পঞ্চবিংশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পঁচিশ

লোকটা বলেছিল, ‘জানি’। কী জানে লোকটা? রাত আটটা নাগাদ হাওড়া স্টেশনে নেমে বিভু ভিড়ের মধ্যে লোকটার পিছু নেয়। লোকটার ডান হাতে সুটকেস, বাঁ বগলে শতরঞ্জিতে বাঁধা ছোট বিছানা, মফস্সলির মতো হাবভাব। কিন্তু ও কিছু একটা জানে। নিশ্চিত। গতকাল থেকেই বিভুর মন ভাল নেই। মানুষ কত সহজেই টুক করে মরে যায়! এই তো একটু আগে বর্ধমানের কাছে কাটা পড়ল একটা লোক, এই লম্বা লোকটা গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল, কয়েক পলক এই লোকটার দিকে চেয়ে কাটা-পড়া মানুষটা মরে গেল। কী সহজ ব্যাপার! গতকাল আর-একটা লোক ঠিক ও-রকমই সহজভাবে মারা গেছে দুর্গাপুরে। ইউনিয়নের সেই লোকটা কীরকম ছিল কে জানে! বিভু তাকে চেনেও না। লোকটা সকালের শিফ্টে ডিউটিতে যাচ্ছিল, অল্প কুয়াশায় আবছা মাঠের ভিতর দিয়ে, একটা টিফিন-ক্যারিয়ার আর একটা থলে হাতে চলে আসছিল সে, সদ্য ঘুমভাঙা চোখে তখনও বোধ হয় বউ কি বাচ্চার মুখখানা ভাসছিল তার। অতশত জানে না বিভু, সে কেবল লোকটিকে আসতে দেখেছিল। লোকটা থেমে একটা বিড়ি ধরাচ্ছিল, বিভু হাতে বাঁধা বোমাটা টপকে দিয়ে দৌড় দিল। রেল লাইনের ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল জিপ গাড়িটা, তাকে তুলে নিল। জিপ গাড়িতেই টাকার লেনদেন হয়ে গেছে। এখন পকেট গরম, বিভু ফিরছে কলকাতায়। কিন্তু তবু গতকাল থেকেই তার মন ভাল নেই। দুনিয়াভর এত মানুষ, তার মধ্যে দু’-একজন মরে গেলে কী হয়! কিছুই না, তেমন কিছুই হয় না। এই যে বর্ধমানের কাছে কাটা পড়ল লোকটা তার জন্য কী হয়েছে। ট্রেনটা আধ ঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিট দেরিতে এসেছে, তার বেশি কিছুই হয়নি। কামরার মধ্যে মানুষেরা ‘আহা, উঁহু’ করছিল বটে, কিন্তু দুঃখের চেয়েও তারা বিরক্তই হচ্ছিল বেশি ট্রেনটা লেট হচ্ছে বলে। কেবল ওই লম্বা লোকটা যার হাতে টিনের সুটকেস, বগলে বিছানা, কেবল ওই লোকটাকেই অন্য রকম দেখেছিল বিভু। কাটা ছেঁড়া থ্যাঁতলানো হয়ে যাওয়া মানুষটাকে বুকে জাপটে ধরেছিল। বিভুর মনে ভাল লাগেনি। অত আদরের কী আছে? পৃথিবীর দু’-চারজন লোক কমে গেলে ক্ষতি কী? কালকের ইউনিয়নের সেই লোকটাই বিভুর প্রথম ‘কেস’ নয়। এর আগে আর একজন তার হাতে গেছে কলকাতায়। দু’বারই দুই ঘটনার সময়ে বিভুর একটা অদ্ভুত দৃশ্য মনে পড়েছিল। অনেক দিন আগে দেশের বাড়িতে বাবা খেতের কাজ করতে যেত। বেলাশেষে তার জন্য ভাত বয়ে নিয়ে যেত বিভু। একদিন ভাত দিয়ে ফেরার সময়ে আলপথে খেলতে খেলতে অন্যমনে ফিরছিল বিভু। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন ভীষণ চিৎকার করে ডাকল, ভাই রে-এ। পিছন ফিরে সে দেখল একজন মুসলমান লোক লম্বা লাঠি উঁচু করে ধরে চেঁচিয়ে বলছে, ভাই রে, তুই এঁকেবেঁকে ছোট, এঁকেবেঁকে ছোট… আর তখন বিভু দেখতে পেয়েছিল চষা জমির ওপর দিয়ে তার পিছু নিয়েছে কাল-কেউটে… বিভু ছুটেছিল। আর তার ছায়ায় ছোবল মারতে মারতে পিছু পিছু সাপটা। ‘ভয় নাই রে, এসে গেছি…’ বলতে বলতে মাঠটা কোনাকুনি পার হয়ে এল সেই মুসলমান লোকটা, লম্বা লাঠির এক ঘায়ে সাপটাকে নিশ্চল করে দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে সাপটাকে বলল, আর একটু হলিই আমার ভাইটারে খেয়েছিলি শালা…। অনেক দিন আগের সেই ঘটনা তবু দু’ বারই বিভুর সেই দৃশ্যটা মনে পড়েছে। চষা নিষ্ফলা জমির ওপারে উঁচু আলের ওপর দাঁড়িয়ে শেষ বেলার ম্লান আলোর ছায়ার মতো একজন মুসলমান লোক লম্বা লাঠি উঁচু করে তাকে চেঁচিয়ে বলছে, ভাই রে, তুই এঁকেবেঁকে ছোট, এঁকেবেঁকে ছোট… বিভুর মন ভাল লাগে না। গতকাল সকালবেলা লোকটাকে বোমা মেরে যখন জিপ গাড়ির দিকে দৌড়াচ্ছে বিভু তখনও হুবহু সেই দৃশ্যটা দেখতে পেয়েছিল, নিস্তেজ বিকেলে তার পিছু নেওয়া সেই সাপ, দুরে আলের ওপর দাঁড়ানো সেই লাঠি-হাতে মুসলমান লোকটা চেঁচিয়ে বলছে, ভাই—রে-এ-এ—

এই লম্বা চেহারার লোকটা বলেছিল, ‘জানে’। কী জানে ও? কেমন করে জানে?

হাওড়া স্টেশনের প্রকাণ্ড হলঘর আর চাতাল পার হয়ে সিঁড়িতে পা দেওয়ার মুখে সে পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে লোকটাকে স্পর্শ করল।

রমেন মুখ ঘুরিয়ে দেখল, দুর্গাপুরের সেই ছেলেটা।

কোন দিকে যাবেন? ছেলেটা জিজ্ঞেস করে।

রমেন মৃদু স্বরে বলে, যাদবপুরের দিকে।

আমিও, ওই দিকেই। ট্যাক্সি নেব, আপনাকে পৌঁছে দিতে পারি। যাবেন?

না, বিভু যাদবপুরের দিকে যাবে না, সে যাবে বেহালা। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। সে বরং ঘুরপথে লোকটাকে যাদবপুরে নামিয়ে দিয়েই যাবে। জানা দরকার এ-লোকটা কী জানে! কতটুকু জানে!

রমেন হাসল। তারপর মাথা নেড়ে জানাল, যাবে।

ট্যাক্সিতে ছেলেটা রমেনকে সিগারেট দিল। দু’-একটা মামুলি কথাবার্তা বলল। তারপর চুপ করে রইল।

বাইরে কলকাতা। আরও পুরনো আরও ঘিঞ্জি হয়ে গেছে। যেন প্রাণপণে রুজ-পাউডার মেখে আছে এক বুড়ি ট্যাঁশ মেম! ভ্যানিটি ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে নিয়েছে বাজার করার চটের থলে। মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠে ট্রাফিকের সুন্দর হলুদ বাতিটি। বিধাতার মতো আত্মবিশ্বাসে হাত বাড়ায় মোড়ের পুলিশ। মতলববাজ মানুষের চোখ জোনাকি পোকার মতো জ্বলে উঠেই ভিড়ের মধ্যে নিবে যায়।

রমেন বাইরের দিকে চেয়ে ছিল।

ছেলেটা তার দিকে একটু ঝুঁকে বলল, আমার চেহারা দেখে কিছু বোঝা যায়?

রমেন একটু নড়ল। তারপর তার স্বচ্ছ সুন্দর মুখখানা ফেরাল ছেলেটির দিকে। নরম গলায় বলল, চেহারায় মানুষের কর্মের কিছু কিছু ছাপ থাকে।

আমার আছে?

রমেন মাথা নাড়ল, আছে।

আছে। তবে আছে। অধৈর্য বিভু সিগারেট বাইরে ছুড়ে দেয়। তার চেহারায় ছাপ পড়ে গেছে। আসলে এ-সবের জন্য দায়ী একটি মেয়ে। মৃদুলা। দেখতে এমন কিছু সুন্দর ছিল না। রং ময়লা, গালে এক-আধটা ব্রণ, নাক ভোঁতা। তবু কী যে টান ছিল তার। বিভু কথা বলতে পারেনি কোনও দিন, তার বুক কাঁপত। সে বিয়ে করতে চেয়েছিল, মৃদুলার বাপ জাত দেখাল। তারপর সরিয়ে নিয়ে গেল মৃদুলাকে কোথায়! তার হাতের বাইরে। আক্রোশে বিভুর সমস্ত শরীর ঝিনঝিন করে, মাথায় রক্ত উঠে আসে ছল ছল করে। তার কাছে মানুষের মূল্য কমে যায়। পৃথিবীতে এত মেয়ে আছে, তার মধ্যে সে একজন সামান্য মৃদুলাকে চেয়েছিল— যার নাক ভোঁতা, গালে ব্রণ, রং ময়লা। সে ওই ব্রণগুলিতে আদরের হাত বুলিয়ে দিত, ঠোঁট ছোঁয়াত চাপা নাকটিতে, নিজের গায়ে মেখে নিত ওর ময়লা রং। কত কথা মৃদুলাকে বলবার জন্য মনে মনে তৈরি করেছিল সে, যখন একমাত্র মৃদুলাকে চায় সে, তখন একমাত্র সেই মৃদুলাকেই পাচার করে দেওয়া হল অন্য জায়গায়। সে জানে মাস দেড়েক আগে মৃদুলার বিয়ে হয়ে গেছে। তাকে পাত্তা দিল না মেয়েটা। ঠিক আছে। তবে এবার পাত্তা দাও বিভুকে, পৃথিবীর মানুষ। বুটের লাথি খেয়ে পাত্তা দাও, ছোরা খেয়ে ঢলে পড়তে পড়তে, আচমকা বোমা খেয়ে উড়ে যেতে যেতে…। দেখো হে, আমি বিভু—বিভু মাস্তান। বাপের সুপুত্র। কোথায় যাবে মৃদুলা? একদিন ঠিক দেখা হয়ে যাবে। বিভু জানে।

খ্যাপাটে চোখে বিভু তার দিকে তাকাল, কীসের ছাপ পড়েছে আমার চেহারায়?

হাত বাড়িয়ে রমেন তার হাতখানা ধরল। ম্লান মুখে বলল, আপনি তো জানেন।

বিভু হাত টেনে নেয়, কিন্তু আপনি কী করে জানলেন? ওস্তাদের মতো বললেন জানি! কী জানেন আপনি? আপনি কি জ্যোতিষ?

রমেন মাথা নাড়ল, না।

তবে? বিভু বিহ্বলভাবে চারদিকে চায়। বলে, আপনি তবে কোথাও আমাকে দেখেছেন! কোথায়?

একটি কিংবা দু’টি খুন করার পর মানুষের চোখ স্থির হয়ে যায়। বাইরে থেকে দেখায় শান্ত, কিন্তু আসলে তা শান্ত নয়। তখন চোখের পাতার একটা গাঢ় ছায়া পড়ে মণিতে। রমেন তা জানে। কিন্তু কী করে তা বলবে রমেন, অত আন্দাজি কিছু বলা যায়!

রমেন একটু কাশল। তারপর ঘুরিয়ে দিল কথাটা, না, আপনাকে এর আগে কোথাও দেখিনি। তবে আপনার চেহারা দেখে মনে হয় সম্প্রতি আপনার কোনও আপনজন মারা গেছেন।

মুহূর্তে আত্মবিস্মৃত হয়ে যায় বিভু, হঠকারীর মতো বলে ফেলে, না, না, তারা কেউ আমার আপনজন ছিল না। আমি তাদের চিনতামই না।

রমেন বুঝতে পারে ছেলেটা প্রকৃতিস্থ নেই। সে ত্বরিতে ওর হাত নিজের কোলের ওপর টেনে নিয়ে বলে, ঠিক আছে, আমি বুঝেছি। ইঙ্গিতে ট্যাক্সিওয়ালাকে দেখিয়ে চাপা গলায় বলে, ও শুনতে পাবে; চুপ করুন…

বিভু হকচকিয়ে চুপ করে যায়। তারপর চুপ করে থাকে।

রমেন ওর হাতে হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর খুব মৃদু গলায় বলে, কে বলল যে, তারা আপনার আপনজন ছিল না?

আর কথাবার্তা তেমন কিছু হল না। বিভু সারাক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে রইল। আর ওর হাতখানা কোলে নিয়ে বসে রইল রমেন।

অনেক দিন আগে, রমেনের বয়স যখন দশ-এগারো, তখন যুদ্ধ চলছে। তাদের তিনটে বন্দুক তখন সরকারে বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা। তাই সেই বয়সেই তাড়াতাড়ি বন্দুক শেখানোর জন্য তাদের পুরনো চাকর উদ্ধব আর ড্রাইভার আশু তাকে নিয়ে গেল কেওটখালির মাঠে। দূরে রাখল তিনপায়া একটা ব্ল্যাক বোর্ড, তাতে দুটো বৃত্ত আঁকল, তারপর তার হাতে তুলে দিল কারুকার্যকরা ভারী বন্দুকখানা। বলল, মারো, মাঝখানের গোল্লাটায় মারো। রমেন মেরেছিল, ভীষণ শব্দে প্রথমবার হাত থেকে প্রায় ছিটকে গেল বন্দুকখানা, গুলিটা কোথাও লাগেনি, উড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর কয়েক বারের চেষ্টাতেই সে ঠিক মাঝখানের বৃত্তটাকে ফুটো করে দিল। উদ্ধব বলল, আর জন্মে তুমি অর্জুন ছিলে। তারপর বন্দুক চালানো নেশার মতো পেয়ে বসল তাকে। উদ্ধব দ্রোণাচার্যের মতো বোর্ডে পাখি এঁকে চোখ বসিয়ে বলত, চোখে মারো তো। রমেন মারত। যখন এই ভীষণ নেশা তাকে প্রতি দিন বিকেল বেলা ঘর ছেড়ে বন্দুক হাতে বেরোনোর জন্য অস্থির করে তুলত, সেই সময়ে একদিন বন্দুকগুলো জমা পড়ে গেল। সন্ধেবেলা ভীষণ দুঃখে দাদুর ইজিচেয়ারের পাশে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে ছিল রমেন, দাদু তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, এ তো ভালই হল। এর পরে একদিন তোমাকে দেখলে অবোধ জন্তুরা ভয় পেত। রমেন বোঝেনি। অনেকক্ষণ পর একসময়ে দাদু মৃদু স্বরে আপনমনে বলল, তুমিই আমার অস্ত্র।

সে-কথাটার অর্থ রমেন এখন খানিকটা বোঝে। এই অচেনা ছেলেটা তার পাশে বসে আছে, এর ঝোলানো ব্যাগের মধ্যে হয়তো রয়েছে হাতে-বাঁধা বোমা, তলপেটের কাছে লুকানো ছোরা—তবু কত নিরস্ত্র, অসহায় দেখাচ্ছে একে। এ জানে না অস্ত্রের ব্যবহার, কিংবা প্রকৃত অস্ত্র কাকে বলে। একদিন এ নিজের হাতে মারা যাবে।

রমেন বড় মায়ায় ছেলেটির হাতে হাত বুলোয়।

যাদবপুরের কাছে ট্যাক্সি থেকে নেমে জানালা দিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হাসল রমেন, আবার কোনও দিন দেখা হয়ে যাবে। আচ্ছা ভাই…

আচ্ছা… ছেলেটা হাত তুলল।

ট্যাক্সিটা ঘুরিয়ে নিল ট্যাক্সিওয়ালা।

রমেন একা একটু হাসে। মানুষের কাছ থেকে মানুষের কাছে, ক্রমে আরওতর মানুষের কাছে চলেছে সে। এইভাবেই দিন কাটে তার।

যাদবপুরের কিছুই আর চেনা যায় না। যখন প্রথম এখানে প্রজারা বসত নিয়েছিল, তখন মাঝে মধ্যে আসত রমেন। দুপুরেও ঝিঁঝির শব্দ শোনা যেত। শোনা যেত মাটি কাটার শব্দ। জমির দখল নিয়ে লাগত কাজিয়া, লাঠি সড়কি বেরোত। ঝগড়া লাগত কমিটিতে কমিটিতে। ফড়ে আর দালালদের গতায়াত ছিল খুব। উচ্ছেদের হুমকি দিতে আসত দারোগা। তখন সারা দিন প্রজাদের কাছে কাছে থাকত রমেন। সঙ্গে থাকত উদ্ধব আর লব। তাদের হাতে লাঠি। বাইরের হাঙ্গামার জন্য তারা ছিল, রমেন দেখত জমির বন্টন। যাদবপুর থেকে পুঁটিয়ারি, বারাসাত, দমদম, হাবড়া, কখনও বা সুন্দরবনের দিকে ঘুরে ঘুরে সে বেরিয়েছে। নতুন জায়গায় এসে দিশেহারা প্রজারা তাকে দেখে বল-ভরসা পেয়েছে আবার। কখনও কখনও জিপ গাড়িতে নিশান উড়িয়ে কাজ দেখাতে আসত পার্টির লোক, জমির লোভ দেখিয়ে ঘুষ চাইত কমিটির মেম্বার, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠত কো-অপারেটিভ সোসাইটি। রমেন তার প্রজাদের আড়াল দিয়ে দাঁড়াত।

এখনকার আলো ঝলমলে যাদবপুর দেখে খুশি হয় রমেন। গায়ে গায়ে দোকান, ট্যাক্সির স্ট্যান্ড, কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়। একটু অচেনা লাগে তার। কিন্তু চেনা রাস্তা খুব কমই হেঁটেছে সে জীবনে।

রিকশাওয়ালা ক্রিং করে বেলের শব্দ করে বলে, যাবেন বাবু—

রমেন সুন্দর শান্ত হাসি হেসে বলে, না ভাই।

রেল লাইন পেরিয়েও অনেকটা হাঁটতে হল রমেনকে। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করতে হল। কলোনির একদম শেষ দিকে উদ্ধৰ জমি নিয়ে ঘর করেছিল, সেটা রমেনের মনে আছে। কিন্তু এখন আর কলোনির কোনও শেষ খুঁজে পাওয়া যায় না। রেল লাইনটা এক দিকে আটকে রেখেছে, অন্য আর সবদিকে বাড়ির পর বাড়ি। সব প্রাকৃতিক দৃশ্য মুছে গেছে।

উদ্ধবের ছোট মেয়েটি কুপি উঁচু করে ধরে আগলের ও-পার থেকে জিজ্ঞেস করে, কে?

উদ্ধবের বাড়ি এটা?

অন্ধকারে, কুপির আলোর আবছায়ায় প্রকাণ্ড লম্বা লোকটিকে অবাক আর ভিতু চোখে দেখে শিশু মেয়েটি। তারপর ফিরে গিয়ে মাকে ডেকে আনে।

ঘোমটা টেনে উদ্ধবের বউ সামনে আসে, কাকে চান?

উদ্ধব কি বাড়িতে নেই!

না। ফিরতে তিনির রাত হয়। আপনি কোথা থেকে আসছেন?

বউটি ঠিক বুঝতে পারে না।

রমেন একটু ইতস্তত করে বহুদিনকার পুরনো ভুলে-যাওয়া এক নাম বলে, রায় রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।

অমনি চঞ্চল হয়ে ওঠে বউটি। কী করবে বুঝতে পারে না। প্রথমেই তার মুখ দিয়ে বেরোয়, ওঃ মা!

আগল খুলে হাট করে দেয় বউটি। অভ্যর্থনার কোনও ভাষা মুখ দিয়ে বেরোয় না। মাটির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে প্রণাম করে। এ যে বুড়োকর্তার নাতির নাম! এ নাম যে তার শিশুবয়সের সংস্কার!

পর দিন সকালে উদ্ধবের উঠোন ভরে যায় মানুষে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ টাকা রেখে প্রণাম করে। দেখে অনেক দিন আগেকার কথা মনে পড়ে যায় বলে রমেন হাসে। টাকা ফিরিয়ে দেয়। বলে, চিরকাল তোমরা আমাকে অনেক দিয়েছ। এবার বলো তোমাদের আমি কী দিতে পারি?

উদ্ধব চেঁচিয়ে বলে, তুমি আমাদের কাছে থাকো। আমরা সবাই মিলে তোমাকে বসত করে দেব, বিয়ে দেব, সংসারী করব। তার বদলে তুমি আমাদের দেখবে, যেমন বুড়ো কর্তা দেখত।

কিন্তু এক জায়গায় থাকে না রমেন। ঘুরে ঘুরে বেড়াতে থাকে। এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গা। বাইরে থেকে শান্ত দেখায় তাকে। কিন্তু তার ভিতরে ভিতরে এক তীব্র আনন্দময় উত্তেজনা থরথর করে কাঁপে।

অনন্ত মণ্ডলের বাড়ি পশ্চিম পুঁটিয়ারি। তার নেশা জমি। দেশে থাকতে চাষ করত, এখন আর তা করে না, কিন্তু জমিরই ব্যবসা তার। কোনও কোনও জায়গা, দেখলেই সে বুঝতে পারে যে এখানে একদিন বসত হবে। অমনি এক লপ্তে জমি কেনে, মাটি ফেলে উঁচু করে, তার দিয়ে ঘিরে ফেলে রাখে। দু’-তিন বছরের মধ্যেই বিঘার দর কাঠার দরের নীচে চলে যায়। ঘোড়েল দু’খানা চোখ অনন্তর, জমি তার চোখে চোখে কথা বলে। এখন তার ঘরে ফ্লুরোসেন্ট আলো জ্বলে, রেডিয়োর আওয়াজ হয়, বাগানে ফুটে থাকে রজনীগন্ধা। তার দুটো বউ আজকাল ঝগড়া কাজিয়া কম করে। ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে যায়।

ছোটকর্তার লম্বা চেহারাখানা তার বারান্দায় সকালের রোদে ছায়া ফেলতেই চমকে ওঠে অনন্ত, পাগলের মতো দু’ হাত ওপরে তুলে চেঁচায়, ছোটকর্তা না? আাঁ?

রমেন দেশি সুরে কথা বলে, অনন্ত কেমন?

মুহূর্তে তুলকালাম কাণ্ড করতে থাকে অনন্ত। দুই বউকে টেনে নিয়ে আসে, নড়া ধরে আনে ছানাপোনাদের, রমেনের পায়ের কাছে ফেলে আর চেঁচায়, ভগবান, ভগবান!

ছেলেপুলেরা এখন বুঝতে শিখেছে। তারা ব্যাপারটা পছন্দ করে না। দেশ ভাগের সময়ে হয় তারা শিশু ছিল, নয়তো জন্মায়নি। কাজেই একটা অচেনা লোককে নিয়ে বাবার লাফালাফি তাদের আত্মসম্মানে ঘা দেয়। কিন্তু দুই বউ পায়ে লুটিয়ে পড়ে, তাদের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রমেন হাত জোড় করে চোখ বুজে তাদের প্রণাম নেয়।

রমেন বারান্দায় থামে ঠেস দিয়ে বসে। তাকে ঘিরে বসে অনন্ত, দুই বউ, আর শিশু ছেলেমেয়েরা। তদগতভাবে চেয়ে থাকে অনন্ত, আপনমনে হাসে, চোখ মোছে।

অনন্তর বড় ছেলে পার্টি করে, সে এসে হাতজোড় করে নমস্কার করতেই অনন্ত ঝাঁকি মেরে ওঠে, পায়ে হাত দে। রমেন উঠে দু’ হাতে ছেলেটিকে বুকে টেনে নিয়ে বলে, ঠিক আছে, ও-ই যথেষ্ট।

সবাই গোল হয়ে বসে রমেনের গল্প শোনে। বড়রা সবাই দেখেছে ছোটকর্তাকে গাড়ি চালাতে, বন্দুক ছুড়তে। কিন্তু এখন এ কী চেহারা ছোটকর্তার? তাদের চোখ ছল ছল করে।

আপনাদের কাছে কত সুখে ছিলাম, ছোটকর্তা!

রমেন হাসে, কেন সুখে ছিলে?

আপনারা ছিলেন আমাদের আপনজন, যেন আত্মীয়।

রমেন একটু চুপ করে থেকে বলে, কিন্তু এখন তো আমি ভিক্ষুক।

অনন্ত সোজা হয়ে বসে, কী কন ছোটকর্তা! আমরা আছি না? কীসের অভাব আপনার, বলেন!

রমেনের মনে আছে অনেক দিন আগে তার পৈতের সময়ে দণ্ডী ঘরে যাওয়ার আগে গায়ে গেরুয়া উত্তরীয়, হাতে দণ্ড আর ঝোলা, কামানো মাথা—এই রকম চেহারায় সে সমবেত ভদ্রমণ্ডলীর কাছে তার গেরুয়া ঝোলা বাড়িয়ে ধরে ভিক্ষে করছে, ভবতি ভিক্ষাং দেহি। ভবান্ ভিক্ষাং দেহি। সঙ্গে তার কাঁধে হাত রেখে দাদু আর কুলপুরোহিত সতীশ ভরদ্বাজ। ভদ্রজনের কাছে ভিক্ষা চাওয়া শেষ হলে দাদু তার হাত ধরে বাইরের উঠোনে নামিয়ে আনল। সেখানে হাজার প্রজা দাঁড়িয়ে। সে ঝোলা সামনে বাড়িয়ে ‘ভিক্ষাং দেহি’ বলার সঙ্গে সঙ্গে কী চঞ্চলতা পড়ে গেল সেই সহস্র লোকের মধ্যে। যেন বিদ্যুৎতরঙ্গ খেলে গেল মানুষের ভিতরে। তারা আশা করেনি ছোটকর্তা ভিক্ষে চাইবে তাদের কাছেও। মুহূর্তে ঠেলাঠেলি পড়ে যায়। তাদের হাত কঁপে, মুখে উত্তেজনার চাপা উজ্জ্বলতা। তারা যে যা এনেছিল সব ঢেলে দেয় রমেনের ঝোলায়। তারা ছোট্ট রমেনের পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে, চেঁচিয়ে ডাকে, কাছে আসতে চায়, দাদু কানের কাছে গুনগুন করে বলে, বলো, ভবান্ ভিক্ষাং দেহি, বলো চেঁচিয়ে, বলো অন্তর থেকে। ছোট্ট রমেন চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ভিক্ষা দাও, আমাকে ভিক্ষা দাও। আবেগে তার গলা কাঁপে, চোখে জল আসে। ঝোলার ভারে কাঁধ ছিঁড়ে পড়ে, তাই টেনে টেনে রমেন হাঁটে, ভিক্ষে চায়। মানুষ ঘিরে ধরে তাকে। চোখের জল মুছে ভিক্ষে দেয়। রমেনের আর খেয়াল থাকে না সে কী করছে, কিংবা সে আসলে কে। তার বিমুগ্ধ মন কেবল ভাবে যে সে এক মহান ভিক্ষুক। নেশার মতো ওই ভিক্ষাবৃত্তি তাকে টেনে নিয়ে যায়, সে ফিরে আসতে পারে না। আর ফিরে আসার দরকারই বা কী! সে কখন যেন ভিক্ষে চাইতে চাইতে দেউড়ি পার হয়, লাল ধুলোর রাস্তায় পড়ে। দু’ধারে জয়ধ্বনির মতো চেঁচিয়ে ওঠে মানুষ, তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে থাকে।

দেউড়ি পার হতেই কে যেন তার হাত ধরেছিল। ব্যস আর না, এবার ফিরে এসো। ছোট্ট রমেন অভিভূত চোখে চেয়ে ছিল। কোথায় ফিরবে সে? কেন ফিরবে?

আজ রমেন জানে, তারা যে সৎ জমিদার সেটা প্রমাণ করার জন্যই যে দাদু প্রজাদের কাছে তাকে দিয়ে ভিক্ষে করিয়েছিল তা নয়। দাদুর অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল। সেদিন সন্ধ্যায় দণ্ডীঘরে এসে তাকে আহ্নিক করার পদ্ধতি শেখাবার পর দাদু বলেছিল, রমেন, ব্ৰহ্ম মানে বিস্তার। ব্রাহ্মণ তাই তার ক্ষুদ্র বাড়িতে বা সংসারে আবদ্ধ থাকেন না। তুমি যদি ব্রাহ্মণ তবে যেন একদিন সেই বিস্তার লাভ কোরো। আজ দরদালান থেকে ভিক্ষে করতে করতে তুমি দেউড়ি পার হয়ে গিয়েছিলে, ভিক্ষে চাওয়ার সময়ে তুমি কাঁদছিলে, কেন বলো তো? কারণ, ওই একটুতেই তুমি টের পেয়েছিলে বিস্তার কাকে বলে।

দাদু এসে দিনের অনেকটা সময় থাকত তার আবছা অন্ধকারে দণ্ডী ঘরে। বলত, তুমি মনেও কোরো না যে তুমি জমিদারের ছেলে বলে লোকে তোমাকে ভিক্ষা দিয়ে কেঁদেছে। তা নয়। আসলে তারা কেঁদেছে সেই ব্রাহ্মণের জন্য যে একদিন ভারতবর্ষকে ধর্ম দান করেছিল। শিখিয়েছিল কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়, কীভাবে বেড়ে উঠতে হয়। তারা ভিক্ষার ছলে ছলে যেত মানুষের কাছাকাছি, তাদের দাওয়ায় বসত, দুঃখের কথা শুনত, ভাগীদার হত তার মনের। এইরকম করেছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও। তারা যাজনে ছেয়ে ফেলেছিল দেশ, ভিক্ষার ছলে ছলে তারা ভারতবর্ষের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল বুদ্ধের বাণী। মনে রেখো, ভিক্ষুকের পাত্র থেকে শুরু হয়েছিল ভারতবর্ষের বিপ্লব। কারণ ভিক্ষা থেকেই এসেছিল জন-সংযোগ, জন-জাগরণ। মানুষের পরস্পরের মধ্যে বোঝাপড়া। ভিক্ষুকরাই তা করেছিল।

তারপর দাদু অনেকক্ষণ ভেবে বলেছিল, কিন্তু আমি তোমাকে ভিক্ষে করতে বলতে পারি না। খামোখা তুমি ভিক্ষে করবে কেন? কিন্তু যদি তাঁর দেখা পাও, যিনি তোমাকে অন্ধ করে দিয়ে কেড়ে নিয়েছিলেন তোমার বল, তারপর আবার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, যদি তাঁকে কোনও দিন পাও, আর তিনি যদি তোমাকে ভিক্ষা করতে পাঠান তবে প্রসন্ন মনে তা কোরো। কিন্তু তুমি কি তাকে কোনও দিন খুঁজবে রমেন?

দাদু চুপ করে অন্যমনস্ক থেকেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, দুঃখে কাতর মানুষই কেবল তাঁর অনুসন্ধান করে। রমেন আমি তোমাকে আশীর্বাদ করি তোমার জীবনে যেন দুঃখ তাড়াতাড়ি আসে।

অনন্ত আর তার ছেলে, বউয়ের কাছে সেই সব গল্প করছিল রমেন।

হঠাৎ চোখ মুছে অনন্ত বলে, হ্যাঁ, মনে আছে কর্তা, কী সুন্দর আছিল আপনার ব্রহ্মচারীর পোশাক। আমি ভিক্ষা দিছিলাম। আঙুল থিক্যা খুইল্যা দিছিলাম রুপার আংটি আর কোমরের কষি থিক্যা দুইটা টাকা। আইজ আমি আরও বেশি দিতে পারি। বলেন কী চাই!

আমি তোমারে কী দিচ্ছি?

এই তো দিলেন! এই যে আসলেন অধমের বাড়িতে, চোখ জুড়াইয়া গেল।

রমেন মাথা নাড়ে, হাসে। বলে, আবার আসুম হে, আবার—

অনন্তর বড় ছেলে, একুশ কি বাইশ বছর বয়স, রমেনের পিছু নিয়ে রাস্তায় আসে। চুপি চুপি জিজ্ঞেস করে, আপনি কি তাঁকে পেয়েছিলেন?

সতীশ ভরদ্বাজ, সেই কালো বেঁটে তেজি ব্রাহ্মণ, এখন শয্যাগত। ছেলেদের সঙ্গে বনিবনা হয়নি, তারা আলাদা থাকে, সামান্য কিছু দেয়। দুই মেয়ের একজন প্রেম করে বিয়ে করেছে, অন্যজন বিধবা, শ্বশুরবাড়িতে আঁকড়ে পড়ে আছে।

বুকচাপা, অন্ধকার, ভ্যাপসা টিনের ঘরটায় রমেন ঢুকে দেখে বিছানায় একখানা ছায়া পড়ে আছে। দু’খানা চোখ জ্বলজ্বল করে প্রত্যাশায়।

কষ্টে উঠে বসে সতীশ ভরদ্বাজ। বলে, আমার বুড়িটার কপালে তখনও সিন্দূর—বুঝলা? বসো হে, তোমারও তো সব গেছে!

রমেন পায়ের দিকটায় বসে। সতীশ ভরদ্বাজ, সেই অহংকারী তেজি লোকটা, আক্ষেপ করে, আমি তো সদ্ব্রাহ্মণ, তবে ক্যান আমার এই অকাল মৃত্যু? ক্যান আমার বংশে অনাচার, অলক্ষ্মী? ইষ্ট কই?

বুড়ি একটা মোড়া পেতে সামনে বসে। গোদা পা দু’খানা দেখলেই বোঝা যায় শরীরে জল এসেছে। সিঁদুরের তলায় সিঁথিতে ঘা দেখা যায়। কপাল চাপড়ায় বুড়ি, সব গেল গিয়া।

কিছুই যায়নি। শতগুণে ফিরে আসছে সব। আর কয়েকটা দিন মানুষ তার সম্পূর্ণ ভুলগুলো বুঝে নিতে যতটা সময় নেবে, তারপরই বিপ্লবী ব্রাহ্মণ ভিক্ষুকে ছেয়ে যাবে দেশ। জীবন বৃদ্ধির ধর্ম দান করে বেড়াবে মানুষকে। তেমন ভিখারিকে সর্বস্ব দেওয়ার জন্য ছুটবে মানুষ।

রমেনের শান্ত তৃপ্ত মুখখানা দেখে হঠাৎ যেন সতীশ ভরদ্বাজ কেমন একটু আশান্বিত হয়ে ওঠে। সর্বস্বই কি গেছে ছেলেটার? না কি আবার কিছু পেয়েছে!

ঘর অন্ধকার করে সন্ধেবেলায় শুয়ে ছিল রমণীমোহন। পুত্রশোক দু’টি গেছে পর পর। আগে নদীর তলা থেকে এক ডুবে খামচি দিয়ে মাটি তুলে আনত, এখন হাঁপানিতে হাঁফায় সারা দিন। প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া করে। কীরকম উদ্দন্ত কীর্তন করত রমণী তা আর এখন কারও মনে নেই। বিধবার সম্পত্তি, গ্রাস করে করেছে ছোট্ট বাড়িখানা, তারপর থেকে পাপবোধে ভুগছে।

কই হে, রমণী।

ছোটকর্তার গলা না? রমণী চমকে ওঠে। তারপরেই বুঝতে পারে ওটা ভুল। কর্তারা কোথায় চলে গেছে! কে জানে বেঁচে আছে কি না! রমণী পাশ ফিরে শোয়।

কে যেন হাত ধরে তাকে তুলে বসায়। আবছা অন্ধকারে মুখোমুখি ছোটকর্তার মুখ। যেন ঘুম ভাঙার পরে স্বপ্ন।

রমেন চলতে চলতে মাঝে মাঝে দাঁড়ায়। চারদিকের আবহাওয়ায় কিছু একটা অনুভব করতে চেষ্টা করে। প্রতি জনপদেরই একটা বিশিষ্টতা আছে। অনেক মানুষ এক জায়গায় বসবাস করতে করতে কিছুটা একে অন্যের মতো হয়ে যায়। তাদের যৌথ চিন্তার বিকিরণ সেই জায়গার আবহাওয়াকে সম্মোহিত করে রাখে। কখনও রমেন মফস্সলের কোনও ছোট্ট শহরে পা দিয়েছে, অমনি সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয়েছে, এ-জায়গা অর্থলিপ্সুদের অধিকারে। প্রায় সময়েই দেখা গেছে যে তার ভুল হয়নি।

মানুষের চারধারে জ্যোতির্বলয় নেই। না থাক, কিন্তু তার অস্তিত্বের একটা বলয় সে তার চারধারে নিয়ে বেড়ায়। সেটা হয়তো তার গায়ের উত্তাপ, রক্তের স্পন্দন, গায়ের বিশেষ গন্ধ। দেহ সবসময়েই বিকিরণ করছে তার অস্তিত্বের সংবাদ। ঠিক সে-রকম, মানুষ তার সারা জীবনের যা কিছু কাজ তার স্বভাব এবং চিন্তারও একটি বলয় তৈরি করে নিজের অজান্তে। একে অন্যের বলয়ের মধ্যে এসে কী একটা টের পায়, কিন্তু সঠিক বোঝে না। তার নিজের অস্তিত্ব তাকে ব্যতিব্যস্ত রাখে বলেই সে অন্যকে সঠিক চিনতে পারে না।

কিন্তু রমেন পারে। সে স্পষ্টতই মানুষের চারধারে সেই বিশেষ বলয়টিকে অনুভব করে। যত মানুষ তার কাছাকাছি আসে, রাস্তায় মুখোমুখি এসে পেরিয়ে যায়। কিংবা রেলগাড়িতে বসে থাকে মুখোমুখি, তাদের প্রত্যেককেই বুভুক্ষু ভালবাসায় লক্ষ করে রমেন। সবসময়েই সে মানুষের সেই বলয়টির নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করে।

মানুষেরা জোটবদ্ধ হয়, হতে থাকে তার চারপাশে। প্রজারা পাড়ার প্রতিবেশীদের ডেকে আনে ছোটকর্তাকে দেখাবার জন্য। রমেন তাদের কাছাকাছি যায়, দাওয়ায় বসে, বহু দূর হেঁটে যায় একসঙ্গে। মানুষ সংগ্রহ করতে থাকে সে, সংগ্রহ করতে থাকে মানুষের সর্বস্ব। একদিন এই বিপুল ভিক্ষা সে নিয়ে যাবে তাঁর কাছে, যিনি একদিন তাঁকে নিশির ডাকের মতো ডেকে নিয়েছিলেন।

ভাদ্রের শেষ এখন। বাংলাদেশের প্রকৃতি সেজে উঠেছে এই সময়ে। অনেক দূর দেশের পাখি আর বাতাস আর সুন্দর পালের নৌকোর মতো মেঘ আসে। গত বর্ষার স্মৃতি মানুষ ভুলে যায়। ঠিক ওই পাখি বা মেঘের মতোই নূতন একটি জিনিস দেখতে পায় লোক—পুটিয়ারি, বারাসাত, চব্বিশ পরগনা, হুগলিতে। তারা দেখে গৌরবর্ণ দীর্ঘকায় রমেনকে। সঙ্গে তার দুঃখী মানুষেরা। লোকটাকে দেখলেই বড় ভাল লাগে মানুষের, এক পলকের জন্য সংসারের সুখ-দুঃখের কথা ভুল পড়ে যায়। মানুষের মাথার চারদিকে জ্যোতির্বলয় নেই— এ তো ঠিক কথাই। কিন্তু কাউকে কাউকে দেখলে মনে হয়, এর মাথার চারদিকে ও-রকম অদৃশ্য কিছু একটা রয়েছে।

কীভাবে সেই বিপ্লব শুরু হবে তা মাঝে মাঝে ভাবে রমেন। কেবলই মনে হয় পারাপার জুড়ে শুয়ে আছে কর্ষিত ভূমি। তার হাতে বীজ।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%