মতি নন্দী
লোকটা যে সত্যি সত্যিই এসে পড়বে অমর তা চিন্তায় রাখেনি। রাখলে অবশ্যই নাম ঠিকানা লিখে দিয়ে আসত না।
ব্যাপারটা এই রকম—কাঁথিতে একটা টুর্নামেন্ট ফাইনালে প্রধান অতিথির চেয়ার অলঙ্কৃত করে, পরের দিন সে ওখানকারই এক ধনী ব্যবসায়ীর মোটরে কলকাতায় ফিরছিল। ব্যবসায়ীটি যুগের যাত্রীর তো বটেই, তারও ভক্ত। অমর রাতটা তাঁর বাড়িতে যাপন করায় তিনি ধন্য এবং গাড়িতে বাড়ি পৌঁছে দেবার সুযোগ পেয়ে কৃতার্থ।
কিন্তু অ্যাম্বাসাডারটি কৃতার্থ বোধ করেনি। বোম্বে রোডের উপর সে ফ্যানবেল্ট ছিঁড়ে ফেলে অমরকে আক্ষরিক অর্থেই পথে বসিয়ে দিয়েছিল। হাত দেখানো সত্ত্বেও দুটো ট্রাক থামেনি কিন্তু একটা খড়্গপুরগামী মারুতি থামল হাত না দেখানো সত্ত্বেও। অমরের অচেনা অজস্র ভক্তেরই কেউ। ড্রাইভার সেটাতেই মেচেদা গেল ফ্যানবেল্ট কিনে আনতে। অমর রইল গাড়ির পাহারায়।
রাস্তার দুধারেই ক্ষেত। প্রচণ্ড গরমের পর পরপর তিনদিন বৃষ্টি হয়ে গেছে। বর্ষা দেরিতে আসায় ধান রোয়াতেও নাকি দেরি হয়েছে। কয়েকজন স্ত্রীলোক ধান রুইছিল, অমর মোটরে বসে কিছুক্ষণ তাই দেখার পর, পায়চারি করতে করতে কয়েকটা খড়ের চালের ঘর দেখে এগিয়ে গেল। একটা সরু ইট বিছানো পথ বোম্বে রোড থেকে বেরিয়ে গ্রামের দিকে চলে গেছে। তারই মোড়ে মিষ্টির, মুদির, সাইকেল সারাই ইত্যাদি দোকানের সঙ্গে একটা চায়েরও দোকান। তার সামনে বাঁশের খুঁটিতে ফালিবাঁশের তৈরি বেঞ্চে বসে দুটি লোক গ্লাসে চা খাচ্ছে।
দোকানে বসে এক স্ত্রীলোক। একটা বছর দশেকের ছেলে কয়লা ভাঙছে। বেঞ্চে বসে অমর চা চাইল। স্ত্রীলোকটির শীর্ণতা দোকানটিরই মতো। ডুরে তাঁতের শাড়ির রঙ যে বেগুনি ছিল সেটা কোনোক্রমে বোঝা যায় যেমন বোঝা যায় ওর গায়ের রঙ একদা গৌর এবং মুখে লাবণ্য ছিল। ময়লা কাচের বোয়েমে বিস্কুট, চানাচুর, কেক। বিড়ি এবং সিগারেটও একপাশে। স্ত্রীলোকটির সিঁথিতে সিঁদুর। অমরের মনে হল, স্বামী কোথাও কাজটাজ করে বা ক্ষেতে হয়তো ধান রুইছে।
চায়ে প্রথম চুমুক দিয়েই তার ইচ্ছে হল ফেলে দিতে। দেয়নি, বৌটি তাহলে অপ্রতিভ হবে, মনে কষ্টও পাবে। অনেকেই অবাক হয়ে বলে, তার এত কোমল মন অথচ মাঠে সে এত নির্মলভাবে ট্যাকল করে কী করে? আট বছর সে ফার্স্ট ডিভিশনে খেলছে। অনেকেরই দাঁত, ঠোঁট তার কনুইয়ের বা পেট, হাঁটু তার বুটের ধাক্কা পেয়েছে, তার মধ্যে শতকরা নব্বইটি স্বেচ্ছাকৃত। অমর মারকুটে মাঠে কিন্তু তার বাইরে সে নিপাট স্বল্পবাক ভদ্রলোক।
সেদিন চা খেতে খেতে সে দোকানে ছ্যাঁচাবেড়ার দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবি দেখতে পায়। কাছে এত বেশি ধুলোময়লা যে বোঝা যাচ্ছে না ছবিটা কীসের বা কার হতে পারে। অনুমান করার চেষ্টা করতে করতে, চায়ের দাম দেওয়ার জন্য উঠে গিয়ে সে একটু ঝুঁকে ছবির কাছে মুখ নিয়ে গেল। এরপর সে বুঝতে পারল এটা একটা ফুটবল টিম। আঙুলের ডগা দিয়ে কাচ ঘষে সে যা আবিষ্কার করল তাইতে সে চমকে উঠেছিল। যুগের যাত্রীর পঞ্চান্ন সালের টিম, যা পূর্ব আফ্রিকা সফর করেছিল। চতুর্গুণ আকারে এই ছবিটাই তাদের টেন্টে টাঙানো আছে। ছবিটা তোলা হয়েছিল নাইরোবিতে।
এটা এখানে এমন জায়গায় কেন? এলই বা কী করে! কৌতূহল না চাপতে পেরে অমর জিজ্ঞাসা করে ফেলল। ছেলেটিই জানাল, এটার মধ্যে তার বাবা রয়েছে। আঙুল দিয়ে সে দেখিয়ে দিল চেয়ারের সারির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ডানদিক থেকে চতুর্থজনকে।
ব্লেজার পরা, গলায় টাই, সবার মধ্যে বেঁটে, চৌকো মুখ, থুতনিটা চাপা, পাতাকাটা চুল। ছবিটা অযত্নে বিবর্ণ হলেও লোকটার চোখদুটো বোঝা যাচ্ছে। বেশ বড় চাহনিটা তীব্র, বোকা—গোঁয়ারদের মতো। অমর লোকটিকে কখনো দেখেনি। অবশ্য ছবিটা তার জন্মের তিন বছর আগে তোলা। সে ছেলেটিকে তার বাবার নাম জিজ্ঞাসা করেছিল।
সুধাকর রেড্ডি। চমকে না উঠলেই অস্বাভাবিক হত সুতরাং অমর বিস্ময়ের ধাক্কায় ''য়্যা, সেকি!'' বলে ওঠে। নামটা সে শুনেছে পুরনো ফুটবলারদের মুখে। হায়দরাবাদ থেকে তাকে আনিয়ে ছিল যুগের যাত্রী। রেড্ডির সময় তার মতো লেফট—হাফব্যাক কলকাতার মাঠে ছিল না। ছিনে জোঁকের মতো লেগে থাকায় আর বল স্ন্যাচ করায় ওর জুড়ি, অনেকের মতে নাকি এখনকার অমর বোস হতে পারে। একথা শুনে অমর বুঝে উঠতে পারেনি প্রশংসাটাকে কতটা উঁচু মাপের বলে সে ধরে নেবে।
অপ্রত্যাশিত সেই লোকের সন্ধান মুঠোয় পেয়ে গিয়ে অমর রোমাঞ্চ বোধ করেছিল। ফ্যানবেল্ট ছিঁড়ে যাওয়াটা এখন তার কাছে শাপে বর মনে হল। রেড্ডি এখন কোথায়? ছেলেটি বলল, ঘরে শুয়ে আছে। জ্বর হয়েছে, কাজে বেরোয়নি। অমর বলল, দেখা করব। ছেলেটিই তাকে নিয়ে গেল। যাবার সময় অমর জেনে নিল তার নাম গোপাল, তার মায়ের নাম সবিতা। বাঙালি মেয়ে। গোপাল জন্মেছে এই গ্রামেই। অমর শুনেছিল রেড্ডি যাত্রীর মেসে থাকত। নেশা করত, জুয়া খেলত, কুজায়গায় যেত। দেনায় জড়িয়ে গেছিল। কিন্তু নিয়মিত প্র্যাকটিস কখনো বন্ধ হত না। ছ'বছর সে যাত্রীতে খেলেছিল। ছ'বছরে ছ'টা ম্যাচেও বোধহয় সে বসেনি। প্রতি বছর ভারতের বড় বড় টুর্নামেন্টের অন্তত দুটো, রেড্ডির সময়ে যাত্রী জিতেছে। ডুরান্ড খেলতে গিয়ে পা ভাঙে, তারপরেই খেলা পড়ে যায়। যাত্রী ওকে বিদায় করে, দুহাজার টাকা বখশিশ হাতে দিয়ে।
অমর এইটুকুই রেড্ডি সম্পর্কে জানত। কিন্তু হায়দরাবাদের তেলেঙ্গির মেদিনীপুরের গ্রামে বৌ—ছেলে নিয়ে বাস করাটা তার কাছে অদ্ভুত ঠেকলেও সে কৌতূহলটা চেপেই রাখে। নিচু খড়ের চালের জীর্ণ এক মাটির ঘর। জানলা বলতে দরজার দুধারে মাটির দেওয়ালে দুটো গর্ত এবং তাতে বাখারির গরাদ। ঘরের মধ্যে ভ্যাপসা গন্ধ। তক্তপোশের চারটি পায়ার একটির দায়িত্ব বহন করছে কয়েকটি ইট।
লুঙি পরে রেড্ডি পাশ ফিরে শুয়েছিল। গোপাল তার কাঁধে ঠেলা দিতে চিৎ হল, অপরিচিত একটা লোককে দেখে উঠে বসল। নমস্কার করে অমর বলল, ''আপনার নাম আমি শুনেছি। আমিও ফুটবল খেলি, যুগের যাত্রীতে। আপনার এখানে গাড়িটার ফ্যানবেল্ট ছিঁড়ে গেল। চা খেতে গিয়ে ছবিটা দেখলাম। ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখাটা করেই যাই।''
অন্তত দশদিনের কাঁচাপাকা দাড়ি—গোঁফ, গাল দুটো বসা, মাথায় সাদা চুলের জট। দারিদ্র্য সারা শরীরটাকে আঁচড়ে মাংস তুলে নিয়েছে! অমরের মনে হল শুধু চোখ দুটোই ছবির চোখের মতো তীব্র রয়েছে।
নমস্কার পাওয়ার অভ্যাস নেই বলেই বোধহয় রেড্ডি সেটা ফিরিয়ে দিতে ভুলে গেছল। সে পরিষ্কার বাংলায় বলল, ''আপনি যাত্রীতে খেলেন? কোন পজিশনে?''
''লেফট স্টপার ব্যাকে?''
''কী নাম আপনার?''
''অমর বোস।''
রেড্ডির মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ঘটল না। অমরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
''শুনলাম জ্বর হয়েছে?''
''শুধু জ্বর নয়, হাঁটুর যন্ত্রণাটাও বেড়েছে। চলতে কষ্ট হয়।'' রেড্ডি লুঙি টেনে ডান হাঁটু পর্যন্ত তুলল। একটা সরু শুকনো বাঁশের মতো পা। ''এটাই ভেঙেছিল।'' রেড্ডি হাঁটুতে আঙুল রেখে দেখাল। ''ফিফটি নাইনে, ডুরান্ডের সেমি ফাইনালে। সার্ভিসেসের সুখলাল মেরেছিল।''
''চিকিৎসা করাননি?''
''কী চিকিৎসা আর করাব? এখানে ডাক্তারই বা কোথায়, ওষুধপত্তরই বা কিনব কী করে? ইটভাটিতে দিনমজুরি করি, নো ওয়ার্ক নো পে।'
''এখানে কদ্দিন আছেন।''
তা প্রায় পনেরো বছর। এটা আমার বৌয়ের বাপের বাড়ির জায়গা। আগে ছিলাম খড়্গপুরে। রেলের হাসপাতালে ঝাড়ুদারির কাজ করতাম, ওখানেই বিয়ে করি গোপালের মাকে। রেড্ডি কথাগুলো বলতে বলতে তক্তপোশ থেকে পা দুটো নামিয়ে মেঝেয় রেখেই যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করল।
দেখে অমরের কষ্ট হল। এককালের নামী ফুটবলারের আজ কী শোচনীয় অবস্থা। এখন খেললে রেড্ডির দর কত হবে? অন্তত তারই মতন দেড় লাখ টাকা তো পেতই। লোকটা তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগে খেলে না ফেললে আজ এই হালে থাকত না। অমরের মনে হল, দেরিতে জন্মে সে লাভবানই হয়েছে। লাভ করেছে মনে হওয়াতেই তার মধ্যে একটা প্রসন্ন নিশ্চিন্তি বোধ তৈরি হয়ে তাকে উদার ও দরদী করে ফেলল। সে বলল, ''আপনি কলকাতায় এসে পায়ের চিকিৎসাটা করান। আমার চেনা ভাল ডাক্তার আছে, ব্যবস্থা করে দেব। পয়সা লাগবে না।''
শোনামাত্র রেড্ডির মুখ করুণ হয়ে উঠল। ছলছলিয়ে উঠল চোখ। সে ঝুঁকে দুহাতে অমরের দুটো পা চেপে ধরল।
''আহা, আহা, করছেন কী। আপনি আমায় লজ্জায় ফেলে দিলেন।'' অমর দুহাতে রেড্ডিকে তুলে দাঁড় করাল।
''বাবু আপনি আমার এই পায়ের একটা ব্যবস্থা করে দিন। পা ঠিক না থাকলে মানুষের কিছুই করার থাকে না। আপনি তো ফুটবল খেলেন, বুঝতে আপনিই পারবেন।''
''ফুটবল তো আপনিও খেলেছেন। শুনেছি খুব নাম ছিল আপনার। মেলবোর্ন অলিম্পিকের ক্যাম্পেও ছিলেন।''
''আর বাবু....।''
''বাবু নয় অমর, শুধু অমর।''
রেড্ডি অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে থেকে বলল, ''আমি তো এখন ইটভাটির মজুর।''
''তাতে কী হয়েছে, আপনি তো আমার দাদা, আমরা তো ফুটবল বংশের লোক। আপনাদের ধারা বেয়েই তো আমরা, আমাদের জেনারেশন এসেছে। এটা তো আমার কর্তব্যও আপনাকে দেখাশোনা করা।''
কথাগুলো বলে অমর তৃপ্ত বোধ করেছিল। সারা দেহে ফুরফুরে একটা চাঞ্চল্য অনেকটা লিগের শেষ ম্যাচটি খেলে চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার মতো হালকা সুখ তাকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। মানুষ হিসেবে কিছু একটা তাহলে করার সুযোগ সে পেয়েছে।
অমর তার বাড়ির ঠিকানা একটা ঠোঙ্গার কাগজে লিখে দিয়ে বলেছিল, ''আপনি কি পথ চিনে বেহালা যেতে পারবেন?''
''পারব। ছ' বছর কলকাতায় কাটিয়েছি তো। শ্যামবাজার, বেলগাছিয়া থেকে বালিগঞ্জ, টালিগঞ্জ বহুবার গেছি। কালীঘাটে থাকত ঘোষ, অন্তু ঘোষ আমাদের গোলকিপার, শ্যামপুকুরে ব্রজ দত্ত, উত্তরপাড়ায় মিলন সুর, এদের বাড়িতে কতবার গেছি।''
''তাহলে তো কোনো অসুবিধে হবে না।''
দূর থেকে মোটরের হর্ন বাজতে থাকায় অমর আর অপেক্ষা করেনি। গোপাল ইতিমধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছল। ছুটে এসে বলল, ''গাড়ির লোকটা আপনাকে খুঁজছে।''
রেড্ডির কপালে দুহাত ঠেকিয়ে নমস্কার জানানোর এবং কৃতজ্ঞতায় সজল দুটো চোখের ছবি মনে ছাপিয়ে নিয়ে অমর বেহালায় তার নতুন বাড়িতে ফিরে এসেছিল। রাত্রে খাবার টেবলে তার বাবা চিত্তরঞ্জনকে সে বলেছিল, ''আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে। তিরিশ—পঁয়ত্রিশ বছর আগে যাত্রীতে খেলত, দুর্দান্ত প্লেয়ার, এতকাল যার কোনো খবরই ছিল না, সবাই ধরে নিয়েছে মরেটরে গেছে এমন একজনকে আজ আচমকা আবিষ্কার করে ফেলেছি। আর কীভাবে করেছি জান?''
অতঃপর সে সবিস্তারে রেড্ডির সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা বাবা, মা, বৌ এবং ছোটবোনকে শোনায়। অবশেষে বলে, ''ওকে আমি আসতে বলেছি। ডাক্তার তরুণ দত্তকে দিয়ে দেখিয়ে দেব।''
''ভালই করেছিস।'' চিত্তরঞ্জন মাথা নেড়ে ছেলের কাজটিকে অনুমোদন জানালেন। ''প্রত্যেক জেনারেশন ঋণী তার আগের জেনারেশনের কাছে। ঋণ শোধ করাই তো মনুষ্যত্ব।''
ঘরের সবাই নতুন একজন হিরো আবিষ্কার করার মতো চাহনি নিয়ে অমরের দিকে তাকিয়ে ছিল।
অমর সুধাকর রেড্ডিকে খুঁজে পাওয়ার কথা অফিসে গল্প করেছিল এবং ক্লাবেও জানিয়েছিল। শুনে অনেকেই শুধু তাকিয়ে থেকে ''তাই নাকি'' ধরনের মন্তব্য করে। যাত্রীর টেন্টেও বিস্ময় ছাড়া আর কিছু উৎপন্ন হল না। তবে রেড্ডির সঙ্গে খেলেছে এমন লোকেদের মধ্যে একমাত্র সলিল মণ্ডলই নিয়মিত ক্লাবে আসেন। তিনিই শুধু আগ্রহ দেখালেন।
''সুধা যদি আসে তাহলে আমাকে একটু খবর দিও। খুব গুণী ফুটবলার। ও লেফট হাফ আমি লেফট আউট, আমাদের মধ্যে একটা চমৎকার আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল। চড় মারার মতো হাতটা নেড়ে ও আমাকে ইশারা করত, আমিও দৌড় শুরু করতাম। জানতাম কোন জায়গায় পৌঁছলেই বলটা পায়ে এসে যাবে। ঠিক এসে যেত। ওর পাস যেন কম্পুটারে হিসেব কষে তৈরি করা।'' সলিল মণ্ডল উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। তারপর বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেন, ''বরাবরই বাউণ্ডুলে প্রকৃতির, যা হাতে পেত জুয়া আর নেশায় উড়িয়েছে। গুণ্টুর জেলায় ওর গ্রাম, সেখানে কখনো যেত না। কলকাতাতেই পড়ে থাকত। বলত দেশে কেউ নেই। লেখাপড়া একদমই জানত না। বাংলাটা খুব তাড়াতাড়ি শিখে ফেলেছিল। রবিদা তখন গ্রাউন্ড সেক্রেটারি, একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর এক বন্ধুর সিমেন্টের গোডাউনে। মাস ছয়েক পর ছাড়িয়ে দেয় মাতলামো করার জন্য।''
অমর বলেছিল, ''পা ভেঙে যেতে ক্লাবেরই তো উচিত ছিল চিকিৎসা করানোর। এটা তো ক্লাবেরই মর্যাল রেসপন্সিবিলিটি!''
সলিল মণ্ডল ম্লান হেসে বলল, ''তখন কলকাতায় এইসব ইনজুরির জন্য ভাল ডাক্তার ছিল না। বড় ধরনের চোট পাওয়া মানেই খেলা শেষ হয়ে যাওয়া। সুধার অবশ্য ট্রিটমেন্ট হয়েছিল। এখন কষ্ট পাচ্ছে শুনে বড্ড খারাপ লাগছে। অমর তুমি যদি ওকে একটু আরাম দিতে পার তাহলে আমি তোমাকে দুহাত তুলে আশীর্বাদ করব।''
অমরের খুব ভাল লাগল প্রৌঢ়ের এই আন্তরিক ব্যাকুলতাটি। ''খুব গুণী ফুটবলার'' আর তারই কদরের জন্য তাকে অনুরোধ করছেন। নিশ্চয় সে তা রাখবে।
কলকাতার ফুটবল মরসুম শেষ হল। যাত্রী লিগে রানার্স হয়েছে। দুর্গাপুজোর সময় দিল্লিতে ডুরান্ড কাপে সেমিফাইনালে হেরে অফিশিয়াল আর সমর্থকদের হতাশা, ক্রোধ, বিদ্রূপের বোঝা মাথায় নিয়ে তিক্ত বিরক্ত অমর কলকাতায় ফিরল। বোম্বাইয়ে রোভার্স কাপে খেলতে যাবার আগে যখন প্র্যাকটিস চলছে, তখন নভেম্বরের কনকনে সকালে সুধাকর রেড্ডি একটা রেশনের থলি হাতে ঝুলিয়ে অমরের বাড়িতে হাজির হল। অমর মাঠে যাবার জন্য তখন বেরোতে যাচ্ছে।
একগাল হাসি নিয়ে রেড্ডি বলল, ''বাবু আমি এসে গেলাম। আসতে বলেছিলেন, মনে আছে?''
অমর কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে তার বিস্ময়টাকে হজম করল। ব্যাপারটা তো সে ভুলেই গেছে! বিব্রত হয়ে সে বলল, ''কিন্তু আমি তো এখন প্র্যাকটিসে যাচ্ছি। না ফেরা পর্যন্ত আপনি বাড়িতেই থাকুন।''
অমর বাড়ির সবাইকে ডেকে রেড্ডির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। রেড্ডি দাড়ি গোঁফ কামিয়েছে, ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো চুল ঘাড় ছাড়িয়ে ঝুলছে, লতাপাতার ছাপ দেওয়া সিন্থেটিক বুশ শার্ট আর জিনসের প্যান্টটা ঢলঢলে, পায়ে হাওয়াই চটি। চোখদুটিতে প্রভূত উৎসাহ ও প্রত্যাশা। দেখে অমরের মায়া হল। মাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, ''ওকে খেতে দাও খুব গরিব, একটু বেশি করে দিও।''
ক্লাব তাঁবুতে তিনজন সাংবাদিক যাত্রীর কোচ ও অধিনায়ককে প্র্যাকটিসের পর নানান প্রশ্ন করছিল। রোভার্সে দলের সঙ্গে চারজন যেতে পারবে না। তারা অফিসের টুর্নামেন্ট খেলতে পরশু কটক যাচ্ছে। তাহলে যাত্রীর সঙ্গে কারা কারা বোম্বাই যাবে? তারা উত্তর পেয়ে সিনিয়র প্লেয়ার অমরকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই অমর বলল, ''আপনারা চমকে যাবেন এমন একটা খবর আপনাদের দেব। শুনলেই আপনারা ঝাঁপিয়ে পড়বেন।''
তিনজন সাগ্রহে ঘিরে ধরল অমরকে। বছরের এই সময়টায় খবরের আকাল চলে। লোকাল ক্রিকেট থেকে কত আর মুচমুচে স্টোরি বার করা যায়! টেস্ট ম্যাচ নেই, ডুরান্ড শেষ, রোভার্সে এখনও কলকাতার দল নামেনি। বিদেশেও তেমন কিছু অঘটন ঘটছে না।
''বিগত যুগের বিখ্যাত ফুটবলার।'' অমর কথা বন্ধ করে নাটকীয় নীরবতা তৈরি করল। তিন সাংবাদিকের মুখে প্রত্যাশিত কৌতূহল ফুটে ওঠার পর সে বলল, ''সুধাকর রেড্ডি, একসময় যিনি যাত্রীকে অনেক সম্মান, অনেক ট্রফি এনে দিয়েছেন, সেই হায়দ্রাবাদী ফুটবলার এখন দুঃস্থ দরিদ্র, না খেতে পেয়ে, চিকিৎসার অভাবে এই বাংলারই এক গ্রামে মরতে বসেছেন। আমি তাঁকে খুঁজে পেয়েছি। তিনি এখন আমার বাড়িতে।''
এরপর সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়ে অমর ক্লাবেই ভাত খেয়ে নিজের স্কুটারে অফিস যায় এবং দুপুরেই বাড়ি ফিরে আসে। বাড়িটা সদ্য তৈরি, এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। একতলায় তিনঘরের একটা ফ্ল্যাট করেছে ভাড়া দেবার জন্য। ভাড়াটেও ঠিক হয়ে গেছে কিন্তু মেঝেয় টালি বসানোর এবং ইলেকট্রিকের কাজ বাকি রয়েছে। রোভার্স থেকে ফিরে এলে কাজ শুরু হবে। দোতলাতে কাঠের পালিশ চলছে। অমর এখন লিজ না পাওয়ার, ডুরান্ড না পাওয়ার সঙ্গে বাড়ি সম্পূর্ণ করার দুর্ভাবনায় জড়িয়ে রয়েছে। এরমধ্যে রেড্ডি এসে হাজির!
বাড়িতে ফিরে অমর শুনল, ভাত খেয়ে ''একটু ঘুরে আসি'' বলে রেড্ডি বেরিয়েছে। থলিটা দালানের এককোণে রাখা। চিত্তরঞ্জন বললেন, ''ট্রিটমেন্টের জন্য কদিন লাগবে কে জানে, ওকে নিচের একটা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়। ইলেকট্রিক না থাকলেও অসুবিধে কিছু হবে না।''
বিকেলে পাড়ার এক ওষুধের দোকান থেকে অমর ফোন করল ডাক্তার তরুণ দত্তকে। যা শুনল তাতে চিন্তায় পড়ে গেল। ডাক্তারবাবু মাদ্রাজে গেছেন অর্থোপেডিকদের এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে হাজির থাকতে। কবে ফিরবেন বাড়ির লোক বলতে পারল না। তিনি না ফেরা পর্যন্ত রেড্ডিকে কি রেখে দেবে, না এখন ওকে ফিরে যেতে বলবে?
মা বললেন, ''এসে পড়েছেই যখন, দুটো দিন থেকে যাক।''
বাবা বললেন, ''ডাক্তারবাবু হয়তো কাল পরশুই এসে যেতে পারেন।''
কিন্তু পরশুই সন্ধ্যার ফ্লাইটে অমর বোম্বাই চলে যাবে।
''আমরা তো আছি। তুই ফেরা না পর্যন্ত ওকে রেখে দেব। নিচে থাকবে আর দুবেলা খাবে, ঝামেলা তো নেই।'' চিত্তরঞ্জন ছেলেকে নিশ্চিন্ত করলেন।
পরের দিনই সেই তিন রিপোর্টারের একজন এসে হাজির। সঙ্গে ফটোগ্রাফার। দোতলায় সোফায় বসে রেড্ডি সাক্ষাৎকার দিল। তার নানান ছবি উঠল অমরের সঙ্গে। রিপোর্টারকে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেল অমর।
''অমর তুমি রেড্ডির জন্য যা করছ, এখনকার কোনো ফুটবলারদের কাছ থেকে তা আশা করা যায় না।''
''না না, আমি আর কী এমন করলাম—''
''বিনয়ের দরকার নেই, এটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ভাল করে লোককে জানানো দরকার যে দেশে এখনও মানুষ আছে।''
''সত্যি বলতে কি লোকটাকে দেখে চোখে জল এসে গেছল। ভিখিরিরাও ওর থেকে বোধহয় ভাল থাকে।''
''তোমার মধ্যে দয়ামায়াটা একটু বেশিই।''
অমরের দেহমন বেয়ে একটা উল্লাস ঝরে পড়তে লাগল। লিগ বা ডুরান্ড না জেতার গ্লানি যেন ধুয়ে গেল। তার মনে হল, ভাগ্যিস ফ্যানবেল্টটা সেদিন ছিঁড়ে গেছল নয়তো রেড্ডিকে তার পাওয়াই হত না। এই প্রশংসাও তাহলে জুটত না। ওকে যত্ন করে রাখা দরকার।
বাড়িতে ফিরে সে রেড্ডিকে একতলার ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে থাকতে দেখে বলল, ''আপনি উপরে গিয়ে টিভি দেখুন না।''
''না বাবু, আমি এখানেই ভাল আছি।''
''আবার বাবু বাবু বলছেন?''
রেড্ডি হাসল। অমর দুটো দশ টাকার নোট ওর হাতে দিয়ে বলল, ''রাখুন। কখন কী দরকার হয় বলা যায় না, কাছে থাকা ভাল।''
রেড্ডি টাকা ধরা হাত কপালে ঠেকাল। তাই দেখে অমরের বুকের মধ্যে কী যেন একটা ফেঁপে উঠল যেটা সে আগে কখনো বোধ করেনি। সকালে খবরের কাগজে খেলার পাতায় প্রথমেই তার চোখে পড়ল ছবিটা। দু হাতে সে রেড্ডিকে জড়িয়ে ধরে, গালে গাল ঠেকানো। তার নিচের লেখাটি পড়তে পড়তে সে তাজ্জব হয়ে গেল।
এ সব কি সে বলেছে? রেড্ডি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ভিক্ষে করছিল? একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে অমর চা খাচ্ছে তখন রেড্ডি তার কাছে এসে পয়সা চায়। অমরের মনে হল মুখটা যেন চেনাচেনা, নিশ্চয়ই কোথাও সে দেখেছে। তারপরই মনে পড়ল, ক্লাবটেন্টে টাঙানো একটা গ্রুপ ফটোয় এই মুখ সে দেখেছে। তখন সে নাম জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে ইনিই সেই বিখ্যাত ফুটবলার সুধাকর রেড্ডি একসময় যিনি ময়দান কাঁপিয়ে ছিলেন।
এছাড়াও, রেড্ডি ইতিমধ্যে একটা ইটভাটিতে মজুরের কাজ পেয়ে যাওয়ায় সে কামাই করে কাজটা হারাবার ভয়েই নাকি চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসতে চায়নি। অমর দুবার তাকে আনতে গেছল, দুবারই তাকে ফিরে আসতে হয়েছে। অবশেষে অমর প্রতিশ্রুতি দেয় ইটভাটি থেকে ছাঁটাই হলে সে তাকে কলকাতায় কাজ যোগাড় করে দেবে। এরপর রেড্ডি কলকাতায় এসেছে। ডাঃ তরুণ দত্ত তার পা পরীক্ষা করবেন আগামী বুধবার। অমর বোসের মহানুভবতার কথা নিয়েছে পুরো এক প্যারা।
অমরের প্রথমেই মনে হল এখুনি একটা চিঠি লিখে তথ্যগুলো মেরামত করা উচিত। কিন্তু তার বাড়ির সবাই বলল, ''দরকার কি? ড্রামাটিক করার জন্য একটু এধার—ওধার করে লেখা হয়েছে কিন্তু ব্যাপারটা তো ওই রকমই?''
''কিন্তু রেড্ডি কী ভাবল বল তো?''
''ভাববে মানে!'' চিত্তরঞ্জন অবাক হয়ে বলেন, ও পড়তে জানে নাকি? লোকটা, বলতে গেলে তো ভিখিরিই ওর কোনো মানমর্যাদা বোধ আছে নাকি?
অমর চিঠি লেখার বাসনা ত্যাগ করে বিকেলে দমদম রওনা হল প্লেন ধরার জন্য। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় রেড্ডির সঙ্গে দেখা করে বলে যায়, নিজের বাড়ির মতোই যেন এই বাড়িকে সে ভাবে, কিছু দরকার হলে যেন চেয়ে নেয়। কুড়ি টাকা ছাড়াও আরও কিছু হাতে রাখবেন কি? রেড্ডি হাত জোড় করে ঘাড় নেড়ে জানায়, দরকার নেই।
সেইদিনই রাত সাড়ে নটা নাগাদ পাড়ার কয়েকটি যুবকের কাঁধে ভর দিয়ে রেড্ডি ফিরল বেহুঁশ অবস্থায়। বাড়ির সবাই বিভ্রান্ত এবং লজ্জিত। একটি যুবক বলল, ''আজই অমরদার সঙ্গে ছবি বেরিয়েছে বলে চিনতে পারলাম। এককালের এত বড় প্লেয়ার! রাস্তায় আমাদের সামনেই পড়ে গেল, তুলে না আনলে অমরদারই বেইজ্জতি হত।''
''ভালই করেছ বাবা।'' চিত্তরঞ্জন চোপসানো গলায় বললেন। ''অমর তো আজই বোম্বাই গেল। কাগজে তো এর সম্পর্কে সবই পড়েছ। তোমরা একটু দেখো।''
রেড্ডিকে ওরাই শুইয়ে দিয়ে গেল। পরদিন সকালে চিত্তরঞ্জন ঘটনা জানিয়ে রেড্ডিকে বললেন, ''আপনার নিজেরও তো একটা মানমর্যাদা আছে। এখনকার ছেলেরা আপনার খেলা দেখেনি বটে কিন্তু কাগজে তো কাল পড়েছে। ওরা তো আপনার নামের জন্যই তুলে এনে পৌঁছে দিল। দয়া করে আর খাবেন না।''
রেড্ডি মাথা নিচু করে শুনল। হাত জোড় করে শুধু বলল, ''বহুদিন পরে তো একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছি।'' দুপুরে সে বাড়ি থেকে বেরোবার সময় অমরের বোনকে বলে গেল, কালীঘাটে পুরনো দোস্ত অন্তুর সঙ্গে সে দেখা করতে যাচ্ছে। সন্ধ্যাবেলায় ফিরে এসে একতলার আলোবিহীন ঘরে শুয়ে পড়ল। রাতে সে কিছু খেল না। শুধু বলল, ''অন্তুটা মরে গেছে, মন খারাপ লাগছে।''
পরের দিন রেড্ডি আবার দুপুরে বেরোল। জানিয়ে গেল, পার্ক সার্কাসে গোলাম নবির সঙ্গে দেখা করতে। বাড়ির রাস্তাটা মনে করতে পারছে না তবে খুঁজে ঠিক বার করে নেবে। রেড্ডি ফিরল রাত এগারোটায়। রাস্তা তখন জনশূন্য। চিত্তরঞ্জন দোতালায় বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন। রেড্ডি বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থেকে নামল। ভাড়া না নিয়েই ট্যাক্সিটা চলে গেল। নেমে এসে চিত্তরঞ্জন দরজা খুললেন।
''নবির ছেলের ট্যাক্সি, পৌঁছে দিয়ে গেল।'' রেড্ডির কথা জড়ানো, সামান্য টলছেও। ''খুব খাইয়েছে। এই দেখুন নবি নিজের একটা গরম চাদর আমাকে দিয়েছে।'' হাতের পলিব্যাগটা সে তুলে ধরল। ''আমি চাইনি, ও নিজে থেকেই দিল। খুব পয়সা করেছে।'' রেড্ডি হাসল এবং ঘরে ঢুকে গেল।
পরদিন চিত্তরঞ্জন বললেন, ''আবার আপনি খেয়ে ছিলেন?''
রেড্ডি আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে বলল, ''খাব না! খেলার আর এক মিনিট বাকি, আমি দুজনকে...না তিনজনকে কাটিয়ে থুরু দিলুম ঠিক নবির পায়ে, বক্সের ডান দিক দিয়ে ও ঢুকছিল তখন। না থামিয়েই বাঁ পায়ে মারল, বার আর পোস্টের জয়েন্ট যেখানে ঠিক সেইখান দিয়ে নেটের উপর দিকে বল লাগল। সেই গোলে আই এফ এ শিল্ড জিতলুম। অমন গোল আমি জীবনে দেখিনি। নবি সেই গল্প করছে আর ঢালছে....খাব না!'' রেড্ডির বিশ্বাস হচ্ছে না যে অমন এক স্মৃতি, বত্রিশ বছর পর চোখের সামনে খেলতে শুরু করলে বিনা স্ফূর্তিতে তাকে মর্যাদা দেওয়া সম্ভব কি না।
চিত্তরঞ্জন আর কথা বাড়ালেন না। স্ত্রীকে শুধু বললেন, ''অমর খুব ভুল করেছে।''
যাত্রী রোভার্সের ফাইনালে উঠেছে। চিত্তরঞ্জন ম্যাচ রিপোর্টের কয়েকটা লাইন কলম দিয়ে দাগিয়ে পুত্রবধূকে পড়তে দিলেন, ''অমর সম্পর্কে লিখেছে। পড়ে ওকে শোনাও।''
অমরের বৌ শ্বাশুড়িকে শোনাবার জন্য চেঁচিয়ে পড়ল। ''নিজের হাফ লাইনে অমর যখন বল ধরল, শেষ বাঁশি বাজার আর তিরিশ সেকেন্ডও বাকি নেই। বল নিয়ে সে দ্রুত উঠতে শুরু করল, পরপর তিনজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সুনীলকে বল ঠেলে দিয়েই সে পেনাল্টি স্পটের দিকে ছুটে গেল এবং সুনীলের কাছে থেকে ফেরত আসা বল না থামিয়েই অমর চকিতে শট নিয়ে জালে পাঠাল। খেলা শেষ হতে তখন পাঁচ সেকেন্ড বাকি। অসাধারণ গোল। ডেম্পোর খেলোয়াড়দের হতবাক হয়ে নিজেদের গোলের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। স্মরণকালের মধ্যে এমন দুরন্ত চমক দেওয়া গোলে যাত্রীর জয় কখনো ঘটেনি। এটা একাই ঘটাল অমর বোস।''
তিনজনের মুখই গর্বে উদ্ভাসিত। চিত্তরঞ্জন বললেন, ''কাগজটা দাও তো, ওকে পড়ে শুনিয়ে আসি।''
রেড্ডি বালতিতে সাবান জলে জামাটা ডোবাচ্ছিল। চিত্তরঞ্জন ওকে পড়ে শোনালেন। রেড্ডি গেঞ্জিটাও ডুবিয়ে হাত দিয়ে চাপতে চাপতে বলল, ''বাবু খুব বড় প্লেয়ার। এখানে একথা আমি শুনেছি। আফসোস হচ্ছে ওর খেলা আমার দেখা হয়নি আর হবেও কিনা জানি না।'' রেড্ডির ম্লান মুখ। মাথাটা ঝাঁকাবার সঙ্গে সাদা চুলের রাশ নড়ে উঠল।
''আফসোস হবারই কথা। এসব গোলের কদর আমাদের মতো লোক যারা কখনো ফুটবল খেলেনি তারা আর দেবে কী করে! আপনাদের মতন লোকেরাই এর মূল্য বুঝবেন।''
''তাহলে বাবু'' রেড্ডির চোখ তীব্র হয়ে উঠল ''নবির গোলটা আমার দেখা সেরা গোল। না না, বাবু ভাল গোলই করেছে, কাগজে তো আর বাজে কথা লিখবে না, নিশ্চয়ই ভাল গোল তবে—'' রেড্ডি থেমে গেল।
''তবে কী?'' চিত্তরঞ্জন তাঁর গলার রুক্ষতা ঢাকার কোনো চেষ্টা করলেন না। তাঁর মনে হচ্ছে অমরের প্রশংসা এই লোকটি মন থেকে মেনে নিতে নারাজ।
''বলটা ঠিকমতো যদি ঠিক জায়গায় না পায় তাহলে যত বড় প্লেয়ারই হোক ফাসটাইম শট টার্গেটে মারতে পারবে না। নবি আমার কাছে সেটা স্বীকার করল। হ্যাঁ, মানল। সলিলও মানত। যেদিন গোল করত আমার থুরু থেকে সেদিন সলিল খাওয়াত।'' রেড্ডির চোখে দূর অতীত থেকে বোধহয় থ্রু পাসগুলো ফিরে আসতে শুরু করল। সে বালতির মধ্যে দুহাত ডুবিয়ে জামা আর গেঞ্জি কচলাতে কচলাতে কাঁধে চোখ ঘষল।
সেদিন যাত্রীর সঙ্গে কেরালা পুলিসের রোভার্স ফাইনাল। টিভি—তে খেলাটি সারা ভারতে দেখানো হবে। রেড্ডি খেলা শুরুর আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। খেলা শেষের দু মিনিট আগে পর্যন্ত যাত্রী এক গোলে এগিয়ে ছিল। তারপর পুলিস দল পেনাল্টি পায়। অমরকে পিছনে ফেলে বল নিয়ে যাত্রীর পেনাল্টি সীমানায় ঢুকেছে পুলিসের জোসেফ অমর পিছন থেকে লাথি মেরে তাকে ফেলে দেয়। বলাবাহুল্য রেফারিকে ঘিরে আবেদন, তর্ক, ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে যায়। এরপর রেফারি লালকার্ড তুললেন অমরের দিকে। পেনাল্টি থেকে গোল এবং ফল হল এক—এক। অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হবার আগেই টিভি—তে খেলা দেখানো বন্ধ হয়ে অন্য অনুষ্ঠান শুরু হল।
বাড়িতে থমথমে নৈঃশব্দ্য বিরাজ করছে। সকলেই কথা বলছে নিচু স্বরে, হাঁটছে পা টিপে, বাসনের শব্দ হওয়ার জন্য ঝি চাপা ধমক খেল। চিত্তরঞ্জন বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসলেন। অতিরিক্ত সময়ের খেলার কী হল সেটা জানার কোনো উপায় আপাতত পাচ্ছেন না। একসময়ে তাঁর স্ত্রী এসে বারান্দায় দাঁড়ালেন। চিত্তরঞ্জন ফিসফিস করে আপনমনেই বললেন, ''তখন ল্যাংমারা ছাড়া অমরের আর কিছুই করার ছিল না। কিন্তু লাল কার্ড কি শুধুশুধুই দেখাল?....ওই মুহূর্তে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়, সাবধান হতে হয়.... একটা প্লেয়ার এই সময় কমে যাওয়া মানে যে কত ক্ষতি।''
''ও ভাল খেলছিল বলেই, ষড়যন্ত্র করে ওকে....''
''চুপ করো।'' চিত্তরঞ্জন তিক্তস্বরে স্ত্রীকে থামিয়ে দিলেন।
লোডশেডিং শুরু হয়েছে। অন্ধকারের দিতে তাকিয়ে ওরা সবাই বারান্দায়। শীত পড়েছে কিন্তু জাঁকিয়ে নয়। হালকা গরম কাপড় ওদের গায়ে। ভিতরে দালানে এমার্জেন্সি ব্যাটারি ল্যান্টার্ন জ্বলছে।
অমরের বোন বলল, ''টিভি—তে স্থানীয় খবরে নিশ্চয় রেজাল্ট বলবে। রেডিওটার ব্যাটারিও তো গেছে।''
''খবরের কাগজের অফিসে নিশ্চয় রেজাল্ট এসে গেছে। একটা ফোন যদি থাকত।'' চিত্তরঞ্জন খেদ জানালেন।
''অ্যাপ্লাই তো করা হয়েছে।'' অমরের বৌ বলল।
হঠাৎই মোড়ের কাছে পটকা এবং বোমা ফাটার আওয়াজ উঠল। একটা উল্লাসের মতো একটা হইচই শোনা যাচ্ছে। এলাকাটা যাত্রীর সমর্থকদের।
''শুনছ বাবা?''
''হ্যাঁ বোধহয় জিতেছে।''
''জেনে আসব?''
''আমি যাচ্ছি।''
টর্চ হাতে চিত্তরঞ্জন প্রায় ছুটেই রাস্তায় বেরোলেন এবং মিনিট পাঁচেক পর ফিরে এসে বালকের মতো দুহাত তুলে ''জিতেছে, জিতেছে'' বলে নাচতে শুরু করলেন। ''ফ্রি কিক করে হেড করে নিশীথ গোল দিয়েছে একস্ট্রা টাইমের আঠারো মিনিটে। কাগজের অফিস থেকে জেনেছে।''
''যাক অমর তাহলে দায়মুক্ত।'' অমরের মা বললেন।
বাড়িতে যখন সবাই জোরে কথা বলছে তখন বাইরে একটা বেসুরো গোলমাল এগিয়ে আসছিল। সবাই বেরিয়ে এল বারান্দায়।
অন্ধকারে অন্তত দশ—বারোজন লোক বাড়ির সামনে। তাদের একজন চেঁচিয়ে বলল, ''কাকাবাবু, আজ কিন্তু ছাড়ব না। যাত্রীকে খিস্তি করছে, অমরদাকে বলছে প্লেয়ারই নয়।''
''না বাবু, আমি ওইরকম করে বলিনি।'' রেড্ডির চিৎকারটা জড়ানো কণ্ঠের।
''ব্যাটা দারুণ টেনেছে কাকাবাবু। ফের যদি যাত্রীর নামে একটা কথা বলেছে তাহলে পুঁতে ফেলব।''
''বাবু শট মারলে গোল হয়....তবে কিনা মারার জন্য বলটা তো পেতে হবে। ....ঠিক বলছি কিনা বলুন। যাত্রী আবার একটা টিম? ফুউঃ উঃ...একটা টিম? ....আমি যদি আজ, বাবু, বাবু, আমার পা—টা.... শুনছেন? ....অমর ফমর স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত থুরু কাকে বলে। সলিলের বাড়িতে টিভি দেখেছি, ও আমায় খাবার পয়সা দিল...।''
''ব্যাটা কবে বড় প্লেয়ার ছিল জানি না, কাকাবাবু ওকে আর বাড়িতে রাখবেন না। আজই তাড়ান। একটা নুইসেন্স!''
অন্ধকারে বারান্দা থেকে ঝুঁকে চিত্তরঞ্জন বললেন, ''অমর তো কালই আসছে, আসুক ও।''
''বাবু, আমার পা—টা যদি ভাল থাকত, সবাইকে নাচাতুম... অমরকে দশটা পেনাল্টি করতে হত।''
''চুপ শালা।''
একটা চড় মারার শব্দ হল, সেই সঙ্গে কারুর পড়ে যাবার।
''থাক থাক, ওকে মেরো না।'' চিত্তরঞ্জন ব্যথিত স্বরে বললেন। ''ওকে বরং ঘরে শুইয়ে দিয়ে যাও।'' তিনি নিচে নামলেন দরজা খুলে দেবার জন্য।
পরদিন সকালে বাড়ির ঝি দুধ আনতে যাবার জন্য নিচে নেমে রেড্ডির ঘরে উঁকি দিয়েই ছুটে উপরে গিয়ে বলল, ''লোকটা নেই, থলেটাও নেই।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন