দশম অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

দশ

লোকটা কষ্টেসৃষ্টে উঠে স্টোভ থেকে চায়ের কেটলি নামিয়ে বলল, আমি আকাশের কথা ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।

নিপুণ হাতে চা তৈরি করল লোকটি। কেটলি থেকে যখন লিকার ঢালছিল তখন সেই লিকারটাকে একদম কালো আর থকথকে ঘন দেখাচ্ছিল। খুব কড়া লিকারের চা। রক্তবর্ণ সেই চা কাপে নিয়ে আবার এঁকেবেঁকে বিছানায় এসে বসল। বলল, আকাশের কথা ভাবতে ভাবতে, কিন্তু দেখো, বরাবর আমার চারপাশের পৃথিবীর বা সমাজ-সংসারের ভাবনার চেয়ে আকাশের ভাবনাই আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল। বিভোর হয়ে ভাবতুম। ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আমার ধারণা, লোকের মধ্যে আকাশের ভাবনা ঢুকিয়ে দিতে পারলে, আকাশ-বিভোর করে দিতে পারলে পৃথিবীতে পাপটাপ অনেক কমে যাবে, দুঃখ-কষ্ট, বিরহ-মৃত্যু অনেকটাই সহনীয় হয়ে যাবে তখন। মানুষ খানিকটা বিবাগী উদাসী হয়ে যাবে। অবশ্য তারও একটা বিপদ ছিল। মানুষ তখন আর তেমন চাষেবাসে মনোযোগী হবে না, ঠিকমতো কলকারখানা চালাবে না, প্রজনন বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তাতেও পৃথিবীর খুব একটা ক্ষতি হত না। হত কি? হিসেব করলে দেখা যায়, আমরা পৃথিবীতে প্রয়োজনের চেয়ে ঢের বেশি জিনিস উৎপাদন করি। বেশি উৎপাদন করি বলেই বেশি লুকিয়ে রাখি, বেশি সঞ্চয় করি। তাতে বেশি অভাব দেখা দেয়। কী বলো? তা ছাড়া আকাশ-চিন্তায় মানুষের কামভাব কমে যায় অনেক। তাতে মানুষ কমই জন্মাবে পৃথিবীতে, লোকসংখ্যা কমে যাবে ঢের। সচ্ছলতা দেখা দেবে। না?

চায়ে চুমুক দিয়ে সেই গরম কড়া চায়ের তীব্র স্বাদে লোকটা মুখ বিকৃত করল। তারপর বলল, এইভাবে আকাশ-চিন্তায় আমি পাগল হয়ে গেলাম। আকাশটা একটু একটু করে আমার মধ্যে ঢুকছিল। কিন্তু আমার মাথা একটা সসীম বস্তু। তার নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য প্রস্থ এবং বেধ রয়েছে, তার ভাবনা-চিন্তার রয়েছে একটা সীমা। তার মধ্যে অসীম আকাশটা ঢুকবে কী করে? তবু রোজই আমি টের পেতাম অনবরত আমার মাথার মধ্যে বিশাল, প্রকাণ্ড অনন্ত আকাশ ঢুকছে তো ঢুকছেই। আমার মাথার ভিতরটা টইটম্বুর হয়ে গেল, তারপর ফাটো ফাটো হল। ব্যথায় আমি একা একা চিৎকার করতাম। সেই সময়ে আমাকে ইউনিভার্সিটি থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়। আমার মা-বাবার ধারণা হয়েছিল যে, দর্শন পড়তে পড়তেই আমার ও-রকম অবস্থা। আমি তিন-চার মাস বাসায় বসে রইলাম। আমার বাবা ছিল জজ-কোর্টের উকিল, কিন্তু তাঁর পসার ছিল না। সেকেন্ড ক্লাস ট্রামে কাছারিতে যেত, জামিন বা এফিডেবিটের ছোটখাটো কাজ থেকে পয়সা পেত। সংসার চলত না। বি এ ক্লাসের মাঝামাঝি থেকে রমেন আমার পড়ার খরচ না দিলে আমার পড়া কবে বন্ধ হয়ে যেত। তিন-চার মাস পর আমার পাগলামি সেরে গেলে বাবা আর আমাকে পড়তে দিল না। খুব ধরা-করা করে কর্পোরেশনে আমাকে একটা কেরানির কাজে বহাল করে দিল। ধাঙ্গড়-জমাদারদের হাজিরা নেওয়ার কাজ। তারপর বাবা বুড়ো হয়ে, অসুখে ভুগে মারা গেল। তার এক বছর বাদে উদুরিতে মারা গেল না। আমার ছোট বোনটা একজনকে ভালবেসে বিয়ে করল। আমার দাদা চলে গেল চাকরি নিয়ে জার্মানিতে। আমাকে একা পেয়ে সাবেকি বাসা থেকে উচ্ছেদ করে দিল বাড়িওয়ালা। আমি মামলায় হাজির হইনি বলে একতরফা ডিক্রি পেয়ে সে কোর্টের পেয়াদা এনে আমার মালপত্র, বই, বিছানা ফুটপাথে বের করে দিল সকালবেলায়। আমি সারা দিন পাড়াপড়শিদের ভিড়ের মধ্যে ফুটপাথে আমার বাক্সের ওপর বসে রইলাম। আমার অনেক জিনিস চুরি হয়ে গেল। আমি কাউকেই বলতে পারলাম না যে, ‘আমাকে একটু সাহায্য করুন’ কিংবা ‘আমাকে একটু আশ্রয় দিন।’ ভাগ্যক্রমে কর্পোরেশনের একটা দয়ালু জমাদার আমাকে দেখতে পায়। সে হাজিরা-খাতায় টিপসই দিয়ে সারা দিন নিজের ধান্ধায় ঘুরত। আমি তাকে কিছুই বলতাম না এমনিতেই, তার ওপর সে রোজ আমাকে বাঁধা রেট-এ দশ পয়সা করে ঘুষ দিত মুখ বন্ধ রাখার জন্য। সেই লোকটাই অবশেষে আমাকে এইখানে নিয়ে আসে। সেই থেকে আমি এই ঘরে আছি।

হঠাৎ আচমকা ললিত প্রশ্ন করল, তুমি ঘুষ নাও?

লোকটা মাথা নাড়ল, নিই। আপত্তি করতে আমার লজ্জা করে। ওরা, ওই ধাঙ্গড়-জমাদাররা খুব আদর করে খুব ভালবাসার সঙ্গে পয়সাটা দেয়। আমি খুব অসহায় বোধ করি, ফিরিয়ে দিতে পারি না। তা ছাড়া যদি ফিরিয়ে দিই তবে ওদের দিয়ে আমাকে কাজ করিয়ে নিতে হবে। যদি তা করি তবে ওরা রেগে যাবে, ছুতোনাতা ধরে হাঙ্গামা করবে, আমাকে চাকরিতে থাকতে দেবে না। সেই হাঙ্গামা সহ্য করার মতো জোর আমার নেই। বুঝলে! আমি যদি সৎ হই, তবে আমার কর্তব্যপরায়ণ এবং সাহসীও হওয়া দরকার। নইলে দুর্বল সৎকে দিয়ে সমাজের কোনও উপকার নেই। সৎ হওয়া সোজা। আমি রোজ সকালে জমাদারদের দেওয়া পয়সা ফিরিয়ে দিতে পারি, কিন্তু কিছুতেই তাদের দিয়ে কাজ করাতে পারি না। আমি ঘুষ না-নিলেও শহর নোংরা থাকবে। নয় কি? কেননা আমি কর্তব্যপরায়ণ বা সাহসী নই। ঠিক বলছি না?

ললিত হাসল। বলল, বলে যাও।

লোকটা একটু চুপ করে রইল। কপালে ব্যান্ডেজের তলা দিয়ে আঙুল ঢুকিয়ে একটু চুলকে নিল। তারপর যন্ত্রণায় মুখ একটু বিকৃত করে বলল, আমার সবচেয়ে প্রিয় বই হচ্ছে কবিতা আর দর্শনের। এই সমস্ত দামি বইগুলো আমার ঘুষের পয়সায় কেনা। ওদের পয়সা না নিলে আমি কী করে এই বইগুলো কিনতাম! অ্যাঁ! ওই সব বইগুলোর মধ্যে এক-একটা আশ্চর্য জগৎ, একটা কবিতার মধ্যে ব্রহ্মাণ্ডের ছায়া, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ হচ্ছে ওই বইগুলি। আমি সৎ হলে কিংবা ধাঙ্গড়-জমাদাররা কাজে ফাঁকি না দিলে এই আনন্দ আমি কোথায় পেতাম! তা ছাড়া দেখো, ওই ঘুষ নেওয়ার ব্যাপারটা আমি প্রচলন করিনি। ওই চাকরির ওটাই নিয়ম ছিল, আমি কেবল ওই নিয়মটার মধ্যে গিয়ে পড়েছিলাম। আমি নিয়ম পালটানোর খুব পক্ষপাতী নই। যদি নিয়ম পালটাতেই হয় তবে সমস্ত দেশটার সব নিয়ম এক আঘাতে, একবারে পালটে ফেলাই ভাল। আমি যদি আমার দুর্বল ক্ষমতা নিয়ে ছোট্ট একটা নিয়মকে পালটানোর চেষ্টা করি তা হলে গোলমাল হবে খুব, আমার বিপদ ঘটবে। প্রকাণ্ড একটা পুরনো মেশিনে তুমি যদি একটা নতুন ধরনের পার্টস লাগানোর চেষ্টা করো তা হলে পুরো মেশিনটাই চেঁচাবে, আর্তনাদ করবে, নতুন পার্টসটাকে কিছুতেই থাকতে দেবে না। তাই আমি একটা বিরাট রহস্যময় মেশিনের কোনও অংশই পালটানোর চেষ্টা করিনি। তার নিয়ম মতোই তাকে চলতে দিয়েছি। আমি ধাঙ্গড়-জমাদারদের চটাইনি, বরং তাদের নিয়ম মতো খুশি রেখেছি। ফলে দেখো, তাদের পয়সায় আমি ইচ্ছেমতো বই কিনেছি, তাদেরই দয়ায় ফুটপাথ থেকে এমন সুন্দর একটা ঘরে আশ্রয় পেয়েছি।

‘সুন্দর ঘর’ কথাটা শুনে ললিত মুখ লুকিয়ে একটু হাসল।

চা শেষ করে কাপটা বিছানার ওপরেই রেখে উঁচু বালিশে আধশোয়া হয়ে লোকটা বলতে লাগল, দেখো, একটা নিয়ম পালটানোর চেষ্টা করতে গিয়েই আজ আমার এই অবস্থা। আমি অনেক দিন ধরেই জানি যে, আমি দুর্বল মানুষ, আমি কথা বলতে পারি না। সারা জীবনে আমার প্রতি যত অন্যায় ব্যবহার করা হয়েছে, আমাকে যত অপমান করা হয়েছে সবই আমি সহ্য করেছি। কেননা আমার স্বভাব অনুযায়ী সেটাই ঠিক নিয়ম। এবং এই নিয়ম অনুযায়ী চললে আমার কোনও বিপদ নেই। অথচ কয়েক দিন আগে এক বার অল্পক্ষণের জন্য আমি আমার স্বভাবের, এই নিয়ম পালটে ফেলেছিলাম। ঘটনাটা অবশ্য খুবই ছোট এবং সাধারণ একটা ঘটনা। সেদিন অনেক রাত্রে আমি নাইট শোতে একটা সিনেমা দেখে ফিরছিলাম…

ললিত একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, তুমি সিনেমা দেখো?

লোকটা ঘাড় নাড়ল, দেখি। বই পড়তে পড়তে বা চিন্তা করতে করতে আমার মাথা ভার হয়ে যায়। তাই আমি সিনেমা হল কিংবা খেলার মাঠে চলে যাই। আমি কখনও সিরিয়াস ছবি-টবি দেখি না, আমি দেখি বেলেল্লা হিন্দি ছবি, যাতে প্রচুর হুল্লোড় আছে, যার মধ্যে দুঃখ-টুঃখ বড় একটা নেই। ওইসব ছবি আমার মাথাকে খুব সজীব করে দেয়।

ললিত হাসল, ঠিক আছে। তারপর বলো।

হ্যাঁ, তারপর সেদিন অনেক রাতে আমি ফিরছিলাম। ভিড়ের বাসে আমি উঠতে পারিনি। ভবানীপুর থেকে টালিগঞ্জ খুব একটা দুর নয় বলে আমি হাঁটা-পথেই চলে আসছিলাম। রেল-ব্রিজ পেরিয়ে কিছু দূর আসতেই কে যেন পিছন থেকে বলল, “ও মশাই, শুনুন! ফিরে দেখি ল্যাম্প-পোস্টের তলায় দাঁড়িয়ে দু’জন লোক। সাধারণ বাঙালির মতোই তাদের চেহারা। শ্যামলাই বোধহয় গায়ের রং, রোগা-টোগা, না-লম্বা-না-বেঁটে। পরনে ধুতি আর শার্ট। আমি ফিরে তাকাতেই বলল, ‘আপনার কাছে দশ কি পাঁচ পয়সার কয়েন হবে? আমরা দুই বন্ধু একটা বাজি ফেলেছি, কিন্তু ‘টস’ করার মতো খুচরো পয়সা আমাদের কাছে নেই।’ লোকটা ভারী ভদ্রলোকের মতো হেসে বলল। খুব শান্ত আর ধীরস্থির তার হাবভাব। আমি কথা না বলে পকেট থেকে একটা আধুলি পেয়ে তার হাতে দিলাম। লোকটা খুব আপ্যায়িত হয়ে বলল, ‘বাঃ, এতেই হবে। বলে আমার সামনে দাঁড়িয়েই ‘টস’ করল। বাঁই করে পয়সা আঙুলের টোকায় শূন্যে উড়িয়ে দু’হাতের চেটোয় চেপে ধরল। তারপর ‘টসে’র ফলাফল দেখে আমার হাতে আধুলিটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ। আমি চলে আসছি, তখন আবার সেই লোকটা পিছু ডাকল, ‘দাদা, শুনুন।’ আমি দাঁড়ালাম। আবার বিনয়ের হাসি হেসে বলল, ‘আমাদের ‘টস’-এর রেজাল্টটা জেনে গেলেন না? আমার এই বন্ধুর ভাগে পড়েছে আপনার হাতঘড়িটা, আর আমার ভাগে আপনার ম্যানিব্যাগ। ও দুটো দিয়ে আপনি চলে যান।’ দেখলাম লোকটার বন্ধু একটা মাঝারি লম্বা ছুরি বের করে খুব মনোযোগের সঙ্গে নিজের আঙুলের নখ কাটছে। আমাকে লক্ষই করছে না। দু’জনেরই ভাবভঙ্গি শান্ত, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, আর বেশ গা-ছেড়ে-দেওয়া, হাসিখুশি। তারা আমাকে একটুও ভয় দেখানোর চেষ্টা করেনি, চাপা গলায় কথা বলেনি। আমি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। তখন বড়জোর রাত বারোটা বেজে দশ কি পনেরো মিনিট। কলকাতায় ওটা তখনও রাতই নয়। আমাদের চারদিকেই তখনও কিছু লোকজন চলাচল করছে, রাস্তায় জ্বলছে আলো, অল্প দূরেই একটা মাংসের দোকান ধোলাই হচ্ছে, ঝাঁটা আর জলের শব্দ আমার কানে আসছিল, ফুটপাথে শোয়া লোকগুলো তখনও ঘুমিয়ে পড়েনি সবাই। এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা আমাকে প্রকাশ্যে লুট করছিল। আমার স্বভাবের নিয়ম অনুযায়ী তখন কী করা স্বাভাবিক ছিল, বলো তো! স্বাভাবিক ছিল চুপচাপ তাদের হাতে আমার পুরনো বাবার আমলের ঘড়ি আর অল্প কয়েকটা টাকাওলা মানিব্যাগটা ছেড়ে দেওয়া। সেটাই ঠিক স্বাভাবিক হত। আমার চেয়ে ঢের সাহসী লোকও ঠিক তাই করত। কিন্তু সেই মুহূর্তে, অল্প কিছুক্ষণের জন্য আমি আমার স্বভাবের নিয়ম পালটে ফেললাম। আমি দিলাম না।

দিলে না?

লোকটা মাথা নাড়ল, না। তারা যদি আমাকে ভয় দেখাত, কিংবা যদি আচমকা আমার সামনে দাঁড়িয়ে সব কেড়েকুড়ে নিত, তা হলে আমি নিশ্চয়ই তাদের সব দিয়ে দিতাম। কিন্তু তারা তা করেনি। তারা অনেক সময় নিয়েছিল, রসিকতা করে আমারই পয়সা দিয়ে ‘টস’ করল, তারা আমাকে দেখাল তাদের আত্মবিশ্বাস কত প্রবল, কত সহজে ঠান্ডা মাথায় তারা দুঃসাহসিক সব কাজ করতে পারে। আর সেটা লক্ষ করেই আমার স্বভাবের নিয়মটা বোধ হয় হঠাৎ পালটে গেল। এ-রকম মাঝে মাঝে হয় যে, খুব সাধারণ দুর্বল মানুষও কোনও দুঃসাহসিক কাজ দেখলে অনুরূপ কাজ করতে উৎসাহ বোধ করে। আমার বিশ্বাস, খুব সাধু সৎ প্রকৃতির কোনও লোকও যদি চোখের সামনে একটা দুঃসাহসিক খুন, ডাকাতি কিংবা গুন্ডামি দেখে তবে তার মনের গভীরে কোথাও-না-কোথাও ওইরকম একটা কিছু করার ইচ্ছে জেগে উঠবে। এটা মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা। কিন্তু সাধারণ মানুষের ইচ্ছে হলেও তারা সব করে না। তারা বিবেকানন্দের জীবনী পড়ে, বড় খেলোয়াড়ের খেলা দেখে, বড় গুড়ার গুন্ডামির খবর শোনে, বলাৎকার বা ধর্ষণের খবর পড়ে পত্রিকায়। তবু অধিকাংশ মানুষই মহাপুরুষ কিংবা খেলোয়াড়, গুন্ডা কিংবা ধর্ষণকারী হয় না। কিন্তু তাদের মনের মধ্যে সব ইচ্ছাই পাশাপাশি থেকে যায়। কিন্তু তারা স্বভাবের নিয়ম বড় একটা ভাঙে না, সাধারণ নিরীহ জীবন যাপন করে যায়। তারা যে মহাপুরুষের মতো ত্যাগী জ্ঞানী মানবপ্রেমিক হয় না, খেলোয়াড়ের মতো কুশলী হয় না, অসৎ গুন্ডার মতো নৃশংস হয় না, কিংবা ধর্ষণ বা বলাৎকারের গুপ্ত উত্তেজনা উপভোগ করে না। তার কারণ, তারা জানে যে, ও-রকম কিছু হতে গেলে বা করতে গেলে প্রকৃতি এবং নিয়তি তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। আমাকে সেই রাত্রে যারা ছিনতাই করছিল তাদের দুঃসাহস এবং আত্মপ্রত্যয় দেখে অনুরূপ দুঃসাহস এবং আত্মপ্রত্যয় দেখানোর ইচ্ছেটা হয়তো স্বাভাবিক হত। কিন্তু আমি তাদের হাতে আমার মানিব্যাগ বা ঘড়ি দিলাম না। আমি তাদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য তাদের পিছনে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে বললাম, পুলিশের গাড়ি! তারা চমকে পিছু ফিরে চাইল। আমি দৌড় দিলাম। আর দৌড়োতে দৌড়োতে আমি একটা তীব্র উত্তেজনা এবং আনন্দ বোধ করছিলাম। ও-রকম আনন্দ আর উত্তেজনা আমি কখনও বোধ করিনি, আমার দর্শন কিংবা কবিতার বইয়ে এতকাল ধরে আমি যা আনন্দ পেয়েছি, এ আনন্দ তার চেয়ে অনেক বেশি। আমার মনে হল জীবনে এই প্রথম আমি একটা কিছু করছি, একটা অসাধারণ কিছু। আমি একদম দৌড়োতে জানি না, কখনও দৌড়েইনি, খানিকটা ছুটেই আমার হাঁফ ধরে গেল, তবু আমি দাঁতে ঠোঁট চেপে হাসছিলাম, এবং নিজের এই ব্যবহারে আমি অবাকও হচ্ছিলাম খুব। সেই লোক দুটো বোধ হয় আমাকে চিনত। তাদের ধারণা ছিল আমাকে লুট করা খুবই সহজ ব্যাপার হবে, তাই তারা লুটের আগে আমার সঙ্গে রসিকতা করেছিল। কিন্তু আমি তাদের ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছি দেখেই তারা হয়তো খুব রেগে গেল। সেটাও খুবই স্বাভাবিক। যার ওপর আধিপত্য করা সহজ, তুমি যদি দেখো যে, সে তোমার বশ মানছে না, তবে তুমি রেগে যাবে না? কাজেই স্বাভাবিক কারণেই তারা রেগে গেল। কারণ, আমি পোকামাকড়ের মতো তুচ্ছ একটা লোক তাদের সঙ্গে টক্কর দিয়েছি। তাদের প্রেস্টিজে লেগেছিল। কিন্তু তারা সোজাসুজি আমার পিছু নিল না। সম্ভবত তারা আমার ঘর চিনত। কারণ, আমি খানিকটা ছুটে, খানিকটা জোরে হেঁটে যখন ঘরের দরজায় পৌঁছলাম তখন দেখি আমার দরজার বাইরে দু’ধারে তারা দুজন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। শান্তভাবে। বোধ হয় তারা কোনও শর্টকাট রাস্তায় এসেছিল, যা আমি জানি না। তাদের একজনের হাতে একটা সাইকেলের চেন, অন্যজনের হাতে লোহার উকো। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম, আমার আর দৌড়োবার ক্ষমতা ছিল না। তারা দু’জন চটপটে পায়ে এসে আমার দু’দিকে দাঁড়াল, ধরে নিয়ে গিয়ে বলল, দরজা খোলো। আমি তালা খুলে ভিতরে ঢুকতে তারাও ঢুকল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তখনও স্বভাবের নিয়মে আমি তাদের ভয় পাচ্ছিলাম না। আমি তখনও তীব্র আনন্দ এবং উত্তেজনা বোধ করছিলাম। তারা দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড়াল। তারপরেই ফাইট শুরু হয়ে গেল। আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়ে তারা ভুল করেছিল। কারণ, আমি শান্তভাবে মার খেলাম না, ঘড়ি আর মানিব্যাগও ছাড়লাম না। আমি একজনকে বই ছুড়ে মেরেছিলাম। মাটিতে পড়ে গিয়ে একজনের গোড়ালি কামড়ে দিয়েছিলাম। সারাক্ষণ আমি লড়াই করার চেষ্টা করেছিলাম বলে তারা আমাকে বেশি মেরেছিল। ওদিকে হইচই শুনে লোকজন উঠে পড়ছিল বোধ হয়, তারা অল্প সময়ে যত দূর সম্ভব আমাকে মেরে পালিয়ে গেল।

লোকটা হাসল। ফাটা ঠোঁট দিয়ে টস করে রক্তের ফোঁটা পড়ল সাদা তোয়ালেটার ওপর। তারপর লোকটা বালিশের তলা থেকে একটা কালো মানিব্যাগ আর পুরনো আমলের বড় গোল একটা হাতঘড়ি বের করে ললিতকে দেখাল, এই সেই ঘড়ি আর মানিব্যাগ। একেবারেই এলেবেলে জিনিস। পুরনো পচা ঘড়ি, ছেঁড়া মানিব্যাগে বোধ হয় গোটা তিন-চার টাকা ছিল। এর জনেই আমি এত লড়াই দিয়েছি ভেবে আমি এখন আশ্চর্য হই।

লোকটা মানিব্যাগ আর হাতঘড়িটা দু’হাতে চেপে ধরে রইল কিছুক্ষণ। তারপর সযত্নে আবার বালিশের তলায় ঢুকিয়ে রেখে বলল, এই হচ্ছে ব্যাপার। খুবই সামান্য তুচ্ছ একটা ঘটনা।

লোকটা ভ্রূ কুঁচকে ভেবে বলল, দেখো, ঘটনাটা যতটা সামান্য মনে হচ্ছে, বাস্তবিক সেটা ততটা সামান্য নয়। লোক দুটো আমাকে মারবার সময়ে বলেছিল, শালা, শুয়োরের বাচ্চা, বেজন্মা, তোমার জিয়োগ্রাফি পালটে দেব। কিন্তু কার্যত আমার জিয়োগ্রাফির বদলে তারা আমার ফিলজফি পালটে দিয়ে গেছে।

লোকটা চুপ করল। ললিত কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী রকম?

লোকটা তার চোখে চোখ রেখে বলল, আমি এখন আর তেমন নিরীহ শান্ত লাজুক মানুষটি নই। এই ঘরে মাঝে মাঝে একটা সাদা বেড়াল আসে, আমার চায়ের দুধ ডেকচি উলটে খেয়ে যায়। দেখতে পেলে আমি তাড়িয়ে দিই, কিন্তু আর কিছু করি না। কিন্তু পরশুদিন দুপুরবেলা বেড়ালটা আমার ঘরে ঢুকে ডেকচি খোলবার চেষ্টা করতেই আমি লাফিয়ে উঠে দৌড়ে গিয়ে ওর লেজটা চেপে ধরলাম। ও পালাবার ফিকিরে জানালায় লাফিয়ে উঠেছিল, কিন্তু লেজটা আমি হাতে পেয়ে গিয়েছিলাম। বেড়ালটা আমাকে ফ্যাঁস করে আঁচড়ে দিল, হাতে দাঁত বসাল, আমি ওকে তবু ছাড়লাম না, তুলে এক আছাড় দিলাম মেঝেয়। ব্যাটা ঝিম ধরে অনেকক্ষণ পড়ে থেকে আস্তে আস্তে উঠে চলে গেল। আর আসেনি। ও যখন আমাকে আঁচড়ে কামড়ে দিচ্ছিল তখনও আমি ঠিক ও-রকম একটা উত্তেজনা আর আনন্দ টের পাচ্ছিলাম। তা ছাড়া দেখো, আগে আমি যে-কোনও লোকের কাছেই চট করে বশ মেনে নিতাম, কারও সঙ্গেই কখনও গোঁয়ারতুমি করিনি। কিন্তু তোমার পাড়ার ছেলেরা এসে যখন আমার মার খাওয়ার ব্যাপারটা সম্বন্ধে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল তখন আমি তাদের স্পষ্ট কিছুই বললাম না। তারা আমাকে ব্যাপারটা খোলসা করে বলার জন্য অনেক ভয় দেখিয়েছে, আবার অভয়ও দিয়েছে, বলেছে আমার হয়ে তারা শোধ নেবে। এ-সব ছেলেদের আমি চিরকালই ভয় পাই, কারণ বরাবর রাস্তায় ছেলেরা আমাকে খ্যাপায়, টিটকিরি দেয়। কিন্তু এবার আমি আমার জেদ বজায় রাখলাম, তাদের কিছুই বললাম না। তারা বলল, আমার কাছে প্রায়ই একটা মেয়ে আসে বইখাতা নিয়ে, এ-ব্যাপারটার সঙ্গে সেই মেয়েটার কোনও যোগাযোগ আছে কি না। আমি তাদের কোনও উত্তর দিলাম না। যদিও জানি যে, পাড়ার ছেলেরা সেই মেয়েটার সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে একটা কেচ্ছা রটিয়ে দিতে পারে।

মেয়েটা কে? ললিত নরম গলায় জিজ্ঞেস করল।

সেটা আর-একদিন বলা যাবে। বলে ক্লান্তিতে লোকটা চোখ বুজল। বলল, আমি অনেকক্ষণ কথা বলেছি। আমার মাথার মধ্যে কুয়াশা জমছে।

ললিত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি তোমার কাছে পরে আসব। আজ তুমি ঘুমোও।

লোকটা হেসে বলল, আমার হিরো।

বলে চোখ বুজল।

ললিত দরজার কাছ থেকে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি খাও কোথায়?

লোকটা চোখ খুলে তাকে দেখল। বলল, নিজে রান্না করি।

ললিত বলল, এখন কে তোমাকে রান্না করে দেয়?

লোকটা মাথা নাড়ে, কেউ না। পাড়ার একটা বাচ্চা-টাচ্চাকে ধরে পাউরুটি নিয়ে দুধ বা চা দিয়ে খেয়ে নিই। কখনও কষ্টেসৃষ্টে সেদ্ধভাত করে নিই।

ললিতের দয়া হচ্ছিল। বলল, কিছু মনে কোরো না, কয়েক দিন আমার বাসায় খাও। আমি তোমার খাবার পাঠিয়ে দেব।

দেবে?

লোকটার চোখমুখ হঠাৎ খুব উজ্জ্বল দেখাল। মাথা নেড়ে বলল, তুমি আমাকে নিমন্ত্রণ করছ?

করছি। ললিত হাসল।

লোকটা খুশি হয়ে বলে, আমি বহুকাল নিমন্ত্রণ খাইনি। ভাল খাবার কাকে বলে জানিই না। তুমি পাঠিয়ে দিয়ে। একটু ভাল হলে আমি নিজেই যাব তোমাদের বাসায়, মাঝে মাঝে খেয়ে আসব।

লোকটা চুপচাপ একটু ললিতের মুখখানা দেখল। বলল, তোমার মা খুব ভাল রাঁধেন, না? আমার খুব পোস্তর বড়া, কচুর শাক আর লাউঘণ্ট খেতে ইচ্ছে করে, তোমার মাকে এ-কথা বোলো।

ললিত হেসে ঘাড় নাড়ল। বলবে। তারপর বলল, তুমি তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে ওঠো।

লোকটা হাসে, আমি অনেক দিন ধরে তো ভালই ছিলাম। কিন্তু ক্রমান্বয়ে ভাল থাকাটা ভীষণ একঘেয়ে।

ললিত কথাটা ঠিক বুঝল না। বাইরে বেরিয়ে ফাঁকা রাস্তাঘাট দেখে আর দূরে কুকুরের ডাক শুনে ললিত বুঝল রাত অনেক হয়েছে। হাতে ঘড়ি ছিল না, আন্দাজ করল, বারোটার কাছাকাছি।

মিত্রদের বাড়ির সামনে অশ্বথ গাছটার তলায় গাঢ় ছায়া জমে আছে। সেই ছায়ার মধ্যে পা দিয়ে আপন মনে বিষগ্ন একটু হাসল ললিত। পাড়ার বুড়িদের মধ্যমণি বলে মাকে সে মাঝে মাঝে বলে, হিরোবুড়ি। কিন্তু সে যে কখনও হিরো ছিল কারও, তা ললিত টের পায়নি। সত্য বটে কলেজে বা ইউনিভার্সিটিতে সে ইউনিয়ন করেছে, ভোটে নেমেছে, বক্তৃতা করেছে, কলেজের ফাংশনে হয়তো কথা বলেছে, কলকাতার মেয়র কিংবা বিখ্যাত কোনও সুন্দরী গায়িকার সঙ্গে। কিন্তু সে-সব স্পষ্ট মনে নেই তার, সে-সব নিয়ে গৌরব করার মতোও কিছু ছিল না। অথচ সেইসব কলেজি হইচই ছেলেমানুষির মধ্যেও সে ছিল একটি দুঃখী ছেলের হিরো। তার শরীর একটা অচেনা আনলে শিউরে উঠল।

অথচ ভেবে দেখল বিমান রক্ষিতের চোখে তাকে যা দেখিয়েছিল তা আসলে সত্য ছিল না। ললিতেরও ছিল নানা দুর্বলতা, ক্ষোভ, লজ্জা। বিমান জানে না, লাজুক ললিত মিতু নামে একটি মেয়ের সঙ্গে দুর্বলতাবশত কোনও দিন কথাই বলতে পারেনি। একবার ছাত্র আন্দোলনের সময়ে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে বিকেলের দিকে গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। গলিঘুঁজি দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল ললিত, ওয়েলেসলি স্ট্রিটে একজন সার্জেন্ট তার কনুই চেপে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল সে কোথায় যাচ্ছে। ললিত কেবল বোকার মতো বলেছিল, বাড়ি। সার্জেন্টটা তার বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করায় সে এত ঘাবড়ে গিয়েছিল যে কিছুতেই তার বাড়িটা কোথায় তা মনে করতে পারেনি। অনির্দিষ্টভাবে হাত তুলে বোধহয় ময়দানের দিকটা দেখিয়েই সে বলেছিল, ওই দিকে। তার অবস্থা দেখে করুণা করেই সার্জেন্টটা সেদিন ছেড়ে দিয়েছিল তাকে। বলেছিল, সাবধানে যাবেন, নিজের বাড়িটা ভুল করবেন না। সেই ঘটনার লজ্জা এখন খুব ক্ষীণ হয়ে এলেও ললিতের মনের মধ্যে রয়ে গেছে। কিছুই ভোলেনি ললিত। কিছু দিন আগে, বোধ হয় বছরখানেক হবে, সে একবার পিসিমার সঙ্গে তাদের এক দূর সম্পর্কের বড়লোক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিল পিসিমার বাড়ির জন্য সরকারি ঋণের তদবির করতে। সেখানে শ্বেতপাথরের সিঁড়ি, ড্রইং রুমে ছোট্ট মদের ‘বার’, শেকলে ঝোলানো ঝাড়লণ্ঠনের মতো মস্ত কাচের বাতিদান দেখেছিল ললিত, আর দেখেছিল একটি মেয়েকে, যার গায়ের রং নতুন তামার পয়সার মতো উজ্জ্বল এবং আলো বিকিরণকারী, সে কৌতূহলী চোখে অনেকক্ষণ দেখেছিল ললিতকে। সেই আত্মীয় ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেছিলেন সে কী করে। প্রশ্নটা শুনে ললিত খুব দুর্বল আর অসহায় বোধ করেছিল। তার চোখের সামনে তখন ওই বিপুল সাদা শ্বেতপাথরের সিঁড়ি। অদ্ভুত বাতিদান, ছোট্ট মদের ‘বার’-এর কাচগুলি ঝিকমিকিয়ে উঠছে, আর ওই সুন্দরী কিশোরীর কৌতুহলী চোখের মাঝখানে বোকার মতো বসে থেকে তার মুখে আনতে খুবই লজ্জা করছিল যে সে মাস্টারির চাকরি করে, আড়াইশো টাকারও কম বেতন পায়। এতকাল ধরে বড়লোকদের সম্পর্কে তার যে আক্রোশ আর ঘেন্না ছিল তা কোথায় উবে গিয়েছিল তখন! প্রকাণ্ড সোফায় বসে সেই বিপুল ঘরখানাকে চারিদিকে টের পেয়ে তার মনে তীব্র ভয় আর আত্মগ্লানি দেখা দিয়েছিল। নিজের হতশ্রী এবং দারিদ্র্যকে সে কখনও আর এমনভাবে টের পায়নি। তার ইচ্ছে হয়েছিল তখনই উঠে পালিয়ে চলে যায়। সম্ভবত পিসিমাও ভেবেছিল যে অত বড়লোকের কাছে তার মাস্টারির চাকরিটার কথা বলা উচিত হবে না। তাই কৌশলে পিসিমা তার হয়ে উত্তর দিয়েছিল, ও এখন এম এ পাশ করে রিসার্চ করছে। আশ্চর্য এই যে, পিসিমার উত্তর শুনে এক রকমের স্বস্তি পেয়েছিল সে।

এ-সবের কিছু বিমান জানে না। কিন্তু ললিত জানে যে সে হিরো নয়। কোনওকালে ছিলও না। বিমান একটা ভুল ছবি টাঙিয়ে রেখেছিল চোখের সামনে। ভাবতে ভাবতে ললিত শ্বাসকষ্টের মতো একটা বুক চেপে-ধরা দুঃখকে টের পাচ্ছিল। এইরকম ছোটখাটো ভুলের ওপর, মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটা নড়বড়ে সে। ভুল ললিতকেই চিনছে সবাই। সেও নিরীক্ষণ করছে এক ভুল নিজেকে। এখন একবার মৃত্যুর আগে সঠিক ললিতকে তার চিনে নেওয়া দরকার।

একা ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে তার চটির ক্ষীণ দুর্বল শব্দ শুনতে পাচ্ছিল, সুস্থ সবল মানুষের পায়ের শব্দ যেমন হয়, তারটা তেমন নয়। এত মৃদু শব্দ যে মনে হয়, আর কয়েক পা গেলেই শব্দটা মিলিয়ে যাবে।

ঘরে এসে ললিত দেখল, মা মেঝেয় শতরঞ্জি পেতে হাঁ করে ঘুমিয়ে আছে। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে তখনও। চেয়ারে বসতে গিয়ে সে লক্ষ করল বাবার ছবির আড়াল থেকে টিকটিকিটা মুখ বাড়িয়ে তাকে দেখছে। ললিত ম্লান হেসে মৃদু স্বরে বলল, কার জন্য জেগে আছ, টিকটিকি-মা? কোনজন বাড়ি ফেরেনি তোমার—ছেলে, না কর্তা?

চেয়ার টানার শব্দে মা ঘুম ভেঙে বলল, কে রে! ললিত!

হুঁ।

কোথায় যে যাস! বলে মা উঠে বসল, অরুণ এসেছিল।

কে অরুণ!

ওমা! অরুণ তোর পিসির ছেলে। কাল একবার ওদের বাসায় যাস, যদি পারিস। বার বার যেতে বলে গেছে।

আচ্ছা।

শোয়ার ঘরেই মা ভাতের হাঁড়ি-টাড়ি এনে রেখেছে। এখন উঠে ভাত বাড়তে বসে বলল, ক’টা বাজে দেখ তো?

ললিত ঘড়ি দেখে বলল, পৌনে বারোটা।

ইস! কত রাত হয়েছে…

খাওয়ার পর রোজই মায়ে-পোয়ে একটু গল্প হয়।

খাওয়ার পর ললিত অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। মা তখন নিজের বিছানায় অন্ধকারে বসে আঙুলে চুলের জট ছাড়াচ্ছে। বলল, আত্মীয়-স্বজনদের একটু খোঁজখবর করিস। নইলে আমি মরে যাওয়ার পর কেউ তোকে চিনবেই না। দেখলেও ভাববে, কে না কে!

ললিত হেসে বলল, কে কোথায় থাকে মা!

মা বলল, কেন, কাঁচড়াপাড়ায় তোর ফুলমাসি থাকে, রাঙাকাকা থাকে মাজদিয়া, ইছাপুরে সোনাভাই, হাবড়ায় থাকে নসু ঠাকুরপো…

জটিল সব সম্পর্ক। অচেনা সব মানুষ। শুনতে শুনতে ললিত ঘুমিয়ে পড়ে।

রাত বারোটাতেও তুলসী আর সঞ্জয়ের ছাড়াছাড়ি হয়নি। ললিতের বাসা থেকে গাড়ি ছাড়ল সঞ্জয়। চলল, সোজা এসপ্ল্যানেডের দিকে। তখন আটটা বেজে গেছে।

তুলসী বলল, কোথায় যাচ্ছিস! আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যা।

সঞ্জয় হাসল, দুনিয়াটাই তো বাসা রে। সেই বাসাটা দেখে নে।

তারপর সোজা গাড়ি চালিয়ে এসে থামল এসপ্ল্যানেডের একটা নিরিবিলি, শান্ত বার-এর সামনে। দরজা খুলে বলল, নাম শালা।

তুলসী ইতস্তত করে বলল, গোলমাল হয়ে যাবে মাইরি।

কেন, বউ গন্ধ পাবে? বলে হাসল সঞ্জয়, বেশি সাধুগিরি দেখাবি তো বউ হাওয়া হয়ে যাবে, দেখিস। রমেনটার তাই হয়েছিল।

তুলসী অস্বস্তিতে হাসল। তারপর নামল। বলল, অনেককাল অভ্যাস নেই।

ইস! শালা যেন কত খেয়েছে!

রাত দশটায় যখন বার-এর মদ দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল তখন তুলসী অনেকটা মাতাল। সঞ্জয় বলল, আর খাবি তুলসী?

তুলসী মাথা নাড়ল, খাবে। তার দু’চোখ দিয়ে তখন অঝোরে জল পড়ছে। কাঁদছিল সে।

সঞ্জয় উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চল। এখানে বন্ধ হয়ে গেছে। সাকী কিংবা গ্র্যান্ডে যাই।

গ্র্যান্ড। মৃদু আলো, বাজনা, ছড়ানো প্রকান্ড রেস্টুরেন্ট। দেখে হু হু করে উঠল তুলসীর বুক। কে বলবে বাংলাদেশ এটা! কে বলবে! কে বলবে যে সে সেই তুলসী যে মফস্‌সলের মাস্টার, স্টেশন থেকে মাইলটাক আলপথ তাকে ধুতি হাঁটুর ওপর তুলে হাঁটতে হয়। সেখানকার স্কুলে আদ্যিকালের বুড়ো বি এ, বি এস সি আধামূর্খ গ্রাম্য একদল লোকের সঙ্গে কাজ করতে হয়! সেখানে মাঠে-ঘাটে বিষধর সাপ, জলেজঙ্গলে রহস্যময় পোকামাকড়। না, এটা মোটে বাংলাদেশই নয়। এই তো নিউ-ইয়র্ক! ইজ নট ইট? সে আপন মনে হাসল। ইট ইজ লন্ডন পারহ্যাপস? হ্যাঁ, লন্ডন। বসন্তকাল।

চেয়ারে বসে সে সঞ্জয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে আবার কেঁদে ফেলল, মাইরি, ললিতটার জন্য কষ্ট হচ্ছে।

সঞ্জয় তার কাঁধ ধরে একটা ঝাঁকুনি দিল, স্টেডি!

চারধারে একবার বোকা চোখে চেয়ে দেখল তুলসী, তারপর বলল, আমার লাইফ-এ মাইরি কী আছে বল তো! অ্যাঁ!

তারপর আবার কাঁদতে লাগল। চেয়ে দেখল তার অদুরে বসে আছে চারজন জাহাজি লোক, হাতে উল্কি, মুখে সমুদ্রের জলবায়ুর কর্কশ ছাপ। তাদের চওড়া কাঁধ, চওড়া কবজি, তারা বিদেশি ভাষায় কথা বলছে। কিছু দিনের মধ্যেই তাদের জাহাজ ছেড়ে যাবে, দূর থেকে কত দূরে চলে যাবে তারা। তখনও আমি হাঁটুর ওপর ধুতি তুলে…আলপথে! তুলসী কাঁদতে থাকে। মদ খায়। কাঁদে।

কী হচ্ছে? সঞ্জয় ধমক দেয়।

আমার লাইফ-এ কী আছে বল তো? অ্যাঁ!

বউ! তোর বউ আছে। সঞ্জয় সান্ত্বনা দেয়।

তুলসী দেখে জলপাই রঙের সুট পরা একটা বিদেশি লোক বেরিয়ে যাচ্ছে। কোন দেশি লোক ও? স্পেন? অ্যাঁ! ইয়েস, স্পেন। বুলফাইট। ও লোকটা বুলফাইটার। একজন নিগ্রোর মুখ নজরে পড়ে তুলসীর। লোকটার মোটা ঠোঁট উলটে দিল— ঝকঝকে ধারালো দাঁত দেখা যায়। বক্সার! হ্যাঁ, লোকটা বক্সার। ক্যাসিয়াস ক্লে! না, প্যাটারসন?

নিউ ইয়র্ক! দিস ইজ নিউ ইয়র্ক। তুলসী বিড় বিড় করে।

হঠাৎ সে শুনতে পেল ‘কঁ কঁ’ করে কর্ক খোলার একটা শব্দ। সে চমকে উঠল। শব্দটা সে কোথায় শুনেছে! শব্দটা চেনা। খুব চেনা। আবার সেই ‘কঁ কঁ’ শব্দটা শুনল তুলসী। সে চারদিকে তাকিয়ে দেখল। তারপর নিচু হয়ে টেবিলের তলাটা দেখল।

কী খুঁজছিস? সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে।

সাপটাকে।

সাপ?

হ্যাঁ, মাইরি এখানেই আছে। শালা ব্যাঙ ধরেছে।

চারদিকে আর-একবার তাকিয়ে তারপর সতর্কভাবে উঠে দাঁড়ায় তুলসী। হাত উঁচু করে সবাইকে সাবধান করে দেয়। স্টপ! অল স্টপ! দেয়ার ইজ এ স্নেক হিয়ার…

সঞ্জয় তার হাত টেনে বসিয়ে দেয়।

তুলসী নীরবে কাঁদতে থাকে।

রাত সাড়ে বারোটায় যখন বাসায় ফিরল তুলসী তখন সিঁড়ির দরজায় ভিড় করে দাদা বউদি মৃদুলা দাঁড়িয়ে আছে। তুলসী ভ্যাবলা চোখে তাকিয়ে দেখল। অসহায়ভাবে। বউদি এগিয়ে এসে ধরল তাকে। মৃদুলা মুখ ফিরিয়ে নিল, দাদা আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গেল।

ডু ইউ হেট মি? সে মৃদুলাকে জিজ্ঞেস করল। তারপর বুঝদারের মতো হাসল সে, ইউ হেট মি। আই নো!

বউদি ঘরে পৌঁছে দিল তাকে। মৃদুলাকেও ঘরের মধ্যে ঠেলে দিয়ে দরজা টেনে বাইরে থেকে বলল, দরজাটা বন্ধ করে দাও।

মৃদুলা দরজা বন্ধ করতেই খুব হাসল তুলসী। তারপর হঠাৎ বলল, আমার একটা কথা রাখবে?

মৃদুলা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে বলল, কী?

তুলসী বলে, মনে করো এটা একটা রাস্তা, তুমি একটা অচেনা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছ, আর আমি একটা রকবাজ মাস্তান ছেলে। তুমি হাঁটো…হেঁটে যাও…যেন আমাকে চেনো না…হাঁটো…

ভয় পেয়ে কয়েক পা হাঁটে মৃদুলা। তুলসী মুখের মধ্যে আঙুল পুরে তীব্র সিটি বাজিয়ে দেয়। চমকে ওঠে মৃদুলা। তুলসী হাসে, মাইরি, আমি কখনও রকবাজি করিনি, মাস্তানি করিনি। সঞ্জয়ের কাছে সিটি দেওয়া শিখেছিলাম, কোনও কাজে লাগেনি। লাইফে আমি একটা মেয়েকেও টিজ করতে পারিনি…বিশ্বাস করো…

তুলসীর চোখে জল এসে যায়। তারপর বলে, এবার তুমি একটা অচেনা মেয়ে—তোমাকে আমি সিটি দিয়েছি…তুমি দাঁড়িয়ে পড়ো---ঘুরে এসে আমাকে একটা চড় মারো, কিংবা চটিজুতো…কিছু একটা করো…বিট মি…আমাকে ছেড়ে দিয়ো না…আমি রকবাজ মাস্তান নোংরা, মাইরি মৃদুল, আমাকে ছেড়ে দিয়ো না…

তুলসী কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে।

শোয়ার আগে সঞ্জয় বুকে-পিঠে পাউডার ছড়াচ্ছিল। আয়নায় গলা উঁচু করে কী একটু গলার কাছে আঙুল দিয়ে টিপে দেখল সে। তারপর রিনির দিকে ফিরে বলল, গলায় একটা লাম্প টের পাচ্ছি যেন!

কীসের লাম্প?

সঞ্জয় ঠোঁট ওলটায়, কী জানি!

তারপর আবার জায়গাটাকে টিপে দেখে। মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে যায়। লাইট নিবিয়ে বিছানায় আসতে আসতে বলে, বড় ভয় করে বুঝেছ! এখন কাজকর্ম সদ্য জমিয়ে তুলেছি…

তাতে কী হল?

কিছু না। সঞ্জয় একটু হাসে, মাঝে মাঝে হঠাৎ বড় ভয় করে আজকাল। ক্যান্সার-ফ্যান্সার যদি হয়…

দূর! অলক্ষুণে কথা!

রিনি তাকে আলতো জড়িয়ে ধরে।

তখন বহু দূরের একটা গ্রামে জাতীয় সড়কের পাশে একটা সাপের মৃতদেহকে ঘিরে পরিশ্রমী সঞ্চয়ী পিঁপড়েদের ভিড়। ললিতের বাবার ছবির পিছনে গর্ভযন্ত্রণায় অস্থির একটা টিকটিকি ডেকে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%