মতি নন্দী
ক্লাসে মেয়েরা বসে ছিল। বেয়ারা এসে জানাল প্রফেসর আসবেন না। সবাই খুশি হল কেননা এটা লাস্ট পিরিয়ড।
ক্লাসঘর থেকে বেরিয়ে মেয়েরা দাঁড়াল দোতলার করিডরে। করিডরের এক কোণায় প্রফেসরদের ঘর, তার সামনেই প্রিন্সিপালের, তার পাশে সিঁড়ি।
সিঁড়ি দিয়ে মেয়েরা নিচের করিডরে নেমে এল। সেখান থেকে রাস্তায়। ছোট ছোট দল করে ওরা এধার—ওধার ছিটকে গেল। শুধু একটি মাত্র মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। দাঁড়িয়ে থেকে সে চারপাশে তাকাল, তারপর মুখ তুলে দেখল আকাশটাকে।
রোদ্দুরটা আজ ভারি মিষ্টি। ভারি সুন্দর। বিকেলে ঘুম ভাঙার পর হাই তুললে শরীরটা এমন লাগে। আমার ভাল লাগছে এই সময়টা। এখন সবে সাড়ে নটা। বাড়ি পৌঁছনোর কথা সাড়ে দশটায়। এক ঘণ্টা সময় এখন আমার। শুধু আমার। এখন আমি কী করব? বাড়ি ফিরে যাব? রাস্তাটা পার হতে হবে ওই ওষুধের দোকানটার সামনে দিয়ে। তারপর একটা গলি। গলিটা মস্ত লম্বা, সেটা শেষ করে আবার বড় রাস্তা। তাই ধরে কিছুটা গিয়ে আবার পার হব। তারপর সরু গলিটা। গলিটা এপাশ—ওপাশ করে অনেক দূর। আর একটা সরু গলিতে ঢুকে শেষ বাড়ির কড়াটা যখন নাড়ব, তখন দোতলায় জানালায় এসে দাঁড়াবে ভোম্বল। শব্দ করে থুতু ফেলবে। দরজা খুলে দিয়ে মা গম্ভীরভাবে বলবে, আসতে এত দেরি হল যে, ছুটি তো হয়েছে স'দশটায়? না, আজ মা বলবে, এত তাড়াতাড়ি যে!
ওই একঘেয়ে রাস্তা ধরে রোজ রোজ বাড়ি ফিরি। আজ ফিরতে ইচ্ছে করছে না। এক ঘণ্টা সময় হাতে রয়েছে। নতুন একটা রাস্তা দিয়ে যদি হাঁটি! ঠিক এক ঘণ্টা পরে বাড়ি ফিরব। মা কিছু জানতে পারবে না। রোজকার মতো চান করব, খাব, ঘুমোব।
মায়া বলে, স্টেট বাসের জানালাগুলো এমন অদ্ভুত, চললেই ঝমঝম শব্দ হয়, চোখ বুজে শুনলে মনে হয় বৃষ্টি পড়ছে। ওই বাসটার ঝকঝকে রঙ। ওটা নতুন তৈরি হয়েছে নিশ্চয়। ওর জানালাগুলো নড়বড়ে নয়। ওর মধ্যের লোকগুলো বৃষ্টি—পড়ার মজা পাচ্ছে না। আমার বৃষ্টি ভাল লাগে। এই রোদ্দুরটাও ভাল লাগছে। শীতকালের রোদ সব্বায়ের ভাল লাগে। কিন্তু আমি এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করছি কেন? হাঁটলেই তো পারি, যেদিকে খুশি, যেদিকে ইচ্ছে। পুবদিকে হাঁটলে কেমন হয়, ওদিকে অনেক দোকান, অনেক মানুষ।
মেয়েটি ছোট ছোট পা ফেলে পুবদিকে হাঁটতে লাগল। হাত দোলাল। রুমালে মুখ মুছল। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে আকাশ দেখল। আবার হাত দোলাল। তারপর এসে গেল পাঁচ মাথার মোড়ে।
এখন অফিস যাবার সময় ট্রামে—বাসে এই যে ভিড় শুরু হল, কখন যে থামবে ভগবানই জানেন। গীতার মুখ রোজই কাঁদকাঁদ হয়ে যায়। বাসের লোকেরা নাকি নানান কথা বলে এ—সময়ে উঠলে। গীতা মেয়েটা বড্ড ভীতু। ভিড় দেখলে বাসে ওঠে না। জোড়াসাঁকো না জোড়াবাগান পর্যন্ত হেঁটে যায়। ও পিসিমার বাড়িতে থাকে। পিসিটা দারুণ পাজি। একটু জিরোবার পর্যন্ত সময় দেয় না। দেশে মা, বাবা আরো কে কে যেন আছে। গীতা বলেছে চাকরি করবে, বিয়ে করবে না।
ওই মেয়েটি এমন কচকচ করে পান চিবোচ্ছে যেন দুপুরে সিনেমা দেখতে বেরিয়েছে। ও কোথায় যাবে! জামাটা কী পাতলা। লোকগুলো তাকিয়ে যাচ্ছে। ওর পাশের মেয়েটির দিকে কিন্তু কেউ নজর দিচ্ছে না। কী ঘন আর লম্বা চুল! ব্যাগটাকে বুকের কাছে এমনভাবে আঁকড়ে রয়েছে যেন এখনো স্কুলে পড়ে। মুখখানা গীতার মতো কাঁদকাঁদ। বোধহয় অনেকক্ষণ বাসে উঠতে পারেনি। বড্ড রোগা, চাকরি করার মতো স্বাস্থ্য নয়। বাবা অফিস থেকে ফিরেই কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে। অফিসে খুব খাটুনি।
একটা বাস আসছে। লোকগুলোর কোনো হুঁশ নেই। ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। আহা রে! পান চিবোনো মেয়েটি কি ঝুলে ঝুলে যাবে অমন করে। পড়ে যাবে যে!
রোগা মেয়েটি এ বাসে উঠতে পারল না। পরেরটাতেও হয়তো পারবে না। দেরি করে পৌঁছে নিশ্চয়ই বকুনি খাবে। আবার ফেরার সময়ও এমন করে অনেকগুলো বাস ফসকে বাড়ি পৌঁছবে। এমনি করে ও রোজ যাবে আর আসবে। তারপর? কতদিন ও এমনি করে চাকরি করবে? ও কি গীতার মতো ঠিক করেছে বিয়ে করবে না!
আজকের সকালটা ভারি সুন্দর, ভারি ভাল। আমি ওর কথা ভেবে মন খারাপ করব না। রোদ্দুরটা ভারি মিষ্টি। রোদে গা লাগিয়ে চলব। দোকানগুলো ঝকমকে। দোকান দেখতে দেখতে যাব। কী সুন্দর আপেল ঝুলিয়ে রেখেছে। টাইফয়েড থেকে ওঠার পর বাবা কদিন আপেল এনেছিল। কদিন কেন, তিন কি চার। ছেলেদের সঙ্গে পড়তে কেমন লাগে! ওই মেয়েটি নিশ্চয় এখন কলেজে যাচ্ছে। ও কি স্কটিশে পড়ে! ও লেখাপড়া শিখে কী করবে, চাকরি করবে? ওর গোড়ালি ছাড়ানো সেদ্ধ আলুর মতো। নিশ্চয় বাড়ির কাজ করে না। করলে ফাটাফাটা দেখাত।
ন্যাপথলিনের গন্ধটা বেশ লাগে। আমার গা ঘেঁষে লোকটা চলে গেল। ওর গরম পাঞ্জাবি থেকে গন্ধটা এল। পাঞ্জাবির রঙটা সুন্দর।
ডিম—ভাজার গন্ধ আমার ভাল লাগে। কোথায় যেন ভাজছে। এই তো এই দোকানটায়। ও মা, রেবার সঙ্গে ওই ছেলেটাকে যে একদিন দেখেছি। রেবা ওর সঙ্গে সিনেমা দেখে। কী ওর নাম, সুব্রত কি? কাল রেবাকে বলব, আমি সুব্রতকে দেখেছি দোকানে চা খাচ্ছিল।
আমায় দেখে কি সুব্রত চিনতে পেরেছে আমি রেবার বন্ধু? এখন যদি ওর সঙ্গে কথা বলি তাহলে নিশ্চয় অবাক হয়ে যাবে। দেব অবাক করে? না থাক। তার চেয়ে মানুষ দেখি, রাস্তা দেখি। চটির শব্দ শুনতে বেশ লাগছে। সুব্রতকে রেবা বিয়ে করবে। নিশ্চয় করবে, করুক, তাতে আমার কী। সুব্রত চাকরি করে কোথায় যেন। সেই মেয়েটা এতক্ষণে নিশ্চয় বাসে উঠেছে।
আহ সেই ছেলেটার সঙ্গে যদি এখন হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। বিজয়ার প্রণাম করতে বাসে করে যাচ্ছিলাম ন' মাসির বাড়ি। বাসে ভিড় ছিল। আমার হাঁটুতে হাঁটু ঠেকতেই মুখ লাল করে ছেলেটা দাঁড়িয়েছিল। খুব ভদ্র! এখন যদি হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়! তাহলে আমি কী করব! দু মাসেই কি সে আমার মুখ ভুলে যাবে? নিশ্চয়ই চিনতে পারবে। আমিও পারব। ও যদি বলে, ইচ্ছে করে আমি আপনাকে ছুঁইনি, বাসে ভীষণ ভিড় ছিল তাই। তখন আমি কী বলব! একটি কথাও বলতে পারব না। জানি আমি জানি আমি খুব লাজুক। ও অবাক হয়ে খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে যাবে, ও চলে যাবে এই রাস্তার মানুষগুলোও চলে যাচ্ছে। ও অবাক হয়ে চলবে, মনে মনে একটু দুঃখ পেয়ে চলবে, কিংবা কিছুক্ষণ রাগ করে থাকবে। এই মানুষগুলোও কি অবাক হয়ে, দুঃখ পেয়ে, রাগ করে চলছে? এত, এত মানুষ! কী আছে ওদের মনে! আহা, আমি যদি ভগবান হতুম, তাহলে জানতে পারতুম। কিন্তু জেনেই বা কি হবে। এত মানুষের মনের কথা আমি কোথায় রাখব। তার চেয়ে এই ভাল—এই সুন্দর সকাল, এই মিষ্টি রোদ্দুর, ট্রাম, বাস, শব্দ, আলো, মানুষ।
কী সুন্দর, কী সুন্দর রঙগুলো! থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে যেন! যদি উলের বলগুলো নিয়ে ঘাঁটি, বেড়ালবাচ্চার মতো ঘাঁটি, তাহলে দোকানি কি কিছু বলবে? নিশ্চয় বলবে না। খদ্দের তো নাড়াচাড়া করে দেখবেই। তারপর ও জিজ্ঞেস করবে কোন রঙটা আমার দরকার। তখন আমি কি বলব? বলব, সব সব রঙের আমার দরকার। ও বিশ্বাস করবে না। তখন কি আমি ওকে বিশ্বাস করাব? কী করে করাব, আমি তো কিনব না। আমার কাছে কেনবার মতো পয়সা নেই। আছে মাত্র পঞ্চাশটা পয়সা। আধুলি দিয়ে কি উল কেনা যায়?
আমার একটা উলের জামা দরকার। ভোরবেলায় কলেজে আসতে কষ্ট হয়। গলির মধ্যে ততটা মানুষ দেখা যায় না। আর কত দূর থেকেও বাসের শব্দ শোনা যায়। মনে হয় একটা কুকুর অনেকক্ষণ ধরে ছুটতে ছুটতে হাঁপাচ্ছে আর ডাকছে। তখন ভয় করে। একলা রাস্তায় গা শিরশির করে। কুয়াশা ফুঁড়ে ভূতের মতো যে মানুষগুলো বেরিয়ে আসে তাদের দেখলে মন ছমছম করে। অথচ কী ভাল লাগছে এখন। ভোরবেলার মানুষগুলো আর এখন ভূত নয়। একলা থাকলেই ভয় করে। গীতা বিয়ে করবে না। ও সারা জীবন ভয়ে ভয়ে থাকবে। রেবা এখনকার মতোই ডানপিটে থাকবে সারাজীবন। আমি কেমন থাকব? লাজুক, মুখচোরা, ভীতু! কেন আমি কথা বলতে পারি না, মনের কথা বলতে পারি না। সেটা কি অভ্যেস না থাকার জন্য? কেমন করে অভ্যেস করব, কার সঙ্গে কথা বলব? আমার মনে কী এমন কথা আছে যা বলতে হবে! আমি জানি না, আমার মনের কথা কিচ্ছু জানি না। শুধু ভাল লাগছে। এই সকালটা এই রোদ্দুরটা, এই রাস্তাটা।
মেয়েটি একটুখানি দাঁড়াল। চটি থেকে পা বার করে, সিমেন্টের ফুটপাথ যেখানে ভাঙা, যেখানে মাটি বেরিয়ে রয়েছে, সেখানে রাখল। ঝাঁকি দিয়ে বিনুনিটাকে দোলাল। তার পাশ দিয়ে যত মানুষ গেল, সকলের দিকে সে তাকাল। তারপর মুখটা উপর দিকে তুলে হাসল। হেসে মাথা নামিয়ে হাঁটতে শুরু করল। আবার থামল সে। রুমাল থেকে পঞ্চাশ পয়সাটা খুলে নিয়ে হাতের মুঠোয় রাখল। রেখে হাসল। হেসে চলতে শুরু করল। এমনিভাবে থেমে থেমে এধার—ওধার তাকিয়ে সে হাঁটতে লাগল।
ঘড়ির দোকানের লোকটাকে ঠিক বাবার মতো দেখতে। ঘড়ির দোকান দেখলে হাসি পায়। কিন্তু লোকটাকে দেখে নয়, ওকে বাবার মতো দেখতে। অফিসের ছুটি পাওনা থাকলেও বাবা নেয় না। বলে, ওতে নাকি ধারণা খারাপ হবে। কিন্তু শিগগির তো রিটায়ার করবে, তবে এত ভয় কেন! এতকাল ভয়ে ভয়ে চাকরি করে এসেছে! কিসের ভয়? কাকে ভয় করে! বাবা খুব দরকার না হলে পয়সা খরচ করে না। সবাই নিন্দে করে, কিপটে বলে। সকালে রুটি খেয়ে কলেজে আসি, ছুটির সময় ভীষণ খিদে পায়। বাবা অফিসে রুটি নিয়ে যায়। ছুটির সময় নিশ্চয়ই খিদে পায়। বাবা কিচ্ছু খাবে না। আমি জানি বাবা পয়সা জমাচ্ছে। রুমুকে, তপুকে টুপিসোনাকে মানুষ করার জন্য। আমার বিয়ের জন্য পয়সা জমাচ্ছে। আমাদের জন্যে বাবা ভীতু হয়ে পড়ছে। মা খিটখিট করে, বিচ্ছিরি সন্দেহ করে। যদি এখন হঠাৎ বড়লোক হয়ে যাই। বাবা প্রত্যেক মাসে লটারির টিকিট কেনে। হঠাৎ যদি জিতে যায় তাহলে কি সাহসী হবে? কিন্তু কত মাস চলে গেল বাবা কিচ্ছু পায়নি। তবু আশা করে প্রত্যেকবার কেনে। অমন কত হাজার হাজার লোক কেনে। অথচ টাকা পায় একজন। বাবা ভাবে এবার ঠিক পাবে। হাজার হাজার লোক ভাবে এবার ঠিক পাবে। এমনিভাবে মাসের পর মাস শুধু আশা করে যাবে। তারপর বাবা একদিন মারা যাবে, হাজার হাজার লোক একদিন মরে যাবে। তারপর আবার হাজার হাজার লোক লটারির টিকিট কিনবে। প্রত্যেকবার টিকিট কিনে মুখখানাকে কেমন করে বাবা বলে, কত দিকে তো কত পয়সা যায়, দুটো তো মোটে টাকা, যদি লেগে যায় একবার। এই যে লোকগুলো ট্রামে—বাসে চলেছে, আমার গাঁ ছুঁয়ে চলেছে, এরাও তো অমন করে বলে! মানুষের মনে কী যেন হয়েছে, না হলে ভীতু হয়ে পড়ছে কেন, লটারির টিকিট কিনছে কেন!
আজ সকালটা আমার ভাল লাগছে। কোনো কষ্টের কথা আমি ভাবব না। মানুষ ভীতু হবে কেন? আমাদের ভালবাসে বলেই বাবা ভীতু হয়ে পড়ছে। ওই মানুষগুলোও ভালবাসে। ঘড়ির দোকান দেখলে আমার হাসি পায়। একগাদা ঘড়ি আর একেক রকম সময়। কলেজের তিনটে ঘড়ি কিছুতেই এক সময় দেয় না। চিত্রা মাঝে মাঝে পূরবীর ঘড়িটা হাতে লাগিয়ে চাল মেরে বেড়ায়। পূরবীর দিদি বিলেতে ডাক্তারি পড়তে যাবে। ও বলেছে দিদিকে একদিন দেখাবে। ওর দিদির ছবি নাকি কোন এক ফোটোর দোকানে টাঙিয়ে রেখে দিয়েছে। ওই দোকানটায় আছে কি?
এমন ঢঙ করা ছবি বাইরে টাঙিয়ে রাখে কেন? যারা তোলায় তাদেরও কি লজ্জা করে না! মেয়েটি কি সত্যিই এত ফর্সা। খুব আলো দিয়ে তুললে নাকি কালোকেও ফর্সা দেখায়। শিবুদা আমার ফোটো দুপুরে ছাদে তুলেছিল। একদম ঝাপসা হয়ে গেছল। খুব লজ্জা পেয়েছিল। পাবেই তো, তোলার আগে কত কারিকুরি! মুখ তোল, পাশ ফেরো, চুল ছড়াও, গালে হাত দিয়ে ভাবুক ভাবুক হও। হেসে ফেলেছিলাম। খুব রেগে গেছল শিবুদা। হাসাটা কি খুব দোষের হয়েছিল? আর যদি হয়েই থাকে, তাই বলে অমন রাগ দেখাবার কী দরকার ছিল। তিন চারদিন আর আসেনি। অথচ রোজ সন্ধেবেলায় আসত। বিচ্ছিরি লেগেছিল ওই তিনটে দিন। তারপর যেদিন এল কথা বলিনি। তার কদিন পরেই তো মা দেখে ফেলল। কি হয়েছিল সেদিন ওর কে জানে, হঠাৎ হাতটা চেপে ধরল। অবাক হয়েছিলুম। আমায় দু—হাতে জড়িয়ে ধরল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলুম। মুখটা ওর ঝুঁকে পড়ল। আমি মুখ সরালাম না। শিবুদার ঠোঁট গালে ছুঁয়েছিল আর তখনই মা দেখে ফেলল। ন' পিসিকে মা চিঠি লিখেছিল, তোমার দেওর যেন আর আমাদের বাড়িতে না আসে। শিবুদা আর আসেনি। এখন যদি হঠাৎ শিবুদার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তাহলে কী হবে! ও মুখ ফিরিয়ে চলে যাবে। কিংবা বলবে, তোমার মা আমায় যা—তা বলে অপমান করেছে। অপমান মা করেছে, আমি তো করিনি তবে আমার সঙ্গে কথা বলবে না কেন? যদি বলে তাহলে আমি কী বলব! বলব, আমাদের বাড়িতে এস। কিন্তু আমি বললে শিবুদা আসবে কেন, বাড়ি কি আমার? তাহলে কী বলব?
ইস, অনেকক্ষণ রোদ্দুরে হাঁটছি। এবার গরম লাগছে। কটা বাজে এখন? শিবুদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে কী বলব জানি না। আমার গরম লাগছে। উঠোনে এখন রোদ এসে গেছে। বালিশের ওয়াড়গুলো, বাবার গামছা সেদ্ধ করে কাচতে হবে। উঠোনটা এত ছোট অতগুলো জিনিস কিছুতেই তারে ধরবে না। যদি ওই রাস্তাটা উঠোন হত, তবে যত কাপড় আছে সবগুলো কেচে শুকোতে দিতুম ট্রামের তারে। কতদূর গেছে ট্রামের তার? ধর্মতলা তারপর ভবানীপুর, তারপর বালিগঞ্জ। বালিগঞ্জের লেকে পরশু প্রতিমা বেড়াতে গেছল। প্রতিমা একা একা বেড়ায়। ওর বাড়িতে কেউ বকে না। এখন যদি আমি বাসে উঠে লেকে চলে যাই তাহলে কী হবে! বাস থেকে নেমে হাঁটব আর হাঁটব। আর যদি বাড়ি না ফিরি তাহলে কী হবে? বাবা অফিস থেকে ফিরে সব শুনে পুলিশে খবর দেবে, হাসপাতালে খোঁজ নেবে। শঙ্করকাকা একদিন অমন কাণ্ড করেছিল। অফিস থেকে আর বাড়ি ফেরেনি। কাকিমা কেঁদে কেঁদে একশা। বাচ্চাগুলোর কান্না চোখে দেখা যায় না। শঙ্করকাকা ছাড়া ওদের বাড়িতে দ্বিতীয় পুরুষমানুষ আর নেই। আমি যদি না ফিরি তাহলে টুকিসোনা কাঁদবে। দিদি না খাইয়ে দিলে ওর আর খাওয়া হয় না। কিন্তু আমি বাড়ি ফিরব না কেন! শঙ্করকাকার মতো চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের খবর কি আমি পেয়েছি? তবে কী পেয়েছি!
এই আলো, এই রঙ, এই শব্দ, আর মানুষ আর মানুষ! আমার ভালই লাগছে না বাড়ি ফিরতে। সেই একঘেয়ে গলি দিয়ে, ইঁদুর কাটা কাগজের গন্ধওলা ঘরটায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। আমি হাঁটব, যেদিকে দু—চোখ যায় চলে যাব। আমাদের ঘরে শীতে রোদ, গরমে হাওয়া ঢোকে না। রমু ছাদে উঠতে পারে না। কড়িকাঠগুলো কবেকার যেন, ক্ষয়ে ক্ষয়ে সরু হয়ে গেছে। দুপদাপ করলেই বালি খসে পড়ে। জানলা বন্ধ করলেও বৃষ্টিতে ঘর ভেসে যায়। উঠোনটা শুকনো থাকে শুধু গ্রীষ্মকালে। ঘরের সেই, আদ্যিকালের খাটটা আর জায়গা বলতে কিছু রাখেনি। নড়াচড়া করলেই হাঁটুতে লাগে।
এখন কত সহজেই হাঁটছি। যতক্ষণ ইচ্ছে এমনি করে হাঁটতে পারি। দেওয়াল নেই, খাট নেই, পেছল উঠোন নেই।
মেয়েটি রুমাল দিয়ে মুখ মুছল জোরে জোরে। কাঁধটা পিছনে ঠেলে পিঠ মোচড়াল। দুটি আঙুল দিয়ে খসখস করে মাথা চুলকাল। চটির মধ্যে গুঁড়ো গুঁড়ো মাটি ঢুকেছে তাই পা ঠুকে মাটি ঝাড়ল।
এবার সে মাথা নামিয়ে চলছিল। হঠাৎ চমকে উঠল হর্নের শব্দ শুনে। ফুটপাথ থেকে নেমে ছোট রাস্তাটা পার হচ্ছিল, এমন সময় ট্যাক্সিটা মোড় ফিরেছে। থতমত খেয়ে কেঁপে উঠল মেয়েটি। মুঠো থেকে আধুলিটা পড়ে গেল। জোরে হেসে উঠল ট্যাক্সিওয়ালা। ওর পাশের লোকটা গলা বাড়িয়ে কী যেন বলল। আধুলিটা কুড়িয়ে নিয়ে মেয়েটি ছুটে রাস্তা পার হয়ে গেল।
আমায় দেখে হেসে গেল। আমি দেখতে পাইনি ট্যাক্সিটা। আমার দোষ ছিল। এমন বেহুঁশের মতো পথচলা অন্যায়। কিন্তু লোকটা বলল কেন যে এটা কলকাতার রাস্তা। কথাটা খুবই সাধারণ, আমি তা জানি। কিন্তু লোকটার বলার মধ্যে কী যেন ছিল। আমার রাগ হচ্ছে, লজ্জা করছে, শরীর জ্বালা করছে। মা আমায় বলেছিল, হারামজাদী, গলায় দড়ি জোটে না? মরগে যা তবে হাড়ে বাতাস লাগবে। সেদিনও আমার এই অবস্থা হয়েছিল। তবু রক্ষে, শিবুদার সামনে মা কথাগুলো বলেনি। সেদিন মরার কথা ভেবেছিলুম। সারারাত ঘুমোইনি। শেষরাতে কেঁদেছিলুম। তারপর দিনগুলো কেমনভাবে যেন কেটে যেতে লাগল।
আজ মরতে পারতুম। ট্যাক্সিওলা যদি চাপা দিত, তাহলে কোনো দোষ থাকত না। কিন্তু ও আমায় বাঁচিয়ে দিল। ওর ওপর কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। তাহলে আমি রাগ করছি কেন? বাঃ, কী সুন্দর সুন্দর রুমাল। একটা কিনব কি? ওই সবুজ বর্ডার দেওয়াটা। কত করে বলল? পঞ্চাশ পয়সা রয়েছে মাত্র। তাছাড়া কাজ চালাবার মতো একটা তো রয়েইছে। ভাল রুমাল ফুটপাথে নয় দোকানে বিক্রি হয়। সে—রুমালের অনেক দাম! মীরা একটা কিনেছে। আমি পরে কিনব। শিবুদা বলেছিল, কাপড় কিনে আনব, একটা রুমাল করে দিও। ওর সঙ্গে যদি দেখা হয়, তাহলে মনে করিয়ে দেব।
প্রতিমা যে ছাপা শাড়ির দোকানের কথা বলে, এইটেই বোধহয়। এমন সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে কী করে! যারা কিনতে আসে পছন্দ করে কী করে! দেখলে সবকটাই তো কিনতে ইচ্ছে করবে। আমায় যদি কেউ পছন্দ করতে বলে তাহলে কোনটি করব? কিন্তু এমন হাঁ করে শাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকলে লোকে কী ভাববে! আশ্চর্য, কেউ কিন্তু আমার দিকে তাকাচ্ছে না। বোধহয় ভেবেছে কিনব বলে পছন্দ করছি। ট্যাক্সিওয়ালা ঠিক বলেছে, এটা কলকাতার রাস্তা। কিন্তু আমাদের বাড়িটা কেন রাস্তার মতো হয় না। রাস্তায় মানুষ শুধু চলছে তা চলছেই, অন্যের সম্পর্কে কৌতূহল নেই। এখানে মনের খুশিতে হাঁটা যায়। কেউ চাপ দেবে না, জোর করবে না আমার মনের মধ্যে কী কথা জমা হয়েছে জানবার জন্য। ওরা ব্যস্ত নিজেদের ভাবনা নিয়ে, আমি আছি আমার ভাবনা নিয়ে। ওরা একবার শুধু আমার দিকে তাকিয়ে যাচ্ছে, তাও সবাই নয়। আমিও দেখেছি ওদের, তাও সবাইকে নয়। এমনিভাবে আমাদের সময়টা, গলিটা, বাড়িটা আমায় মুক্তি দিক না। আমি ভাবব, অনেক অনেক কথা ভাবব। মানুষ যেমন সবসময় চলছে তেমনি আমার ভাবনাগুলোও চলবে। আমার মন এই সকালটার মতো, রোদ্দুরের মতো, রাস্তার মতো হয়ে যাবে।
বাড়ি ফিরলেই মা বলবে, এত দেরি হল যে! মা সন্দেহ করে। দুপুরের কলেজে আমায় ভর্তি হতে দেয়নি। তাহলেই নাকি আমি নষ্ট হয়ে যাব। মা'র কথার ওপর বাবা কথা বলে না। ভীতু ভীতু মানুষ আমার ভাল লাগে না। শঙ্করকাকাদের ঝগড়া ভাল লাগে না। ওর ছেলেদের ঘ্যানঘ্যান আর হ্যাংলামি দেখলে রাগ হয়। ভোম্বল দিনরাত আমাদের কলঘরের দিকে তাকিয়ে থাকে। জানালায় দাঁড়ালে, উঠোনে গেলে মা রাগ করে। আমি নড়াচড়া করতে পারি না। আমি হাঁফ ছাড়তে পারি না।
এখন ক'টা বাজে? যটাই বাজুক, ঘড়ি দেখব না। আমি এখন হাঁটব। যতদূর রাস্তা গেছে ততদূর হাঁটব। সারি সারি জুতোর দোকান। আমি প্রত্যেকটা দোকানের কাছে দাঁড়াব। প্রত্যেকটা জুতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখব। দেরি হয় হোক, আমি দেখব।
জুতোর সঙ্গে দাম লিখে রাখে না কেন? বাবার সঙ্গে জুতো কিনতে এসে ঠকেছিলুম। দর জানা থাকলে ঢুকতুম না। আমার লজ্জা করেছিল, যখন দোকানি বাবাকে বলেছিল, দরাদরি ফুটপাতে চলে, এখানে এক দাম। শেষকালে রাস্তার দোকান থেকেই চটি কিনেছিলুম। এটা ছিঁড়ে গেছে। বাবা হয়তো আবার ফুটপাথ থেকেই আর একজোড়া কিনে দেবে। আমায় দাঁড় করিয়ে দোকানির সঙ্গে একঘণ্টা দরাদরি করবে। আমার ভাল লাগে না এমনভাবে জিনিস কিনতে। আমায় যদি টাকা দিয়ে দেয় তাহলে পছন্দমতো নিজেই কিনতে পারি। কিন্তু আমার পছন্দমতো কিনতে পারব না, বাবা টাকা দেবে না। তাহলে ওই সাদায় জরির কাজ করাটা কিনতুম।
লোকটা আমায় ভিতরে এসে জুতো দেখতে বলছে। গিয়ে কী হবে, আমি তো আর কিনব না। ওর জামার কলার ফেটে গেছে। বোধহয় ওর ছোটবোন নেই, থাকলে কলারটা উল্টে সেলাই করে দিত।
এক জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাচ্ছে না। রোদ্দুর চড়ছে। শরীর জ্বালা করছে। আমি যদি গাড়িবারান্দাটার তলায় দাঁড়াই তাহলে লোকে ভাববে, হয়তো কারুর জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু সত্যিই তা নয়। এই ষাঁড়গুলো ভয়ানক বিচ্ছিরি! নিরীহের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেও শিঙগুলো দেখলে ভয় করে।
লোকটা বাসের জন্য ছুটছে। পারবে কি ধরতে! পেরেছে। একটা ঠাকুরমন্দির ফেলে এলুম। মনে মনে এখন প্রণাম করলে দোষ হবে না! কী ঠাকুর ছিল? শেতলা, শনি না রাধাকেষ্ট?
ফুলকপির সিঙাড়া লিখে এমনভাবে টাঙিয়ে রেখেছে মনে হয় যেন সরস্বতী পুজো এসে গেছে। রমু বলছিল এবারও পাড়ায় জলসা হবে।
সুলেখার দিদি টাইপ শেখে কি এইখানে? টাইপ জানলে চাকরিতে সুবিধে হয়। কিন্তু শঙ্করকাকাও টাইপ জানে।
হরতালের পোস্টার দিয়েছে। কলেজেও একদিন হয়েছিল। বাবা বলেছিল জোর করে ঢুকবি। নন্দিতাদিরা সিঁড়িতে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়েছিল। ঢুকতে পারিনি শুনে বাবা ভয় পেয়েছিল, বকেছিল।
ভিক্ষে চাইছে। বিচ্ছিরি এদের স্বভাব। মেয়েদের দেখলে আরও বেশি ঘ্যান ঘ্যান করে। যদি চায় তো এক পয়সাও দেব না। চায়নি। বোধহয় লক্ষ্য করেনি। ভালই করেছি ওপাশ দিয়ে ঘুরে এসে। ভিখিরিদের তাড়াতে লজ্জা করে, মা কিন্তু খুব সহজে, দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দেয়।
এইবার রাস্তাটা দেখে পার হতে হবে। রিকশটার আগে কি পার হব? না, ওটা চলে যাক।
আমার মতো নিশ্চয় রাস্তার সব লোক রিকশটার দিকে তাকাবে। তাকিয়ে হাসবে। অমন করে আমিও অষ্টমীর রাতে রিকশয় মা'র কোলে বসে বাড়ি এসেছিলুম। সেদিন রাস্তায় ভিড় ছিল। কেউ হয়তো লক্ষ্য করেনি। করলে হাসত নিশ্চয়। মা বলেছিল একটা গাড়ি করতে। টুকিসোনাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে আমারও কষ্ট হচ্ছিল। রমু অনেকক্ষণ জুতোটা হাতে নিয়েছে। মোজা না পরলে নতুন জুতোয় ফোসকা তো পড়বেই। ভেবেছিলুম বাবা একটা ট্যাক্সি করবে, করেনি। বাড়ি ফিরে বাবা অনেকক্ষণ রিকশওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া করেছিল। শেষটায় রিকশওয়ালা হেরে গেছল। যাবার সময় যা—তা কথা বলেছিল। ট্যাক্সিতে এসবের ঝামেলা নেই, ঝগড়া হবার কোনো উপায় নেই। আমার রিকশর থেকে ট্যাক্সি ভাল লাগে।
ওখানে লোকগুলো ভিড় করে কী দেখছে! কলকাতার রাস্তায় অল্পেই ভিড় জমে। একটু জোরে কথা বললেই লোক জড়ো হয়ে যায়। সিনেমার জন্য দেওয়ালে ছবি আঁকছে! আমার ছবি আঁকা দেখতে বেশ লাগে। শিবুদা যেমন করে পেন্সিল দিয়ে রুমালে ফুল এঁকে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি করে দেওয়ালে মুখ আঁকা। তার ওপর রঙ করা হবে। পেন্সিলের মুখ ভরাট হয়ে যাবে। এক—একটা তুলির আঁচড় পড়বে আর অল্প অল্প করে একটা জিনিস তৈরি হবে। কী ভাল লাগত যখন রুমালে ফুলটা ফুটে উঠত! আর ফুল ফুটবে না।
শিবুদা আর আসবে না। দুপুরবেলায় আমি কী করব? ঘুমোব। চুপ করে শুয়ে সায়া ব্লাউজওয়ালার ডাক শুনব। উঠোনোর এঁটো বাসন কাক কিংবা পায়রা যখন ফেলে দেবে, তখন উঠে গিয়ে দেখে আসতে হবে চোর এসেছে কিনা। আর কি করব দুপুরে, পড়তে বসব? সন্ধেবেলায় শিবুদা ক'দিন পড়িয়েছিল। শিবুদা আসবে না আর, সন্ধেবেলায় কী করব তাহলে!
আমি কী করব কিছু জানি না। এমনি করে কতক্ষণ আর হাঁটব! এই সিনেমা বাড়িটা আমাদের কলেজের মতো দেখতে। ভেতরে ফোটো সাজানো আছে, গিয়ে দেখলে হয়। কিন্তু দেখে কী হবে, এ ছবিটা তো কোনোদিনই দেখতে পাব না। বাবা পছন্দ করে না, মা পছন্দ করে না সিনেমা দেখা। রেবা গল্প করছিল এই বইটার। ও দেখে এসেছে সুব্রতর সঙ্গে। সিনেমায় নামলে নাকি অনেক টাকা পাওয়া যায়। বম্বেতে দশ লাখ টাকা করে দেয়। এত টাকা নিয়ে ওরা কী করে! আমি যদি একখানা বইতে নামি তাহলে সারাজীবন আর কিছু করতে হবে না। অত টাকা নিয়ে আমি কী করব? জমিয়ে রাখব? বাবা টাকা জমায়। বাবা ভীতু হয়ে গেছে। আমি জমাব না। ঝি রাখব বাসনমাজার জন্য। পূরবী চাকর নিয়ে বাজারে যায়, পঞ্চাশ টাকার বাজার করে। ফুলু মাসির বিয়েতে মা একটা রুপোর সিঁদুরকৌটো দিয়েছে, পূরবীর ঘড়িটা জন্মদিনে ওর মাসিমা দিয়েছে। ও যদি জন্মদিনে আমায় নেমন্তন্ন করে তাহলে অনেক দামী জিনিস দেব। আর কী করব? এই গলি থেকে উঠে যাব। সুন্দর একটা বাড়ি ভাড়া নেব। ছাদে ওঠা যাবে। মা বসে বসে শুধু বড়ি দেবে। রমুকে বিলেত পাঠাব। রমু রবার দেওয়া একটি পেন্সিল চেয়ে ধমক খেয়েছে বাবার কাছে। ওকে শেফার্স কিনে দেব। ছাপা শাড়ির দোকানটায় একদিন যাব। উলের দোকানে গিয়ে যত খুশি ঘাঁটব।
সিনেমার ডিরেক্টররা কি কালোচশমা পরে? জুলফি রাখে না? সাদা প্যান্ট পরে? সাদা জুতো পরে? রেবা বলেছিল ওরা নাকি বাবুগিরি করে, খুব সিগারেট খায়। ও লোকটা কি সিনেমা—ডিরেক্টর? যদি ও এসে বলে, আপনার নাম কী, বাড়ির ঠিকানা কী, আমি একটা বই তুলব, আপনি নামবেন? তাহলে কী বলব! রেবা বলেছিল কাকে যেন এমনি করে রাস্তা থেকে নিয়ে গেছল বইতে নামাবার জন্য। সে এখন তিনখানা গাড়ি কিনেছে। রেবা গাড়ির নম্বর পর্যন্ত জানে। কিন্তু লোকটা এসে যদি জিজ্ঞেস করে, তাহলে কী বলব!
লোকটা আমায় দেখতে পায়নি। ওর পাশ দিয়ে যদি আমি হাঁটতে থাকি, আর হাঁটবার সময় যদি পয়সাটা ফেলে দিই। নিশ্চয় ও কুড়িয়ে দেবে, তখন আমার দিকে তাকাবে। তাকিয়ে অবাক হয়ে যাবে। কিছু একটা ভাববে। তারপরে আমায় বলবে, আমি জানি কী বলবে, তখন আমি কী বলব?
হঠাৎ মেয়েটি জোরে হাঁটতে শুরু করল। গগলসপরা লোকটি ফুটপাথে ভিড় এড়াবার জন্য রাস্তায় নামল। মেয়েটিও রাস্তায় নামল। ইলেকট্রিক কোম্পানির লোক রাস্তা খুঁড়ছে। লোকটি আবার ফুটপাথে উঠল, মেয়েটিও উঠল। কিন্তু ওদের ব্যবধান বেশি কমল না।
ফুটপাথের অর্ধেক জুড়ে ফেরিওয়ালারা বসেছে। চলবার রাস্তাটা সরু হয়ে গেছে। মেয়েটি কয়েকজনকে ধাক্কা দিল। তারা মুখ ফিরিয়ে ওর দিকে অবাক হয়ে তাকাল। মেয়েটি কিছু ভ্রূক্ষেপ করল না। জোরে আরও জোরে সে হাঁটতে লাগল।
ওদের ব্যবধান কমে এসেছে। লোকটিকে প্রায় ধরে ফেলেছে। হাতের মুঠো খুলে পয়সাটা দেখল। তারপর হাতটা একটু দোলাল। আর সেই সময়েই মেয়েটির চটির স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে গেল।
আমার চলা বন্ধ হয়ে গেল। লোকটা চলে যাচ্ছে। যেমনভাবে হাঁটছিল, এখনো ঠিক তেমনিভাবেই হেঁটে যাচ্ছে। ও কি সত্যিই সিনেমার ডিরেক্টর? আমি তো ভুল করতে পারি। কেন, কেন এমন ভুল হল! এখন চটিটা সারাতে হবে।
কোথায় মুচি? অন্য ফুটে লোকটা বসে, ও কে? না, একটা পুরনো বইওয়ালা। ও—ধারের লোকটা কে? নাপিত! আশ্চর্য, মুচি কেন নেই? আর একটু এগিয়ে গেলে হয়তো পাব।
রাস্তার লোক এইবার তাকাচ্ছে আমার দিকে। ওরা কী ভাবছে? বুঝতে পেরেছে আমার বিপদটা। কেউ হাসছে না তো!
কী বলল বুড়ো ভদ্রলোক? মুচি খুঁজছি কিনা। নিশ্চয়! ওই কোণের দিকটায় পাব?
বুড়ো চলে গেল অথচ ধন্যবাদ দিলুম না। 'ধন্যবাদ' কথাটা বলতে কেমন লজ্জা করে। কোনোদিন তো বলা অভ্যেস নেই। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি, আর সব লোক কত জোরে হেঁটে চলেছে। লোকটাকে ধরার জন্য যদি জোরে না হাঁটতুম তাহলে চটিটা ছিঁড়ত না। কেন আমি জোরে হাঁটতে লাগলুম? কেন আমার মনে অনেক টাকার জন্য লোভ তৈরি হল? এত এত মানুষ আগের থেকেও যেন জোরে ছুটে চলেছে। সত্যিই কি চলেছে, না আমি আগের থেকে আস্তে হাঁটছি বলে এমন মনে হচ্ছে! চাঁদ এক জায়গাতেই থাকে, মেঘগুলো ভেসে যায় বলেই মনে হয় চাঁদও ভেসে যাচ্ছে।
এই তো একটা মুচি!
মেয়েটি একপাটি চটি খুলে দিল। কোনো কথা না বলে মুচি তুলে নিল চটিটা। পেরেক বসাল। তারপর মেয়েটির পায়ের কাছে এগিয়ে দিল।
মেয়েটি পঞ্চাশ পয়সা মুচির হাতে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বাকি পয়সার জন্য।
মুচি পয়সাটা নিয়ে ভাল করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ফেরত দিয়ে মেয়েটিকে বলল বাংলাদেশী চলবে না।
অস্ফুট শব্দ করে, পয়সাটা নিয়ে তাকিয়ে রইল মুচির দিকে মেয়েটি। কী ভেবে মুচি হাসল। হেসে হাত নেড়ে ওকে চলে যেতে বলে নতুন কাজে মন দিল।
আমার দেরি হয়ে গেছে বাড়ি ফিরতে। মা আজ অনেক কথা শোনাবে, দেরির কারণ জানতে চাইবে। তখন আমি কী বলব। আমি জানি না, আমি জানি না।
বাড়ি থেকে অনেকদূর চলে এসেছি। এখন অনেক পথ আমায় চলতে হবে। আমায় জোরে হেঁটে বাড়ি পৌঁছতে হবে।
আমি ঠকে গেছি। এই আকাশ, আলো, রোদ্দুরের রঙ—ঘষা সীসের মতো হয়ে যাচ্ছে। কী দরকার ছিল এই সকালটার আমাকে ভোলাবার।
আমি কী পেলুম, কী পেলুম এই হাঁটার মধ্য দিয়ে? আনন্দ পেলুম, কতটুকু পেলুম, কতক্ষণের জন্য পেলুম? কেন এই সকালের মতো মন আমার সারাক্ষণ রইল না?
পরশু টুকিসোনার দুধ কেটে গেছল। কাটা—ছেঁড়া মেঘ আকাশে বেড়াচ্ছে। মা বকেছিল আমায়। সেদিন টুকিসোনা দুধ খেতে পায়নি। আমার বিচ্ছিরি লাগছিল।
আমার বিচ্ছিরি লাগছে এই রোদ্দুর। সকালের সেই মিষ্টিভাবটা আর নেই। আশ্চর্য সকালটাই তো আর নেই। বেলা বেড়ে গেছে, ক'টা বাজে এখন? বাবা অফিস চলে গেছে। রমু স্কুল চলে গেছে। তপু এক্কাদোক্কা খেলছে। টুকিসোনা হয়তো মাটি থেকে কুড়িয়ে কিছু—একটা খাচ্ছে।
আমার দেরি হয়ে গেছে। আমায় এখন ছুটে বাড়ি পৌঁছতে হবে। এই সকালটা আমায় ভুলিয়ে অনেকদূর নিয়ে এসেছে। মুচিটা খুব ভাল লোক। ওকে কাল পয়সা শোধ দিয়ে দেব।
কিন্তু এই রাস্তাটা দিয়েই আমায় আসতে হবে। সুন্দর সকাল, রোদ্দুর, দোকান, মানুষ, গাড়ি, আমায় ভোলাবে। আমি নিজেকে ভুলে যাব। তারপর হঠাৎ মনে পড়বে বাড়ি ফিরতে হবে। কেন, কেন, কেন এমন হয়! কেন আমাদের বাড়িটা সকালের রাস্তার মতো হয় না। আমি আসব না। মুচিটা আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করবে, করুক। আমি আর আসব না।
আমি এখন খুব জোরে হাঁটছি। কিন্তু কত জোরে? সকালটা আমায় ছাড়িয়ে দুপুরের দিকে চলেছে। আমি পিছিয়ে গেছি কি? দুপুরটা বিকেল হবে, বিকেলটা রাত্তির হবে। দিনটা শেষ হবে ঠিক একটা মানুষের জীবনের মতো। আমার কী হবে? আমি কোথায়, কেমন করে শেষ হবে? এই রোদ্দুরের জ্বালা কতক্ষণে জুড়োবে। জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না।
মাথায় ঝাঁকুনি দিল না, মাথা দোলাল না। শুধু মাথা নামিয়ে মেয়েটি প্রায় ছুটে চলল।
একবার হঠাৎ মেয়েটি দাঁড়াল। মুখ তুলল আকাশে। আঁচল দিয়ে মুখ মুছল। ফুটপাথের ধারের নর্দমায় আধুলিটা টুক করে ফেলে দিল।
তারপর মেয়েটি আবার প্রায় ছুটে চলল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন