চোরা ঢেউ

মতি নন্দী

মেজ—জেঠিমারা উঠে যাচ্ছে বস্তিতে। আটমাসের ভাড়া বাকি পড়েছিল। বাড়িওলা লোক ভালো তাই আর কোর্টঘর করতে হয়নি। মেজ—জেঠিমা সে—কথা স্বীকার করে চোখের জল মুছেছিলেন। ভানুদি, অক্ষয়কাকী, বুল্টা, রাঙাবৌদি আর তার প্রথম বাচ্ছাটা, এমনকি ফেলার মা'র পর্যন্ত কথা চুপ। আজ এগারো বচ্ছর পরে মেজ—জেঠিমা এদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, আর এ পাড়ায় ফিরবেন না।

দু'টো ঠেলাগাড়িতে রংচটা তোবড়ানো ট্রাঙ্ক, ছেঁড়া তোশক, তক্তাপোশ, পুরানো জুতো আর ঘুঁটে সামনে রেখে মেজ—জেঠিমার রিকশাটা কর্পোরেশনের জলমিস্ত্রিদের গর্ত—বোজানো গলিটায় টালমাটাল হতে হতে হুশ করে বেরিয়ে গেল বড় রাস্তার স্রোতে। যতক্ষণ দেখা গেল, সবাই চুপ। তারপরই যেন বদ্ধ ডোবার থসথসে পাঁকে নদর গদর করতে করতে কতকগুলো পাতিহাঁস নেমে পড়ল। তাদের ঠোঁটের খোঁচায় অনেক কালের জমা বাতাস উঠে এল কাদার তল থেকে।

''এই একটা মানুষ ছিল গা। যদ্দিন ছিল হাসিতে—খুশিতে কেমন ভরিয়ে রাখত।''

গামছাটা বিড়ের মতো পাকিয়ে মাথায় রাখতে রাখতে রাস্তায় দাঁড়িয়েই নিজের মনে বলল ভানুদি।

সদ্য চাপানো ভাজাটা উনুন থেকে নামিয়ে মেয়েমুখী রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। এখান থেকে রাস্তার লোকের সঙ্গে কথা বলা যায়।

''শুধু হাসিখুশি! মানুষটা কী রকম নরম—সরম ছিল তা বল! আটবিয়েনি মেয়েমানুষের একদিনের তরেও দেখলুম না কাপড়—চোপড় এধার—ওধার হয়েছে।''

''তাই না তাই। তবু কপাল দ্যাখ, বুড়ো বয়সে এ কী দুর্গতি ছিল বল দিকিন। অমন ডাঁটো ছেলেটা দু'দিনের জ্বরে ধড়ফড়িয়ে ম'লো, চিকিচ্ছেটুকুও কত্তে পারল না। কত্তার চাকরি গেল, তবু মুখের হাসিটি মোছেনি। আবার বস্তিতে ছোটলোকদের মাঝে বাস কত্তে গেল তবু হাসিটি লেগেই আছে।''

চোখ মুছল ভানুদি। হাঁপিয়েও পড়েছে, কেন না গলা চড়িয়ে অতক্ষণ ধরে কথা বলতে আজকাল বুকে টান ধরে।

''কার কথা বলচ গা, মেজবৌয়ের?'' দোতলায় গরাদভাঙা জানলা দিয়ে খুদীকেলোর মা'র কাঁচাপাকা মাথাটা বেরিয়ে এল।

''তবে আর কার।''

''আহা, ছেলেটা কী দুরন্ত—দুষ্টুই না ছিল। আবার পড়াশুনোতেও তেমনি মাথা। কেলোর যখন পা ভাঙল, রোজ আমায় হাসপাতালে নিয়ে যেত।''

''সেতো যাবেই, অমন মা যার। এই তো, রাঙাবৌয়ের আঁতুড়ে কী করাটাই না করল।''

ভানুদি তার ছোট্ট র্যাশনব্যাগটা পাট করে বগলে রাখল। তখন থেকে জানলায় ঠায় দাঁড়িয়েছিল বুল্টা। চোখাচোখি হতেই ভানুদি বলল, ''কটা বাজল, এগারোটা বেজে গেছে?''

''কববে।'

চোখ বুজে নিচের ঠোঁট ওলটাল বুল্টা। ভানুদি চলে যাচ্ছে, তাই গলা তুলেই মিনতি করল : ''একবার গৌরীকে ডেকে দিয়ো না, ওদের বাড়ি হয়েই তো যাবে।''

''আহা, মেয়ের আবদার দেখ। আমি বুড়ো মাগি এবাড়ি—সেবাড়ি করে বেড়াব, আর তোরা ছুঁড়িরা—চলাফেরায় ন'মাস পোয়াতির আলিস্যি।''

''ধ্যাত, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি যা—তা যে বল।'' ভানুদি হেসে চলে যাচ্ছিল, বুল্টা আবার ডাকল।

'হারছড়াটা আছে তো, না বিক্রি হয়ে গেছে? আজকেও একবার দেখো ভানুদি।''

''জ্বালালে বাপু, রোজ রোজ এক কথা। কিনবি তো পয়সা নিয়ে চল।''

''বলেছি তো, পয়সা জমলেই কিনব।''

''আজ বাপু মন—টন ভালো নেই, সোজা রথতলা—ঘাটে গিয়ে ডুব দিয়ে আসব। সন্ধেবেলা মদনমোহনতলাটা ঘুরে আসব তখন পারি তো দেখব।''

এগিয়ে গেল ভানুদি। কাত হয়ে এক চোখে গরাদের ফাঁক দিয়ে যতদূর দেখা যায়, তাকে দেখল বুল্টা। আবার দাঁড়িয়ে পড়েছে সে ঢোলেদের বাড়ির জানলায়।

''হ্যাঁ যাই, ডুবটা দিয়ে আসিগে। কচ্ছিলে কী?''

ঢোলেদের ছোট বৌ আধখানা নকশা—তোলা চটের টুকরোটা তুলে দেখাল। এখনো নতুন, তাই বেশি কথা বলে না।

''হ্যাঁ, সেলাই বোনা কী না জানত। মেয়েদের ভিড় তো হরদম লেগেই ছিল। তোমার ননদকে যখন দেখতে এল, ওই তো সাজিয়ে দিয়েছিল। রতন—ছাব্বিশ নম্বর বাড়ির রত্না গো—সূতিকায় ভুগে ভুগে কাঠিসার হয়েছে এখন, ওর বাসরে গান পর্যন্ত গেয়েছে!''

''গানও জানতেন!''

একটু জোরেই অবাক হল নতুনবৌ। অল্প হেসে সেটুকু উপভোগ করে ভানুদি চলতে শুরু করল।

ফেলার মা শীলেদের বাড়ি কাজ সেরে সেখানেই স্নান করে ফিরছিল।

''এখন গিয়ে উনুনে আগুন দেব। মেয়েটা একজ্বরি হয়ে পড়ে আছে আজ এগারো দিন। ওই দুটো ভাতে—ভাত ফুটিয়ে নেব।''

ফেলার মা ব্যস্ততা দেখালেও ভানুদির থলথলে দেহটা ডোবায়—ভাসা কলসির মতো মন্থর হয়ে থেমে পড়ল।

''তোকে পই পই করে যেতে বলেছে, যাস একদিন।''

''আ পোড়া কপাল, যাব যে তার সময় কোথা!''

''তবে! তখন অত ঠ্যাকার করে বললি কেন, যাব।''

ঝাপটা—দেওয়া বাতাসের মতো ভানুদির কথাগুলো। তারই ধাক্কায় খানিকটা এগিয়ে গেল সে ফেলার মা'কে ছাড়িয়ে।

''ভালোয়—মন্দয় সুখে—দুখে মানুষটা আমাদের সঙ্গে অ্যাদ্দিন কাটাল। আজ নয় চলে গেছে, তাই বলে সম্বন্ধটুকুও আর রইবে না?''

কথাগুলো বলার সময় পিছনে আর তাকায়নি ভানুদি। অস্বস্তিবোধ করতে লাগল ফেলার মা। ছেলেটার জ্বর হতে মেজজেঠি একবাটি বার্লি আর একটুকরো মিছরি দিয়েছিল। জিনিসটা সামান্য, কিন্তু অন্তঃকরণটা কতখানি।

''তোরা বস্তিতে থাকিস ঠিক চিনে বার করতে পারবি, আমরা কি আর তা পারব।''

ভানুদি থামল। ডানদিকের পথটা ফেলার মা'র বস্তির দিকে গেছে।

ইতস্তত করে শেষকালে বলে ফেলল ফেলার মা, 'চিরটাকাল কোঠাবাড়িতে কাটিয়ে আজ নয় অবস্থার পাকে পড়ে খোলার ঘরে উঠেছে, তাই বলে একদিনেই তো আর বস্তির লোকের মতো ছোট হয়ে যাচ্ছে না। এখন যদি সেখানে যাই লজ্জা পাবে, যাক না আর কিছুদিন।''

মাঝে মাঝে ফেলার মা দামি কথা বলে। পাড়ার যে কেউ, ইন্তক ভানুদি পর্যন্ত তখন অবাক হয়ে যায়। ভাবনা ধরার মতোই কথা। হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে শুরু করল ভানুদি। মানুষ যখন ছোট হয়ে যায় তখন লজ্জা পায়, মানীদের দেখলে নিজেদের হীন মন করে। মেজবৌকে আরো সময় দিতে হবে কোঠাবাড়ি থেকে বস্তিতে নেমে যাবার ধাক্কাটুকু সামলাতে। ফেলার মা'র বুদ্ধি আছে। আর থাকবে নাই বা কেন, গতর খাটিয়ে ওকে ছেলেপুলে আর গেঁজেল স্বামীর সংসার চালাতে হয়।

ভাবনা তো নয়, যেন ঢেউ। ধাক্কায় ধাক্কায় ওপরে—ভাসা শ্যাওলার মতো পুরানো বিচারবুদ্ধিকে কিনারে সরিয়ে পরিষ্কার করে দেয় মাথাটা। আর তখনই যত আনকোরা ধরনধারণ সেখানে ছায়া ফেলে। শ্যাওলাগুলো পচে শুকিয়ে যায় এক সময়।

মাথাটা গুলিয়ে ওঠে ভানুদির। রোদের তাত বাড়ছে, পিচের রাস্তায় আর পা রাখা যায় না। রাস্তার ধারে ছায়া দেখে সরে গেল।

দু'টি মাত্র ঘর। একদিনেই চুনকাম থেকে ধোয়ামোছা পর্যন্ত সেরে ফিটফাট তৈরি হয়ে গেল। পরদিন লরি এসে দাঁড়াল বড় রাস্তার মোড়ে। কুলির মাথায় জিনিসগুলো পৌঁছতে শুরু করল। রান্নাঘর থেকে মেয়েমুখী, ভাঙা জানলা থেকে মাথা বের করে খুদীকেলোর মা, বুল্টা, ঢোলেদের নতুনবৌ—সকলেই দেখল।

নতুন ঝকঝকে সিঙ্গল বেডের দুখানা খাট। পালিশের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে মেয়েমুখীর মনে পড়ল তার বিয়ের দানসামগ্রীর কথা। তিন ছেলেকে নিয়ে সে আজও সেই খাটে শোয়, কিন্তু তখন কী ফাঁকাফাঁকাই না লাগত। বড়ো বড়ো দুটো পাশ বালিশেও ভর্তি হত না খাটটা। সেই বড় বালিশদুটো অনেকগুলো ছানাপোনা বিইয়ে আজ নিজেরা মরে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেয়েমুখী, সে নিজেও একদিন মরে যাবে তার সাধ আহ্লাদগুলোর মতো।

আয়না—বসানো পাল্লা আকাশের দিকে রেখে আলমারিটা নিয়ে এল কুলিরা। ঝকঝকে পরিষ্কার কাচ। দুটো কুলির মাথায় কাঁপতে কাঁপতে স্বচ্ছ একটা দীঘির মতো খুদীকেলোর মা'র মুখটাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। অবাক হল গ্রামের মেয়ে খুদীকেলোর মা। একসঙ্গে আকাশ আর মুখ প্রায় চল্লিশ বছর আগে শেষ দেখেছে সে। বিয়ের পরই কলকাতায় চলে আসে। সংসার জমিয়ে বসার মুখেই স্বামী মারা গেল। দেশে আর ফিরল না। আঁটসাট যৌবনটার উপর ভরসা রেখে পান সাজতে বসল ভদ্দরবাবুদের অফিসের ধারে। তারপর তেলেভাজার দোকান। কয়েকটা গোরু কিনে উঠিয়ে দিল দোকানটা, আর খুদীকেলোকে পুষ্যি নিল। দুধের ব্যবসা তার এখনো আছে, সেইসঙ্গে সুদী কারবারও ফেঁদেছে। এ পাড়ায় ব্যবসাটা চলে ভালো।

এইমাত্র চল্লিশ বছর আগেকার গ্রামটাকে মনে পড়ল তার। বাঁশবনের দমকা বাতাস শুকনো পাতা উড়িয়ে এনে ফেলত পুকুরের জলে। জলটা কাঁপত। বুকের মধ্যে কেমন—যেন একটা কাঁপুনি লাগল খুদীকেলোর মা'র। বয়স অনেক হল। মাঝে মাঝে বুকে একটা ফিক ব্যথা ধরে। এবার খুদীকেলোর বিয়ে দিতে হবে। গ্রামের মেয়েরা অল্প বয়সেই বেশ শক্ত সমর্থ হয়। বিয়ের জন্যে টাকার দরকার। তা সে মন্দ জমায়নি। বন্ধক রেখে অনেকেই আর সোনাদানা ছাড়াতে পারেনি। মেজ বৌয়ের নোয়াটা এখনো কাঠের সিন্দুকের কোনায় পড়ে আছে। খুশি থাকলে সেগুলোকে নিয়ে নাড়াচাড়া করে সে।

দ্রুত মাথাটা টেনে নিতে গিয়ে ঠুকে গেল দু পাশের গরাদে। মেজ বৌয়ের জায়গায়—আসা নতুন ভাড়াটেদের আলমারিটা খুব দামি, যন্ত্রণার মধ্যে এই কথাটাই আগে মনে পড়ল খুদীকেলোর মার। বোধহয় পয়সাওলা। বিরক্তিতে মুখের ভাঁজগুলো আরো গভীর হয়ে উঠল তার।

চার মাসের বিয়ে—হওয়া নতুন বৌ জানলা থেকে পিছিয়ে এল একটু। একটা তানপুরা আর হারমোনিয়াম ঠিক তার সামনে দিয়ে কুলির মাথায় চলে গেল, এত সামনে যে হাত বাড়ালে ছোঁয়া যেত। কতদিন যে হারমোনিয়াম ছোঁয় না সে। গরাদ থেকে পিছলে পড়ল নতুন বৌয়ের আঙুলগুলো। মনে পড়ে গেল সরস্বতী পুজোর জলসায় ছেলেদের চোখের কাতরানি। গানের স্কুলের আরতির বড়দা, কী সুশ্রী ছিমছাম ঠাট্টাটাই না করত। আর একটু আস্কারা দিলে আরতির বৌদি হয়ে যেতে পারত সে। কিন্তু কেমন যেন বাধ—বাধ লাগত। শরীর সম্পর্কে অত্যন্ত শুচিবায়ুগ্রস্ত ছিল তখন। আর এখন? ঢোলেদের নতুন বৌয়ের গলার কাছে চাপ চাপ কান্না ফুলে ওঠে। চার মাসের বৌ রাতে স্বামীকে আটকে রাখতে পারে না বলে কানাকানি শুরু হয়েছে এ বাড়ি ও বাড়ি। বিয়ের পরই বাপের বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দিয়েছে হারমোনিয়ামটা। সেটা বাজাতে এখন সংকোচ হয়, ভয় করে। বাজালেই বুঝি সবাই ছুটে আসবে, ডুগডুগির শব্দে বাঁদরনাচ দেখতে যেমন ভিড় জমে জানলায়। শুধু ঝাড়মোছ করার সময় যেটুকু ছোঁয়া যায়। তাও আর যাবে না। কোনো কাজে লাগে না, তাই খদ্দের খোঁজা হচ্ছে।

জমাট কান্নাটা কখন গলে ঝরে পড়ে গেছে। তার বদলে ঝাঁঝালো যন্ত্রণা গরাদধরা আঙুলগুলোয় পাক দিয়ে উঠল নতুন বৌয়ের। হাত বাড়ালেই যখন পাওয়া যেত, তখন কেন তানপুরার তারগুলো পটপট ছিঁড়ে দিল না কিংবা ধাক্কা দিয়ে হারমোনিয়ামটাকেও তো ফেলে দিতে পারত।

দুধরঙা রাজহাঁসের মতো ওরা দুজন ভেসে এল। বুল্টা নিষ্পলক চাউনি ছুঁড়ে দিল ওদের গায়ে। পিছলে নামল তার চোখ ধবধবে পাঞ্জাবি বেয়ে। কতই বা বয়স ছেলেটির। হ্যাঁ, লোকটি নয়, ছেলেটি। আর বৌটি নয়, মেয়েটি। যেন ভাই—বোন। বুল্টার চেয়ে বড়জোর পাঁচ বছরের বড় হয় যদি মেয়েটি। আটপৌরে সাদা শাড়িটা নতুন নয়, কিন্তু কী পরিষ্কার ভাঁজগুলো। টুকটুকে চটির সঙ্গে আলতাটুকু মিশে গেছে। কমলা—রঙের ব্লাউজ, হাতে ব্যাগটাও কমলা। হাঁটার ঢঙে পাঞ্জাবির হাতায় আছড়াচ্ছে লম্বা বেণীটা।

দু'ধারের বাড়িগুলো দেখতে দেখতে আসছে মেয়েটি। চোখাচোখি হল বুল্টার সঙ্গে, জানলার নিচে লুকিয়ে পড়ল বুল্টা। গালে বোধহয় হলুদের দাগ লেগে আছে। গালটা কাঁধে ঘষে নিল। টকটক ঘামের গন্ধ। ঘাড় নিচু করে আগাগোড়া ফ্রকটা দেখল সে। রোল্ডগোল্ডের হারটা তিন হপ্তা আগে দেখেছে দোকানের আলমারিতে। পছন্দ হয়েছিল, তাই সে পয়সা জমাতে শুরু করেছে। রোজই একবার দেখে আসতে ইচ্ছে করে, কিন্তু রাস্তার লোকগুলোর চাউনি দেখলে ভয় করে। তাছাড়া মা—ও আজকাল বকাবকি করে, এমনকি জানলার ধারে বেশিক্ষণ দাঁড়ালেও। ফ্রকটা ছিঁড়ে গেছে। ফাঁক দিয়ে কোমরের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। চিনেবাদামের দানার মতো তেলতেলা বাদামি চামড়া। মেয়েটির কমলা—ব্লাউজও বাদামি রঙের কিনারে শেষ হয়েছে। রুখু চুলে যেদিন তেল পড়ে, সেদিন বেণীটা ওর সমানই লম্বা হয়। ভানুদিটা বড় অসভ্য—অসভ্য কথা বলতে শুরু করেছে তার শরীরের গড়ন নিয়ে।

মেয়েটির সঙ্গে খুঁটিয়ে নিজেকে যাচাই করে বুল্টা। কিছুতেই সমান বলে মনে হয় না। শাড়িতে ঢাকা শরীরটা অনেক সুন্দর। তার যদি নিজের একটা শাড়ি থাকত। মার শাড়িটা সে পরে কিন্তু অল্পক্ষণের জন্যে। মাত্র দুখানা শাড়ি মা—র। তাছাড়া পরের শাড়ি পরেও সুখ নেই। ঝকঝকে ট্রাঙ্ক, চামড়ার সুটকেস, আয়না—লাগানো আলমারি—এর প্রত্যেকটার মধ্যে কতগুলো শাড়ি থাকতে পারে। সেই ভাবনার মাঝেই বুল্টার মনে পড়ল মেয়েটির বয়স, তার থেকে মাত্র চার—পাঁচ বছর বেশি। আর চার—পাঁচ বছর পরে হয়তো তার বিয়ে হবে।

ছেলেটিকে আর একবার দেখার জন্যে বুল্টা জানলায় ঘেঁষে এল। ছুটে এল গৌরী জানলার কাছে।—''এরাই, এল, না রে?''

চুপ করে থাকে বুল্টা।

''নতুন বিয়ে হয়েছে, না রে?''

বুল্টা চুপ।

''খুব আপ টু—ডেট।''

গৌরী এবার প্রশ্ন করল না। পাকাপাকি সিদ্ধান্ত।

ভারি বয়সটার জন্য ভানুদিই আগ বাড়িয়ে যায়। মেজবৌ যখন প্রথম এল, ভানুদি একেবারে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিল। বাঁহাতে ঘোমটা টেনে, হেসে পিঁড়ি এগিয়ে দিয়েছিল মেজবৌ। এবারেও ভানুদি ভাব—সাব করার মন নিয়ে এগিয়ে গেল। ওইটুকু তো মানুষ, ভাবসাব আর কী! বরং ঘরকন্নার ধরনটুকু দেখে আসবে, আর দরকার বুঝে কিছু উপদেশও দিয়ে দেবে।

কিন্তু থেমে পড়ল ভানুদি সদর দরজাতেই। দরজা জানলা সবেতেই পর্দা। ভিতর থেকে ভেসে আসা দমকা হাসিটা ভানুদির ভারি বয়সের কিনারে আছড়ে পড়ল। ভিতরে আর যাওয়া হল না।

ভানুদি ফিরে এলেও, ফেলার মা হাজাফাটা আঙুলে পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল।

এক আশ্চর্য দেশ থেকে যেন ফিরে এসেছে ফেলার মা। খুঁটিয়ে সকলেই তাকে দেখে। ওর কথাতেও আশ্চর্যের ছোঁয়া লেগেছে।

''দুবেলা পোড়া মেজে হাতের নোড়া ছিঁড়ে যাবার দাখিল। তার ওপর মানুষের শরীর, কখন কী হয়। জ্বর—জ্বারি হলে মাইনে কাটা, ট্যাঁকট্যাঁক কথা শোনানো, কত আর সহ্য হয়? এবার ট্যাঁ ফোঁ করলে সিধে বলে দেব, রইল তোমার কাজ, দশটাকায় অমন অনেক কাজ জুটবে আমার।''

''এরা বুঝি দশটাকা দেবে, মোটে তো দুটো মানুষ!''

মেয়েমুখী যতখানি অবাক হ'ল ঠিক ততখানি গলা নামিয়ে গম্ভীর সুরে ফেলার মা বলল : ''এই দেড়মাস হল বিয়ে হয়েছে। ভালো জায়গায় বাড়ি পেলেই উঠে যাবে। ভালোবাসার বিয়ে, বাপ মায়ের অমতে করেছে। বৌকে ঘরে নেবে না ছেলের বাপ, ছোট জাত কিনা। তাই আলাদা রয়েছে।''

''পোয়াতি?''

''ও মা, বললুম না, মোটে দেড়মাস বিয়ে হয়েছে!'' লহমায় রাঙাবৌকে উত্তর দিল ফেলার মা।

''ভালোবাসার বিয়ে কিনা তাই রাঙাবৌ বলল।''

চোখ বুজিয়ে থেমে থেমে বলল খুদীকেলোর মা। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির বুড়বুড়ি কেটে, আবার বলল সে, ''অবস্থা কেমন রে, পয়সা—কড়ি আছে?''

''ওই যা দেখেছ। মেয়ের বাপই সব দিয়েছে।''

''মেয়েটার গায়ে তো তেমন সোনাদানা দেখলুম না।''

চুপ করে বসে থাকা ভানুদিকে কথা বলানোর জন্যে তার দিকে তাকিয়ে বলল খুদীকেলোর মা। অথচ উত্তর দিল গৌরী।

''আজকাল আর অত গয়না পরে না কেউ। শুধু একজোড়া লিচুকাট বালা হলেই হল।''

গৌরী কথাটা শেষ করল বুল্টার দিকে তাকিয়ে। ফিসফিসিয়ে বুল্টা জিজ্ঞাসা করল, ''আজকে কী খোঁপা বেঁধেছিল রে?''

''টেলিফোন—খোঁপা। একদিন তোকে করে দেব।''

''আজকেই দে না।''

বুল্টা আর গৌরী উঠে গেল। ফেলার মা—ও উঠল। কলে জল থাকতেই এখন থেকে তিন বাড়ির কাজ তাকে সারতে হবে।

''কেমন—কেমন যেন, কারো সঙ্গে মেশে না। মেজজেঠি কিন্তু প্রত্যেকের বাড়ি যেত।''

হাঁটুর উপর হাত চেপে উঠে দাঁড়াল মেয়েমুখী। খুদীকেলোর মা—ও উঠল।

''এরা আলাদা জাতের মানুষ গো, দেখছ না কেমন চালচলন, ঠ্যাকার—ঠোকর। মিশতে গেলে ওদের মতো হয়ে মিশতে হবে। দরকার কী বাপু।''

''এইটুকু তো গলি। ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে কেউ চলতে পারে নাকি। ওদের ঠিকই আসতে হবে আমাদের কাছে।''

ভানুদির কথার উত্তর দিয়ে আর কথা বাড়াল না মেয়েমুখী বা খুদীকেলোর মা। চিনেবাদামওয়ালা হাঁক দিয়ে গেছে, তার মানে বেলা গড়াচ্ছে। ওরা দুজন চলে গেল।

ভাবনা তো নয়, যেন ঢেউ। বসে রইল ভানুদি, ঘরটা তারই।

পরদিন সন্ধ্যাটা পুরুষছোঁয়া কিশোরীর মতো শিউরে উঠল। ডোবার জলে দুজোড়া রাজহাঁস পাখার ঝাপটে চারপাশের নোনাধরা দেয়ালে অবাকের পলেস্তরা ধরাল।

সকলেই ভেবেছিল রাঙাবৌয়ের রেডিওতে গান হচ্ছে। ভুল ভাঙল, যখন চিকন আর ভরাট গলায় গান থামিয়ে হেসে উঠল ওরা। পুরুষ আর মেয়ে এক সঙ্গে গলা ছেড়ে গান গাইছে। প্রেমের গান! এ গলিতে মাঝরাতে সিনেমাফেরত দু একটা গানের কলি হল্লা তুলে মিলিয়ে যায়। তাছাড়া এ গলির জীবন স্রোতশূন্য অচকিত।

গৌরী ছুটে এল বুল্টাদের জানলায়।

''রবীন্দ্রসঙ্গীত!''

''তুই জানিস? শিখিয়ে দিবি?''

অন্ধকার ঘরে হারমোনিয়ামটায় আঙুল বোলায় নতুন বৌ। খসখস শব্দ করে ওঠে রিডগুলো। রাত্রে হঠাৎ আলো জ্বাললে আরশোলারা যেমন শব্দ তুলে পালায়। একটা ঝাঁঝালো যন্ত্রণায় সবকটা আঙুল দিয়ে আঁকড়ে ধরে রিডগুলো। বোবা হারমোনিয়ামটার গলা টিপে ধরতে ইচ্ছে করে নতুন বৌয়ের।

একগোছা রজনীগন্ধার ডাঁটা হাতে ফিরছিল ফেলার মা। মেয়েমুখী ডেকে জিজ্ঞাসা করল— ''পেলে কোথায় গে?''

চোখের ইশারায় দেখিয়ে দিল ফেলার মা কোথা থেকে পেয়েছে। তারপর বলল : ''ফেলে দিচ্ছিল। বললুম, এখনো তো তাজা আছে। তা বলল, না তেমন সাদা আর নেই। ধবধবে সাদা না হলে নাকি ঘরে রাখার মানেই হয় না।''

ফুলগুলো মেয়েমুখীর মুখের কাছে তুলে ধরল ফেলার মা। একটা বাসি গন্ধ এখনো পাওয়া যায়, ফুলশয্যার পরের দিনও ঘরে যেমন গন্ধ থাকে।

''রোজই ফুল কিনে আনে, না?''

''তা প্রায় রোজই আনে।''

চোখ মটকে ফেলার মা আবার বলল,—''ভালোবাসে খুব কিনা।''

মেয়েমুখীও হাসে। অমন ভালোবাসাবাসি তাদেরও ছিল।

সেদিনই লক্ষ্মীপুজোর শেষে ঠাকুরের পট থেকে বেলফুলের মালাগাছটা তুলে নিল মেয়েমুখী। বড়ো ছেলেটির বুদ্ধি পাকতে শুরু করেছে। সবেতেই ওর কৌতূহল। মালাটা সে বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখল।

সকালে ভাত খায়নি বুল্টা, রাতেও না। মা সাধাসাধি করে হার মেনেছে। তবু বুল্টার একরোখ। 'বাবা শুনে শুকনো হেসে বলেছে : ''হবে, হবে, এই তো মোটে ষোলোয় পড়ল, এর মধ্যে শাড়ি পরবার দরকার কী।''

''চোখ দিয়ে মেয়েকে দেখে তারপর বলো।''

মার দাঁত কিড়মিড়ানি শুনে চুপ করে গেল বাবা। রাত্রে ঘুম আসেনি বুল্টার। একখানাই ঘর। যত চাপাই হোক সে ঠিক শুনতে পায় বাবার কথা।

''দেখেই বলছি। মেয়ে তো আর রাস্তায় বেরোচ্ছে না। ঘরে ফ্রক পরে থাকবে তাতে লজ্জাটা কি?''

''লজ্জা ওর না তোমার? একখানা শাড়ি কিনে দিতে পার না?''

''দাম জান শাড়ির?''

''তা বলে ন্যাংটো থাকবে?''

'শাড়ি পরালে ও মেয়েকে আর ঘরে রাখতে পারবে? পাত্তর খোঁজার জন্য তারপর তো ঘ্যান ঘ্যান করবে।''

দু—কান চেপে বালিশে নাক ঘষতে শুরু করে বুল্টা, বিয়ের কথায় এই মাঝরাতে তার মুখ লুকোতে ইচ্ছে করছে।

''কত টাকা পাবে হারমোনিয়মটা বিক্রি করে?''

গড়িয়ে স্বামীর বুকের কাছে সরে এল নতুন বৌ। আজ মদ খায়নি। নতুন বৌয়ের খুশি থাকার কথা। স্বামীর চিবুক টেনে আবার জিজ্ঞাসা করল সে।

''গোটা পঞ্চাশ তো পাব।''

''আমি দেব।''

বিস্ময়টা বুঝতে পারে নতুন বৌ, স্বামীর পাশ ফেরার ধরন দেখে।

''বাপের বাড়ি থেকে দিয়েছিল বুঝি? কই আমায় তো বলনি।''

''তুমিই বুঝি কোনোদিন জানতে চেয়েছ আমার কথা।'' স্বামীর বুকে দেহটাকে হিঁচড়িয়ে টেনে তুলল নতুন বৌ। যেমন করেই হোক হারমোনিয়মটা তাকে রাখতেই হবে।

একটু গাঁইগুঁই করল খুদীকেলো, তারপরই চুপ করে গেল ধমক খেয়ে।

''এই ফাল্গুনে বিয়ে তোর দেবই। মামাকে চিঠি দিয়েছি। ওদেরই গাঁয়ের মেয়ে, বেশ ডাগরডোগর, এই তেরোয় পড়েছে। আর আমি তোকে রেঁধে খাওয়াতে পারব না।''

''হোটেলে খাব।''

''হ্যাঁ, পয়সা খরচ করে রাতটাও বাইরে কাটিয়ে আসবি। এসব মতলব করেচিস কি ঝেঁটিয়ে ধুধ্বুড়ি ছুটিয়ে দেব।''

খুদীকেলোর মার কথাগুলো শক্ত কব্জিটার মতোই শক্ত—শক্ত। শুধু বৌ নয়, দুশো টাকা পণও আসবে। দিনকাল খারাপ পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, মানুষজনের চাকরি যাচ্ছে, ধুমসো ছেলেগুলো ঘরে বসে। তার কাঠের সিন্দুকও ভরে উঠছে। তবু দিনকাল খারাপ আসছে। গলিতে নতুন মানুষ আসছে, সঙ্গে আসে নতুন ঢং—ঢাং। গলির মানুষগুলোতেই নতুন রং ধরেছে। বুল্টার মা বলে রেখেছিল, বুল্টার বিয়ের সময় শ পাঁচেক টাকা ধার নেবে। এখন আবার শুনছে উল্টোকথা। দেখতে যখন ভালোই তখন আর টাকা খরচ করে মেয়ের বিয়ে কেন। যদি কোনো ছেলের চোখে ধরে, সেধে এসে ঘরে তুলে নিয়ে যাবে। ভালোবাসার বিয়ে দেবে মেয়ের, বুল্টার মা। রাঙাবৌ ব্যাঙ্কে টাকা জমাবে এবার থেকে। 'ওদের' টাকা নাকি ব্যাঙ্কেই থাকে। শুনে অবাক হয়েছিল সকলেই। রাঙাবৌ এখন ইংরিজি—সই মকসো করা শুরু করেছে। গল্পকথার মতো শোনায়। মেয়েছেলে সই দেবে আর টাকা উঠে আসবে। এরপর সকলেই টাকা জমাতে শুরু করুক। ভাবতেই মাথা গরম হয়ে ওঠে খুদীকেলোর মা'র। আপদ যত উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। যেখানে যাবার সেখানেই যাক না। এ পোড়াগলিকে চানকে কী গুষ্টির উদ্ধার হবে!

আপদরা নাকি চলে যাবে, খবরটা দিল ফেলার মা। বাসন কেনার জন্যে রাখা পুরোনো কাপড়গুলোকে কাটছিল মেয়েমুখী। পর্দা হবে। কাঁচি না থামিয়েই সে বলল : ''কেন গো, বেশ তো আছে দুটিতে জোড়া—পায়রার মতো। আবার বাসা—বদল কেন!''

''ছেলের বাপের মন গলেছে। ছেলে—বৌকে বাড়ি নিয়ে যাবে। পেল্লায় বাড়ি নাকি, দুখানা মোটর!''

খুদীকলোর মা'ও খবরটা শুনল। ফেলার মা'র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে কিছুক্ষণ। বোঝা গেল না খুশি হয়েছে কি না। একটু আগেই সে হিসেব করতে শুরু করেছিল। নতুন বৌ কোনোদিনই তার চুরি—গাছটা আর ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবে না ওটাকে বিক্রি করলে পঞ্চাশটাকার কত বেশি পাওয়া যাবে।

বুল্টার কাছ থেকে শুনে গৌরী বলল, ''ফ্যাশান দেখাতেই এসেছিল। যা ছিল সব ফুরিয়ে গেছে, তাই কেটে পড়ছে। শ্বশুরবাড়ি যাওয়া না আর কিছু।''

নতুন ব্রেসিয়ারের ইলাস্টিক স্ট্র্যাপটা অস্বস্তি দিচ্ছে বুল্টাকে। স্ট্র্যাপ টেনে আলগা করতে করতে সায় দিল সে—''তাই না তাই।''

আসার মতো ওদের যাওয়াটাও। এক জোড়া রাজহাঁস ডোবার জল ঘুলিয়ে, পানা কেটে, সাঁতরে ফিরে গেল যেন। ওদের ধবধবে পাখনায় একটুও ময়লা ধরেনি।

কুলির মাথায় একে একে জিনিসগুলো লরিতে পৌঁছল। আয়না—বসানো আলমারিটা তেমনি ভাবেই আকাশ ভাসিয়ে চলে গেল খুদীকেলোর মা'র জানলার তলা দিয়ে। জানলা বন্ধ। চল্লিশ বছর পরে সে দেশে গেছে।

সিঙ্গল খাট দুটো পাশাপাশি গেল। নতুন পর্দা টাঙানোয় ব্যস্ত ছিল মেয়েমুখী, তাই নজরে পড়ল না।

অনেকদিন পরে গান গাইছে নতুন বৌ। চেষ্টা করেও গলায় সুর রাখতে পারছে না। দম ফুরিয়ে যাচ্ছে। পেটে বাচ্ছা এসেছে তার।

গৌরীদের ছাদে উঠেছে বুল্টা অনেকদিন পরে।

''ছেলেটা কে রে?''

''ও তো টুনু, বিশেকাকার ছেলে। এবার কলেজে ঢুকেছে।''

গৌরীর দিকে ফিরে মিষ্টি হেসে বুল্টা বলল, ''কেমন করে তাকাচ্ছে দ্যাখ।''

মিষ্টি হাসিটা মুখে ধরে রেখেই বুল্টা আবার টুনুর দিকে তাকাল।

ফেলার মাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল ভানুদি, ''তোকে যেতে বলেনি ওরা?''

''বলেছে।''

ব্যস্ত গলায় জবাব দিল ফেলার মা। শীলগিন্নি দেরি করে গেলে মাইনে কাটার ভয় দেখিয়েছে।

''তবে যাচ্ছে কে আর বলো? বড়লোক, রকম—সকম আলাদা? মেজবৌয়ের কাছে যাইনি, গেলে হয়তো লজ্জা পাবে। এরাও যদি আমায় দেখে লজ্জা পায়।''

হনহনিয়ে চলে গেল ফেলার মা। ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে ঘুলিয়ে দিল ভানুদির মাথাটা। ফেলার মা বড় দামি কথা বলে। অবস্থা বদলালে আগের কথা ভেবে মানুষ লজ্জা পায়। লজ্জা পায় বলেই না তারা মানুষ। এ গলির অবস্থা তো বদলায়নি। ভানুদি মনে মনেই চমকে উঠে ভাবতে শুরু করে। তাহলে এ গলিতে কি মানুষ থাকে না!

ঘর খালি থাকেনি! ঠেলাগাড়িতে তেল—চিটচিটে বালিশ, কলাইচটা থালা আর কয়লার থলি জড়াজড়ি করে এসে পৌঁছল।

গামছাটা বিড়ের মতো পাকিয়ে মাথায় রাখতে রাখতে ভানুদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আপন মনে বলল: ''কী নোংরা বাপু। আগের ওরা কী সাজানা পরিপাটিই না ছিল!''

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%