শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সঞ্জয় যেদিন জোর করে মদ খাইয়ে দিয়েছিল তাকে, আর সে মাতাল হয়ে রাতে বাসায় ফিরেছিল, তার পরদিন সকালবেলায় ভিতরের বারান্দার এক কোণে দাড়ি কাটার সরঞ্জাম নিয়ে বসে ছিল তুলসী। রান্নার জায়গায় মৃদুলা কৌটো-টৌটো খুলে কী খুঁজছে। তুলসী সন্তর্পণে আয়নাটা একটু ঘুরিয়ে তার ভিতর দিয়ে মৃদুলার দিকে চেয়ে থাকে। কালোজিরে কিংবা সর্ষে খুঁজতে খুঁজতে মৃদুলা একবার হঠাৎ মুখ তুলে তাকায়। আয়নার ভিতর দিয়ে চোখাচোখি হতে মৃদুলা টপ করে চোখ নামিয়ে যে পাতকুয়ার মধ্যে ঝুঁকে পড়ল।
সকাল থেকেই কেউ কথা বলছে না তার সঙ্গে, মৃদুলাও না। বাড়িটা থমথম করছে। অথচ বারান্দায় রান্নার জায়গায় বউদি, ঘর জুড়ে দাদা আর খবরের কাগজ, সব যথারীতি, রোজকার মতোই।
পাশ দিয়েই বউদি বাথরুমে যাচ্ছে, তুলসী তাড়াতাড়ি আয়নার ওপর ঝুঁকে পড়ে।
বারান্দায় যখন বউদি নেই ঠিক সেই সময়েই মৃদুলা চা দিতে এল। তুলসী মৃদুলার একটা হাত খপ করে চেপে ধরে বলে, কাল রাতে কী হয়েছিল বলো।
ছাড়ো। জানি না।
পায়ে পড়ি, বলো।
ছিঃ, তুমি গুরুজন না!
আমি পাষণ্ড, ওই সঞ্জয় হারামজাদার দোষ। কী করেছি বলো।
অনেক কিছু। মাতালরা যা যা করে। আমাকে শিসও দিয়েছ।
মাইরি?
আজ সকালে দাদা বলেছে তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া উচিত, নইলে ছেলেমেয়েগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।
আমি চলে যাব।
কোথায়?
কোথাও। বাসা খুঁজছি।
একটু চুপ করে থাকে তুলসী। তারপর বলে, একদিন একটু খেলে কী হয়! সঞ্জয়রা তো রোজ খায়।
তুমি কি সঞ্জয়?
উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে না মৃদুলা, হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যায়।
তুলসী দেখে আয়না থেকে বুড়োটে মুখটা চোর-চোখে চেয়ে আছে। হিসেব করলে এই শেষ ভাদ্রে তার মধ্যযৌবন। বয়স তেত্রিশ। কিন্তু বাস্তবিক মধ্যযৌবন বলে কিছু টের পায় না তুলসী। নিজের এই মুখখানা সে গতকাল, পরশু কিংবা দশ-পনেরো বছর আগে যে-রকম দেখেছিল, অবিকল সে-রকম দেখছে। আরও দশ বছর পরেও বোধ হয় একই রকম দেখাবে। এই হচ্ছে তুলসী—তুলসীচন্দন—কেবলমাত্র তুলসী হয়ে ওঠা ছাড়া এর আর কোনও গতি নেই। না, সে সঞ্জয় নয়। তবু ‘তুমি কি সঞ্জয়?’ এ-প্রশ্নটা সারা দিন তার বুকে লেগে রইল।
আবার ঘুরে-ফিরে সুযোগ বুঝে কাছে এল মৃদুলা। ফিসফিস করে বলল, তুমি বরং পলাশপুরেই বাসা নাও।
দূর, ওখানে যা সাপ! কালকেই ক’জনকে কামড়েছে।
লোকে তো আছে!
দূর। সব হিংসুক—বোকা। আর কয়েক দিন দেখো না, কলকাতাতেই একটা কিছু—
মৃদুলা চলে যাচ্ছিল। তুলসী তার হাত টেনে বলে, কাল কোথায় গিয়েছিলাম জানো? গ্র্যান্ড!
হাসে তুলসী। আবার বলে, গ্র্যান্ড!
আবার উত্তেজনাহীনভাবে দিন কেটে যায়। কিছুই ঘটে না।
স্কুলে এসে একদিন তুলসী শুনল আজ খেলা আছে। জবর খেলা। টিচার্স ভারসাস স্টুডেন্টস। টিফিনের মধ্যেই টিম তৈরি হয়ে গেল। শিক্ষকদের ক্যাপ্টেন হরি চক্রবর্তী, এক সময়ে কলকাতায় সেকেন্ড ডিভিশনে কয়েকদিন খেলেছেন, বললেন, তুলসী, তুমি রোগা-টোগা আছ, ছুটতে পারবে—তুমি রাইট আউট। গতবারও রাইট আউট ছিল তুলসী, হাফটাইমের পর লাইনের ধারে নেতিয়ে বসে হাঁফিয়ে যাচ্ছিল। তবু ঠিক আছে। পাঞ্জাবিটা খুলে ধুতিতে মালকোঁচা মেরে গেঞ্জি গায়ে রাইট আউটেই দাঁড়িয়ে গেল সে।
ইচ্ছে করেই ছেলেরা আজ বুট পরে নামেনি। তবু তাদের খালি পাগুলোই লোহার মতো শক্ত। লাল-হলুদ জারসি তাদের গায়ে। যেখানেই যাচ্ছে বল সেখানেই লাল-হলুদের পা। ওদের গোলকিপার হাফিজ, ইলেভেন সায়েন্সের। তার গায়ে হলুদ গেঞ্জি, হাতে বল-ধরা দস্তানা, কপালে নামানো টুপির ঢাকনি, এ-তল্লাটের নাম-করা গোলকিপার। জলে শোল মাছ যেমন নড়ে-চড়ে তেমনি শূন্যে বাতাসের মধ্যে চলে যায় হাফিজ, পিংপং বলের মতো মাটিতে পড়ে লাফায়। হরি চক্রবর্তীর দুটো শট তুলে নিল মা যেমন শোয়ানো শিশুকে তুলে নেয়।
হাফ টাইম পর্যন্ত গোল-লেস।
এতক্ষণ মাঠে কোথাও ছিল না তুলসী। লাইন ধরে সে মাঝে মাঝে এগিয়ে গেছে, পিছিয়ে এসেছে আবার। তার দিকে বাড়ানো পাসগুলি তার কাছে পৌঁছয়নি, চলে গেছে লালহলুদের পায়ে। ওরাই তো সারা বছর খেলে, তাই বলটা ওদের পোষ-মানা, পোষা কুকুরের মতো লজ্জাহীন পায়ে পায়ে ছুটছে। সারা মাঠময় লাল-হলুদ, লাল-হলুদ ঝলকে যাচ্ছে দুপুরের রোদে। ডাঁটো শরীরের ঘাম ঠিকরে দিচ্ছে দুপুরের আলো। হরি চক্রবর্তী চেঁচিয়ে বলে, লাইনের বড় ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে তুলসী, কে এসো—পাস পায়ে যাবে না, ঢুকে এসে বল তৈরি করে নাও। তুলসী দেখে কখনও সবুজ ঘাসে, কখনও নীল আকাশের গায়ে সাদা বলখানা। খুব দুরে দুষ্পাপ্য বস্তুর মতো মনে হয়। তুলসী চেষ্টা করে না।
হাফটাইমে ভরপেট কোকোকোলা। তার শরীর হিস হিস করে। আরও ঝিমিয়ে পড়ে তুলসী। শরীরটা জুতের নেই। সেদিনের হুইস্কির ঝোঁক এখনও যেন একটা ঝিমুনির মতো রয়ে গেছে। গতকাল কত দূর মাতলামি করেছিল সে? সে কি শিস দিয়েছিল? আশ্চর্য! মৃদুলাকে শিস দেওয়ার কী আছে! শিস দিত সঞ্জয়, যেখানে মেয়েছেলে দেখত, সেখানেই দুটো আঙুল গোল করে মুখে পুরে দিত, চুঁ-হিঁ-হিঁ করে বেজে উঠত আশ্চর্য শিস। তুলসী শিখেছিল, কিন্তু কোনও দিন দেয়নি। কারণ সে তো সঞ্জয় নয়! …তার পা ছুঁয়ে চলে গেল বলটা ধীরে ধীরে লাইনের ও-পারে। থ্রো-ইন। কী খেলছে! সোজা বল— ধরতে পারলে না! তুলসী লজ্জা পায়। লোকটা বড় সিরিয়াস। ছাত্রদের সঙ্গে খেলা, তবু জান লড়িয়ে দাও। কে না জানে একটা না একটা সময়ে ওরা ঠিক গোল ছেড়ে দেবে! শিক্ষকরা জিতলে কাল ছুটি। ওরা জানে।
ওপর থেকে নেমে আসছে সাদা বলটা। তাকে লক্ষ করে। সুন্দর দেখায় বলটাকে। তুলসী অলসভাবে দেখে। বলটার পিছনে নীল আকাশ, নৌকোর পালের মতো মেঘ।
সে কে ধরবে ওই বলটা? কী স্বার্থ তার? সে তো সঞ্জয় নয়, যে অধ্যবসায়ী সঞ্জয় বউয়ের জন্য গোলাপি স্বপ্ন কিনে নিয়ে যায়, ছেলের জন্য কেনে বিলিতি ফিডার, বিকেলের অবসরে গ্রান্ডে গিয়ে বসে থাকে! কিংবা সে নয় ললিত, যে ললিত হাসপাতালের বিছানায় শোয়া—সাদা রোগা মুখখানায় নীল শিরা জেগে আছে, হাতের নলীতে ঢোকানো গ্লুকোজের ছুঁচ— জানে মরে যাবে, তবু ঠাট্টা করছে, তোর মুখটা গম্ভীর কেন রে তুলসী? তোর ভাবী বউটা কি কুচ্ছিত? মরবে তবু কেমন শান্ত! কিংবা সে নয় রমেন, যে রমেন গাড়ি চালাত, পিয়ানো বাজিয়ে গাইত পূর্ব বাংলার মাঝিদের গান, কিংবা রিলে রেসের শেষ ল্যাপ—এ ব্যাটনের জন্য হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। কী সুন্দর সেইসব ভঙ্গি রমেনের! সে তুলসীই, আর কেউ নয়। সে একফি হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলে ভরসন্ধেবেলা তার কাঁদুনে ছেলেকে ‘ও-ও’ করে ঘুম পাড়াবে, বাজারে গিয়ে পাশের লোকজনকে লক্ষ করে বলবে, এই বাজারে বাঁচা যায় না, বললেন, বাঁচা যায় না। তারপর একদিন পৃথিবীর বিশাল তার তাকে চাপা দিয়ে চলে যাবে। তবে সে কেক ধরবে এই বলটা? কী স্বার্থ তার? আশ্চর্য অভিমানে তুলসী চেয়ে থাকে।
ঝলকে ওঠে লাল-হলুল। সুঠাম চেহারার রঞ্জিত হাঁটুতে বলটা আটকে নেয়। তুলসী দেখে। এম-কম জগত্তারণ বলটা প্রাণপণে বুক দিয়ে আটকায়।
আশ্চর্য এই, বলটা তার কাছেই গড়িয়ে আসে। ধীরে ধীরে, বিনীতভাবে। অপরাধী ছাত্রের মতো এসে সামনে দাঁড়ায়। মাথা নিচু করে।
কী সংবাদ ভগ্নদূত?
তুলসী ছোটে। খুব জোরে নয়। তার পায়ে বল। লাইনের বাইরে থেকে ছেলেরা চেঁচায় স্যার, ম্যান বিহাইন্ড, ম্যান বিহাইন্ড—
এইভাবেই ছুটত রমেন, ইন-আউট ইন-আউট করতে করতে। কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে চলে যেত, তারপর হঠাৎ ঘুরে গুপ করে সেন্টার করত বল। কিংবা চিতাবাঘের মতো ডজ করতে করতে ঢুকে আসত।
সামনেই উড়ছে ছোট্ট লাল নিশান। কর্নার ফ্ল্যাগ। অনেক দূর চলে এসেছে তুলসী। এখনও তার পায়ে বল। কী করবে তা সে বুঝতে পারে না। এ অবস্থায় রমেন হলে কী করত? কালো বেঁটে বোটবেগুনের মতো চেহারা গোপীকান্ত ছুটে আসছে। তার গায়ে আগুনের মতো জ্বলছে লাল-হলুদ জারসি। ফার্স্ট ব্রাকেটের মতো বাঁকা পা দু’খানা। এত বাঁকা যে, পা জোড়া করে রাখলেও বোধ হয় মাঝখান দিয়ে বল গলে যায়।
সেই চেষ্টাই করল তুলসী। গোপীকান্তর দু’ পায়ের ভিতর দিয়ে বলটা গলিয়ে দেবার। হল না। বল ধরে উড়িয়ে দিল গোপীকান্ত। হঠাৎ নিঃস্ব মনে হয় নিজেকে।
কিন্তু এ কেমন যে, সে চিরকাল সেই তুলসী? আজন্ম? আমৃত্যু?
গোল দেওয়ার জন্য সেন্টার লাইনের ও-পাশে চলে গেছে সব লাল-হলুদ খেলোয়াড়। বুড়ো মাস্টারদের নাচিয়ে পায়ে পায়ে টোকা দিচ্ছে বল। গোলের সামনে গিয়েও ফিরে আসছে। এ-পাশে ফাঁকা সবুজ মাঠ, সামনে কেবল পায়চারি করছে একজন ব্যাক। এ-তল্লাটের সেরা গোলকিপার হাফিজ পোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, বংশীবাদক কৃষ্ণের মতো পা দু’খানা ক্রস করা, দাঁতে ঘাসের ডাঁটি চিবোয়।
হঠাৎ শূন্যপথে উড়ে আসে বল। ফাঁকা মাঠে।
ঝামেলা! তুলসী অলসভাবে এগোয়। লাল-হলুদ ব্যাক ক্লাস এইট-এর পীযূষ এগিয়ে আসে। হাফিজ ভঙ্গি বদলায়।
ফাঁকা মাঠ। উঠে আসে বল। আশ্চর্য, কাছে এসে প্রণামের মতো মাথা নিচু করে দেয় বলটা। বশংবদের মতো পায়ে পড়ে থেমে যায়। সামনে একা পীযূষ। তার লোহার ডাঙের মতো পা। তুলসী ঘুরে তাকে কাটানোর অক্ষম চেষ্টা করে। পায়ে পা লেগে খটাং শব্দ হয়। তুলসী পড়ে গিয়ে ফের ওঠে। পীযূষ তখনও মাটিতে, উঠছে। বলটা তার পায়ের ওপর দিয়ে লাফিয়ে তুলসীর কাছে চলে আসছে, শিশু যেমন অচেনা লোকের কোল ছেড়ে বাপের কাছে ছুটে আসে।
তুলসীর পায়ে বল টেনে নেয়। ছোটে।
লাইনের বাইরে থেকে ছেলেরা চেচায়, ফাস্ট টাইম স্যার, ফাস্ট টাইম—!
তুলসী দৌড়ায়। আদি অন্তহীন ফাঁকা মাঠ। কেউ নেই। কিন্তু বুকে খিঁচ ধরে ওঠে একটা ব্যথায়। তুলসী হাঁফিয়ে পড়ে। মার-মার করে ছুটে আসছে পায়ের শব্দ, হাতি-ছোটার শব্দের মতো। ম্যান বিহাইন্ড!…সে কেন নয় রমেনের মতো কুশলী? সে নয় অধ্যবসায়ী সঞ্জয়, কিংবা আত্মবিশ্বাসী ললিত। সে তুলসী, কেন সে কেবল তুলসী?
ডান ধার থেকে তুলসী ঢুকতে থাকে। এক দুই করে লাল-হলুদ জার্সি এগিয়ে আসে। তুলসী বল নিয়ে ঘুরে যায়, মানুষের অলিগলি দিয়ে ছুটতে থাকে বুকে খিঁচ-ধরা ব্যথা। সে হাঁফায়। বল তার পায়ে বশংবদ লেগে আছে, গড়িয়ে যাচ্ছে।
ফার্স্ট টাইম স্যার—গোলে মারুন!
কিন্তু কোন দিকে গোল-পোস্ট ও তুলসী উদ্ভ্রান্তের মতো তাকায়। কোন দিকে গোলপোস্ট?… ওই তো তিন, বাঁশের গোলপোস্ট, বার বাঁকা হয়ে ঝুলে আছে৷ ডান দিকে। একা হাফিজ।
বাঁ পা থেকে ডান পায়ে বল টেনে নেয় তুলসী। হঠাৎ ডান দিকে বেঁকে ছুটে যায়। সে কেন তুলসী? সে কেন চিরকাল সেই তুলসী?
লাল-হলুদ একজন, সামনে এসে ভুঁইফোঁড় দাঁড়িয়ে যায়। পা থেকে খসে যায় বল। লাল-হলুদের পায়ে চলে যায়। ছেলেটা মৃদু হাসে, মন্থর পায়ে এগোয়।…এ-অবস্থায় রমেন হলে কী করতঃ তুলসী ভেবে পায় না। সে দেখতে পায় ছেলেটার পা থেকে বল গড়িয়ে একটু এগিয়ে গেছে। ছেলেটা হাঁটতে হাঁটতে এগোচ্ছে। খুব নিশ্চিন্ত ভাবভঙ্গি। হঠাৎ রেগে যায় তুলসী। খুব রেগে যায়। সে কাছেই রয়েছে, তার ছেলেটা তেল অত নিশ্চিন্ত? কেন সাবধান হচ্ছে না? অবহেলা!
হঠাৎ হালকা পায়ে ছুটে আসে তুলসী। ছেলেটার পা থেকে তিন-চার হাত দূরে বল গড়িয়ে যাচ্ছে। তুলসী টুক কার বলটা সরিয়ে নেয়। ছেলেটা বোকার মতো চেয়ে থাকে। তাকে সময় দেয় না তুলসী, দিশেহারার মতো বাঁ দিকে ঘুরে এগোয়।
সামনেই গোলপোস্ট। হাফিজ দাঁড়িয়ে, হলুদ গেঞ্জি, চামড়ার দস্তানায় ঢাকা দু’খানা হাত— তৈরি—তার মুখে টুপির ছায়া—অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে ক্রুর চোখ। ফণা তুলে অল্প অল্প দোলে হাফিজ।
হাঁটু ভেঙে আসে। হাফিজের মুখোমুখি হঠাৎ মনে হয়, সে পারবে না। অসম্ভব।
বলে পা লাগার টুম শব্দ হয়। সে মেরেছে কি? হ্যাঁ, মেরেছে।
হাফিজ শূন্যে ভেসে যায়।
হঠাৎ বাতাস ছুটে এসে গায় লাগে।
গো-ও-ও-ও-ল! গো-ও-ও-ও-ল! গো-ও-ও—
মাঠের বাইরে ছেলেরা নাচছে। মাঠের ভিতরে ছুটে আসে ছেলের পাল।
হরি চক্রবর্তী জড়িয়ে ধরে, জগত্তারণ কাঁধে তুলে নেয়।
তুলসীর কাছা খুলে ঝুলতে থাকে।
কাল ছুটি।
বিকেলে দু’খানা সিনেমার টিকিট কাটে তুলসী। তারপর প্রথমেই গেল ললিতের বাসায়। গিয়ে শুনল, আদিত্য আর বিমানকে নিয়ে দুপুরে বেরিয়েছে ললিত। কী একটা ব্যাপার আছে ওদের। বলে গেছে বিকেলে নাকি ওরা মুরগি এনে ফিস্টি করবে। তুলসী তাই ললিতের মা’র সঙ্গে বসে একটু গল্প করল। তারপর এক কাপ চা খেয়ে উঠে পড়ে। বাসায় এসেই মৃদুলাকে তাড়া দেয়, তাড়াতাড়ি শাড়ি-টাড়ি পরে নাও। বুকপকেট থেকে সিনেমার টিকিট দু’খানা উঁচু করে দেখায়।
ও মা! মৃদুলা বলে। তারপর নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, মাত্র আমরা দু’জন? বাসার লোকে কী মনে করবে!
করুক গে। তুমি তাড়াতাড়ি করো। সময় নেই।
তুলসীকে খুব উত্তেজিত দেখায়। মাঝে মাঝে সে আপনমনে হাসছে।
সিনেমা হলের উলটো দিকে সুরুচি কেবিন। তুলসী বলল, চলো।
মৃদুলা ইতস্তত করে, দেরি হয়ে যাবে।
দূর। নিউজ রিল আগে শেষ হোক।
কবিরাজি কাটলেট কেটে গরম টুকরোটা মুখে দিয়ে তুলসী চোখ নামায়, কেমন?
মাংস ডিম আর ঘিয়ের স্বাদে মুখ ভরে যায়, মৃদুলা লজ্জায় হাসে, রোজ খেতে ইচ্ছে করে। বাসার রান্নায় এখন রুচি হয় না। ভাতের গন্ধে বমি হয়ে যায়।
রোজ খাওয়াব।
দূর। রোজ কি আসা হবে বাইরে?
কেন! বাসায় নিয়ে যাব!
মৃদুলা চোখ গোল করে, বাসায় এত লোক, সকলের সামনে?
তা কেন? লুকিয়ে নিয়ে যাব, রাতে শোয়ার সময়ে দরজা বন্ধ করে মশারির মধ্যে বসে খাবে!
মৃদুলা হাসে, তা কি হয়?
কেন হবে না? আপৎধর্মে সব হয়। সবাইকে অত খাতির করলে চলে না। দেশের বাড়িতে মাকে দেখেছি মশারির মধ্যে বাবা এনে খওয়াত। তখন ছোট ভাইটা পেটে—যে বাঁচল না। তুমিও খাবে।
মৃদুলার মুখ ঝলমল করে। উত্তেজনায় খাবারের স্বাদ পায় না তুলসী। চোখের সামনে অবিকল দেখতে পায় হাফিজকে—শূন্যে অসহায় হাত বাড়িয়ে ভাসছে। খেলার শেষে হেডমাস্টার বলছে, খুব অ্যাকিউট অ্যাঙ্গেল থেকে মেরেছিলে হে—হেরিয়েলি—ভেরি গুড—। গোলটার কথা ভাবতে ভাবতে আপনমনে শূন্যে তুলসীর পা উঠে যায়। নিজেকে সামলায় তুলসী। মৃদুলা দেখলে হাসবে।
ইন্টারভ্যালে প্যাকেটে পোট্যাটো চিপস ফেরি করছিল সাদা ইউনিফর্ম পরা ট্রে-হাতে একটা লোক। তুলসী হাত বাড়িয়ে বলল, দুটো দেখি।
মৃদলা মৃদু ঠেলা দিয়ে বলল, একটা নাও।
দূর
একটু পরে দাম নিতে ঘরে এল লোকটা। দেড় টাকা। শুনে চমকে উঠল তুলসী। মৃদুলা চোখ গোল করে ফিসফিস করে বলল, ও মা! এইটুকু আলুভাজা। কী গলাকাটা নাম গো!
তুলসী মৃদু হাসে, ঠিক আছে।
একদিন সে সঞ্জয়ের সঙ্গে গ্র্যান্ডে গিয়েছিল। সেই স্মৃতি থেকে সামলে নিল ব্যাপারটা। রোজ তো আর নয়। বরং আর কোনও দিন আগে থেকে দাম না জেনে সে পোট্যাটো চিপস কিনবে না।
বেরিয়ে আসার সময় তুলসী দেখে মৃদুলার চোখ লাল। সে জিজ্ঞেস করল, কেঁদেছিলে?
মৃদুলা ম্লান হেসে বলে, ইস, কী কষ্টের ছবিটা!
তুলসীর হঠাৎ বড় মায়া হয় মৃদুলার জন্য।
লবিতে প্রচণ্ড ভিড়, নাইট শোয়ের লোকেরা ঢোকার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সেই ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ শিউরে কেঁপে উঠে তুলসীর হাতখানা চেপে ধরল মৃদুলা। বলল, দেখো দেখো, ওই লোকটা—ওই নীল জামা পরা—আমার ঊরুতে চিমটি কেটে পালাচ্ছে। ওকে ধরো—ওই যে—
কই? কোথায়? দিশেহারার মতো বলে তুলসী।
মৃদুলা তাড়া দিয়ে বলে, ওই যে—ও পালিয়ে যাচ্ছে—ছুটে ওকে ধরো।
তুলসী দেখতে পেল লোকটাকে। নীল হাওয়াই শার্ট আর প্যান্ট পরা, লম্বা কালো কালো বিশ্রী চেহারা। কিন্তু দেখেও দেখল না তুলসী। ওকে ধরে কী করবে সে? কী করতে পারে? ওই মস্ত লম্বা লোকটাকে কীভাবে বা ধরবে তুলসী? খুবই অসহায় বোধ করে সে। তবু অনিচ্ছার সঙ্গে এগিয়ে একটু এদিক-ওদিক দেখে ফিরে এসে তুলসী বলে, নাঃ, পালিয়ে গেছে।
অপমানে লজ্জায় মৃদুলার চোখ-ভরা জল, বলল, তোমার চোখের সামনে দিয়ে গেল, তুমি দেখতে পেলে না?
তুলসী দার্শনিকের মতো বলে, যেতে দাও। কত বদমাইশ মতলবাজ লোক রয়েছে পৃথিবীতে! সবাইকেই কি ধরা যায়! কত ধরবে তুমি, অ্যাঁ?
বাস-স্টপে এসে মৃদুলা চোখ মোছে। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, লোকটার মুখটা ঠিক দেখতে পাইনি। কিন্তু ঠিক বিভুর মতো। বিভুরও এই রকম বদমাশের মতো চেহারা। ওই রকম কালো লম্বা। ধরতে পারলে আমি ঠিক চটি খুলে মারতাম।
রাত্রি। তুলসী শুয়ে ছিল। গা হাত পায়ে হাজারটা ফোঁড়া টনটন করে, হাত-পা নাড়তে কষ্ট হয়, দম নিতে বুক ফেটে যায়। মনে হয় খুব জ্বর আসছে।
মৃদুলা নরম হাতে তার হাঁটু টিপে দিতে দিতে বলল, কেন ওইসব খেলতে যাও! হাত-পা ভাঙলে, তখন?
তুলসী মৃদু কাতর ধ্বনি করে। তারপর আস্তে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, ওই লোকটা কি সত্যিই বিভু, তুমি ঠিক দেখেছিলে?
মৃদুলা ঠোঁট ওলটায়, কী জানি! মনে হয়েছিল তো। হনহন করে পালিয়ে গেল, মুখটা দেখা গেল না।
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে তুলসী, তারপর ঘুমোবার আগে উদাস গলায় বলে, কলকাতাটা বড্ড নোংরা, বুঝলে? একেবারে নোংরা শহর। সম্মান নিয়ে থাকা যায় না। এই ভিড়ভাট্টা গণ্ডগোলের মধ্যে—দূর, দুর—তার চেয়ে ঢলো পলাশপুরেই চলে যাই। ওখানে খেতখামার করব, বুঝলে? খেতখামার— একটা গোরু পুষব—কাছেই একটা ভেড়ি আছে—টাটকা মাছ—মাস্টারমশাই বলে ওখানকার লোক সম্মান করে খুব—গাঁয়ের মানুষ তো—সরল সোজা—
বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ে।
ওদিকে শাশ্বতীকে বাসে তুলে দিয়ে সারা বিকেল বিমান এসপ্ল্যানেডে ঘুরে বেড়িয়েছে। ময়দানের ও-ধারে গড়ের পিছনে দেখেছে আশ্চর্য সূর্যাস্ত। তুলিতে আঁকা গোধূলির ছবি। না, ঠিক গোধূলি নয়, গোরু ছিল না, মানুষের পায়ে পায়ে উড়ছিল ধুলো। ফুচকাওলাকে ঘিরে মানুষের ভিড়, চ্যাপটা মাটির উনুনে ভুট্টা পোড়াচ্ছে দেহাতি মানুষ, মনুমেন্টের তলায় মিটিং। সে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। ট্রাম লাইনের ওপরে তারের জটিলতা, লক্ষ করল সে, কার্জন পার্কে বসে আছে অলস মানুষ।
সুন্দর এক দৃশ্য দেখল সে। প্রাইভেট বাসের হাতল ধরে পড়ো-পড়ো মানুষকে বুকে জড়িয়ে তুলে নিল বিশাল চেহারার পাঞ্জাবি কন্ডাক্টর। একটা বাচ্চা ভিখিরির ছেলেকে হাত ধরে রাস্তা পার করে দিল ট্রাফিক পুলিশ। কৃতজ্ঞতায় তার চোখে জল এসে গেল।
প্রতিটি মানুষকেই ডেকে একটি-দু’টি কথা বলতে ইচ্ছে করে। অচেনা মানুষের কাঁধে হাত রেখে কয়েক পা হাঁটতে সাধ হয়। তার চারদিকে অসহায় জন্মান্ধ সব মানুষ, জানে না কোথা থেকে কীভাবে এসেছে। জিজ্ঞেস করলে বড় জোর বাবার নাম বলতে পারে—তার বেশি কিছু নয়। এইখানে মিটিং করছে কিছু লোক, কী বলছে ওরা? বিমান এগিয়ে শোনে। শিগগিরই ধর্মঘট। বাংলা বন্ধ। ট্রেনের চাকা চলবে না। কারখানায় চাক্কি বন্ধ। অফিস ফাঁকা থাকবে। বড় রাস্তায় ফুটবল খেলা হবে। একদিন ছুটি।
ছোট্ট একটা মিছিল আসছে মিটিঙের দিকে। রোগা ক্রুদ্ধ মানুষেরা হাত তুলে চেঁচাচ্ছে, নিপাত যাক। —নিপাত যাক।
জন্মান্ধ মানুষ। জানে না বিদ্রোহ বিপ্লবের বীজ নষ্ট করে দেয়। শতকরা পঞ্চাশ ভাগ দাবি মিটলেই এরা ঝিমিয়ে পড়বে। রেলের চাকা চলবে। কারখানায় চাক্কি ঘুরবে। অফিসে বশংবদ মানষেরা মাথা নিচু করে ঢুকে যাবে। আজকাল আর তেমন মানুষের জন্ম হয় না, তেমন ল্যাংটা মানুষের, যে পৃথিবী কাঁপায়। যার দাবি-দাওয়া অভিশাপ নেই, যে দিতে আসে।
একটু আগেই সে একটা কাজ করেছে। খুব সাহসের কাজ। নিজেকে তাই খুব সজীব বলে মনে হয় তার। সে লোকের চোখে চোখ রেখে হাসে, তারপর তাদের পেরিয়ে হেঁটে যায়।
ট্রামে উঠে বিমান দেখল পিছন দিককার লম্বা সিটে প্রকাণ্ড চেহারার একটা লোক অনেক জায়গা নিয়ে বসে আছে। তার মুখে মদের গন্ধ, কড়া চোখে চার দিকের রোগা লোকগুলোর দিকে তাকাচ্ছে। সে একটু সরে বসলে তার পাশে একজন রোগাটোগা লোকের জায়গা হয়ে যায়। কিন্তু কেউ বসতে সাহস করছে না।
চোখে চোখ পড়তেই বিমান একটু হাসে, ভরাট সুন্দর গলায় বলে, একটু সরে বসুন।
লোকটা কেঁপে ওঠে। প্রকাণ্ড লোকটা কুঁকড়ে সরে যায়। বিমান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বসে। দাঁড়ানো লোকগুলো ঈর্ষার চোখে তার মাথার ব্যান্ডেজ লক্ষ করছে। এরা হয়তো আজ বাসায় ফিরে বউয়ের কাছে বিমানের আশ্চর্য সাহসের গল্প করবে।
শরীরটা ভাল নেই। বড় রাস্তা থেকে বিমান একটা রিকশা নিল। ঘরের সামনে রিকশাটা ছেড়ে দেওয়ার সময়ে দেখল রিকশার গায়ে একটা পোস্টার। মৃদু রাস্তার আলোতে বিমান পড়ল, তাতে লেখা, দিন আনি দিন খাই, বাংলা বন্ধে উপোস যাই।
ওধারে যে মিটিং হচ্ছে, এধারে তারই প্রতিবাদ।
এটা কী? বিমান জিজ্ঞেস করে।
লোকটা কপালের ঘাম মুছে বলে, কী জানি বাবু। একজন লাগিয়ে দিয়েছে, বলেছে ছিঁড়ে ফেললে মাথা নামিয়ে নেবে। কী লেখা আছে ওতে?
লেখা আছে, তুমি দিন আনে দিন খাও, বাংলা বন্ধে তুমি উপোস যাবে।
লোকটা হাসে।
তুমি বাংলা বন্ধ চাও না?
কী জানি। লোকটা উদাস গলায় বলে।
ওর কেবল মনে পড়ে গত বর্ষার কথা। বর্ষাকাল রোজগারের সময়। যখন কলকাতায় রিকশা ছাড়া যানবাহন নেই। আবার এক বছর পর আসবে সেই সময়। তখনই বিপ্লব। মাঝখানে বাবুমানুষেরা যা খুশি করে নিক, কিছু যায় আসে না।
রাতের খাবার নিয়ে এল শম্ভু। সঙ্গে সুবল।
ললিতার শরীর খারাপ। খাবার পাঠিয়ে দিলেন।
টিফিন ক্যারিয়ারটা ফেরত নিয়ে যাবে বলে ওরা বসে রইল। খাটের ওপর পাশাপাশি। মেঝেতে বসে নিঃশব্দে খেয়ে নিচ্ছিল বিমান।
হঠাৎ সুবল বলে, বালিগঞ্জের এ কে দত্তকে আপনি চেনেন?
বিমান মুখ ফেরাল, চিনি।
সুবল বলে, তার মেয়ে অপর্ণা, গান গায়, তাকে?
বিমান মাথা নাড়ে, চিনি, ছেলেবেলা থেকে।
আপনাদের সম্পর্কটা কী?
বিমান হাসে। তারপর তার সুন্দর ভরাট গলায় বলে, অপুর সঙ্গে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। ছেলেবেলা থেকে। ওদের বাড়ি আর আমাদের বাড়ি একই গ্রামে, পাশাপাশি। ছেলেবেলায় আমি ভাল ছাত্র ছিলাম। সকলেই আশা করত আমি বড় কেউ একজন হয়ে উঠব। ওরা আমাকে তখন থেকে পছন্দ করে রেখেছিল।
আর, এখন? সুবল প্রশ্ন করে।
বিমান মাথা নাড়ে, এখন আর ওরা আমাকে পছন্দ করে না। কেননা, আমি তেমন কিছু হইনি। ওরা কথা ফেরত নিয়েছে। কিন্তু অপুর বোধবুদ্ধি পাকেনি, সে ছেলেবেলা থেকেই জানে একদিন আমি তার স্বামী হব। আমি তার চিরকালের খেলাঘরের পুতুলের বর। সে আমাকে ছাড়তে পারছে না। এখনও নেশার ঘোরে আমার কাছে চলে আসে। বুদ্ধি পাকলে আর আসবে না। ও এখনও বুঝতে পারছে না যে, আমি কিছু নই।
আর আপনি? আপনার কোনও দুর্বলতা নেই?
না। বিমান মাথা নাড়ে। আস্তে আস্তে বলে, আমি বিশেষ কোনও মেয়ের প্রতি দুর্বল নই। আমার দুর্বলতা সন্তানের প্রতি।
বিমান নিঃশব্দে খায়। তারপর হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে ভ্রূ কুঁচকে বলে, আমি অঙ্ক কষে বিয়ে করব। খুব ধীরেসুস্থে, ভেবেচিন্তে। তারপর পৃথিবীতে এমন একজন মানুষের জন্ম দেব, এমন একজন—
বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে বিমান, কথা আটকে যায়! সময় নিয়ে সামলে ওঠে। ধীরে ধীরে বলে, এমন একজন, যে ঠিক আমার মতো নয়। সে আমার চেয়ে অনেক লম্বা-চওড়া হবে—অনেক সুপুরুষ—সে আমার চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী হবে—চক্ষুষ্মান—সে নিজের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দেখতে পাবে। সে জানবে সে কোথা থেকে এল—সে পৃথিবীতে কোনও দাবিদাওয়া নিয়ে আসবে না—সে দিয়ে যেতে আসবে—স্বভাবেই সে হবে ঐশ্বর্যবান। পৃথিবী এ-রকম একজন মানুষের জন্য বসে আছে।
কী করে আনবেন? সুবল জিজ্ঞেস করে।
ঠিক মতো বিয়ে করলে—দেখেশুনে, অঙ্ক কষে—
পারবেন? সুবল আর শম্ভু হাসে।
বিমান মাথা নাড়ে, কে জানে! আমি যদি না পারি তবে আমার ছেলে চেষ্টা করবে, কিংবা তার ছেলে। আমার বংশে এ-রকম চেষ্টা থেকে যাবে। ও-রকম একজন পৃথিবীতে আসতে আমাদের কত জন্ম কেটে যায়!
কার মতো হবে সেই ছেলে? কার্ল মার্ক্স, না স্বামী বিবেকানন্দ? সুবল জিজ্ঞেস করে।
কার্ল মার্ক্স, না স্বামী বিবেকানন্দ? কথাটা বুঝতে পারে না বিমান। কেবল বিড়বিড় করে। হ্যাঁ, কার্ল মার্ক্স, সেই দাড়িওয়ালা স্মিতমুখ সাধুসন্তের মতো লোকটা, যে বলছে যে, সে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে, মানুষের সপক্ষে। যে-লোকটা উলটে দিচ্ছে পৃথিবীর দান! অদ্ভুত মনোবল লোকটার। হ্যাঁ, কার্ল মার্ক্সকে চেনে বিমান। কিংবা বিবেকানন্দ! শিকাগো স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যে লোকটা কেবল গেরুয়া আলখাল্লা আর পাগড়ি মাথায় কাঠের প্যাকিং বাক্সে বসে রাত কাটাচ্ছে, তবু সোজা দাঁড়িয়ে বলছে, আমি তোমাদের ভ্রাতা, তোমরা আমার প্রিয় ভ্রাতা ও ভগিনী। আমি জীবকে ঈশ্বর বলিয়া জানি। ঈশ্বরলাভই প্রতিটি জীবনের লক্ষ্য।…কিন্তু কার মতো হবে সেই মানুষ, কে জানে? বিমান বিড়বিড় করে, কিন্তু থই পায় না। বস্তুত পৃথিবীর কোনও মানুষের সঙ্গেই তার সেই স্বপ্নের মানুষটির অবিকল মিল নেই।
টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে ওরা চলে গেলে বিমান আপনমনে বলল, আজ রাতে আমি গীতা পড়ব। অনেককাল পড়ি না।
সুবল শম্ভুকে বলল, লোকটা বদ্ধ পাগল।
শম্ভু একটু চুপ থেকে বলে, এ কে দত্তকে তুই চিনলি কী করে?
বাড়ি পর্যন্ত গেছি মেয়েটাকে ‘ফলো’ করে। বাড়ির গেটে নামের ট্যাবলেট ছিল। সেই দেখে ফোন করেছিলাম।
কী হল?
ফোন করে বললাম যে, আপনার মেয়ে একজন খুব বাজে লোকের সঙ্গে মিশছে। ও-পাশ থেকে গমগম করে লোকটা জিজ্ঞেস করল, আপনি কে? আমার ফোন নম্বর জানলেন কী করে? বললাম, আমি সুবল মিত্র। বি-কম পাশ! ওই বাজে লোকটা যে পাড়ায় থাকে সেই পাড়াতেই থাকি, ফোন নম্বর পেয়েছি ডিরেক্টরিতে। লোকটা তবু ছাড়ে না, বলল ডিরেক্টরিতে পেলেন তো আমার নাম নিশ্চয়ই জানা ছিল। কোথা থেকে জানলেন? বলতে তো পারি না যে আপনার মেয়েকে ‘ফলো’ করেছিলাম, তাই অনেক কায়দা-কসরত করতে হল। বললাম, আপনি অত বড় ফার্মের মালিক, আপনাকে কে না চেনে? তখন বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে। বিমান রক্ষিতকে আমি চিনি। ব্যাপারটা দেখব। বলে ফোন রেখে দিল।
সুবলের বুক জ্বালা করে ওঠে। সে যে বি কম পাশ এ-কথা কেন বলতে গেল? আজকাল কি বি কম পাশের কোনও দাম আছে? খামোকাই সে বলেছে কথাটা, বোকার মতো।
বিমান রক্ষিত বেঁচে গেল। কারণ, অপর্ণা দত্তর সঙ্গে ওর প্রেম নেই। থাকলে? থাকলে—সুবলের গা হাত শিরশির করে ওঠে। কেন থাকবে? ওই বড় বাড়ি, যার চূড়ায় পাথরের পরি, অনেকখানি জমিতে বাগান, সে-বাড়ির মেয়ে কেন প্রেম করবে কর্পোরেশনের জমাদারদের হাজিরাবাবুর সঙ্গে? কেন করবে?
ওদিকে রাতের গাড়িতেই কলকাতা ছেড়ে গেছে আদিত্য। ভোররাত্রে বিহারের এক জংশন স্টেশনে নেমেছে সে। বেশ শীত। অল্প কুয়াশা।
স্টেশনের বাইরে বাঁধানো চত্বরে কয়েকটা টাঙ্গা, রিকশার সারি দাঁড়িয়ে আছে। রাত-জাগা কিংবা ভোরে-ওঠা লোকেরা ছোট দোকান থেকে ভাঁড়ে চা খাচ্ছে।
চারটে বেজে দশ মিনিট। এত ভোরে আদিত্য কখনও ওঠে না। এখনও ঘোর অন্ধকার চারদিকে। কোথায় যাবে ঠিক ছিল না। ট্রেনে এক বুড়ো লোক সঙ্গী ছিল। তার কাছেই জেনেছে যে, এইখানে থাকার মতে একটা ডাকবাংলো আছে।
সে একটা ছোকরা টাঙ্গাওলাকে ডাকবাংলোর কথা বলে জিজ্ঞেস করল, কেতনা লেগা?
দু’ টাকা।
দূর। একটুখানি পথ।
চড়াই উতরাই আছে বাবু। পাহাড়ি জায়গা!
আদিত্য হাসল, আর যদি মাঝপথে টাঙ্গা থামিয়ে গলায় ছুরি দাও!
লোকটা হাসে।
টাঙ্গা দুলতে দুলতে চলে। একটা বিশাল উতরাই ভাঙতে থাকে।
আকাশের গভীর রং থেকে একটা আভা আসে। আদিত্য দেখে ডান দিকে একটা উপত্যকা নেমে গেছে। বাঁ দিকে দূরে পাহাড়। খোলা মাঠ বেয়ে আসছে বহু দূরের গন্ধমাখা বাতাস।
ভোরবেলা জায়গাটা সুন্দর দেখাবে। ভাবে আদিত্য।
এইখানে যদি আশ্রয় পায় তবে একা একা অনেক দিন থাকবে সে। অনেক দিন সে আর লোকালয়ে ফিরে যাবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন