মতি নন্দী
''এবার তো ছেলেছোকরাদেরই যুগ এসে গেল। আমি যাচ্ছি, তারপর পবিত্র নাগ যাবে। যারা আঠারো কুড়ি টাকা মাইনেয় ঢুকেছিল সব একে একে যাবে। দুঃখ হবে কেন, জায়গা জুড়ে কি চিরকাল থাকা চলে?'' মুখ নামিয়ে গুণেন ঘোষ কাজে মন দিল। আর একটা কথাও সেদিন সে বলেনি।
এর চারদিন পরেই ম্যানেজিং ডিরেক্টরের বেয়ারার কাছ থেকে সবাই জানল, গুণেন ঘোষ সন্দীপবাবুর পা জড়িয়ে কেঁদে পড়েছিল এক্সটেনশন পাবার জন্য। পায়নি। তিনি বলেছেন, বুড়োহাবড়াদের আর রাখবেনই না। এখন কোয়ালিফায়েড, স্মার্ট ছেলে অজস্র পাওয়া যায়। এবার থেকে নাকি দরখাস্ত নিয়ে ইন্টারভিউ করে সব চাকরি হবে।
প্রতাপ জানার পক্ষাঘাত হবার পর থেকেই তার ছেলে সন্দীপ কর্তা হয়ে বসেছে। নিজে গাড়ি চালায়, লিফট না পেলে লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় ওঠে। প্রতাপ জানা থাকলে গুণেন ঘোষ যে দু—বছর এক্সটেনশন পেত, সে—বিষয়ে কারুরই দ্বিমত দেখা গেল না। এই বিরাট অফিস আর কারখানা তার একার চেষ্টায় গড়ে তোলার, কর্মচারীদের সঙ্গে তার অমায়িক ব্যবহারের, বিপদে—আপদে অর্থ সাহায্যের কথা ইত্যাদি সবই আলোচিত হল সেদিন।
এরপর থেকেই পবিত্র নাগের রাতের ঘুম কমে গেল। গুণেন তার থেকে মাত্র সাত মাসের সিনিয়র। পবিত্রর ছেলে বুড়ো এ—বছরই ডাক্তারি পাস করল। রোজগার করে দাঁড়াতে এখনো বছর তিন—চার। একটা মেয়ের বিয়ে হয়েছে, আরো একটি বাকি। রাতে যতক্ষণ না ঘুম আসে কানে শুধু বাজে গুণেনের কণ্ঠস্বর 'তারপর পবিত্র নাগ যাবে।'
ব্যাপারটা একদিন খুলে বলল স্ত্রী উমাকে। শোনামাত্র ফ্যাকাসে হয়ে গেল উমার মুখ। শুধু বলল, ''রিটায়ার হলে চলবে কী করে? কটা টাকাই বা আর পাবে। জয়ন্তীর বিয়েতে তো চার হাজার পর্যন্ত তুলেছ।''
উমা পরামর্শ দিল প্রতাপ জানার সঙ্গে দেখা করার। পরদিনই অফিস ছুটির পর পবিত্র হাজির হল মালিকের বাড়ি। ওর মনে পড়ল যখন দর্জিপাড়ার ভাড়াবাড়িতে প্রথম সে প্রতাপ জানার সঙ্গে দেখা করতে যায় পাঁচ বছরের সন্দীপ তাকে বলেছিল, ''বসুন, ডেকে দিচ্ছি।''
প্রায় পনেরো মিনিট পর চাকর এসে পবিত্রকে নিয়ে গেল দোতলার ঘরে। দেড় বছরেই দশাসই মানুষটি কঙ্কালসার হয়ে গেছে। বাঁদিক একদম পড়ে গেছে। কথা যা বলেন বোঝা যায় না। ডান হাত কোনোরকমে তুলে ওকে বসতে বললেন। চেয়ারটা খাট ঘেঁষে টেনে পবিত্র বসল।
প্রায় আধঘণ্টা চুপ করে বসে পবিত্র বাড়ি ফিরল। উমা ব্যগ্র হয়ে জানতে চাইল, উনি কিছু করবেন বলে কথা দিলেন কিনা। পবিত্র ভারি অসহায় বোধ করল। যার নড়াচড়ার বা কথা বলারই ক্ষমতা নেই তাকে কি এইসব ব্যাপার জানানো যায়। উমার মুখ দুশ্চিন্তায় কালো হয়ে গেল।
দিন—তিনেক পর রাতে উমা এসে বসল পবিত্রর বিছানায়। ফিসফিস করে বলল, ''সন্দীপবাবুর সামনে চটপটে ভাব দেখিয়ে ঘোরাঘুরি করো না। তোমাকে তো খুব বুড়ো আর দেখায় না।''
''তা কী করে হয়। ওতে কি বয়স কমে?''
''কেন হবে না। ওপরের পাঁচুদাসবাবুর তো সব চুলে পাকা, বুঝতে পারবে দেখলে? আর কেমন সিধে হয়ে হাঁটে।''
''ও তো এককালে ফুটবল খেলত, স্বাস্থ্যটা এখনো ভালো। তাছাড়া প্যান্ট পরলে অনেক স্মার্ট দেখায়।''
''তুমিও পরবে। বুড়োর প্যান্ট তোমারও হবে। দরকার হলে দর্জির কাছ থেকে ছোট করিয়ে আনবে।''
পরের সোমবারই চুলে কলপ দিয়ে, ছেলের প্যান্ট এবং নতুন বুটজুতো পরে পবিত্র অফিসে এল। দেখে সবাই হাসল, ঠাট্টা করল। দু—একজন ঘুরিয়ে এমন কথাও বলল, রিটায়ারের সময় আসছে বলেই ছোকরা সেজেছে। পবিত্র এ—সবের কিছুই গ্রাহ্য করল না। শুধু খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে লাগল অল্পবয়সীদের চলাফেরা রকমসকম।
নতুন জুতোর তলায় ভালো করে ধুলোও লাগেনি। এখনো চলতে গেলে পা হড়কায়। তাই পা টিপে টিপে পবিত্র অফিসের সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। হঠাৎ ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে উঠে আসতে দেখে হকচকিয়ে প্রায় ছুটেই সে নামতে শুরু করল। সিঁড়িটা যেখানে ঘুরেছে তার শেষ ধাপের তিনটি সিঁড়ি উপর থেকে পবিত্র লাফ দিল। হাঁটু নুয়ে পড়ছিল, টাল সামলে উঠতে গিয়ে জুতো পিছলে গেল। ম্যানেজিং ডিরেক্টরই ওকে টেনে তুলল। এবং বেশ সহানুভূতির সঙ্গেই বলল, ''সাবধানে নামা—ওঠা করুন। এই বয়সে হাত পা ভাঙলে আর সারবে না!''
শুনে পবিত্র বিমর্ষ হয়ে পড়ল। বহুক্ষণ ভাবল 'এই বয়সে' বলতে কী বোঝাল? বুড়ো হয়েছি অর্থাৎ শারীরিক অক্ষমতার ইঙ্গিত দিল কি? 'এই বয়সে' মানে কী ষাট বছর বয়সে। রাতে উমার কাছে পবিত্র ঘটনাটা বিবৃত করল। ক্ষুব্ধ হয়ে উমা বলল, ''নিশ্চয় তোমার বয়সকে ঠেস দিয়েই বলেছে। হয়তো রিটায়ারের সময় এই ঘটনাটার কথাই ওর মনে পড়বে তখন আর চাকরি বাড়াতে চাইবে না। কেন ওভাবে নামতে গেলে?''
''ওভাবেই তো সুধেন্দুকে নামতে দেখি।''
পরদিনই উমা আঁশবঁটি দিয়ে জুতোর তলা ঘষে দিল। জুতো পরে চেয়ার থেকে পবিত্র বার পাঁচ ছয় লাফিয়ে নামল। অফিস বেরোবার সময় ফিসফিস করে উমা বলে দিল, ''এখন কিছুদিন একদম সামনাসামনি হবে না। ভুলে যেতে দাও। বড় বড় ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় তো, ছোট ব্যাপার আর কদিনই বা মনে করে রাখবে।''
পবিত্র প্রাণপণ করে চলল যাতে ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে তার দেখা না হয়। মাসখানেক পর সন্দীপ জানা তাদের ঘরে ব্যস্ত হয়ে ঢুকে বিল—ইনচার্জ প্রভাকরের সঙ্গে টেবলে হাত রেখে ঝুঁকে কথা বলতে শুরু করল। পবিত্রর টেবলে তখন চায়ের কাপ আর মুখে টোস্ট। ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে দেখেই বিষম খেল। খক খক করে কাশতে শুরু করল। সন্দীপ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই পবিত্র দম বন্ধ করল কাশি চাপতে। চোখ দুটো ঠিকরে পড়ার দশা, মুখের খাবার গিলবার জন্য কোঁত পাড়ল। ঘরের সকলেই তার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে। সন্দীপ খুব সহানুভূতির সঙ্গেই বলল, ''আপনার কি কাশির অসুখ আছে? আমাদের ডাক্তারকে দেখিয়ে নিন না।''
পবিত্র জোরে মাথা নাড়তে থাকল।
বাড়ি ফিরে পবিত্র ঘটনাটার কথা উমাকে বলল না, শুধু 'কাশির অসুখ' কথাটা তার মনে পাক খেয়ে ফিরতে লাগল। কি বোঝাতে চাইল? কাশিটা কি যক্ষ্মারোগীদের মতো ছিল? এটা কি ও মনে করে রাখবে? যদি রাখে তাহলে এক্সটেনশন কি পাওয়া যাবে?
কিছুদিন পর অপিসে একটা চাপা উত্তেজনা দেখা গেল। স্পোর্টস হবে। ইতিপূর্বে কখনো হয়নি। এক ছোকরা সহকর্মী পবিত্রকে পরামর্শ দিল, ''দাদা, বুড়োদের জন্য ওয়াকিং রেস আছে, নেমে পড়ুন। সন্দীপবাবু প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউট করবেন। যদি ফার্স্টসেকেন্ড হন, নজরে পড়বেন। আপনি যে ফিজিক্যালি ফিট সেটা তো প্রমাণ হবে।''
কথাটা মনে লাগল। উমাকে বলামাত্রই সে সায় দিল।
''কতটা হাঁটতে হবে?''
''তা প্রায় আধ মাইল।''
''পারবে না?''
পবিত্র কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ''খুব জোরে হাঁটতে হবে। ফার্স্টসেকেন্ড না হলে লাভ কী?''
''তা তো বটেই। কাল থেকেই জোরে হাঁটা অব্যেস কর। আমি বরং ভোরবেলা তুলে দেব। পার্কে গিয়ে হাঁটবে।''
পবিত্র পরদিন থেকে হাঁটার অভ্যাস শুরু করল। আলো ফোটার আগেই উমা তাকে তুলে দেয়। পার্কে গিয়ে কয়েক চক্কর হেঁটে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে বাড়ি ফিরে আসে। একদিন উমা বলল, ''চলো আমিও যাই। দেখব তুমি কেমন হাঁটতে পার।''
পার্কের বেঞ্চে উমা বসে রইল। পবিত্র এক পাক দিয়ে তার সামনে আসামাত্র বলল, ''এ তো বেড়ানো হচ্ছে। এভাবে চললে কি ফাস্ট সেকেন হওয়া যায়?''
পবিত্র চলার বেগ বাড়াল। তিনপাক দেবার পর হাঁফিয়ে উঠে, উমার পাশে এসে বসল।
''আধ মাইল হয়ে গেল!''
''আর পাচ্ছি না।''
''তাহলে হবে কী করে? বুড়োকে ডাক্তারখানা করে দিয়ে বসাতে হবে; বাসন্তীর বিয়ে এই বছরই দেব; আর বলছ পাচ্ছি না? ওঠো ওঠো। আর দিন—পনেরো মোটে সময়।''
পবিত্র জোরে আরো তিনপাক হেঁটে এসে বসল। পা কাঁপছে। হাঁ করে শ্বাস নিতে নিতে উমাকে বলল, ''এভাবে কি জোয়ান সাজা যায়!''
উমা কথা না বলে সামনে তাকিয়ে থাকল। পবিত্র হাঁটুতে হাত রেখ ঘাড় নিচু করে কিছুক্ষণ হাঁফাবার পর আস্তে আস্তে বলল, ''এতখানি বয়েস হল তার আর কোনো দাম রইল না।''
এরপর থেকে রোজই উমা সঙ্গে আসে। পবিত্র চক্কর দিতে থাকে। যখন কাছে আসে উমা গলা এগিয়ে ফিসফিস করে, ''জোরে। আরো জোরে।'' পবিত্র তাই শুনে হাঁটার জোর বাড়ায়। কখনো কখনো উমাও হাঁটে ওর সঙ্গে। কিছুটা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পবিত্র চক্কর সম্পূর্ণ করে এলে আবার কিছুটা সঙ্গে থাকে। রাতে সকলে ঘুমিয়ে পড়লে সে পবিত্রর পা টিপে দেয়।
স্পোর্টসের দিন পবিত্রর সঙ্গে উমাও মাঠে গেল। শামিয়ানা খাটানো হয়েছে। অ্যামপ্লিফায়ারে গানের রেকর্ড বাজছে। কর্মকর্তারা তদারকিতে ব্যস্ত। পবিত্র আর উমা একধারে দুটি চেয়ারে বসে রইল। বিরাট এক টেবলে পুরস্কারগুলি সাজানো। উমা বলল, ''কোনটা তোমাদের?''
''কী জানি! শুনেছি অ্যাটাচি ব্যাগ দেবে।''
''তাহলে বুড়োর কাজে লাগতে পারে।''
পবিত্র মুখ ফিরিয়ে স্পোর্টস দেখতে লাগল। সকাল থেকে উমা কিছু খেতে দেয়নি। তেষ্টায় বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। কোকাকোলা বিলানো হচ্ছে প্রতিযোগীদের। পবিত্র উঠে পড়ল। গুটি গুটি এগোতেই উমা পিছু নিল।
''জল খেতে যাচ্ছি।''
''বেশি খেও না।''
উমা চেয়ারে এসে বসল। পবিত্র দু—বোতল কোকাকোলা শেষ করে তৃপ্তি বোধ করল। ফুরফুরে হাওয়া, রোদটাও মিঠে লাগছে, তাই সে ইতস্তত বেড়াতে লাগল। দূরে দূরে ঘেরা ফুটবল মাঠ। মাঝে মাঝে ক্লাবের তাঁবু। অনেক মাঠেই ক্রিকেট খেলা চলছে। এধারে মনুমেন্ট, ওধারে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ট্রামগুলো খেলনার গাড়ির মতো। পবিত্র কিছুক্ষণ দূরের ট্রাম—বাসের চলা দেখল। একজায়গায় অনেক লোক ভিড় করে। এগিয়ে গেল সে। ম্যাজিক দেখাচ্ছে দাঁতের মাজনের ফিরিওলা।
অবাক হয়ে সে মাজনওলার বক্তৃতা শুনছিল। হাতে টান পড়তেই ফিরে দেখে উমা।
''এখানে দাঁড়িয়ে থাকলেই কি চলবে? সন্দীপবাবু এইমাত্র এল, যাও সামনে গিয়ে দাঁড়াও। কত লোক তো ঘুরঘুর করছে, কথা বলছে।''
গজগজ করতে করতে উমা ওকে নিয়ে ফিরে এল শামিয়ানার কাছে। সন্দীপ জানা হেসে হেসে কথা বলছে, কর্মচারীর ছেলে—মেয়েদের পিঠ চাপড়াচ্ছে, গাল টিপছে। পবিত্র ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একজন বলল, ''পবিত্রবাবু আজ ওয়াকিং রেসের সব থেকে ভেটারেন কম্পিটিটর।''
''তাই নাকি!'' ম্যানেজিং ডিরেক্টর খুব অবাক হল, ''তাহলে তো আপনাকে জিততেই হবে। যদি জেতেন আপনাকে আমি একটা স্পেশাল প্রাইজ দেব।''
পবিত্র কাছে আসতেই উমা ঝাঁপিয়ে পড়ল যেন। ''কী, কী বলল?''
''যদি জিতি, স্পেশাল প্রাইজ দেবে আমাকে।'' পবিত্রর কণ্ঠে উমার মতো উত্তেজনা নেই।
''তাহলে তো জিততেই হবে তোমাকে। ওঃ রাধামাধব! এইবারটি অন্তত মুখ তুলে চাও। সারাজীবনই তো জ্বালাতন—পোড়াতন হলুম।'' উমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ফোঁপানি চাপতে মুখে আঁচল দিল! ম্যাজিকওলাকে ঘিরে এখনো ভিড় জমে আছে। পবিত্র সেইদিকে মুখ ফিরিয়ে রইল।
সবশেষে ওয়াকিং রেস। মাঠটা গোল হয়ে দুটো চক্কর দিতে হবে। দর্শকরা চেয়ার থেকে উঠে এসে লাইনের ধারে জড়ো হয়েছে মজা দেখতে। প্যান্টটাকে হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে পবিত্র প্রতিযোগীদের সঙ্গে দাঁড়াল। অফিস এবং কারখানা মিলিয়ে পনেরোজন। সকলে পঁয়তাল্লিশ বছরের উপরে। দর্শকরা উৎসাহ দিয়ে কথা বলছে। উমা শুধু একধারে ঠায় দাঁড়িয়ে।
পিস্তল ছোঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল হাঁটা। দর্শকদের মধ্যে হইহুল্লোড়। অনেকে প্রতিযোগীদের সঙ্গে লাইনের পাশ দিয়ে হাঁটতে লাগল চিৎকার করতে করতে। প্রথম চক্করে সিকি পথ পবিত্র সবার আগে! মাঝপথে দেখা গেল তিন—চারজনের পিছনে। চক্করটা শেষ হবার আগেই পিছনের লোকেরা ওকে ধরে ফেলল দর্শকদের চিৎকারে দূরের পথিকরাও একবার থমকে এদিকে তাকাল।
পবিত্র অসহায় বোধ করল। পাশের লোকটি তাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। উমা কোথায়, তাই দেখতে গিয়ে চোখ পড়ল ম্যানেজিং ডিরেক্টর হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে অগ্রবর্তীদের। পবিত্র দমে গেল। খালি পেট মোচড় দিচ্ছে। ঘাড়টা কাত হয়ে পড়েছে। হাত দুটো পাঁজরের দুপাশে গাছের ভাঙা ডালের মতো দুলছে। সামনের লোকেদের সঙ্গে তার ব্যবধান বেড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সে চমকে উঠল উমাকে দেখে। লাইনের পাশে সর্বস্বান্তের মতো দাঁড়িয়ে।
''এইভাবে তুমি ডোবাবে।'' উমাও ওর সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করেছে তার তিক্ত হতাশ কণ্ঠে বলছে, ''সবাই এগিয়ে যাচ্ছে। এগোও। আরো জোরে হাঁটো, আরো জোরে, এই তো, এই তো।''
চিবুক তুলে, নিঃশ্বাস টেনে পবিত্র জোরে হাঁটতে চেষ্টা করল। মাথা নড়ছে ছ্যাকরা গাড়ির টাল খাওয়া চাকার মতো। দুটো হাত লগবগ করছে। গোটা শরীর আলোড়িত হয়ে হাস্যকর দৃশ্য তৈরি করল। তবে ওর আগের লোকের সঙ্গে ব্যবধান কয়েক মিটার কমল।
উমা তাল রাখতে ছুটতে শুরু করেছে। আর চাপাস্বরে বলে চলেছে, ''এই তো, এই তো! সবাই দেখছে, সন্দীপবাবু দেখছে। কে বলে তোমার বয়স হয়েছে? কে বলে বুড়ো হয়েছ?''
মাঠের দর্শকরা এতক্ষণ নাগাড়ে চিৎকার করে যাচ্ছিল। এখন তারা হঠাৎ চুপ করে, পবিত্র আর উমাকে দেখতে লাগল। কথা বলার দরকার হলে ফিসফিস করছে। পবিত্র দ্বিতীয় চক্করের অর্ধেক পার হয়েছে। প্রথমজন ফিতের দিকে এগোচ্ছে।
''সব্বোনাশ হল। পৌঁছে গেছে যে গো।'' উমা দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন পবিত্র মরিয়া হয়ে হঠাৎ ছুটতে শুরু করল। প্রতিযোগীরা অবাক হয়ে কেউ কেউ থমকে দাঁড়াল। এতক্ষণ সারা মাঠ একটা কিছুর প্রত্যাশায় দম বন্ধ করে ছিল। এবার হইহই করে চিৎকার, হাততালি আর হাসি শুরু করল। পবিত্র সবার আগে ফিতে ছিঁড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে, ম্যানেজিং ডিরেক্টরের দিকে তাকিয়ে হাসল।
লাউডস্পিকারে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা হচ্ছে। হাততালি পড়ছে। পবিত্র আর উমা তখন অবসন্নগতিতে ধর্মতলার ট্রাম টার্মিনাসের দিকে হেঁটে চলেছে। কেউ কথা বলছে না। পবিত্র একটু পিছিয়ে। মাঝে মাঝে মুখ তুলে দু—ধারে তাকাচ্ছে। প্যান্টটা তখনো হাঁটু পর্যন্ত গোটানো।
ট্রামে উঠে পবিত্র উমার সিটের পিছনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। উমা তাকে বসতে বলল না।
পরদিন ধুতি—পাঞ্জাবি পরে পবিত্র অফিসে গেল। ফিরে এল দুপুরে। উমা বিস্মিত হয়ে তাকাবামাত্র সে বলল, ''আর রিটায়ার করাতে পারবে না। রিজাইন দিয়ে এলুম।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন