মতি নন্দী
''কি?''
উপরওয়ালাকে কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দিয়ে বড়বাবু ফোনটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন। পরিমল চট্টোপাধ্যায়—সাকুল্যে তিনশো আঠাশ টাকার কেরানি, অবিবাহিত—পকেট থেকে মানিব্যাগ এবং তার থেকে একটি ফটো বার করল।
''দেখুন তো পছন্দ হয় কি না।'' পরিমল ফটোটি টেবিলের উপর রাখল। বড়বাবু চশমার প্লাস—পাওয়ারের অংশ দিয়ে সেটিকে কয়েক লহমা দেখে মাইনাস মারফত দণ্ডায়মান পরিমলকে বিস্মিত চোখ দেখালেন।
''পাত্রী'', আনুগত্য দেখাবার জন্য চাঁদিতে হাত বোলাতে বোলাতে ''মা কদিন থেকেই রোজ'', একটু তোতলাবার চেষ্টা করে, ''কি বলব ভেবে পাচ্ছি না''—পরিমল বলল।
''আমি পছন্দ করব কেন?''
''আমাদের পারিবারিক অবস্থা তো জানেনই। কি ধরনের মেয়ে ঠিক মানিয়ে চলতে পারবে, আপনি তো সাত বছর ধরে আমায় দেখছেন, ঠিক আমার মতো সিরিয়াস টেমপারমেন্টের ছেলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে কি না, ফটো দেখেই আপনি তা আঁচ করতে পারবেন—আচ্ছা ওরা বলেছে সতেরো, উনিশও যদি ধরা যায়, তাহলেও আমার সঙ্গে ডিফারেন্স হচ্ছে বারো বছরের। একটু বেশি হচ্ছে না?''
''ভালই তো। আজকালকার সম—বয়সের বিয়ে যত হচ্ছে খোঁজ নিয়ে দেখো তো তারা হ্যাপি কি না। আমার সঙ্গে ওয়াইফের বয়সের ডিফারেন্স কত বল তো?''
বড়বাবু কতখানি 'হ্যাপি' এইবার তা পরিমলকে বলতে হবে। সাত বছর ধরে ওঁকে সুখী করতে চাইছে পরিমল, এখন সেই মুহূর্তে সে এসেছে। ব্যবধানটা কত বছরের করা যায়!
''পনেরো।''
বড়বাবু মাথা নাড়লেন। তাইতে ঝিকমিক করে উঠল প্লাস—মাইনাস টেবল ল্যাম্পের আলোয়। পরিমল ঘাবড়াল। বেশি বলা হল কি?
''শি ওয়াজ ওনলি নাইন হোয়েন আই ম্যারেড হার, তখন আমার ঊনত্রিশ এখন ফিফটি ফাইভ।''
দ্রুত অঙ্ক কষে পরিমল জেনে ফেলল বড়বাবুর বৌয়ের পঁয়ত্রিশ।
''তাই বলুন, এখনো এ রকম ইয়ং কি করে যে রয়েছেন এইবার বুঝতে পারছি।''
''বয়সের ডিফারেন্স থাকা ভাল। দেবে—টেবে কেমন?''
''মোটামুটি। পনেরো ভরি সোনা, হাজার দুই নগদ এছাড়া যা—যা দেয়—খাট—বিছানা, ঘড়ি, আংটি, আলমারি—রেডিও, বাপ নেই চার দাদা চাকরি করে।''
''লেখাপড়া?''
''স্কুল ফাইনাল দেবে, গানও শেখে।''
''তা শিখুক, আমার ওয়াইফও গান জানত। গেরস্ত ঘরে দরকার খাটিয়ে মেয়ের, বেশি লেখাপড়া দিয়ে কি হবে, সংসারে অশান্তি হয় কি করে জান? বৌকে যদি লাই দিয়ে মাথায় তোল!''
''না—না—তা কেন দেব। আমার টেমপারমেন্ট জানেনই তো। তাহলে বলছেন, এখানেই রাজি হয়ে যাই।''
''সেকি, আমি আবার বললুম কখন!'' বড়বাবু ফাইলের উপর থেকে ফটোটিকে দ্রুত টেবলে নামিয়ে দিলেন। ''যখন খুঁত বেরোবে তখন তো বলবে, এই ব্যাটাই বলেছিল বিয়ে করতে। না বাপু। তোমাকে তো অফিসে শুধু একটা ঘণ্টাই দেখি তারপর রেস খেল কি মদ খাও জানি না। মেয়েটারও মাথা খারাপ কি না জানি না। আর শুধু ফটো দেখেই বলে দেব বিয়ে কর! স্টেটমেন্ট অফ অ্যাকাউন্টসে যোগ না মিলিয়ে কখনো আমাকে সই করতে দেখেছ?''
বড়বাবুর হঠাৎ বিগড়ে যাওয়ার কারণ এখনই সন্ধান করা উচিত হবে কি না ভাবতে ভাবতে পরিমল—''আজ্ঞে তা দেখিনি'', ওঁর পূর্ণ সম্মতি বিনা বিয়ে করা উচিত হবে কি না ভাবতে ভাবতে ''ঠিকই বলেছেন'', ওঁর সঙ্গে কিছুতেই তর্ক করা উচিত নয় ভেবে বলল, ''বিয়ের আগে ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করানোর কথা তো বলা যায় না।''
''করলেও, বাঁজা কি না তা তো আর বিয়ে না করে জানতে পারছ না।''
বড়বাবুর স্বরে তিক্ত করুণ অসহায় ধ্বনি—সমবায় পরিমলের কান এড়াল না। এইবার তার মনে পড়ল, বড়বাবু নিঃসন্তান। বাহুতে নানাবিধ মাদুলি তাঁর আকাঙ্ক্ষাকে বিজ্ঞাপিত করছে।
''বিয়ে করবে তুমি আর আমি করব পছন্দ! আচ্ছা লোক তো হে তুমি।'' এই বলে বড়বাবু প্লাসের মধ্য নিয়ে ফাইলে ডুব দিলেন।
নিজের চেয়ারে বসে পরিমল ভেবে ঠিক করল, সুধীজন কাউকে ধরে এবার জিজ্ঞাসা করবে। সকলকে লক্ষ্য করতে করতে সে মাঝবয়সি নন্দিতাদিকে বেছে নিল। কৌটোয় টিফিন আনে অথচ চাইলে দেয়, আলজিভ দেখিয়ে হাসে কিন্তু শব্দ হয় না, মিছিলে হাঁটে তবু হরতালে বিরক্ত হয়, যদিও ক্যাজুয়াল লিভ খরচ করে না, তাহলেও বড়বাবুর ধমকে চোখ ছলছলায়, যেহেতু দ্বিতীয় পক্ষ কেন না বাপের বাড়ি গরিব অতএব পরিমল মেয়েদের ক্যান্টিনের দরজা থেকে ডাকল, ''নন্দিতাদি একবারটি শুনুন।''
আলু ছেঁচকির লঙ্কাটা হাতে নিয়ে নন্দিতাদি বেরিয়ে এল।
''একটা জিনিস দেখাব, আপনার মতামত চাই।''
ফটোটি দেখামাত্র নন্দিতাদি বলল, ''কার, আপনার জন্য?''
বলার ভঙ্গিতে পরিমল ঈষৎ অপ্রতিভ হয়ে পড়ল। ব্যক্তিত্ব সংগ্রহের উপায় হিসাবে কণ্ঠস্বর মোটা করে বলল, ''আমার এক বন্ধুর জন্য!''
''অ!''
কিছুক্ষণ দেখে নন্দিতাদি বলল, ''এমন আর কি দেখতে, রঙ তো বেশ ময়লাই, বড্ড রোগা মুখটি আর একটু ছোট হলে ভাল হত, বয়স কত?''
''সতেরো, স্কুল ফাইনাল দেবে।''
''বন্ধুটি করে কি।''
''আমার মতোই কেরানি।''
''আচ্ছা আপনারা চাকুরে মেয়ে বিয়ে করেন না কেন? আজকাল দুজনে রোজগার না করলে কি চলে? আমরা চার বোন, চারজনই চাকরি করি। বন্ধুটির জাত কি?''
''তিলি।''
''আজকাল অবশ্য জাতটাত অত আর কেউ মানে না। দেখুন না বন্ধুটি চাকুরে মেয়ে বিয়ে করে যদি। এরা দেবে—থোবে কেমন?
''পনেরো ভরি সোনা, নগদ দু হাজার—''
''খাট—বিছানা ঘড়ি আংটি রেডিও আলমারি!''
পরিমল ঘাড় নাড়ল। নন্দিতা নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, ''বন্ধুর ঠিকানাটি দিন।''
''সেকি, কেন?''
''আরে দূর, আপনার বন্ধুর বয়স তিরিশ—বত্রিশ তো হবেই, এইটুকু বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে ঘর করবে কে। দাঁড়ান ডায়রিটা আনি!''
নন্দিতা ক্যান্টিন ঘরের ভিতর ছুটে গেল। পরিমল বুঝল, সে ফাঁপরের মধ্যে পড়ে গিয়েছে। এখন সত্যি বলা ছাড়া উপায় নেই।
''বলুন।''
কলমের ক্যাপ খুলতে খুলতে নন্দিতা তাকাল, ''নাম কি?''
''পরিমল চাটুচ্চেচ।'' পরিমল বলল।
''ঠাট্টা হচ্ছে।''
''সত্যি বলছি, আমার জন্যই।''
''আহাহা।''
''বিশ্বাস করুন, সত্যিই।''
নন্দিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিশ্বাস করল, কলমে ক্যাপ লাগাল, ডায়রি বন্ধ করে বলল, ''দেখুন না আমার বোনগুলোর জন্য, মেজ সেজ স্কুলে পড়ায় বি—টি, এক একজন প্রায় হাজার পাঁচেক করে জমিয়েছে, বছর পঁয়তাল্লিশের মধ্যে হলেই ভাল, দেখুন না।''
''দেখতে কেমন।''
''আমারই মতো, তবে ফিগার দুজনেরই ভাল। মেজ বেশ লম্বা, খুব ভাল রান্নাও করে। নিজের বোন বলে বলছি না খুব খাটিয়ে। পরেরটিকে ওরাই তো লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করল। আজকাল এরকম মেয়ে দেখা যায় না। আমি তো কিছুই করিনি ওদের জন্য।''
অনুশোচনায় নন্দিতাদি একটু নুয়ে পড়লেন। দেখে পরিমলের সহানুভূতি জাগল। বলল, ''আপনিও তো কম করছেন না। ওদের বিয়ের জন্য চেষ্টা করছেন।''
''করছি তো ভাই, হচ্ছে কই। মুখেই সবাই সাহায্যের কথা বলে। আপনিও বলছেন, তারপর অন্যদের মতোই ভুলে যাবেন।''
''না না, আপনি তো জানেন আমি সিরিয়াস টেমপারমেন্টের লোক। যা বলি তা করি!''
''তাহলে আমার মেজ বোনকে আপনিই নিন না। করুন না বিয়ে, করবেন? আপনার এই মেয়ের থেকে অনেক অনেক ভাল হবে। স্কুলে পায় আড়াইশো, দুটো টিউশনি থেকে আরও একশো। আপনাদের দুজনের আয় তাহলে সাতশোর মতো দাঁড়াবে। করবেন?''
পরিমলের থুতনিটা একটু একটু করে ঝুলে পড়ল, এক কদম পিছিয়ে গেল, স্বরনালিতে কিছু শব্দ আটকে গেল। খাঁকারি দিয়ে বলল, ''টাকাটাই তো বড় কথা নয়!''
''নয় কি বলছেন? আমার দুধই তো মাসে লাগে পঁচাত্তর টাকার। সংসার করে দেখুন বুঝবেন, খালি খরচ আর খরচ। পাগল হয়ে যাবেন। উনি তো মাসের শেষে বলেন—'' নন্দিতাদি থমকে, ''যাকগে ওসব কথা,'' হেসে ''আমার মেজ বোন খুব হিসেবি, এই ক—বছরেই পাঁচ হাজার জমিয়েছে, ফ্যাশন ট্যাশান নেই, বাজে খরচ করে না, করতেও দেয় না। একবার দেখুন না ওকে। দেখবেন?''
''কিন্তু আমার মা ভীষণ গোঁড়া সেকেলে। তিনি বয়স্কা মেয়ে একদম পছন্দ করেন না। আর ওঁকে দুঃখ দিতে আমি পারব না।''
''না না তা দেবেন কেন। আসুন না আমাদের বাসায়, আলাপ করবেন বোনের সঙ্গে। বাইশের একদিনও বেশি বয়স যদি মনে হয় তো কান কেটে ফেলব।''
''কিন্তু আমার মাকে আপনি জানেন না, ঠিক ধরে ফেলবে।''
''কুষ্ঠি করিয়ে দেব। এই যে ফটো দেখালেন এর বয়স কি সতেরো? পঁচিশের একদিনও কম নয়। আপনাকে চায়ের নেমন্তন্ন করছি কালই আসুন, বন্দিতাকেও খবর দি। দুজনে আলাপ করুন। তাতে তো আর দোষ নেই।''
চেয়ারে বসে পরিমল মুহ্যমান হয়ে পড়ল। দোষী করল নিজেকেই। কেন যে ফটোটা দেখাতে গেল। চায়ের নেমন্তন্নে যাওয়া মানেই মায়া দয়া করুণা প্রভৃতি বোধগুলোকে একটি বিয়ে না—হওয়ার দুঃখে কাতর, সংসারে উৎসর্গীকৃত প্রাণ কুমারীর খপ্পরে তুলে দেওয়া। সে বিষণ্ণ চোখে কিংবা নন্দিতাদির নির্দেশে, উজ্জ্বল চোখে তাকাবে। মরিয়া হয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইবে, দন্ত্য স—কে মুর্ধন্য ষ—এর মতো উচ্চচারণ করবে, হিন্দি ফিলমের নিন্দা করবে কিংবা কিছুই না করে দিদির মুখের দিকে তাকিয়ে বসে—বসে ঘামবে।
নানাবিধ ছবি মনে মনে এঁকে পরিমল জর্জর হয়ে পড়ল। চায়ের নেমন্তন্ন একটা ফাঁদ এবং একবার গেলে বেরিয়ে আসা কঠিন এটা সে বোঝে। একমাত্র নিজেকে কঠিন করে প্রত্যাখ্যান করতে পারলে রেহাই পাওয়া সম্ভব। নন্দিতাদি আমার মতোই কেরানি, বড়বাবু তো আর নয়। কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না। তাছাড়া একটা পাত্র যদি খুঁজে দি, তাহলেই তো ঝামেলা চুকে যায়।
পরিমল চল্লিশ বছরের আশে—পাশে বিবাহযোগ্য পাত্রের সন্ধানে ভাবনা করে যাচ্ছে, তখন পিওন এসে জানাল বড়বাবু ডাকছেন। পরিমল হাজির হওয়া মাত্র বললেন, ''তোমার বাড়ির ঠিকানাটা দাও তো, কাল—পরশু আমার দাদা যাবে তোমার মার সঙ্গে কথা বলতে। ওর মেজ মেয়ে এবার প্রি—ইউ দেবে, আমাকে বলে রেখেছিল পাত্রের খোঁজ পেলে জানাতে। এইমাত্র ফোনে তোমার কথা বললুম, পছন্দ হয়েছে। ঠিকানাটা দাও।''
শুনতে শুনতে পরিমলের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, মাথায় হাতুড়ি পড়ল, টেবলে হাত রেখে ঝুঁকে—''কিন্তু মা যে এখানে প্রায় ঠিকই করে ফেলেছেন।''
''ওরকম ঠিক অনেক হয় ভেঙেও যায়, ওসব তোমায় ভাবতে হবে না। পাওয়া—থোওনা এরা যা দেবে, দাদাও তাই দেবে। ওরও বয়স সতেরো, রঙ এর থেকেও ফরসা, আর লক্ষ্য করেছ কিনা জানি না, এ মেয়েটি একটু ট্যারা, গালে মেচেতার দাগ, আর কেমন যেন কালচারের অভাব আছে মুখে। স্বাস্থ্য দেখে তো মনে হয় খুব অভাবের মধ্যে মানুষ হয়েছে, চোখে হ্যাংলা হ্যাংলা ভাব। এ—সব মেয়ের চরিত্র—টরিত্রও খুব সুবিধের হয় না। সব থেকে বড় কথা জান, তোমার বাবা নেই, তাই এমন একজন শ্বশুর তোমার চাই যে সেই স্থান পূরণ করবে। এইটাই হবে তোমার সেরা লাভ। দাদা পুলিস কোর্টের উকিল, কত গুণ্ডা—বদমাশ যে ওর হাতের মুঠোয়।''
প্লাস—মাইনাসের নিচে বড়বাবুর হাসি পরিমল সাত বছরে এই প্রথম দেখল। এবং তাইতে ওর বুক শুকিয়ে এল। বড়বাবুকে সুখী করাই ছিল উদ্দেশ্য, কিন্তু এতটা সুখী করা নয়।
''কিন্তু গুণ্ডা—বদমাশের তো আমার দরকার নয়। আমার দরকার—'' পরিমল থেমে গিয়ে বাক্যটি বড়বাবুর বিবেচনার উপর ছেড়ে দিল।
''কে বললে দরকার নেই। আজকেই পকেটমার হয়ে পুরো মাইনে খোয়াতে পার, কালই বাড়ি লুঠ হতে পারে, পরশুই ব্ল্যাকে চাল কেনার দরকার হবে, তারপর দিন তোমার বোনের হাত ধরে রাস্তায় কেউ টানল—আর তুমি বলছ গুণ্ডা—বদমাশের হেলপ দরকার নেই? একটা গুণ্ডা এসে যদি তোমার টেবলের সামনে দাঁড়ায়, যে কেসটা ছ মাসে ডিল করতে, সেটা ক—মিনিট করবে বল তো?''
পরিমল অনুভব করল শাঁখের করাতের নিচে পড়েছে। কিলবিলিয়ে উঠল সর্বাঙ্গ। বড়বাবু থাকতে এ অফিসে গুণ্ডার নির্দেশে দ্রুত কাজ সম্ভব, এটা কি এখন স্বীকার করা উচিত হবে? নিজেকে কি কাপুরুষ ঘোষণা করা উচিত হবে? অথচ বড়বাবু চাইছেন—''কিন্তু গুণ্ডার পক্ষে কি এখানে হামলা করা সম্ভব'' এবং খুবই বিনীতভাবে, ''ছ—মাস সময় তো কোনো কেসেই আমি নিইনি।'' সব দিক বাঁচিয়ে পরিমল উত্তর দিল।
''জানি জানি।'' বড়বাবুর তৃপ্ত কণ্ঠ পরিমলকে আবার কিলবিলিয়ে দিয়ে বলল, ''তাই তো তোমার নামটাই রেকমেন্ড করলাম দাদার কাছে।''
নিজের চেয়ারে বসে চোখ বুজল পরিমল। ছোরা হাতে একটা গুণ্ডা লোক পাশেই দাঁড়িয়ে। এই রকম একটা বোধ সর্বাঙ্গে হেঁটে বেড়ানো শুরু করতেই চোখ খুলে দেখে নন্দিতাদি আসছে।
''তাহলে কাল। এক সঙ্গেই অফিস থেকে বেরোব, কেমন?''
''কিন্তু নন্দিতাদি একটা কথা কি ভেবেছেন, যা হালচাল যে—কোনো সময় যে—কোনো লোকই মারা যেতে পারে? গাড়িচাপা পড়েই হোক কি গুণ্ডার ছোরায়।''
''নিশ্চয় তা তো হতেই পারে, উনিও এই একই কথা বলেন। তাই তো আমি চাকরি ছাড়িনি। কখন কি হয়ে যায় কে বলতে পারে, তখন সংসার চালাবো কি করে। তাই তো বলছি চাকুরে মেয়ে বিয়ে করুন, একেবারে অথৈ জলে পড়বে না যদি—'' নন্দিতাদির নিশ্চিন্ত কণ্ঠ পরিমলকে বিষণ্ণতায় ডোবাতে ডোবাতে হঠাৎ থেমে গিয়ে, আবার, ''তার জন্য ভাববেন না, আমাদের বোনে—বোনে খুব ভাব। কেউ বিপদে পড়লে সবাই বুক দিয়ে পড়বে।''
নন্দিতাদি চলে যাবার পর চেয়ারে বসে পরিমল নানান বিষয় ভাববার চেষ্টা করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। পাঁচটা বাজতেই অফিস থেকে বেরিয়ে ট্রামে ওঠার চেষ্টা করতে করতে অবশেষে ট্রামে উঠল। ট্রাম থেকে নেমে মিনিট দুয়েকের পথ। কড়া নাড়তে দরজা খুলে বেরোল এক বিধবা।
''আমি তারক চ্যাটার্জি লেন থেকে আসছি শোভনার দাদা। আপনারা ওর একটা ফটো চেয়েছিলেন, এনেছি।''
''বাইরে কেন ভেতরে আসুন।''
অন্ধকার উঠোন পেরিয়ে পরিমলকে তিনি ঘরে এনে বসালেন। একখানি শোবার ঘর আর রান্নাঘর নিয়ে সংসার।
''অফিসের বন্ধুদের দেখাবে বলেই খোকা চেয়েছে, নয়তো পিসিমার পছন্দের উপর ও কোনোদিন কথা বলেনি বলবেও না। নিজের ভাইপো বলে বলছি না, দাদা—বৌদি গত হওয়ার পর ওকে অ্যাত্তোটুকু থেকে মানুষ করছি তো, সাত চড়ে রা কাড়ে না, একদিনের জন্যও অবাধ্য হয়নি। আমার বয়স হয়েছে, চিরকাল তো আর থাকব না। তোমার বোনটিকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে বাবা, নরম—সরম লক্ষ্মীছিরি আছে বয়সও কম।''
এই সময় ব্যাগ থেকে ফটোটি বার করে পরিমল এগিয়ে দিল।
''চার ভাইয়ের এক বোন। ভগ্নিপতি আমাদের ভাইয়ের মতো হবে সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন। তবে স্কুল ফাইনাল পাস করে শোভার আরও পড়ার ইচ্ছে। আমারও মনে হয়''—সর্বাঙ্গ হঠাৎ কিলবিলিয়ে ওঠায় পরিমল থেমে গেল।
''ভালই তো। পড়া বন্ধ করা খোকারও মত নয়। যা দিনকাল পড়েছে তুমি বাবা কি বলো?'' ছেলের পিসিমা মেয়ের দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। শোভার মুখটা মনে পড়েছে পরিমলের আর সঙ্গে সঙ্গে টের পাচ্ছে তার ভিতরে নন্দিতাদি এবং বড়বাবু নিজেদের মধ্যে প্রবল ঝগড়া শুরু করেছে, কে আগে তার গলা দিয়ে কথা বলবে। তারপর ঝগড়া থামিয়ে দুজনেই এক সঙ্গে হাতছানি দিয়ে ডাকল ছোরা হাতে ষণ্ডা চেহারার একটা লোককে। লোকটা ছুটে এসে পরিমলের হৃৎপিণ্ডটা ছোরা দিয়ে খোঁচাতে শুরু করল। তখন পরিমল হেসে উঠল, বললে, ''আমি আর কি বলব, যা বলার বা করার সে তো গুণ্ডারাই আজকাল বলছে বা করছে।''
ছেলের পিসিমা অবশ্য এই অর্থহীন খাপছাড়া উত্তরের কারণ বুঝলেন না। কুটুম্বিতার আয়োজন করতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
বাড়ি ফেরামাত্রই মা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'শোভার ফটোটা দিয়ে এসেছিস? ছেলে দেখল? কি মনে হল?''
পরিমল ক্লান্ত স্বরে সবগুলোর জবাব দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকল ঘরের আলো নিভিয়ে। ঘণ্টাখানেক পর খেতে বসে সে বলে, ''আজ অফিসে খুব মজা হল একজনকে নিয়ে। সম্বন্ধ হচ্ছে, তাই পাত্রীর ফটো এনেছে দেখাতে। বিয়ের খুব ইচ্ছে কিন্তু তাকে সবাই এমন ভয় দেখাল, বোধহয় বেচারা আর বিয়েই করবে না'' হাসতে শুরু করল পরিমল।
''কিসের ভয়'', মেজ ভাই বলল, ''খুব সুন্দরী?''
''না ও সব নয়, আসলে লোকটার মাথায় ছিট আছে। ওর হাতে পড়ে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট হবে কেন, তাই সবাই ষড়যন্ত্র করে—'' পরিমল তারপর ষড়যন্ত্রের বিবরণ দিতে শুরু করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন