আঠারো বছরে

মতি নন্দী

আঠারো বছর আগে হুবহু এইরকম ঘটনা ঘটেছিল এই অফিসে।

''তবে একজন পুরুষ নয়, চিঠি পেয়েছিল পাঁচটা মেয়ে। তখনকার অনেকেই তো এখনও চাকরি করছে, জিগ্যেস করে দেখ।'' গুরুদাস ঘোষ তার আধা টাকপড়া মাথাটায় হাত বুলিয়ে হাসল, ''তখন এটা চুলে ভরা ছিল।''

কথাটা যাদের বলা, সেই তনুময় দে আর সুব্রত মান্না, বছর পাঁচেক আগে চাকরিতে ঢুকেছে। আঠারো বছর আগের ব্যাপারটা তারা জানে না।

ওরা দুজন এরপর সৌমেন্দু মিত্রর কাছে উঠে গেল। ''গুরুদা বলল, এইরকম ব্যাপার নাকি আগেও এই অফিসে ঘটেছে, আঠারো বছর আগে।''

''স্ট্রেঞ্জ!'' সৌমেন্দু রীতিমতো অবাক অবস্থাতেই উঠে গেল গুরুদাসের কাছে।

''গুরুদা ব্যাপারটা কী হয়েছিল বলুন তো?''

''অতদিন আগের কথা সব কি আর মনে আছে। তবে কাল যখন তুমি চিঠিটা দেখালে... ওই যে নিঃসঙ্গতা, বিষণ্ণতা, এইসব শব্দগুলোই মনে পড়িয়ে দিল। কই দাও তো, চিঠিটা একবার দেখি।''

সৌমেন্দু উঠে গিয়ে তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা খাম এনে দিল। গুরুদাস খামটা উল্টেপাল্টে বলল, ''জি পি ও থেকে পোস্ট করা। হাতের লেখাটা মেয়েলিই।''

অতঃপর ভিতর থেকে কাগজটা বার করে স্বগতোক্তির মতো পড়ল : ''যতবার তোমার দিকে তাকাই কেন জানি তোমাকে ভীষণ নিঃসঙ্গ মনে হয়। মাঝে মাঝে যখন অন্যমনস্ক হয়ে জানালা দিয়ে আকাশে তাকাও তখন কেমন চাপা দুঃখ তোমার চাহনিতে ফুটে ওঠে। তাই দেখে আমার মন বিষণ্ণতায় ভরে যায়। মন চায় তোমার দুঃখের ভাগ নিতে। বোধহয় তোমার মতো আমারও কোনো দুঃখ আছে। তাই কি তোমায় জানতে আমার এত ইচ্ছে করে?'' পড়া শেষ করে গুরুদাস জানালা দিয়ে আকাশে তাকিয়েই দ্রুত চোখ ফিরিয়ে আনল। ''মনে হচ্ছে, ঠিক এই ভাষাতেই—'' সে থেমে গেল।

''এই ভাষাতেই পাঁচটা মেয়েকে কেউ চিঠি দিয়েছিল?'' সৌমেন্দু কৌতূহল জানাল।

''না... হ্যাঁ। সেই পাঁচজনের মধ্যে কল্পনা চক্রবর্তী চাকরি ছেড়ে দিয়েছে, লক্ষ্মী বসাক ট্রান্সফার নিয়ে এখন মালদায়, অরুন্ধতী চৌধুরি তো মারাই গেছে বাস অ্যাক্সিডেন্টে, অঞ্জনা আচার্য, ওকে দেখে বুঝতেই পার আঠারো বছর আগে সুন্দরীই ছিল, সদ্য তখন চাকরিতে ঢুকেছে বছর বাইশ—তেইশ বয়স, প্রেম করে বিয়ে, অঞ্জনা তো চেঁচামেচি করে রাগে চিঠিটা কুচিকুচি করে বলল, ওর স্বামী যদি জানতে পারে তাহলে এখুনি ওকে এই অফিস ছাড়তে বলবে। ...এখন অঞ্জনা তো মেটারনিটি লিভে।''

''আর পঞ্চম জন?'' তনুময় ইতিমধ্যে তার চেয়ার থেকে উঠে এসেছে।

''আমি কোনো চিঠি পাইনি।''

ওরা তিনজনই প্রায় চমকে উঠে মুখ ঘোরাল। কথাটা এসেছে তাদের বাঁদিকে, জানালার ধারে প্রায় দশ হাত দূরত্বে বসা প্রীতি দাশগুপ্তের কাছ থেকে। একমনে মাথা নিচু করে কাজ করে যাচ্ছিল। বোঝা গেল আসলে সে ওদের কথোপকথন শুনছিল।

''আপনি চিঠি পাননি?''

''না।''

''ঠিক বলছেন?''

প্রীতি স্থির চোখে গুরুদাসের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে কেটে কেটে দৃঢ়স্বরে বলল, ''আমি কোনো নোংরা চিঠি পাইনি।''

গুরুদাস চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, ''অ।''

তনুময় মাথা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ''যা দেখতে, কে আর ওকে চিঠি দেবে!''

''এখন যাও তো। অনেক কাজ হাতে রয়েছে।'' হঠাৎই ব্যস্ততা দেখিয়ে গুরুদাস ওদের তুলে দিল।

চেয়ারে ফিরে সৌমেন্দু চিঠিটা আবার পড়ল। তিনতলার পারমিতার কানে চিঠির কথাটা পৌঁছবেই। তখন কাণ্ডটা কি ঘটবে? দুমাস আগে মিতা তাকে চুমু খেতে দিয়েছে, গত সপ্তাহে বিয়ে করার পাকা প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় বুকে হাত দিতে দিয়েছে। ওর মা বিয়ে দিতে রাজি, তার নিজের বাড়িতেও আপত্তি হবে না। এসব কথা অফিসের সবাই জেনে গেছে, কারণ সে নিজেই তা জানিয়েছে।

আর কালই কিনা ডাকে এই চিঠিটা এল! চিঠি নয় প্রেমপত্রই। সৌমেন্দু জানে সে সুশ্রী, অনেকেই তাকে বলে চোখদুটো, মুখের ছাঁদ অমিতাভ বচ্চচনের মতো। তাই সে চুলটাও বচ্চচনের মতো করে ফেলেছে। ভাল টেবিলটেনিস খেলত, এখনও অফিস টুর্নামেন্টে ট্রফি জেতে। মেয়েরা তার দিকে তাকায় তবে সেটা বচ্চচনের নকল দেখার জন্য কিনা, সেটা নিয়ে তার সন্দেহ আছে। তবে মিতার ভালবাসা সম্পর্কে তার কোনো সন্দেহ নেই। বচ্চচনকে নয়, তাকেই পছন্দ এ—কথা মিতা তাকে বলেছে। আরও বলেছে, পাগলের মতো সে ভালবাসে সৌমেন্দুকে।

এখন যদি জানতে পারে এই অফিসেরই আর একজন সৌমেন্দুর প্রেমে পড়েছে, পড়াই নয়, চিঠিটা যেরকম তাতে বলায় যায় নিবেদন করেছে, তাহলে কি হবে! কি ঘটতে পারে?

সৌমেন্দু কয়েকটা সম্ভাবনার কথা ভাবল। মিতা তাকে চাকরি ছাড়তে বলবে। সেটা অসম্ভব। এই বাজারে আবার কোথায় সে চাকরি পাবে? সারাক্ষণ তাকে চোখে চোখে রাখার জন্য মিতা তিনতলা থেকে দোতলার এই ঘরে অর্থাৎ ডিপার্টমেন্ট বদল করে নেমে আসার চেষ্টা করবে। এলে আসতে পারে। জীবন তখন দুর্বিষহ করে তুলবে, তার নয়, অন্য মেয়েদের। আর শেষ সম্ভাবনাটি হল, দুজনের মধ্যে ছাড়াছাড়ি।

তিনটি সম্ভাবনাকেই সে কয়েক সেকেন্ডে খারিজ করে দিল। বরং তার মনে হল, চিঠিটা মিতাকে দেখালে কাম্য পুরুষ হিসাবে তার দর বাড়বে। শুধু বুকে হাত দিতে দেওয়া নয় আরও কিছু কনসেশন দিতে পারে।

কিন্তু চিঠিটা কে তাকে লিখল? এই ফ্লোরে, এতবড় ঘরে, যেখানে ছেচল্লিশ জন স্টাফ, সাতজন অফিসার, বেশির ভাগের চাকরিই দশ বছরের উপর, আটজন মেয়ে... সৌমেন্দু থমকে গেল। এই আটজনেরই কেউ।

সে ঝাড়াই বাছাই শুরু করল। প্রথমেই খারিজ করল প্রীতি দাশগুপ্তকে। আড়চোখে তাকিয়ে বয়স বোঝার চেষ্টা করল। পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চান্নর মধ্যে কোনো একটা জায়গায়। লম্বা সরু মুখ, উপরের পাটির সামনের দুটো দাঁত সতত বেরিয়ে আসতে চায় আর ঠোঁট দিয়ে ঢেকে দেবার নিরন্তর চেষ্টা। তনুময় ওর নাম দিয়েছে 'হর্সি'। অনেকে বলে 'ঘোড়ামুখো'। গোলাকার বড় বড় চোখ, নাকের নিচে তিল, রোমগুলো বড় এবং ঘন, ফলে গোঁফের রেখা স্পষ্ট। বিয়ে করেনি। অনেকে বলে, বিয়ে করতে কেউ চায়নি। প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা, পাতলা দেহ, সামান্য খোঁপা। শুধু দামি ঘড়ি আর দামি চশমা ছাড়া কোনো অলঙ্কার নেই। বাইশ বছর চাকরি করছে। মাকে নিয়ে আলাদা থাকে। ভাইদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। প্রীতি দাশগুপ্তের সঙ্গে অফিসের কারুরই হৃদ্যতা বা বন্ধুত্ব নেই। 'আমি কোনো চিঠি পাইনি।' পাবার কথাও নয়।

সৌমেন্দু অতঃপর বাকি মেয়েদের দিকে নজর দিল। অঞ্জনা আচার্য ছুটিতে, দুজনকে সে দেখতে পেল না, আর আছে চারজন। তাদের সে খুঁটিয়ে দেখল, তাদের বয়স অনুমানের চেষ্টা করল, তাদের কথাবার্তা, হাবভাব, চলাফেরা মনে আনল। না, এরা কেউ নিঃসঙ্গতায় বা বিষণ্ণতায় ভোগার মতো পাত্রী বলে তার মনে হল না।

মিতা ঠিক পাঁচটায় এল। সৌমেন্দুকে নিয়ে সে বেরোয়। হয় সিনেমা বা থিয়েটার যায়, নয়তো গঙ্গার ধারে বা ময়দানে গিয়ে দুজনে বসে। ওরা দুজন সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিক্টোরিয়ার সামনে বসল। সৌমেন্দু জানাল না একটা অদ্ভুত চিঠি সে ডাকে পেয়েছে।

পরদিন সে অফিসে গুরুদাসকে জিজ্ঞাসা করল, ''কে চিঠিটা লিখেছিল সেটা কি জানা গেছল?''

''হ্যাঁ, কালপ্রিট ধরা পড়েছিল।''

''কে?'' সৌমেন্দু খাড়া হয়ে বসল, তারপর ঝুঁকে পড়ল, ''কোন লোকটা?'' সে দুধারে সবার মুখের ওপর চোখ বোলাল।

''নেই। চাকরি ছেড়ে চলে গেছে।... জ্ঞানবাবু, জ্ঞান মুখুজ্জে। অ্যাসিস্ট্যান্ট ইনচার্জ, পি এফ সেকশনের। এখন আমার যা বয়স সেই বয়সীই ছিল। ঠাণ্ডা প্রকৃতির, আস্তে কথা বলতেন, কিন্তু বাইরেটা দেখে কি আর মানুষ চেনা যায়।'' গুরুদাস টানা বলার জন্যই যেন হাঁপিয়ে পড়লেন। একটু অন্যমনস্ক, বোধহয় স্মৃতি ঝালিয়ে নেবার জন্যই।

সৌমেন্দুর চোখ প্রীতির দিকে সরে গেল। গুরুদাসের মুখের দিকে একদৃষ্টে প্রীতি তাকিয়ে। চাহনিতে ওর নিজস্ব কঠিন ভাবটা নেই বরং চাপা একটা দুঃখই যেন ফুটে রয়েছে।

''সারা অফিস তো হইচই পড়ে গেল। নানা জনের নানা কথা, একে সন্দেহ, তাকে সন্দেহ। সে একটা বিশ্রী সিচুয়েশন তৈরি হল। শেষকালে একটা ইনভেস্টিগেশন কমিটি হল তিনজনকে নিয়ে। তারা চিঠির হাতের লেখার সঙ্গে মেলাবার জন্য অফিসের প্রত্যেককে দিয়ে চিঠিটা কপি করাল।''

''বাহহ, এটা কী রকমের ইনভেস্টিগেশন! যে এইরকম চিঠি দিয়েছে, সে কি নিজের হাতে লিখবে নাকি? নিশ্চয় অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়েছে।'' সৌমেন্দু তদন্তের গোড়ার গলদটা দেখিয়ে দিয়ে আত্মপ্রসাদ বোধ করে বাঁ দিকে তাকাল। প্রীতি মাথা নামিয়ে কাজে ডুবে আছে।

''কিন্তু এক্ষেত্রে কালপ্রিট ওই ভুলটাই করেছিল। এ জি এম—এর ঘরে বসে সবার হাতের লেখা পরীক্ষা করে একজনের লেখার সঙ্গে চিঠির হাতের লেখা মিলে গেল। ...জ্ঞান মুখুজ্জে। ওই টেবিলটায় বসত।'' ঘরের মাঝামাঝি গুরুদাস আঙুল দিয়ে দেখাল। কমিটির তিনজন এ জি এম—এর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়াল। আমি কোনোদিনই ভুলব না, তখন জ্ঞানবাবুর মুখটা যা হয়ে গেল। ছুটি পর্যন্ত চুপ করে পাথরের মূর্তির মতো সিটে বসে রইল। পরেশ, বেয়ারা পরেশ, এখন বিলিং সেকশনে রয়েছে, ও গিয়ে একগ্লাস জল দিয়েছিল। তখন শুধু বলেছিল, আমাকে আজ বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে? প্রেশারটা বেড়েছে মনে হচ্ছে। পরেশ থাকত ওর বাড়ির কাছেই।''

''জ্ঞান মুখুজ্জে নিজেকে ডিফেন্ড করলেন না!''

''হাতের লেখা মিলে গেছে, এরপর আর কী বলবে!'' গুরুদাসকে ঈষৎ বিব্রত ও অধৈর্য মনে হল।

''তাহলেও এত বড় একটা অ্যালিগেশন, চরত্রে কলঙ্ক... একজনের হাতের লেখা অন্যের সঙ্গে মিলতেই পারে। এক্ষেত্রে উচিত ছিল হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট দিয়ে পরীক্ষা করানো।'' সৌমেন্দু অনুমোদন করতে পারল না এবং সেটা মাথা নেড়ে জানিয়ে নিল।

''তোমার চিঠিটা তাহলে হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্টের কাছে দাও।'' গুরুদাস তীব্রস্বরে বলল বিরক্তি গোপন না করে।

''তার মানে সারা অফিসকে দিয়ে চিঠিটা লেখানো! ওরে বাবা!''

''সারা অফিস কেন হতে যাবে, লিখেছে তো কোনো মেয়ে। কটা মেয়েই বা আর—''। গুরুদাস দুপাশে তাকানোর জন্য প্রথমেই প্রীতির দিকে মুখ ঘোরাল। স্থির শীতল চাহনি নিয়ে প্রীতি তাকিয়ে রয়েছে। ঠোঁটের কোণ মোচড়ানো। দুই আঙুলে ধরা কলমটা ঘুরিয়ে চলেছে।

''না গুরুদা, অত হইচই করার মতো ব্যাপার এটা নয়। সত্যি সত্যিই যদি কারোর হাতের লেখার সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াবে বলুন তো?... হয়তো আত্মহত্যা, নয়তো ব্লাড প্রেশার, হার্ট অ্যাটাক... রেজিগনেশন, জ্ঞান মুখুজ্জে যা করেছিলেন... ভাল কথা, আপনারা কি পরে খোঁজ নিয়েছিলেন ভদ্রলোক কী করছেন, কেমন আছেন?''

''নাহ, কার আর মাথাব্যথা ওই নিয়ে, সময়ই বা কোথায় খোঁজখবর নিতে। কিছু হলে পরেশই জানিয়ে দিত।'' এই বলে গুরুদাস মোটা একটা ফাইলের ফিতে খুলতে শুরু করল।

পরদিন সন্ধ্যায় পরেশের সঙ্গে প্রীতি দাশগুপ্ত বরানগরে বি টি রোডে মিনিবাস থেকে নামল। তখন সেখানে বিদ্যুৎ বন্ধ। পরেশ বলল, ''দিদি একটা রিকশ নিন, রাস্তার যা অবস্থা অন্ধকারে আপনি হাঁটতে পারবেন না। ওপারে, মিনিট পাঁচ—ছয় ভেতরে যেতে হবে।''

একটা সরু ঘেঁষের রাস্তার ওপর, দরজা খোলা একটা ঘরের সামনে তারা রিকশ থেকে নামল। দেওয়াল ইঁটের গাঁথনির, ছাদটা টালির। ভিতরে হারিকেন জ্বলছে। রাস্তা থেকে দুধাপ সিঁড়ি ভেঙে ঘরে উঠতে হয়। ঘরের মধ্যে গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা, পুরু লেন্সের চশমা চোখে অধিকাংশ পেকে যাওয়া চুলের একজনই লোক, চেয়ারে বসে টেবিলে বিছানো খবরের কাগজের ওপর হুমড়ি দিয়ে। তার পাশে একটা ময়লা কাচের পাল্লার পুরনো আলমারি, যাতে পালিশ নেই। তার ভিতরে কিছু বই, আর শিশি। টেবলে কাঠের খোলা বাক্স, যেটা কর্কের ছিপি আঁটা হোমিওপ্যাথির শিশিতে ভরা। একটা বেঞ্চ আর চেয়ার ছাড়া আর কোনো আসবাব নেই।

বৃদ্ধ তাদের দুজনকে দেখে মুখ তুলে পরিচয় বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন। প্রীতিকে বলে রেখেছিল পরেশ সুতরাং জ্ঞান মুখুজ্জেকে সে চিনল কিন্তু তাকে চেনাতে পরেশকে কথা বলতে হল।

''জ্ঞানবাবু, দিদিকে চিনতে পাচ্ছেন কি? আমাদের অফিসের প্রীতি দাশগুপ্ত। বললেন, আপনাকে দেখতে আসবেন, তাই নিয়ে এলাম।''

জ্ঞানবাবুর শীর্ণ গালদুটি হাসিতে আরও বসে গেল।

''নিশ্চয় চিনব, বসুন বসুন।''

''দিদি আমার একটু কাজ আছে—''

''তুমি এসো, আমি বাসস্টপ পর্যন্ত চিনে চলে যাব।''

প্রীতি চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল জ্ঞান মুখুজ্জের মুখের দিকে।

''শেষ আপনাকে যেদিন দেখেছি—।''

''এখন তার সঙ্গে কিছুই মিলছে না, তাই তো?''

বৃদ্ধ হেসে উঠলেন। ''গ্রেসফুলি ওল্ড আমি হতে পারলাম না। চাকরিটা ছেড়ে এমন অবস্থায় পড়লাম, এত কষ্টে যে দেহটাকে আর যত্ন দেওয়া গেল না। তখন বয়স প্রায় পঞ্চাশ, ওই বয়সে কোথায় আর চাকরি পাব? এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টের অফিসে পার্ট টাইম কাজ পেলাম, এম কম—টা পাস করেছিলাম তো! আর হোমিওপ্যাথির শখ ছিল, ওষুধ টষুধ দিতাম, এটাকেও জীবিকার জন্য কাজে লাগালাম। আজও চালিয়ে যাচ্ছি।''

''পরেশের কাছে শুনলাম খুব কষ্ট করে ছেলেকে মেয়েকে পড়িয়েছেন।''

''তা কিছু কষ্ট করতে হয়েছে। মেয়ে এখন কলেজে পড়ায়, বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে রিসার্চ করছে বোস ইন্সটিটিউটে, বিয়ে করেনি।''

''আপনি চাকরিটা ছাড়লেন কেন? আপনি তো ওই চিঠি লেখেননি।'' প্রীতি কয়েক সেকেন্ড থেমে বলল, ''আমি জানি ওটা আপনার লেখা নয়। কিন্তু ছাড়লেন কেন?''

''আপনি জানেন!''

''হ্যাঁ জানি।''

''তখন সেটা বলেননি কেন?''

''বলে কিছুই করতে পারতাম না। হাতের লেখা মিলে যাওয়ায় এমন একটা অবস্থা তখন তৈরি হল—।''

''ঠিক করেননি, ঠিক করেননি। হলেই বা অবস্থা, তার বিরুদ্ধেও তো দাঁড়াতে হয় মানুষকে... চাকরি ছাড়ার অবশ্য প্রকৃতই কোনো যুক্তি নেই, একটা বাজে ব্যাপারে... এটাই আমার জীবনের একমাত্র ভুল। আমার উচিত ছিল ওই অফিসে ওই লোকগুলোর মধ্যে থেকে চাকরি করে বুঝিয়ে দেওয়া, আমি পরিচ্ছন্ন, তোমরা নোংরা। ... হঠকারিতা, আমার হঠকারিতা তাছাড়া আর কী বলব!''

তারপর জ্ঞান মুখুজ্জে সরল হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন, ''চা আনি, বসুন।''

প্রীতি হাত ধরে তাঁকে বসাল। ''দরকার নেই, চা আমি খাই না। একটা কথা জানতে এসেছি, ঠিক ঠিক বলবেন?''

''বলুন।''

''আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়নি? মানে, কে ওইরকম চিঠি লিখেছে তাই নিয়ে আপনি—।''

প্রীতি তাকিয়ে রইল কথা শেষ না করে। জ্ঞান মুখুজ্জের চশমার পুরু কাচের পিছনে কোনো ভাবান্তর সে দেখতে পেল না।

''একবার শুধু মনে হয়েছিল, আপনারই লেখা।''

প্রীতির কোনো ভাবান্তর ঘটল না।

''কেন, আমি কেন? ... কুৎসিত বলে? কোনো পুরুষ আমার দিকে তাকায় না তাই সবার চোখ আমার দিকে টানার জন্য?... কিন্তু অন্যদের মতো আমিও ওই চিঠি পেয়েছিলাম, আমি কিন্তু কাউকে সে কথা বলিনি।''

''চেপে গেছলেন কেন?''

''আমাকে কেউ প্রেম নিবেদন করবে বলে কি আপনার মনে হয়? করেছে বললে তো আমি হাসির খোরাক হতাম। কেউ একজন মজা করার জন্যই এটা করেছিল। হয়তো লক্ষ্যটা ছিল আমাকেই। আর সেজন্যই আমি নির্বিকার থাকার, চিঠি না পাওয়ার ভান করেছি। যদি তখন জানাতাম অন্যদের মতো আমিও চিঠি পেয়েছি তাহলে ব্যাপারটা লঘু হয়ে যেত, দুচার দিন হাসাহাসি হত, বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যেত না।''

টেবলে রাখা প্রীতির হাতের ওপর জ্ঞান মুখুজ্জে আলতো করে হাত রাখলেন। ''আমি এই নিয়ে আর অসুখী নই। মন থেকে আপনি পাষাণভারটা নামিয়ে ফেলুন।''

ছদিন পর অফিসে ডাকে আসা একটা খাম পেল সৌমেন্দু। খামের ওপর লেখা 'ব্যক্তিগত'। খাম থেকে সে একটা বহু পুরনো দুভাঁজ করা কাগজ বার করল। কাগজটা খুলে পড়তে পড়তে অবাক হল। তারপর হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুখের অবাক মুছে দিয়ে। চিঠিটা হাতে নিয়ে সে উঠে এল গুরুদাসের কাছে।

''দেখুন গুরুদা, কেউ একজন নিশ্চয় মজা করছে। সেই একই ভাষায় একই হাতের লেখায়। তবে এটা খুবই পুরনো, বহু বছর আগের—।''

চিঠিটা সে গুরুদাসের হাতে তুলে দিল।

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%