মতি নন্দী
দুলালের তিনকুলে কেউ না থাকায় এতদিন বিয়ে হয়নি। দর্জির দোকানে সেলাইয়ের কাজ করে পায় মাসে আশিটি টাকা। বায়ান্ন—তিপ্পান্ন বয়সে পাড়ার লোকেরাই উদ্যোগ করে কাছাকাছি এক গ্রামের একটি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিল। গিরিবালার বয়স সতেরো। তারও তিনকুলে কেউ নেই। ওকে যত্নে রাখতে দুলাল আপ্রাণ চেষ্টা করে।
কথায় কথায় দুলাল একবার বলেছিল, তোমাকে কলকাতা দেখাব। একদিন সে পাঁচটা টাকা উপরি পেয়ে যেতে একবেলার ছুটি নিয়ে বেরোল গিরিকে কলকাতা দেখাতে। পরনে ধোপাবাড়ির কাচানো ধুতি—শার্ট, দাড়ি কামিয়ে জুতোয় কালি দিয়েছে। চুলে পাতা কেটে টাকের কিছুটা ঢেকেছে, দুপুরে সন্না দিয়ে গোটা কয়েক পাকা গোঁপও তুলেছে। মোক্তার গিন্নি পুরনো সিল্কের শাড়ি দিয়েছিল বিয়েতে, গিরি সেইটা আর দুলালের কিনে দেওয়া জরি লাগানো সবুজ চটি আর প্লাস্টিকের চুড়ি পরেছে। টেনে চুল বেঁধে মস্ত খোঁপা করে লাল রিবন দিয়েছে, পায়ে আলতা। গিরিবালা বেরোবার আগে অনেকক্ষণ মুখে সাবান ঘষেছে।
জুতো পরে হাঁটতে দুলালের কষ্ট হচ্ছে। পাড়ার ছেলেদের মুচকি হাসিতে সে লজ্জা পেল। তার ভয় করল গিরিবালা কলকাতায় না হারিয়ে যায়। হেলথ সেন্টারের নার্স মেয়েটি কোয়ার্টারের জানালায় দাঁড়িয়েছিল, গিরিকে ডেকে ভুরুতে লাগা পাউডার মুছিয়ে, টিপ পরিয়ে, গাল টিপে দিয়ে বলল, ''বউ খুব সুন্দর।'' নার্স কলকাতার মেয়ে। এর পর বুক চিতিয়ে জুতোর খটখট শব্দ করে দুলাল গিরিবালার আগে আগে হাঁটতে লাগল।
ট্রেনে ভিড় নেই। কিন্তু জানালার ধারের জায়গাগুলো ভর্তি। গিরি জানালার ধারে বসতে পেলে খুশি হবে এই ভেবে দুলাল একজনকে বলল, ''এনার শরীরটা খারাপ, যদি এ ধারটায় বসেন বড় উবগার হয়।''
লোকটি কাগজ পড়ছিল। গিরিকে এক পলক দেখে জায়গা ছেড়ে দিল। গিরির চোখের ভাষা পড়ে দুলালের মনে হল যেন বলছে, বাব্বাঃ কী চালাক তুমি! দুলাল ঠিক করল আজ সে বিড়ি খাবে না।
হাওড়া স্টেশনে নেমেই শক্ত মুঠোয় সে গিরির হাত চেপে ধরল। বড় খারাপ জায়গা। গিরিকে প্রায় টানতে টানতে স্টেশনের বাইরে এল। হাওড়া ব্রিজ দেখেই গিরির চোখ আর সরে না। অস্ফুটে মুখে শব্দ করল, ইসস। বিদেশিকে নিজের সাম্রাজ্য দেখাবার ভঙ্গিতে দুলাল আঙুল দিয়ে গঙ্গার ওপারে উঁচু একটা বাড়ি দেখিয়ে বলল, ''ওটা বিশতলা। আমি একবার উপরতলায় উঠেছিলুম।''
দুলাল মিথ্যা বলল। সে বাড়িটার ধারে—কাছেও যায়নি। কিন্তু উঁচু উঁচু জিনিস দেখে গিরির চোখে মুখে যে ভাব ফুটছে, তাতে তার নিজেরও বড় হতে খুব সাধ হচ্ছে। কোন দিকে যে তাকাবে গিরি তা স্থির করতে না পেরে এধার—ওধার দেখছিল। এখন সে দুলালের মুখের দিকেই তাকাল। তাতে দুলালের নিজেকে কয়েক গুণ উঁচু বলে বোধ হল। ভারিক্কি চালে সে বলল, ''এই সব বাসগুলো দোতলা। আমরা উপরতলাতেই বসব। ফেরার সময় তখন আঁধার নেবে যাবে, পোলে আলো জ্বলবে, আমরা হেঁটে আসব পোলটার উপর দিয়ে। দেখবে কেমন অদ্ভুত লাগবে।''
ঘাটে নেমে গিরি গঙ্গাজল মাথায় স্পর্শ করে জোড় হাতে প্রণাম করল। দেখাদেখি দুলালও করল। গিরি বলল, ''একটা ঘটি আনলে হত।''
একথা শুনে দুলালের খুব মজা লাগল। বলল, ''তুমি কি ঘটি হাতে কলকাতা ঘুরে বেড়াতে? আমি একদিন এসে এক ঘড়া গঙ্গাজল নিয়ে যাবখন।''
ওরা বাসের দোতলায় উঠে বসল। ব্রিজের উপর দিয়ে যাবার সময় বাতাসে গিরির ঘোমটা খসে যাচ্ছিল, হাত দিয়ে চেপে ধরে সে বাইরে তাকিয়ে হাসতে লাগল। দুলাল তাকে এটা—সেটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করল। বাস অফিসপাড়া ডালহৌসিতে পৌঁছনোমাত্রই ভীষণ ভিড় হয়ে গেল। ধর্মতলায় নামবার সময় দুলাল ফাঁপরে পড়ল। গিরিকে পিছনে রেখে নামতে তার ভরসা হল না, পাজি কেউ এই সুযোগে গায়ে হাত দেয় যদি! এগোবার জন্য দুলাল ঠেলা দিল। গিরি কোথাও কোনো পথ না দেখে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে। পিছনের লোকেরা তাড়া দিচ্ছে। বিরক্ত হয়ে নানাকথা বলতে শুরু করেছে। কয়েকজন বেঁকেচুরে বেরোবার একটা জায়গা করে দিল। লজ্জায় প্রায় চোখ বন্ধ করে গিরি ঠেলেঠুলে সিঁড়ি দিয়ে নামল। নিচে আরও ঠাসাঠাসি। গিরি কোনো দৃকপাত না করে সামনের লোকদের ধাক্কা দিয়ে, একেবারে রাস্তায় নেমে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে বাসটা ছেড়ে দিল।
খিলের মতো দুটো হাত দুলালের সামনে হঠাৎ পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। বাস ছেড়ে দিতেই সে ''গিরি, গিরি'' বলে চেঁচিয়ে ওঠে, সামনের লোককে ঠেলে নামতে যাচ্ছে তখন একজন ওর কলার ধরে আটকে বলল, ''অ্যাকসিডেন্ট হবে যে মশায়।'' বাস জোরে চলতে শুরু করেছে। দুলাল শুধু, ''ও যে একা রয়ে গেল।'' বলে ঠকঠক করে কেঁপে উঠল।
বাসটা পরের স্টপে থামতেই দুলালকে ওরা ঠেলে নামিয়ে দিল। সে ছুটতে শুরু করল। কিছুটা গিয়ে থমকে দাঁড়াল। গিজগিজে ভিড়। কোথায় যে গিরি নেমেছে বুঝতে পারছে না। হাঁটতে হাঁটতে দূর থেকে দেখল গিরি এই দিকেই মুখ করে আঁচল চেপে দাঁড়িয়ে। দুলাল কাছে এসে দাঁড়াতেই সে প্রাণপণে ফোঁপানি চেপে শুধু তাকিয়ে রইল। দুলাল হাসবার চেষ্টা করে বলল, ''ভয় কি! এখানে হারিয়ে যাওয়া সোজা ব্যাপার নাকি?''
হাঁটতে গিয়ে গিরি বলল, তার এক পাটি চটি বাসেই রয়ে গেছে। ফাঁপরে পড়ল দুলাল। শেষে ভাবল, আর এক পাটি কিনে নিলেই তো হবে। চটিটা যত্নে পকেটে রাখার সময় মনে হল গিরির পা কী ছোট্ট!
ওরা এ রাস্তা সে রাস্তা দিয়ে অনেক ঘুরল। গিরি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও একটু জিরোনো দরকার। দুলালের মনে পড়ল, আর একটু এগিয়ে বাঁদিকের ট্রাম রাস্তায় রাইমোহনদার চায়ের দোকান, সেখানে বসে জিরোনো যায়। কিন্তু বছর পাঁচেক অগে রাইদার কাছ থেকে দুটো টাকা ধার নিয়ে সে আর এমুখো হয়নি। সেকথা যদি ওর মনে থাকে তাহলে বড় লজ্জায় পড়তে হবে। পকেটে করকরে পাঁচটাকার একটা নোট আর কিছু খুচরো রয়েছে, এখুনি শোধ করে দিতে পারে বটে, কিন্তু এই পাঁচবছর শোধ না করায় হয়তো চোর—জোচ্চেচার ভেবে বসে আছে। তারপর দুলাল ভাবল, রাইদা দিলদরিয়া মানুষ, দু'টাকার কথা কি মনে করে রেখেছে। তাছাড়া গিরিকে সঙ্গে দেখলে এ কথা তুলবেই না বরং চপ—কাটলেট খাইয়ে দেবে।
''কখনো কাটলেট খেয়েছো?''
গিরিকে মাথা নাড়তে দেখে দুলাল খুশি হল। তাহলে কলকাতা আসা সার্থক হয়েছে।
''চলো তোমাকে খাওয়াব।''
এই বলে সে গিরিকে নিয়ে কিছুটা হেঁটে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে হাজির হল। দরজার পাশে ঘণ্টা আর মৌরীর প্লেট রাখা টেবলটায় রাইদার জায়গায় এক ফিটফাট ছোকরা বসে। দেখে দুলাল দমে গেল। ব্যাপারটা কি, দোকান কি হাত—বদল হয়েছে? দুলাল জিজ্ঞাসা করবে কি না ইতস্তত করছিল, তখন দোকান থেকে তোয়ালে ঘাড়ে একটা লোক বেরিয়ে এসে বলল, ''ভেতরে কেবিন খালি আছে, আসুন না।''
দুলাল তাকে বলল, ''রাইদাকে দেখছি না! কোথায়?''
''বাবু তো অনেক দিন থেকেই আর বসে না, ওনার ছেলে বসে। তবে রোজ সন্ধেবেলা একবার করে আসে।''
দুলাল বুঝল, রাইদা এখন ছেলেকে ব্যবসা শেখাচ্ছে। তবে ঘাগু লোক তো, ঠিক একবার করে এসে খোঁজ নিয়ে যায়।
ফিটফাট ছোকরাটির কাছে একগাল হেসে দুলাল দাঁড়াল। ''তুমি রাইদার ছেলে? তা ভাল। এত্তটুকু তোমায় দেখেছি। আমায় চিনবে না, আমি হলুম দুলাল মান্না, সিঙ্গুরে থাকি। সেই যুদ্ধের আগে আমি আর রাইদা একসঙ্গে শ্যালদার মেসে কাজ কত্তুম।''
ছোকরাটি ভ্রূ কুঁচকে চশমার মধ্য দিয়ে দুলাল ও গিরিবালাকে আদ্যপান্ত দেখল। বেশ বিরক্ত ভাব। এক খদ্দেরের বিল নিয়ে ভাঙানি দিয়ে শুকনো গলায় বলল, ''বাবা তো আজ আসবে না।''
দুলাল বিপন্ন বোধ করল। এখন চলে যাবে কি না ভাবল। ছোকরা বিরক্তস্বরে বলল, ''বাবাকে কি দরকার?''
''না, এমনি। প্রত্যেকবার এলেই তো দেখা করে যাই। আজকের আলাপ—পরিচয় নয়তো। রাইদা আমায় ছোটভায়ের মতো দেখে। এবার অনেক দিন পর এলুম তো।'' দুলাল আরও অনেক কথা বলত, কিন্তু ছোকরাকে খাতা পেন্সিল নিয়ে হিসাব করতে দেখে থেমে গেল। অপ্রতিভ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গুটিগুটি ফিরে এল গিরির কাছে। ''রাইদা এখনো আসেনি। বরং রাস্তায় দাঁড়াই, এলে ভেতরে যাব।''
ওরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। বহুক্ষণ পরে দুলালের মনে হল, ফতুয়াপরা লম্বামতো যে লোকটা দোকানে ঢুকল সেই রাইদা। কয়েক পা এগিয়ে সে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল। ছোকরাটা গজগজ করে কী সব বলছে। দুলাল এবার চিনতে পারল। রাইদা মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল দোকান থেকে। লম্বা কাঠামোটা সামনে ঝুঁকে পড়েছে, হাত—পাগুলো বাঁখারির মতো শরীর থেকে ছিরকুটে বেরিয়ে। কার্তিক ঠাকুরের মতো চেহারার এ কী দশা! গোঁপটা পর্যন্ত নেই।
দুলালের ডাক শুনে রাইদা ফিরে দাঁড়াল। দুলাল এগিয়ে গিয়ে গলা ভার করে বলল, ''সেই কখন থেকে তোমার জন্যে দাঁড়িয়ে।''
''কেমন আছিস রে দুলে।'' রাইদা হেসে দুলালের হাত ধরল।
''ভাল। কিন্তু তোমায় তো চেনাই যায় না।''
''আর কী, বয়স তো তিন কুড়ি হল। শরীর একেবারে গেছে। তুই তো দিব্যি রয়েছিস।''
লাজুক হেসে দুলাল বলল, ''রাইদা আমি বে করছি।'' গিরিকে ইশারায় দেখাল।
রাইদা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, ''বড্ড কচি রে, এই বয়সে আবার কেন জড়িয়ে পড়লি। বেশ তো এতগুলো বছর কাটালি।''
দুলাল অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বলল, ''গিরিবালা বড় ভাল মেয়ে, আমায় যত্ন করে খুব।'' তারপর গিরিকে ডেকে বলল, ''তোমার ভাসুর, পেন্নাম করো।''
পথ চলতি লোকেরা গিরির প্রণাম করা দেখতে দেখতে গেল। রাইদা মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করল। ''তোদের কোথায় যে বসাই, দোকান তো আর এখন আমার নয়, ছেলের।''
''ভালই করেছ। এই বয়সে আর তোমার এসব ধকল না পোয়ানোই ভাল। ছেলেকে মানুষ করেছ, এবার বিশ্রাম করো। কম পরিশ্রম তো করোনি!'' দুলাল বিজ্ঞের মতো মাথা দোলাল। বৌবাজারের রাস্তা ধরে যত লোক যাচ্ছে, রাইদা তাদের মাথার ওপর দিয়ে অনেক দূরে তাকিয়ে থেকে বলল, ''জানিস দুলে, আঙুর মরে গেছে।''
''সেই বৈঠকখানায় আঙুর?''
''কলেরায়। চেষ্টা করেছিলুম অনেক। শ' দুয়েক টাকা দেনাও হয়ে গেল। এই নিয়ে বাড়িতে অনেক অশান্তি হল। শেষে ছেলের নামে দোকান লেখাপড়া করে দিয়ে রেহাই পেলুম। তোর বৌদিকে তো আর জানিস না। এখন দুমুঠো খেতে দেয় আর শুতে দেয়। নেশাটাও ছাড়তে হয়েছে, ছেলের কাছে হাত পাততে লজ্জা করে।'' রাইদা হাসবার চেষ্টা করল।
''বড় দুঃখে আছ রাইদা, তাই না।''
''ছেলের কাছে অপমান হলে বড় লাগে, তুই এসব বুঝবি না।''
''রাইদা তোমার কাছে দুটো টাকা একবার ধার নিয়েছিলুম, সেটা শোধ দিতেই এসেছি।''
রাইদার চোখে জল এসে পড়ল। ধরা গলায় বলল, ''কোথায় তোদের জন্য আমি খরচ করব, তা না তোরাই আমায় দিতে এসেছিস।''
''এভাবে কুটুমের মতো কথা বোলো না।'' দুলাল পকেট থেকে পাঁচ টাকার নোট বার করে ফাঁপরে পড়ল। এটা ভাঙাতে হবে। মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল।
''তুমি বরং একটু অপেক্ষা কর রাইদা, আমরা চট করে তোমার দোকান থেকে কিছু খেয়ে আসি। ওকে বলেছি কাটলেট খাওয়াব।''
গিরিকে নিয়ে দুলাল দোকানে ঢুকল। ভ্রূ কুঁচকে ছেলেটা এমনভাবে তাকাল যে দুলালের হাড়পিত্তি জ্বলে গেল।
''বসার জায়গা আছে?''
গিরি পর্যন্ত চমকে উঠল দুলালের গলার আওয়াজে।
''কী দরকার?'
''খাবো।''
ছেলেটা ঘণ্টা বাজাল।
কেবিনে বসেই দুলাল বলল, ''কাটলেট দাও, বাসিটাসি না হয়।''
একটা আধ—ন্যাংটো মেয়ের ছবি দেয়ালে। গিরি মাথা হেঁট করে বসে। দুলাল ফিসফিস করে বলল, ''রাইদার ছেলের কথা শুনলে। আমাদের যেন মানুষ বলেই গ্রাহ্যি করল না। ঠিক আছে, চার আনা বখশিশ করে যাব।''
একটা বিড়াল টেবলের নিচে ঘুরঘুর করে পায়ে ল্যাজ বুলোচ্ছে দুলাল তাকে লাথি কষাল। ওর রগের শিরাটা ফুলে উঠেছে। গোগ্রাসে কাটলেট শেষ করে বলল, ''এবার চপ খাওয়া যাক। বুড়ো বয়সে বাপ আরামে থাকবে, ছেলে তার সেবা করবে। তা নয় বাপ এসে হাত পাতছে আর ধমক খাচ্ছে। ভাবে সবাই বুঝি ওর বাপের মতো হাত পাততে আসে।''
চপ আসতে দেরি হচ্ছে। দুলাল বিকট চিৎকার করল, ''কই হে দেরি হচ্ছে কেন?''
''আঃ চেঁচাচ্ছ কেন।'' পর্দা সরিয়ে ছেলেটা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ''ভেজে দেবে, দেরি হবে না?''
''দেরি করার আমার সময় নেই। অন্য কী তৈরি আছে?''
''তা হলে মটন কারি খান।''
''তাই দেখি, জলদি।''
চলে যাওয়া মাত্র দুলাল ফিসফিস করে বলল, ''কী কষ্ট করে দোকান গড়ে তুলেছে, তা আমি জানি। আর তাকেই আজ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। বখশিশ আটখানা দোব। দেখিয়ে দোব বাজে লোকদের সঙ্গে রাইদার পরিচয় নয়।''
খাওয়া শেষ করে দুলাল বলল, ''কত হয়েছে?''
''চা খাবেন না?''
''না হে, অত সময় নেই।''
লোকটা বিল এনে দিল! তা দেখেই দুলালের বুকের মধ্যেটা ফাঁপা হয়ে গেল। গিরি জিভ দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে মাংসের কুচি বার করতে ব্যস্ত, যেন ভ্যাঙাচ্ছে মনে হয়। পাঁচ টাকার নোটটা সে মৌরীর প্লেটে রাখল। খুচরো আনতে লোকটা চলে গেল। দুলাল দ্রুত হিসাব শুরু করল। দু'টাকা বারো আনা গেলে থাকে দুটাকা চার আনা। গাড়ি ভাড়ার জন্য ওটা লাগবে। তাহলে রাইদাকে দেবার জন্য কিছুই তো থাকে না!
লোকটা খুচরো পয়সা আর নোটগুলো প্লেটে করে দুলালের সামনে রাখল। মনে পড়ল আট আনা বখশিশ দেবে বলেছিল। তা দিলে ট্রেন ভাড়ার পয়সা থাকে না। কলকাতা থেকে সিঙ্গুর পর্যন্ত গিরিকে নিয়ে হেঁটে যেতে হবে।
নোট আর পয়সাগুলো দুলাল চটপট পকেটে পুরল। দোকান থেকে বেরোবার আগে উঁকি দিল রাস্তায়। কোথাও রাইদা নেই। উৎফুল্ল হয়ে গিরিকে নিয়ে সে পথে নামল। মিঠে পান কিনে এগিয়েছে আর তখনই রাইদার কণ্ঠস্বর শুনল। ঘুরে দেখে রাস্তার ওপার থেকে ছুটে আসছে। দুলালের ফাঁপা বুকের মধ্যে তাল তাল লোহা পুরে দেওয়া হয়েছে, সে আর নড়তে পারছে না।
রাইদার হাতে প্লাস্টিকের একটা সিঁদুর কৌটো। গিরির সামনে এগিয়ে ধরে বলল, ''অদ্দুর থেকে আমার কাছে এলে, খালি হাতে আশীর্বাদ করলুম ভাবতে বড় লজ্জা হল। নাও বৌমা।''
গিরি তাকাল রাইদার দিকে, যেন হাওড়া ব্রিজ বা সেই বিশতলা বাড়িটা দেখছে। রাইদা ওর হাতে কৌটোটা গুঁজে দিল। আপনা থেকেই দুলালের হাত পকেটে চলে গেল। নোট দুটো এগিয়ে দিয়ে বলল, ''রাইদা এই নাও।''
দুলালের কানের কাছে মুখ এনে রাইদা বলল, ''অনেক দিন পরে আজ গলাটা ভিজবে রে'' বলেই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলে গেল।
''চলো।'' দুলাল দু'পা গিয়েই থমকে দাঁড়াল, আচ্ছা বখশিশ কি দিয়েছি?''
''দেখিনি তো।''
পকেট থেকে সব পয়সা বার করে দুলাল গুনল। আগের খুচরো মিলিয়ে মোট তিপ্পান্ন পয়সা। দুলাল ফিরে এল দোকানে।
''আচ্ছা, যে আমাদের খাবার দিল তাকে ডাকুন তো বখশিশ দেওয়া হয়নি।''
লোকটা আসতে দুলাল সব পয়সা তার হাতে তুলে দিল। সে অবাক হয়ে সেলাম জানাল। হাওড়া ব্রিজের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুলালের মনে হল নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। রেলিং ধরে অন্ধকার গঙ্গার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াল। কী লাভ হল, এই কথা দুলাল ভাবল। গুম গুম শব্দ হচ্ছে ট্রাম চলার। পায়ের নিচে ব্রিজটা থরথরিয়ে কাঁপছে। দুলালের মনে হল এত বড় লোহার জিনিসটা যদি ভেঙে পড়ে তাহলে সে মরে যাবে। এখুনি মরতে তার ইচ্ছে নেই। সে বড় গরীব। আরও কয়েকটা বছর বাঁচতে তার বড় সাধ। গিরি ছাড়া তার আর কিছু নেই।
''গিরি কি করে ফিরব? পকেটে যে একটাও পয়সা নেই।
একথা শুনে গিরিবালা যেন হাওড়া ব্রিজ বা বিশতলা বাড়ি দেখার বিস্ময় নিয়ে দুলালের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, ''যখন সেলাম করল, তোমাকে দারোগাবাবুর মতো লাগছিল।''
তারপর গিরিকে নিয়ে দুলাল রওনা হল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন