মতি নন্দী
অপরাহ্ণ বেলায় কলকাতার ঠিক মাঝখানে, রাজপথের উপর একটি বিরাট বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে মেয়েটি ভাবছে।
এই সময় এই অঞ্চলের মোটর গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যায় এবং অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে সেগুলো ছোটার চেষ্টা করে, পথিকজন ব্যস্ত হয়ে পথ চলে। ফুটপাথে দোকানিরা আর একটু বেশি চিৎকার দ্বারা দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যস্ত হয়। এই সময় কলকাতার এই মধ্যদেশ উত্তেজনা চাঞ্চল্য ও লঘুতা দ্বারা কিছু বেসামাল হয়ে ওঠে।
মেয়েটিকে ঈষৎ চঞ্চল বা উত্তেজিত দেখা গেল। সে ঘন ঘন এধার—ওধার তাকাচ্ছে। কোনো পথিককে নিকটবর্তী হতে দেখলেই তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছে। এক একজন তাকে অতিক্রম করে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাশার ছায়া চোখে নেমে এসে মুখমণ্ডলকে মলিন করে দিচ্ছে।
মেয়েটি সত্যই একজনের জন্য অপেক্ষা করছে। লোকটিকে সে চেনে না। তাকে চিঠি দিয়ে দেখা করতে বলেছে লোকটি। লোকটি বিবাহেচ্ছুক। মেয়েটির জন্ম অতি দরিদ্র পরিবারে, কলকাতার শহরতলীতে। শৈশব থেকে সে অনাদার, অশিক্ষায় ও অর্ধাহারের মধ্য দিয়ে লালিত। কিন্তু স্বভাবে ভীরু ও হৃদয়ে কোমলতার অভাব নেই। স্কুলের কয়েক শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর আর তাকে বাড়ির বাইরে বেরোতে দেওয়া হয়নি। তবে পাড়ার মধ্যে একা এবাড়ি—ওবাড়ি যাওয়ার অধিকার আছে। মেয়েটিকে প্রচলিত ধারণায় কোনোক্রমে সুন্দরী বলা যায় না, শ্রীময়ীও নয়। শীর্ণ ফ্যাকাসে সাদা দেহটির জন্য তার বাবা কিংবা মা খুব বিরক্ত হয়ে 'প্যাঁকাটির' সঙ্গে তুলনা করেন। ওঁরা প্রায়ই রাগেন। মেয়েটির রূপও তাঁদের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করেছে। ওঁরা হাল ছেড়ে দিয়ে ললাটে করাঘাত করেছেন, আর মেয়েটি আড়ালে প্রতিবার অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে।
মেয়েটির কৈশোরে, কিছু প্রেমিক জুটেছিল। কয়েক বছর মেয়েটি অনটন ও লাঞ্ছনার মধ্যেও সুখ লাভ করে। প্রত্যেকেই তাকে বিবাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়, সে তাদের বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার দেহে যুবতীসুলভ মনোহারিত্বের অভাবগুলি প্রকট হওয়ায় এবং প্রেমিকদেরও সাংসারিক দায়িত্ব ও চিন্তা বেড়ে যাওয়ায় মেয়েটি একসময় লক্ষ্য করল, সে আবার একা হয়ে গেছে। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করল, প্রণয় দ্বারা কোনো পুরুষকে সে আকর্ষণ করতে পারবে না, অর্থ ব্যয় দ্বারা বিবাহ দেওয়ার সামর্থ্যও পরিবারের নেই। একমাত্র দৈববশেই যদি বিবাহ হয়।
মেয়েটির একজন বান্ধবী আছে। প্রতিবেশী বধূ ওরই সমবয়সি। মেয়েটির দুঃখে বধূটিও সমদুঃখী। এই বধূটিই একদিন খবরের কাগজের একটি বিজ্ঞাপনের প্রতি মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ''লেখো না একটি চিঠি। শুধু ঘরের কাজ জানা মেয়েই চেয়েছে। রূপ, গুণ, বয়স নিয়ে কোনো দাবি জানায়নি যখন, চিঠি দিতে অসুবিধা কীসের? মাত্র কুড়িটা পয়সা তো খরচ। না হয় না হবে, কিন্তু হয়েও তো যেতে পারে।''
মেয়েটির হৃৎপিণ্ড কিছুক্ষণের জন্য অকর্মণ্য হয়ে পড়েছিল বধূটির শেষ কথাটিতে। তার মনে হয়েছিল এটাই বোধহয় দৈব। হয়তো এই বিজ্ঞাপনের মধ্যে তার দুঃখের অবসান আছে। কিন্তু লজ্জা ও ভয়ে সে প্রথমে অস্বীকার করল চিঠি লিখতে। বারবার তার অবিশ্বাসের এবং মন্দভাগ্যের নজিরগুলির পুনরাবৃত্তি করল। বধূটি দৃঢ়ভাবে জানাল, ''বেশ তাহলে আমিই তোমার হয়ে লিখে পাঠাচ্ছি।''
এক সপ্তাহ পরেই বধূটি ওকে ডেকে পাঠাল, চিঠির জবাব এসেছে। পত্রদাতা ঠিকানা দেয়নি। একটি নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে একটা জায়গায় অপেক্ষা করতে বলেছে আলাপ করবে বলে। মেয়েটি ঠকঠক করে কেঁপে উঠল বধূটির উদ্ভাসিত মুখের দিকে তাকিয়ে। বোধহয় দৈব সদয় হয়েছে এতদিনে। বোধহয় সত্যিই এবার কিছু ঘটবে। বহুবার খুঁটিয়ে সে চিঠিটা পড়ল। চিঠি থেকে সে একটা পুরুষের আকৃতি নির্ণয় করার চেষ্টা করল।
তার মনে হল এই পুরুষটিই পরিহাসপ্রিয়, পরিচ্ছন্নতা বিলাসী, দীর্ঘদেহী, চটপটে, পুরুষটির ললাট উন্নত, মধ্যভাগ ক্ষীণ, বক্ষ—কপাট প্রশস্ত, চক্ষে কৈশোরের চাপল্য, গাত্রবর্ণ চাঁপা ফুলের মতো। এবং সহজেই কামমোহিত হয়ে পড়ে। তার মনে হল পুরুষটি খুবই দুঃখী তারই মতো। খুবই রূপবিহীন তারই মতো। এইভাবে কয়েকদিন মেয়েটি ভাবল। তখন দিনগুলি লঘু পক্ষ বিস্তার করে তার দেহের প্রতি প্রান্তে নানান ভঙ্গিতে উড়ে ফিরল। দিনগুলি তাকে বিবশ করল, সংসারের কাজে সে বিরস হল। মাঝে মাঝেই তার মনে হল, এখন অন্যের সংসারে রয়েছি।
নির্দিষ্ট দিনে চুপিচুপি সে বধূটির বাড়ি এল। বধূটি তাকে নিজের শাড়িতে সাজিয়ে দিল হালকাভাবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটি মুগ্ধ চোখে নিজেকে বারবার দেখল। বধূটি তার স্বামীর কাছ থেকে জেনে রেখেছিল কীভাবে সেই নির্দিষ্ট জায়গাটিতে পৌঁছতে হবে। মেয়েটিকে সে পুঙ্খানুপুঙ্খ বুঝিয়ে দিল।
মেয়েটি ঠিকমতোই এসে পৌঁছেছে। ঘড়িওলা বড় বাড়িটার নিচে দাঁড়িয়ে সে প্রথমে ভয় পেল। এমন প্রবল ব্যস্ততা ও বৃহৎ জনকোলাহলের মাঝে সে আগে কখনও দাঁড়ায়নি। নিজেকে সে অকিঞ্চিৎকর বোধ করল। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে, আর ফিরতে না পারার ভয়ে সে কেঁপে উঠল।
কিন্তু সম্মুখের প্রবহমানতা অচিরেই তার কৌতূহল আকর্ষণ করতে শুরু করল। সে ভীতভাব কাটিয়ে নানান বেশভূষা এবং ভঙ্গির নরনারীদের, নিকটের একটি দোকানের সামগ্রী, অতিকায় বাস এবং ক্ষুদ্র মোটর গাড়িগুলির গমনাগমন ও তার আরোহীদের দেখতে থাকল।
কিছুক্ষণ পর সে ক্লান্ত বোধ করল। সবই তার কাছে একই দৃশ্যের বারংবার ফিরে আসার মতো মনে হল। সে লক্ষ্য করল, বহু লোক তাকে দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ ঘাড় ফিরিয়েও দেখছে। কেউ কেউ তার সামনে এসে মনোহর হয়ে সোজা মুখের দিকে তাকাল। অস্বস্তিতে ভরে উঠল মেয়েটি। সে ঘড়ির দিকে তাকাল। নির্দিষ্ট সময় পৌঁছে গেছে। সে লোকটিকে দেখার জন্য বহুদূর পর্যন্ত তাকাল। এখন প্রত্যেককেই মনে হচ্ছে সেই লোক। এবার সে ব্যস্ত হয়ে উঠল। দেহে—মনে চঞ্চলতা এবং শিহরন লেগেছে। ঘড়ির দিকে বারবার তাকাল এবং হঠাৎ মনে হল, এখন তাকে খুবই বিশ্রী দেখাচ্ছে। নিজেকে দেখবার জন্য কয়েক পা হেঁটে একটি দোকানের কাচের শো—কেসের সামনে দাঁড়াল। মনে হল তাকে আরও শীর্ণ দেখাচ্ছে, আরও শুষ্ক। কপালটা ঠেলে উঠেছে, পুরো বাহুর শিরাগুলি দড়ির মতো, বক্ষদেশ সমতল, চোখের নিচে অপুষ্টির ঘনছায়া।
মেয়েটি বিষণ্ণ চিত্তে নিজের প্রতিবিম্ব থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েই চমকে উঠল। কুড়ি—পঁচিশ হাত দূরেই এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে। তার দিকেই তাকিয়ে, মুখে চাপা হাসি। মেয়েটি বিহ্বল হয়ে পড়ল। ধীরে চোখ নামিয়ে নিল সে। লোকটি রুমালে মুখ মুছছে। মেয়েটি সঙ্গোপনে দেখল, দীর্ঘদেহী, ক্ষীণ কটি, উন্নত ললাট এবং বলিষ্ঠ। পোশাকে বিলাসী, চাহনিতে চটুল, ভঙ্গিতে তরুণ। লোকটি কাছে এগিয়ে, কয়েক হাত দূরে মাত্র দাঁড়াল। গলা খাঁকরি দিল। মেয়েটির মনে হল, লোকটি কুণ্ঠিত হচ্ছে। জেনে নিতে চাইছে, যার অপেক্ষা করার কথা, সেই মেয়েটিই কিনা। স্বাভাবিকই। কোনো ভদ্রলোকই নিশ্চিন্ত না হয়ে এক্ষেত্রে অপরিচিত মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। লোকটিকে নিশ্চিন্ত করার জন্য মেয়েটি হাসল।
''যাবার জায়গা আছে?'' ফিসফিস করে লোকটি বলল প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। মেয়েটি মাথা নাড়ল।
''তা হলে আমাকেই জায়গা ঠিক করতে হবে?''
''আমি এই প্রথম এখানে এসেছি। কিছুই চিনি না।'' কাঁপা গলায় মেয়েটি কোনোক্রমে বলল। লোকটি হেসে ওর আপাদমস্তকে চোখ বোলাল। সেই চাহনিতে কী যেন আছে, মেয়েটির ভাল লাগল।
''এসো আমার সঙ্গে।'' লোকটি চলতে শুরু করল। মেয়েটি অনুসরণ করল। একটি গলির মধ্যে ঢুকে খানিকটা চলার পরই জীর্ণ একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে লোকটা বলল—''দাঁড়াও আসছি।''
মিনিট পাঁচ পর সে বেরিয়ে এল সঙ্গে দাড়িওলা এক প্রৌঢ়। মেয়েটিকে খুঁটিয়ে দেখে প্রৌঢ় ঘাড় নাড়ল এবং বলল, ''এ তল্লাটে আগে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছে একদম নতুন।''
লোকটি সন্তুষ্ট হয়ে হেসে মেয়েটিকে বলল, ''চলো ঘর পাওয়া গেছে।''
দোতলায় একটা ঘরে ওরা এল। মেয়েটির এখন মনে হচ্ছে, লোকটি বোধহয় ভুল করেছে কিংবা সে নিজেই।
''আপনি কি আমাকে খুঁজতেই এসেছিলেন?'' মেয়েটি বলল।
''নিশ্চয়।'' গলা থেকে টাই খুলতে খুলতে লোকটি বলল।
''আপনার কে কে আছে?''
''কেউ নেই, তাইতো এসেছি তোমার জন্যে!'' বলতে বলতে লোকটি উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
''আমাকে কি আপনার পছন্দ হবে?''
''পছন্দ হয়েছে বলেই তো, এখানে এলাম।'' হাত ধরে কাছে টানতে টানতে লোকটি বলল।
হাত ছাড়াবার জন্য মেয়েটি মোচড় দিতে গিয়ে দেখল তার শরীরে বিন্দুমাত্রও শক্তি অবশিষ্ট নেই।
''আমি কিন্তু বেশি দিতে পারব না। ঘরটার জন্যই দশটাকা বেরিয়ে গেল।''
মেয়েটি বলল, ''আমাকে পছন্দ হয়েছে আপনার?''
''বললাম তো।''
অতঃপর মেয়েটির মনের মধ্যে কোনো এক স্থান থেকে গভীর সুর উৎপন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। সে কোনোরূপ আপত্তি করল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন