনে পড়ল ঘড়ি কিম্বা টাকাকড়ি সাবধানে রাখবেন কিন্তু। সাবধান। নিশ্চয় সাবধান। আর শেফার্স, লেন হাটন। আর,
আম্পায়াররা এসেছে। বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা পৌঁছে তৈরিও হয়ে গেছে। টস হলো। পালমশাই ফিল্ডিং করবেন ঠিক করলেন। গা ছাড়া দিয়ে নিমাই উঠল। ছুটে এলো হাবলো।
'আপনি কিন্তু রাজেন চক্রবর্তী নামে খেলছেন।'
তাতে কিছু এসে যায় না। না খেললেও কিছু এসে যায় না। আসলে নিমাই অথবা রাজেন নামটা যাই হোক, তাতে তার মাথাব্যথা নেই।
নিমাইকে দাঁড়াতে হলো থার্ডম্যানে। উইকেটকীপারের প্রায় পিছনে মাঠের সীমানা ঘেঁষে। সূর্য সামনে, হঠাৎ চোখ তুললেই আকাশটা অন্ধকার হয়ে যায়। হাওয়া আসছে পিছন থেকে, শিরদাঁড়ায় কনকনে ভাব। চলতে অসুবিধা, বুটটা যথেষ্ট বড়। ঠাণ্ডা বাতাসে চোখের পাতা আঠালো হয়ে আসছে।
প্রথম বলটাই যে উইকেটকীপার ফস্কে যাবে নিমাই তা আশা করেনি। জমিটা এবড়োখেবড়ো। ইঁটে ঠোক্কর খেয়ে নিমাই প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। সামনে উঠতে উঠতে বল বাউন্ডারির সীমানা পার হয়ে গেল। বলটা ধরা উচিত ছিল। অপ্রস্তুত লজ্জায় নিমাই মাঠের লোকেদের দিকে তাকালো। ওরাও যেন অবাক হয়েছে। মাঠের বাইরে থেকে কে চীৎকার করল, 'দেখে কী হবে আর, বলটা কুড়িয়ে আনো।'
মাথা নামিয়ে নিমাই ছুটল। অনেক দূর গড়াতে গড়াতে চলে গেছে বলটা। হাতে নিয়ে ভাবলো এখান থেকেই ছুঁড়ি, তারপর ভাবলো যদি ঠিক উইকেটকীপারের হাতে না পড়ে।
'আবার হাতে করে আসছেন, ছুঁড়তে পারো না?'
মাঠের বাইরের সেই গলাটা। নিমাই তাড়াতাড়ি বলটা ছুঁড়ল। পড়ল উইকেটকীপারের মাথা টপকে। নিমাইয়ের মনে হলো মাঠের কয়েকজন যেন মুচকি হাসল। মুখ ঘুরিয়ে নিলো নিমাই। কানে রাবণের চিতার শব্দ। চোখ তুলল, অন্ধকার। পিছন ফিরল, শিরদাঁড়ায় ঠাণ্ডা বাতাসের ছোঁয়া।
এরকম মনে হয়েছিল সেই দিনটায়। বাবা বাড়ি ফিরে জিজ্ঞাসা করলেন, নিমাই পাশ করেছে? মা কি যেন বললেন। বাবা আর একটিও কথা বলেননি। পাশের ঘরে নিমাই মাথা নিচু করে বসেছিল। নিজেকে পাশের বাড়ির ছেলের মতো মনে হচ্ছিলো।
বলটা কেন ধরা গেল না? নিমাই খুঁটিয়ে জমি দেখল। গর্ত, ইঁটের ডগা, ধুলো, শুকনো গোবর, শালপাতা। অনায়াসে বল ধরা অসম্ভব। তার থেকে জায়গা বদল করে যদি স্লিপে দাঁড়ানো যায়! সাধারণত শক্ত ক্যাচ ওঠে ধরতে না পারলে চট করে দোষ দিতে পারবে না।
ওভার শেষ হতেই পালমশাই নিমাইকে খোঁড়াতে দেখে ডাকলেন, 'কি ব্যাপার, তখন লাগল নাকি?'
'হ্যাঁ মুচকে গেছে। দৌড়তে পারব না, বরং স্লিপে দাঁড়াই।'
পালমশাই রাজি হলেন।
পা ফাঁক করে ঝুঁকে দাঁড়ালো নিমাই। বাদামি রংয়ের পোক্ত ব্যাট। চোখ দুটো ছুঁচোলো করে লোকটা অপেক্ষা করছে ঘা দেবার জন্য। নিমাই চোখের কোণের ভাঁজগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল। বল ছোঁড়া হয়েছে। ভাঁজগুলো সমান হয়ে গেল। চোখ সরিয়ে নিমাই ব্যাটের দিকে তাকালো। অপেক্ষায় থাকতে হবে যদি বলটা ব্যাটের কাণা ছুঁয়ে দিক বদল করে।
লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো ব্যাটসম্যান। বিদ্যুৎগতি থাবার মতো ব্যাটটা ঝাঁপিয়ে পড়ল। আশ্চর্য বলটা ব্যাট ছুঁলো না। মুচড়ে পাশ কাটিয়ে উইকেটকীপারের দিকে এগিয়ে এলো। উত্তেজনায় হাত তুলে নিমাই লাফিয়ে উঠল।
অদ্ভুত চোখে উইকেটকীপার তাকালো সকলের দিকে। বল ফস্কেছে। স্টাম্প আউট করতে পারল না। একটা সুযোগ চলে গেল। নিমাই চোখ সরিয়ে নিলো। বাবা মারা যাওয়ার পর এইভাবে তাদের সংসারটাও ভাবাচাকা খেয়ে গেছলো। মাঠের বাইরে হায় হায় করে উঠেছিল যারা এখন তর্ক করছে নিজেদের মধ্যে। ব্যাটসম্যান একবার হাসল। আলগা দস্তানা দাঁত দিয়ে টেনে ঠিক করে নিলো। বোলার ঘাম মুছলো। বলটা প্যান্টে ঘষতে ঘষতে আবার বল করার জন্য তৈরি হলো। উইকেটকীপার হাঁটু ভেঙে বসল গলা উঁচিয়ে। নিমাই ঠিক করল চোখ আকাশে তুলবে না, বাতাসে পিঠ লাগাবে না, এখনো একজনও আউট হয়নি, ব্যাটের দিকে তাকাবার আগে টাঙানো স্কোর বোর্ডটা শুধু দেখে নিলো।
জীবন ফিরে পেয়ে লোকটা বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। ঝড়ের মতো তছনছ করছে বোলিং। ছোটাছুটি করে ক্লান্ত ফিল্ডাররা হাল ছেড়ে দিয়েছে। এখন আর স্লিপে লোক থাকার অর্থ হয় না। নিমাইকে পাঠানো হয়েছে বাউন্ডারির ধারে। রান উঠেছে দ্রুত। এতে তার উদ্বেগ নেই, কেননা এদলের সে কেউ নয়।
পাশেই আর এক মাঠেও খেলা হচ্ছে। হঠাৎ অনেকগুলো গলায় চীৎকার উঠল। নিশ্চয় আউট হল কেউ। ঘাড় ফেরালো নিমাই। ব্যাট হাতে ফিরে যাচ্ছে একজন। মাঠের লোকগুলো ছুটে গিয়ে বোলারকে জড়িয়ে ধরেছে।
নিজেদের খেলায় নিমাই চোখ ফেরালো। বোলার ছুটে যাচ্ছে বল করতে। লোকটা লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো। ঝিমঝিম করে উঠল নিমাইয়ের চুলের গোড়া। আবার সেইরকম হবে নাকি। বল লক্ষ্য করে ব্যাট থাবা মারল। উইকেটকীপার ক্লান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে উঠল। ফিল্ডাররা গুড়ি মেরে পা—পা এগিয়েছিল। থেমে গেল।
বলটা ছুটে যাচ্ছে বাউন্ডারির দিকে। নিমাই পিছু নিলো। ইচ্ছে নেই কিন্তু না ছুটলেও ভালো দেখায় না। দেরী করে ফেলেছে। পাশের মাঠ থেকে সেই সময় আবার চীৎকার উঠল। ঝুঁকে হাত দিয়ে ধরার সময় নেই। পা দিয়ে বলটাকে আটকাল। হাত দিয়ে তুলেই ছুঁড়ল।
ব্যাটসম্যান একবারও রান করার জন্য ছোটেনি। কেননা তার ধারণা বলটা বাউন্ডারি হবেই। আম্পায়ার বাউন্ডারির ইসারা জানাবার আগে তাকালো নিমাইয়ের দিকে, অর্থাৎ বাউন্ডারি হয়েছে কিনা জানাও।
নিমাই বাউন্ডারি চিহ্নটা খুঁজল। মাঠের চারধারে ফ্ল্যাগবাঁধা কয়েকটা কাঠি পোঁতা আছে মাত্র। দাগ দেওয়া নেই। আন্দাজে নিমাই বুঝল, অদৃশ্য বাউন্ডারি পার হবার পরেই সে বলটা ধরেছে।
মাঠের বাইরে থেকে বিষণ্ণ গলায় কে চীৎকার করল, 'আর একটু জোরে দৌড়াতে হয়, রান যে দুশোয় উঠে গেল।' মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করে হাত তুলে ইসারা করল নিমাই, বাউন্ডারি হয়নি।
পালমশাই ওভারের শেষে নিমাইয়ের কাঁধ চাপড়ে গেলেন। ব্যাপারটায় গর্ব নেই। কিন্তু খারাপ কিছু করেছে বলেও নিমাইয়ের বোধ হচ্ছে না। একটু লজ্জা করল মাত্র। রান বাঁচাবার জন্য এই মিথ্যা বলতে হলে সে নিশ্চয় বলত না। আসলে নিজের ব্যর্থতা ঢাকার জন্যই বলল। এ রকম হয়েছিল প্রথমবার যখন ব্যাট হাতে বাড়ি ফেরে। দাদা জিজ্ঞাসা করেছিল 'রাখতে দিয়েছে তোর কাছে?' তখন লজ্জা করেছিল।
মাঠের সবাই ফিরে এলো তাঁবুতে। এবার লাঞ্চ। তারপর নিমাইয়ের দল ব্যাট করবে।
মাংসের ঝোলে পাউরুটি চুবিয়ে নিমাই গোগ্রাসে গিলছিলো। পাশের লোকটি আলাপ জমালো।
'আপনি নতুন এসেছেন?'
'দলেরই লোক, সুতরাং সত্যি কথা বলা যায়, ঘাড় নাড়লো নিমাই, 'না, শুধু আজকেই খেলছি।'
'যা, বোলিং তাতে ফিল্ডিং দেওয়া অসম্ভব। স্টাম্পটা মিস না করলে দেড়শোর মধ্যে ওরা নেমে যায়।'
নিমাই ঘাড় নাড়লো। দেড়শোই হোক আর পঞ্চাশই হোক তাতে তার কিছু এসে যায় না।
নিমাই হাত বাড়িয়ে প্লেট থেকে আরো দু টুকরো রুটি তুলে নিলো। লোকটা বকবক করে যাক, তাতে কিছুই আসে যায় না। দুটো সহজ ক্যাচ ফস্কেছে, তাই বোধহয় অন্যের খুঁত দেখাতে চায়। নিমাইয়ের গলদ ছিল কিন্তু, খুঁত ধরতে সে ব্যস্ত নয়। কেননা আর কয়েকঘণ্টা পরে খেলা শেষ হলেই সে চলে যাবে। আর এ—মুখোই হবে না।
'আপনাকে আর একটু দি।'
ঘাড় নাড়লো নিমাই, হাবলো দু হাতা মাংস নিমাইয়ের প্লেটে দিলো। 'অন্তত পঁচিশটা রান আপনি আজ বাঁচিয়েছেন', মাংস দিয়েও হাবলো দাঁড়িয়ে থাকল, 'ব্যাটিংটাও যদি একটু এইরকম হয়, তাহসে গেম শিওর ড্র। আপনাকে কিন্তু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবেই। স্টে করার মতো আজ একজনও টিমে নেই।'
হাবলোর দিকে নিমাই তাকালো। মনে মনে সে অবাক হয়ে গেছে। অদ্ভুত আবদার তো। আমি কেউ নই, বলতে গেলে রাস্তার লোক অথচ টিমটাকেই ঘাড়ে ফেলে দিতে চায়। এই রকমই যখন অবস্থা তখন টিম করাই বা কেন, লীগে নাম দেওয়াই বা কেন! মরুকগে। এদের টিম থাকুক না—থাকুক তাতে আমার কি?
'আপনাকে চাটনি দোবো?'
নিমাই ঘাড় নাড়লো। হাবলো চাটনি আনতে গেলো।
'আপনাকে এখন খুব খাতির করবে। যদি খারাপ খেলতেন তাহলে পুঁছতোও না।' পাশের লোকটা আবার বকবক শুরু করেছে।
হঠাৎ সে চেঁচিয়ে উঠে টেবিলের অন্যধারে বসা একজনকে বলল, 'অধিকারীদা, এটি মেজো না সেজো?'
বছর আষ্টেকের একটি ছেলেকে আঙুলে করে চাটনি খাওয়াচ্ছিলো লোকটি, কেমন জড়োসড়ো হয়ে গেল কথা শুনে। তবু হাসতে হাসতে বলল, 'সেজো। আসতে চাইছিল না, জোর করে আনলুম। বললুম, চ ব্যাটা মাঠের ঘাস চিনবি, নইলে ক্রিকেট শিখবি কি করে?'
ছেলেটা চোখবুজে বাপের হাত চাটছে। ওর সুবিধের জন্য অধিকারী আঙুলগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিতে লাগল। চা—টা শেষ করে ছেলেটি মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।
'আর খাবি?'
লজ্জা পেলো ছেলে, বাপের পিঠের আড়ালে মুখ লুকোলো।
'হাবলো, আর একটু চাটনি দাওতো এদিকে।'
অধিকারী চেঁচালো। নিমাইয়ের পাশেই হাবলো দাঁড়িয়ে। কিন্তু নড়বার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। অধিকারী আবার চেঁচালো।
'এই এক জ্বালা, নিজেও খাবে গুচ্ছের খানেক, ছেলেকেও এনে খাওয়াবে।' বিড়বিড় করে হাবলো চাটনি দিতে গেল।
পেটপুরে খাওয়া হয়েছে, খেলা শুরু হতে দেরী আছে। তাছাড়া ফোরডাউন ব্যাটসম্যান, তার মানে চারজন আউট হলে খেলতে নামা। তার অনেক দেরী। তাঁবু থেকে নিমাই বেরিয়ে এলো। পাশের তাঁবু থেকেও একদল বেরিয়ে এসে সিগারেট ধরালো। নিমাইকে একজন জিজ্ঞাসা করল, 'আপনাদের খেলার রেজাল্ট কি দাদা?' জবাব পেয়ে আর একজন বলল, 'তার মানে আপনাদের সবাইকেই ব্যাট করতে হবে?'
কেমন যেন একটা তাচ্ছিল্যের ভাব, গা—জ্বালা করে। সুরটাকে বেঁকিয়ে নিমাই বলল, 'আপনাদের বুঝি করতে হবে না।'
'পঁচানব্বই অল—ডাউন, আমাদের বাহাত্তর এক উইকেটে। জিততে আর চব্বিশটা রান বাকি, ব্যাট আর পাওয়া সম্ভব নয়।'
নিমাই বিরক্ত বোধ করল। আচ্ছা এক টিমের হয়ে খেলছি বটে। বুড়ো—হাবড়া, নয়তো চালিয়াৎ, দৌড়তে পারে না, বল করতে পারে না, তবু খেলতে নামা চাই। বিরক্তিটা রাগে উঠল অধিকারীকে দেখে। ছেলেটাকে বেড়ার ধারে মোতাচ্ছে। নিমাইকে দেখে কাছে এলো, বলল, 'এ ক্লাবে নতুন এলেন?'
'শুধু আজকের জন্য।' গম্ভীর সুর দিয়ে নিমাই ব্যক্তিত্ব ফোটাতে চাইলো।
'এভাবে আর ফিল্ডিং দেবেন না। এবড়ো—খেবড়ো জমি, ওভাবে বল ধরলে যে জখম হবেন। আগে শরীর তারপর খেলা।'
নিমাই হাসলো। সকলেই তার সুখ্যাতি করছে কিন্তু আসলে সে কিছুই করেনি। ছুটেছে জোরে, বল ধরেছে মরি—বাঁচি করে। খাটবার ইচ্ছে মোটেই ছিল না, তবু খেটেছে। স্রেফ লজ্জায়। ব্যাপারটা নিমাইয়ের কাছে গোলমেলে ঠেকছে। মাঠে নেমে না—খেলতে পারলেই তার লজ্জা। লজ্জা না পেলেও চলে। তবে এইটুকু মনে হয়েছে যে, আসলে সকলে তাকে যা ভেবেছে সে তাই নয় বলেই এমনটা হচ্ছে আর প্রাণপণে চেষ্টা করেছে তাই কাটাতে। এতে ক্ষতির কিছু নেই লাভও কিছু হবে না। এ ধরনের অহেতুক লজ্জা যে কেন হয় তার কাছে সেই জিনিসটাই গোলমেলে ঠেকে।
ঘাসের উপর আধশোয়া হয়েছিল নিমাই, পিঠে বল লাগলো। ঘাড় ফিরিয়ে দেখে অধিকারীর বাচ্চা ছেলেটা ছুটে আসছে বল কুড়োতে। অধিকারী ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে। বল নিয়ে ছেলেটা ছুটে গেল।
খেলতে নামার আগে কসরত হচ্ছে। ছেলেকে ঘাস চেনাচ্ছে। নিমাইয়ের হাসি পেল। এখন প্র্যাকটিশ করে কতটুকু উন্নতি হবে খেলার? বলটা আবার এলো। নিমাই উঠে কুড়োলো। ছুঁড়ে দিলো। খেয়ে উঠে বাচ্চাটার ছুটতে কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়। কাগজে তামাক পাকাতে পাকাতে পালমশাই একবার ঘুরে গেলেন।
'কোন পজিশনে নামবেন, ছ নম্বর?'
নিমাই ঘাড় নাড়লো। সেই বকবকিয়ে লোকটা আড়চোখে তাকাতে তাকাতে পাশ দিয়ে চলে গেল। শীতের দুপুরে ভরাপেটের সঙ্গে রোদ্দুরের একটা আঁতাত আছে। মিলে গেলেই দুটো জিনিস এক হয়ে ঝিমুনি এবং তাই থেকে ঘুমে দাঁড়ায়। চোখের পাতা ভারি হয়ে ঝুলে গেছলো, ধড়ফড় করে উঠে বসল নিমাই।
অধিকারী পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কখন।
'ঘুম পাচ্ছে বুঝি?'
নিমাই পরিষ্কার বুঝল যে বোকার মতো হলো তার হাসিটা, কিন্তু তাছাড়া উপায়ই বা কি।
'ব্যাট করা মানে আপনাকে একা লড়তে হবে এগারোটা শত্রুর সঙ্গে। কোন দিক থেকে খতম করে দেবে জানেন না, চোখ, কান, হাত, পা—কে সজাগ রাখতে হবে, ঢিলে দিলেই নির্ঘাত মৃত্যু।'
অধিকারী নিমাইয়ের পাশে বসল। মাথায় পাকা চুলের ঝামর, কপালে কাটা দাগ, আঙুলগুলো সরু, লম্বা, শির—ওঠা। কণ্ঠনালী সর্বদাই যেন কাঁপছে।
নিমাই জিজ্ঞাসা করল, আপনি বেঙ্গলের ট্রায়াল খেলেছিলেন?'
'কে বলল' হাসল অধিকারী।
'শুনলুম।'
'হ্যাঁ।' বলেই চীৎকার করল 'রান রান।'
অধিকারীর ছেলে পড়িমরি ছুটল বল কুড়োতে। চোখ বসাবার জন্য কে একজন বেড়ার ধারে ব্যাট করছে। হাবলো মালীদের দিয়ে হাঁড়ি, প্লেট পরিষ্কার করাচ্ছে, অন্যান্যরা চাঁদোয়ার ছায়ায় গল্পে ব্যস্ত। বিপক্ষ দল তোড়জোড় করছে ফিল্ডিংয়ে নামবার জন্য।
এইভাবে বল কুড়োতুম ছাব্বিশ বছর আগে, তখন ক্লাশ টেনে পড়ি। সেই থেকে আজও খেলে যাচ্ছি।
'বেঙ্গলের হয়ে খেলেননি?'
'চান্স পেলুম কই। খেলা খেলা করেই তো ভবিষ্যৎ নষ্ট করলুম। আমার থেকেই ভালো ব্যাট করত অবনী মিত্তির, সে এখন কাপড়ের দোকানের কর্মচারী। ছেলেটাকে দিয়েছে ফ্রেম পালিশের দোকানে, দেখা হলো সেদিন, পুরনো গপ্পো হলো, বললুম, মাঠে আসতে। হাতজোড় করে বলল, 'আর কেন ভাই আখের খুইয়েছি তো এবার কি বুড়োবয়সে চাকরিটাও খোয়াবো। ছেলেটা দিনকতক মাঠে ঘোরাঘুরি করছিল। একদিন হাত—পা বেঁধে চাবকালুম তারপর কাজে লাগিয়ে দিলুম।'
ছুটে এল হাবলো।
'বুঝলেন আমাদের প্যাড আছে চার জোড়া, আপনিতো ফোর ডাউন, সেকেন্ড উইকেট পড়লেই প্যাড পরে তৈরি হয়ে নেবেন। অধিকারী তোমার কি হলো বলোতো, প্যাড—ফ্যাড পরবে না না কি? আজ তোমায় ওয়ান ডাউন দেওয়া হয়েছে, অবস্থা খুব খারাপ, জেতাতো যাবেই না যদি সময় নষ্ট করে ড্র করা যায়। এসো এসো।'
হাবলো ছুটে চলে গেল, আম্পায়ার মাঠে নামছে।
আধ ঘণ্টার মধ্যে তিনজন আউট হয়ে ফিরে এলো, প্যাড পরে বেঞ্চে বসে নিমাই খেলা দেখছে। গল্প করতে করতে পাশের মাঠের সেই ছেলেটা হাজির হল, জেতা হয়ে গেছে তবে হাতে সময় আছে তাই খেলা বন্ধ হয়নি।
তিনজন খুব তাড়াতাড়ি আউট হওয়ায় নিমাই হাল্কাবোধ করছে। তার আউটে কেউ দোষ দিতে পারবে না। আউট হয়ে এসে দুজন কারণ দিয়েছে, মাঠের অবস্থা। বল গড়িয়ে এসেছিল। নিমাই ভাবল, প্রথম বলটাই যদি সিধে গড়িয়ে আসে তাহলে বাঁচা যায়, হাবলোকে আসতে দেখে ব্যাজারবোধ করল সে, কি বলবে মোটামুটি বলে দেওয়া যায়। জবাবে তাকেও কি বলতে হবে জানা আছে— নিশ্চয়, চেষ্টা করবো তো বটেই, আপ্রাণ চেষ্টা করব যাতে ড্র হয়।
মুখ ফিরিয়ে মাঠের খেলা দেখতে লাগল নিমাই, অধিকারী ব্যাট করছে। ময়লা, পুরোনো প্যান্ট, মাথায় আদ্যিকালের টুপি, গোড়ালির কাছে রঙীন মোজা দেখা যাচ্ছে, বুটের বদলে কেডস, রুগ্ন—লম্বা দেহ, বলটা এগিয়ে খেলতে গিয়ে ফস্কালো, প্যাডে লেগেছে, বোলার চীৎকার করে উঠল, আম্পায়ার মাথা নাড়লো।
'আর চোখে দেখতে পায় না।'
চাঁদোয়ার নীচে বলাবলি শুরু হলো।
'বয়স কম হলো নাতো, প্রায় চুয়াল্লিশ—বিয়াল্লিশ, এ্যাদ্দিন খেলছে এই ঢের।'
'এবার কিন্তু ছাড়া উচিত।'
'তাহলে ও মরে যাবে, খেলাই ওর প্রাণ।'
নিমাই শুনতে শুনতে দেখল অধিকারী অস্থির হয়ে পড়ল যেন, অবধারিত রান—আউটের ফাঁড়া কাটিয়ে অন্য ব্যাটসম্যান অধিকারীর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে অথচ সে চীৎকার করছে, ধমকাচ্ছে। দেখে বিশ্রী লাগলো নিমাইয়ের। এতখানি গুরুত্ব দিয়ে খেলাকে নেওয়া কেন? ভুল হয়েছে তো হয়েছে, ভুলের মাশুল দিয়ে ফিরে আসবে মাঠ ছেড়ে। তাই বলে কুৎসিত চেঁচামেচি কেন?
মাঠের ওধারে রাস্তায় একটা মোটর এসে দাঁড়ালো। ধুতি—পাঞ্জাবি—পরা একজন নেমে চাঁদোয়ার দিকেই আসছে, হাবলো ছুটে গেল লোকটার দিকে। কে একজন বলল, 'মিস্টার চক্রবর্তী।' একটু কাছাকাছি লোকটি এসে পড়তেই নিমাইয়ের বুকের হাড় এবং মাংসগুলো উবে গিয়ে শূন্যতার সৃষ্টি করল, রাশি রাশি বাতাস সেখানে ভারী হয়ে জমা হলো। নিমাইয়ের নড়াচড়ার উপায় রইল না। লোকটি আরো এগিয়ে এলো। সঙ্গে হাবলো বকবক করছে, লোকটি সবকিছুর দিকে তাকাতে তাকাতে নিমাইয়ের দিকেও তাকালো। বুকের বাতাস খানিকটা যেন কমে গেল। না চিনতে পারেনি। কিংবা হতে পারে, এ সেই লোক নয়, তবু সন্দেহ গেল না নিমাইয়ের।
পিছু ফিরে স্কোরবুকটা দেখছে। নিজের নাম দেখে লোকটা নিশ্চয় জানতে চাইবে তার নামে কে খেলছে? হাবলো ছুটে এসে নিমাইকে দেখাবে। দেখতে দেখতে ভুরু কুঁচকে লোকটা বলবে, 'গত বছর কি আপনি টালা মাঠে খেলতে গেছলেন?' তারপর হয়তো শুনিয়ে শুনিয়ে বলবে, 'ঠিক আপনার মতোই দেখতে একজন ওখানকার এক ক্লাবে নেট প্র্যাকটিশের সময় এসে বল—টল করত; এমনিই একজন, ক্লাবের কেউ নয়; দিন—দুই পরেই একটা ব্যাট চুরি হয়, তাকেই সন্দেহ করা হয়। কিন্তু সেকথাতো আর মুখ ফুটে বলা যায় না।' এই বলে লোকটা হয়তো আবার ভুরু কোঁচকাবে।
মাঠের মাঝে চীৎকার উঠল, নিমাইয়ের পাশের লোকটি 'আঃ' বলে সিধে হয়ে বসল। আউট হয়ে ফিরে আসছে অধিকারীর সঙ্গী ব্যাটসম্যান।
যে করেই হোক পালাতে হবে। নিমাই উঠে দাঁড়ালো, হাতে ব্যাট, মাঠের মাঝখানে ছাড়া আর পালাবার উপায় নেই। হাবলো কিছু একটা বলবার জন্য আসছে, মুখ নামিয়ে হনহন করে নিমাই উইকেটের দিকে রওনা দিলো।
পা ফাঁক করে সাত—আট হাত দূরেই লোকটা দাঁড়িয়ে। ব্যাট নিয়ে তৈরি হলো নিমাই। বোলার ছুটে আসছে। সামনের লোকটা কুঁজো হয়ে ঝুঁকে পড়ল। নিমেষের জন্য নিমাই তার মুখের দিকে তাকালো। বুভুক্ষের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে একজোড়া লোভী চোখ, শিউরে উঠল নিমাই। বলটা অনেক বাইরে দিয়ে আসছে। ছেড়ে দিলো।
ওভার শেষ হতেই অধিকারী এগিয়ে এলো, 'তড়বড় করবে না, ডাকলেই ছুটবে।'
ব্যাট হাতে অধিকারী দাঁড়িয়ে। তাকে ঘিরে বিপক্ষ দল, ছুটে আসছে বোলার, পদধ্বনি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। কুঁজো হয়ে ঝুঁকে পড়ল ওরা। অধিকারী একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে, একদৃষ্টে তাকিয়ে, একদৃষ্টে তাকিয়ে, যেন এ পৃথিবীর দৃশ্যবস্তু কিছু নেই, এতগুলি ভয় যে তাকে ঘিরে রয়েছে, তা যেন সে গ্রাহ্য করে না। তাকে মাঠ থেকে বিদায় করে দেবার জন্য ওদের চেষ্টাকে যেন সে দেখেও দেখছে না।
যেন জানতো বলটা ওইখানেই পড়বে। নিঃশব্দে হাওয়ায় ভাসিয়ে বাঁ পা—টাকে এগিয়ে দিলো। গর্বিত ভঙ্গিতে শরীরটা ঝুঁকে পড়ল। সিধে ব্যাটের প্রতিরোধকে এগিয়ে ধরল আক্রমণের সামনে। বাধা পেয়ে বলটা এক ইঞ্চিও লাফাতে পারলো না। ঘেরাও করা লোকগুলি হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়ালো।
আবার সেই পদধ্বনি, মাঠ থেকে সরিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র, যেন অপমান করার জন্যই সামনের লোকটাকে আরো এগিয়ে দেওয়া হলো। ভয় পাওয়াবার জন্য অধিকারীর বাঁ—ধারে আর একজোড়া সতর্ক হাত রাখা হলো। ডানদিকে সামনের দিকের লোক সরিয়ে মাঠ খুলে দেওয়া হলো প্রলুব্ধ করার জন্য। অথচ সেই সামনের দিকে তাকিয়ে থাকা, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা। পৃথিবীর দৃশ্যবস্তু যেন নিশ্চিহ্ন। পদধ্বনি, এগিয়ে আসছে।
যেন জানা ছিল। ডান পা—টা হাওয়ায় ভাসিয়ে পিছিয়ে দিলো, শরীরটাকে একটু নুইয়ে বাঁ—পা টেনে আনল পিছনে। সিধে ব্যাট বুকের কাছে ধরল। হার মেনে বলটা পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল।
অধিকারী মাথার টুপি খুলে আবার পরলো, পাতলা হয়ে গেছে ঠিক মধ্যিখানের চুল, পাকা চুলের তেড়ি মাথা ঘিরে হাসলো, বাহুতে নাক ঘষলো, একবার নিমাইয়ের দিকে তাকালো ও।
আবার সেই একই দৃশ্য। লোকটা যেন সব জানে। জানবেই, ছাব্বিশ বছর মাঠে রয়েছে।
ঠিক একইভাবে নিমাইও সামনে তাকালো। অধিকারী, স্টাম্প, উইকেট, বোলার মাঠের সীমানায় সাদা পরদা, আর পরদার পাশে কে লোকটা? সঙ্গে সঙ্গে বুকের মধ্যে হাড় এবং মাংস উবে গেল, রাশি রাশি বাতাস সেখানে জমা হলো।
ছুটে আসছে বোলার, সেই পদধ্বনি নিশ্চয় উঠেছে। লোভ, ভয়, অপমান ঘিরে ধরে ষড়যন্ত্র করছে অথচ নিমাই চেষ্টা করেও পারছে না ব্যাটটাকে তুলতে, অসহায়ভাবে সে চারধারে তাকালো।
ঠিক হাঁটুর নিচেই শব্দটা হলো, চীৎকার করে লাফিয়ে পড়ল চারপাশের ওরা। থর থর করে কেঁপে নিমাইয়ের ব্যাটধরা হাতটা ঝুলে পড়ল। আম্পায়ার মাথা নাড়লো, নট আউট।
গ্লাভসের মধ্যে চিটচিটে ঘাম। পায়ের মোজা ঘামে ভিজে, কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে ভুরুর উপর দিয়ে চোখে নেমেছে। জ্বালা করছে চোখ। কি রকম ভাবে যেন অধিকারী তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। মাঠের বাইরে থেকে কে চীৎকার করল, 'স্টেডী, ডোন্ট নার্ভাস।' নিমাই শক্ত করে ব্যাটের হাতল চেপে ধরল। লজ্জা করছে তার, প্রাণপণে ফিল্ডিং দিয়েছিল যে লজ্জায়, সেই জিনিস।
হাতল ধরে সামনে তাকালো সে। অধিকারী, স্টাম্প, আম্পায়ার, বোলার, সাদা পরদা আর কোথায় সেই লোকটা? নেইতো। ওই যে পর্দার বাঁদিকে বসে চিনেবাদাম খাচ্ছে। খেতে খেতে তাকেই লক্ষ্য করছে। লক্ষ্য করতে করতে ভাবছে, নিশ্চয় ভাবছে—
মাথায় হাত চেপে সামনের লোকটা হায় হায়—এর ভঙ্গিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল। সবকিছুই হয়ে গেছে শুধু বলটারই উইকেট ছোঁয়া হয়নি। চীৎকার করতে ইচ্ছে হল নিমাইয়ের 'ও লোকটা কি সরে যাবে না?' পর্দার সামনে থাকলে সরে যাবার জন্য বলা যেতো, কিন্তু তাতো নেই।
হেরে গেছি, নিমাই ঠিক করল সে মাঠ থেকে চলে যাবে। ইচ্ছে করে আউট হয়ে যাবে। স্বেচ্ছায় চলে যাওয়াই ভালো। পারব না। এভাবে পারা যায় না। তাছাড়া আমিতো এদের কেউ নই। খেলতেও আমি আসিনি, আউট হয়ে গেলে কোনোই ক্ষতিবৃদ্ধি নেই।
নিমাই সামনে তাকালো। অধিকারী, স্টাম্প, আম্পায়ার... চোখ বন্ধ করে বেপরোয়া ব্যাট চালালো। চোখ খুলল আশ্চর্য হয়ে সামনের লোকটা মাথায় হাত আড়াল করে বসে, বলটা গড়িয়ে যাচ্ছে সিমেন্টের উপর সর্ষেদানার মতো, অধিকারীর উত্তেজিত মুখ দশ হাতের মধ্যে।
মাঠের বাইরে হাততালি দিচ্ছে কয়েকজন। অধিকারী এগিয়ে এসে বলল, 'ঘাড়বে গেছ?'
মাথা নেড়ে স্বীকার করার জোরটুকুও নিমাইয়ের নেই। 'আগে মাঠ বোঝো, বোলারকে বোঝো, তারপর হাত খুলো। আগে টিকে থাকা তারপর মার।'
অধিকারী ফিরে গেল, নিমাই আবার তৈরি হলো। সামনে তাকালো, চোখে পড়ল চক্রবর্তী এখনও পর্দার পাশে বসে। নিমাই দাঁতে দাঁত ঘষে বল আসামাত্রই লাফ দিয়ে বেরোলো, সারা মাঠ টপকে পর্দার ওপারে গিয়ে বল পড়ল। হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল চক্রবর্তী।
ওভার বাউন্ডারি। নিমাই বিশ্বাস করতে পারছে না, একটু পুঁজ রক্ত—মাখা ঘটনার মতো লোকটা চোখের সামনে বসে। ওকে যদি বলের ঘা মেরে ওখান থেকে উঠিয়ে দেওয়া যায়। অন্য কোথাও বসুক। অন্তত যেখানে বসলে চোখে পড়বে না। ওভার শেষ হতেই নিমাই বলল, 'অধিকারীদা আপনি এইদিকে আসুন, এদিকের পিচটা বড় অসুবিধে করছে।'
'বেশ তৈরি থাকো, রান নিয়ে এদিকে আসছি।'
প্রথম বলেই অধিকারী রান নেবার চেষ্টা করল। বেড়াজাল ভেঙে বল গলাতে পারলো না। অধিকারী ছুটতে গিয়ে পিছিয়ে এলো। বড়দা তার জন্য কারখানায় একটা চাকরির ব্যবস্থা করেছিল। সুপারিশ পেতে ফোরম্যানকে পঞ্চাশ টাকা ঘুষ দিতে হবে। মেজদির কানপাশা বিক্রি করার জন্য চেয়েছিল, মেজদি দেয়নি। বিয়ের জন্য সঞ্চয় করে রেখেছে। বড়দা মেরেছিল মেজদিকে। মেজদি ছুটে পাশের বাড়ি পালিয়েছিল।
নিমাইও পড়িমড়ি ছুটে গেল ওধারের উইকেটে। রান নেবার জন্য অধিকারী ছুটেছে। মাঝামাঝি ধাক্কা লাগল দুজনের। ছিটকে পড়ল অধিকারী। নিমাই মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করে নিজের উইকেট বাঁচাতে ফিরে এলো। প্রবল উল্লাসে ওরা চীৎকার করল। অধিকারীর উইকেট মাটি থেকে উপড়ে দিয়েছে, রান আউট অধিকারী মাথা নিচু করে মাঠ থেকে বেরিয়ে গেল।
নিমাই ভাবলো দোষটা কার। চোখ পড়ল সেই লোকটার উপর। পর্দার পাশে বসে চিনেবাদাম ভাঙছে। আশ্চর্য সব সময়ই ও সামনে রয়েছে, চেষ্টা করেও ওধারের উইকেটে সে যেতে পারছে না। লোকটাকে পিছনে ফেলে চোখের আড়ালে রাখতে পারছে না। নিশ্চয় ও তাকে নজরে রাখছে। নিশ্চয় ও তাকে চিনে ফেলেছে, নিশ্চয় কথাটা সবাইকে বলে দিয়েছে। ওরা সবাই মাঠের বাইরে অপেক্ষা করছে, মাঠ থেকে বেরোলেই তাকে ঘিরে ধরবে, ঘন হয়ে কাছে এগিয়ে আসবে। যতই এগোবে ততই ওদের চোখমুখ কঠিন হতে থাকবে।
নিমাই সতর্ক হবার চেষ্টা করল। হয়তো ওরা বুঝেছে সে ঘাবড়ে গেছে। চোখাচোখি হলো একজনের সঙ্গে, ধূর্তের মতো সে হাসলো। আর একজন হাত ঘষছে। ঠিক পিছনেই গলা খাঁকারির শব্দ হলো। ওরা ঘিরে ধরেছে।
চোখের মণি ছুঁয়ে হাওয়া চলে যাচ্ছে। জ্বালা করছে, পাতা নামিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। ব্যাটের হ্যান্ডেলের রবারে আলতো হাত বোলালো, ডুমো ডুমো ফোস্কার মতো। মর্গে মেজদিকে দেখে মা কেঁদেছিল। কাপড় সরে গেছলো। সেমিজটা ফুলে উঠেছিল ভারী বুকের জন্য। পর্দার খুঁটি কাঁপছে সম্ভবত হাওয়াতেই কিংবা লোকটা ঠেস দিয়ে বসেছে বলে; নিমাই বুঝল সে ফাঁদে পড়েছে। এখন মাঠ ছেড়ে বাইরে গেলেই ও লোকটা তাকে ধরবে অভিযুক্ত করবে ব্যাট চুরির দায়ে।
আর এই লোকগুলো, যারা তাকে ঘিরে ধরেছে, সামান্য ভুলের অপেক্ষায় রয়েছে, বলটা প্যাড ছুঁয়ে একটু বেপথে যাক, পা—টা একটুর জন্য দাগের বাইরে বেরোক, ঝোড়ো বলে ভয় পাক, কিংবা ঘূর্ণী বলে ধাঁধায় পড়ুক। ওরা উল্লাসে চীৎকার করে উঠবে। একটা আঙুল আকাশমুখো হবে তাকে মাঠের বাইরে যাবার নির্দেশ জানিয়ে।
নিমাই তৈরি হলো লড়াইয়ের জন্য। মাঠে তাকে থাকতেই হবে, যতক্ষণ পারা যায় ওই লোকটার হাতে ধরা না দিয়ে সে থাকবে। মাঠের বাইরের ওরা অপেক্ষা করুক। মাঠের মধ্যের এরা অপেক্ষা করুক। সে লড়বে, বীরের মতো লড়বে।
অত্যন্ত শিথিল ভঙ্গিতে সময় চলেছে। দীর্ঘ শীতের রাত্রের মতো খেলা আর ফুরোয় না। জেতা হবে না জেনেই নেমেছে, এতক্ষণে প্রায় নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে যে হারও হবে না।
ক্লান্তি, বিরক্তি, হতাশা ধীরে ধীরে উৎসাহী বিপক্ষকে কালো করে আনছে। ওরা অলস হয়ে পড়ছে, সুযোগ পেলেই গল্প করছে নিজেদের মধ্যে, অন্যমনস্ক হয়ে অন্য মাঠের খেলার দিকে তাকাচ্ছে।
পর্দার পাশে বসে রাজেন চক্রবর্তী সিগারেট ধরাচ্ছিল। স্তূপ হয়ে আছে চিনেবাদামের খোসা আর ঠোঙ্গা। একটা লোক ছুটে এসে তাকে কি বলল। ব্যস্ত হয়ে রাজেন চক্রবর্তী তাড়াতাড়ি রওনা হলো রাস্তামুখো। ওখানে তার মোটর রাখা আছে।
নিমাই দেখল সে গাড়িতে উঠল। গাড়ি ছেড়ে দিলো। আর পরের বলেই তার একটি স্ট্যাম্প নিখুঁতভাবে ঢলে পড়ল।
মাঠের এগারোজন একবুক শ্বাস টেনে চীৎকার করে ছেড়ে দিলো। হাসল নিমাই। আমি নই রাজেন চক্রবর্তী আউট হয়ে গেল। মাঠের বাইরে যাবার জন্য রওনা হয়ে সে ভাবলো এতে আমার কিছুই এসে যায় না, কারণ এ ক্লাবের আমি কেউ নই।
মাঠের ধারে বাইরের ওরা একসঙ্গে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে। নতুন ব্যাটসম্যান মাথা নামিয়ে তার গা ঘেঁসে মাঠে রওনা হলো। কাউকে এখন গ্রাহ্য করি না—এমন একটা কিছু ভেবে সে হাল্কা বোধ করল। পাংশু মুখে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে করতে ওরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। হেসে নিমাই তাঁবুর দিকে এগোতে ওরা সরে দাঁড়ালো।
ময়লা প্যান্ট যত্ন করে ভাঁজ করছে অধিকারী। ছেলেটা চুপ করে বেঞ্চে বসে। নিমাই বুট খোলার জন্য বসল। তাঁবুতে আর কেউ নেই। মাঠের ধারে এখন সকলে থমথমে উদ্বেগ ভোগ করতে গেছে।
'যে যাই বলুক, কান দিও না' অধিকারী বলছে তাকেই। নিমাই ঘাড় ফেরালো। 'এতদিন ধরে খেলছি বুঝতে পারছি।'
'কি বুঝেছেন?' শ্বাসরোধ হলো নিমাইয়ের।
'ভালো না বাসলে তো এমন খেলা যায় না। ছাব্বিশ বছর ধরে আমি তো এই চেষ্টাই করছি।'
একটা ছেঁড়া তোয়ালে অধিকারী এগিয়ে দিলো, 'মুছে নাও, ভীষণ ঘেমে গেছ।'
যন্ত্রের মতো মুখ মুছলো নিমাই। নিশ্বাস ফেলতে গিয়ে অনুভব করল তার বুক খালি। হাড় এবং মাংসগুলো উবে গিয়ে শূন্যতা সৃষ্টি করছে। বুকের মধ্যে এক বায়ুহীন কক্ষ। তাকে ঘিরে অনেকগুলো ছায়া একসঙ্গে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে। টেনেটেনে হেসে উঠল নিমাই। এ খেলার কৃতিত্ব আমার নয় কিন্তু, স্কোরবুকে দেখবেন অন্য লোকের নাম লেখা আছে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন