কালপ্রিট

মতি নন্দী

গুরুদাস ঘোষের টেবলে বেয়ারা যখন খামটা রেখে গেল, তখন সে পে—শিটের উপর হুমড়ি খেয়ে প্রায় সাড়ে তিনশো লোকের বেতনের হিসাব কষায় ব্যস্ত। এক সময় খামটায় চোখ পড়তে, অবাক হয়ে সে ভাবল, আমাকে আবার কে লিখল। অফিসের ঠিকানায় ব্যক্তিগত চিঠি তার সাত বছরের চাকরিতে এই প্রথম।

খাম ছিঁড়ে এক চিলতে কাগজ পেল গুরুদাস। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—''যতবার তোমার দিকে তাকাই, কেন জানি, তোমাকে ভীষণ নিঃসঙ্গ মনে হয়। মাঝে মাঝে যখন অন্যমনস্ক হয়ে জানলার বাইরে তাকাও তখন কেমন একটা চাপা দুঃখ তোমার চাহনিতে ফুটে ওঠে। তাই দেখে আমার মন বিষণ্ণতায় ভরে যায়। বোধহয় তোমার মতো আমারও কোনো দুঃখ আছে। তাই কি তোমায় জানতে আমার এত ইচ্ছে করে?'' লেখার নিচে স্বাক্ষর, ঠিকানা বা তারিখ নেই।

গুরুদাস সুদক্ষ কর্মঠ করণিক। ওর কাজে ও ব্যবহারে কর্তৃপক্ষ থেকে দারোয়ান পর্যন্ত সবাই সন্তুষ্ট। দিনে পাঁচটি সিগারেট খায়, রাত্রে ছাদে কুড়িটি ডন ও পঞ্চাশটি বৈঠক দেয়। ট্রামে সেকেন্ড ক্লাসে ছাড়া ওঠে না, এক বছর আগে বাবা—মায়ের মনোনীত মেয়েটিকে বিয়ে করেছে। নেতাজির প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে প্রগাঢ় আশাবাদী। সুতরাং চিঠিটিকে সে ক্ষণিকের জন্য ঝাপসা দেখবে এবং চারপাশের চাপা গুঞ্জন, জমাট একটা বিস্ময়ধ্বনির মতো আঘাত করে তার মাথার মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, এ কথা বলাই বাহুল্য। সামনের তেত্রিশ জন কেরানি, বেয়ারা ও আটজন অফিসারের দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে গুরুদাস একবার থরথরিয়ে কেঁপে নিজেকে বলল, 'কেউ পেছনে লেগেছে আর কি! নয়তো আমাকে লেখা কেন?'

অতঃপর গুরুদাস ভাবল, মেয়েলি হাতে লেখা এই চিঠিটা অবশ্যই প্রেমপত্র এবং খামটা ভুল করে তার কাছে এসেছে। কিন্তু ঠিকানায় ইংরাজিতে স্পষ্ট তারই নাম। জি—পি—ও থেকে পোস্ট করা। সেকশানের নামেও কোনো ভুল নেই। তখন ভাবল, নামের আদ্যাক্ষর 'জি' দিয়ে এমন কেউ মেটাল সেকশানে আছে কিনা। হয়তো তার নাম লিখতে ভুল করে গুরুদাসের নাম লিখে ফেলেছে। মনে করে দেখল একমাত্র মুখুজ্যে ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু তিনি দেড় বছর পরই রিটায়ার করবেন। জ্ঞানবাবুর চাপা দুঃখ জানার জন্য উৎসুক কোনো স্ত্রীলোক আছে, গুরুদাস কোনোক্রমেই তা বিশ্বাস করতে পারল না। এরপর সে তার সেকশানে 'ঘোষ' পদবিযুক্ত মাত্র একজনকেই খুঁজে পেল। প্রদীপ, যার কাছে এক গ্লাস জল চাইলে দশ মিনিটের এবং সিগারেট আনতে দিলে পনেরো মিনিটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। প্রদীপের ভিতরে নিঃসঙ্গতা বলে যদি কিছু থাকে, গুরুদাস ভেবে দেখল, তাহলে চাঁদেও জীবন আছে।

এটা আমাকেই লেখা এবং এখানকারই কোনো মেয়ে আমাকে নাচাবার জন্য লিখেছে, গুরুদাস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে, চটে উঠে কিছুক্ষণ কাজ বন্ধ করে রইল। সেই সময় তার মনে একটি প্রতিজ্ঞা খুবই ধারালো হতে হতে তাকে শেষ পর্যন্ত বিঁধে ফেলল। সে ঠিক করল—দুষ্কৃতকারীকে বার করবে এবং শাস্তি দেবে।

এই উদ্দেশ্যে প্রথমে সে হাতের লেখাটিকে মন দিয়ে নিরীক্ষণ করল। তেত্রিশ জন কেরানির মধ্যে এগারো জন মেয়ে। এই এগারো জনের কেউ বা কয়েকজন মিলেই যে কাজটা করেছে, গুরুদাসের তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এগারো জন বসেছে ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে। সে একে একে প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে ছয়জনকে খারিজ করে দিল সঙ্গে সঙ্গে। এদের দুজনের বিয়ে হয়েছে গত চার মাসের মধ্যে। একজনের স্বামী গুরুদাসের পিছনেই বসে। নিঃসঙ্গতা বা চাপা দুঃখ নিয়ে মাথা ঘামাবার অবসর ওদের কারুরই নেই। আর একজন প্রতিদিনই স্বামী পুত্র—কন্যা বাস কন্ডাক্টর গৃহশিক্ষক পুরোহিত বড়বাবু ঠিকেঝি এবং গবরমেনটের কাজের বিভিন্ন গলদ ও ফাঁকির তালিকা পেশ করাতে এত আনন্দ পায় যে, গুরুদাস ভেবে পেল না চাপা দুঃখ বা নিঃসঙ্গতায় এই মহিলা আদৌ পীড়িত হবার যোগ্য কিনা। আর একজন চারতলার প্রভিডেন্ট ফান্ড সেকশানের লম্বা ঝুলফিওলা কৃশকায় এক যুবকের স্মার্ট চলনে বলনে সম্প্রতি বুঁদ হয়ে রয়েছে। দুজনে ছুটির পর গড়ের মাঠে হাওয়া খায়। একেও সে সন্দেহ থেকে বাদ দিয়েছে। আর দুজনের মধ্যে একজন চতুর্থবার অন্তঃসত্ত্বা (সাত মাস) সুতরাং গুরুদাসের নিঃসঙ্গতা নিয়ে এর মন কেমন করার উপায় নেই। অন্যজন পাশের টেবলেই। চর্বির চাপে পিঠের কাছে ব্লাউজটা বেলুনের মতো ফুলো। বছর দুয়েক আগে গুরুদাস ওকে নিয়মিত ব্যায়াম করার পরামর্শ দিয়েছিল। তারপর থেকে বাক্যালাপ বন্ধ। তবে মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত প্রয়োজনীয় বাক্য বিনিময় ঘটে, রুক্ষস্বরে।

বাকি পাঁচজন সম্পর্কে পরে তদন্ত করবে ঠিক করে খামটি ড্রয়ারে রেখে দিয়ে গুরুদাস হাতের কাজ সারায় নিজেকে নিযুক্ত করল। ছুটির পর বাড়ি ফেরার জন্য বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার কালে ওর মাথায় একটা মতলব খেলে গেল। ওই পাঁচজনের বাংলা হাতের লেখা পরখ করে দেখলে কেমন হয়। বিশেষ করে নিঃসঙ্গতা আর চাপা দুঃখ এই শব্দগুলোকে চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে নিলেই বোঝা যাবে। হাতের লেখার টান—টোনগুলো তো আর চেপে রাখা যাবে না।

বাড়ি ফিরে গুরুদাস স্নান করল, তারপর কয়লার দোকানে গিয়ে এক মন কয়লা পৌঁছে দিয়ে আসতে বলে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পালটাল। একটা মোটা ঐতিহাসিক উপন্যাস পেয়ে সে খুবই খুশি হয়ে রেস্টুরেন্টে এককাপ চা খেল, ফুটপাতের দোকানির কাছে কাপ—ডিশ এবং সায়া দর করল, সিনেমা বাড়ির বাইরে টাঙানো ছবিগুলো খুঁটিয়ে দেখে, বাবার জন্য পাঁউরুটি ও বৌয়ের জন্য দুটি মিঠে পান কিনে লন্ড্রি থেকে কাচা ধুতি পাঞ্জাবি নিয়ে বাড়ি ফিরেই ছাদে উঠে প্রাত্যহিক ব্যায়াম সেরে সে উপন্যাস পড়তে শুরু করল। এই সময় যখনই ওর স্ত্রী কোনো কাজে ঘরে আসছিল, গুরুদাস বই থেকে আড়চোখে তাকাল ঈষৎ মুগ্ধ চাহনিতে। সবাই বলে বৌ খুব সুন্দরী। গুরুদাস তাই স্ত্রীকে খুব ভালবাসে। কাল রাতেও গা ছুঁয়ে দিব্যি করেছে ও মরে গেলে আবার সে বিয়ে করবে না। স্ত্রীর কাছে কিছুই সে গোপন করে না কিন্তু আজ অফিসে পাওয়া চিঠিটির কথা বলতে পারল না। ওর মনে হল এটা না বললে দোষের কিছু নেই। বললে অহেতুক সন্দেহের বীজ বপন করা হবে।

রাত্রির দ্বিতীয় যামে গুরুদাস তার স্ত্রীকে বিশ্রাম দিয়ে গভীর নিদ্রার পর ভোরে উঠে বাজার সেরে খবরের কাগজ পড়ে দাড়ি কামিয়ে ফেলল এবং ঠিক দশটায় অফিস পৌঁছল। মিনিট পনেরো পর সে অঞ্জনা আচার্যের টেবিলে গিয়ে বলল, ''আমার খুড়তুতো ভাই কাল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিল। মিনিস্ট্রি অব ইনফরমেশন চাকরি। অনেক রকমের প্রশ্ন দিয়েছিল তার মধ্যে একটা ছিল বানান শুদ্ধ করে লেখা। প্রশ্নটা টুকে এনেছি। গুরুদাস একটা কাগজ রাখল অঞ্জনার সামনে। পারেন এটাকে শুদ্ধ করে লিখে দিতে। আমি পেরেছি তবে অভিধান দেখে।'' অঞ্জনার কৌতূহল কুঞ্চিত ভ্রূ ধীরে ধীরে পূর্বের সমতায় প্রত্যাবর্তন করল চার লাইনের লেখাটি পাঠ শেষে। ''এ আর এমন কি শক্ত, ক্লাস সিক্সের মেয়েও পারবে। নিঃসহায়—এ দীর্ঘ ঈ হবে না সঙ্গবিহীন—এ প্রথমটা হ্রস্ব ই, পরেরটা—''

''না না মুখে বললে হবে না লিখে দেখান, মুখে অনেকেরই কারেক্ট হয় লিখতে গেলেই দেখা যাবে ভুল করেছে। গুরুদাস একটা কাগজ অঞ্জনার সামনে রেখে কলম এগিয়ে ধরল। অতি অবহেলায় অঞ্জনা ঘসঘস করে নির্ভুল বানানে লাইন চারটি লিখে দিল। গুরুদাস তারিফভরা চাহনিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ''বাঃ প্রত্যেকটাই কারেক্ট হয়েছে। আমার এক বন্ধু খবরের কাগজের রিপোর্টার তাকেও দিয়েছিলাম এটা।''

''নিশ্চয় পারেনি।'' অঞ্জনা নিশ্চিন্ত স্বরে বলল।

''না না পেরেছে। শুধু দুঃখেতে একটা য—ফলা লাগিয়ে ফেলেছিল পরে অবশ্য নিজেই কেটে দেয়।''

গুরুদাস এর পর লক্ষ্মী বসাক কল্পনা চক্রবর্তী অরুন্ধতী চৌধুরী আর প্রীতি দাশগুপ্তকে দিয়েও লিখিয়ে নিল একই কথা বলে। নিজের চেয়ারে বসে পাঁচটি লেখার সঙ্গে আসলটির হাতের লেখা মিলিয়ে দেখতে গিয়ে সে হতভম্ব হয়ে গেল। নিঃসঙ্গতা বা চাপা দুঃখ বা ইচ্ছে ইত্যাদি শব্দগুলো পাঁচজনের লেখাতে হুবহু আসলটির ভঙ্গিতেই ফুটে রয়েছে। মনে হচ্ছে যেন একজনের হাতেই সব ক'টি লেখা। এটা কি করে সম্ভব হয়। ভেবে ভেবে কিনারা পেল না গুরুদাস। শুধু ছমছম করে উঠল একবার বুকটা আর রাগ হল। কেউ একজন নিশ্চয় তাকে নিয়ে খেলতে চাইছে আড়াল থেকে মজা দেখবে বলে। 'আমি কি এমনই যে এইভাবে মজা করা যায়?' —সে বারংবার নিজেকে প্রশ্ন করল।

অতঃপর গুরুদাস স্থির করল সেও পালটা খেলবে। তবে আগে খুঁজে বার করতে হবে পত্রলেখিকাটিকে। এজন্য আর একটা চিঠি পাওয়া দরকার নয়তো কোনো ক্লু পাওয়া যাবে না। তাই টোপ হিসাবে সে জানলার বাইরে অন্যমনস্কের মতো তাকিয়ে থাকতে শুরু করল এবং নিঃসঙ্গতা ও চাপা দুঃখ যাতে তার চাহনিতে ফুটে উঠে সেজন্য খুবই যত্নবান হল। এই সময় সে মনে মনে দেখত—একজন পুরুষের সঙ্গে তার স্ত্রী পালিয়ে যাচ্ছে বা রিটায়ারমেন্টের নোটিস টেবলের উপর পারসোনেল সেকশানের বেয়ারা রেখে গেল বা ঠাকুমাকে মনে করার চেষ্টা করত, যিনি কুড়ি বছর আগে বলেছিলেন—গুরুর যা মাথা, হাইকোর্টের জজ হবে।

কিন্তু দিনদশেক পর কোনো চিঠি না পেয়ে গুরুদাস হাল ছেড়ে দিল। ভেবে দেখল, যদি তাকে নাচাবার উদ্দেশ্যেই কেউ লিখে থাকে তাহলে তো একটা চিঠি লিখেই বন্ধ করে দেওয়ার কথা নয়। আর যতদিন না ব্যাপারটার কোনো কিনারা করতে পারছে অদ্ভুত একটা ভার তার মনের উপর চেপে থাকবেই। যদি সিরিয়াসলিই কেউ লিখে থাকে।

গুরুদাস ক্রমশ হাঁফিয়ে উঠতে শুরু করল, ব্যাপার কি, একটা লিখেই বন্ধ করে দিল কেন? অবশেষে বেপরোয়া হয়ে স্থির করল, সন্দেহজনক পাঁচজনকে সে ঠিক ওই কথাগুলো দিয়ে ওইভাবেই নাম—ঠিকানাবিহীন চিঠি দেবে। পরদিনই বাজার থেকে ফেরার পথে পাঁচটি খাম কিনল এবং অফিসে বসে পাঁচটি চিঠি লিখে টিফিনের সময় নিজ হাতে রাস্তার ডাকবাকসে ফেলে এল।

পরদিন সে উদগ্রীব হয়ে ক্রমাগত পাঁচজনের ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করে যেতে লাগল।

বেয়ারা চিঠি বিলি করছে। ওই পাঁচজনের কোনো চিঠি আসেনি। তাহলে কাল ডেলিভারি হবে, এই ভাবে গুরুদাস কাজে মন দিল। পরের দিন দূর থেকেই সে বেয়ারার হাতে খামগুলো চিনতে পারল। দুজন তার দিকে মুখ করে বসে বাকি তিনজনের পিঠ সে দেখতে পাচ্ছে। বেয়ারা ওদের টেবলে খামগুলো রেখে যাচ্ছে। উত্তেজনায় গুরুদাসের মাথা ঝিমঝিম করছে, কিছুটা ঝাপসাও দেখতে শুরু করল। মাথায় জল দেবার জন্য সে প্রায় ছুটে গেল ওয়াটার কুলারের দিকে।

মেঝের দিকে তাকিয়ে সে চেয়ারে ফিরে এল এবং ভীষণ অনুতপ্ত দুটি চোখ তুলে দেখল লক্ষ্মী বসাক থমথমে মুখে চিঠিটা সামনের বিজন ঘোষের হাত তুলে দিচ্ছে। কল্পনা চক্রবর্তী দিশাহারার মতো চার ধারে তাকাচ্ছে আর ক্রমশ ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। অরুন্ধতী, প্রীতি আর অঞ্জনার পিঠগুলো কাঠের মতো।

এ—টেবল থেকে ও—টেবল এবং পনেরো মিনিটের মধ্যেই তেত্রিশজন কেরানি, বেয়ারা ও আটজন অফিসার ধিক্কার দিয়ে, লজ্জা পেয়ে এবং ক্রোধে অশান্ত হয়ে অপরাধীকে খুঁজে বার করতে উদ্যোগী হল। গুরুদাসকে তার পাশের সহকর্মী বলল, ''শুনেছেন ব্যাপার? কেলেঙ্কারি, রীতিমতো কেলেঙ্কারি। পাগল ছাড়া আর কেউ এ কাজ করতে পারে না।'' তারপর গলা নামিয়ে বলল, ''আমার মনে হয় ব্যাচেলার কোনো ছোকরার কাজ, আপনি কি বলেন?''

গুরুদাস বলল, ''হতে পারে। কিন্তু ম্যারেডদের মধ্যে থেকেই যে কেউ লেখেনি, তাই বা বলি কী করে।''

''ম্যারেডরা কেন লিখতে যাবে, তাদের কী প্রয়োজন? আপনিও তো ম্যারেড তাই বলে কি এরকম কাজ আপনি করতে যাবেন না আমি করতে যাব? তাহলে বিয়ে করা কেন?''

''হয়তো মজা করার জন্য কিংবা নিঃসঙ্গ বোধ করে কেউ লিখেছে।''

''তাহলে একজনকে লিখবে, চারজনকে সে লিখতে যাবে না।''

গুরুদাস প্রচণ্ড বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলল, ''চারজন। সে কী, পাঁচজন নয়?''

''লক্ষ্মী বসাক কল্পনা চক্রবর্তী অরুন্ধতী চৌধুরী আর অঞ্জনা আচার্য এই চারজনই পেয়েছে। চারটে চিঠিই একই হাতের লেখা।''

গুরুদাসের অনিবার্যভাবেই প্রীতি দাশগুপ্তের পিঠের উপর নজর পড়ল। কুঁজো দেহটি আরও কুঁজো করে প্রীতি একমনে কাজ করছে। সরু কাঁধের উপর হাড় দুটো পেরেকের মাথার মতো ঠেলে উঠেছে। ঘাড় থেকে মেরুদণ্ড বরাবর পেরেক যেন নেমে গেছে ব্লাউজের মধ্যে। কনুইয়ে পোড়া রবারের মতো চামড়া। একমুঠো খোঁপা তেকোণা গড়নের মাথাটিতে আটকানো। গুরুদাস চোখ সরিয়ে কাজে মন দেবার চেষ্টা করল।

ঘণ্টাখানেক পর তার টেবলের সামনে তিনজন পুরুষ সহকর্মী এসে দাঁড়াল। ''গুরুদাসবাবু, এইটে কপি করে দিন। আমরা একটা কমিটি করেছি কালপ্রিটকে খুঁজে বার করার জন্য। সকলকে দিয়েই কপি করাচ্ছি, বেয়ারা বা অফিসাররাও বাদ যাবে না। আমরা হাতের লেখা মিলিয়ে দেখব দরকার হলে এক্সপার্টের কাছে যাব। এ রকম পারভারশান কোনোক্রমেই টলারেট করা যায় না। আমাদের সকলেরই লজ্জার কারণ হয়েছে ব্যাপারটা, তাই আমরা সন্দেহের মধ্যে থাকতে চাই না।''

গুরুদাস বিনা বাক্যব্যয়ে চিঠিটি দ্রুত কপি করে দিল। একটুও হাত কাঁপাল না। ছুটি হবার আধঘণ্টা আগে চাপা উত্তেজনা টেবলে—টেবলে ছড়িয়ে পড়ল। অনেকে দোতলায় সহকারী জেনারেল ম্যানেজারের ঘরের দিকে ছুটে গেল। ওই ঘরে বসেই হাতের লেখা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। অবশেষে গুরুদাসের সহকর্মীটি হাঁফাতে হাঁফাতে ফিরে এসে চাপা স্বরে বলল, ''পাওয়া গেছে, কালপ্রিট ধরা পড়েছে। হুবহু মিলে গেছে হাতের লেখা। এইবার ওরা আসবে!''

গুরুদাস চেয়ারে সিধে হয়ে বসল। টেবলের ফাইলগুলো গুছিয়ে জলের গ্লাস পিনকুশন এবং লাল—নীল পেন্সিলটা ড্রয়ারে রেখে রুমালে মুখ মুছে প্রস্তুত হল। এখন আর তার ভিতরে কোনো কম্পন নেই, পাথরের মতো জমাট হয়ে গেছে। সরু কাঁধ থেকে ঠেলে ওঠা দুটো হাড়ের মাঝখানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সে অপেক্ষা করতে লাগল।

কমিটির তিনজন লোককে দেখামাত্র দপ করে স্তব্ধ হয়ে গেল বিরাট ঘরটা। তারা একবার সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে গম্ভীর মুখে এগোল। গুরুদাসের টেবল অতিক্রম করে তারা লঘু পায়ে জ্ঞান মুখুজ্যের সামনে এসে দাঁড়াল। চাপা বিস্ময়ধ্বনি বৃদ্ধের মুখ থেকে বেরোনো মাত্র গুরুদাসের সহকর্মী নিচুগলায় বলল, ''জ্ঞানবাবুকে ম্যারেড বলা উচিত হবে না, পনেরো বছর আগে ওর বৌ মরে গেছে। বেঁচে থাকলে, এ ধরনের কাজ নিশ্চয় উনি করতেন না।''

কমিটির লোকেরা ফিসফিস করে জ্ঞানবাবুকে কিছু বলল, তারপর বিমূঢ় বৃদ্ধকে সঙ্গে নিয়ে তারা দোতলায় উঠে গেল। সহকর্মীটি গুরুদাসকে বলল, ''লাইফের এই পিরিয়ডটাতেই অনেকে সামলাতে পারে না। জ্ঞানবাবু ছাড়া নাকি আর কারোই হাতের লেখার সঙ্গে মেলেনি!'' গুরুদাস অস্ফুটে বলল, ''কিন্তু উনি কি খুব নিঃসঙ্গ?''

ছুটির পর গুরুদাস ট্রামস্টপে দাঁড়িয়ে দেখল প্রীতি দাশগুপ্ত কুঁজো হয়ে সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। তাকে দেখে গভীর বিষণ্ণ চাহনি মেলে একবার শুধু হাসল। গুরুদাস তখন নিজেকে বলল, 'আমরা কেউ একজন ঠকলাম।'

সকল অধ্যায়
১.
ছাদ
২.
একটি ঐতিহাসিক সিচ্যুয়েশন
৩.
শূন্যে অন্তরীণ
৪.
রাস্তা
৫.
জীবনযাপন প্রণালী
৬.
পাষাণভার
৭.
শেষবিকেলের দুটি মুখ
৮.
একটি পিকনিকের অপমৃত্যু
৯.
শহরে আসা
১০.
বয়সোচিত
১১.
প্রত্যাবর্তন
১২.
গুণ্ডাদ্বয়
১৩.
বেহুলার ভেলা
১৪.
টুপু কখন আসবে
১৫.
বহুদূর ব্যাপ্ত উজ্জ্বলতা
১৬.
উৎসবের ছায়ায়
১৭.
সুখী জীবন লাভের উপায়
১৮.
দুর্ঘটনা
১৯.
ঘর
২০.
এবং তারা ফিরে এল
২১.
কালপ্রিট
২২.
অস্থায়ী পলায়ন
২৩.
ষড়যন্ত্র
২৪.
রাজা
২৫.
সূর্যাস্তের প্রতিবিম্ব
২৬.
চোরা ঢেউ
২৭.
তাপের শীর্ষে
২৮.
নিরর্থক
২৯.
কামরার মধ্যে
৩০.
শীত
৩১.
সেই আবছা মুখগুলো
৩২.
ইমেজ
৩৩.
দু'ভাগে
৩৪.
নিজেকে যে—সব প্রশ্ন
৩৫.
আত্মভুক
৩৬.
একটি সাধারণ ব্যাপার
৩৭.
এক ধরনের অসুখ
৩৮.
নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান
৩৯.
একচক্ষু
৪০.
সামান্য জীবন
৪১.
চতুর্থ সীমানা
৪২.
ব্লেজার
৪৩.
পর্দার নিচে একজোড়া পা
৪৪.
শবাগার
৪৫.
একটি মহাদেশের জন্য
৪৬.
ক্লান্তি বিনিয়োগ
৪৭.
ছ'টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন
৪৮.
যুক্তফ্রন্ট
৪৯.
রাশিফল
৫০.
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
৫১.
মুক্তো
৫২.
কপিল নাচছে
৫৩.
জালি
৫৪.
অবিনাশের সাড়ে আটচল্লিশ
৫৫.
বৃষ্টির মতো
৫৬.
গলিত সুখ
৫৭.
একটা খুনের খবর
৫৮.
বৃষ্টিতে
৫৯.
একটি সকাল, একটি মেয়ে
৬০.
ফুলদানি
৬১.
আঠারো বছরে
৬২.
তরুণের বাড়ি ফেরা
৬৩.
অন্ধকার থেকে অন্ধকার
৬৪.
ষোলোকে পনেরো করা
৬৫.
রেড্ডি
৬৬.
বুড়ো এবং ফুচা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%