মতি নন্দী
''জায়গাটার সঙ্গে অতুল কয়েকদিনের মধ্যেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।
হিসেব যুক্তি প্রভৃতির দ্বারা অমলাই বুঝিয়ে দেয়, কলকাতা ছেড়ে এখানে বাসা ভাড়া করে থাকলে সাশ্রয় তো বটেই মন এবং স্বাস্থ্যও ভাল থাকবে। কলকাতা থেকে মাইল ষোলো। ট্রেনে অফিস যাতায়াতে অতুলের যতটা সময় লাগবে, পাতিপুকুর থেকে ততটাই লাগে। উপরন্তু ওখানে চাকরিটা নিলে অমলা এখানকার চাকরির থেকে সত্তর টাকা বেশি পাবে। বুজুমেরও বিশেষ অসুবিধা হবে না ওখানে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হতে।
অমলার কথামতো সবই ঠিকঠাক হয়ে গেছে। বাসাটা স্টেশন থেকে মাইলখানেক। খেয়ে উঠে এতটা পথ হাঁটতে অতুলের কষ্ট হয়। তাছাড়া সে ভালই আছে; প্রচুর হাওয়া, মশা কম, স্নানের জন্য অঢেল জলও। অতুল ভালই আছে। সব থেকে বড় কথা মাথার চুল ওঠা, যার ফলে খুলিটা দিনে দিনে চর—এর মতো ভেসে উঠছে, সেটা বন্ধ হয়েছে।
অতুলের কষ্ট লাঘবের জন্য মাসকাবারি রিকশার ব্যবস্থা করেছে অমলা। স্টেশনে অতুলকে নামিয়ে দিয়ে অমলা সেই রিকশাতেই অফিসে চলে যায়। অতুলকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রিকশাকে সিকি মাইল পথ বেশি ঘুরতে হয়। এজন্য ভাড়া আট টাকা বেশি লাগে। ওর ভয় ছিল, অমলা এটাকে অযথা মনে করে হয়তো পথেই রিকশা থামিয়ে বলবে, ''এটুকু তো হেঁটেই যেতে পার।'' কোনোদিনও বলেনি, তবু রিকশায় অতুল কাঁটা হয়ে থাকে।
রিকশা থেকে নেমে সে একটা হাত সামান্য তুলে ''চলি' বলে। অমলা ঘাড়টা ঈষৎ হেলিয়ে রিকশাওলাকে বলে ''চলো।'' তারপর অতুল স্টেশনের মধ্যে আসে, খবরের কাগজওলার কাছে কাগজ কেনে, প্ল্যাটফর্মের শেড ঠিক যেখানে শেষ হয়েছে সেইখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে ট্রেনের জন্য। এইখানে দাঁড়ালে যে কামরাটা সামনে পড়ে, সেটায় বসারও জায়গা পাওয়া যায় এবং এইভাবে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই ওকে তার চোখে পড়ে এবং সে লক্ষ্য করতে শুরু করে।
সে লক্ষ্য করল, স্টেশনের দিকে আসার দুটি রাস্তার দক্ষিণটি দিয়ে ও আসে। ওদিকের বাড়িগুলো যথেষ্ট পুরোনো ঘিঞ্জি। হেঁটেই আসে অর্থাৎ কাছাকাছিই থাকে। অতুল এখানে মাস দেড়েক এসেছে, কয়েকটা অঞ্চলের নাম সে জানে মাত্র আর জানে গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার পথটি। ও প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে গিয়ে অপেক্ষা করে, অতুলের ঠিক পিছনের কামরাটার জন্য। সেটাতেও বসার জায়গা পাওয়া যায়। অতুল লক্ষ্য করেছে দারুণ রোদেও শেডের বাইরে ঠিক ওইখানেই ও দাঁড়ায়। বৃষ্টিতেও এইভাবে দাঁড়ায় কি না সেটা অবশ্য সে জানে না। তবে প্রথম থেকেই তার মনে হয়েছে, গ্রীষ্মে বা বর্ষায় ও বাইরেই দাঁড়ায়।
সাধারণভাবে পরিপাটি ওর শাড়ির কুঁচি ও ভাঁজগুলোর মতোই শরীরের ভাঁজ, ব্লাউজের হাতা, পিঠের আঁচল, উঁচু করে বাঁধা খোপা এমনকি মাথা তুলে থাকার ভঙ্গিটিও। হাতের ব্যাগটির বাইরের খাপে মাঝে মাঝে খবরের কাগজ গোঁজা থাকে। হয়তো পড়ার সময় করে উঠতে পারেনি তাই নিয়ে যাচ্ছে। বোধহয় বাড়িতে কাগজ পড়ার কেউ নেই, থাকলে নিয়ে যেত না। অমলা রাত্রে কর্মখালির বিজ্ঞাপনগুলো পড়ে আর আনমনা হয়ে হিসাব করে।
অতুলের একদিন দেরি হয়ে যাওয়ায় ছুটে এসে ট্রেনে ওঠে। সেই কামরায় ও ছিল। এরপর থেকে সে এই কামরাতেই ওঠে। চেষ্টা করে ওর পিছন দিয়ে থাকতে যাতে ও মুখ ফেরালে প্রোফাইলটা দেখতে পায়। কিন্তু ও কদাচিৎ মুখ ফেরায়।
অন্যান্য অভ্যাসগুলো নিছকই অভ্যাস, কিন্তু একটি সম্পর্কে অতুল সচেতন। অভ্যাসটা হল, সারা সকাল ধরে সে জেনে থাকে ওকে সে দেখতে পাবে। এই সামান্য ব্যাপারটায় সে এত উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে মাঝে মাঝে তার হাসি পর্যন্ত পায়। কিন্তু তাহলেও সকালটা তার বেশ লাগে। স্টেশনে যতক্ষণ পর্যন্ত না ও আসছে উত্তেজনাটা থাকে। ও এলেই অতুল এক ধরনের স্বস্তি পায় এবং ট্রেনে সত্যিই আরামবোধ করে। অনেকটা, আরামদায়ক কোনো ঘরে, নিশ্চিন্তে খবরের কাগজ কিংবা গল্পের বই পড়তে পড়তে শুধু অনুভব করা কাছেই ও আছে। নিজেকে সে মনে মনে বলে, ঠিক এই রকম, অনেকটা এই রকমই।
কিন্তু ট্রেন কলকাতায় পৌঁছালেই কামরার লোকেরা দরজার কাছে ভিড় করে এলেই ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যায়। উত্তেজনাটা তখন আর এক রকমের, সেটা একদমই ভাল লাগে না তার। অতুল জানে ট্রেন থেকে নেমে কোনপথ দিয়ে ও ট্রাম স্টপ পর্যন্ত যাবে। যদি একদিন সকালে, আর সব দিনের মতোই দুজনে ট্রেনে উঠে কলকাতায় নামে, এবং এই বিশেষ একদিন সকালে ও ট্রাম স্টপে না গিয়ে প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়েই গেটের ওধারে তার জন্য অপেক্ষা করে, তারপর দুজনে নিরিবিলি কোথাও গিয়ে বসে। যদি এমন হয়!
ওর সঙ্গে কী করে আলাপ করা যায়, অতুল সেটাই ভাবল। জায়গাটা নতুন তাছাড়া লোকসংখ্যাও যথেষ্ট, ট্রেনেও বেশ ভিড়। গায়ে পড়ে সাদামাটা ভাবেও, কী ভিড় দেখেছেন বলা সম্ভব নয়। সিনেমা হল আছে এবং নিশ্চয়ই লাইব্রেরি আছে। কখনো কখনো মনে হয়েছে, এখানকার লাইব্রেরিতে ভর্তি হয়ে যাবে। ও নিশ্চয় বই পড়ে এবং নিশ্চয়ই লাইব্রেরিটার মেম্বার। কিন্তু অমলা দশটার একমিনিটও বেশি আলো জ্বেলে রাখতে দেবে না। বেশি রাত পর্যন্ত পড়লে চোখ খারাপ হবে। অমলার সঙ্গে দুই রবিবার সিনেমা দেখতে গিয়েছিল, কিন্তু অতুল ওকে দেখতে পায়নি। বাজারে ছিট কাপড়ের দোকানগুলোর সামনে এক চায়ের দোকানে পরপর কদিন সে চা খেয়েছে। কিন্তু ব্লাউজের কাপড় কিনতে ও আসেনি। বোধহয় কলকাতাতেই কেনে। গঙ্গার ধারেও পায়চারী করেছে, না, ও গঙ্গার ধারেও আসে না।
একদিন অতুলের মনে হল বৌয়ের সঙ্গে রিকশায় স্টেশনে আসাটা ঠিক হচ্ছে না। তাই বাড়ি ফিরেই সে বলল, ''মিছিমিছি আটটা টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে।''
''কী রকম?''
''ওটুকু পথ তো হেঁটেই যেতে পারি। খাওয়ার পর আস্তে আস্তে হাঁটাটা শরীরের পক্ষে খুবই দরকার, হজমে সাহায্য করে। বড় রাস্তাতেই যদি নামিয়ে দাও, তাহলে রিকশাওলাকে বাড়তি আট টাকা আর দিতে হয় না। বুজুমের একজোড়া চটি হয়ে যাবে।''
অমলা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ''আচ্ছা।'' সুতরাং অতুল তারপর থেকে একাই স্টেশনে আসে। একটু কষ্ট হয় দেরি হয়ে গেলে। জোরে হাঁটতে হয় এবং মনে মনে তখন বলে, ওর জন্যই তো কষ্ট করছি, তবে হাত নেড়ে বৌ—এর কাছে বিদায় নেওয়াটা ও এখন থেকে আর দেখতে পাবে না। বৌ আছে জানলে ও আগ্রহী হবে না। ওকে আগ্রহী করতেই হবে কেন না, অতুল আবার মনে মনে বলে, আমি ভালোবেসেছি।
যাই হোক, অবশেষে অতুল এটাকে স্বীকার করে নিয়েছে। অবশ্য বরাবরই, এই রকমই একটা কিছু যে হবে সে জেনে গিয়েছিল, প্রায় প্রথম দিনেই যখন ওকে স্টেশনের দিকে আসতে দেখে। ও প্ল্যাটফর্মে ঢোকামাত্র তার মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া ঘটে তার মনে হয়েছে ঝাঁকুনি লাগার মতোই সেটা।
এখন থেকে তার ভোরে গঙ্গার ধারের মন্থর বাতাস, ঘাটে জলের আঘাতের শব্দ এমনকি পাটকলের চিমনির ধোঁয়াও ভাল লাগছে, অবাক করছে। কুণ্ডুলীপাকানো ধোঁয়া ছড়িয়ে যাবার পর সে তারমধ্যে নানারকম প্রাকৃতিক আকার দেখতে পায়। প্রেমের গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত বা ফিল্মের, সে শোনে। বস্তুত অফিস ছুটির পর কয়েকটি ফিল্মও দেখেছে এবং বাড়ি ফিরে বলেছে ট্রেনের গোলমালের জন্য দেরি হল। একটা ইংরাজি ফিল্মে সে দেখে—দুজন ডিটেকটিভকে নিয়ে ভদ্রমহিলা এক হোটেলের বন্ধ কামরার দরজায় টোকা দিল। বেশ কিছুক্ষণ পর নগ্ন শরীরে তোয়ালে জড়িয়ে এক ভদ্রলাক দরজা খুলেই ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইল। ওরা ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখে বেশ সুন্দরী একটি মেয়ে খাটে শোওয়া, ওদের দেখেই তাড়াতাড়ি গলা পর্যন্ত চাদর ঢাকা দিল। একজন ডিটেকটিভ বলল, 'মিস্টার হোল্ডার, এই মহিলা বলছেন আপনিই মিস্টার বার্টলেট, এঁর স্বামী!'' এই বলে লোকটা খাটের দিকে তাকাল, ''উনি নিশ্চয় মিসেস হোল্ডার।''
''আমি বার্টলেট।'' এই বলে বিষণ্ণ চোখে সে স্ত্রীর দিকে তাকাল।
এই দৃশ্যটার আগে পর্যন্ত বার্টলেটের প্রতি একটি চাপা ঈর্ষা অতুল অনুভব করছিল। কিন্তু তারপরই ডিভোর্স, মাসোহারা নিয়ে দরাদরি এবং একমাত্র ছেলেটির অভিভাবকত্ব নিয়ে যা সব হল, তার অনেক কথা না বুঝলেও অতুল অজান্তেই নিজেকে বলে, না এসব নয়। অমলা এরকম কিছু করবে না, আমিও এভাবে কেলেঙ্কারি করব না।
করব না কেন? রাত্রে অতুল অনেক কিছু ভাবল। অন্য কোনোভাবে কিছু যদি করা না যায় তাহলে বার্টলেটের মতো নয় কেন? পরদিন সকালে স্টেশনে এসে সে ঠিক করল ওকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে হবে : আমরা যদি এভাবে দুজন দুজনকে না পাই তাহলে আর কী করতে পারি? তুমি যদি আমাকে ভালোবাস, দারুণভাবে ভালোবাস তাহলে আমি বলতে পারি যা খুশি করতে চাও, করতে পার। যত টাকা অমলা চাইবে সব দেব।
এরপরই অতুল নিজের চিন্তা হৃদয়ঙ্গম করে দারুণ অবাক হয়ে এবং যথেষ্ট মজা পেয়ে বেশ জোরেই হেসে উঠল। তাই শুনে ও মুখ ফেরালো চাপা হাসি নিয়ে। কামরার আরো কয়েকজন অতুলের দিকে তাকিয়ে হাসল। হাতল ধরে দাঁড়িয়ে কোনো লোক আপন মনে জোরে হেসে উঠলে সকলে তাকাবেই। কিন্তু ও হেসেছে এবং হাসিটি অত্যন্ত সুন্দর। ও অত্যন্ত সুন্দর।
অতুল সেই মুহূর্ত থেকে ট্রেনের দোলায় ঝিমিয়ে পড়তে পড়তে ভাবল, কোনোদিনই নয়। আমি কোনোদিনই পারব না আমার এই হাসিটার হাত থেকে রেহাই পেতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন