অন্ধকার থেকে অন্ধকার

মতি নন্দী

''এইখানে নামিয়ে দিলে হবে?''

''আর একটু যদি—'' আড়ষ্ট স্বরে কিন্তু কিন্তু করে প্রতুল বলল।

''আবার এই অন্ধকারে গলির মধ্যে, খানাটানায় পড়ে গাড়িটা বসে গেলে আর এক ঝঞ্ঝাটে পড়ে যাব। সরু রাস্তায় গাড়ি ঘোরানোও বিপজ্জনক। এখানে নামিয়ে দিলে পারবি না চলে যেতে? কতটা?''

''খানিকটা, খুব বেশি নয়।'' যে—রাস্তাটা দিয়ে এখন যাবে, প্রতুল সেই দিকে তাকিয়ে বলল। আবছা হয়ে অন্ধকারের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে রাস্তাটা। দুপাশে নানান আকৃতির একতলা—দোতলা পাকাবাড়ির সঙ্গে টালিরও কয়েকটা বাড়ি। ডানদিকে মোড় ঘুরলেই একটা পুকুর পড়বে। সেখান থেকে আর একটা বাঁক! তারপরই পানুদার বাড়ি। পানু আর মাসতুতো দাদা। প্রতুল ঘড়ি দেখল। দশটা বাজতে দশ।

গাড়ির দরজা খুলে প্রতুল সন্তর্পণে বাঁ পা বার করে মাটিতে রাখল।

''আহ!'' অস্ফুটে সে কাতরে উঠতেই মোটরচালক উদ্বিগ্ন চোখে তাকাল।

''কী হল, হেঁটে যেতে পারবি তো?''

দুপায়ে ভর দিয়ে দেহটাকে টানটান রেখে প্রতুল হাসল। একটু ঝুঁকে জানলা দিয়ে ভিতরের দিকে তাকিয়ে বলল, ''থ্যাঙ্ক ইউ সলিলদা। আমি ঠিক চলে যাব।''

''সাবধানে দেখেশুনে যাস। আর দু—তিনদিন একদম বেরোবি না, অচেনা কেউ দেখা করতে এলে দেখা করবি না। খবরের কাগজের কেউ তোর এই জায়গাটা চেনে কি?''

''না।'' প্রতুল জোর দিয়ে বলল। ''মাঝে মাঝে দাদার বাড়িতে আসি। এত রাতে আমায় দেখে খুব অবাক হয়ে যাবে।''

''শুনলুম ছ'জন নাকি মাঠেই মারা গেছে, পি জি—তে দুজনের অবস্থা খুব সিরিয়াস। বোধহয় বাঁচবে না।''

''কিন্তু সলিলদা আমাকে কেন দায়ী করা হচ্ছে? আমি কী করেছি? পায়ে ইনজুরি, খোঁড়াচ্ছি, আশুদাকে তিন—চারবার বললাম, বসিয়ে দিন আর দাঁড়াতে পারছি না, তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।''

''ওসব কথা পরে হবে। মোট কথা, তুই এখন টার্গেট, রডটা যেভাবে চালিয়েছিল কোমরে লাগলে জন্মের মতো তোর ফুটবল খেলা শেষ হয়ে যেত, হয়তো চিরকালের জন্য ইনভ্যালিড হয়েই যেতিস।'' এরপর সলিলদা মোটরের চাবি ঘুরিয়ে এঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ''বড় ক্লাবে খেলার এই হল হ্যাজার্ড। জেতালে মাথায় তুলে নাচবে, না জেতালে চোখ উপড়ে নেবে।''

''কিন্তু আমি তো—''

''আমি তো কী?'' সলিলদার চাপা ধমক আর এঞ্জিনের রেস করানোর গর্জন মিশে গিয়ে প্রতুলকে একটা ভীমরুলের চাকের এক হাত সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। নিস্পন্দ হয়ে সে একটা ফর্সা মুখ আর টাক—পড়ে—আসা মাথাটা ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।

''বারো গজ থেকে একটা বসানো বল শট করে যে গোলে রাখতে পারে না তার ফার্স্ট ডিভিশন খেলাই উচিত নয়। ও ও ও কে, গুড নাইট।''

সলিলদা ক্লাচ ছেড়ে দিতে দিতে তারপর চাপাস্বরে বলল, ''শুওরের বাচ্চা।''

প্রতুল শুনতে পেয়েছে। মোটরটার লাল আলো যতক্ষণ দেখা যায় দেখল। হুশ হুশ করে মালবোঝাই ট্রাক যাচ্ছে কলকাতার দিকে। যাত্রী—বাস থামল পঞ্চাশ গজ দূরে। দুজন পুরুষ নামল। তারা কিছুটা হেঁটে একটা রাস্তায় নেমে গেল। সে রাস্তার ওপারে তার গন্তব্যে যাবার পথটার দিকে তাকাল। একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো দেখাচ্ছে।

''বলা যায় না, ওখানেও ওরা হয়তো ঘাপটি মেরে থাকতে পারে। কিচ্ছু বিশ্বাস নেই।'' সলিলদা মোটর চালাতে চালাতে বলেছিল। ''দিন দিন কী হয়ে উঠছে এই সাপোর্টাররা, অ্যাঁ, ইংলিশ হুলিগ্যানিজম এখানেও আমদানি হল! বাহারের চেয়াল আর গালে এগারোটা স্টিচ করতে হয়েছে, ও তো মরেই যেত যদি আর একটু ওপরে লাগত। মিত্তিরদার পিঠে আধলা পড়েছে। একটু কমা, টাকার খাঁইটা তোরা একটু কমা, বুঝলি, দেড় লাখ দু লাখ নিবি আর শট মারবি গোলের বাইরে, সাপোর্টাররা কি ছেড়ে কথা কইবে?''

প্রতুল কাঠ হয়ে বসে শুনে গেছে। বলতে যাচ্ছিল দেড় লাখ দুলাখ আমি পাই না কিন্তু মাঠে যা ঘটে গেছে তারপর নিজের পক্ষ নিয়ে কোনো কথা বলার মতো জোর সে পাচ্ছে না।

বাঁ পা হিঁচড়ে টেনে টেনে সে রাস্তা পার হল। একটু ঢালু হয়ে পথটা নেমে গেছে। সলিলদা অনায়াসেই তাকে বাড়িটার দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারত। কিন্তু মানুষ যে কত দ্রুত বদলে যায়! তবু এতটা যে গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে গেল প্রতুলের কাছে এটা কৃতজ্ঞ থাকার মতো ব্যাপার। এই পা নিয়ে ট্রেনে নালিকুল গিয়ে আবার রিকশায় ওঠা আজ আর সম্ভব ছিল না।

তাছাড়া পথে কোথাও না কোথাও ওরা ওৎ পেতে থাকবেই। রডটা যদি না ফস্কাতো তাহলে—! প্রতুল ঢাল বেয়ে সাবধানে নেমে সমতলে দাঁড়াল।

মাঠ থেকে পুলিশের গাড়িতে ফেরার সময়, জানলার জালের উপর ইঁট আর বোতল পড়েছিল। গাড়ির মেঝেয় বসে জানলার দিকে তাকিয়ে সে ধোঁয়া দেখতে পায়। টিয়ার গ্যাস। পরে শোনে তিনটে মোটরে আগুন ধরানো হয়, কয়েকটা স্কুটারও শেষ হয়ে গেছে।

ছেলেটার মুখটা চেনা—চেনা। সে, অশোক আর বাহার দিন কুড়ি আগে সন্ধ্যায় সাগর থেকে খেয়ে বেরিয়ে ট্যাক্সি পাচ্ছিল না। এই ছেলেটাই হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হয়। ছোটাছুটি করে ট্যাক্সি ধরে দেয়। উদ্ভাসিত চোখে লাজুক স্বরে বলেছিল, ''আপনাদের ছবিতে শুধু অটোগ্রাফ করে দেবেন।''

রডটা ওর হাতেই ছিল।

সে পা টেনে টেনে এগোতে লাগল জমির দিকে তীক্ষ্ন নজর রেখে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একটা ভাঙা ইঁটের মাথায় বাঁ পা পড়তেই সে 'উহ' বলে কাতরে উঠে চারপাশে তাকাল। ভ্যাপসা গরম। ঘামে ভিজে গেঞ্জিটা চামড়া হয়ে সেঁটে বসেছে বুকে—পিঠে। গাল বেয়ে থুতনিতে ঘাম নামছে। রুমাল দিয়ে সে মুখ মুছল। কত ডিগ্রিতে আজ উঠেছে? একশো দুই তো কাল উঠেছিল।

ছ'জন নাকি মাঠেই মারা গেছে! কথাটা সে চার—পাঁচবার শুনেছে। ক্ষ্যাপা ভিড়ের মধ্য দিয়ে টানতে টানতে তাদের টেন্টে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে বলা হয়েছিল চুপচাপ বসে থাক। জানলা দিয়ে কেউ যেন মুখ না দেখায়। সেই সময় সুপ্রকাশ চাপা গলায় বলে, চান না করলে মরে যাব, যা গরম। সে উঠে বাথরুমে চলে যায়। প্রতুলের পায়ে তখন ব্যান্ডেজ হচ্ছিল। সুপ্রকাশ সারা গায়ে পাউডার মেখে তার কাছে এসে ঝুঁকে ব্যান্ডেজে হাত রেখে বলে ''সলিলদাকে সঙ্গে নিয়ে আজই এক্স—রে করিয়ে আয়। কাল করব বলে ফেলে রাখিসনি।''

''যাব কী করে, বাইরে যা চলছে।''

''এসব একটু পরেই থেমে যাবে। আহ চানটা করে বাঁচলাম।''

''ছ'জন নাকি মরেছে!''

''আসে কেন খেলা দেখতে?''

এই সময় ম্যানেজিং কমিটির পঞ্চানন দত্ত দুঃখ—ভারাক্রান্ত মুখে প্রতুলকে বলে, ''তখন কী হয়েছিল তোর বল তো? টাইব্রেকারের লাস্ট কিকটা খুব স্ট্রং নার্ভের প্লেয়ারকেই দেওয়া হয় আর সবাই জানে তোর আর সুপ্রকাশের নার্ভ স্টিলের মতো। তুই যখন বলটা বসাচ্ছিস তখন ধরেই নিয়েছিলাম ফাইনালে পৌঁছে যাচ্ছি। সেখানে জে সি টি, এমন কিছু নয়।''

প্রতুল মুখ নিচু করে ব্যান্ডেজ বাঁধা পায়ে হাত বুলিয়ে যায়। সুপ্রকাশের পাউডারের গন্ধটা তখনও বাতাসে রয়েছে। তার ভাল লাগছে সেটা শুঁকতে। জেসমিন? রোজ? না ল্যাভেন্ডার? কীসের গন্ধ সেটা বুঝতে চেষ্টা করছিল।

কে একজন উত্তেজিত স্বরে তখন তার প্রত্যক্ষ দর্শনের বিবরণ দিচ্ছিল : ''ছ'জন কে বলল, আরও বেশিই হবে। পুলিশেরি তাড়ায় গ্যালারি থেকে হুড়মুড়িয়ে যখন নামছে তখন তো আমার চোখের সামনেই ছ'সাতজনকে মাড়িয়ে গেল অন্তত ষাট—সত্তরটা লোক। ওদিকে কাঠের গ্যালারি ভেঙে তার নিচে কতজন যে চাপা পড়েছে কে জানে। ইসস, শুধু যদি লাস্ট কিকটা গোলে ঢুকত তাহলে এসব কিচ্ছু হত না।''

বাড়িটার ভিতরে কোথাও আলো জ্বলছে। রাস্তার দিকের ঘরের জানলাগুলো খোলা। প্রতুল ঘরের ভিতরে তাকাল। লোকজন হয়তো ছাদে মাদুর পেতে শুয়ে আছে। থাকুক, কিন্তু মানুষ—টানুষ যে আছে, এটা জানতে পারাটাই এখন তার দরকার। এই মুহূর্তে কোথাও থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে কেউ অ্যাটাক করলে তখন বাড়ি থেকে মানুষজন যদি ছুটে বেরিয়ে আসে কিংবা ছাদ, জানলা কি বারান্দা থেকে হাঁকাহাঁকিও যদি করে তাহলেও প্রাণ বাঁচানো যাবে।

কিন্তু সেজন্য চিৎকার করতে হবে।

কী বলে সে চিৎকার করে উঠবে? প্রতুল তার দেখা, এই ধরনের কতকগুলো পরিস্থিতিকে স্মৃতি থেকে বার করে আনার চেষ্টা সবে করছে তখনই একটা খোঁদলে পড়ে পায়ে তীক্ষ্ন যন্ত্রণা পেল।

শুওরের বাচ্চা। গোলটা হয়ে গেলে তো মাথায় তুলে এখানে পৌঁছে দিয়ে যেতিস। প্রতুল বিড়বিড় করল। সে বাঁ পা তুলে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকল প্রায় আধ মিনিট। রাস্তাটা অন্ধকার হলেও আবছা ছায়ার মতো কাছের গাছ, পাঁচিল, এমনকি পুকুরের জলের আন্দাজও পাচ্ছে। তাছাড়া রাস্তাটা অজানা নয়। পানুদার বাড়িতেও সে অবাঞ্ছিত নয়। অবশ্য চার বছর আগে ছোট ক্লাবে খেলার দিনগুলোয়, এমন সময়ে বাড়িতে দেখলে পানুদা খুশি হত কিনা বলা শক্ত।

বাঁ দিকে টানা একটা বাগানের পাঁচিল, ডান দিকে পুকুর। প্রতুলের বুক ছমছম করে উঠল। বলটা স্পটে বসিয়ে কিক নেবার জন্য যখন পিছনে হটছিল সারামাঠ তখন নিস্তব্ধ। এই রকম ভাবে তখন ছমকে উঠেছিল বুক।

এখন একটা যা হোক কোনো শব্দ, পাখির ডানা ঝাপটানি, বাচ্চার কান্না, কুকুরের ডাক, রেডিয়োতে বা টিভি—তে গান, পুকুরে ব্যাঙের লাফ, বাসন পড়ার আওয়াজ, এনিথিং, এনিথিং এখন দরকার।

প্রতুল আবার ঘেমে উঠেছে। মানুষ আছে, টের পাওয়ার মতো এমন একটা কিছু ঘটুক।

কী যেন একটা নড়ে উঠল সামনে। কেউ যেন আসছে কিংবা কারা যেন আসছে। প্রতুল কাঠ হয়ে গেল। এখন পাঁচিলে সেঁটে দাঁড়ালে ওরা তাকে দেখতে পাবে না। সে পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে, কথা বলার আওয়াজও। রাস্তা থেকে হাত পাঁচেক দূরে পাঁচিল। সে পাঁচিলের সঙ্গে পিঠ লাগিয়ে দাঁড়াল নিশ্বাস বন্ধ করে। তবু রক্ষে তার জামাটা সাদা নয়।

লোকটির সঙ্গে একটি বালক, প্রতুলের সামনে দিয়ে চলে গেল। এদের জন্যই ভয়ে মরে যাচ্ছিল ভেবে সে অপ্রতিভ বোধ করল। লোকটা যখন ঠিক তার সামনে তখন ছেলেটাকে ধমকাল, ''কে তোকে ওস্তাদি করে মাথায় জল ঢালতে বলেছিল? যদি জ্বর আরও বেড়ে যেত, তখন তো—''

প্রতুল আবার রাস্তার উপর এল। যদি তাকে ওরা দেখে ফেলত তাহলে কী হত? অন্ধকারে একটা লোক পাঁচিলের ধারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দেখলে নিশ্চয় ভূতটুত ভেবে 'রাম রাম' বলে হাঁটার বেগ বাড়িয়ে দিত। হাসি পেল প্রতুলের। তখন যদি নাকিসুরে 'কাঁর জ্বঁর হঁয়েছে' রেঁ? ডাক্তার ডাঁকতেঁ যাঁচ্ছিস বুঁঝি?' বলে হাতছানি দিয়ে উঠত তাহলে আর দেখতে হত না।

হাসি চাপতে চাপতে তার মনে হল, কিন্তু এই রকম জায়গায় এইভাবে ভূত দাঁড়িয়ে থাকবে কি? লোকটা সাহসী হলে নিশ্চয় দাঁড়িয়ে পড়ে বলত, ''কে। কে ওখানে?'' সে বলত, ''আমি''।

''আমি তো সবাই। এভাবে, এখানে, এত রাতে দাঁড়িয়ে কেন? মতলব কী? বাড়ি কোথায়? পিণ্টু ডাক তো এই বাড়ির লোকেদের, চোরটোর হবে।''

প্রতুল অস্বস্তি বোধ করল। ব্যাপারটা এই রকম যদি ঘটত তাহলে কী হত? বাড়ি থেকে কেউ বা পাড়ার লোকজন বেরিয়ে এলে সে নিজের পরিচয় দিয়ে নিশ্চয় সসম্মানে বেরিয়ে যাবে। তার নাম কেউ না কেউ জানেই, ছেলেছোকরা কেউ থাকলে চিনেও ফেলবে। তাছাড়া পানুদাকে তো এখানকার লোক চেনেই। কিন্তু যদি কেউ প্রশ্ন করে বসত, ''এত রাতে এমন ঘাপটি মেরে কেন?''

ঝাঁঝি আর কচুরিপানা পুকুর পাড়ে তুলে রাখা হয়েছে। সেগুলোর থেকেই আঁশটে সোঁদা গন্ধটা আসছে। প্রতুল দরজা—জানলা বন্ধ টেন্টের ভ্যাপসান আর ঘামের গন্ধ তারপর সুপ্রকাশের পাউডারের গন্ধ মনে করার চেষ্টা করল।

প্রশ্নটা, এখানে এমন ঘাপটি মেরে কেন? তাহলে কী উত্তর দেবে? সুপ্রকাশের পাউডারের গন্ধটা কীসের মতো? ল্যাভেন্ডার মানে কী? এটা কি কোনো ফুলের নাম! বলেছিল, ''আসে কেন খেলা দেখতে?'' সুপ্রকাশের নার্ভও নাকি স্টিলের মতো। টাইব্রেকারে ও মিস করেনি, ডান পোস্টের নিচের দিকে বলটা রেখেছিল। প্রতুল মাথা নাড়ল, অথচ তার নিজের নার্ভও নাকি স্টিলে গড়া! এরা কিছুই জানে না।

কীসের যেন শব্দ হল!

থমকে গেল সে। গাছটার আড়ালে খসখস হচ্ছে কেন? প্রতুলের পিঠ আর বুক বেয়ে দরদর ঘাম নামল। হাঁটু থেকে ঘাম নামছে পিঁপড়ে চলার অনুভূতি দিয়ে। যদি ওদের কেউ হয়! তাহলে চেঁচিয়ে লোক ডাকবে। কী বলে চেঁচাবে?

''ওগো আমায় বাঁচাও, ওগো আমি মরতে চাই না।'' রান্নাঘরের মেঝেয় গড়াগড়ি দিয়ে বলছিল পাশের বাড়ির জনার্দনকাকার বউ। কেরোসিন গায়ে ঢেলে দেশলাই জ্বালানো পর্যন্ত অন্য জগতে ছিল। প্রতুলের কানে, আজ প্রায় কুড়ি বছর পরও সেই আর্তনাদ লেগে আছে। তাহলে কি এখন সে ওই বলে চেঁচিয়ে উঠবে?

খসখসানিটা আর হচ্ছে না। নিচু টালির চালের বাড়িটাকে আড়াল করে বিশাল গাছটা। বোধহয় অশ্বত্থ। ঘরে আলো জ্বলছে। হাতের আঙুলগুলোর কাঁপুনি এখনও থামছে না।

কিন্তু এতদূর পর্যন্ত তাকে ধাওয়া করে ওরা কি আসবে এত রাত্রে? ছ'জন মাঠেই মারা গেছে, দুজনের অবস্থা সিরিয়াস, বোধহয় বাঁচবে না। কিন্তু তাকে মারধর করে কী লাভ? হারা ম্যাচটা কি তাতে জেতা যাবে? নিশ্চয় অন্য জগৎ থেকে ওরা এতক্ষণে ফিরে এসেছে। তাকেও ফিরে আসতে হবে এই ভয়ের জগৎ থেকে।

যদি আসে তো আসুক, আমি ভয় করব না। লড়ব। ঘুষি মারব, এই চোট পাওয়া পা চালাব সামনের লোকটার পেটে। রড, খুর, চাকু, চেক, লাঠি যা খুশি চালাক, পড়ে যাব মাটিতে, ওরা চালাতে থাকবে, কিন্তু একটা না একটাকে ধরে নেবই। চোখের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে উপড়ে নেব, দুহাতে গলার নলি টিপে ধরব—মরার আগে একটাকে নিয়ে অন্তত—।

প্রতুলের সারা দেহের পেশী টানটান, ফুলে উঠে দপদপ করছে। আঙুলগুলো বেঁকে রয়েছে। ঈষৎ কুঁজো হয়ে সে ঘন ঘন চোখ নাড়িয়ে দুপাশে তাকাল। অন্ধকার আর অন্ধকার। পিছন থেকে কেউ কি—! চকিতে সে পিছনে ঘুরে গেল। কেউ নেই। ''আয় শালারা, আয়। মরতে চাস তো আয়।''

চারপাশের অন্ধকারের দিকে সে কথাগুলো ছিটিয়ে দিল চাপা গর্জনে মুড়ে।

''মিঁয়াও।''

গুড়ির পাশ দিয়ে সাদা পুঁটলির মতো একটা বাচ্চা বেড়াল বেরিয়ে এল। অন্ধকারের মধ্যে প্রাণীটিকে চিনতে প্রতুলের অসুবিধা হল না।

''মি—য়া—ও।'' ভীত করুণ আবেদন।

প্রতুল হাঁফাতে শুরু করল। অন্য জগৎ থেকে বেরিয়ে আসার ধকলটা এখন সামলাতে হচ্ছে। ব্যাটা বেড়াল মানুষ দেখে সাহস পেয়ে ডাক দিয়েছে।

''আয় আয়''। বহুক্ষণ পর জীবন্ত কারুর উদ্দেশে কথা বলার সুযোগ সে পেয়েছে। টাকরায় জিভ ঠেকিয়ে চুকচুক শব্দ করল। বেড়ালটা ক্রমান্বয়ে ডেকে যাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে নিচু হয়ে বেড়াল বাচ্চাটাকে কুড়িয়ে আলতো করে সে দুহাতের মধ্যে রেখে নিঃশব্দে হেসে যেতে লাগল।

কয়েক সেকেন্ড শান্ত থেকেই বেড়ালটা বন্দিদশা থেকে ছাড়া পাবার জন্য আঁকুপাকু শুরু করে দিল। প্রতুল দুহাতের আঙুলগুলো আরও আঁটো করে, ''অ্যাই অ্যাই কী হচ্ছে।'' বলতে বলতে এগোল। এখন আর ভয় পাওয়া মিঁয়াও নয়, বেড়াল বাচ্চার গলা দিয়ে বিরক্তি আর রাগ বেরোচ্ছে। কিন্তু প্রতুল ওকে ছাড়ল না। কথা বলে সে স্বচ্ছন্দ স্বাভাবিক বোধ করছে।

পানুদার বাড়িতে আলো জ্বলছে। দোতলার দুটো ঘরেই এবং সদর দরজার উপরের আলো জ্বালা রয়েছে দেখে প্রতুল অবাক হল। সদরের কাঠের দরজা ও কোলাপসিবল গেট খোলা।

ব্যাপার কী! সারা অঞ্চলে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার আর পানুদার বাড়িতেই আলো! বেড়াল বাচ্চাটাকে রাস্তায় নামিয়ে দিল। এদিক ওদিক তাকিয়ে জায়গাটা অপরিচিত বুঝতে পেরে বাচ্চাটা সেইদিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিল, যেদিক থেকে তাকে তুলে আনা হয়েছে। প্রতুল দুহাতের চেটো ঝেড়ে নিয়ে পানুদার বাড়িতে ঢুকল।

সদর থেকে ঢুকেই বাঁদিকে দোতলার সিঁড়ি আর সামনে ভাড়াটেদের দরজা। প্রতুলের পায়ের শব্দে বা গলাখাঁকারি দেওয়ার জন্যই, হঠাৎ সামনের দরজার পাল্লা খুলে অল্পবয়সি এক বৌ উঁকি দিল। যেন কারুর জন্য অপেক্ষা করছিল। প্রতুল তার সম্পূর্ণই অপরিচিত তা সত্ত্বেও কিছুটা ব্যাকুল উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ''কোনো খবর পেলেন ভাই?''

''কীসের খবর?''

বৌটি অপ্রতিভ হল।

''আপনি কি ওদের সঙ্গে কলকাতা গেছলেন?''

''না তো। আমি অবশ্য কলকাতা থেকেই আসছি, পানুদার কাছে এসেছি।'' সিঁড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলতে বলতে প্রতুল দেখতে পেল সিঁড়ির বাঁকে দাঁড়িয়ে বৌদি হাত নেড়ে ইশারা করছেন তাড়াতাড়ি উপরে উঠে আসার জন্য।

বৌদির হতাশ মলিন মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে প্রতুল উপরে উঠে এল। বৌদি ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে তাকে কথা বলতে বারণ করলেন।

দোতলার দালানের একধারে প্রতুলকে টেনে নিয়ে বৌদি বললেন, ''আজকেই কিনা তুমি এখানে এলে। জান, কি কাণ্ড হয়েছে? নিচের ভাড়াটে মানে ওনার স্বামীকে, অফিসের কে একজন খেলা দেখার টিকিট দিয়েছে, এখনও ফেরেনি। সকালে অফিসে বেরিয়েছে সেখান থেকে মাঠে যাবে, মাঠ থেকে বাড়ি ফিরবে।''

''দ্যাখো কারুর বাড়িটাড়িতে গিয়ে...''

''না না, আজ ওনার তাড়াতাড়ি ফেরার কথা। রাত সাতটা থেকে আটটার মধ্যে ফ্রিজ ডেলিভারি দেবে, তখন উনি থাকবেন বলে গেছেন।''

''ফ্রিজ দিয়ে গেছে?''

''হ্যাঁ। ... মাঠে নাকি ভীষণ গোলমাল হয়েছে, অনেক লোক নাকি মারা গেছে? তুমি তো দেখেছ সব, কী ব্যাপার বল তো?''

প্রতুলের বুকের মধ্যে বরফ জমতে শুরু করল। রুমাল দিয়ে মুখ মুছল। আবার দরদর ঘাম নামছে।

''হ্যাঁ আমিও শুনেছি, জনা ছয়েক নাকি মারা গেছে। গ্যালারিতে ভিড়ের চাপে কী ঘটছে তাতো মাঠের মাঝ থেকে বোঝা সম্ভব নয়। তা এই ভদ্রলোক কোনদিকের গ্যালারিতে ছিলেন, কত টাকার টিকিট ছিল?''

''তাতো কিছু জানি না। ব্যাঙ্কে চাকরি করেন, কে এক ক্লায়েন্ট টিকিট দিয়েছে। খেলাটেলা দেখার শখ খুব একটা নেই। বিনি পয়সায় পেয়েছেন তাই গেছেন।''

প্রতুল একটা ব্যাপার ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করছে, তার ভুল হয়েছে, মারাত্মক ভুল হয়েছে এখানে আসা। সেটা আরও বুঝতে পারল বৌদির পরের কথায়।

''তোমার দাদা টিভিতে খেলা দেখছিলেন, পাড়ারও কয়েকজন ছিল। তারা বলল, গণ্ডগোলটা হল নাকি তোমারই জন্য।''

''সেকি! আমার জন্য কেন?''

''তা আমি জানি না। তোমার দাদাও আমায় ওই কথা বলল, 'বাচ্চু যদি কিকটা ঠিকমতো নিত।' তবে ওদের সামনে বলেনি।''

''পানুদা কোথায়?''

''কলকাতায় ছুটেছেন খোঁজ নিতে। সঙ্গে গেছেন পাশের বাড়ির বিকাশবাবু, উনিও ব্যাঙ্কে কাজ করেন আর পাড়ার ছেলে মনিরুল। বন্দনাদের তো দৌড়োদৌড়ি করার আর কেউ নেই, স্বামী—স্ত্রী আর বাচ্চা একটা ছেলে। এক দাদা দুর্গাপুরে আর একজন ভাইজাগে। শ্বশুরবাড়ি ডায়মন্ডহারবারের দিকে কোন এক গ্রামে, তবে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। মেয়েটা কী বিপদে যে পড়ল!''

বৌদি একটানা বলে যেতে যেতে হঠাৎ থেমে গেল। বছর চোদ্দ—পনেরোর কাজের মেয়েটি দাঁড়িয়ে শুনছে।

''কিরে, কিছু বলবি?''

''আমি শুতে যাব?''

''হ্যাঁ হ্যাঁ শুয়ে পড়গে যা। তুই আর রাত জাগবি কেন?''

পায়ের যন্ত্রণা প্রতুলকে আর দাঁড়াতে দিচ্ছে না। মোড়াটার দিকে সে এগিয়ে গেল।

''কী হল পায়ে?''

''কিছু না, একটু লেগেছে। কিন্তু আমাকে কেন দায়ী করা হচ্ছে? খেলায় গোল হয় আবার হয় না। পৃথিবীর সর্বত্র এটা হয়, হচ্ছে।''

''লোকে তো আর সেসব বোঝে না।''

''নিকুচি করেছে লোকের।''

''খাবে তো?''

''না।''

''তুমি ভেতরের ঘরে শোও। ফোল্ডিং খাটটা পেতে দিচ্ছি, মশারি টাঙিয়ে দিচ্ছি, তা পাখা নেই।''

''দরকার নেই। পা'টা যদি ঠিক থাকত তাহলে এক্ষুনি আমি হেঁটেই কলকাতায় যেতাম।''

''পাখার ব্যবস্থা... আচ্ছা দেখছি। তুমি বরং ততক্ষণ ঘরের মধ্যে এসে বসো।''

বৌদিকে কিছুটা সন্ত্রস্ত মনে হচ্ছে। প্রতুল কারণটা আঁচ করতে পারলেও সোজা জিজ্ঞাসা করতে ভয় পেল। তাই ঘুরিয়ে বলল, ''আমাকে কি চেনে?''

''কে চেনে?''

''নিচের ভাড়াটেদের কেউ?''

''শশধরবাবু, মানে যিনি আজ খেলা দেখতে গেছলেন তিনি তোমায় দেখেছেন। একদিন বলেছিলেন তোমার সঙ্গে আলাপ করবেন। বন্দনা তোমায় কখনো দেখেনি, এটা আমি জানি।''

''তোমাদের এখানকার লোকেরা আমায় চেনে না।''

''চেনে না আবার! প্রত্যেকটা ছেলে চেনে। তোমাকে এখন কেউ আসতে দেখেছে নাকি?''

বৌদিকে স্পষ্টতই শঙ্কিত দেখাল। প্রতুলের কপালে ঘাম ফুটে উঠল। যে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সে এসেছে সেটাকে এখন তার ভগবানের আশীর্বাদ মনে হল। শুধু বেড়াল বাচ্চাটাই তাকে দেখেছে।

''বিছানা করে দিচ্ছি শুয়ে পড়ো। আমি নিচে যাব, বৌটি একা, কান্নাকাটি করছিল।''

বিছানা পেতে দিয়ে বৌদি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। প্রতুল মেঝের দিকে তাকিয়ে বসেছিল। কিছুক্ষণ পর বৌদি একটা টেবলফ্যান হাতে ঝুলিয়ে ঢুকলেন। প্রতুল মুখ তুলে চাপা স্বরে বলল, ''বৌদি আমি যে এখানে রয়েছি এটা কাউকে বোলো না!''

''পাগল, তাই বলে নাকি! শশধরবাবুর খবর না পাওয়া পর্যন্ত মনের মধ্যে কী যে এখন হচ্ছে। ওরা ভাল খবর আনুক, ভগবানের কাছে এই প্রার্থনাই শুধু করে যাচ্ছি। তোমার দাদার শরীর ক'দিন ধরে ভাল নয়, তবু উনি জোর করেই বেরোলেন। বললেন, ''আমার ভায়ের জন্য একটা পরিবার পথে বসল, লোকের কাছে এই কথা আজীবন শুনতে হবে। এখন আমি ঘরে বসে থাকলে ব্যাপারটা আরও খারাপ দেখাবে।'' আমিও বললুম, ''তোমার যাওয়া কর্তব্য। দোষের ভাগী তো তুমিও।''

বৌদি বেরিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। প্রতুলের মনে হল ছিটকিনিটাও যেন বাইরে থেকে তুলে দিল। মশারির মধ্যে চিত হয়ে আবছা কুয়াশার মতো ঘরের অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। টেবল ফ্যানের হাওয়ায় মশারির কাপড় ঝিরঝির করে কাঁপছে।

ঘামে ভিজে যাচ্ছে চাদরটা। তোশকটাও নিশ্চয় ভিজবে। পানুদার লুঙি সে পরে রয়েছে। রুমালটা প্যান্টের পকেটেই রয়ে গেছে।

মন থেকে সারা দিনটাকে মুছে সাদা করার জন্য যে যতই চেষ্টা করছে ততই একটা আবছা মুখ মনের মধ্যে ফুটে উঠছে। মুখটা শশধরের। চোখ, নাক, চুল, ঠোঁট, থুতনি কিছুই নেই। শুধু একটা সাদা ছোপ যেন কালো কাপড়ে লেগে রয়েছে। ধীরে ধীরে মুখটা ক্রমশ সুপ্রকাশের মতো হয়ে উঠল। পাউডারের মিষ্টি গন্ধ যেন ঘরে ভেসে বেড়াচ্ছে। একসময় তার মনে হল মুখটা বলছে, ''আসে কেন খেলা দেখতে?''

বাহ, ওরা না এলে খেলব কার সামনে? ওরা চিৎকার না করলে, মাথায় তুলে টেন্টে না নিয়ে গেলে, খেলার জন্য মাঠে নামার দরকার কী? শুধু টাকার জন্যই কি খেলি?

অথচ এই খেলাটাকে তার এই মুহূর্তে কেমন যেন অবাস্তব মনে হচ্ছে যেমন অবাস্তব আবছা মুখটা। এখন তার জীবনের দুই প্রান্তে দুই অবাস্তবতা, কিছুর উপর যে ভর দিয়ে দাঁড়াবে, খুঁজে পাচ্ছে না তেমন কিছু।

এখন সে নিজের কাছে নিঃসঙ্গ, এই ঘরে তো বটেই, বাইরেও অপেক্ষা করছে অচেনা অপরিচিত পরিস্থিতি, এমনকি খুনি বলেও সে গণ্য হতে পারে।

প্রতুলের সারা দেহের উপর দড়ি—ছেঁড়া মশারির মতো শ্রান্তি ঝপ করে নেমে এসে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল।

ভোমরা ওড়ার মতো ক্ষীণ একটা শব্দ ঘুমের মধ্যেও অস্বস্তি দিয়ে যাচ্ছিল। ঘুম ভাঙতে প্রথমেই সে শব্দের কারণটা জানল। টেবল ফ্যান। তারপরই মনে হল, বৌদি এটাকে জোগাড় করল কোথা থেকে? নিচে গিয়ে ভাড়াটেদের ঘর থেকেই কি চেয়ে আনল? রাতে এটাকে চালিয়ে মাথার কাছে টুলের উপর রেখে ঘুমোয়। শশধর রাতে ঘুমোতে আসবে না, তার বৌও ঘুমোবে না, তাই বৌদি চাইবা মাত্র পেয়েছে।

মাথার দিকে জানলার নিচের পাল্লা দুটো বন্ধ। বাইরে থেকে ঘরের ভিতরে কেউ চলাফেরা করলে দেখা যাবে না বলেই বৌদি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতুল উঠে বসল। বাথরুমে যাওয়ার দরকার। ঘরের দরজাটা টানতেই খুলে গেল। উঁকি দিয়ে দালানে কাউকে দেখতে পেল না। সারা বাড়িতে কোনো সাড়াশব্দও নেই। বৌদিকে ডাকতে গিয়েও ডাকল না। বাথরুমে ঢোকার সময় মুখ ফিরিয়ে দেখল রান্নাঘরে কাজের মেয়েটি কুঁজো হয়ে ফুটন্ত ভাতের হাঁড়িতে হাতা নাড়ছে। খবরের কাগজটা চেয়ারে ভাঁজ করা। কেউ খুলে পড়েনি। কাগজটা নেবার জন্য এগিয়েও এল না। তার মনে হল, সাপের গর্তে হাত ঢোকাতে যাওয়ার মতোই হবে এটা।

''বাড়ির সবাই গেল কোথায়, পানুদা ফিরেছে?''

মেয়েটি সেঁকা পাউরুটি আর ওমলেট এনেছে। ওর হাত থেকে নিতে নিতে প্রতুল জিজ্ঞাসা করল।

''মেসোমশাই ভোরবেলা এসেছিলেন। নিচের বৌদি আর তার ছেলেকে নিয়ে আবার তক্ষুনি কলকাতা চলে গেলেন। সঙ্গে মাসিমাও গেলেন।''

''কিছু বলেছেন? মানে শশধরবাবুর খবর কিছু—'' প্রতুল দমবন্ধ করে কাজের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল।

''কি জানি, আমায় কেউ কিছু বলেনি।''

''কান্নাকাটির শব্দ শুনতে পেয়েছ?''

''আমি সারাক্ষণ ওপরেই ছিলুম, কান্নার শব্দ তো পাইনি!''

''মেসোমশাই এসে কী বলল মাসিমাকে?''

''মেসোমশাই নিচে ওদের ঘরেই ছিল। ওপরে আর ওঠেনি। মাসিমাও নিচে নেমে গেছল। যাবার সময় আমায় বলে গেল রান্না করতে, আর আপনার পায়ে ব্যথা তাই চলাফেরা একদম না করার জন্য বলতে।''

তার মানে বারান্দায় বা জানলায় গিয়ে যেন না দাঁড়াই। লোকেরা যেন আমায় দেখতে না পায়। প্রতুল ব্যান্ডেজ বাঁধা পায়ের দিকে চোখ রেখে বলল, ''আমার শরীর খুব খারাপ, কিছু খাব না। এসব নিয়ে যাও।''

''কিচ্ছু খাবেন না!'' মেয়েটি বিব্রত অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে।

''যদি খিদে পায় তোমায় ডেকে বলব।''

প্রতুল সারা দুপুর, বিকেল শুয়ে কাটাল। কী ঘটেছে জানার কোনো উপায় নেই। বাড়িতে মেয়েটি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো প্রাণীর সাড়া সে পায়নি। সন্ধ্যার সময় বারান্দায় দাঁড়াল, অবশ্যই আলো না জ্বেলে। রাস্তা দিয়ে অল্পই লোক চলাচল করছে, পাশের বাড়িটা একতলা, তাদের দালান, শোবার ঘর ও রান্নাঘর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সাদামাঠা, গেরস্ত সংসার। সামনের বাড়ির দোতলার জানলাগুলো বন্ধ। লোকজন সম্ভবত কোথাও বেরিয়েছে, কালও সে জানলা খোলা দেখেছে। একতলার জানলায় পর্দা টানা, তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে খাটে পা ঝুলিয়ে বসা তিনজোড়া পা। বোধহয় টিভি দেখছে। প্রতুলের মনে পড়ল পানুদার ঘরেও টিভি আছে। কাল খেলা দেখেছে।

প্রতুল ঠিক করল সে চলে যাবে। আর একটু রাত বাড়ুক। প্যান্ট—জামা পরে তৈরি হয়ে কিছুক্ষণ দালানে পায়চারি করে সে ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। নিজেকে তার দুর্বল লাগছিল, ধীরে ধীরে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। একসময় সে হঠাৎ ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। একটা মোটর যেন বাড়ির সামনে থামল! ঘর থেকে বারান্দায় যেতে গিয়েও সে গেল না।

ডুকরে উঠেই থেমে যাওয়া একটা কান্না যেন সে শুনতে পেল। দ্রুত ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে প্রতুল ভেবে পেল না এবার সে কী করবে। কান্নারই শব্দ না অন্য কিছু? সে জানলার কাছে এসে কান পেতে রইল, নিচের থেকে উঠে আসা কোনো খবরের জন্য।

শশধর কি মারা গেছে? খেলার মাঠের ঘটনাতেই? গাড়ি—চাপা পড়েও তো মারা যেতে পারে! সেটা হলেই সে বেঁচে যায়।

কই কান্নার মতো কিছু তো আসছে না! বন্ধ দরজার ওধারে কথা বলার শব্দ পেয়ে প্রতুল পা টিপে দরজার কাছে গেল।

''বুলবুল আমাদের কাছে শোবে, তুই চট করে ওর বালিশটা নিয়ে আয়। আর শোন মেসোমশাইকে বলিস, ডাক্তারবাবু চলে গেলে যেন ওপরে আসে।''

বৌদির গলা। ওরা কি শশধরকে নিয়ে ফিরল? ইনজুরি হয়েছে তাই ডাক্তার? তাহলে ডুকরে কান্নার শব্দটা কি ভুল শুনেছে? নিচে মনে হচ্ছে যেন অনেক লোক রয়েছে। প্রতুলের চিন্তার ধারাবাহিকতায় বারবার সন্দেহের ধাক্কা লেগে যুক্তির বাঁধন আলগা হতে লাগল। একটা অবাস্তব জগৎ থেকে বেরিয়ে নিজের জানা পরিচিত পরিবেশকে পাবার জন্য সে যেন অন্ধের মতো হাতড়াচ্ছে।

তার অস্তিত্ব কি ওরা ভুলে গেছে? এই ঘরে কাল থেকে সে বন্দির মতো চব্বিশ ঘণ্টা কাটাচ্ছে অথচ ওরা একবার দরজাটা খুলে উঁকিও দিল না!

হঠাৎ রেগে উঠল প্রতুল। ব্যাপার কী, এই শশধর না মশধর যদি মরেই গিয়ে থাকে তার জন্য আমি কেন খুনের দায়ে ধরা পড়ব! যেন আমি নিজের হাতে কাজটা করেছি। এমন ব্যবহার করার অর্থ কী? সুপ্রকাশ ঠিক বলেছে, কেন এরা খেলার মাঠে যায়!

দরজাটা কখন যে খোলা হয়েছে প্রতুল তা বুঝতে পারেনি। ত্রিভুজের আকারে একচিলতে দালানের আলো মেঝেয় পড়েছে। সেই ত্রিভুজের উপর একটা ছায়া নড়ে উঠতেই সে চমকে উঠল।

''তোকে একজন খুঁজতে এসেছে বাচ্চু।''

''কে? কেন?''

প্রতুলের হাতের রোম খাড়া হয়ে গেল। ফিসফিস করে কাতরস্বরে আবার বলল, ''কেন পানুদা, আমি কী করেছি?''

''বলল তোর ক্লাব থেকে এসেছে। তোকে নিয়ে আজই ডাক্তারের কাছে যাবে, কাল পায়ে নাকি বড় চোট পেয়েছিস।''

দরদর ঘাম নামছে। কপাল, ভুরু বেয়ে চোখের কোণ দিয়ে থুতনিতে পৌঁছল। জ্বালা করে উঠতে প্রতুল রুমাল দিয়ে চোখ মুছল। পানুদার পাশ কাটিয়ে সে নিচে নেমে এল। সদরের আলো নেভানো। ভাড়াটেদের দরজা বন্ধ। সে ফিরে তাকাল না।

''কিরে গপু, খবর কী?''

''সলিলদা পাঠাল। বড় রাস্তায় গাড়িতে বসে আছেন। পা কেমন? ফেডারেশন কাপের আগে যে সারিয়ে তুলতেই হবে।''

আবার সেই অন্ধকার রাস্তাটা দিয়ে প্রতুল ফিরে যায় গপুর কাঁধে হাত রেখে। মোটা গুঁড়িওলা একটা গাছের কাছে সে একবার থেমে কী যেন খুঁজেছিল। চুকচুক শব্দ করার পর মাথা নেড়ে বলেছিল, ''অন্ধকারে সাদা জিনিস চোখে পড়ে। কিন্তু শুধু একবারই।''

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%