ইমেজ

মতি নন্দী

জ্ঞানশেখর তৈরি হয়েই অপেক্ষা করছেন। চৈত্রের মাঝামাঝি, তিনদিন পরই অন্নপূর্ণা পুজো। সকাল থেকে ত্বক চিটচিট করে তবু তিনি সাদা ঢলঢলে সুতির ট্রাউজার্সের সঙ্গে সুতির ঘিয়ে রঙের কোটটাও পরেছেন। কোটের হাতা ছাড়িয়ে নেমে আসা শার্টের কাফজোড়ায় ময়লা ধরেছে। এইমাত্রই এটা লক্ষ্য করেছেন। ভেবেছিলেন শার্টটা বদলাবেন, তারপর ভাবেন কাফটা গুটিয়ে লুকিয়ে নেবেন। কি ভেবে আর করা হয়নি। ভেবেছিলেন টাই পরবেন। চুরুটটা হাতে নিয়ে বসে আছেন, কি ভেবে সেটাও ধরাননি। জুতোর চামড়া পিঁজে—দুতিনটে ভাঁজ পড়েছে। নতুন ব্লেডে একটু আগেই দাড়ি কামিয়েছেন। ভিজে ব্লটিংয়ের মতো গালে হাত বুলোতে বুলোতে চোখ বুজলেন। ঠাণ্ডা, নরম, মসৃণ। তাঁর মনে হল, কোটটা খুলে রাখলে মন্দ হয় না।

তখনি নিচে থেকে মোটরহর্নের বিপবিপ ভেসে এল। সামনের টেবিলে রাখা ছোট স্যুটকেসটার দিকে তাকিয়ে তিনি জানলায় এলেন।

কালো ফিয়াটটা ঠিক জানলার নিচেই। গাড়ির পিছনের জানলায় রাখা একটুখানি বাহু ও কনুই তিনি দেখতে পেলেন। অলি, বড় নাতনি অলির। ড্রাইভার বংশী কপালে হাত ঠেকিয়ে সেলাম জানাল। জ্ঞানশেখর মাথা হেলালেন এবং তাকে উপরে আসতে ইশারা করলেন।

তিনি নামলেন, পিছনে স্যুটকেস হাতে বংশী। অলি একা নয়, আরো দুটি মেয়ে গাড়িতে। পিছনের দরজা খুলে ধরে অলি বলল, ''দাদু এসো।'' তিনি ইতস্তত করে সামনের সিটে বসা মেয়েটির দিকে তাকালেন। আশা করছেন মেয়েটি নেমে এসে পিছনে ওদের সঙ্গে বসবে। তাই হওয়া উচিত। এদের মধ্যে তিনিই বয়স্ক, যথেষ্ট বড়ো, অন্তত অর্ধ শতাব্দীর। গাড়িটি তাঁরই ছেলের। সেরা আসনটি তাঁরই পাওয়া উচিত।

মেয়েটি শান্ত চাহনিতে একবারমাত্র জ্ঞানশেখরের দিকে তাকাল। কোলে রাখা রঙিন একটা পত্রিকা। মাথা হেঁট করে আবার মনোযোগী হল। অপ্রতিভ বোধ করলেন জ্ঞানশেখর। ফিকে হাসলেন এবং ছ'ফুট দু ইঞ্চি দেহটা নুইয়ে পিছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন। আড়ষ্ট হয়ে বসা ছাড়া উপায় নেই তিনজনের।

''দাদু এরা আমার বন্ধু, জ্যোতি আর রুণা। এরাও যাচ্ছে।''

''বেশ।''

তাঁর পাশে বসা মেয়েটি দুইমুঠি তুলে নমস্কার জানাবার চেষ্টা করল। ভেবেছিলেন হয়তো প্রণাম করবে। উনি জোড়কর কপালে ঠেকালেন, ঈষৎ মাথা নুইয়ে। দেখলেন চুরুটটা এখনো হাতেই রয়েছে। কোটের বুকপকেটে সেটি রেখে দিলেন।

''আমার দাদু, ওঁর কথা তো বলেইছি।''

পাশের মেয়েটি মাথা হেলাল। সামনের মেয়েটির কানে অলির স্বর যেন পৌঁছয়নি মনে হল। এদের মধ্যে কে জ্যোতি আর কে রুণা এখনো তিনি জানেন না।

''কী হল বংশী, দেরি হয়ে যাচ্ছে যে।'' অলি জানলা দিয়ে মুখ বার করে বলল। পিছনে কাচ দিয়ে দেখার জন্য ঘাড় ফেরাতে গেলেন জ্ঞানশেখর। মেয়েটির বাহুতে ও হাঁটুর কাছে তাঁর দেহের চাপ পড়ল। মেয়েটি যেভাবে কুঁকড়ে গেল তাতে তাঁর মনে হল, যেন এটা প্রত্যাশা করছিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সামনে তাকিয়ে নিজেকে কাঠ করে ফেললেন। পিছনে ডালা বন্ধ করার শব্দ হল।

''ক্লাচ প্লেটটা স্লিপ করছে। গ্যারেজে পাঠানো হয়েছে।'' অলি বলল।

''বৌমা যাবে না?''

''মা কাল যাবে ট্রেনে, বাবার সঙ্গে। এখন আর বেশিদূর কারে যেতে পারে না।''

ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়ে, কোন রাস্তা দিয়ে যেতে হবে বলা জ্ঞানশেখরের বরাবরের অভ্যাস। ট্যাক্সিতে উঠেও তাই করেন। এটা তাঁর কাছে তৃপ্তিদায়ক ব্যাপার। গাড়িটা ল্যান্সডাউন থেকে সার্কুলার রোডে পড়ে বাঁ দিকে বেঁকছে, তিনি ''আহ'' বলে উঠলেন। বংশী থামিয়ে ফেলল।

''ডাইনে, মৌলালি হয়ে বেলেঘাটা ভি আই পি রোড ধরে চলো।''

''না, বাঁ দিকে যাবে। আমার ক্যামেরাটা নিতে হবে বিডন স্ট্রিট থেকে। তারপর মানিকতলা দিয়ে ভি আই পি।'' সামনের মেয়েটি, এতক্ষণে জ্ঞানশেখর নামটা জেনে গেছেন, জ্যোতি, আলতো কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, বংশী বাঁ দিকেই, চৌরঙ্গি রোডের দিকে গাড়ি ঘোরাল।

জ্ঞানশেখর প্রফুল্লতা হারালেন। তাঁর মনে হল, পরনের কোটটার মতোই তিনি এই গাড়িতে ফালতু লোক। কিন্তু জ্যোতির কণ্ঠস্বর তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। বলার ভঙ্গিতে, বহুকাল পর মৃদু তরল কম্পন তাঁকে ছুঁয়ে গেল। মেয়েটি একবারও মুখ ফেরায়নি বা পিছনের দুজনের কথার মধ্যে অংশ নেয়নি। দুই কান ঢেকে ঝালরের মতো মরচে রঙের চুল হলুদ শার্টের কলারের উপর দিয়ে। নাকের ডগা, চোখের পাতা বা চিবুক ছাড়া কিছু তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। পাশের মেয়েটি রুণা, ওর রেশমকাপড় থেকে তিনি বাসি সুগন্ধ পাচ্ছেন। অলির কথার পিঠে কথা জুগিয়ে যাওয়াই ওর কাজ। তিনি মাঝে মাঝে কান পাতলেন। যাদের সম্পর্কে ওরা বলছে, তাদের উল্লেখ করছে পদবি বা ডাকনামে—বিজি, সেহনবীশ, ফেনি, জিতা, খোসলা। পদবিগুলো ছেলেদের। ড্রাইভারের জন্য পিছন দেখার ছোট্ট আয়নাটায় তিনি জ্যোতির একটি চোখ ও ঠোঁটের আধখানা কাঁপতে দেখলেন। দেখতে দেখতে একসময় তিনি নিজেকেই বললেন, 'এ মেয়ে কোনোদিন কাউকে আপন করবে না, করা সম্ভব নয় এর দ্বারা।' তারপর ভাবলেন, এরা মনে করে, দুনিয়াটা ওদের কাছে বশ্যতা মেনে আছে। তবে এরা, এই জ্যোতিরা, ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের মেজাজে ঠিকই চলে যায়। যায় যেহেতু টান ধরাবার মতো চেহারা এদের থাকে আর অবশ্যই কিছু বোবা পুরুষও।

বিডন স্ট্রিটে প্রাচীন একটি বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াল। সারিবদ্ধ বিবর্ণ খড়খড়ির জানলা আর বালিখসা দুটো মোটা থাম এবং জরাজীর্ণ লোহার ফটক। জ্যোতি নেমে বলল, 'এক মিনিট।' পরনে কাউবয় জিনস। ছুটে সে বাড়িটার মধ্যে ঢুকে গেল। জ্ঞানশেখর তারিফের ভঙ্গিতে মাথাটা নোয়ালেন। চমৎকার মেয়ে! ও জানে, নিশ্চয়ই জানে বা মনে হয় জানে কী ও পেতে চায়। যত তুচ্ছই চাওয়াটা হোক না ঠিকই পেয়ে যায়। এরা যা চায় সে সম্পর্কে এদের স্পষ্ট ধারণা থাকে। তাছাড়া ভগবান এদের আকর্ষণ দিয়েছে, চাওয়া জিনিসটার দিকে ওর কাঁচা বয়স তড়বড় করে এগোতে পারে, একে প্রতীক্ষা করতে হবে না যেভাবে জ্ঞানশেখর নিজে করেছেন। দুনিয়াটাকে ও দৃকপাত না করেই চলে যেতে পারে।

একটি বালক চাকর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ''আপনাদের চা খেতে ডাকছেন।''

অলি ও রুমা নেমে গেল। জ্ঞানশেখরকে সঙ্গী হতে বলল না। তিনি আশা করেছিলেন বলবে। চুরুটটা ধরাবার কথা একবার ভাবলেন। তলপেটটা ভার লাগছে। রাস্তায় নেমে কোথাও ভারলাঘব করা যায় কিনা দেখার জন্য যতটা সম্ভব রাস্তাটা সমীক্ষা করে হতাশ হলেন।

ওরা একসঙ্গে ফিরে এল। জ্যোতির কাঁধ থেকে ঝুলছে চামড়ার খাপে ভরা ক্যামেরা। ওদের কথা থেকে জ্ঞানশেখর বুঝলেন এটা জ্যোতির মামাবাড়ি। ভি আই পি রোডে একটা অ্যামবাসাডর ওদের অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছিল, জ্যোতি হাত বার করে নাড়তে থাকল। মন্থর হয়ে অ্যামবাসাডরের তরুণ চালক দাঁত ঝলসিয়ে বলল, ''কোথায় যাচ্ছ?''

''বন্ধুর বাড়ি, বসিরহাটে অন্নপূর্ণা পুজো দেখতে। তুমি কোথায়?''

''এয়ারপোর্টে, দিদিরা আসছে টোকিও থেকে।''

ইতিমধ্যে জ্যোতি ক্যামেরা চোখে তুলেছে। তরুণটি চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে হাসতেই শাটারের শব্দ হল।

''উঠবে তো?''

''মনে তো হয়।''

''কপি দিও, বাই।'' অ্যামবাসাডর গতি বাড়িয়ে দ্রুত ক্ষুদ্রকায় হল।

''গাড়িটার পিকআপ দারুণ, কে রে জ্যোতি?''

''দুটো বাড়ি পরে থাকে।''

বাতাসের তাত বাড়ছে। জ্ঞানশেখর কোটের বোতাম খুলে দিলেন। রুণা বলল, ''কাচটা আরো নামিয়ে দিলে ভাল হয়।''

হাতটা ঘোরাবার জন্য তিনি সামান্য ঝুঁকলেন। রুণার হাঁটুতে তার হাঁটু স্পর্শ করল। রুণা সঙ্কুচিত হল। জ্ঞানশেখরের মনে হল, অলি এদের কাছে নিশ্চয় তাঁর সম্পর্কে কিছু বলেছে। কী বলতে পারে তা তিনি জানেন। দাদু কেন একাকী আলাদা থাকেন, এটা রুণার মতো মেয়েরা ওকে জিজ্ঞাসা করবেই। আয়নায় দেখলেন, হুহু বাতাসের বিরুদ্ধে জ্যোতির চোখ তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো। কানের পাশে ঝাপটাচ্ছে চুলগুলো। জ্ঞানশেখরের মনে হল, এই মেয়ে নিশ্চয় কোনো মানুষকে দখল করতে কিংবা বিত্ত বা কেরিয়ারটা গুছিয়ে নেবার জন্য বহু আগে থেকেই নিজেকে মনে মনে তৈরি করে রাখবে। বাজি ধরে বলতে পারেন, যেটা ও চায় সেটা ঠিকই পেয়ে যাবে। আর যদি বুঝতে পারে, কিরকম অদ্ভুতভাবে যেন বুঝতে পারে, পাওয়াটা যেরকমভাবে যতটা হওয়ার তা হচ্ছে না, তাহলে সেটাও সময়মতো বুঝে যাবে। তখন ও নির্দয়ভাবে ভ্রূক্ষেপ না করে চলে যাবে, কণামাত্র লাবণ্য নষ্ট না করেই।

বসিরহাটে বাড়িতে পৌঁছে গাড়ি থেকে তিনিই প্রথম নামলেন, তারপর জ্যোতি। মাটিতে পা রাখতেই দুই হাঁটু থরথর করে উঠল। এতক্ষণ মুড়ে বসে থাকায় অসাড় হয়ে গেছে। দুমড়ে ভেঙে পড়ছে, হাত বাড়িয়ে গাড়ির দরজাটা ধরতে গিয়ে ফস্কালেন এবং মাটিতে দু হাত রেখে উবু হয়ে বসে পড়লেন। সাহায্য করবে না, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েই যেন অবিচল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল জ্যোতি। পাঁচ—ছয় সেকেন্ড পর হেসে ব্যাপারটি চুকিয়ে ফেলে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়েও পারলেন না। অন্যরা গাড়ির মধ্য থেকে তাঁর দিকে তাকিয়ে। কেউ সাহায্য করতে আসেনি সেজন্য কৃতজ্ঞ হলেন। দরকার নেই কেননা সত্যিই তিনি অথর্ব নন, বুড়োও হননি; একাত্তর। অবশেষে বংশীই সাহায্য করল বগলের নিচে দু হাত রেখে টেনে তুলে।

''ঠিক আছি, ঠিক আছি, পা—টায় ঝিঁঝি ধরেছিল।''

ওদের আগে তিনি বাড়িতে ঢুকলেন। জ্ঞানশেখরের ঘরটি পুবে। দক্ষিণে প্রধান দেউড়ি এবং ঠাকুরদালান। দোতলায় ওঠার আগে তিনি সিঁড়ির পাশে একদা সেরেস্তাখানা বড় ঘরটায় উঁকি দিলেন। আধখানা জুড়ে ধানের বস্তা, একটা চৌকি আর চাষের কয়েকটা যন্তর ও পাম্পসেট। খালিগায়ে অল্পবয়সী একটি ছেলে স্ক্রু ড্রাইভার হাতে। ওকে দেখে ছেলেটি সসম্ভ্রমে লুঙিটা হাঁটুর নিচে নামিয়ে বলল, ''আমি মঞ্জুল সেখের ছেলে, আপনাদের চাষ করি।''

''ভালো।'' জ্ঞানশেখর মাথা হেলালেন। এখনকার কাউকেই তিনি চেনেন না। বছরে একবার কয়েকদিনের জন্য এলে বাড়ির লোকজন বা আজকের দুজন অতিথির মতো কেউ ছাড়া, আর কারুর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎও সম্ভব নয়। মঞ্জুল আর অঞ্জুল, বছর পনেরো আগে কয়েকটি বাচ্চাকে এনে দেখিয়েছিল। ওদের ব্যাটা, তারই একজন।

''কী হয়েছে এটার?''

''ঘটঘট শব্দ করছে, হঠাৎ জোরে চলে আবার আস্তে হয়ে যায়।''

জ্ঞানশেখর সিঁড়ির দিকে এগোলেন। পদুর মা নিচে নামছে। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল।

''কিরে, তুই এখনো বেঁচে আছিস!''

পদুর মা একগাল হেসে মাথা কাত করল।

''সরস্বতী পুজোর সময় এট্টু জ্বর—জ্বর মতো হইছিল। তুমি কেমন আছ?''

''ভালো। দিদিমণি কোথায়?''

''উপরে।''

পদুর মা প্রায় সত্তর। এগারো বছর বয়স থেকে এ—বাড়িতে। জ্ঞানশেখরের বিধবা বোন, ষাটের কাছাকাছি দেবিকা নামতে নামতে বলল, ''কে, দাদা?''

''দেবি কেমন আছিস রে।'' জ্ঞানশেখর কয়েক ধাপ উঠে সিঁড়ির বাঁকের চওড়া জায়গাটায় দাঁড়ালেন। দেবি ঝুঁকে প্রণাম করতে উদ্যত, জ্ঞানশেখর ''থাক থাক'' বলে উঠলেন। আঙুল জুতোয় স্পর্শ করল কিনা বুঝতে পারলেন না। তবে দেবি নিজের হাতের আঙুল মাথায় ছোঁয়াল।

''গরমে কোট পরেছ, দেখছি তো ঘামছো!''

''এপ্রিলে গরম তো হবেই, একশো ডিগ্রি ছিল পরশু।''

''ঘরে যাও। জল দিয়ে রেখেছে, স্নানটা সেরে নাও। আমি চা পাঠিয়ে দিচ্ছি—চা খাবে? ঘোল কি ডাব কি দুধ?''

''চা—ই ভাল। অলি আর ওর বন্ধুদের বরং ডাবই দিস।''

''তাহলে তোমাকেও ডাব দিই। অলি শেষ মুহূর্তে জানাল আসছে। ওর বন্ধুদের দিয়েছি তোমার পাশের ঘরটা। তোমার বাথরুমটা ওরাও ব্যবহার করবে।''

জ্ঞানশেখর দোতলায় নিজের ঘরে এলেন। ঘরটা একই রকম রয়েছে শুধু আসবাবগুলোর কয়েকটা জায়গা বদল করেছে। বেতের ইজিচেয়ারটা জানলার কাছে নেই। তবে ঘরটা আরামদায়ক শীতল। অ্যাশট্রে, পাপোষ, কুঁজো, মশারি ছোটখাট এইসব নিয়ে কেমন ঘরোয়া, ন্যাওটা ভাব, যেন নিয়মিত বসবাস হয়। ব্যাপারটা তাঁর কাছে একদমই অপরিচিত, বিশেষ করে ঘরের কাছেই যেন অপরিচিত তিনি। কুড়ি—পঁচিশ বছর আগে এই বাড়ি যতটা টানত এখন আর তা পারে না। ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে জ্ঞানশেখর ভাবলেন এইবার চুরুটটা ধরাবেন। কোটটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ দলা পাকিয়ে, একের পর এক, দমকা বেগে পুরনো কথাগুলো তাঁর মনে এল। সারা বছর ওগুলো তাঁর মনের কোণেই পড়ে থাকে। কিন্তু এখানে এলে তিনি বহু আগের অথচ চোখের আড়াল নয় তাঁর, এমনসব দুঃখগুলোকে নিয়ে একবার বাৎসরিক সমীক্ষা করেন।

এই বাড়ি, এটা তাঁরই ছিল কিন্তু এখন তাঁর ছেলে পবিত্রশেখরের। পঁচিশ বছর আগে তিনি সোয়ালাখ টাকায় বাড়িটা ও জমিদারি যাকে বিক্রি করেছিলেন, তার দশ বছর পর সেই লোকটি তার একমাত্র জামাই পবিত্রশেখরকে সবই দান করে। সেই আমলে দামটা ভালই পেয়েছিলেন এবং তখন তাঁর টাকার খুবই দরকার ছিল। যাবতীয় কিছুরই তখন দরকার ছিল। কলকাতায় যে—বাড়িতে এখন রয়েছেন, সেটা ওই টাকা থেকেই কেনা। ভাড়াটেদের কাছ থেকে যা পাচ্ছেন তাতেই তাঁর চলে; সাদার্ন অ্যাভিন্যুয়ে পবিত্রশেখরের বাড়ি, শ্বশুরের অ্যাটর্নি অফিসটার পুরো মালিক। তাঁর মনে পড়ল একদিন পবিত্রশেখর তাঁকে বলে, ''মা বলছিল, ডিভোর্স করার দরকার নেই।'' অবাক হয়ে তিনি বললেন, ''এসব কী কথা!'' ''নানান জায়গায় কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে, মানে, মিসেস নাগই হয়তো ছড়াচ্ছেন, কিন্তু ব্যাপারটা তো খুব একটা বাজে কথা নয়, মার সঙ্গে তোমার ব্যবহার তো আমি নিজেই দেখেছি। ব্যাপারটা যদি হয়—অর্থাৎ ডিভোর্স—তাহলে সত্যিই সেটা খুব লজ্জার হবে। আমার বা আমার বৌ কি মায়ের কথা বাদই দিচ্ছি, বংশের মানমর্যাদার কথাও তুলছি না, কিন্তু মার পক্ষে এটা মারাত্মক হবে, মুখ দেখাতে পারবে না। তাছাড়া আমার মনে হয়, তোমার এই বয়সে এসবের, অর্থাৎ ডিভোর্সের দরকারই বা কি। উনি তো তোমার সঙ্গে এমনিই বসবাস করছেন, তাই করুন না। বহু টাকা নষ্ট করেছ, টাকাকড়ি যা তোমার দরকার হবে আমিই দেব।'' পবিত্রশেখর সবশেষে বলেছিল, ''মা যদি আত্মহত্যা করে লোকে তোমায় স্কাউন্ড্রেল বলবে।''

রেনুকা নাগ তখন রাজনীতিতে জায়গা পাবার জন্য ব্যস্ত। পার্লামেন্টে যাবার প্রাথমিক কাজও শুরু করেছে। তার তখন ইমেজ চাই। বিয়ে না করে বসবাস, সেটা তার শত্রুপক্ষের হাতিয়ার। চাপ দিয়েছিল ডিভোর্স করার জন্য। আর অপেক্ষা করে নিজের কেরিয়ার গড়ার কাজে দেরি করতে সে রাজি নয়। জ্ঞানশেখর পারেননি। সাহস হয়নি। তার কারণ, চেয়েছিলেন সন্তানের ইমেজ রক্ষা করতে, বৌমার ইমেজ রক্ষা করতে, সদ্যোজাত নাতনির ইমেজ রক্ষা করতে। স্ত্রীকে বাঁচাতে। আর আজও ওদের ইমেজ রক্ষা করে যাচ্ছেন—ওদের বাবা, শ্বশুর বা দাদু যে ভিখিরি নয়, কারুর বোঝা নয়, এটা ওরা এখনো বলতে পারে। ভাগ্যিস বাড়িটা তখন কিনেছিলেন বা ওর নামে লিখে দেননি। রেনুকা বিয়ে করেছে এক পাঞ্জাবিকে, এম পি—ও হয়েছিল। কিন্তু সেদিন তিনি ছেলেকে বলেছিলেন, ''ভাবছি কলকাতার বাড়িটা বিক্রি করে বাঙ্গালোরে পরিতোষের কাছে চলে যাব। ওখানে ভাল প্র্যাকটিস জমিয়েছে, কেস—টেস দিয়ে আমাকে হেল্প নিশ্চয়ই করবে।'' তিনি জানতেন ঠিক এই ধরনেরই কিছু একটা পবিত্রশেখর চাইছে। তবে মাসখানেকের বেশি বাঙ্গালোরে বাল্যবন্ধুর বাড়ি তিনি থাকেননি।

দরজার বাইরে বারান্দার মেঝেয় ভারী কিছু একটা রাখার শব্দ হল। মঞ্জুল সেখের ছেলে ডাবের কাঁদি আর দা হাতে। অলি তার দুই বন্ধুকে নিয়ে হয়তো নদী দেখতে গেছে কিংবা ঠাকুর দালানে।

''তুমি বরং ডাবগুলোর মুখ ছুলে রেখে দিয়ে যাও। ওরা এখুনিই এসে পড়বে। আর আমার জন্য একটা গ্লাসে ঢেলে দাও।''

ছেলেটি চলে যাবার পর জ্ঞানশেখর গ্লাসে চুমুক দিলেন। ঈষৎ নোনতা কিন্তু স্নিগ্ধ। একচুমুকে শেষ করে প্রফুল্ল বোধ করলেন। সিঁড়িতে ধুপধাপ আওয়াজ শুনে বুঝলেন ওরা তিনজন ফিরেছে।

''জ্যোতি, তোদের এই ঘরটা। ওপাশেরটা আমার আর এপাশেরটা দাদুর।''

''তাই বুঝি আমাদের সঙ্গে থাকবি না?''

''খাটটায় তিনজন ধরবে না রে। মেঝেয় শুবি?''

''হ্যাঁ হ্যাঁ, জ্যোতি কী বলিস আমরা মেঝেয়ই শোব। তাড়াতাড়ি বাপু কর। আমি কিন্তু সাঁতার জানি না, অলি আমায় টানাটানি করবি না বলে রাখছি।''

শ্বেতপাথরের টেবলে রেখে যাওয়া মুখ ছোলা, গোটা সাতেক ডাবের দিকে তাকিয়ে জ্ঞানশেখরের হঠাৎ একটা ছেলেমানুষী ইচ্ছা হল। হাতে করে ডাবগুলো ওদের ঘরে নিয়ে যাবেন। বিশেষ করে জ্যোতির, মসৃণ গ্রীবা তুলে ডাবে চুমুক দেওয়া তিনি দেখবেন। দৃশ্যটা কল্পনায় প্রত্যক্ষ করে চমৎকার একটা আবেশ অনুভব করলেন। মনোযোগ দেবার মতো একটা মানুষের দেখা বহু বিরস নিঃসঙ্গ বছরের পর পেয়েছেন। কথা বলে নিশ্চয় মজা পাওয়া যাবে; এই পৃথিবীটাকে কী চোখে দেখছে, আকাঙ্ক্ষা কতটা, সেটা পূরণে কতটা এগিয়েছে বা কতটা মোহভঙ্গ ঘটেছে—তার ফলে দার্শনিক কথাবার্তা শিখেছে কিনা। বহুদিন বাচ্চা মেয়েদের সঙ্গে খুনসুটি করা হয়নি। দু হাতে দুটো ডাব নিয়ে নজরানা দেবার ভঙ্গিতে হাজির হলে নির্ঘাত গাম্ভীর্য রাখতে পারবে না।

জ্ঞানশেখর ঠিক করলেন বারান্দা দিয়ে না গিয়ে বাথরুমের সঙ্গে পাশের ঘরের যে দরজাটা, সেটা দিয়ে যাবেন। বারান্দায় রুণা আর অলি তোয়ালে হাতে দাঁড়িয়ে। ওদের ডেকে ডাবগুলো দেবেন কিনা ভাবলেন। আগে জ্যোতিকে তারপর ওদের, ঠিক করলেন।

দুটি ডাব হাতে বাথরুমে ঢুকে তিনি দেখলেন পাশের ঘরের সঙ্গে লাগোয়া দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে আছে। হয়তো ওদের কেউ বাথরুমে এসে ফিরে যাবার পর দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছে। ডান হাতের ডাবটা দিয়ে দরজায় টোকা দিলেন। জ্ঞানশেখরের মনে হল যেন ঘরের মধ্যে থেকে ভেসে এল ''এক মিনিট''। তারপর মনে হল বোধহয় ভুল শুনেছেন। স্বরটা যেন ''ভেতরে আয়'' বলল। যাদের দু—তিনবার ভিতরে আসতে বলতে হয়, তাদের তিনি অত্যন্ত অপছন্দ করেন। তাছাড়া এইভাবে বাজে ধারণা তৈরি করিয়ে আলাপ শুরু করাটা মোটেই উচিত হবে না।

তিনি দরজাটা খুললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে দেখলেন তাঁর শোনাটা ঠিকই হয়েছিল, জ্যোতি ''এক মিনিটই'' বলেছিল। ঘরের মাঝখানে, কস্ট্যুম পরার জন্য জ্যোতি কুঁজো হয়ে রয়েছে, নিরাবরণ দেহে। মুহূর্তে জ্ঞানশেখর জেনে গেলেন জীবনের আর যে কটা দিন তাঁর বাকি রয়েছে তা শেষ হয়ে গেল। মেয়েটির চোখে রক্তহিমকরা খুন আর আজীবনের জন্য তাঁর প্রতি ঘৃণার প্রতিশ্রুতি। ঠাণ্ডাগলায় সে বলল, ''বেরিয়ে যান এখুনি, নোংরা বুড়োভাম কোথাকার।''

জ্ঞানশেখর ফিরে এলেন তাঁর ঘরে এবং আরামচেয়ারে। আপন মনে চুরুটটা ধরালেন। যা কিছু করলেন সবই দীর্ঘসময় নিয়ে মন্থরগতিতে। হাতে এখন অফুরন্ত সময়, অত্যন্ত বেশিই যেন তাঁর জন্য। তিনি জানেন আর ঘণ্টাখানেক পর থেকেই নিজেকে তিনি একটা ঘৃণ্য কীট হিসাবে ভাবতে শুরু করবেন। কিন্তু তার আগে এই আরামচেয়ারে বসে চুরুটটা শেষ করতে করতে ভয়ঙ্কর একটা সন্ত্রাসের ছক নিজের জন্য রচনা করতে থাকবেন।

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%