শেষবিকেলের দুটি মুখ

মতি নন্দী

হাওড়া স্টেশনের বিরাট টিনের চালার নিচে দাঁড়িয়ে দুইবোন বারবার চারধারে তাকাল। প্রতিটি মানুষের মুখ লক্ষ্য করার চেষ্টা করল। কেউই তেমন করে তাদের দেখে না, সবাই ব্যস্ত, সকলেরই কোনো না কোনো কাজ আছে। তাদেরও আছে।

ওরা স্টেশনের বিরাট চালার নিচে, গমগমে শব্দ ও ব্যস্ততার মধ্যে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে যাচ্ছে। সারা স্টেশন জুড়ে কে কথা বলছে। দুইবোন মুখ চাওয়া—চাওয়ি করল। হঠাৎ কথা বন্ধ হল। ছোটবোন আঙুল দেখিয়ে বলল, ''ওই যে।'' ওরা দুজনে তাকাল সসপ্যানের মতো লাউডস্পিকারটার দিকে।

ছোটবোন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ''এখন কী করব?''

বড়বোন এধার—ওধার তাকাবার ভান করে দেখে নিল একবার। দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাদা চুলের মধ্যে আঙুল চালাচ্ছে। এবার ফুঁ দিয়ে হাত থেকে চুল ঝেড়ে ফেলবে।

বড়বোন বলল, ''চল ওই দিকটায়।''

ওরা গমগমে ভিড়ের মধ্য দিয়ে উত্তর দিকে এগোল। টিকিট ঘরের খুপরিতে মানুষের সারি, তার পাশ কাটিয়ে, ঢালাও মেঝেতে ছড়ানো মানুষ শুয়ে আর বসে, তাদের পাশ কাটিয়ে, ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে মানুষ, তাদের পাশ কাটিয়ে, দুইবোন তৃতীয় শ্রেণীর বিশ্রাম ঘরে এল। একটা বেঞ্চের ধার ঘেঁষে দুজনে বসল। জানলা দিয়ে রাস্তা দেখা যায়। সার দিয়ে বাস দাঁড়িয়ে। ঘরের মধ্যে ফিকে আলো। ভ্যাপসা গন্ধ। জলের কল। টিকিটের জন্য মেয়েদের সারি। আর অপেক্ষারত দূরের যাত্রী।

''দিদি জল খাব।''

''খেয়ে আয়।''

ছোটবোনের দিকে নজর রাখল। ঝুঁকে কল টিপে জল খাচ্ছে। বড়বোন অস্বস্তি বোধ করল। ছোটবোনের জামাটা পাঁজরার কাছে ফেঁসে গেছে। ঘটি হাতে দাঁড়ানো লোকটা একদৃষ্টে কি দেখছে?

''তুফান একসপ্রেস আজ লেট।''

মুখ ফেরাল বড়বোন। তর পাশের মহিলাটি কথা বললেন।

''কতক্ষণ যে বসে থাকতে হবে।''

''কেউ বুঝি আসবেন?''

উনি হাসলেন। হাসতে হাসতে সারা ঘরে চোখ মেলে বললেন, ''চিঠি পেলুম গতকাল পৌঁছবে। এসে ঘুরে গেছি, আসেনি।''

বড়বোন উঠে দাঁড়াল। ছোটবোনকে সে দেখতে পাচ্ছে না।

''যাবেন কোথাও, না কারুর জন্যে এসেছেন?''

''না, না, আমরা যাব বলে এসেছি।''

বড়বোন কথা বাড়াল না। স্টেশনের বিরাট চালার নিচে, মানুষ আর শব্দের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে ছোটবোনকে খুঁজল। পা—পা এগিয়ে স্টেশনের বহু সদর গেটগুলির একটিতে পৌঁছল। এখান থেকে হাওড়ার ব্রিজ দেখা যায়। ওই ব্রিজটা পার হলে কলকাতা। কলকাতার একটি গলিতে তাদের বাড়ি। সেই বাড়ির একতলায় এক ঘরে মা, দাদা, ভাই আর বোনের সঙ্গে সে থাকে। শীতের দিনে শীত আর গ্রীষ্মের দিনে গরম তাদের ঘরে থেবড়ে বসে থাকে। যত দক্ষিণের হাওয়া সব ছাদের উপর দিয়ে চলে যায়। হাওয়া যায়, মেঘ যায়, রোদ যায়, আর বিকেল যায়। গা—ধুয়ে আর বিকেলে ছাদে ওঠা হবে না।

নাক কুঁচকে গন্ধ শুকল। এখানে কেমন যেন একটা গন্ধ। বাবাকে শ্মশানে নিয়ে যাবার সময় দাদা একশিশি এনেছিল, অনেকটা সেই রকম। খালি শিশিটা ছোটবোন রেখে দিয়েছিল। কোথায় গেল ছোটবোন?

* * *

''দিল্লি দেখো, আগ্রা দেখো' বলত আর হাতল ঘোরাত। কুতবমিনার, তাজমহলের ছবি, একে একে ঘুরে চলে যেত। লোকটা একঘেয়ে সুরে চেঁচাত আর হাতলটা একটু আস্তে ঘোরাতে বললে সর্দিটানার মতো মুখ করে হাসত। স্টেশনের থামে লটকানো ছবিগুলো দেখতে দেখতে ছোটবোনের সেই লোকটাকে মনে পড়ল। একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, দিল্লি—আগ্রা সে কখনো দেখেছে কিনা। লোকটা কথার জবাব না দিয়ে বাক্সের ফোকরে চোখ লাগানো উটকো মাথাগুলোকে, হাত দিয়ে মাছির মতো তাড়াতে লেগে যায়। সেই লোকটাকে ছোটবোনের এখন মনে পড়ল। অনেকদিন পরে পাড়ায় এক নতুন বাইসকোপওলা এল। সেই লোকটা কেন আসে না, এই কথা ছোটবোন অনেক দিন অনেক রাত ভেবেছে। ভাবলেই কুতুবমিনার, তাজমহল, হাওয়াই জাহাজ আর জটায়ুর যুদ্ধ চোখের সামনে দিয়ে সারি বেঁধে চলে যায়। বিজ্ঞাপনের ছবি দেখতে দেখতে সে একেবারে গা ঘেঁষে এসেছিল বউটির। নজর পড়তে বুঝল তার দিকেই তাকিয়ে। ছবিতে ইংরেজি অক্ষর লেখা। বিড়বিড় করে সে অক্ষর পড়ে। আড়চোখে বউটির দিকে তাকায়। ওর কাপড় থেকেই মিষ্টি গন্ধটা আসছে। আস্তে আস্তে লম্বা শ্বাস টানল ছোটবোন। চকোলেট মোড়া কাগজে এমন গন্ধ থাকে।

''মোটেই অত সুন্দর নয়।''

ছোটবোন ঘাড় ফেরাল। বউটি ছবির দিকে তাকিয়ে।

''গেল পুজোয় আমরা গেছলুম। বাব্বাঃ যাতায়াতের কী কষ্ট আর হোটেলের কী চড়া রেট।''

ছোটবোনের ইচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে মিষ্টি গন্ধটা চুষে নিয়ে জমা করে রাখে বুকের মধ্যে। বলল, ''সুন্দর নয় বললেন যে, ওখানে কি এমন—''

''মোটেই না। ওসব বন—বাদাড়ের ছবি, সেখানে যায় কে। তার চেয়ে বরং ওই ছবিটা, কোনারকের ছবিটা, ওখানে সত্যি দেখবার জিনিস আছে।''

''আপনি গেছেন?''

''আমার নন্দাই গেছল।''

''এখন কোথায় যাচ্ছেন?''

''রানীগঞ্জ।''

''কার কাছে যাচ্ছেন?''

এবার বউটি হাসল। ছবিতে মেয়েরা যেমন সুন্দর করে হাসে। তারপর কি একটা বলতে গিয়ে, না বলে আবার হাসল। তাই দেখে ছোটবোনও হাসল।

''সামনের বছর উনি ছুটি পেলে, কাশ্মীর বেড়াতে যাব আমরা।''

''দিদি ট্রেন সাত নম্বর থেকে ছাড়বে, তাড়াতাড়ি।''

ছুটতে ছুটতে এসে হাফপ্যান্ট—পরা ছেলেটি সুটকেসটা তুলে নিল। বেতের ঝুড়িটা হাতে ঝুলিয়ে বউটি বলল, ''আচ্ছা চলি।''

ওরা চলে যাচ্ছে। ছোটবোন গুটিগুটি এগিয়ে, কোলাপসিবল রেলিংয়ে হাত রেখে সাতনম্বর প্লাটফর্মে ট্রেনটার দিকে তাকিয়ে রইল।

* * *

এত শব্দ তবু কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। থামের গা ঘেঁষে লোহার মতো সে দাঁড়িয়ে। মাথায় লাল টুপি, খাকি পোশাকের লোকটা এদিক—ওদিক তাকিয়ে তার দিকেই আসছে। বড়বোন এখন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। লোকটা চলে গেল পাশ দিয়ে। যাবর সময় একবার তাকিয়েছিল। বড়বোন ভাবল, বিশ্রামঘরে গিয়ে অপেক্ষা করাই ভাল। হয়তো ছোটবোন এখন সেখানে বসে আছে।

বেঞ্চ ভর্তি। বড়বোন দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। সেই মহিলাটি কোথা থেকে ঘুরে এলেন। বসার জায়গা না পেয়ে তার কাছে এসে বলল, ''নাঃ এখনো আসেনি।''

''আসছেন কে?''

নেহাত একটা কথা বলতে হয় তাই জিজ্ঞাসা করা, করে তাকিয়ে থাকল। আর থাকতে থাকতে সে দেখল, অতবড় চোখদুটো, যা দুটো মুখের আয়তনে মানায়, কেমন মানানসই হয়ে উঠল; থুতনির নিচে বয়সের ভাঁজ কাঁপল।

''কে আবার, কেউ না।''

অন্য সুরে হুবহু সেই কথা। জ্বালা করে উঠল মাথার মধ্যেটা। ন'মাসিমা দুটো টাকা দিয়ে বলেছিল, 'অত ঘন ঘন এলে আমিই বা পারি কী করে।' ঘরে তখন পাশের বাড়ির কে যেন ছিল। ফিরে আসার সময় বড়বোন ন'মাসিমাকে বলতে শুনেছিল, 'কে আবার, কেউ না।'

''তিরিশ টাকা বেশি পাবে বলে দেড়শো মাইল দূরে ছুটল চাকরি করতে। কী যে দরকার ছিল বুঝি না। স্কুল থেকে আমি যা পাই আর ও যদি কিছু একটা জুটিয়ে নিত, তাহলে সাতটা লোকের সংসার খুব চলে যেত।''

বড়বোন মাথা নাড়ল।

''আমার কথা তো কখনো শোনে না। আজ আট বচ্ছর দেখে আসছি। অথচ আমার টাকা বিয়ের আগে ছোঁবে না।''

''উনি কোথায় চাকরি করেন?''

''ডি.ভি. সি—তে।''

''আমার দাদা ওখানে চেষ্টা করেছিল, পায়নি।''

''সেকি, ও—ই তো কত লোককে চেষ্টা করে চাকরি করিয়ে দিয়েছে, আচ্ছা আমি জিজ্ঞেস করব। আছেন তো এখানে না ট্রেনের সময় হয়ে গেছে?''

''না না আমার ট্রেনের সময় হয়নি, আমি থাকব।''

বড়বোন এখন আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না, শুধু তার বুকের মধ্যের কথাটা ছাড়া,—আমি থাকব। আমি যাব না।

''আমি আর একবার বরং দেখে আসি।''

মহিলাটি চলে যাচ্ছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সে। মহিলাটি অত মানুষের মধ্যে আড়াল হয়ে গেছে। বড়বোন পিছিয়ে এল। স্টেশনের ফটকে এসে দাঁড়াল। বিকেল শেষ হয়ে আসছে। স্ট্যান্ডে বাসের মধ্যে অফিস ফেরত মানুষরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। মরচেধরা কৌটোর মতো তাদের মুখ। রোদ্দুরের আঁচ লেগেছে হাওড়া—ব্রিজে। স্টিমার গম্ভীর ভোঁ বাজাল। পিঠকুঁজো ঠেলাওলা দুলতে দুলতে ব্রিজের চড়াইতে উঠছে। বাস থেকে নেমে ড্রাইভার আস্তে আস্তে আকাশে বিড়ির ধোঁয়া ছুঁড়তে লাগল। বিকেল শেষ হয়ে আসছে। লিলুয়ায় সরকারি আশ্রম আছে মেয়েদের। পালাতে গিয়ে যারা ধরা পড়ে পুলিশ প্রথমে ওখানে নিয়ে রাখে। 'বলবি আমরা এখানে থাকব, আমাদের বাড়ি নেই, কেউ নেই। পারবি বলতে?' বলতে বলতে দাদার মুখটা এই বিকেলের মতো হয়ে গেছল।

বড়বোন আবার স্টেশনের চালার নিচে ফিরে এল।

* * *

কোলাপসিবল রেলিং ধরে ছোটবোন দেখছে ট্রেনটা চলে যাচ্ছে। ট্রেনের জানলার মুখগুলো প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে হাসছে। হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে। এমন করে তারও চলে যেতে ইচ্ছে করল। লাইনের ওপর আড়াআড়ি একটা ব্রিজ। প্ল্যাটফর্মের পাশ দিয়ে রাস্তাটা উঁচু হয়ে ব্রিজে উঠেছে। থলি হাতে তিনটি মানুষ রাস্তা দিয়ে চলেছে। ওরা যেন পাহাড়ে উঠছে। তারপর সে ভাবল, বড়বোন অপেক্ষা করছে।

বিশ্রামঘরে বড়বোনকে দেখতে না পেয়ে সে চালার নিচে ফিরে এল। ওজনযন্ত্রে এক বৃদ্ধ ওজন মাপল। তাই দেখল। বৃদ্ধ কার্ড পড়ে হন হন করে চলে গেল। তারপর বিজ্ঞাপন পড়ল। পড়তে পড়তে সে বইয়ের স্টলে পৌঁছে গেল।

''আর তিনমিনিট বাকি অথচ এখনো এসে পৌঁছল না, কি ইররেসপন্সিবল!''

ছোটবোন মুখ ফিরিয়ে দেখল। ছ—সাতটি ছেলেমেয়ের এক দল।

''ওর জন্য অপেক্ষা করলে, আমরাও ট্রেন মিস করব।''

''তাহলে?''

ওরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে ব্যস্ত হয়ে চলে গেল। একটু পরেই, প্রায় ছুটে এল চশমা চোখে একটি মেয়ে। খুব রোগা, দেখে মনে হয় যেন ক্লাস সেভেনে পড়ে। ওকে দেখেই ছোটবোন বুঝল এর কথাই ওই দলটা বলছিল।

''ওরা এইমাত্র চলে গেল।''

''চলে গেল!''

মেয়েটি হাতের চামড়ার ব্যাগটা খুব জোরে চেপে ধরল। চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে চেপে বসাল। তারপর এমনভাবে তাকাল, যেন জিজ্ঞাসা করছে এবার আমি কী করব?

''একা যেতে পারবেন না?''

''পারব না কেন, তবে ওদের সঙ্গে থাকলে বাড়ি চিনতে অসুবিধে হত না।'' এই বলেই মেয়েটি বলে উঠল, ''আরে!''

ছেলেটি ব্যস্ত হয়ে এল। সেই ছেলেমেয়েদের দলে ছোটবোন একেও দেখেছিল।

''আপনি কি এই আসছেন?'' ছেলেটি বলল।

''হ্যাঁ, আপনি?''

''আমিও।''

''তাহলে!'' ট্রেন তো ছেড়ে দিয়েছে। ইসস একটা মিছিলে ট্রামটা আটকে গিয়ে এই কাণ্ড হল।''

''এই প্রসেশন কবে যে বন্ধ হবে। যাকগে, এখন কী করবেন? যাওয়া তো হল না।''

''বাড়িতে বলে এসেছি ফিরতে রাত দশটা এগারোটা হতে পারে বিয়ে বাড়ির ব্যবস্থা তো। এখন ফিরে গেলে বাড়িতে হাসাহাসি করবে।''

''চলুন ট্রেনে চেপে ব্যান্ডেল থেকে ঘুরে আসি।''

''কিন্তু আগে একটু কিছু খেয়ে নেবেন।''

ওরা দুজনে চলে গেল। সেই সময় অতবড় স্টেশনের সব আলোগুলো জ্বলে উঠল। একটা ট্রেন এসেছে। পিলপিল করে স্টেশনে মানুষ ঢুকছে। এত মানুষ দেখতে ছোটবোনের ভাল লাগল না। আবার সে বিশ্রামঘরে ফিরে এল।

* * *

ছোটভাইকে মা চড় মেরে বলেছিল, 'মুখপোড়া আর একটু আগে যেতে পারিসনি?' কাদের বাড়ি বৌভাতে বিনা নিমন্ত্রণে খেতে গিয়ে মার খেয়ে এসেছে। দিদিদের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সে হাউ হাউ করে উঠেছিল। তখন এমনি ভাবে ছোটভাইয়ের মুখটা চ্যাপ্টা দেখাচ্ছিল।

ছবিগুলোর আর একটু কাছে বড়বোন এগিয়ে এল। যারা রেলে কাটা পড়েছে তাদের ছবি। কাচের উপর তার নিজের মুখের ছায়া পড়েছে। নিজের মুখ দেখার জন্য একটু পিছিয়ে কোনাচে হয়ে তাকাতেই তার মনে হল, কী বিশ্রী, কী ভয়ংকর। দাদা চিৎকার করে একদিন বলেছিল, 'আমি কী করব, কী করব। চেষ্টা তো করছি।' বড়বোন সারা কাচ জুড়ে দাদার মুখ দেখল। ওর মন মমতায় দুঃখে টলমলিয়ে উঠল। রেলে কাটা—পড়াদের জন্য সে দুঃখ পেল।

সেই মহিলাটিকে দেখতে পেল বড়বোন। পুরুষটির হাতে সুটকেস বেডিং। ওরা কথা বলছে না। বড়বোন ছুটে গিয়ে মহিলাটির হাত ধরল।

''উনিই কি?''

মহিলা ঘাড় নাড়ল।

''ওঁর ঠিকানাটা দিন, দাদাকে পাঠাব।''

এই কথা বলে বড়বোন তাকিয়ে থাকল আর থাকতে থাকতে দেখল, দুটো মুখের আয়তনে মানায় এমন একজোড়া চোখ, ঝুলেপড়া চিবুক, আর উনুন ভাঙা মাটির মতো ঠোঁট।

''এখানে ছাঁটাই নোটিস দেওয়া হয়েছে।''

মহিলাটির চলে যাওয়া দেখল বড়বোন। কাঁধে কেউ যেন বেডিং—সুটকেস চাপিয়ে দিয়েছে। দেখতে দেখতে বড়বোনের ঝিমুনি এল। চোখের পাতা ভার—ভার বোধ হল। কোনো রকমে চারধারে চোখ ফেলে সে ভাবল, ছোটবোন বোধহয় অপেক্ষা করছে।

বিশ্রামঘরে ফিরে এসে বড়বোন দেখতে পেল ছোটবোনকে।

ওরা দু—জন পাশাপাশি চুপ করে বসে রইল। একসময় বড়বোন বলল, ''এখানে বসে কী লাভ, চল ওদিকে যাই।''

ওরা আস্তে হেঁটে স্টেশনের আরেক প্রান্তে এল। ছোটবোন বলল, ''এবার আমরা কী করব?''

বড়বোন দাঁড়িয়ে ভাবল। ভেবে বলল, ''এখানে একটু দাঁড়াই।''

রেস্টুরেন্টের দরজা ঠেলে একজোড়া ছেলেমেয়ে বেরোল। ছোটবোন দেখে ভাবল, ওরা এবার বেড়াতে যাবে।

থুথু ফেলল, কাশল। পিঠ কুঁজো করে সে ওয়াক তুলল। বড়বোন পিঠে হাত রাখল। বুকের কাছে টেনে আনল।

বলল, ''কিছু বলছিস?''

''না।''

''তোর খিদে পেয়েছে?''

''না।''

আবার রেস্টুরেন্টের দরজা খুলল। শব্দটা শুনল, শুনে ঝিমোতে শুরু করল। ট্রেনের ভেঁপু বাজল। ছোটবোন বলল, ''শাঁখের মতো শব্দ, না?''

''হ্যাঁ।''

''দিদি মনে আছে তোর বাবার সঙ্গে গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়ে একটা ইঞ্জিনে উঠেছিলুম!''

''হ্যাঁ।''

''ড্রাইভারের একটা দাঁত সোনার ছিল। আমায় কোলে করেছিল।''

''সে যখন ইঞ্জিনের সিটি বাজাচ্ছিল, তুই ভয়ে ওর বুকে মুখ লুকিয়েছিলি।''

ছোটবোন হাসল।

বড়বোন বলল, ''ওই দ্যাখ।''

বিয়ে করে বউকে নিয়ে বর বাড়ি চলেছে। নতুন ট্রাঙ্ক, নতুন শয্যা, নতুন গহনা, নতুন কাপড়। জড়োসড়ো হয়ে বউটি হাঁটছে। বর সিগারেটে ফুক ফুক করে টান দিচ্ছে।

''দিদি চুল দেখেছিস, সামনেটা পাতলা।''

''হ্যাঁ।''

''বরটার কিন্তু অনেক বয়েস।''

''হ্যাঁ।''

''দাদার সেই বন্ধু আর এল না কেন রে?''

''কী জানি।''

''খুব সুন্দর করে কথা বলত।''

বড়বোন আর জবাব দিল না।

''একদিন চকোলেট এনে দিয়েছিল, মনে আছে?'' জবাব না পেয়েও ছোটবোন থামল না, ''মা বলেছিল তোকে বোধহয় পছন্দ হয়েছে।''

''চুপ কর এখন।''

ছোটবোনের চোখ ছলছল করে উঠল। কাশির ধমক চাপতে সে কুঁজো হল। মৃদু স্বরে বলল, ''জল খাব।''

''খেয়ে আয়।''

ছোটবোন গেল না। বড়বোনের যেন ঝিমুনি লেগেছে। একদৃষ্টে সামনের দিকে তাকিয়ে। তাই লক্ষ্য করে ছোটবোন বলল, ''এবার আমরা কী করব?''

''জানি না।''

''দাদা কী বলে দিয়েছিল?''

বড়বোন ভাবতে চেষ্টা করল।

''ওরা কী এবার আসবে?''

''কেন?''

বড়বোন চোখ মেলে চারধারে তাকাল। মানুষ, আলো, শব্দ, দেখেশুনে, আবার একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। তারপর ঝিমানো সুরে বলল, ''আমরা অপেক্ষা করব। ওরা আসবে, জিজ্ঞেস করবে সঙ্গে কে আছে, কোথায় যাবে, কেন যাবে। আমরা বলব, আমরা দুবোন বেরিয়েছি বোম্বাই যাব, সঙ্গে কেউ নেই, ওখানে সিনেমায় নামব। তখন ওরা আমাদের ধরে নিয়ে যাবে। ঠিকানা জিজ্ঞাসা করবে। আমরা বলব না। তখন ওরা আশ্রমে পাঠিয়ে দেবে।''

''সেখানে কি করবে?''

''জানি না।''

''দিদি চল পালিয়ে যাই।''

একটু একটু করে বড়বোনের ঝিমোনো ভাবটা কেটে গেল। ঠান্ডা স্বরে বলল, ''কোথায় পালাব?''

''যেখানে হোক।''

''তারপর?''

ছোটবোন শুধু তাকিয়েই রইল। বড়বোন হাত বাড়িয়ে ওকে বুকের কাছে টেনে আনল। মুখ নামিয়ে বলল, ''ভয় পেয়েছিস?'' ছোটবোন বুকে মুখ গুঁজে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। ওর পিঠে হাত রেখে বড়বোন নিজেকে সিধে করে রাখল।

তখন একজন ভাবল, মানুষের মুখ মরচেধরা টিনের কৌটোর মতো।

আর একজন দেখল, হাসতে হাসতে ট্রেনের মুখ চলে যাচ্ছে।

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%