বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা

মতি নন্দী

জানতাম না বিজন দত্ত এই স্যানাটোরিয়ামে রয়েছে। স্কুল ছুটির পর, ডাক্তার বসুরায়ের কোয়ার্টারে মাঝে—মাঝে যাই, যদি থাকেন তো গল্প করে সময় কাটাতে। সেদিন উনি বললেন, 'তুমি তো ফুটবল পাগল, বিজন দত্তের নাম শুনেছ?'

আমাকে চিন্তায় বিব্রত দেখে বললেন, 'ফরটি—এইট লন্ডন ওলিম্পিকে ইন্ডিয়ান ফুটবল টিমে নাকি স্ট্যান্ডবাই ছিল। আমি অবশ্য বলতে পারব না কথাটা সত্যি কি মিথ্যে তবে কথাবার্তা ফুটবলারদের মতোই রাফ, মুখে অনর্গল খিস্তি, আর গোঁয়ার। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়েস কিন্তু এককালে যে লম্বা—চওড়া দারুণ স্বাস্থ্য ছিল সেটা বোঝা যায়।

মনে পড়ল, ছোটবেলায় দাদাদের কাছে বিজন নামটা শুনেছি। ও যখন পা ভেঙে খেলা ছেড়ে দেয়, তখনও আমি ময়দানে ফুটবল দেখতে যাওয়া শুরু করিনি। তাছাড়া মোহনবাগান ক্লাবে বিজন দত্ত কখনো খেলেনি। সুতরাং আমার পক্ষে না চেনাই স্বাভাবিক। ওয়ার্ড এবং বেড নম্বর জেনে নিয়ে একদিন বিকেলে আলাপ করতে গেলাম।

ঘরে চারটি মাত্র বেড। দেয়াল ঘেঁষে ওর খাট। তার পাশেই দরজা, বারান্দায় যাওয়া যায়, মাথার নিচে দু হাত রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল। লম্বায় ছ ফুটের বেশি বই কম নয়। চুল কদমছাঁট, অর্ধেক পাকা, মাথাটি ঝুনো নারকেলের মতো দেখাচ্ছে। খাটের পাশে দাঁড়াতেই কৌতূহলটা বিস্ময়ের রূপ নিয়ে ওর ঘন ভ্রূয়ের নিচে জ্বলজ্বল করে উঠল।

'আপনার নাম শুনে আলাপ করতে এলাম।' সঙ্কোচ কাটাবার জন্য হাসতে গিয়ে বুঝলাম এ—লোকের কাছে সৌজন্য দেখানো নিরর্থক।

'কেন, আমি কি ফিল্ম—স্টার না টেস—প্লেয়ার?'

দমে না গিয়ে বললাম, 'ফুটবল ভালবাসি, রেগুলোর খেলা দেখিও।'

'জীবনে কখনো তো বলে পা দেননি।' কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসতে বসতে বিজন দত্ত বলল, 'চেহারা দেখেই বুঝেছি।'

কথাটা নব্বুই ভাগ সত্যি, তাই প্রতিবাদ করার মতো জোর পেলাম না।

'গত বছরই, আপনার মতো পটকা চেহারার এক ছোকরা এল, ফুটবল সেক্রেটারির বন্ধুর ছেলে। আমাকে বলা হল একটু দেখতে।' বিজন দত্ত পিটপিটিয়ে হাসল। 'সকালে প্রথম দিন প্র্যাকটিসে আসতেই কুড়ি পাক দৌড়তে বললুম, পাঁচ—ছ পাক দিয়েই বাছাধনের কোমরে হাত। গোলের মুখে উঁচু করে বল ফেলে ওকে হেড করতে বললুম আর আমার স্টপারকেও বলে রাখলুম কোঁতকা ঝাড়তে। প্রথম বার উঠেই পাঁজর চেপে বসে পড়ল। তারপর ট্যাকলিং প্র্যাকটিস। ছোকরার একটা ভালো ডজ ছিল। দুবার আমায় কাটিয়ে বেরোল। থার্ড টাইমে, লাট্টুর মতো পাক খেয়ে সাইড— লাইনের দশ হাত বাইরে ছিটকে পড়ল। পরদিন থেকে আর আসেনি।'

বিজন দত্ত দুই ঊরুতে চাপড় মেরে পুরনো মোটর স্টার্ট দেবার মতো শব্দ করে হেসে উঠল। দেখলাম নিচের পাটির সামনে দুটি দাঁত নেই।

'ফুটবল পুরুষমানুষের খেলা। বুঝলেন, সেইভাবেই আমরা খেলেছি। মার দিয়েছি, মার খেয়েছিও। বাঁ হাঁটুর দুটো কার্টিলেজই নেই, আর এই পায়ের সিনবোনটা—বিজন দত্ত লুঙিটা হাঁটু পর্যন্ত তুলে ডান পা ছড়িয়ে দিল। ঘন লোমের মধ্যে দিয়েও কয়েকটা কাটা দাগ দেখতে পেলাম।'

'এই পা—টা ভাঙার পরই খেলা ছাড়তে হল।'

কোনোরকম প্রয়াস ছাড়াই আমার মুখে বোধহয় স্বস্তির ভাব ফুটে উঠেছিল। বিজন দত্ত কঠিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আপনি কী করেন?'

'এখানকার স্কুলে পড়াই, সায়ান্স।'

'মাস্টার। আমিও মাস্টারি করি, ফুটবলের। আমার লেখাপড়া ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত।'

'আপনি কি এখন কোচ করেন?'

'শোভাবাজার ইয়ং মেনস। গতবার ফাসডিভিশানে ওঠার কথা ছিল, ওঠেনি।' বলতে বলতে বিজন দত্তর মুখ চাপা রাগের আক্রমণে মুচড়ে যেতে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'বাঞ্চোতটা টাকা দিয়ে ম্যাচ কিনল। জানত খেলে আমার টিমের কাছ থেকে পয়েন্ট নিতে পারবে না।'

'কার কথা বলছেন?'

'রতন সরকার। শালা খেলার আগের দিন একশো টাকা নিয়ে আমার গোলকিপারের বাড়ি গেছে; স্টপারের বৌটা মরো—মরো, হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেবে বলেছে, দুটো হাফব্যাককে টেরিলিন প্যান্ট দিয়েছে। নয়তো প্রদীপ সঙ্ঘের সাধ্যি ছিল কি চ্যাম্পিয়ন হয়। পাঁচটা ম্যাচ কিনেছে হাজার টাকা দিয়ে। শালা আবার নিজেকে কোচ বলে বড়াই করে। বরাবর, সেই যখন আমরা একসঙ্গে খেলতাম তখন থেকে ওকে জানি, পয়লা নম্বরের জোচ্চচর। হাত দিয়ে কতবার যে গোল করেছে! পেনাল্টি এরিয়ার মধ্যে মাটিতে পড়ে ছটফটিয়ে এমন কাতরাত যে মনে হত যেন ওকে দারুণ মেরেছে। এইভাবে অনেক পেনাল্টি আদায় করেছে। গোলকিপার বল ধরতে লাফাচ্ছে, রতন অমনি প্যান্ট টেনে নামিয়ে দিল। যত রকমের ছ্যাঁচড়ামো আছে কোনোটাই বাদ দিত না।'

শুনতে শুনতে আমি হেসে ফেলেছিলাম, ওর যত রাগ রতন সরকারের বিরুদ্ধে অথচ নিজের টিমের যারা ঘুষ নিল তাদের সম্পর্কে একটি কথাও বলল না। আমার হাসি দেখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'আপনি কোন ক্লাবের সাপোর্টার?'

'মোহনবাগানের।'

অশ্রাব্য একটা খিস্তি করে বলল, 'কাঁপে, বুঝলেন ছোট টিমের কাছেও ভয়ে কাঁপে। তিনটে ক্লাবের অফার আছে আমার কাছে। এখনও ঠিক করিনি কোনটা নোব, তবে নোবই। রতনকে এমন শিক্ষা দেব যে খানকির বাচ্চাটা জীবনে ভুলবে না। আর মোনবাগান ইসবেঙ্গলের কাছ থেকে পয়েন্ট নেব। ইজিলি পয়েন্ট নেব। একশো টাকা বাজি রাখছি।'

বললাম, 'যদি রতন সরকার আবার আপনার প্লেয়ারকে ঘুষ খাওয়ায়?'

ওর চোখে দপ করে ওঠা রাগটা ধীরে ধীরে বিচলিত হতে থাকল, তারপর স্তিমিত হয়ে পড়ল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে শুধু বলল, 'ও শালা সব পারে, ওর কাছে খেলাটা কিছু নয়, যেনতেন করে জেতাটাই বড় কথা।'

ঘড়ি দেখে বললাম, 'আমার ট্রেনের সময় হয়ে গেছে, এবার কলকাতা ফিরব। মাঝে মাঝে এসে যদি গল্প করি, বিরক্ত হবেন না তো?'

'না, না, রোজ আসুন না, তা হলে তো বেঁচে যাই, সময় কাটতেই চায় না। বাড়ি থেকে রোজ রোজ বৌয়ের পক্ষে আসা তো সম্ভব নয়।'

চোখে মুখে কাতরতা ফুটে উঠতে দেখে, এই অমার্জিত কিন্তু সরল রাগী উদ্ধত লোকটির জন্য মায়া বোধ করলাম। ঘরের অন্য তিনজনের ভাবভঙ্গি দেখে বুঝলাম কেউই ওকে পছন্দ করে না। করার কথাও নয়। আমিও করতাম না। কিন্তু এমন একটা বন্য প্রাকৃতিক শক্তির বিচ্ছুরণ ওর কণ্ঠস্বর, হাত বা মাথানাড়া, চাহনি এবং মেজাজের দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঘটে যাচ্ছিল, যেটা আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় বোধ হল। বললাম, 'বইটই পড়তে চান তো এনে দিতে পারি?'

'বই!' কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে বলল, 'নাহ পড়তে—টড়তে ভাল লাগে না। তবে সেক্সের বই যদি আনতে পারেন,—অবশ্য এসব বই ছেলেদের পড়তে বারণই করি। ফুটবলারদের ভীষণ ক্ষতি করে, শরীর দুর্বল করে দেয়। একবার মোহনবাগানের সঙ্গে খেলার আগের দিন রাত্রে—' থেমে গিয়ে চোখ মেরে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়ে বলল, 'সকালে আর উঠতেই পারি না।'

'সেদিন খেলেছিলেন কেমন?'

'আরে খেলব কি, শুরু হবার দশ মিনিটের মধ্যেই তো ম্যাকব্রাইড আমায় মাঠ থেকে বার করে দিল। সামান্য পা চালিয়েছিলুম, অতি সামান্য, তেমন কিছু লাগেও নি। ফ্রি কিক দিয়েছে, বেশ ভাল কথা, কিন্তু সেই সঙ্গে মাঠ থেকে বারও করে দেওয়া?'

ওর গলায় প্রকৃত ক্ষোভ ফুটে উঠল। আমার দিকে যেভাবে তাকিয়ে, তাতে একটা কিছু মন্তব্য না করে উপায় নেই। বললাম, 'রেফারি বোধহয় নার্ভাস ছিল তাই বেশি কড়া হয়ে নিজেকে সামাল দিতে গিয়ে—'

'না না, ম্যাকব্রাইড খুব ভাল রেফারি, নার্ভাস হবার লোকই নয়। আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারি না কোন পর্যন্ত গেলে, বুঝলেন কোথায় নিজেকে আটকাতে হবে, একদমই জানি না। এতে আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমি অলিম্পিক যেতে পারলুম না শুধু এই জন্যেই। তেল দিতে পারি না, জিবের আড় নেই। কত্তাদের মুখের ওপরই যাচ্ছেতাই করে খিস্তি করতুম। ভাবতুম খেলা দেখিয়ে টিমে আসব, ব্যাটাদের পা চেটে ব্যাকডোর দিয়ে নয়।'

ধীরে ধীরে বিষণ্ণ হয়ে এল বিজন দত্তের কণ্ঠস্বর। চাহনিতে অনুশোচনায় আভাস দেখতে পেলাম। বললাম, 'তাইতো উচিত। পুরুষমানুষরা তো তাই করে। এতে আপনার বিবেক চিরদিন পরিষ্কার থাকবে, আপনি মাথা উঁচু করে চলতে পারবেন। আর রতন সরকারের মতো লোকেরা আপনাকে দেখে কেঁচো হয়ে যাবে।'

ওর মুখে চাপা সুখের আমেজ ফুটে উঠতে দেখলাম, সেই সঙ্গে চাপা রাগও। দাঁত চেপে বিড় বিড় করে বলল, 'বাঞ্চোতকে একবার পাই...এখান থেকে আগে ফিরি।'

ফেরার সময় ট্রেনে বসে হঠাৎ খেয়াল হল, সারাক্ষণ আমি দাঁড়িয়েই ওর সঙ্গে কথা বলেছি। বিজন দত্ত আমায় বসতে বলেনি। মনে হল, ভদ্রতার অভাব নয়, আসলে ও সৌজন্যের ব্যাপারটা একদমই জানে না।

মাঝেমাঝে যেতাম ওর কাছে। লক্ষ্য করলাম আমার জন্য বিজন দত্ত অপেক্ষা করে। বিছানা থেকে ওঠার অনুমতি পেয়েছে, বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে। স্যানাটোরিয়াম গেটের কাছে আমায় দেখলেই বারান্দা থেকে হাত নাড়ে। টুলটা টেনে বসামাত্রই শুরু হয় অনুযোগ, কেন দু—দিন আসিনি। আমাকে ওর ভাল লেগে গেছে। আমরা বারান্দায় গিয়ে বসতাম, ও গল্প করে যেত—কুড়ি—পঁচিশ বছর আগের কোনো একটি গোলের, খেলার, খেলোয়াড়দের, দারুণ কোনো জেতার কিংবা জোচ্চচুরির শিকার হয়ে হেরে যাওয়ার। ওর সমস্ত গল্পের মধ্যেই একটা কথা স্পষ্ট হয়ে উঠত—তুমি যেমন শক্ত ফুটবলও তেমনি শক্ত আর ফুটবল শক্ত যেহেতু, জীবনটাই শক্ত।

একদিন গিয়ে দেখি, বিজন দত্ত বিছানায় শুয়ে, তার সামনে টুলে বসে তাঁতের রঙিন শাড়ি পরা, শ্যামবর্ণ স্থূলকায়া এক মহিলা। মুখখানি গোলাকার, কপালে বড় সিঁদুর টিপ, গলায় ও ঘাড়ে পাউডার, হাতে শাঁখা ও লোহা ছাড়া কিছু প্লাস্টিক চুড়ির সঙ্গে একগাছি সোনার চুড়িও। বুঝলাম, এ বিজন দত্তর স্ত্রী। বেশি বয়সেই বিয়ে করেছে বিজন দত্ত। একটি মাত্র ছেলে, বছর দশেক বয়স। 'ব্যাটার পায়ে সট আছে, দু পায়েই।'—এর বেশি ছেলে সম্পর্কে কিছু বলেনি। স্ত্রী সম্পর্কে শুধু 'ভাগ্যিস খেলা ছেড়ে দেবার পর বিয়েটা করেছি নয়তো খেলা শিকেয় উঠত, যা মাল একখানা! বুঝলেন ভালবাসা—টাসা বলে কিছু আর আমাদের নেই। বিয়ে না করলে এসব বুঝবেন না।'

মহিলার মুখের বিরক্তি আর বিজন দত্তর হাত নেড়ে অসহায় ভঙ্গিতে তাকে বোঝানোর চেষ্টা দেখে মনে হল, ওরা বোধহয় ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপারের ফয়সালায় ব্যস্ত। আমাকে দেখতে পায়নি বিজন দত্ত। ওখান থেকেই আমি ফিরে গেলাম। পরদিন ওর সঙ্গে ঘণ্টাখানেক গল্প করলাম কিন্তু একবারও বলল না, কাল ওর স্ত্রী এসেছিল।

দিন চারেক পর, আমি টুলে বসে আছি, বিজন দত্ত বাথরুমে। দীর্ঘাঙ্গী এক বিধবা মহিলাকে ঘরের দরজার দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে দেখলাম। বয়স মনে হল পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। কাঁধে একটি থলি। চোখা নাকের দুপাশে দীর্ঘ চোখ। চাপা গলায় দরজার ধারের খাটে বইয়ে মগ্ন রোগীটিকে কি জিজ্ঞাসা করতেই সে আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে দিল। আমার কাছে এসে মহিলা মৃদুকণ্ঠে বলল, 'বিজন দত্ত কি এই বেডের?'

'হ্যাঁ, বাথরুমে গেছেন, আপনি বসুন।' টুল ছেড়ে আমি উঠে পড়লাম। অপরিচিতার সঙ্গে চুপচাপ বসে থাকা অস্বস্তিকর, তাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। মিনিট দুয়েক পরই বিজন দত্তর হর্ষোৎফুল্ল কণ্ঠ শুনলাম—'আরে মিনু!'

বারান্দা থেকে দেখতে পেলাম মহিলার চোখের সলজ্জ হাসিটুকু ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে ব্যাকুলতার দ্বারা গভীর হয়ে উঠল। ফিসফিস করে কি বলতেই বিজন দত্ত দুই ঊরুতে চাপড় দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'গোলি মারো তোমার অসুখকে। ফাইন আছি।' এরপর ওর কণ্ঠস্বর আর শুনতে পেলাম না। আড়চোখে মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখি নিচু গলায় কথা বলে যাচ্ছে অনর্গল, নিঃশব্দে হেসে উঠছে, এক সময় আপেল খেতে দেখলাম আর বিছানার উপর রাখা মহিলার হাতের আঙুলগুলোকে সন্তর্পণে তুলে চট করে চুমু খেতেও দেখলাম।

চলে যাবার জন্য আমি ঘরে ঢুকে ওকে বললাম, 'আজ চলি।'

আমার দিকে একবার তাকিয়ে, বিজন দত্ত এমন ভঙ্গিতে মাথাটা হেলিয়ে দিল যেন অনুমতি দিচ্ছে। ফেরার পথে ট্রেনে বসে আজই প্রথম ওর উপর বিরক্ত হলাম। দিন সাতেক আর স্যানাটোরিয়াম—মুখো হলাম না। স্কুল থেকে সোজা স্টেশনে চলে যাই। ওর স্ত্রীকে দুদিন দেখলাম ট্রেন থেকে নামতে। একদিন সঙ্গে ছেলেটিও ছিল। সেই বিধবা মহিলাকে দেখলাম, স্যানাটোরিয়ামের দিক থেকে সাইকেল রিকশায় স্টেশনে এল। টিকিট কিনে, প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। কলকাতা থেকে একটা ট্রেন এসে দাঁড়াতেই ঘোমটায় মুখ আড়াল দিল। একদিন ডা. বসুরায়ের কোয়ার্টারে গেলাম। তিনি ব্যস্ত ছিলেন কয়েকজন নিকট আত্মীয়কে নিয়ে। চলে আসছি, তখন আমায় বললেন, 'তোমার বন্ধু যে খোঁজ করছিল।' আমাকে অবাক হতে দেখে আবার বললেন, 'সেই ফুটবলার বিজন দত্ত। এখন তো ওকে বাইরে বেড়াবার পারমিশন দেওয়া হয়েছে।'

ডাক্তার ও কর্মচারীদের কোয়ার্টারগুলোর পিছনে একটা পুকুর, তার ধারেই এক চিলতে জমি। এখানকার বাচ্চা ছেলেরা তাতে ফুটবল খেলে। পুকুরের কিনারে সীমানা—পাঁচিলের খানিকটা ভাঙা আছে জানি। সেখান দিয়ে বেরোলে মিনিট খানেকের পথ কম হাঁটতে হয়। তাড়াতাড়ি স্টেশনে পৌঁছবার জন্য ওই দিকে যাচ্ছি, হঠাৎ ধমকানো গলার 'বাঁদিক কভার করো, বাঁ দিক' চিৎকার শুনে দেখি কালো হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে বিজন দত্ত, বল নিয়ে ধাবমান একটা বছর বারো বয়সি ছেলের পাশাপাশি ছুটছে আর হাত নেড়ে নিজের ডিফেন্ডারদের নির্দেশ দিচ্ছে। দেখেই আমি কাঁটা হয়ে গেলাম। একটা ধাক্কা দিলেই রোগা ছেলেটা লাট্টুর মতো পাক খেয়ে ছিটকে পড়বে।

বিজন দত্ত পা দিয়ে আঁকশির মতো বলটা টেনে নিয়ে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল। ছেলেটা কী করবে ভেবে না পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। 'দাঁড়িয়ে কেন, কেড়ে নাও আমার কাছ থেকে, কাম অন চার্জ মি।' ছেলেটি ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এসে বলে লাথি মারতে যেতেই বিজন দত্ত ঘুরে গিয়ে বলটাকে আড়াল করে দাঁড়াল। 'পুশ মি, জোরে, জোরে, আরও জোরে ধাক্কা দাও, ভয় কি ...নাঃ', হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে বলল, 'ভয় পেলে ফুটবল খেলা হবে না। যখন পারে না তখন পুরুষ মানুষ কি করে? হয় মারে নয় মরে। তুমি আমাকে মেরে বল কেড়ে নাও। ইজ্জতের খেলা ফুটবল, মরদের খেলা।'

ছেলেরা দাঁড়িয়ে হাঁ—করে ওর কথা শুনছে। এই সময় ও আমাকে দেখতে পেল। হাত তুলে অপেক্ষা করার ইঙ্গিত জানিয়ে, এগোতে এগোতে ছেলেদের বলল, 'এবার তোমরা খেলো। কিন্তু মনে থাকে যেন, যখনই খেলবে জান লড়িয়ে দিয়ে খেলবে।'

সারা মুখ পরিশ্রম ও উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে, হাপরের মতো ওঠানামা করছে বুক, সারা দেহের রোম ঘামে সেঁটে গেছে চামড়ার সঙ্গে। কাছে এসেই বিজন দত্ত বলল, 'পারলুম না আর। ঘাস দেখলে গরু মুখ না দিয়ে থাকতে পারে!'

'অন্যায়, আপনি খুবই অন্যায় করেছেন। এখনও পুরোপুরি সেরে উঠেননি, অথচ দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। যদি রিল্যাপস করে?'

আমার ধমকটা যেন বেশ ভালই লাগল ওর। হাত নেড়ে বলল, 'কিসসু হবে না। আমি সেরেই গেছি। কদিন আসেননি কেন, গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন বুঝি।'

'হ্যাঁ।'

আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হো হো করে হেসে উঠল বিজন দত্ত। পুকুরের সিমেন্ট বাঁধানো ঘাটে এসে আমরা বসলাম। একটা কুকুর চাতালে কুণ্ডুলী হয়ে ঘুমোচ্ছে। পুকুরের ওপারের ঘাটে কাপড় কাচছে দুজন স্ত্রীলোক। আকাশে মৃদু কোমল রৌদ্রের রেশ। বাতাস ধীরে বইছে। ঘাটের পাশে অজস্র হলুদ সন্ধ্যামণি ফুটে। বিজন দত্ত কপাল থেকে ঘাম চেঁছে ফেলে হাসল। বললাম, 'গার্ল ফেন্ডের সঙ্গে আপনার কেমন কাটছে?'

'আমার?' রীতিমতো অবাক হয়ে গেল। 'ও তো আমার বৌ!'

'উহুঁ, আর একজন।'

বিজন দত্ত এবার বিব্রত হল। উঠে গিয়ে একটা কঞ্চি কুড়িয়ে কুকুরটাকে খোঁচা দিল। 'ক্যাঁউ' করে উঠে কুকুরটা লেজ নাড়তে নাড়তে কয়েক হাত সরে গিয়ে আবার বসে পড়তেই বিজন দত্ত বাতাসে কয়েকবার জোরে কঞ্চিটা নাড়ল। কুকুরটা বোধহয় এসবে অভ্যস্ত। ভয় পেল না, শুধু অপেক্ষা করতে লাগল। বিজন দত্ত ফিরে এসে বসল। 'ওকে আমি বিয়ে করব বলেছিলুম। গোঁড়া বামুন পরিবারের মেয়ে, ওরা তো শুনেই ক্ষেপে গেল। আমি লেখাপড়া শিখিনি, চাকরি করি বলতে গেলে বেয়ারারই। তখন তো ফুটবলাররা দশ—পনেরো হাজার করে টাকা পেত না, গাড়িভাড়া ছাড়া একটা পয়সাও নয়, এখনকার মতো চাকরিও নয়।'

আকাশের আলো দিনের এই শেষবেলায় খুব তাড়াতাড়ি ম্লান হয়। বিজন দত্তকে শীর্ণ এবং অসহায় দেখাচ্ছে। আমি ওর পাংশু মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে না পেয়ে চোখ রাখলাম জলের উপর আবছা নারকেল গাছের ছায়ার উপর। বিষণ্ণ কণ্ঠে বিজন দত্ত আবার বলল, 'ওরা আমাদের পাড়ায়ই থাকত, এরপর উঠে চলে গেল। বলেছিল, আমায় নিয়ে পালিয়ে যাও। আমি রাজি হয়েও শেষপর্যন্ত কেমন ভয় পেয়ে গেলুম। আজও বুঝতে পারি না, কেন পেয়েছিলুম, কীসের ভয়।'

'আপনার স্ত্রী ওর কথা জানেন না?'

'আমি কিছু বলিনি, তবে আমাদের বাড়ির কিংবা আশেপাশের বাড়ির কারুর কাছ থেকে নিশ্চয় শুনে থাকবে।'

'এখানে যদি দুজনের মধ্যে দেখা হয়, তাহলে আপনি কী করবেন?' উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

হেসে উঠে বিজন দত্ত বলল, 'তাহলে ইসবেঙ্গল মোনবাগানের ম্যাচ দেখব।'

প্রসঙ্গটা আমি আর টানলাম না। বললাম, 'আর বোধহয় বেশিদিন এখানে আপনাকে থাকতে হবে না।'

'হ্যাঁ, টেম্পারেচার তো কদিন ধরেই অফ—সাইড করছে না। এভাবে বন্দি—জীবন আর ডাক্তারদের হুকুম মেনে আর চলতে পারছি না। মাঝে মাঝে ভাবি, এখানে আমি কী করছি? একদিনের জন্যও কখনো শরীর খারাপ হয়নি, একদিনের জন্যও নয়। হাসপাতালে গেছি শুধু কার্টিলেজ আর ভাঙা পায়ের জন্য, ব্যস।'

'এই অসুখটা বাধালেন কী করে?'

'কী করে। ডাক্তার বলেছিল বেশি খাটুনির জন্যই নাকি। অথচ পঁচিশ বছর ধরেই আমি এইভাবে খেটে আসছি। তাতে কি বলল জানেন? আপনি তো আর আগের মতো ছোকরা রয়ে নেই, বয়স যে বেড়েছে। ঠিক, কিন্তু আমি বুড়োও হইনি। হয়েছি কি?'

ওর দিকে তাকিয়ে সেই মুহূর্তে মনে হল, বিজন দত্ত নিজের চোখে বরাবরই তরুণ থেকে যাবে। বার্ধক্যকে স্বীকার করা ওর পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না। 'মাসখানেক বড়জোর, তারপরই ফিরে গিয়ে আবার শুরু করব ছেলেদের নিয়ে। ফাস ডিভিশানে সামনের বার উঠতেই হবে। পরশুর কাগজে দেখলুম আমরা সাত গোল খেয়েছি।'

শেষ বাক্যটি বলার সময় মনে হল, ওর মুখটা যন্ত্রণায় কালো হয়ে উঠল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সামলে নিয়ে বলল, 'আজকালকার ফ্যাশান হয়েছে হাফব্যাক উঠে গিয়ে গোল দিয়ে আসবে। আমি কখনো ওদের তা করতে দিই না। উঠতে পারে ঠিকই কিন্তু পাল্টা অ্যাটাক হলেই বাবুরা আর চটপট নামতে পারে না। বোধহয় তাই করেই গোল খেয়েছে। আমি থাকলে এটা হত না। একবার চারটে ম্যাচ আমি বসিয়ে রেখেছিলুম আমার স্টপারকে, কথা শোনেনি বলে।'

পরদিন আমি খানিকটা উত্তেজিত হয়েই হাজির হলাম। বিজন দত্ত তখন সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে। বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে। হ্যান্ডবিলটা ওর চোখের সামনে ধরে বললাম, 'এই দেখুন প্রদীপ সঙ্ঘ পরশু রোববার এখানে এক্সিবিশন ম্যাচ খেলবে লোকাল ইলেভেনের সঙ্গে।'

ক্ষুধার্তের মতো কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে গোগ্রাসে প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত পড়ে বিজন দত্ত বলল, 'আমি দেখতে যাব, মাঠটা কতদূরে? টিকিট ওখানে গিয়ে পাওয়া যাবে তো?'

'মাঠ প্রায় মাইল দেড়েক। কিন্তু অত দূর যাওয়া—আসার ধকল সহ্য করার মতো শরীর এখনও তো আপনার হয়নি!'

'আমার শরীরের ব্যাপার আমি বুঝব, তা নিয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না।' রুক্ষস্বরে বিজন দত্ত বলল, 'রতন নিশ্চয়ই আসবে ওর টিমের সঙ্গে। সকলের সামনে শালাকে অপমান করব।'

ঠিক সেই সময়ই বিধবা মহিলাটি ঘরে ঢুকল। আমার মুখে এসে যাওয়া কথাগুলিকে বহু কষ্টে চেপে রেখে উঠে দাঁড়ালাম। স্যানাটোরিয়াম গেট থেকে বেরিয়েই দেখি ছেলেকে নিয়ে বিজন দত্তর স্ত্রী আসছে। ওকে দেখে মনে মনে অদ্ভুত একটা উল্লাস বোধ করলাম। বাছাধন আজ মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ দেখুক! স্টেশনে এসে দেখি অনেকক্ষণ বসে থাকতে হবে কলকাতার ট্রেনের জন্য। বিধবা মহিলাটি আমার একটু পরেই স্টেশনে পৌঁছল। মুখ বিবর্ণ এবং বিরক্তি মাখানো। আমার দিকে একবার তাকিয়ে প্ল্যাটফর্ম—প্রান্তের বেঞ্চে গিয়ে বসল।

রবিবার ট্রেন থেকে নেমে সোজা মাঠে চলে গেলাম। আসতাম না। প্রদীপ সঙ্ঘ এমন কিছু নয়, যার খেলা দেখার জন্য ছুটির দিন কলকাতা থেকে ছুটে আসব। বস্তুত ফার্স্ট ডিভিশনে খেললেও কি ওদের জার্সির রঙ জানি না। কিন্তু মনে হল, বিজন দত্ত খেলা দেখতে আসবেই আর রতন সরকারের সঙ্গে কিছু একটা বাধবে। দুজনকে মুখোমুখি দেখার লোভেই বোধহয় এসেছি।

পৌঁছে দেখি প্রচণ্ড ভিড়। বাস রিকশা, গরুর গাড়ি, সাইকেলে, দূর গ্রাম থেকেও লোক এসেছে। মাঠটা টিন দিয়ে ঘেরা হয়েছে। প্রদীপ সঙ্ঘ উঠেছে মাঠের কাছেই এক ব্যবসায়ীর বাড়ি। সেখান থেকে হেঁটে আসবে। তারা যে গেট দিয়ে মাঠে ঢুকবে সেখানে অল্পবয়সিদের ভিড়। হঠাৎ চোখে পড়ল বিজন দত্ত সেই গেটের কিছুদূরে অধীরভাবে ঘোরাফেরা করছে। আমি কাছে গেলাম না। স্কুলের দুটি ছাত্র সিগারেট লুকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসতেই ভিড় থেকে দূরে সরে গেলাম।

প্রদীপ সঙ্ঘের খেলোয়াড়দের আসতেই হুড়োহুড়ি পড়ে গেল গেটের কাছে। দূর থেকেই দেখলাম, বেঁটে, কালো, কুতকুতে ধূর্তচোখ, মোটাসোটা একটি লোককে লক্ষ্য করে বিজন দত্ত এগোচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি ওর কাছাকাছি হবার চেষ্টা করলাম। ওদের প্রাথমিক কথা শুনতে পেলাম না। শুধু দেখলাম বিজন দত্ত অচঞ্চল শান্ত ভঙ্গিতে কী বলতেই, লোকটার মুখে অস্বস্তি ফুটল, কাঁধ ঝাঁকিয়ে পাশ কাটাবার চেষ্টা করছে। বিজন দত্ত পথরোধ করে দাঁড়াল। লোকটি বিরক্ত ও বিস্মিত হয়েও ঘনিষ্ঠ স্বরে বলল, 'তোর অসুখ হয়েছে শুনেছিলুম, এখন কেমন আছিস?'

'ভালই। তোকে দেখে আরও ভাল লাগছে।' বিজন দত্ত চারপাশের উদগ্রীব মুখগুলোর উপর মৃদু হেসে চোখ বোলাল। 'তারপর রতন এবারও কি টাকা দিয়ে ম্যাচ কিনে ফাস ডিভিশনে চ্যাম্পিয়ান হবার মতলব করেছিস নাকি?'

'তার মানে?' রতন সরকার তেরিয়া মেজাজে বললেও ওর চোখে ভীত ভাব দেখলাম।

'সেই কথাটা জিজ্ঞাসা করতেই তো এসেছি। খেলে তো সতেরোটা ম্যাচে সাত পয়েন্টও তোর টিম করতে পারত না। গড়ের মাঠে সবাই তোর কেরামতি জানে।'

'তুই এসব কি বলছিস, বিজন! পথ ছাড়।' রতন সরকার ব্যস্ততা দেখাল। ভিড়ের মধ্যে থেকে দু—একটা চাপা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য ওর উদ্দেশে ছোঁড়া হয়েছে। বিজন দত্ত চাপা খুশিতে আরও গলা চড়িয়ে বলে উঠল, 'এক মাঘে শীত পালায় না। সামনের বছরে আমরা ফাস ডিভিশানে যাবই আর—আর দেখব টেরিলিন প্যান্ট দোব, বেঙ্গল টিমে চান্স করে দোব, বৌকে হাসপাতালে ভর্তি করে দোব, এইসব করে কটা ম্যাচ জিততে পারিস।'

'প্রত্যেকটা ম্যাচই আমরা খেলে জিতেছি, ক্লিনলি অ্যান্ড অনেস্টলি' রতন সরকারও গলা চড়াল।

'হ্যাঁ, ঘুষ দিয়ে।'

'মুখ সামলে বিজন! তোর কোচিংয়ের কেরামতিতে দু—দুটো টিম ফার্স্ট ডিভিশান থেকে নেমেছে; কোথাও পাত্তা না পেয়ে তাই সেকেন্ড ডিভিশানের টিম ধরেছিস। এখন নিজের মুখ রক্ষার জন্যে অন্যের গায়ে কাদা না ছিটোলে বাঁচবি কি করে, বল!'

বিজন দত্তকে দেখে আমার মনে হল এইবার ও রতন সরকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। মুখ সাদা হয়ে গেছে। ঠকঠক করে কাঁপছে। এই উত্তেজনা ওর অসুস্থতার পক্ষে ক্ষতিকর। এইবার আমি ওর হাত চেপে ধরলাম। ঝটকা দিয়ে আমার হাত ছাড়িয়ে নিল।

রতন সরকার তখন অতি দ্রুত গেট অতিক্রম করে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে দেখে হাঁফ ছেড়ে বললাম, 'চলুন, এইবার খেলা শুরু হবে।'

'না, দেখতে হয় আপনি যান। আমি ফিরে যাব এখন।' একটু আগের উত্তেজিত সেই উচ্চচস্বর অবসাদে স্তিমিত। চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় হল। অদ্ভুত এক শূন্যতা ভেসে উঠেছে দুই চোখে। চতুর্দিকে জনতা ও কোলাহল ওকে যেন স্পর্শ করছে না।

ওকে সাইকেল রিকশায় তুলে স্যানাটোরিয়ামে ফেরার পথে জিজ্ঞাসা করলাম, 'ডাক্তারকে বলে এসেছেন তো?'

শিথিলভাবে পিছনে হেলান দিয়ে বিজন দত্ত মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলল, 'ডাক্তারবাবু রাজি হয়নি। বলেছিল, যদি প্লুরুসি বাধাতে চান তাহলে যেতে পারেন। আমি লুকিয়ে এসেছি। অনেকটা হাঁটতে হয়েছে।'

বলতে বলতে বিজন দত্ত কাশতে শুরু করল। কাশি থামার পর লক্ষ্য করলাম শ্বাস—প্রশ্বাস ভারি হয়ে উঠেছে। শরীরটা কুঁকড়ে, রিকশার হাতল চেপে ধরে ক্রমশ ওর মাথাটা বুকের কাছে নেমে আসতেই প্রাণপণে তুলে ফ্যাকাসে মুখে বলল, 'বয়সটা যদি আপনার মতো হত।' তারপর সারাপথে আর একটিও কথা বলেনি।

পরদিন গিয়ে শুনলাম, রাত্রি থেকেই ওর দেহতাপ একশোয়। কাশির ধমকে ঘরের বাকি তিনজনের ঘুম কয়েকবার ভেঙে গেছিল। ডাক্তারবাবু ক্রুদ্ধস্বরে জানিয়েছেন, প্লুরিসি হলে তিনি মোটেই অবাক হবেন না।

'ডাক্তারবাবুর কথা শুনলে ভালই করতুম। এইসব রোগ নিয়ে খেলা করাটা উচিত হয়নি। রতনটাই হয়তো শেষপর্যন্ত জিতে যাবে, আমার বোকামির জন্য। এই রকম মাথা গরম করার জন্যই আমার কিছু হল না।' বিজন দত্ত মাথাটা কাত করে বাইরে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর বলল, 'দুটি টিম আমার জন্যই নেমে গেল এ কথাটা কিন্তু পুরো সত্যি নয়। একটা ছেলেও খেলতে জানে না, একজনেরও ফুটবল সেন্স নেই। আমি একা আর কতটা সামাল দিতে পারি!'

ডা. বসুরায়ের কাছে খোঁজ নিলাম। স্পুটাম পরীক্ষা করে পজিটিভ হয়েছে। বিজন দত্তর খিদে কমে গেছে, চোখ দুটি ক্রমশ বসে যাচ্ছে, ওজন দ্রুত কমছে। ওর স্ত্রী এখন রোজই আসছে। বিষণ্ণ মুখে বসে থাকে আর চাপাস্বরে মাঝে মাঝে বলে, 'তোমার সেদিন যাওয়া উচিত হয়নি। তুমি জানতে এতে তোমার ক্ষতি হবে।' ইতিপূর্বে বিজন দত্তর মুখে 'এ. পি', 'পি, পি,' 'রিফিল', 'পি. এ. এস', 'থোরা' প্রভৃতি শব্দগুলি কখনো শুনিনি। এগুলির উল্লেখ না করে সে যেন তার রোগের অস্তিত্বকে উপেক্ষা করত। কিন্তু এখন তার মুখে মাঝে মাঝে অসুখের কথা শুনতে পাই। কথা কম বলে। একদিন স্কুল যাবার পথে সকালে, বিধবা মহিলাটিকে দেখলাম, শুকনো মুখে হেঁটে চলেছে স্যানাটোরিয়ামের দিকে। সেদিন বিকেলে হাসতে হাসতে বিজন দত্তকে বললাম, 'ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচের রেজাল্ট কী হল?' শুনেই ওর মুখে চাপা হাসি খেলে গেল। চোখ মেরে বলল, 'ম্যাচ পোসপন। ওরা এ মাঠে খেলতে রাজি নয়।'

নানান দাবিতে তখন বাংলাদেশে শিক্ষক আন্দোলনের প্রস্তুতি চলেছে। আমিও সংগঠনের কাজে জড়িত। অবস্থান ধর্মঘট হবে রাজ্যপাল ভবনের সামনে। পরপর কয়দিন বিজন দত্তকে দেখতে যেতে পারিনি। একদিন গিয়ে দেখি ওকে অন্য একটি ঘরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেখা করা নিষেধ। ডা. বসুরায় বললেন, 'উই আর গোয়িং টু কোল্যাপস দ্য আদার লাং।'

দিন চারেক পর আবার গেলাম, দুপুরে। এক মিনিটের জন্য দেখা করার অনুমতি পেলাম, কথা বলা বারণ। বিজন দত্ত চিৎ হয়ে একদৃষ্টে সিলিংয়ে তাকিয়ে। গাল দুটি বসে গেছে। একদা যে বিপুল শক্তি এই দেহ ধারণ করত তার ধ্বংসাবশেষ মাত্র অবশিষ্ট।

'কী খবর?' ফ্যাসফ্যাসে স্বরে বিজন দত্ত বলল।

'কথা বলবেন না।' নার্স ছোট্ট করে ধমক দিল। হাত তুলে ওকে ব্যস্ত না হবার ইঙ্গিত করে বিজন দত্ত আমাকে বলল, 'পুকুরধারে ওরা রোজ খেলে?'

জানি না খেলে কি না, তবু ওকে খুশি করার জন্য বললাম, 'রোজই খেলে।'

'ওদের মধ্যে একটা ছেলে আছে দেখবেন, দারুণ ফুটবল সেন্স।'

নার্স এবার বলল, 'আপনি বাইরে যান, নয়তো উনি কথা বলে যাবেন।'

আমি যাবার জন্য ঘুরেছি, শুনলাম টেনে টেনে বলছে, 'ভেবেছি ওই ছেলেটাকে তৈরি করব।'

স্টেশনের পথে হেঁটে যেতে যেতে, ওর কথাই ভাবলাম। চোখে বারবার ভেসে উঠল, একা ঘরে প্রাচীন ভগ্নস্তূপের মতো পড়ে থাকা দেহটিকে, শীর্ণ হাতটির ধীরগতি উত্তোলন ভঙ্গি, নিশ্বাস নিতে নিতে দমবন্ধ করে কথা বলা। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না ওর সেই বন্য প্রাণশক্তি, যার ফলে ওকে দুর্ভেদ্য মনে হত, মৃত্যু সেখানে ফাটল ধরিয়েছে কিনা।

দিন পাঁচেক পর, বিকেলে স্যানাটোরিয়ামের দিকে যাচ্ছি। শরতের বিকেলের আকাশ ঘন নীল, বহুদূর পর্যন্ত তার উজ্জ্বলতা ব্যাপ্ত। নিকটের একটি বাড়ি থেকে কোমল নারীকণ্ঠের সংগীতের সুর ভেসে এল। মন্থর গতিতে মোড় ফিরলাম। এবার সোজা রাস্তা। স্যানাটোরিয়ামের গেট দেখতে পাচ্ছি। হঠাৎ চোখে পড়ল গেট থেকে সেই বিধবা মহিলা বেরোচ্ছেন বিজন দত্তর ছেলের হাত ধরে, তাঁর পিছনে দত্তর স্ত্রী ক্লান্ত পায়ে আসছে।

তখন আমি জানলাম, ও এবার মারা যাবে।

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%