মতি নন্দী
দয়ানন্দ খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল এইভাবে, ''জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত, হিন্দু, আত্মীয়স্বজনহীন, যে কোনো জাতির মেয়েকে বিবাহেচ্ছু। পাত্রী স্বয়ং পত্র লিখুন।''
ঠিকানা ছিল বক্স নম্বরে। তিনদিন পরে কাগজের অফিস থেকে দয়ানন্দ ছেচল্লিশটি চিঠি নিয়ে আসে। অফিস ছুটির পর মনুমেন্টের কাছে মাঠে বসে একে একে চিঠিগুলি পড়ে, তিনটি বেছে রাখে।
একটি চিঠি সন্তানহীনা বিধবার। স্বামী মারা যাবার পর একমাত্র ছেলেটি তিন বছরের হয়ে মারা যায়। এখন স্কুল শিক্ষিকা, গ্র্যাজুয়েট। লিখেছে : ''থাকি শ্বশুর বাড়িতেই। দ্যাওর বিয়ে করেছে, ভাল চাকরি করে, এ বাড়িতে আপাতত আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, বাপের বাড়িতে সৎমা। আমার বয়স আঠাশ, বিয়ে হয়েছিল আঠারো বছরে, সেই স্মৃতি আর কিছুই মনে নেই।''
দয়ানন্দ ভাবল, বিধবা, অন্য পুরুষের বাচ্চাও পেটে ধরেছে। তবু চিঠিটায় কেমন মায়া রয়েছে, টানছে। প্রায় বাল—বিধবাই বলা যায়, তার ওপর সন্তান হারিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে শোকে তাপে এতগুলো বছর কাটিয়ে বিয়ে বসতে চাইছে। শ্বশুরবাড়িতে নিশ্চয় ভাল ব্যবহার করে না, বাপের বাড়িতে গেলে নির্ঘাত হাঁড়ি ঠেলে আর সৎ ভাইবোনদের মানুষ করতে করতে একদিন শুকিয়ে মরে যাবে। উদ্যোগী হয়ে বিয়ে দেবারও কেউ নেই। এইসব মেয়েদের মধ্যে স্নেহ, প্রেম, মমতা বেশি থাকে। তাইতো দরকার।
দ্বিতীয় চিঠিতে লেখা : ''আমরা নয় ভাইবোন। বাবা সাড়ে ছয় শত টাকা মাহিনা পান। আড়াই বছর পর রিটায়ার করিবেন, বড় বোনের বিবাহ হইয়াছে। ভগ্নিপতি স্কুল শিক্ষক, মেজ বোনেরও বিবাহ হইয়াছে, লাভ ম্যারেজ, বাবা কোনো বাধা দেন নাই। আমি সেজ, ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়িয়াছি। বয়স চব্বিশ, সংসারের কাজ আমিই করি। মা হাঁপানিতে ভুগিতেছেন। আমি সুন্দরী। দয়া করিয়া যদি বিবাহ করেন তাহা হইলে খুবই উপকার হয়। প্রণাম জানিবেন।''
চিঠিতে একজায়গায় কাটা। ভুগছেন—টাকে কেটে 'ভুগিতেছেন' লেখা। দয়ানন্দ ভাবল কাজটা কার? সম্ভবত বাবা রিভাইজ করে দিয়েছে। লিখেছে ক্লাস সেভেনে পড়ি। অর্থাৎ ফোর হবে। চব্বিশ বছরটা নির্ঘাত ছব্বিশ। হোক, এইসব মেয়েরা একটু বোকা ধরনের হয় বটে কিন্তু অল্পেই সন্তুষ্ট হয়ে থাকে। আমার মতো গেরস্ত লোকের পক্ষে এই ভাল। অন্তঃকরণ সাদা হবে, অসুখ বিসুখের ঝামেলা থাকবে না, সেবাযত্ন করবে মন দিয়ে। লিখেছে আমি সুন্দরী। কী ছেলেমানুষ! বোধহয় রঙটা ফর্সা আর মাথায় খুব চুল। মায়ায়—মমতায় দয়ানন্দর বুক ভারী হয়ে উঠল।
তৃতীয় চিঠি দয়ানন্দকে লোভে ফেলল। লিখেছে আঠারো বছরের এক কলেজের মেয়ে: ''সাক্ষাতে সব বলব। আপনার সাথে কোথাও দেখা হতে পারে কি?'' বেশি কথা লেখেনি। ঠিকানা দিয়েছে কাঁচরাপাড়ার।
দয়ানন্দ এক কথায় চিঠিটাকে নাকচ করে দিতে পারে। শুধু বয়স আর বিদ্যেবুদ্ধির বহর দিয়ে তার কী হবে। কেন বিয়ে করতে চায়, সেইটাই লেখেনি। সাক্ষাতে সব বলবে, কেন, চিঠিতে লিখে দিলেই তো পারত। গোলমাল আছে। তাহলে আর একে দিয়ে কী হবে। বিয়ে করে তো আরও গোলমালে পড়তে হবে।
কিন্তু অন্যকিছুও তো হতে পারে। কৌতূহল দয়ানন্দকে নাকানি—চোবানি দিতে শুরু করেছে। স্কুল ফাইন্যালটা তো পাস করা, তাহলে চাকরিও তো খুঁজেপেতে করতে পারে, নাকি বাড়ির অবস্থা ভালই। তবে বিয়ে করতে চায় কেন। লটঘট করছে? সামাল দিতে একটা স্বামীর দরকার?
দয়ানন্দ ভাবল খুব বেঁচেছি, ভাগ্যিস মনে পড়ল! তাহলে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হত। রবিবাবু সেদিন তো একটা গল্প বলল, তাদের পাড়ার একটা ছোকরা শেষমেশ আত্মহত্যাই করে ফেলল। বৌটার খুব চটক ছিল, বিয়ের পরও কলেজের ছেলেবন্ধুরাও আসত। দয়ানন্দ আন্দাজ করতে পারে, আঠারো বছরের এই কলেজে—পড়া মেয়েটা নিশ্চয় চটকদার। ছেলে বন্ধু—টন্ধুতো আছেই।
তবে বিজ্ঞাপন দেখে বিয়ে করতে চাইছে যখন, বাড়িতে বাপ—মা হয়তো নেই, কিংবা কোনো আত্মীয়ের পোষ্য, জোর করে টাকার লোভে বিয়ে দেওয়া যায়, যাকে বলে মেয়ে—বিক্রি—সে রকম কেস নয়তো?
দয়ানন্দর মাথা তালগোল পাকিয়ে গেল। অনেকক্ষণ বসে সে ভাবল। এদিকে গড়ের মাঠে সন্ধ্যা নেমে আসছে। ক্লাবের মালীরা ক্রিকেট পিচ জলে ভিজিয়ে খুঁটি পুঁতে ঘিরে দিয়েছে। আশেপাশে কিছু লোক বসে, কেউ একা, কেউ বা আড্ডায়। ঠিকমতো শীত এখনও পড়েনি। দয়ানন্দের দিকে তাকাতে তাকাতে একটি স্ত্রীলোক দুবার ঘুরে গেল। কালো ওভারকোট গায়ে পায়চারি করছে পুলিশ। চা—ওলাকে ডাকার ইচ্ছে হচ্ছিল, বরং মেসে গিয়েই খাবো, এই ভেবে দয়ানন্দ উঠে পড়ল। হিম লাগানোটা ঠিক হচ্ছে না, শ্লেষ্মার ধাত। মাথায় র্যাপার মুড়ি দিয়ে সে ছুটল ট্রামের উদ্দেশে। গলির মধ্যে মেস। তিরিশ বছর এই বাড়িতেই। দয়ানন্দ আছে সাতাশ বছর। সব থেকে পুরনো বোর্ডার, তাই ম্যানেজারের পরেই ওর খাতির। আলাদা ঘর, যা আর কারোর নেই। ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলেই দয়ানন্দ শুয়ে পড়ল। রাত্রের খাবার যেমন ঢাকা তেমনিই রইল। একবার শুধু উঠেছিল, কাঁচরাপাড়ায় চিঠি লেখার জন্য।
শনিবার যা কখনোই করে না, দয়ানন্দ আজ তা করে বসল। পাট ভাঙা ধুতি পাঞ্জাবি পরে অফিসে গেল। অফিস থেকে ঠিক দুটোয় বেরিয়ে গুটি গুটি এসে পৌঁছল ময়দানে। যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মৃতিস্তম্ভের চাতালে দাঁড়িয়ে চারপাশে মন দিয়ে তাকাল। স্তম্ভের গায়ে হাত খানেক চওড়া রক। একটু নিচে সিঁড়ির ধাপ। রুমাল দিয়ে বার কয়েক ঝেড়ে সে বসল।
সামনের জমিতে কিশোরদের গুটি পাঁচ—ছয় দল ক্রিকেট খেলছে। ওপাশে কাঠের তক্তায় ঘেরা মাঠ। পানওয়ালা দয়ানন্দর কাছে এসে শুধিয়ে গেল। না, পান সিগারেট সে জীবনে ছোঁয়নি। বাদামওয়ালা যাচ্ছিল তাকেই ডাকল।
কটা বাজল? দয়ানন্দ ঘড়ি ব্যবহার করে না, ঘাড় ফিরিয়ে, চৌরঙ্গীতে মেট্রোপলিটনের বাড়ির গম্বুজের ঘড়িতে সময় দেখতে চেষ্টা করল। ঠিক বোঝা গেল না, বোধহয় আড়াইটে। সময় দেওয়া আছে তিনটায়।
এলে এইদিক দিয়ে আসতে হবে। শেয়ালদা থেকে ধর্মতলা, তারপর হাঁটতে হাঁটতে এখানে। একটু দূরেই হয়ে গেল। তবে জায়গাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা।
বাদাম খেতে ভাল লাগছে না। গলা শুকিয়ে টান ধরছে। দয়ানন্দ চা—ওয়ালার খোঁজে চারধারে তাকাল। একটু দূরে, টেবলে সোডা লেমনেডের বোতল সাজানো দোকান। গিয়ে খেয়ে এলে হয়। ইচ্ছে সত্ত্বেও দয়ানন্দ উঠল না। শরীরটা আলগা লাগছে। দেহের ভিতর ঝন ঝন করে হাড়ের জোড়গুলো খুলে পড়ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে আবার সময় দেখতে চেষ্টা করল। আড়াইটে যেন মনে হচ্ছে। পাঁচিলের উপরে, দুধারে হেঁট মাথা দুই সৈনিক। কুচকুচে কালো রং পোশাকেরও। দেহের সামনে দুটি হাত, তালু জমির দিকে ফেরানো। মুখ নামানো রাইফেলের বাঁট ধরা ছিল ওই তালুতে। দুজনেই অস্ত্রহীন। রাইফেল দুটো কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।
ফুরফুরে হাওয়া আসছে গঙ্গার দিক থেকে। আজ আর আলোয়ান সঙ্গে নেই। খোলা রোদে হাওয়া এখন মন্দ লাগছে না। ছেলেদের এবং দ্রুত বাঁক ফেরা মোটর টায়ারের ক্বচিৎ চিৎকার ছাড়া স্থানটিতে কোনো কোলাহল নেই। খোঁড়াতে খোঁড়াতে একটি ছেলে চাতালে বসল। বল লেগেছে। ট্রানজিস্টর হাতে এক পথিক মাঠ পেরোচ্ছে। রাজ্যপাল ভবনের ফটকে পিস্তলধারী পুলিশ আনমনে আকাশে তাকিয়ে। বহুদূর থেকে একবার সম্মিলিত উল্লাসধ্বনি ভেসে এল, কোনো মাঠে কেউ হয়তো আউট হল।
চোখ বুজে এসেছিল দয়ানন্দের। খটখট আওয়াজে চোখ মেলল। পিছন দিকের চাতাল দিয়ে কেউ আসছে। আড়ষ্ট হয়ে সামনে তাকিয়ে রইল সে। আওয়াজটা কাছে এসে থামল। আর সেই মুহূর্তে দয়ানন্দের মনে হল, কী দরকার ছিল চিঠি দেবার, কী দরকার ছিল বিজ্ঞাপন দেওয়ার; বেশ তো দিনগুলো এক রকম করে কেটে যাচ্ছিল। বেশ তো কেটে যাচ্ছিল। লোভী, কামুক, ঠিকই হয়েছে।
নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে মরিয়া হয়ে দয়ানন্দ চোখ ফিরিয়ে তাকাল। শুকনো আলুর খোসার মতো দোমড়ানো মুখ এক যুবক, হাতে সেলসম্যানদের ব্যাগ, দাগধরা সাদা প্যান্ট, সবুজ শার্ট, দয়ানন্দকে তাকাতে দেখে সেও তাকাল। অত্যধিক ধূমপানে ঠোঁট কালো, বাঁ হাতের উল্কিতে নামের আদ্যক্ষর। মাথায় প্রচুর চুল। দয়ানন্দের কাছে ধুলোর ওপরই বসল। পা দুটো ছড়িয়ে ব্যাগটা মাথায় দিয়ে আধশোয়া হল। চোখ বুজল।
দয়ানন্দ হাল্কা হয়ে গেল। গোটা শরীরই জমাট বেঁধে গেছল, এবার ঝুর ঝুর করে ভেঙে পড়তে শুরু করল। একটা বল চাতালে পড়ে লাফাতে লাফাতে আসছে। দয়ানন্দ পা এগিয়ে দিল আটকাবার জন্য। আটকাল না, জুতো ঘেঁষে স্তম্ভের গায়ে ধাক্কা দিল। সেলসম্যান চোখ খুলল।
''কটা বাজে আপনার ঘড়িতে?''
লোকটা হাত তুলে দেখে বলল, ''তিনটে পাঁচ।''
দয়ানন্দ চারপাশে তাকাল। রাস্তা পার হবার জন্য দুটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। এদের মধ্যে কেউ কি? না ওপারে ইডেন গার্ডেনে যাচ্ছে। আর একটি মেয়ে একা মন্থরগতিতে চলেছে।
ওই কি?
''এ বছরে কোনো টেস্ট ম্যাচ নেই।''
সেলসম্যান কথা বলছে। দয়ানন্দ মুখ ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাল।
''তাই বুঝি?''
ছোকরা অবাক হল যেন। ভারিক্কি সুরে বলল, ''প্রত্যেক বছরই দেখে দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে এক বছর বাদ গেলে কেমন যেন লাগে।''
দয়ানন্দ রাস্তার ওপারের মেয়েটিকে লক্ষ্য করছিল। হাঁটতে হাঁটতে দূরে চলে গেল।
''খারাপ লাগে?''
ছোকরা হাসল। ''সেই ফরটি এইটে গডার্ডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিম থেকে দেখছি। মারাত্মক নেশা। দেখুন না, কাজকম্মো নেই, পাদুটো ঠিক মাঠে টেনে আনল।'' ছোকরা সেলসম্যানই বটে। গায়ে পড়ে বকবক শুরু করেছে। এক বিহারী পরিবার ছোকরাটির কাছ ঘেঁষে বসল। শহরের দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখে ফিরছে। এত কাছে বসাটা ওর খুব অপছন্দ লেগেছে, তাই দয়ানন্দর দিকে কিছুটা সরে এল।
''অদ্ভুত ভাইটালিটি। ট্যাঁকে বাচ্চা নিয়ে যাদুঘর থেকে চিড়িয়াখানা পর্যন্ত গোগ্রাসে দেখে বেড়াবে। আমরাও ছোটবেলায় এরকম ছিলাম।''
''সব দেখা জানা হয়ে গেলে সময় কাটানোটা যে কী বিশ্রী ব্যাপার।''
এতক্ষণে দয়ানন্দ কথা বলল। অনুমোদনের ভঙ্গিতে ছোকরা ঘাড় নাড়ল।
''বিশেষত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে।''
এবার দয়ানন্দ ঘাড় নাড়ল। বিহারী পরিবারের কনিষ্ঠ সভ্যটি চিৎকার শুরু করেছে। কর্তাটি ওকে থামাতে কোলে নিয়ে লেমনেডের রঙিন বোতলের সারি দেখিয়ে ব্যস্ত রাখছে। অবশেষে ঝালমুড়িওয়ালাকে ডাকল।
''অবশ্য যারা ফ্যামিলিম্যান, ছেলে মেয়ে, ঘর—সংসার করে তারা সময় কাটিয়ে দেয়।'' দয়ানন্দের এই মন্তব্যের কোনো জবাব এল না, ছোকরা হাতঘড়ি দেখে পা দুটো ছড়িয়ে দিল।
একটু যেন শীত করছে। ইডেনের দেবদারুর ছায়া লম্বা হয়ে ছুঁতে আসছে। পথচারীদের সংখ্যা বাড়ছে না। ময়দানের এই দিকে বেশি লোক বেড়াতে আসে না।
''কটা বাজে?''
ছোকরা শুনতেই পেল না। স্থির দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে কিছু ভাবছে। মেট্রোপলিটনের ঘড়ি দেখার জন্য দয়ানন্দ ঘাড় ফেরাতে গিয়েই—হাসপাতালের আউটডোরে ঝিমোয় বা মিছিলের স্লোগানে গলা দেয় বা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে ধার করে জিনিস কেনে, এমনই এক পরিচিত চেহারা দেখতে পেল। জাম রঙের পাট ভাঙা তাঁতের শাড়ি, হাতে ঝোলানো পশমের স্কার্ফ, খাটো হাতের ব্লাউজ। কখন এসে দাঁড়িয়েছে কে জানে। এক দৃষ্টে কিশোরদের এলেবেলে ক্রিকেট খেলা দেখছে। ঘড়ি দেখার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। দয়ানন্দ বুঝতে পারল এ সেই। এমন ভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে যেন কেউ জিজ্ঞাসা করলেই বলবে, এই তো এই মাত্র। অদ্ভুত শব্দ করে সেলসম্যান ছোকরা হাই তুলল, মেয়েটি ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল।
''বাস ট্রামের ভিড়টা বোধহয় এখন কমেছে, শনিবার তো।''
''হুঁ''।
ছোকরা নির্লজ্জ। দয়ানন্দ সামনে তাকাল।
কিছুক্ষণ পরে ডানদিকে। চোখাচোখি হতেই মেয়েটি খেলা দেখতে শুরু করল। দয়ানন্দ আর খেই পাচ্ছে না, এবার কী করা উচিত। কাছে গিয়ে কি বলবে আমিই সেই বিজ্ঞাপনদাতা, আপনাকে আসতে বলেছি। নাকি ও নিজেই এসে বলবে, আমিই সেই, যাকে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু ও আমাকে চিনবে কী করে? আমারই যাওয়া উচিত। কিন্তু একটা অপরিচিত মেয়ের কাছে গিয়ে কথা বললে এই ছোকরা কী ভাববে?
বলটা কিছুদূর গিয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছিল। ছোকরা লাফিয়ে উঠে গিয়ে ধরল। একদল ছেলে চিৎকার করছে, ''এদিকে ছুঁড়ে দিন, আমাদের বল।'' বলটা ও ছুঁড়ল। দূরে ঘেরা মাঠের কাঠের বেড়ায় গিয়ে বলটা লাগল। শব্দটা পাওয়া গেল মুহূর্ত কয়েক পরে। একটি ছেলে বল আনতে ছুটল, আর একজন জোরে গালি দিল।
''উপকার করলুম কিনা, তাই ধন্যবাদ জানাল। আজকালকার ছেলেদের নেচারটা দেখলেন তো।''
দয়ানন্দ লক্ষ্য করল ছোকরার কথায় মেয়েটি মুখ টিপে হাসল।
''কি উপকারটা করলেন? এমনই ছুঁড়লেন যে বল কুড়োতে ওদের আবার ছুটতে হল।''
দয়ানন্দর কথায় ছোকরা অপ্রতিভ হল। ভাবটা কাটিয়ে উঠতে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল ''আপনার ডানদিকে লক্ষ্য করেছেন?''
দয়ানন্দর মুখ ঘুরিয়ে মেয়েটিকে দেখল একবার। ঠায় এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে।
''ব্যাপার বুঝেছেন?''
দয়ানন্দ মাথা নাড়ল। ছোকরা আর একটু কাছে সরে এল।
''এসব হল পার্টিশানের ফল। আগে কিন্তু এসব দেখিনি। সেই ফর্টিএইট থেকে তো ময়দানে যাতায়াত করছি। ময়দানে আর ভদ্রলোকদের আসার উপায় নেই।''
''ঠিক বুঝলাম না কী বলতে চাইছেন।'' দয়ানন্দ যা শুনল তার অর্থ পরিষ্কার, তবু মুখ থেকে কথাগুলো বেরিয়ে এল।
ছোকরা অল্পবিস্তর আহত বোধ করছে। এমন সোজা ব্যাপার না বুঝতে পারায় দয়ানন্দকে সে আস্ত নির্বোধ ঠাওরে বলল, ''ভদ্র মেয়েদের পোশাক কি এই রকম হয়? ভাল করে তাকিয়ে দেখুন।''
চোখে চোখ রেখে দয়ানন্দ বলল, ''পরিষ্কার করে বলুন।''
স্বরে কাঠিন্য ছিল।
ছোকরা ভ্রূ তুলল, কাঁধ ঝাঁকাল।
''এও যদি না বুঝতে পারেন, তাহলে আর কিছু বলার নেই। তবে আমি নিঃসন্দেহ। যদি প্রমাণ চান তাও দেখিয়ে দিতে পারি।''
দয়ানন্দ চমকে উঠল। ব্যাপারটা কোন পর্যন্ত গড়াতে পারে তা বুঝে ভয় পেল। মেয়েটি সম্পর্কে যতটুকু কথা হয়েছে, তাতেই ওকে যথেষ্ট অপমান করা হয়েছে। দয়ানন্দর মনে হল, অপমানের অধিকার তো তাদের নেই। ছোকরা কিছু করতে চায়। কত সহজে বলল, দেখিয়ে দিতে পারি। খারাপ কিছু করার ক্ষমতা আমরা কী সহজেই না পেয়ে গেছি।
এসব কোথা থেকে আমরা পেলাম?
''কী দাদা, চুপ রইলেন যে।''
''কিন্তু আপনার ধারণাই যে অভ্রান্ত, বুঝলেন কিসে?''
দয়ানন্দর গলা কেঁপে গেল। শরীরের ভিতরটা কাঁপছে। ছোকরাকে কিছু করা থেকে নিরস্ত করতে হবে, এইটুকুই সে বুঝেছে।
''দেখুন সেজেগুজে, একা এই রকমভাবে কি আমার আপনার বাড়ির মেয়েরা দাঁড়াতে পারে? যদি বেড়াতে এসে থাকে, বেড়াচ্ছে না কেন? কেন এইভাবে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে?''
উত্তেজিত হয়ে ছোকরা গলা চড়াল। দয়ানন্দ আরও ভয় পেল। চট করে দেখল, মেয়েটি ওদের দিকে পিছু ফিরে একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে।
''কিন্তু এমনও তো হতে পারে ও অপেক্ষা করছে, কারোর জন্য। এইখানেই তার সঙ্গে দেখা করার কথা।''
''কার সঙ্গে দেখা করতে?''
''আমি কি হাত গুনতে জানি যে বলব।''
''নিশ্চয় প্রেমিক—ট্রেমিক।''
''হ্যাঁ, হতে পারে।''
''হাসালেন মশায়, এসব ক্ষেত্রে প্রেমিকরাই দু—ঘণ্টা আগে এসে পায়চারি করত। আপনার যদি এরকম হত?''
কথায় কথায় যেন ছোকরা অনেকটা থিতিয়ে এসেছে। এইভাবে কথার জালেও যদি ধরা দেয়, দয়ানন্দ ভাবল, তাহলে আটকে রাখা যায়। ততক্ষণে মেয়েটিও নিশ্চয় চলে যাবে। এখন ওর চলে যাওয়াই ভাল।
''আমার হলে? ধরুন বাইরে থেকে আসছে ট্রেন লেট করল, এটা মোটেই আনন্যাচারাল ব্যাপার নয়। তাছাড়া অ্যাকসিডেন্ট ঘটতে পারে, কে জানে যার জন্য অপেক্ষা করছে সে হয়তো এখন হাসপাতালের এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে পড়ে আছে।''
''কোয়ায়েট ন্যাচারাল, কিন্তু এ সবই অনুমান।''
দয়ানন্দ রেগে উঠল। ''আমারটা অনুমান আর আপনারটাই যথার্থ, না? আমাদের টিকে থাকার মতো এতবড় একটি সত্যি ব্যাপার, সেটাও কি অনুমানের উপর নির্ভর করে নয়? সব ব্যাপারই যে আমরা জেনে গেছি বা আমাদের চোখের সামনে ঘটবে এমন কোনো কথা নেই। অনুমানে বুঝতে হয়, আর তাইতেই প্রমাণ হয় আমরা কে কতটা শিক্ষিত, সভ্য।''
ঠকঠক করে দয়ানন্দর বাইরের শরীর কাঁপছে। আরও অনেক কথা ভিতরে দাপাদাপি করছে। ফলে দুই চোখ বিস্ফারিত, কপালে চিটচিটে ঘাম।
''ভাল কথা, কার অনুমান ঠিক হাতেনাতে প্রমাণ হয়ে যাক।''
কথা শেষ করেই ছোকরা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে চোখমেরে তীক্ষ্ন শিস দিল।
''এসব কী, এসবের মানে কী?'' দয়ানন্দ ওর কাঁধদুটো ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল। ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে ছোকরা অত্যন্ত নিস্পৃহ স্বরে বলল, 'অশিক্ষিত, অসভ্য অনেক কিছুই তো বললেন, তাহলে ওকেই জিজ্ঞাসা করি।''
''কী জিজ্ঞাসা?''
জবাব না দিয়ে ছোকরা উঠে দাঁড়াতে গেল।
''না।''
চিৎকার করেই দয়ানন্দ ওর মুখে সজোরে চড় মারল। পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল ও। শুধু দপদপ করছে রগের পেশী। ''আমি'' দয়ানন্দ ওঠে দাঁড়াল, ''আমিই যাচ্ছি।''
ওকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দয়ানন্দ মেয়েটির দিকে এগোল।
চিৎকার শুনে মেয়েটি তাকিয়েছিল। চড় মারতে দেখে দু—এক পা এগিয়েছিল। দয়ানন্দকে আসতে দেখে থমকে দাঁড়াল।
''আপনি,'' হাঁপাচ্ছে দয়ানন্দ। ''আপনি এখানে কী করতে দাঁড়িয়ে আছেন?'' মেয়েটির চোখে মুখে বিস্ময় ফুটল।
''এভাবে এসব জায়গায় খারাপ মেয়েরা দাঁড়ায়।''
''একজনের সঙ্গে দেখা করার কথা। তিনিই আমাকে এখানে আসতে বলেছেন। কিন্তু আপনি গায়ে পড়ে এসব কী বলছেন?'' ঝাঁঝালো স্বরে মেয়েটি বলল।
''এই রকম জায়গায় যে দেখা করতে বলে, তার মতলব মোটেই ভালো নয়। আপনি বদমাশের পাল্লায় পড়েছেন। ওই যে ছোকরাটি, যাকে চড় মারলাম, ওই আপনাকে আসতে বলেছে। ওকে আমি চিনি। এইভাবে ও অনেক মেয়েকে ভুলিয়ে সর্বনাশ করেছে। আপনি এখনি চলে যান।''
শুনতে শুনতে মেয়েটির মুখে ভয় ফুটল। চারপাশে তাকিয়ে ইতস্তত করল। দয়ানন্দর মুখের দিকে বারেক তাকাল। তারপর হনহন করে রওনা হল। দয়ানন্দ পিছন থেকে দেখল ওর কনুইয়ের কাছে আঁচড়ের খড়ি ওঠা দাগ। কোনো এক সময়ে চুলকে ছিল।
সেলসম্যান ছোকরা ব্যাগটা হাতে নিয়ে দয়ানন্দর পাশে এসে দাঁড়াল। ওর মুখের উপর চোখ মেলে বোবা রইল দয়ানন্দ।
''কে ঠিক?''
জবাব না দিয়ে ভূতে পাওয়ার মতো দয়ানন্দ ফিরে এল যেখানে বসেছিল। পাশে তাকাল, বিহারী পরিবারটি কখন উঠে চলে গেছে। ইডেনের দেবদারু থেকে বাদুড় উড়ল। জাহাজ ভোঁ দিচ্ছে। রাজ্যপাল ভবনের ফটক দিয়ে গুর গুর শব্দে মোটর বাইক বেরোল। যা ঘটল এর জন্য একজনই দোষী। দয়ানন্দর মাথা নুয়ে পড়ল। একজনই মাত্র দায়ী। আমার মূলে কোথাও পচ ধরে আছে। নয়তো বুক ফুলিয়ে বলা যেত আমিই সেই, জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত, হিন্দু, আত্মীয়স্বজনহীন যে কোনো জাতির মেয়েকে বিবাহেচ্ছু পাজী, বদমাশ, জোচ্চেচার।
''আপনার ক্ষমা চাওয়া উচিত।''
টেনে টেনে টেনে দয়ানন্দ মাথাটাকে তুলল। দৃষ্টি জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই ছোকরা। গালে হাত বুলোতে বুলোতে মুচকি হাসছে। কিলবিল করে নড়ে বেড়াচ্ছে সিগারেটের ধোঁয়া। ধীরে ধীরে মাথাটাকে আবার নুইয়ে দয়ানন্দ বলল, ''আমাকে ক্ষমা করুন।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন