জীবনযাপন প্রণালী

মতি নন্দী

ঠিক দশটায় অফিসে নিজের চেয়ারে বসেই প্রদ্যোত লক্ষ্য করল, চাপা উত্তেজনা আর চাহনি নিয়ে এ ওর সঙ্গে কথা বলছে। জ্যোতিভূষণ পাশের চেয়ারের লোক। তিনি এখন রমেনদের টেবলের জটলায় গিয়ে একমনে আলোচনা শুনছেন। প্রদ্যোত ড্রয়ার থেকে জল খাবার গ্লাস, পেপারওয়েট, লাল—নীল পেনসিল, পিন—কুশন ইত্যাদি বার করতে করতে ভাবল, জেনারেল ম্যানেজারের ঘরের সামনে কি আজও আবার ডিমনস্ট্রেশন আছে? মিসেস চক্রবর্তীর পাঁচ সপ্তাহের মেডিক্যাল লিভ শেষ হতেও তো দিন দশ বাকি! তরুণ দত্তের অফিসার গ্রেড 'সি'তে ওঠা হল না, সেটাও তো দু'সপ্তাহ আগেই সবাই জেনে গেছে। তা হলে?

''কাশীনাথ, জল দিয়ে যা।'' হাঁক দিল প্রদ্যোত। ওর গলার আওয়াজে জ্যোতিভূষণ ফিরে তাকালেন এবং ব্যস্ত হয়ে ফিরে এসে উত্তেজিত স্বরে বললেন, ''শুনেছ? মৃত্যুঞ্জয় লটারির সেকেন্ড প্রাইজ পেয়েছে! চল্লিশ হাজার টাকা!''

শোনামাত্র প্রদ্যোতের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ''টাকাগুলো পেয়ে ও কী করবে?''

জ্যোতিভূষণ একটু অপ্রস্তুতে পড়লেন। ভেবেছিলেন প্রদ্যোত বলবে,—য়্যাঁ! কিংবা শুধুই, ওর চোখ দুটো বেরিয়ে আসতে আসতে চোয়ালটা ঝুলে পড়বে! কিন্তু এইরকম কিছু না হওয়ায় কিঞ্চিৎ অবাক হয়েই জ্যোতিভূষণ বললেন, ''কী আবার করবে, ব্যাঙ্কে রাখবে সুদ পাবে।''

পিছন থেকে বিশ্বনাথ দাশগুপ্ত চাপাস্বরে বলল, ''প্রদ্যোতদা জানেন এই টাকাটা আমিই পেতুম।''

প্রদ্যোত ঘুরে বসে বলল, ''কী রকম?''

''দারোয়ান খুশিরাম আমার কাছে যখন টিকিট বেচতে এসেছিল মৃত্যুঞ্জয় তখন দাঁড়িয়ে। আমিই ডেকেছি ওকে পান আনতে দোব বলে। পকেটে ছিল একটা পাঁচ টাকার নোট আর আনা ছয়েক পয়সা। ভাবলুম, নোটটা ভাঙালেই তো খরচ হয়ে যাবে, তাই খুশিরামকে বললুম, কাল এসো। ও তখন বই থেকে টিকিট ছিঁড়ে ফেলেছে। মৃত্যুঞ্জয় হঠাৎ পকেট থেকে একটা টাকা বার করে কিনে ফেলল টিকিটটা। অথচ কোনোদিন কোনো লটারির টিকিট এর আগে ও কাটেনি আর আমি চার বছর ধরে কেটে যাচ্ছি। যদি তখন নোটটা ভাঙিয়ে কিনেই ফেলতুম—''

প্রদ্যোত দেখল অসহ্য যন্ত্রণা যুবকটির সারা মুখ কুপিয়ে যাচ্ছে। সেটা বন্ধ করার জন্য তাড়াতাড়ি সে বলল, ''টাকা পেলে করতে কী?''

বিশ্বনাথ তাই শুনে মৃদু হেসে ঝুঁকে একটা ভারী লেজার বই টনে পাতা ওলটাতে শুরু করল। তারপর যখন বুঝল উত্তরের আশায় প্রদ্যোত তখনো তাকিয়ে, সে রাগত স্বরে বলল, ''এখনো তিনটে বোনের বিয়ে আমাকেই দিতে হবে। টিপে টিপে খরচ করি, শখটখ শিকেয় তুলে দিয়েছি। কিন্তু আমি কেন ওদের জন্য সাফার করব বলতে পারেন? বাবা তো ঘাড়ে বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে সটকে পড়ল।''

প্রদ্যোত ঘুরে বসে নিজের কাজে হাত দেবার আগে বিশ্বনাথের হতাশ এবং ক্রুদ্ধ মুখটিকে মন থেকে মুছে ফেলার জন্য জ্যোতিভূষণের সঙ্গে কথা শুরু করল।

''মৃত্যুঞ্জয়কে দেখছি না যে, অফিসে আসেনি?''

''কে জানে।'' তাচ্ছিল্যভরে জ্যোতিভূষণ বললেন, 'সারা জীবন পিওনের চাকরি করে যে টাকা পেত না, শুধু এক টাকা খরচ করেই ব্যাটা তা পেয়ে গেল। এ সব হচ্ছে স্টারস অ্যান্ড প্ল্যানেটসের কারচুপি। নয়তো ওর মতো একটা লোকের অতগুলো টাকা পেয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয়?''

''কেন মানে হয় না? ওর নিশ্চয় চাহিদা আছে, টাকা দিয়ে এবার সেগুলো পূরণ করবে।''

''চাহিদা! মৃত্যুঞ্জয়ের?'' জ্যোতিভূষণ বিস্ময়ের চাপে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। ''জানেন কি, ওর ঘরভাড়া কত লাগে? সারাদিনে খাওয়ার জন্য কত খরচ করে? বছরে জামাকাপড়ে কত খরচ? ওর ফ্যামিলি মেম্বার কজন?''

প্রদ্যোৎ নঞর্থক মাথা নাড়ল।

''তাহলে বলেন কী করে যে ওর চাহিদা আছে? আপনার—আমার স্ট্যান্ডার্ড দিয়ে বুঝলে তো হবে না। ওর কাছে চল্লিশ হাজার, আমাদের স্ট্যান্ডার্ডের দশ লাখ।''

''দশ লাখ পেলে আপনি কী করবেন?''

প্রশ্নটায় জ্যোতিভূষণ বিব্রত হয়ে পড়লেন। সেই সময় প্রদ্যোতের পিছনে বিশ্বনাথ গুন গুন করে উঠল—''লাক, বুঝলেন প্রদ্যোতদা, জীবনে একবারই আসে। আমার কাছেও এসেছিল। বাট আই অ্যাম অ্যান ইডিয়ট, ফুল, রাস্কেল, সোয়াইন, বাস্টার্ড। আর আসবে না। আই অ্যাম ডুমড। আর আসবে না। আর টিকিট কিনে পয়সা নষ্ট করব না।''

জ্যোতিভূষণ বললেন, ''একটু ভেবে বলতে হবে। অনেকগুলো টাকা তো।''

কাজ করতে করতে প্রদ্যোতের মনে হল—যদি চল্লিশ হাজার টাকা পাই তাহলে আমিই বা কী করব? কিছুক্ষণ আজেবাজে চিন্তা করে হাল ছেড়ে সে কাজে মন দিল। এক সময়ে কে.বি. মুখার্জির টেবল থেকে দারুণ হাসির আওয়াজ আসতে প্রদ্যোত তাকাল। মুখার্জি নিজের টাক মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলছে, ''আমি যদি পেতুম তাহলে একটি হেয়ার রিসার্চ ইনসটিটিউট করে সব টাকা তাতেই দান করে দিতুম। আঠারোটা সম্বন্ধ ভেঙে গেছে ভাই।'' করুণা গুহ তাই শুনে ছোপধরা দাঁতগুলো মেলে ধরে বলল, ''চল্লিশ হাজার টাকা দেখলে আচ্ছা আচ্ছা মেয়েও তোর পায়ে লুটিয়ে পড়বে রে শালা।''

প্রদ্যোত এই পর্যন্ত যাবতীয় ব্যাপার দেখে ও শুনে আবার কাজে মন দিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার মনে হল, একটা প্রশ্ন যেন মাথার মধ্যে বিঁধে খচখচ করছে। সেটাকে উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত বোধহয় স্বস্তি পাবে না। আমার চাহিদা কী? এই প্রশ্নটার সম্মুখীন বাইশ বছর চাকরি করার পর হতে হবে, প্রদ্যোত তা জানত না। এই ব্যাপারটা নিয়ে সে ভাবল কাজ করতে করতে, বাড়ি ফেরার কালে বাসের মধ্যে দমবন্ধ হওয়া অবস্থায়, হায়ার সেকেন্ডারি পড়া ছোট ছেলেকে একই অঙ্ক বারংবার বোঝাবার ফাঁকে এবং স্ত্রীর পাশে শুয়ে। অবশেষে সে সিদ্ধান্তে পৌঁছল, লটারির একটা ফার্স্ট বা সেকেন্ড প্রাইজ না পাওয়া পর্যন্ত বোঝা সম্ভব নয় তার চাহিদাটা কী! কেননা, এখন তার মনে হচ্ছে, জেনারেল ম্যানেজার পদ, সুশ্রী বুদ্ধিমতী স্ত্রী, প্রতিভাবান পুত্র, স্বাস্থ্য, মনোবল প্রভৃতি যেসব জিনিসের কথা সে ভেবেছে তার কোনোটিই লটারির টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করা যায় না। নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা হাতে এলে তবেই সেই অনুযায়ী চাহিদাটা নির্দিষ্ট একটা চেহারায় হয়তো ফুটে উঠবে। এইসব চিন্তার পর প্রদ্যোত স্থির করল, একটা লটারির টিকিট এবার সে কিনবে।

পরদিন খুশিরামের কাছ থেকেই প্রদ্যোত চুপি চুপি একটা টিকিট কিনল। সাত—আট রকমের লটারির টিকিট ওর কাছে রয়েছে। প্রদ্যোত বিন্দুমাত্র মাথা না ঘামিয়ে যেটা কিনল, তার ফার্স্ট প্রাইজ তিন লক্ষ টাকার। খুশিরাম হেসে বলল, 'আগে বাবুদের কাছে গিয়ে, কত ভুলিয়ে ভালিয়ে টিকিট গছিয়েছি আর এখন বাবুরাই যেচে আমার কাছে আসছে টিকিট কিনতে। আমি পয়মন্ত আছি পরমান হয়ে গেছে কিনা। মিরতুনজয় আগে কোনোদিন লটারি খেলে নাই, পরথম কিনল আর পাইয়ে গেল।''

শুনেই প্রদ্যোতের মনে হল, বোধহয় আমিও পাব। আমারও তো প্রথম টিকিট কেনা আর খুশিরামের কাছ থেকেই। এরকম যোগাযোগ তো ঘটতেই পারে যে, ওর কাছ থেকে যারাই প্রথম কিনবে তারাই পাবে। এক সময় কথায় কথায় সে বিশ্বনাথকে বলল, ''তুমি কার কাছ থেকে প্রথম লটারির টিকিট কিনেছিলে?''

সেকেন্ড পাঁচেক ভেবে বিশ্বনাথ বলল, ''আমার মাসতুতো ভাইয়ের এক বন্ধুর কাছ থেকে।'' তারপর কণ্ঠস্বর বদল করে, ''এ পর্যন্ত ছত্রিশটা টিকিট কেটেছি পাঁচ বছরে, সব লেখা আছে আমার ডায়েরিতে।''

জ্যোতিভূষণ মনে করতে পারলেন না প্রথম কার কাছ থেকে টিকিট কেনেন, তবে খুশিরামের কাছ থেকে এবারই প্রথম কিনলেন। মঞ্জুশ্রী চৌধুরীকে খুশিরামের খোঁজ করতে দেখে প্রদ্যোত জিজ্ঞাসা করল, ''ওর কাছ থেকে কিনলেই বুঝি প্রাইজ পাবেন ভেবেছেন?''

মঞ্জুশ্রী থতমত হয়ে বলল, ''আমিও জানেন তাই ভাবছিলাম। একজন পেলেই যে সবাই পাবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু রাধাদি বলল, ওর নাকি এমন ইন্সট্যান্স জানা আছে, একই লোক তিনটে ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়া টিকিট বেচেছে। কি করি বলুন তো, কিনব?''

''আপনার নিজের যা মনে হয়েছে তাই করুন, কারুর কথায় কান দেবেন না।''

মঞ্জুশ্রী হাঁফ ছেড়ে চেয়ারে ফিরে গেল। প্রদ্যোত দুদিন ধরে নানাভাবে খোঁজ নিয়ে জানল, এ অফিসে সেই একমাত্র লোক যে জীবনে এই প্রথম লটারির টিকিট কিনল। খেলার তারিখটা তার মুখস্তই আছে তবু চুপি চুপি শোবার ঘরের দেয়ালে, খাটে শুয়ে চোখ থেকে এক হাত দূরত্বের মধ্যে পেনসিল দিয়ে লিখে রাখল। টিকিটটা রেখেছে সে অফিসের ড্রয়ারে।

কয়েকদিন পর মৃত্যুঞ্জয় অফিসে এল। ওকে দেখে কেরানিবাবু এবং দিদিরা শোরগোল তুলল। কেউ কেউ বলল, খাইয়ে দাও একদিন। কয়েকজন পরামর্শ দিল, টাকাগুলো কী করা উচিত। একজন বলল, নিরাপদ কোনো ব্যবসায় খাটাও। আর একজন আপত্তি করে বলল, কোনো ব্যবসাই আজকাল নিরাপদ নয় বরং সেভিংস সার্টিফিকেট কিনুক। তারপর ওরা তুমুল তর্কে প্রবৃত্ত হল। অনেকে বলল, বাড়ি—জমি—সোনা ইত্যাদি কিনে রাখলে ভবিষ্যতের জন্য ভাবনা থাকবে না।

মৃত্যুঞ্জয় তার স্বভাবসুলভ বিনয় সহকারে সকলের কথাতেই ঘাড় নাড়ল। প্রদ্যোতের কাছে এসে নমস্কার করে একগাল হেসে দাঁড়াতেই প্রদ্যোত বলল, ''এবার তুমি কি করবে, অনেকগুলো টাকা তো পেলে।''

''ভগবান দিয়েছেন তাই পেলাম।'' মৃত্যুঞ্জয় হাতজোড় করে উদ্দেশে প্রণাম জানাল।

''কী করবে টাকা দিয়ে?'

''বিশ্রাম করব।''

ওর স্বাভাবিক বিনয়ী কণ্ঠকে প্রদ্যোতের যেন ইয়ার্কি মনে হল। ক্ষুণ্ণ হল সে। মৃত্যুঞ্জয় অর্থবান হলেও এখনো পিওন বটে। গম্ভীর হয়ে প্রদ্যোত বলল, ''কতদিন বিশ্রাম নেবে?''

''আমার তো সংসার খরচ সামান্যই। যদি টেনেটুনে চলি তা হলে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারব। আপনার কি মনে হয়, পারব না?'' মৃত্যুঞ্জয় উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।

''তুমি কি চাকরি করবে না আর?''

''না। ছেড়ে দোব। শুধু দুবেলা দুমুঠো খাব, আর ঘুমোব। আমার শুয়ে থাকতে খুব ভাল লাগে। এবার থেকে শুধু ইচ্ছে হলে কাজ করব। বুঝলেন প্রদ্যোতবাবু, এই টাকাটা পেয়ে আমার মনে হল, এত খাটাখাটুনি যে জন্য সেটাই যখন ভগবান পাইয়ে দিলেন, তখন আবার কেন খাটা?''

প্রদ্যোত শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে শুনে যাচ্ছে। শুনতে শুনতে সে অনুভব করল ক্লান্ত লাগছে। ক্লান্তিটা ক্রমশ তাকে দীনতায় ডুবিয়ে দিচ্ছে। এই প্রথম সে ঈর্ষা করতে শুরু করেছে মৃত্যুঞ্জয়কে অতগুলো টাকা পাওয়ার জন্য। এখন তার মনে হচ্ছে, এতদিন ধরে রুটিনমাফিক, যন্ত্রের মতো শুধু খেটেই চলেছি। আরও অনেক বছর ধরে তাকে খেটেই যেতে হবে। অথচ এই লোকটা কেমন রেহাই পেয়ে গেল।

মৃত্যুঞ্জয় চলে যাবার পর প্রদ্যোত কলম রেখে দিল। পিছন থেকে বিশ্বনাথ চাপা গলায় বলল, ''ওর কাছে বিনা সুদে যদি হাজার পাঁচেক টাকা ধার চাই প্রদ্যোতদা, তাহলে রিফিউজ করার মতো মর্যাল গ্রাউনড কি ওর থাকতে পারে?''

জ্যোতিভূষণ বললেন, ''ধরাকে এখনই সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে। চাকরি ছেড়ে দেবো! বললেই হল!''

ছুটির পর রাস্তায় বেরিয়ে ট্রাম—বাসের দিকে তাকিয়ে প্রদ্যোত ক্লান্ত বোধ করল! যেদিকেই সে তাকায় শুধু বিশ্রাম লোলুপতার এবং বিরক্তির ঊর্ধ্বশ্বাস গমনাগমন চোখে পড়ল। যত শব্দ তার কানে এল তাতে কর্কশ দীর্ঘশ্বাসের এবং হতাশ গর্জনের নিরন্তর ওঠানামাই শুধু শুনল। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে বাড়ি পৌঁছল। ছেলেকে অঙ্ক বোঝাবার সময় প্রদ্যোত ক্লান্ত বোধ করল। রাত্রে স্ত্রীর পাশে শুয়ে তার মনে হল একমাত্র নিঃসঙ্গতা ছাড়া বিশ্রাম বোধ হয় পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নিঃসঙ্গ হবার জন্য কতকগুলো জিনিস দরকার, তার মধ্যে প্রধান জিনিস টাকা। বহু টাকা যা দৈনন্দিন নানাবিধ দায় ও ভবিষ্যতের শর্তসমূহ পালনের আবশ্যিকতা থেকে রেহাই দেবে। এবং প্রচুর টাকা, একমাত্র লটারি ছাড়া আর কোনো উপায়ে অর্জনের সুযোগ তার নেই।

প্রদ্যোত গভীরভাবে প্রথম পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষায় ডুবে গিয়ে, ঘুমে পাওয়া স্ত্রীকে বলল, ''লটারির একটা টিকিট কাটলুম।''

''কত টাকার?''

''কিসের টাকা?''

''ফার্স্ট প্রাইজ কত?''

''তিন লাখ।''

''অ—নেক টাকা তো।'' এই বলে স্ত্রী ওপাশ ফিরে শরীর 'দ' করে শুল। প্রদ্যোত কিছুটা উৎসাহব্যঞ্জক স্বরেই বলল, ''তাহলে চাকরি ছেড়ে দেব।''

''তার মানে! বিস্ময়ের আঘাতে 'দ' ভেঙে পূর্ণচ্ছেদ হয়ে গেল।

''স্রেফ পড়ে পড়ে ঘুমোব আর ইচ্ছে হলে কাজ করব। টাকা রোজগারের জন্যেই তো খাটাখাটুনি, সেটাই যদি পেয়ে যাই তাহলে আর চাকরি করব কেন?''

''তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সেজন্য এমন চাকরিটা ছেড়ে দেবে? এখনো কত টাকা রিটায়ার করা পর্যন্ত রোজগার করবে জান?''

প্রদ্যোত মনে মনে দ্রুত গুণ করল—৬১৫×১২×১১ অর্থাৎ একাশি হাজার টাকারও বেশি। এর উপর বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটি। সোয়া লাখ টাকারও বেশি হয়ে যাচ্ছে।

''অতগুলো টাকা ছেড়ে দেবে, শুধু শুধু?''

''কিন্তু আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে যে।'' প্রদ্যোত ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বিরক্ত উত্তেজিত স্ত্রীকে প্রশমিত করার চেষ্টা করল।

''ক্লান্ত! তাহলে লক্ষ লক্ষ লোক আপিসে চাকরি করছে কী করে?''

তারাও ক্লান্ত, এই কথাটি বলার ইচ্ছা দমন করে প্রদ্যোত অতঃপর ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন অফিসে গিয়ে সে প্রবল চাঞ্চল্য দেখল। মৃত্যুঞ্জয় চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। কেউ বলল, ইডিয়ট। কেউ বলল, হয়তো ব্যবসায় নামছে। বেশির ভাগই বলল চাকরিটা ছাড়ার কোনো মানে হয় না। চাকরি হল সিকিউরিটি, এই বাজারে জিনিসটার দাম আছে। কিন্তু সকলের মুখেই কেমন একটা অস্বস্তিকর বিভ্রান্তির ছাপ পড়েছে।

প্রদ্যোত হিসেব করে দেখল, চল্লিশ হাজার টাকার লটারি পেয়ে মৃত্যুঞ্জয় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি টাকা দামের চাকরিটা ছেড়ে দিল। ওকে অসাধারণ সাহসী মনে করতে এখন তার অসুবিধা হচ্ছে না। বিছানায় চিৎ হয়ে বুকের উপর হাতদুটি জড়ো করে মৃত্যুঞ্জয় জানলা দিয়ে বাইরের আকাশে তাকিয়ে—এইরকম একটা ছবি প্রদ্যোতের চোখের সামনে কয়েকবার ভেসে উঠতেই সে ধীরে ধীরে ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে শুরু করল এবং লটারির ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়ার কামনার দ্বারা প্রবলভাবে আক্রান্ত হল। তখন তার ইচ্ছা করল মৃত্যুঞ্জয়ের মতো সাহস দেখাতে, এই মুহূর্তে চাকরি ছেড়ে দিতে।

সেদিন রাতে সে স্ত্রীকে বলল, ''ছেড়েই দেব চাকরিটা যদি লটারির টাকা পাই।''

''ছেড়ে দিয়ে কী করবে?'' কটু কণ্ঠে স্ত্রী জানতে চাইল।

''কিছুই করব না। সেইজন্যই তো ছাড়ব। শুধু শুয়ে থাকব, ঘুমোব, বই পড়ব আর খিদে পেলে খাব।''

''ওইভাবে দিন কাটাতে পারবে? একঘেয়ে বিরক্তিকর লাগবে না?''

প্রদ্যোত কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ''এখনকার এই একঘেয়েমির থেকে ক্লান্তিকর আর কিছু হতে পারে না।''

''কিন্তু চাকরি থেকে যে টাকাগুলো পেতে পার অযথা সেগুলো ছেড়ে দেওয়া কি বোকামি হবে না? ওই টাকা দিয়ে তো আরো বেশি সুখস্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানো যেতে পারে?''

প্রদ্যোত চুপ করে রইল। সে জানে, কথা বাড়ালে বহু প্রকারের অকাট্য যুক্তি তার সামনে পাঁচিল তুলে দাঁড়াবে। সেগুলো লঙ্ঘন করা বা ধসিয়ে দেওয়াও আর এক ক্লান্তিকর কাজ। আসলে মনের ইচ্ছাটা এত আগে ব্যক্ত করাই তার ভুল হয়েছে। লটারির টাকা পেয়েই চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে তারপর চুপচাপ সবরকম কথা শুনে যাওয়াই ভাল। সবাই কিছুদিন খুব বোকা বলবে তারপর এক সময় চুপ করে যাবে। তারপর ভুলে যাবে।

পরদিন থেকে সে গুনতে শুরু করল লটারির খেলার তারিখটা ঘনিয়ে আসতে কত বাকি। এক একটি দিন যায় আর সে বর্ধিত হারে চঞ্চলতা বোধ করতে শুরু করে। চটপট বাজার করে, ছেলেকে বারবার একই পড়া বুঝিয়ে দিতে দিতে বিরক্ত হয় না, বাসে বা ট্রামে ভিড় থাকলেও ঠেলেঠুলে উঠে পড়ে, বেয়ারার জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই জরুরি ফাইল অফিসারের কাছে পৌঁছে দেয়, পঞ্চমবার মা হওয়া মিসেস চক্রবর্তীকে নিয়ে মেয়েরা মসকরা করলে প্রদ্যোতও এখন মুচকি হাসে, দিন দুয়েক অফিস গেটে ছুটির পর সে স্লোগানও দিয়েছে ''মালিকের দালাল নিপাত যাক'' বলে আর প্রতি রাতে ঘরের আলো নেভাবার আগে দেওয়ালে একটা নতুন টিক দেয় পেন্সিলের। কিছুক্ষণ মাছের কাঁটার মতো টিকগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে প্রবল উদ্দীপনায় অভিভূত হয়ে সে আবার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়—পেলেই চাকরিটা ছেড়ে দেব।

অবশেষে দিনটি এসে গেল। প্রদ্যোত বিছানা থেকে উঠল না, বাজার গেল না, অফিসেও না এবং খবরের কাগজ ছুঁল না। স্ত্রী একবার বলেছিল আজ একটা লটারির রেজাল্ট বেরিয়েছে, ''এটা তুমি কিনেছিলে নাকি? প্রদ্যোত মাথা নাড়ল উপরন্তু বেশ জোর দিয়েই বলল ''না।''

দুপুরে বিছানায় চিৎ হয়ে হাত দুটো বুকের উপর রেখে জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কাটাল। এই সময় কারুর কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে তার ইচ্ছা করল না। কোনোপ্রকার ভালমন্দ সুখ দুঃখ বোধ তার হৃদয়ে পৌঁছল না। গভীর রাত্রে ঘর থেকে বেরিয়ে দালানের আলোটি জ্বেলে সে খবরের কাগজ খুলল। প্রায় আধ পাতা জুড়ে রেজাল্ট ছাপা রয়েছে। প্রথমে সে তলার দিকের নম্বরগুলোয় চোখ রাখল। এগুলো একশো টাকা পাওয়াদের নম্বর। প্রদ্যোত নিজের নম্বর পেল না। তারপর একটু উপরে পাঁচশো টাকা পাওয়াদের নম্বরগুলো খুঁটিয়ে দেখেও যখন পেল না, উত্তেজনায় তার হাতটা কেঁপে উঠল। সে হাজার টাকার নম্বরেও পেল না। দশ হাজার পেয়েছে যে তিনটি নম্বর তার সঙ্গে নিজের সিরিয়ালেরই মিল নেই। পঞ্চাশ হাজারের দুটি এবং তিন লাখের একটি নম্বর এবার বাকি। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে হঠাৎ সে নিজেকে ভাগ্যের মুখে ঠেলে দিল।

পরদিন প্রদ্যোত অফিসে কাজ করতে করতে লক্ষ্য করল, বিশ্বনাথ তালগোল পাকানো একটা লটারির টিকিট মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলেছে। জ্যোতিভূষণ তাই দেখে মৃদু হাসল মাত্র। বিশ্বনাথ বিড়বিড় করে বলল, ''লাক একবারই আসে। আর পয়সা নষ্ট করব না।'' মঞ্জুশ্রী চৌধুরী একসময় বলল, ''ধ্যেৎ প্রদ্যোতবাবুর সঙ্গে পরামর্শ না করলেই হত। রাধাদির কথামতোই এবার কিনব।''

ছুটির কিছু আগে খুশিরাম অনেকরকম লটারির টিকিট নিয়ে বিক্রি করতে করতে প্রদ্যোতের কাছেও এল। ''কিনুন এই দু—লাখেরটা। আর পনেরো দিন পরে ড্রোয়িং হোচ্ছে।''

প্রদ্যোত কয়েক মুহূর্ত ভেবে উত্তেজনা চেপে বলল, ''ওটা বড্ড অল্পদিনের জন্য। দু—তিন মাস পর ড্রয়িং হবে এমন কিছু থাকে তো, দাও।''

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%