মতি নন্দী
খবরের কাগজের দ্বিতীয় পাতায়, কর্মখালি, নাম ও পদবি পরিবর্তন, শিক্ষক—শিক্ষিকা, ক্রয়—বিক্রয়, স্কুল—কলেজ—শিক্ষা, তারপর হারানো—প্রাপ্তির দুটো বিজ্ঞাপনের একটা থেকে নিশাপতি জানতে পারল তার হারিয়ে—যাওয়া বা পালাবার সময় হাত থেকে পড়ে—যাওয়া ছোট ফোলিও ব্যাগটা নীলরতন সরকার হাসপাতালের সামনে পেয়েছেন ডিক্সন লেনের জনৈক পঙ্কজ মুখোপাধ্যায়। উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে যে—কোনো রবিবার ব্যাগটির মালিক সেটি ফেরত নিতে পারেন।
ছ'দিন আগে অফিস থেকে হেঁটে বৌবাজার স্ট্রিট দিয়ে শেয়ালদায় এসে নিশাপতি নীলরতন হাসপাতালে তার বন্ধু তরুণকে দেখতে যায়। তরুণের বাড়ি মছলন্দপুর, চাকরি করে আসানসোল শহর থেকে চার মাইল দূরে একটা কেমিক্যাল কারখানায়। কিডনি থেকে পাথর বের করতে সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
তরুণের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। হাসপাতাল ফটক থেকে বেরিয়ে আসা মাত্র রাস্তার ওপারে আচমকা পর পর তিনটে বোমা ফাটার শব্দ ও ধোঁয়া সে দেখে। তারপর দেখল তিনটি ছেলে রাস্তা পার হয়ে আসছে যেন তার দিকেই। তাদের একজনের হাতে পাইপগান। তখন অনেকের সঙ্গে নিশাপতিও দিকবিদিক বোধশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করে। রাস্তা পারাপারের জন্য নতুন যে ফুটব্রিজটা বানানো হয়েছে নিশাপতি তার সিঁড়ির দিকে ছুটে যাবার সময় পড়ে যায়। তার দেহের উপর আর একটি লোক পড়ে। তখন খুব কাছে আবার বোমা ফাটার শব্দ হয়। এরপর তার পক্ষে প্রাণরক্ষার দাবি মেটানো ছাড়া বাহ্যজ্ঞান রক্ষার চেষ্টা করাটা নিরর্থক মনে হয়।
মিনিট তিনেক পর সার্কুলার রোডের উপর তিনতলা উঁচু ব্রিজের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে নিশাপতি অনুভব করল তার নিচের দুনিয়াটা আবার আগের মতোই স্বাভাবিক। রাস্তায় যথারীতি মানুষের ভিড় ও ব্যস্ততা, দোকানপাট খোলা, গাড়ি চলাচল একই ভাবে। যেটি অস্বাভাবিক তা হল, হাতে ফোলিও ব্যাগটির অনুপস্থিতি। তখন সে ব্রিজ থেকে দ্রুত নেমে এসে পতনের স্থানটিতে যথাসাধ্য খোঁজাখুজি করে। তিনচারজনের হাতে তার ব্যাগটির মতো ব্যাগ দেখে হাত বাড়িয়ে প্রায় ছুটে যাচ্ছিলও। এরপর পাওয়া আর যাবে না সাব্যস্ত করে বিষণ্ণ মনে সে ট্রেন ধরে যাদবপুরে বাড়ি ফেরে।
নিশাপতির ফোলিও ব্যাগটিতে মূল্যবান জিনিস বলতে ছিল সাড়ে সাতশো টাকা। তরুণ চিঠি মারফত তার কাছে ধার চেয়ে লিখেছিল : 'হাসপাতালে ভর্তি হব। হাত একদম খালি। একস্ট্রা কিছু টাকা এইসময় হাতে থাকলে ভাল হয়। পারিস তো কিছু দিস।' ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলায় গড়িমসি এবং টাকা দিতে তরুণের মছলন্দপুরের বাড়িতে সময় করে যেতে না পারায় সে ঠিক করে একেবারে হাসপাতালে গিয়েই ওর হাতে টাকাটা দেবে। এক ট্রাভেলিং এজেন্ট বন্ধুর দাক্ষিণ্যে হঠাৎই দু সপ্তাহ নিখরচায় দক্ষিণ ভারত ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে সে বেরিয়ে পড়েছিল। ফিরে এসেই সে তরুণকে দেখতে যায়।
টাকা ছাড়া ব্যাগে আর যা ছিল তার মধ্যে কিছুটা গুরুত্ব (শুধু নিশাপতির কাছে) সে দিয়েছে তরুণের চিঠির সঙ্গে পাঠানো আলাদা একটা দু পাতার লেখা। সেটা ফোলিও ব্যাগে ছিল এই জন্যই, ওটা সম্পর্কে খুঁটিনাটি কিছু জিজ্ঞাস্য আছে, সেটা তরুণের কাছ থেকে জেনে নেবে বলে।
হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর করে ওয়ার্ডে গিয়ে সে জানল অপারেশন হয়ে তরুণ দুহপ্তা থেকে গতকালই বাড়ি ফিরে গেছে। অপারেশন কতটা সাকসেসফুল, ডিউটিতে থাকা নার্স তা বলতে পারেনি। তাই শুনে নিশাপতির উৎকণ্ঠা বা উদ্বেগ শুরু হয়নি। বাড়িতে চলে গেছে যখন নিশ্চয় তাহলে সাকসেসফুল। অতঃপর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা দিতেই ঘটল ফোলিও ব্যাগের অন্তর্ধান।
তিনদিন পরেই রবিবার। নিশাপতি সকাল ন'টা নাগাদ হাজির হল বিজ্ঞপ্তিতে ঠিকানা দেওয়া বাড়ির সামনে। পুরনো বাড়ি তবে যত্নে রাখা। রাস্তা থেকে চারধাপ উঠে পালিশ করা সেগুন দরজার পাশের দেয়ালে সাদা পাথরের ফলকে ইংরাজিতে লেখা : পঙ্কজ মুখার্জি, এল এল বি, অ্যাডভোকেট।
কলিং বেল টিপতে বাড়ির অন্দরে কোকিল ডেকে উঠল। দরজা খুলে দাঁড়াল ফ্রক পরা বছর বারো—তেরোর একটি মেয়ে।
''কাকে চাই?''
''পঙ্কজ মুখার্জির সঙ্গে দেখা করতে চাই, আছেন?''
মেয়েটি পিট পিট করে নিশাপতির মুখের দিকে দশ সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ''দেখছি।''
দরজা ভেজিয়ে সে কুড়ি সেকেন্ডের মধ্যে আবার খুলে বলল, ''আপনার কী দরকার, আপনার কী নাম?''
''কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন সেই ব্যাপারে—'' নিশাপতি কথা শেষ না করে ভিতরে তাকাল। স্থূলবপু, গৌরবর্ণ, মাথাজোড়া টাক, মধ্যবয়সি, একটি লোক তখনই বাঁ দিকের ঘর থেকে বেরিয়েছেন। পরনে ঢোলা পাজামা, গেঞ্জি এবং হাওয়াই চটি। তার মনে হল ইনিই অ্যাডভোকেট পঙ্কজ মুখার্জি। তাই নিশাপতি জিজ্ঞাসিত হবার আগেই বলল, ''একটা বিজ্ঞাপন কাগজে দিয়েছেন... ফোলিও ব্যাগ পেয়েছেন। আমার ব্যাগটা ছ'দিন আগে শুক্রবার বিকেলে হারিয়েছি।''
''অ। ... শিপ্রা বসার ঘর খুলে বাবুকে বসা। রবিবার মক্কেল নিয়ে বসি না, পুরোই ছুটি নি তাই সেরেস্তাটা ভ্যাকুম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করছি, বড্ড ধুলোঝুল জমে গেছে। শিপ্রা দিদাকে বরং ডেকে দে, আপনি আমার স্ত্রীর সঙ্গেই কথা বলুন, ব্যাগটা তিনিই কুড়িয়ে পেয়েছেন। অবশ্য ঠিকমতো বললে এই মেয়েটিই।''
দ্রুত কথাগুলো বলে পঙ্কজ মুখার্জি স্মিত মুখে শিপ্রার দিকে তাকালেন। নিশাপতির মধ্যে টানটান যে উৎকণ্ঠাটা এতক্ষণ ছিল সেটা ঢিলে হয়ে এল। সে ভাবল, উকিল হলেও মারপ্যাঁচ নেই, লোকটাকে ভালই মনে হচ্ছে, ব্যাগটা পেতে খুব একটা ঝামেলা হবে না। সে সিদ্ধান্ত নিল, ব্যাগটা হাতে পেলেই শিপ্রাকে দশ টাকা দিয়ে পুরস্কৃত করবে।
সেরেস্তাটা বাঁ দিকে, ডানদিকে বসার ঘর। মাঝখানে মোজাইকের সরু দালানটা চলে গেছে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির গোড়ায়। ডানদিকে একটা ছোট উঠোন। পঙ্কজ মুখার্জি সেরেস্তা ঘরে ঢুকে গেলেন। নিশাপতি দরজার পাল্লার ফাঁক দিয়ে দেখল বড় একটা কাঠের টেবল যার পায়াগুলো খুবই মোটা, কাঠের পাঁচ—ছটা ভারি চেয়ার, দেয়াল—জোড়া কাঁচের আলমারিতে সেই সব বাঁধানো বই যা তাবৎ উকিলদের চেম্বারে দেখা যায়। কড়িকাঠ থেকে রড দিয়ে ঝোলানো দুই সারি তক্তায় গাদা করা পুরনো ব্রিফ। এক ঝলক দেখেই তার মনে হল এরা পুরুষানুক্রমে উকিল, পূর্বপুরুষদের পসার খুবই ভাল ছিল। আসবাবগুলোর বয়স চল্লিশের কম নয়। এর সঙ্গে সর্বশেষ সংযোজন বোধহয় ভ্যাকুম ক্লিনারটা যেটা এখন ঘরের মধ্যে একটানা শব্দ করে যাচ্ছে।
শিপ্রা বসার ঘরের দরজা খুলে দিয়ে চলে গেল। চারজনের বসার মতো বিবর্ণ হলুদ কাপড়ে মোড়া দুটো সোফা দুই দেয়াল ঘেঁষে, মাঝে নিচু একটা কাচ বসানো টেবল, দুটো কাঠের চেয়ার, দেয়ালে নিসর্গ দৃশ্য আঁকা পুরনো একটা ছবি। ঘরটি নিরাভরণ, বোধহয় মক্কেলরা এখানে অপেক্ষা করে।
মিনিট পাঁচেক পর ঘরে ঢুকলেন আধঘোমটা দেওয়া, ছোট চেহারার, বছর পঞ্চাশের এক মহিলা। শীর্ণাকৃতি, গৌরাঙ্গী, কালো ফ্রেমের চশমা, কানে মুক্তোর টাব, ঠোঁট দুটি গোলাপি। চাহনি কিঞ্চিত খর। নিশাপতি সোফা থেকে উঠে নমস্কার করল।
''বসুন বসুন।'' মহিলা ডান হাতটা বাতাসে থাবড়ে নিশাপতিকে বসিয়ে দিয়ে নিজে পাশের সোফায় বসলেন। কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে তাকিয়ে ধীর স্বরে বললেন, ''আধঘণ্টা আগে একজন ব্যাগটা নিতে এসেছিলেন, মানে তাঁর ব্যাগ বলে ক্লেইম করেছিলেন। প্রথমেই তাঁর কাছে জানতে চাই ব্যাগটা কী রঙের? কালো, না খয়েরি, না পাটকেল, না—''
''খয়েরি। আমারটার...।''
মহিলা ডান হাত তুলে বাতাস থাবড়াতেই নিশাপতির উদ্দীপনা থমকে গেল।
''ভদ্রলোকও বললেন খয়েরি। কিন্তু—'' মহিলা অসমাপ্ত থেকে নিশাপতির মুখ লক্ষ্য করতে লাগলেন।
কিন্তু কী? নিশাপতি গোলমালে পড়ে গেল। তার ব্যাগটার রঙ তো খয়েরিই! তাহলে কি অন্য কোনো রঙের ব্যাগ উনি কুড়িয়ে পেয়েছেন?
''কিন্তু এইসব ফোলিও ব্যাগ সাধারণত খয়েরি রঙেরই হয়ে থাকে। হ্যাঁ, এটার রঙও খয়েরি তবে একটা বিশেষ চিহ্ন এর গায়ে আছে। সেটা উনি বলতে পারেননি।''
অর্থাৎ আমায় সেটা বলতে হবে। নিশাপতির ঠোঁট হাসিতে মুচড়ে গেল। ''আধুলি মাপের একটা কালো তাপ্পি আছে ব্যাগটার গায়ে। ওর মধ্যে ছিল সাড়ে সাতশো টাকা। সাতটা একশো টাকার, একটা পঞ্চাশ টাকার নোট।''
নিশাপতির দৃষ্টি তীক্ষ্ন ও অনুসন্ধানী এবং ঠোঁট ঈষৎ বাঁকা। মহিলার মুখে ভাবান্তর নেই। ব্যাপার কী! প্রমাণ পেয়েছে কিনা সেটা বোঝা যাচ্ছে না। আরও কিছু দাখিল করতে হবে না কি? নিশাপতি উৎকণ্ঠার সাগরে সাঁতার শুরু করল কূল পাবার আশায়।
''সেই ভদ্রলোক বলেছিলেন সাড়ে এগারোশো ছিল।... ব্যাগটা কোথায় হারিয়ে ছিলেন?''
''ফুট ব্রিজটার পূর্বদিকের সিঁড়ির গোড়ায়, এন আর এস—এর দিকে। বোমার আওয়াজ শুনে ছুটে পালাতে গিয়ে পড়ে যাই, একটা লোক তখন গায়ের ওপর এসে পড়ে। তারপর ছুটে ব্রিজের ওপর উঠে যাই। কিছুক্ষণ পর টের পেলুম ব্যাগটা হাতে নেই।''
নিশাপতির সাঁতার অব্যাহত রইল। মহিলার মুখে ভাবান্তর নেই।
''সেই ভদ্রলোকও বোমার শব্দ শুনে আরও অনেকের সঙ্গে ছুটে পালাচ্ছিলেন। তিনিও ব্রিজটার উপরে ওঠেন তবে পশ্চিম দিকে লরেটো স্কুলের দিক দিয়ে।''
নিশাপতি চুপ করে তাকিয়ে রইল। কেউ যদি পশ্চিম দিকের সিঁড়ি দিয়ে ব্রিজের উপর ওঠে এবং ফোলিও ব্যাগ হারায় তাতে তার কিছু করার নেই। মোদ্দা কথা, সে পূর্ব দিক দিয়ে উঠেছিল।
''ব্যাগটা অবশ্য রাস্তার পূর্ব দিকেই পাওয়া গেছে।''
আশ্বস্ত হল নিশাপতি। এবার আর কী প্রমাণ দিতে হবে? দরজায় পঙ্কজ মুখার্জির মুখ উঁকি দিল, সেই সঙ্গে হাতে ধরা ভ্যাকুম ক্লিনারের নলটিও।
''ও ঘরটা হয়ে গেছে, এ ঘরটা করব কি?''
''এনার সঙ্গে কথা হয়ে যাক, ততক্ষণে সিঁড়ির পাশেরটা আর দালানের ঝুল, উঠোনটা ... শিপ্রাকে বলো গুঁড়ো সাবান ছড়িয়ে দিতে।''
''ওনার নাম—ধাম সব লিখে রেখো।''
মুখার্জির মাথাটা দরজা থেকে অদৃশ্য হল। নিশাপতি ব্যস্ত হয়ে বলল, ''হ্যাঁ হ্যাঁ, নাম তো প্রথমেই আমার বলা উচিত ছিল।''
''আমারই জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল। কিন্তু নাম দিয়ে তো ব্যাগের মালিকানার প্রমাণ হয় না, তাই আর জানতে চাইনি। যেমন সেই ভদ্রলোকের নাম আর জানার দরকার হয়নি কেননা বুঝেই গেছলাম ব্যাগটা তাঁর নয়।''
বিশাল একটা স্বস্তির শ্বাস নিশাপতি আটকে ফেলল যেহেতু মহিলার মুখে এতক্ষণে একটা মুচকি হাসি ফুটেছে। হাসিটাকে তার খুব সুবিধাজনক মনে হল না।
''তবু প্রমাণের জন্য নাম অনেক সাহায্য করে। আমি নিশাপতি বসাক। এই নামটা, ধরুন যদি আপনি ব্যাগের মধ্যে পান তাহলে সেটা কি প্রমাণ করবে না আমিই ব্যাগের মালিক?''
কথাটা বলে নিশাপতি তৃপ্ত বোধ করল। উকিলের বাড়িতে বসে একটা প্রথম শ্রেণীর ওকালতি দেখাবার কৃতিত্ব বোধহয় সে দেখাতে পেরেছে।
''ব্যাগের মধ্যে কিন্তু একটাই নাম পেয়েছি, একটা ইনল্যান্ড লেটারে কেয়ার অব দেশ পত্রিকার ঠিকানায় হিমাংশু রায়ের নাম। নিশাপতি বসাক বলে কোনো নাম ব্যাগের মধ্যে কিন্তু পায়নি!''
মহিলার চশমার পুরু কাঁচ ভেদ করে, বিস্ময়ের মোড়কে ভরা একটা সন্দেহ বেরিয়ে এল। নিশাপতি প্রমাদ গুনল এবং বিপন্ন বোধ করল।
''হ্যাঁ হ্যাঁ, একটা ইনল্যান্ড... ওটা তরুণকে দেখাব বলে... আমার বন্ধু তরুণ হালদার এন আর এস—এ ভর্তি হয়েছিল কিডনি স্টোন অপারেশনের জন্য। ওকে দেখতে গিয়েই তো ব্যাগটা হারালুম।''
''কিছু মনে করবেন না, চিঠিটা আমরা, মানে আমি আর আমার স্বামী পড়েছি। ... বুঝতেই পারছেন ব্যাগের মালিক কে জানতে খোঁজখবর করার জন্য ওটা পড়তে হয়েছিল। তাছাড়া চিঠিটাও খোলা ছিল।'' মহিলা খেপে খেপে কথাগুলো বললেন একটানা স্বরে।
''না না আমি কিছু মনে করছি না। এক পাঠক চিঠিটা দিয়েছে আমার গল্প পড়ে। হিমাংশু রায় নামে আমি লিখি।''
''কেন?... কেন নিশাপতি বসাক নামে লেখেন না?''
''লিখি না, মানে নামটা ঠিক লেখকদের মতো নয় বলে।'' নিশাপতির লাজুক স্বরে আন্তরিকতার অভাব ঘটল না। ''নিশাপতি নাম দেখলে কেউ কি আর পড়বে?... কোনো সম্পাদক কি ম্যানসক্রিপ্টটা একবারও খুলে দেখবে? আপনিই বলুন, আপনাকে যদি দুটো গল্প দেওয়া হয়, যার একটার লেখক নিশাপতি বসাক অন্যটার অরিন্দম রায়...।''
''আমি দুটোই পড়ব।''
নিশাপতি অপ্রতিভ হয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল। তার দিকে তাকিয়ে আছে সন্দেহে তীক্ষ্ন একজোড়া চোখ যার এক ইঞ্চি উপরে কুঞ্চিত ত্বকের দুটি কুটিল সরলরেখা। সে ঘাবড়ে গেল।
''নিশ্চয় নিশ্চয়, দুটোই পড়বেন, তবে আগে নিশ্চয়ই...''
''তার কোনো মানে নেই। নারায়ণ কি সতীনাথ বা ননী নামে কি কেউ লেখেনি, না তাদের লেখা লোকে পড়ে না? ...এসব খুবই বাজে ধারণা। নামে কী বা আসে যায়? বাপ—মার দেওয়া নাম বদলানো বা লুকোনোর দরকার হয় কেন? ...কনফিডেন্সের অভাব থেকে এই ধরনের ইচ্ছে জন্মায়।''
গরম হয়ে উঠল নিশাপতির কানদুটো। রক্ত ছুটে গেল মাথায়। পালস রেট বেড়ে চলেছে। নির্ভেজাল অপমান, একেই বলে দুগালে চড়! কিন্তু এই সময় মাথা ঠান্ডা রাখা উচিত। সে মনে মনে দ্রুত জপ করে চলল, ''ঠান্ডা হও, কুল ডাউন নিশাপতি, কুল ডাউন, ব্লাড প্রেশার আছে তোমার, চড়িও না... কুল, কুল...।''
''আপনার গল্পটা আমি পড়িনি কিন্তু চিঠিটা পড়ে মনে হল, সাধারণ আর পাঁচটা মানুষ জীবন সম্পর্কে উপর উপর যে ধারণা পোষণ করে আপনিও গল্পে তাই করেছেন। একটা লোক প্রতি শনিবার বিকেলে ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেসে আসানসোল থেকে ব্যান্ডেলে এসে মছলন্দপুরে মাঝরাতে বাড়ি পৌঁছয় আর রবিবার দুপুর একটায় বাড়ি থেকে রওনা হয় হাওড়া থেকে পাঁচটা এগারোর কোলফিল্ড এক্সপ্রেস ধরে আসানসোল পৌঁছবার জন্য।''
''এগজ্যাক্টলি। তরুণ ওইভাবেই যাতায়াত করে। জাস্ট ফর আ ফিউ আওয়ার্স... বারো ঘণ্টার জন্য কষ্ট করে কাঠ—খড় পুড়িয়ে বাড়ি আসা। বিশ্বাস করুন, তরুণ বছর দুই ধরে নিয়মিত এই কাজই করছে। ভাবতে পারেন, কী পরিশ্রম, কী সময় নষ্ট, কী আয়ুক্ষয়!''
''কিন্তু কেন করে?... পাঠকটি এই প্রশ্নটাই তুলে ধরছে। তিনি বলছেন এট অবাস্তব, বাড়াবাড়ি তাছাড়া লেখক যে কারণটা দিয়েছেন সেটা খুবই ছেঁদো... সেক্স।''
এই প্রথম সে মহিলার চোখে বিরক্তির মতো একটা ভাব ফুটে উঠতে দেখল। ফর্সা মুখটায় লাল আভা। নিশাপতি চোখ কুঁচকে তাকাল। একটা ব্যাগ ফেরত নিতে এসে এ কোন ঝামেলায় সে পড়ল! তার লেখা গল্পটা পড়ে, যেটা এই মহিলা পড়েননি, কে একজন পাঠকের প্রতিক্রিয়া জানানো একটা চিঠির ভিত্তিতে তিনি এই বলে তাকে অভিযুক্ত করছেন, গল্পের নায়ক কেন এত কষ্ট স্বীকার করে বাড়ি যায়? যৌবন চলে যাওয়া এই মেয়েমানুষটাকে বোঝাই কী করে যে স্রেফ সেক্সের জন্যই, বৌয়ের সঙ্গে পাঁচ মিনিটের কম্মোটা করার জন্যই তরুণ হপ্তায় একবার হাঁ হাঁ করতে করতে ছুটে যায়।
''সেক্সটা সক্ষম পুরুষ বা নারীর কাছে কি খুব একটা প্রয়োজনীয় ব্যাপার নয়? এটা প্রাকৃতিক, একে জোর করে দমন করলে তো জীবন—বিরোধী কাজই হবে। আমার নায়ক তো সেক্সকে বিকৃত পথে নিয়ে যায়নি, বাড়াবাড়িও করেনি। আপনি তো বিবাহিতা... প্রথম কটা বছরে কি তরুণের মতো আপনাদের খিদে হত না?''
নিশাপতি কথাটা বলে প্রচণ্ড সুখ বোধ করল। তখন থেকে শুধু অ্যাটাক করে যাচ্ছে। সাড়ে সাতশো টাকা ব্যাগে না থাকলে এতক্ষণ ধরে কি সে লেখার জন্য এত জবাবদিহি করত? ব্যাগের মালিকানার অকাট্য প্রমাণ তো সে দিয়েইছে তবু গল্প নিয়ে এই ভ্যানতাড়া কেন! এবার এমন লাইনে কথা বলতে হবে যাতে ব্যাগটা তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে তাকে বিদায় করে। কিন্তু নিশাপতির কথাগুলো যেন শুনতে পাননি এমন ভাব নিয়ে মহিলা শুধু তাকিয়ে রইলেন।
''বলুন?... এখন হয়তো আপনার কাছে এটার কোনো প্রয়োজন নেই, কিন্তু একসময় কি ছিল না?'' নিশাপতি উত্তর না পাওয়ার জন্য গলাটা ঝাঁঝালো করে বলল।
''গল্পটা না পড়ে এই বিষয়ে কিছু বলব না। আমার প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনটা গল্পের নায়কের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। আপনি বলছেন আপনার বন্ধু তরুণ সেক্সের জন্যেই ছুটে যেত, তিনি কি আপনাকে এই কারণই বলেছেন?''
''পাগল। এসব কথা কি কাউকে জিজ্ঞাসা করা যায় না জিজ্ঞাসা করলে কেউ সত্যি কথা বলবে। এটা আমি নিজেই ভেবে ঠিক করেছি। ওর বৌয়ের স্বাস্থ্য ভাল, ফিগারটা দারুণ। যে—কোনো পুরুষকেই উত্তেজিত করে তুলবে। কিন্তু আমি তো বৌয়ের শরীরের কথা বলতে চাইনি... আমি শুধু ওর জার্নিটাই বর্ণনা করেছি। এই যে লোকটা চিঠিতে 'ছেঁদো' শব্দটা লিখেছে, এটা তো কিছু না বুঝেই লিখেছে। গল্পটার মূল উদ্দেশ্য একদম তো ধরতেই পারেনি। আপনি যদি পড়তেন তাহলে বুঝতে পারতেন—।'' মহিলার হাত তোলা দেখে নিশাপতি নিজেকে সংবরণ করল।
''একটু কি আপনি বলবেন, মানে জার্নিটার কথা।''
মহিলার চোখে মুখে কৌতূহল ধরা পড়ল। এতক্ষণ পর নিশাপতির তাঁকে স্বাভাবিক ঘরোয়া মনে হচ্ছে। পঙ্কজ মুখার্জির গলা শোনা যাচ্ছে বাইরে থেকে ''ওই কোণাটায় শিপ্রা,আর একটু সাবান... ইসস, অ্যাতো শ্যাওলা জমল কি করে বল তো! ... বংশীটা কাল এলে আমায় ডাকবি তো, কড়কানি দিতে হবে।''
নিশাপতি কিছুক্ষণ দেয়ালের ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল। জঙ্গলে দুটো হরিণ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, একটা মাদি অন্যটা নিশ্চয়ই মদ্দা। দুজনেই মুখ ফিরিয়ে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে। ওদের পিছনে আরও কিছু হরিণ। পাথরের গা বেয়ে ঝর্নার জলে নামছে। নিশাপতি ছবি থেকে সরিয়ে মহিলার মুখে দৃষ্টি রাখল।
''ব্যাগে দু পাতার একটা লেখা দেখেছেন নিশ্চয়।''
মহিলা মাথা নাড়লেন। ''পড়েছি কিন্তু ঠিক বুঝতে পারিনি।''
''তরুণ যে ভাবে বাড়ি যায় সেই রুটটাই ওতে লেখা। একদিন গল্প করে বলেছিল, পরে ওটা লিখে রাখি যা মনে থেকে গেছিল। ভুলটুল কিছু হয়েছে কিনা সেটা ওকে দেখাব বলে হাসপাতালে যাবার সময় ব্যাগে রেখেছিলুম।''
''গল্পটা উনি মানে তরুণ পড়েছেন তো?''
''বোধহয় না। নিজের পেশাগত বই আর খবরের কাগজ ছাড়া ও আর কিছু পড়ে না। আমরা সুরেন্দ্রনাথ কলেজে একসঙ্গে বি এসসি পড়েছি। দুটো চাকরি বদলে এখন আছে আসানসোল থেকে চার মাইল ভেতরে একটা কেমিক্যালস ফার্মে, হাজার চারেক টাকা মাইনে।''
''মছলন্দপুর স্টেশন থেকে দু—তিন মাইল ভিতরে দক্ষিণ চাতরায় ওর বাড়ি। অবস্থা মোটামুটি। এক বছরের ছেলে, দুটো ভাই আর বাবা—মা আছেন। তরুণের যাত্রা শুরু হয় শনিবার দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ। বাসে বা অটো রিকশায় স্টেশনে এসে ব্ল্যাক ডায়মন্ড ধরে। ব্যান্ডেলে নামে রাত সাড়ে আটটা নাগাদ। আটটা ছত্রিশে ব্যান্ডেল—নৈহাটি ট্রেন। ব্ল্যাক ডায়মন্ডের যদি মিনিট দশেক লেট থাকে তাহলেও নৈহাটির ট্রেনটাও ততক্ষণ অপেক্ষা করে, তারপর ছেড়ে দেয়। পরের ট্রেন যদিও দশ মিনিট পর কিন্তু সেই বাজারসাউ প্যাসেঞ্জার অবধারিত লেট করে আসবেই। ব্যান্ডেল থেকে নৈহাটি মিনিট পনেরোর জার্নি। আপনি কি ব্যাপারটা ঠিকমতো ফলো করতে পারছেন?''
''পারছি। সাড়ে তিনটে থেকে একটা লোক বাসে তারপর ট্রেনে... নিশ্চয় ট্রেনটা লেটে রান করবে যে জন্য সে ব্যান্ডেল—নৈহাটি ট্রেনটা মিস করবে।''
''একজ্যাক্টলি তাই ঘটেছে।'' নিশাপতি মহিলার বাস্তব বোধকে তারিফ জানাল। হাবাগবা টাইপের যে নন সেটা তো স্বামীর সঙ্গে কথা বলার ধরন থেকেই বোঝা গেছে।
''নৈহাটি থেকে বাসে যেতে হবে হাবরা। সেখান থেকে আবার ট্রেনে মছলন্দপুর। যাই হোক, সেদিন তরুণ নৈহাটি পৌঁছল রাত নটায়। প্রাইভেট বাস ছাড়ল মিনিট পাঁচেক পর। বসার জায়গা পায়নি, দেড়ঘণ্টার জার্নি। আবালসিদ্ধির মোড় পেরিয়ে মিনিট পাঁচেক যাবার পরই বাস থেমে গেল। ব্রেক ডাউন। রাত তখন প্রায় দশটা। এঞ্জিনের ঢাকনা সরিয়ে ড্রাইভার এটা—ওটা নাড়াচাড়া করতে করতে বলল কুড়ি—পঁচিশ মিনিটেই ঠিক হয়ে যাবে। বাসে তখন লোক কম। আধ ঘণ্টা পর সে জানাল, আজ আর বাস যাবে না।
''দুধারে গ্রাম, ক্ষেতি জমি, এখানে ওখানে চালা বাড়ি, দোকানপাট বন্ধ, রাত সাড়ে দশটার নিশুতি রাত। রাস্তাটার মোটেই সুনাম নেই, প্রায়ই ছিনতাই হয়। কিছুদিন আগে বাসের যাত্রীর কাছ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা ছিনতাই হওয়ার গল্প একজন শোনাল। এখন উপায় একমাত্র খালি বা আধখালি কোনো ট্রাক ধরা। ট্রাকের যাতায়াতটা রাত্রে কমই। গোটা চারেককে হাত তুলে থামানো গেল না। মিনিট চল্লিশ পর একটা থামল। হাবরায় পৌঁছে দেবে সেজন্য দিতে হবে মাথা পিছু পাঁচ টাকা... আপনি কি তখনকার অবস্থাটা বুঝতে পারছেন?''
''পারছি।''
''কিছুক্ষণ চলার পর ট্রাক ড্রাইভার বলল অশোক নগরে কচুয়া মোড়ে তার গ্যারেজ, তার ওপারে সে যাবে না। কাকুতিমিনতি, হাতে পায়ে ধরাধরি কিন্তু ড্রাইভারকে টলানো গেল না। কচুয়া মোড়ে ট্রাক পৌঁছল। ঝগড়াঝাঁটি করে শেষপর্যন্ত ওদের নেমে যেতে হল। সেখান থেকে হেঁটে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট, ওরা হাবরায় পৌঁছল। তখন রাত সাড়ে বারোটা। দিনটা শনিবার, লাস্ট ট্রেন মিনিট পনেরো আগে চলে গেছে। স্টেশন থেকে আবার রাস্তায় ফিরে এসে ট্রাক বা ভ্যানরিকশার জন্য খোঁজাখুজি। একটা ট্রাকেরও দেখা মিলল না। জোর করে ঘুম ভাঙিয়ে অবশেষে এক রিকশাওলাকে তোলা হল। তখন ওরা চারজনে এসে ঠেকেছে। শুরু হল দরাদরি। মছলন্দপুর স্টেশন পর্যন্ত যাতায়াতের ভাড়া নিয়ে রফা হল জনপ্রতি তিরিশ টাকায়। রাত একটায় ভ্যানরিকশা যাত্রা শুরু করল, আড়াইটায় পৌঁছল মছলন্দপুর স্টেশন। সেখান থেকে হেঁটে বা আধা দৌড় দিয়ে বাড়ি পৌঁছল রাত তিনটেয়।''
নিশাপতি কথা বলতে বলতে মনে মনে ভেবে যাচ্ছিল, একটা লোক প্রায় বারোঘণ্টা ধরে এত পরিশ্রম, উদ্বেগ, ভয় পেরিয়ে এল শুধুই বৌয়ের সঙ্গে শোবার জন্য! সে অবাক চোখে মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিই কি এটা সম্ভব!
মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। ''আপনার ব্যাগটা এনে দিচ্ছি।''
মিনিট তিনেক পর ফিরে এলেন ব্যাগ হাতে। ''খুলে দেখে জিনিসগুলো আর টাকা মিলিয়ে নিন।''
নিশাপতি জানে সবই ঠিক আছে। তবু নোটগুলো হাতে নিয়ে একবার শুধু তাকাল। ''তরুণ বলেছিল কিছু টাকার দরকার। ওর কিডনি স্টোন অপারেশন হয়েছে। এখন বাড়িতে রয়েছে।''
''আপনি কি মনে করেন শুধু কয়েক মনিটের একটা ফিজিক্যাল সুখ পাবার জন্য একটা লোক এত কষ্ট করবে? ... কী জানি!'' মহিলা ভ্রূ কুঁচকে দেয়ালের ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
''আপনি কি অন্য কোনো কারণের কথা বলবেন?'' নিশাপতির স্বরে আগের মতো জোর নেই। কেমন একটা সন্দেহ তার মধ্যে মাথাচাড়া দিচ্ছে, হয়তো সে ভুল করেছে।
''টাকাটা ওকে তাড়াতাড়ি দিয়ে দেবেন।''
''হ্যাঁ আজই দিয়ে আসব।''
নিশাপতি মছলন্দপুর স্টেশনে যখন ট্রেন থেকে নামল তখন ঠিক সাড়ে পাঁচটা। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ট্রেন বামনগাছি স্টেশনে দেড়ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। ভ্যান রিকশায় তরুণদের বাড়ি যখন পৌঁছল হেমন্তর বিকেল তখন পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেছে।
তরুণ খাটে তিনটে বালিশ ঠেস দিয়ে একটু উঁচু হয়ে শুয়ে। মুখটা ফ্যাকাসে, চোখে ক্লান্তি। তার পাশেই ঘুমোচ্ছে ছেলেটা। নিশাপতিকে দেখে সে খুবই খুশি হয়েছে। হাসপাতাল, অপারেশন, ওষুধ ডাক্তার নিয়ে অনেকক্ষণ সে কথা বলল।
''যাক, তবু একটা কথা বলার লোক পাওয়া গেল। কিন্তু এত দেরি করে এলি কেন, সকালে আসবি তো? এখুনি তো আবার ট্রেন ধরতে উঠে পড়বি।'' তরুণ অনুযোগ করল।
''তা তো উঠতেই হবে। ট্রেন ফেল করে তারপর মাঝরাতে বাড়ি ফেরা আমার দ্বারা হবে না। তোর মতো বাস, ট্রেন, ট্রাক, ভ্যানরিকশা ধরে বাড়ি ফেরার মতো ক্ষমতা বাপু আমার নেই।''
''এক শনিবারে আমার বাড়ি আসার গল্প তোকে করেছিলাম, মনে আছে?''
''আবছা মনে আছে।'' তরুণের বৌ মায়া চায়ের কাপ আর মিষ্টি ভরা প্লেট হাতে ঘরে ঢুকছে দেখে নিশাপতি স্বরটা লঘু করে বলল, ''সুন্দরী বৌ থাকলে আমিও বারো ঘণ্টা তোর মতো নষ্ট করে রাতে বাড়ি ফিরতে পারি।''
''আপনার বন্ধু শনিবার শনিবার বাড়ি আসেন, সে কী ভেবেছেন আমার জন্য। তাহলে আপনি ওকে খুবই চিনেছেন।... আসেন তো ওইটার জন্য।'' ঘুমন্ত ছেলের দিকে মায়া তাকাল। তরুণ আলতো করে ছেলের মাথায় হাত রেখে হাসল। নিশাপতি দেখল অদ্ভুত একটা আলো তরুণের মুখে ছড়িয়ে পড়ল।
''তাহলে তরুণই বলুক কেন ফী শনিবার পড়িমরি করে বাড়ি আসে।'' নিশাপতি উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে তাকাল তরুণের মুখের দিকে। বলুক বৌয়ের জন্য, বলুক এটা প্রাকৃতিক, এটা প্রয়োজনের জন্য, এটা ছেঁদো ব্যাপার নয়।
''রাখ তো এসব কথা।'' তরুণ হাসল। নিশাপতির মনে হল খুব যেন জোর নেই হাসিটায়। অপারেশনটা বড় ধরনের, এখনও ধকল চলেছে। ''খেয়ে নে। আটটা তিনের ট্রেনটায় দশটা কুড়িতে শেয়ালদায় পৌঁছবি, তারপর তো যাদবপুর যাবি।''
ছোট টেবলটায় রাখা প্লেটে দুটো রাজভোগ, দুটো সন্দেশ। খিদে পেয়েছে নিশাপতির। কথা না বাড়িয়ে সে প্লেটটা তুলে নিল। মায়া ঘরের বাইরে গেল।
''সাড়ে সাতশো টাকা এনেছি।'' নিশাপতি প্লেটটা নামিয়ে ফোলিও ব্যাগ তুলে নিল।
''টাকা! কেন?'' তরুণ অবাক নয়, হতাশ স্বরে বলল।
''তুই চেয়েছিলিস,'' নিশাপতি নোটগুলো ওর হাতে দেবার জন্য এগিয়ে ধরল। তরুণ মুখ নামিয়ে ছেলের দিকে তাকাল।
''নিশা, তোর কি কখনো মনে হয়েছে তুই শিগগির মরে যাবি? দুবছর আগে জনডিস হয়েছিল, তারপর থেকেই কেন জানি মনে হচ্ছিল আমি বোধহয় মরে যাব। ইনটুইশনই বলতে পারিস। কাউকেই আর আমি দেখতে পাব না। বাচ্চুকে নয়, মায়াকে নয়, বাবা, মা, ভাইদের নয়। সবাইকে দেখার জন্য কী ভয়ঙ্কর যে ইচ্ছেটা হত। শনিবার এলে পাগল হয়ে যেতাম। ... এদের কাউকে বলিনি, এরা কেউ এখনও জানে না... আমার একটা কিডনি ওরা বাদ দিয়ে দিয়েছে। আর একটার অবস্থাও ভাল নয়।''
তরুণ হাসবার চেষ্টা করল। নিশাপতি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, ''টাকাটা রেখে দে, দরকার হবে।''
''তাড়াতাড়ি খেয়ে নে, ট্রেনটা মিস করলে কপালে অনেক দুর্ভোগ জুটবে।''
''খাচ্ছি, আগে তুই এটা রেখে দে।''
গলা নামিয়ে ফিসফিস করে তরুণ বলল, ''ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর। বাড়ি ফেরার কথাটা সবসময় মাথায় রাখবি।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন