একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন

মতি নন্দী

পার্লামেন্ট মেম্বর গোপীনাথ ঘোষ (নামের শেষে এম পি অক্ষর দুটি দেখতে না পেলে অম্বলে আক্রান্ত হন) তার আম্পায়ারিং দ্বারা আটঘরা—বকদিঘি ক্রিকেট ম্যাচটিকে গত বছর ঐতিহাসিক মর্যাদায় ভূষিত করে গেছেন। একটিবার তর্জনী তুলেই তিনি একসঙ্গে দুজনকে আউট ঘোষণা করেছিলেন। পীচের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভুবন ডাক্তার ক্যাচ লোফার জন্য তৈরি সেই সময় দুইদিক থেকে, ব্যাট হাতে অতুল মুখুজ্যে ও বিষ্টু মিশির বুলডোজারের মতো তার ঘাড়ে এসে পড়ে। ক্যাচটা আর লুফতে পারেননি ডাক্তারবাবু। গোপীনাথ ঘোষ একই সঙ্গে মুখুজ্যে ও মিশিরকে ক্রিকেটের ৪০ আইন, 'অবস্ট্রাক্টিং দ্য ফিল্ড' অনুসারে আউট দিয়ে দেন। ম্যাচটা হেরে যায় বকদিঘি। অল্পস্বল্প ফিসফাস ছাড়া, সেদিন কেউ এম পি—র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেনি।

তবে বকদিঘির নতু মুখুজ্যে পরদিনই হুগলি ডি এস এ—কে ঘটনাটি জানিয়ে, অবস্ট্রাক্টিং দ্য ফিল্ড আইনে দুজন ব্যাটসম্যানকে একই সঙ্গে আউট দেওয়া আইনসম্মত কিনা এই প্রশ্ন তুলে চিঠি দেয়। ডি এস এ চিঠিটা পাঠায় সি এ বি—কে, নির্দেশ প্রার্থনা করে। সি এ বি চিঠিটা রেফার করে ক্রি—কন্ট্রোল বোর্ডের রুলস সাব—কমিটির কাছে। তারা দুটি জরুরি মিটিং ডেকে সমস্যার ফয়সালা করতে না পেরে অবশেষে লর্ডসে এম সি সি—র দ্বারস্থ হয়। গোপীনাথের ডিসিশান কি পরিস্থিতিতে কিভাবে দেওয়া হয়েছে, মাঠের ছবি, যাদের আউট দেওয়া হয় তাদের সঠিক পজিশনের ছবি ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে চেয়ে চারটি চিঠি আসে লন্ডন থেকে বোম্বাই, কলকাতা ঘুরে বকদিঘিতে। অবশেষে ইম্পিরিয়াল (তখন ওই নাম ছিল) ক্রিকেট কনফারেন্সে প্রসঙ্গটা ওঠে। আট ঘণ্টা তর্কাতর্কির পর অবশেষে ৪০ আইনের সঙ্গে একটি লাইন জুড়ে দেওয়া হয় : ইট ইজ দ্য স্ট্রাইকার হু ইজ আউট।

ব্যাপারটা উইজডেনের সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছিল। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার কাগজে কাগজে গোপীনাথ ঘোষের নাম ছাপা হয়। পার্লামেন্টেও তিনি অভিনন্দিত হন। কলকাতার কাগজগুলিতে, নতু মুখুজ্যের নামও উল্লেখ করা হয়। ব্যাপারটা নিয়ে সে যদি চিঠি না দিতো তাহলে ৪০ আইনে ওই লাইনটার সংযোজনই হতো না। মোট কথা, আটঘরা—বকদিঘি বাৎসরিক ম্যাচ রাতারাতি এমনই বিখ্যাত হয়ে গেছে যে শোনা যাচ্ছে, কলকাতা থেকে রিপোর্টার—ফটোগ্রাফারও নাকি এবার বকদিঘিতে আসতে পারে। তাহলে নতু মুখুজ্যের ক্যাপে ওটা হবে দ্বিতীয় পালক।

দুই প্রাক্তন জমিদার বাড়ি, আটঘরার সিংহ আর বকদিঘির মুখুজ্যেদের মধ্যে সাবেকি রেষারেষিটা এই বাৎসরিক ম্যাচকে কেন্দ্র করে এখনো জীইয়ে রয়েছে। প্রতি বছর বড়দিনের সময় খেলাটি হয়। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই দুই গ্রামের কথাবার্তা এবং যাতায়াত কমে আসে। লাইব্রেরি, টিচার্স রুম, ডাক্তারখানা, কো—অপারেটিভ এবং বি ডি ও অফিস, হেলথ সেন্টার, সিদ্ধেশ্বরীতলা, শেখ বসিরের কোল্ড স্টোরেজ, নরেন মান্নার দি নিউ নেতাজী ভাণ্ডার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট—সর্বত্রই থমথমে আবহাওয়ায় ফিসফাস শুরু হয়ে যায়।

এবারও শুরু হয়েছে।

নতু মুখুজ্যে নাকি বলেই রেখেছে, এবার দেখিয়ে দেবে। কি দেখাবে সেটা নিয়েই জল্পনা—কল্পনা।

শোনা যাচ্ছে, মুখুজ্যেদের বড় তরফের সেজ মেয়ের দ্যাওরপো শিশিরকে ওরা নাকি জামসেদপুর থেকে আনাবে। শিশির গত বছর রঞ্জি ট্রফিতে খেলেছে বিহারের পক্ষে। কথা উঠেছে, তার খেলার যোগ্যতা নিয়ে। সে বা তার বংশের কেউ বকদিঘিতে কখনো তে—রাত্তির বাস করেছে কিনা।

এই ম্যাচে খেলার জন্য যে কটি যোগ্যতা দরকার, তার একটি হলো তে—রাত্তির বাস। নতু মুখুজ্যে বলেছে, শিশির তার এগারো বছর বয়সে দুর্গাপূজার সময় এসে সাতদিন বকদিঘিতে ছিল। মেজ খুড়িমার কাছে রক্ষিত, তখনকার তোলা একটি গ্রুপ ফোটো প্রমাণ দেবে।

শোনা যাচ্ছে, নতু মুখুজ্যে কলকাতা থেকে পাশকরা আম্পায়ার আনাবে। বকদিঘির গোবিন্দ বর্ধনের ছোট নাতি জিতু বর্ধন নাকি কলকাতায় আম্পায়ারিং—য়ে ভীষণ নাম করে ফেলেছে। এই বছর লীগে প্রথম ম্যাচেই সে দশটি এল বি ডবল্যু দিয়েছে। খবরের কাগজে চিঠি লেখালেখি চলছে—ওয়ারল্ড রেকর্ড কিনা?

বাৎসরিক ম্যাচের নিয়ম—দুই পক্ষ থেকে একজন করে আম্পায়ার থাকবে। খেলা হয় হোমঅ্যাওয়ে ভিত্তিতে। অর্থাৎ এই বছর আটঘরায় খেলা হলে, পরে বছর হবে বকদিঘিতে। লাঞ্চ দেয় হোম—টিম। কিন্তু একবার বকদিঘির দেওয়া লাঞ্চ খেয়ে ফিল্ড করতে নেমে আটঘরার পুরো টিমটাই আধ ঘণ্টার মধ্যেই মাঠ ছেড়ে পাশের বাঁশবনে জরুরী তাগিদে ঘনঘন ফিল্ড করতে যাওয়ায় ম্যাচ হারে। তারপর থেকেই নিয়ম হয়—সে যার নিজের লাঞ্চ।

আজ পর্যন্ত দুই পক্ষের ফল ১৩ : ১৩। একটিও ড্র হয়নি। সুতরাং এবারের সাতাশতম ম্যাচটিকে নিয়ে এগারো মাইল দূরে গোপীনগরে পর্যন্ত বাজী ধরা যাবে, সেটা এমন কিছু আশ্চর্যের নয়।

অনেক রকম কথাই কানে আসছে, কিন্তু তাই নিয়ে আমি বা পরমেশ সিং বা নন্তু দত্ত একটুও বিচলিত হচ্ছি না। প্রতি বছরই গুজব ওড়ে কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, সেই চণ্ডী কম্পাউন্ডার, পঞ্চু কলু, মুকুন্দ মালখন্ডি, বিষ্টু মিশির, অতুল মুখুজ্যে, ভুবন ডাক্তার, আর কুড়িয়ে—বাড়িয়ে ইস্কুলের ছেলেদের নিয়েই টিম হয়। আম্পায়ার থাকে বকদিঘি ড্রামটিক সোসায়েটির প্রম্পটার হরিশ কর্মকার আর আটঘরা উচ্চচমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অঙ্কের বুদ্ধদেব স্যার।

একটা গোলমাল অবশ্য দুবছর আগে বুদ্ধু স্যারকে (কিছু ছেলে আড়ালে বলে) নিয়ে হয়েছিল। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার করার টোপ দেখিয়ে বকদিঘি স্কুলের সেক্রেটারি নাকি ওকে দিয়ে ম্যাচ জিতে নেয়—তিনটি রান আউট, দুটি এল বি ডবল্যুর সাহায্যে। আমরা অবশ্য এসব কথা একদমই বিশ্বাস করি না। বুদ্ধদেবের মতোই বুদ্ধু স্যার নির্লোভ এবং অহিংস। অপবাদের প্রতিবাদে গত বছর তিনি আম্পায়ার হননি, তাই গোপীনাথ ঘোষকে আমরা নামিয়েছিলাম।

এই বছর, দু মাস আগে আমরা তিনজন ওর বাড়িতে যাই। না গিয়ে উপায় নেই। ক্রিকেট আইন জানা আটঘরায় কেউ আর নেই। বাইরের কাউকেও নামাতে ভরসা হয় না, কেননা বুদ্ধু স্যারের মতো আটঘরা—প্রেমিক তিনি হবেন, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। হরিশ যতটা বকদিঘির জন্য গাত্রচর্ম পুরু করে ফেলেন, তার সঙ্গে তাল দিয়ে বুদ্ধু স্যারও চক্ষুলজ্জা খসিয়ে দেন। রান আউটের বদলে রান আউট, এল বি ডবল্যুর বদলা নিতে এল বি ডবল্যু—এই হচ্ছে তার নীতি। কিন্তু দুবছর আগের ম্যাচটিতে হরিশের দেওয়া দুটি স্ট্যাম্প আউটের (স্ট্রাইকারের পা ব্যাটিং ক্রিজের একবিঘৎ ভিতরে) বদলা নিতে না পারায়, তার নামে অপবাদ রটে।

বুদ্ধু স্যার তো আমাদের দূর থেকে দেখেই মাথা নাড়তে শুরু করেছেন।

'নো, নো, নো, আই ওন্ট স্ট্যান্ড আ্যাজ আম্পায়ার। নেএভার।'

আমরা তিনজন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম মিনিট দুই।

গলা খাঁকারি দিয়ে অবশেষে পরমেশদা ধরা গলায় বলল, 'এবার আমরা, মানে আটঘরা, হেরে যাব।'

বিষণ্ণ কণ্ঠে নন্তু দত্ত বলল, 'তারকেশ্বর থেকে ব্যান্ড পার্টি আনবে বলেছে নতু মুখুজ্যে। এই রাস্তা দিয়েই হয়তো বাজাতে বাজাতে, নাচতে নাচতে যাবে।'

আমি যথাসাধ্য ক্ষুব্ধ স্বরে বললাম, 'হরিশ একটা অশিক্ষিত মূর্খ, যে ইংরিজি জানে না, ক্রিকেট রুলস পড়েনি, সে কিনা এই প্রথম কে নোবল গেমে আম্পায়ার হয়ে আমাদের অর্থাৎ আটঘরাকে, বেইজ্জত করে ছাড়বে। তাই দেখতে হবে আমাদের, অর্থাৎ আটঘরার লোকেদের?'

'আপনি কি বলেন? মনে হয় না কি, একজন আইনজ্ঞ, কড়া, নির্ভীক, সৎ আম্পায়ার, আপনার মতোই কেউ, আর এক এন্ডে থাকা দরকার?' পরমেশদা কাঁচুমাচু দেখাবার জন্য চশমাটা খুলে ফেলল।

'আমি তো সেই কথাই বলছিলাম, বুদ্ধদেব স্যারের মতো আম্পায়ার এই ব্লকে, এই সাবডিভিশ্যানে, এই জেলায় আর দ্বিতীয় কে আছে?' নন্তু দত্ত গর্বে তার আটাশ ইঞ্চি বুক তিরিশ পর্যন্ত ফোলালো।

'গোপীনাথবাবু গতবার যা কেলেঙ্কারিটা ক'রে আমাদের, অর্থাৎ আটঘরার নাম যেভাবে ডোবালেন, সেই নাম আবার টেনে তুলতে কে আর আছে? প্রশ্নের সঙ্গেই উত্তরটাও বুঝিয়ে দিতে বুদ্ধুস্যারের দিকে তাকিয়ে আমি গোটা বারো দাঁত ঠোঁট টেনে দেখালাম।

চুপচাপ শুনে যাবার পর উনি শুধু একটি শব্দ করলেন, 'হুম।'

আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। পাষাণে ফাটল তাহলে ধরেছে।

'গোপীনাথ ঘোষ আর যাই করুন, ক্রিকেট হিস্ট্রি তো ক্রিয়েট করেছেন।' বুদ্ধুস্যারের এই গম্ভীর ভঙ্গিটা আর শুধুমাত্র দেখা যায় নল—চৌবাচ্চার অঙ্ক বোঝাবার সময়। 'ওঁর ডিসিশান ক্রিকেট আইন রি—রাইট করিয়েছে, উনি ইন্টারন্যাশনালি ফেমড হয়েছেন এটা ভুলে যাচ্চচ কেন?'

'আপনিও হিস্ট্রি ক্রিয়েট করবেন; আটঘরাকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট জিওগ্রাফিতে স্থাপন করবেন।' আমি বললাম।

'কিভাবে?'

'আপনার প্রাজ্ঞতা, সুনিশ্চিত সিদ্ধান্ত, যুগান্তকারী ডিসিশ্যন দ্বারা।' নন্তু দত্ত তক্তপোশে ঘুঁষি মারল। তলা থেকে ঊর্ধ্বশাসে একটা বেড়াল বেরিয়ে গেল।

'কিভাবে তা সম্ভব! সেরকম সিচুয়েশন চাই। আমি অঙ্কের লোক তবু বলছি হিস্ট্রি অলওয়েজ ক্রিয়েটেড বাই সিচুয়েশন।'

'সিচুয়েশন নিশ্চয় তৈরি হবে। ক্রিকেট ইজ এ গেম অফ আনসার্টেনিটি। দেখবেন হরিশ হয়তো এমন এক ডিসিশ্যন দিলো, তাতেই আপনি সিচুয়েশন পেয়ে যাবেন।'

'হুমম।' পাষাণ বিদীর্ণ হবার শব্দ হলো।

কোনোবারে যা হয়নি এবার আটঘরায় তাই হয়েছে। নেই প্র্যাকটিস।

মাসছয়েক হলো শিবশঙ্কর রাহা দারোগা হয়ে এসেছেন আটঘরায়। বত্রিশ বছর আগে উনি পাটনা ইউনিভারসিটির ক্রিকেট ব্লু হন। তারপর চাকরিতে ঢুকে ক্রিকেট ব্যাট প্রায় হাতে নেননি। আটঘরায় এসে এখানকার শান্তিপ্রিয় অধিবাসীরা তাকে হাঁফ ছাড়ার সুযোগ দেওয়ায় তিনি পরিত্যক্ত শখটি আবার ঝালিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁর উদ্যোগ প্রেরণা এবং চাপে পড়েই নেটের ব্যবস্থা।

শিবশঙ্কর মানুষটি গোঁয়ার, অপরের খুঁত খুঁজে বেড়ান, যা মনে করেন সেটাই সর্বোত্তম ধরে নেন, এবং ক্রিকেট ভালোবাসেন। আটঘরার এলাকার মধ্যে যে—কটি ম্যাচ ইতিমধ্যে খেলা হয়েছে তার সবকটিতেই দলে ছিলেন।

প্রথম ম্যাচেই তিনি জানিয়ে দেন, পয়েন্ট ছাড়া আর কোথাও তিনি ফিল্ড করেন না। পরমেশদা তাকে বহুকষ্টে বোঝাতে লাগলেন, আজকালকার বোলাররা পয়েন্টে আর লোক রাখে না। গাঁইগুঁই করে অবশেষে তিনি গালিতে ফিল্ড করতে রাজি হন। মোটামুটি জায়গাটা পয়েন্টেরই কাছাকাছি তো! আমরাও ওকে খুশি করতে সর্বদাই তাই বলে থাকি; 'ব্যাকওয়ার্ড—পয়েন্টে দরোগাবাবু ফিল্ড করবেন' বা 'করছেন' বা 'করুন'।

অত্যন্ত জরুরী মুহূর্তে দারোগাবাবুর অভ্যাস ক্যাচ ফেলা। কিন্তু অন্যে ক্যাচ ফেললে তিনি রক্ষা রাখবেন না। ব্যাট হাতে নিয়ে প্রথম দিনই তিনি জানিয়ে দেন, ডাকাত ধরতে গিয়ে পিস্তলের গুলি হাঁটুতে লাগায়, জায়গাটা জখম হয়েছে। রানার ছাড়া তিনি ব্যাট করতে পারবেন না। বিপক্ষ অধিনায়কের মধ্যে এখনো পর্যন্ত এমন কাউকে পাওয়া যায়নি, যে আপত্তি করার মতো বুকের পাটা দেখাতে পারে! তবে দারোগাবাবুর ব্যাট করার পালা এলেই দেখা যায় আটঘরার অল্পবয়সী খেলোয়াড়রা গুটিগুটি সটকে পড়ার চেষ্টা করছে। কেউই ওর রানার হতে চায় না। অবিরত খ্যাচ খ্যাচ করে যাবেন। কেউই ওকে খুশি করতে পারে না।

একবার আমিই ঠিক করে দিই : লটারি হবে। যার নাম উঠবে সে দারোগাবাবুর রানার হবে এবং লটারি বিজয়ীর দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে বাকিরা প্রত্যেকে তাকে দশ পয়সা দেবে। প্রথমবারেই উঠেছিল আমার নাম।

দারোগাবাবুর সঙ্গে মাঠে নেমে স্কোয়্যারলেগ আম্পায়ারের কাছে দাঁড়াই। উনি প্রথম বলটি কভারের দিকে ঠেলে দেওয়া মাত্র আমি 'ই য়ে য়ে স' বলেই ছুটে রান দিতে যাই। নন—স্ট্রাইকার বিন্দুমাত্র ব্যগ্র হয়নি ক্রিজ ছাড়তে। আমি অর্থাৎ দারোগাবাবু রান আউট হলেন। মাঠের মাঝে এবং পরবর্তী এক সপ্তাহ উনি আমায় যা—যা বলেছিলেন তা উহ্য থাক। তবে আড়ালে ছেলেরা বলেছিল : 'মতিদা আমাদের চিট করেছেন, দু'মিনিটের কাজের জন্য উনি পয়সাটা বেশিই নিয়েছেন।'

পরের দুটি ম্যাচেও রান আউট হয়ে দারোগাবাবু এখন নিজের রানার এক কনস্টেবলকে নিয়ে ব্যাট করতে যান। তবে পরমেশদাকে ছেলেরা জানিয়ে রেখেছে বাৎসরিক ম্যাচে এই বিলাসিতাটি চলবে না অর্থাৎ টিমেরই কাউকে রানার নিতে হবে।

বাৎসরিক ম্যাচের আগের দিন সকালে কলকাতা থেকে হঠাৎ এসে পড়লেন মলয় সিংহ। সাব—জজিয়তি করেন। ক্রিকেটে ভীষণ উৎসাহী। এসেই বললেন, 'কাল খেলব।'

লাঞ্চের অর্ধেক খরচ দেবেন বলা মাত্র, আমি নিজের জায়গাটি ছেড়ে ওঁকে টিমে ঢুকিয়ে নিলাম। দুপুরে নেটে এলেন সাব—জজ। গ্রামের অনেকেই দেখতে এলো তার এলেমদারি। দারোগাবাবু আমার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। মলয় সিংহ বল করছেন।

'কোনোরকম সারপ্রাইজ নেই বোলিংয়ে। ভীষণ ইরাটিক। লেংথের যে কি গুরুত্ব, সে সম্পর্কে দেখছি একদম ধারণাই নেই। জোরে জোরে বল করলেই কি আর উইকেট পাওয়া যায়? লেংথ আর ডিরেকশন এ দুটোই আসল জিনিস। তোমার সাব—জজের তো ব্রেন বলে কিছু নেই। এর থেকে চণ্ডী কম্পাউন্ডার অনেক মাথা খাটিয়ে বল করে।'

দারোগাবাবু আমাকে শুনিয়ে যেতে লাগলো তার সুচিন্তিত মন্তব্যগুলি। আমি চুপ। এরপর সাবজজ ব্যাট করতে এলেন।

'সায়ান্স বলে কোনো ব্যাপারই নেই দেখছি দ্যাখো কাণ্ড, এসেই কিনা হুক করতে গেল। আগে চোখটা সেট করুক, তবে তো রিস্কি শট নেবে।'

'ব্যাটে—বলে হয়েছে তো।' আমি বললাম।

'হয়েছে মানে? এটা তো ক্যাচ! লংলেগে হাতের মধ্যে গিয়ে পড়ল।' দারোগাবাবু পিছন ফিরে কাল্পনিক লংলেগের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেনও 'পরমেশের উচিত ওকে বলে দেওয়া, কালকের ম্যাচে সেট না হওয়া পর্যন্ত এসব শট যেন একদম বাতিল করে। তবে কি জানো, পরমেশের পার্সোনালিটি তো একটু কমই, ক্রিকেট সেন্সটাও। সেদিন দেখলে তো রায়পাড়ার সঙ্গে খেলায়, চণ্ডীকে একবার স্লিপে, একবার ডীপ ফাইন লেগে, একবার লং অনে দাঁড় করালো। প্রত্যেক ফিল্ডারের নির্দিষ্ট জায়গা থাকা উচিত। বারবার এধার ওধার করালে......দ্যাখো দ্যাখো কিভাবে বোল্ড হলো! ব্যাট—প্যাডের ফাঁক দিয়ে যে হাতিও গলে যাবে!'

'আরে আরে, মাঠে গরু ঢুকে....' বলতে বলতে আমি রথতলার দিকে দ্রুত এগিয়ে দারোগাবাবুর কাছ থেকে রেহাই নিলাম।

রীতিমতো শোভাযাত্রা করেই বকদিঘি এলো। দুটি মোটরে এলো নতু মুখুজ্যের সঙ্গে খেলোয়াড়রা এবং আম্পায়ার হরিশ। টেম্পোয় এলো খেলার সরঞ্জাম। আর সার বেঁধে শ'খানেক বকদিঘি—সমর্থক।

নন্তু দত্ত ওদের অভ্যর্থনা জানাবার ছলে দেখে এলো কে কে এসেছে।

'কই শিশিরকে তো দেখলুম না! আম্পায়ারও সেই হরিশই এসেছে!'

পরমেশদা বলল, 'নতুন একটা কায়দা, তুরুপের তাস আগে ফেলে না।'

কথাটা ঠিক। টস হবার দশ মিনিট আগে আর একটা মোটর পৌঁছল এবং তা থেকে নামল শিশির। তৈরি হয়েই এসেছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে ও হাসলো। নন্তু দত্ত একবার বলেছিল শিশিরকে চ্যালেঞ্জ করবে। পরমেশদা আপত্তি করে বলে, নতু কাঁচা ছেলে নয়, ঠিক একটা ছবি বার করে দেখিয়ে দেবে।

টস হলো। দূর থেকে নতু মুখুজ্যের মুখের হাসি দেখেই বোঝা গেল কে জিতেছে। আর বলার দরকার নেই কারা ব্যাট করবে। ওপেনিং বোলার, ছ'ফুট চার ইঞ্চি চণ্ডী কম্পাউন্ডার যথারীতি সঙ্গে সঙ্গে দশটা ডন আর কুড়িটা বৈঠক দেওয়া শুরু করলো। উইকেটকীপার বকু বোস প্যাড বার করলো। দারোগাবাবু হাঁটুতে নী—ক্যাপ পরে নিলেন। বুদ্ধদেব স্যার এবং হরিশ কর্মকার গম্ভীর মুখে ধীর পদক্ষেপে পাশাপাশি রওনা হলো উইকেটের দিকে। নামার সময় দুজনেই কঠোরভাবে নিরপেক্ষ—বেলা গড়াবার সঙ্গে সঙ্গে ওরা তা থাকবে কি না, সেটা অবশ্য অন্য কথা।

বকদিঘির ইনিংস একটু চাঞ্চল্যকর ভাবেই শুরু হয়। ব্যাট করতে নামে আলুর আড়তদার বিষ্টু মিশির এবং মুখুজ্যেদেরই একটি স্কুলে পড়া ছেলে, অরুণ। চণ্ডীর, তিরিশ কদম ছুটে আসা প্রথম বলটিকে অনায়াসেই 'ওয়াইড' বলা যায়। থার্ড স্লিপ যথাসময়ে উবু হয়ে বসে না পড়লে ফুলটসটি অবশ্য বাউন্ডারিতে পৌঁছতো না। বোলিং প্রান্তে আম্পায়ার বুদ্ধদেব স্যার নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে। হরিশ কর্মকারের ভ্রূ ইঞ্চিখানেক উপরে উঠে কয়েক সেকেন্ডের জন্য কঠিন হয়ে রইল। পরের বলটি নিখুঁত লেংথে, মিডলস্টাম্পের উপর। অরুণের মুখ দেখে মনে হলো না, বোল্ড আউট হয়ে সে অখুশী।

খেলতে নামল শিশির। বাকি চারটি বল সে অবহেলায় ছেড়ে দিলো, কিন্তু তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণের মধ্যে রেখে। চণ্ডীর দ্বিতীয় ওভারেরও সম্মুখীন হলো শিশির। পরমেশদার বলে সামিয়ানার ওপর একবার বল ফেলা ছাড়া আগের ওভারে মিশিরজী আর কিছু করেনি। চণ্ডীর প্রথম বলটি পড়ল অফ স্ট্যাম্পের যৎসামান্য, মাত্রই যৎসামান্য বাইরে, সম্ভবত বলটা একটু উঠেছিল, সম্ভবত যতটা জোরে আসবে মনে হয়েছিল ততটা জোরে আসেনি, সম্ভবত শিশিরের মশারির মধ্যে দু—একটা মশা ঢোকায় ঘুমোতে পারেনি, সম্ভবত সে ঠিক করে উঠতে পারেনি বলটা ছেড়ে দেবে না খেলবে। কারণটা যাই হোক, বলটির দিকে সে প্রায় আনাড়ির মতোই ব্যাট এগিয়ে দেয়। ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বলটি আলতো লোপ্পাই হয়ে গালির হাতে অর্থাৎ দারোগাবাবুর হাতে পড়ল বটে কিন্তু অবস্থান করলো না। মোটা বেঁটে আঙুলগুলোকে কুঁকড়ে মুঠোয় পরিণত করতে তিনি একটু দেরী করে ফেলেন।

সারা মাঠ স্তব্ধ। দারোগাবাবু গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলেন পায়ের কাছে পড়ে থাকা বলটির দিকে তাকিয়ে। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন, 'হায় মা কালী, বই পড়ার চশমাটা পরে কিনা নেমেছি!'

উনি হাত তুলে ইশারা করলেন। ছুটে এলো মাঠের এক কনস্টেবল।

'জলদি আমার ব্যাগ থেকে ডিউটির চশমাটি নিয়ে এসো।'

'মিনিট চারেক পর দারোগাবাবুর চশমা বদল হলো। ততক্ষণ খেলা বন্ধ ছিল।

খেলার ভাগ্য যে ক্যাচ নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বদল হয়ে গেছে, সেটা বুঝতে ওভার দুয়েক সময় লেগেছিল। দু ওভারের মধ্যেই শিশির ২৪—এ পৌঁছে যায় এবং আটঘরার ফিল্ডাররা বাউন্ডারি থেকে বল কুড়িয়ে এনে প্রতিবারই দারোগাবাবুর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে।

লাঞ্চের সময় শিশিরের ১০৪ এবং বকদিঘির চার উইকেটে ১৭৪।

নন্তু দত্ত কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, 'কোনোদিন এমন হয়েছে মনে পড়ে না মতি, লাঞ্চের আগেই দেড়শোর ওপর রান করলো আমাদের এগেনস্টে! তাহলে টি—এর আগে তো সাড়ে তিনশো করে ফেলবে!'

দারোগাবাবু বিরিয়ানির পাহাড়ের মাঝে গর্ত করে তাতে মুরগির ঝোল ঢেলে একটা হ্রদ তৈরি করায় ব্যস্ত ছিলেন। কথাটা তার কানে পৌঁছতেই কাজ অসমাপ্ত রেখে মুখ তুললেন।

'ভুবন ডাক্তারকে দিয়ে চেষ্টা করা উচিত। আমি লক্ষ করেছি ভুবনের বলে শিশির দোনামোনায় পড়ছিল—ছয় মারবে না চার মারবে ভেবে পাচ্ছিলো না। এই অবস্থায় স্টামপিং চান্স সহজেই এসে যায়।'

'তবে কমন ডিসেন্সি থাকলে,' সাব—জজ মুরগির একটা ঠ্যাং তুলে নাকের সামনে নাড়তে নাড়তে বললেন, 'ওরা নিশ্চয়ই একঘণ্টার মধ্যেই ডিক্লেয়ার করবে।'

ডিক্লেয়ার করতে হলো না। একঘণ্টার মধ্যেই বকদিঘির ইনিংস শেষ হয়ে গেল ২১৪ রানে। কিভাবে যে ঘটলো কেউ জানে না। লাঞ্চের পর শিশির প্রথম ওভারেই অলসভাবে (অতি ভোজনের জন্যই বোধ হয়) ব্যাট চালিয়ে উইকেটকীপার বুকু বোসকে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যায়। এরপর দুটি এল বি ডবল্যু আবেদনে বুদ্ধদেব স্যার আঙুল তুলে দেন।

পাশে বসা নতু মুখুজ্যের দাঁত কড়মড়ানি শুনে আমার মনে হলো, বুদ্ধদেব স্যার একটু তাড়াতাড়িই তুরুপের তাস ফেললেন। আটঘরাকে এরপর ব্যাট করতে হবে এবং হরিশ সমতা রক্ষার জন্য আড়াই ঘণ্টা সময় পাবে। আটঘরার পাঁচ উইকেটে ৯২ রান করার পর নামলেন দারোগাবাবু। সঙ্গে রানার পরমেশদা। ক্যাচটা ফেলার পর তিনি যেটুকু মুষড়ে পড়েছিলেন ইতিমধ্যেই তা কাটিয়ে উঠেছেন।

অপরপ্রান্তে চণ্ডী কম্পাউন্ডার। দারোগাবাবুর ইশারায় সে কাঁচুমাচু মুখে এগিয়ে এলো।

'রান যখন নেবে, খবরদার পীচের উপর দিয়ে দৌড়বে না। মনে থাকবে?'

চণ্ডী মাথা নাড়লো, দারোগাবাবু এরপর গার্ড নিলেন, মিনিট চারেক ধরে। তারপর সাইট স্ক্রীনের খুঁত বার করলেন। তার মতে বাঁ দিকে দু গজ অন্তত কম রয়েছে। নতু মুখুজ্যে সায় দিতে তিনি খুশি হয়ে বললেন, 'ক্রিকেট ডেলিকেট গেম। সবাই এটা বোঝে না।'

আটঘরার ইনিংস একশো পার হলো প্রধানত দারোগাবাবুর জন্যই। স্ট্যাম্পের সামনে ব্যাট দিয়ে বল থামিয়ে ফেলার অদ্ভুত একটা দক্ষতা ছাড়াও খোঁচা দিয়ে মাঝে মাঝে একটা—দুটো রানও তিনি যোগাড় করে ফেলতে পারেন। তার চারটে সিঙ্গল এবং চণ্ডীর একটি ঝাড়ুতে বাউন্ডারি থেকে আটঘরা একশোয় পৌঁছতেই, পরের বলে সে আবার ঝাড়ু চালালো। বলটা ব্যাটের কানায় লেগে স্কোয়্যার লেগের দিকে সোজা আকাশে উঠল।

মিড—অন পড়িমরি ছুটে এসে ক্যাচ ধরার সঙ্গে সঙ্গেই স্কোয়্যার লেগ আম্পায়ার হরিশের উপর সে পড়ল। মাথায়—মাথায় প্রচণ্ড ঠোকাঠুকি। চণ্ডী আউট, সেইসঙ্গে হরিশ এবং মিড—অনও। দুজনেরই কপাল থেকে রক্ত ঝরছে। দুজনকেই মাঠের বাইরে যেতে হলো।

মুস্কিলে পড়লো নতু মুখুজ্যে। ওই দুজনের জায়গায় নামাবার মতো লোক তার নেই। তার স্কোরারকে আম্পায়ার হিসেবে নামাতে পারে কিন্তু মিড—অনের বদলী হবার মতো কেউ নেই। পরমেশদাই উদার কণ্ঠে ওকে বললেন, 'যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমাদের কেউ ফিল্ড করতে পারে তোমাদের হয়ে।'

কি ভেবে নতু মুখুজ্যে রাজি হয়ে গেল। আটঘরার ক্লাস টেনের ছাত্র সুব্রত নামলো বকদিঘির হয়ে ফিল্ড করতে। চণ্ডীর জায়গায় ব্যাট করতে এসেছেন সাবজজ।

'স্যার, এখুনি তাড়াহুড়ো করবেন না।' দারোগাবাবু চেঁচিয়ে সাবজজকে বললেন, 'আগে সেট হয়ে নিন।'

সম্ভবত এই উপদেশ শুনেই সাবজজ প্রথম বলটিতেই ব্যাট হাঁকড়ালেন। একস্ট্রা কভার দিয়ে বল চলেছে। তার পিছনে কাঠবেড়ালীর মতো ছুটছে সুব্রত।

ইতিমধ্যে ব্যাটসম্যান দুজন ও রানারের মধ্যে কয়েকটি চীৎকার বিনিময় ঘটলো। দারোগাবাবু বললেন, 'নো', সাবজজ বললেন, 'রান', পরমেশদা বললেন, 'ওয়েট', সাবজজ 'কাম অন',

দারোগাবাবু : 'ইয়েস'; সাবজজ 'নো', পরমেশদা 'হারি—আপ'।

দেখা গেল সাবজজ এবং দারোগাবাবুর রানার পরমেশদা দুজনেই ছুটতে শুরু করেছে রান নিতে এবং দুজনেই পীচের মাঝামাঝি পৌঁছে উভয়ে দেখলো সুব্রত পরিচ্ছন্নভাবে বলটা কুড়িয়ে নিয়ে ছোঁড়ার জন্য উদ্যত। ওরা ইতস্তত করে থমকে গেলো।

'স্যার ছুটুন।' দারোগাবাবু চীৎকার করল।

'গো ব্যাক।' পরমেশদা বলল।

দেখা গেল দুজনেই একই দিকে ছুটছে। সাব—জজ ও পরমেশদা পাশাপাশি পৌঁছলেন নন—স্ট্রাইকার প্রান্তে। দর্শকরা মজা পেয়ে হৈ হৈ করে উঠতেই ওরা নিজেদের ভুল বুঝে এবার দুজনেই ছুটলো স্ট্রাইকার প্রান্তের দিকে। এবং সেই মুহূর্তে উইকেটকীপার পঞ্চু কলুর গ্লাভসে উড়ে আসা বলটিকে জমা পড়তে দেখে, দুজনেই পাশাপাশি পীচের মাঝে হাল ছেড়ে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে পড়লো।

পঞ্চু কলু রান আউট করার জন্য বেল ফেলতে গিয়েও থমকে গেল। দুজনেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, কে তাহলে রান আউট হবে? ফ্যালফ্যাল করে সে নতু মুখুজ্যের দিকে তাকালো।

নতু মুখুজ্যে হাত তুলে তাকে প্রথমে বারণ করলো। তারপর ভ্রূ কুঁচকে পরিস্থিতিটা গোলমেলে বুঝে ইশারায় বেল ফেলে দিতে বললো। পঞ্চু কলু বল হাতে তিনটি স্টাম্পকেই জমিতে শুইয়ে দিয়ে 'হাউজ দ্যাট' বলে চীৎকার করলো।

বোলিং প্রান্তে হরিশের বদলী আম্পায়ার ছেলেটি আঙুল তুলে চেঁচিয়ে উঠল 'আউট।'

পরমেশদার বাহু আঁকড়ে ধরে, গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়ানো সাবজজ হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, 'কে আউট?'

'আপনি স্যার!' দারোগাবাবু এগিয়ে এলেন পীচের মাঝে।

'রাবিশ। আমি কেন আউট হব?'

'তাহলে আম্পায়ারকে জিজ্ঞাসা করা যাক।'

আম্পায়ার ছেলেটি এইবার ফাঁপরে পড়লো। পরমেশদা আর সাবজজ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, কাকে সে আউট দেবে?

নতু মুখুজ্যে মুচকি হেসে বললো, 'ওরে পরমেশ, গত বছরতো দুজনকে একসঙ্গে আউট দিয়ে আমাদের হারিয়ে দিয়েছিল তোর আম্পায়ার। এবার আমাদের আম্পায়ারও যদি তাই করে?'

'পারবে না করতে। আইনে নেই।'

সবাই চমকে ফিরে তাকালো। স্কোয়্যার লেগ বুদ্ধদেব স্যার কখন যেন গুটিগুটি এসে দাঁড়িয়েছেন।

'স্ট্রাইকার এন্ডে স্টামপিং কি রান আউট ডিসিশ্যন দেবে স্কোয়্যার লেগ আম্পায়ার অর্থাৎ আমি।'

'কারেক্ট।' সাবজজ বললেন। দারোগাবাবু মাথা নাড়লেন।

'বেশ,' নতু মুখুজ্যে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো। 'কে আউট তাহলে?'

বুদ্ধদেব স্যার চিন্তিত স্বরে বললেন, 'ইট ইজ এ হিস্টরিক সিচ্যুয়েশন। হঠাৎ একটা ডিসিশ্যন দেওয়া ঠিক হবে না। আইন বইয়ে এ রকম কোনো নজিরের কথা আছে কিনা, সেটা আগে দেখতে হবে। না থাকলে লর্ডস—এ রেফার করতে হবে, তাদের মতামত আনাতে হবে।'

'ততক্ষণ কি আমরা এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকব?' কাঁদোকাঁদো হয়ে পড়লেন পরমেশদা।

'নিশ্চয়।' দারোগাবাবু পঞ্চু কলুর দিকে চোখ রেখে ধমক দিলেন পরমেশদাকে। হাতে বল নিয়ে পঞ্চু ভূতলশায়ী স্টাম্পগুলিকে যক্ষের মতো পাহারা দিচ্ছে। দুজনের কেউ একপা সামনে কি পিছনে নড়লেই সে আবার রান আউটের দাবী জানাতে একটা স্টাম্প মাটি থেকে তুলে নেবে।

'আমি তো গোপী ঘোষ নই, যে হুট করে একটা ডিসিশ্যন দিয়ে দেবো। তবে আপনাদের মধ্যে কেউ যদি স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে রান আউট হতে চান—'

'টিমের মুখ চেয়ে, আপনারই আউট হওয়া উচিত।' সাবজজকে লক্ষ করে দারোগাবাবু বললেন, 'আমি এখন সেট হয়ে গেছি, এখন আমার থাকা দরকার।'

'রাবিশ। কুইক রান এখন দরকার যদি জিততে হয়। আমি এসে প্রথম বলই কি ভাবে ড্রাইভ করলাম, সেটা নিশ্চয়ই দেখেছেন।'

'আনফরচুনেটলি ব্যাটে—বলে হয়ে গেছে। কিন্তু সবগুলো যে হবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।'

ষোলোটি লোক মাঠের মাঝে এবং খেলা বন্ধ রেখে কথা কাটাকাটি করে চলেছে। দর্শকরা প্রথমে উসখুস তারপর চেঁচামেচি শুরু করলো। আমি, নন্তু দত্ত এবং আরো কয়েকজন মাঠের মধ্যে এলাম। বুদ্ধদেব স্যারকে ডেকে নিয়ে বললাম, 'গতিক খুব ভালো নয়। যাহোক একটা ডিসিশ্যন দিন।'

'যা হোক! বলো কি, গড সেন্ট সিচ্যুয়েশন, হাতছাড়া করা যায়?'

'কিন্তু পাবলিক তো তা শুনবে না।' নন্তু দত্ত উদ্বিগ্ন চোখে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললো, 'ডিসিশ্যন দিয়েছিল বলেই না গোপী ঘোষ ইন্টারন্যাশনাল ফেম পেয়েছে। আপনিও দিন, দেখবেন তারপর দেশবিদেশে আটঘরার নাম ছড়িয়ে পড়বে।'

বুদ্ধদেব স্যার বিচলিত হলেন। দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বললেন, 'কিন্তু কি করি বলো তো?'

নন্তু দত্ত কিছু না ভেবেই বললো, 'টস করুন। যে হারবে, সে আউট।'

তাই হয়েছিল। আটঘরা শেষপর্যন্ত ২১ রানে হেরে গেলেও কিছু ছেলে অবশ্য খুশি হয়েছিল টসে দারোগাবাবুর হেরে যাওয়ায়। শোনা যাচ্ছে নতু মুখুজ্যে চিঠি লিখেছে লর্ডসে। এখনো জবাব আসেনি।

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%