শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পরদিন বাংলা বন্ ধ। বেলা করে উঠে বিভু তার নতুন কেনা টেরিলিনের শার্ট, টেরিকটনের গাঢ় রঙের প্যান্ট, তার ভারী সোলের জুতো জোড়া পরে নিল। এখন তার নাম হয়ে গেছে। কলকাতার গুন্ডা মহলে নাম করে নিচ্ছে বিভু। দুর্গাপুর থেকে ফিরে আসার পর আদিলের চায়ের দোকান থেকে খবরটা ছড়িয়ে গেছে। বিভুর একটা কেস বাড়ল। শরীরটা শক্ত হয়ে যায়, বুক ঠেলে ওঠে। সাফল্যের কেমন এক ধরনের আনন্দ আছে।
রোদ-চশমা পরে একটা টহল দিতেই পাড়ার আনাচকানাচ থেকে একজন দু’জন সঙ্গ নিতে থাকে। তোষামোদকারী। বিভু ডাঁটে হাসে। রাজার মতো হাঁটতে থাকে। কথা ছুড়ে দেয় এদিক ওদিক। বিভু মাস্তান।
আদিল এখন খাতির করে খুব। পর পর দু’বার চা খাওয়াল সবাইকে। সবসুদ্ধ বারো কাপ।
কত রে?
কী একটা হিসেব বলল আদিল, বিভু শুনলই না। পাঁচ টাকার একখানা নোট শূন্যে ছুড়ে দিয়ে বিভু জিজ্ঞেস করল, আজ হরতাল কীসের?
খাদ্য সমস্যা। কমিউনিস্টরা ডেকেছে।
কথাটা ভাল করে কানে গেল না বিভুর। সিগারেট ধরানোর সময়ে হঠাৎ তার মনে হল অনেকদিন হয় তার সঙ্গে হরতাল-টরতালের আর যোগাযোগ নেই। তবু যখন দেখা যায় হরতালের দিন সব অফিস-দোকান বন্ধ, কলকারখানার চাকি চলছে না, রাস্তায় গাড়িঘোড়া নেই তখন কেমন যেন বুক ভরে ওঠে। মিছিল দেখলে চনমন করে শরীর।
পাড়ার হরিশ তার পানের দোকানের একখানা তক্তা খুলে চোরের মতো সিগারেট বেচছে, সেখানে ভিড়। বিভু দলবল নিয়ে গিয়ে তার দোকান ঘিরল।
বন্ধ করে দে।
হরিশ ভয় পেয়ে বলে, বন্ধই তো। কেবল চেনা লোক দেখে দিচ্ছি—
না একদম বন্ধ। শালা দেশের লোক না খেয়ে আছে আর তুমি পয়সা লুটবে!
বিভুর সঙ্গীরা আত্মপ্রত্যয়ের হাসি হাসে।
বিভু টহল মারে পাড়ায়। বড় রাস্তায় ফুটবল খেলা হচ্ছে, গলির মধ্যে ক্রিকেট। ওরা খেলুক ক্ষতি নেই। কিন্তু তেলেভাজার দোকান কেন খোলা? মিষ্টির দোকানের ভিতর থেকে কেন আসছে জিলিপির গন্ধ? বন্ধ, সব বন্ধ করে দে। দেশের মানুষ না খেয়ে আছে—
বিভুর গা গরম হয়ে যায়। বন্ধ, সব বন্ধ আজ।
দুর্গাপুরের লোকটা কোন দলের ছিল কে জানে! অত খবর বিভুকে দেয়নি ওরা। কিন্তু ব্যাপারটায় রাজনীতি আছে, বিভু জানে। টালিগঞ্জের শচে তাকে কাজটা ধরে দিয়েছিল। বলেছিল, তুই-ই যা, নতুন উঠছিস, হাত পাকবে। এখন সে-লোকটার বালবাচ্চা বউ কিংবা মা বাপ কাঁদছে হয়তো। ওরা তো জানে না বিভু আঠা দিয়ে বোমা বাঁধে, আঠা শুকোলে ছোট্ট আর কড়কড়ে হয়ে আসে মারাত্মক জিনিসটা, যত শুকোয় ততই যে-কোনও সময়ে ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়! এমনও হতে পারত যে বিভুর হাতেই ফেটে গেল বোমাটা, তখন কোথায় বিভু? বোমা তো আর কারও পোষা নয় যে, বিভুকে চিনে রাখবে! পরশুদিন গাড়ির সেই লম্বা লোকটা বলেছিল যে তাকে দেখলে নাকি মনে হয় তার কোনও প্রিয়জন মারা গেছে। কথাটা ঘুরিয়ে বলা; আসলে লোকটা বুঝতে পেরেছিল যে, বিভু খুনে। না, দুর্গাপুরের সেই লোকটা বিভুর প্রিয়জন ছিল না, শত্রুও নয়। কোন দলের যে তাও বিভু জানে না। তবু সে লোকটার জন্য তেমন দুঃখও নেই বিভুর। ভারতবর্ষে যদি এতদিনে তেমন কোনও যুদ্ধ হত তবে বিভু যেত সৈন্যের খাতায় নাম লেখাতে। কত অচেনা মানুষ মারা পড়ত তার হাতে। এও অনেকটা সে-রকমই, টাকা খেয়ে মানুষ মারা। তবে আর দুঃখ কীসের। নিজের মতো করে বিভুও একজন সৈন্য। কেবল একটা ব্যাপারেই খটকা লাগে তার। দুটো খুনের বেলাতেই সে সেই কবেকার ছেলেবেলার কেউটে-তাড়া-করা বিকেলের দৃশ্যটা দেখেছে। পিছনে আলের ওপর দাঁড়িয়ে একটা মুসলমান লোক লম্বা লাঠি তুলে তাকে সতর্ক করে দিচ্ছে, ভাইরে-এ-এ। কে ওই লোকটা? কেন সে দু’-দু’বার বিভুকে সাবধান করেছে?
ভাবতে ভাবতে মাথা কেমন ঘুলিয়ে ওঠে।
মৃদুলার বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে যেতে বিভু দেখে বাইরের ঘরে মৃদুলার বাবা ইজিচেয়ারে বসে আছে। আজকাল চোখে চোখ পড়লেই কেমন অসহায়ভাবে তাকায় লোকটা, বিড় বিড় করে ঠোঁট নড়ে। যেন বলে, আমাকে মেরো না। ক’দিনেই লোকটা বুড়িয়ে গেছে অনেক। দুশ্চিন্তা। মৃদুলার বিয়ের খবর পেয়ে দু’বার বুড়োটাকে ধরেছিল বিশুরা। বুড়ো ওদের পায়ে ধরেছে। বামুন! হায় ঈশ্বর! ক’দিন সারা রাত ঢিল পড়েছে ওদের বাড়িতে, সদরে ঢেলে দিয়েছে গু, সন্ধেরাত্রে ছোরার ওপর টর্চ ফেলে বাইরে থেকে ছোরা চমকে ভয় দেখিয়েছে। এত কিছুর পর বুড়োটা নিস্তেজ হয়ে গেছে। মৃদুলার ভাই আজকাল খুব ভয়ে ভয়ে রাস্তায় হাঁটে, তাদের মুখোমুখি হলে ভয়ে মুখ সাদা হয়ে যায়। দিনরাত এখন জানালা বন্ধ থাকে ওদের বাসায়। বিয়ের পর মৃদুলা আর আসেনি। ভয়! কিন্তু তাতে লাভ নেই, বিভু একদিন পেয়ে যাবে মৃদুলাকে। খোলা দরজাটার মুখোমুখি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়ায় বিভু। বুড়োটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে—চোখ সরিয়ে নিতে পারছে না—যেন সম্মোহিত।
বিভু একটু হাসল। তারপর দলবল নিয়ে হাঁটতে লাগল।
বড় রাস্তা দিয়ে জালে ঢাকা কালো একটা পুলিশ-ভ্যান চলে যাচ্ছে। আধখানা ইট তুলে নিয়ে বিভু ছুড়ে মারল, শালা! ঝং করে পিছনের জালে লাগল ইটটা। ভ্যানটা থামল না।
পালা, শালা, পালিয়ে যা। হারামি! এই রাস্তা দিয়ে কোনও গাড়ি চলবে না আজ। সব বন্ধ—সব—।
বিশু কানের কাছে মুখ এনে বলে, খামোকা হুজ্জত করিস না, তোর গন্ধ ছুটে যাবে চারধারে।
হ্যাঁ। বিভু জানে। গন্ধ ছুটবার আগেই তাকে পালাতে হবে। এইখানে বেহালার কোন কোণে বিভু-ফুল ফুটে উঠেছে তা টের পেতে মানুষের দেরি হবে না। ইতিমধ্যেই পাড়ার ভদ্রলোকেরা একবার জয়েন্ট পিটিশনের মুসাবিদা করেছিল বিভুর নামে। তার আগে ওসি-র সঙ্গে পরামর্শ করেছিল ওরা। বিশুরা হুজ্জত করে সেটা রুখেছে। কিন্তু ঠান্ডা থাকাই ভাল বিভুর। খুনের গন্ধ বহু দূর যায়। সারাজীবন গায়ে লেগে থাকে।
কিন্তু মাঝে মাঝে রক্ত গরম হয়ে যায়। ভাঙ শালা, সব ভেঙে ফেল। মাঝে মাঝে ডবল ডেকারে দশ নম্বর বা আটের বি কিংবা দু’নম্বর বাসে যেতে যেতে বড়লোকদের অন্দরমহল চকিতে চোখে পড়ে। কী সুন্দর পরদা ওড়ে হাওয়ায়, কী সব বিছানা, কিংবা কেমন স্বপ্নের মতো আলো জ্বলে, কেমন বাগান! নিউ মার্কেটে ঘুরে বেড়ায় ছোট ব্লাউজ আর আঁচল-খসা শাড়ি পরা আপেলের মতো মেয়েরা। তাদের ঘুম-ঘুম চোখ। যেন এ-দেশের এ-জগতের কেউ নয়। নন্দীদের অ্যালসেশিয়ানটা প্রকাণ্ড গামলায় গম আর মাংসের ঝোল খাচ্ছে চকচক করে। ভুর-ভুর শব্দে চলছে এয়ারকুলার, ঠান্ডা ঘরে অকাতরে ঘুমোয় আগরওয়ালা। ভাঙ শালা, সব ভেঙে ফ্যাল। মার বোমা, উড়ে যাক কলকাতা। লুট করে আন ওই মেয়েদের, ভিখিরিদের ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যা ওই এয়ারকন্ডিশন ঘরের ভিতরে, সামনে সাজিয়ে দে রুটি-মাখন আপেলের টুকরো। ভাঙ শাল, ভেঙে ফ্যাল। মাঝে মাঝে রক্ত গরম হয়ে যায় বিভুর। ফুলের মালায় সাজানো প্রকাণ্ড গাড়িতে যাচ্ছে বর-বউ, বিভুর ইচ্ছে করে লাফিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ায়। গাড়ি আটকে বলে, নামো, নেমে হেঁটে যাও। এইরকম কত কী ইচ্ছে করে বিভুর। ইচ্ছে করে সুভাষ বোস হয়ে পালিয়ে যেতে, ইচ্ছে করে অস্ত্রাগার লুট করতে ইচ্ছে করে ফাঁসির মঞ্চে উঠে গলায় দড়ি পরে ‘বিদায় দে মা’ কিংবা ‘বন্দেমাতরম’ গাইতে গাইতে মরে যেতে। কিন্তু বস্তুত শত্রুর দেখাই পায় না বিভু। ইংরেজ আমলে হিসেবটা সোজা ছিল, হিরো হওয়া কঠিন ছিল না। শত্রুরা ছিল চেনা। কিন্তু এখন কেবল মাথাটা ঘুলিয়ে যায় বিভুর। কে যে শত্রু তা বুঝতেই পারে না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে বটে একজন-দু’জন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কি একজন-দু’জন নেতা-ফেতাকে শেষ করে আসি। কিন্তু তাতে কী লাভ? দু’-তিনটে দারোগা কি ম্যাজিস্ট্রেট মারলে কেউ তার প্রশংসা করবে না। নেতাকে মারলে নির্ঘাত জনতা তাকে লাথি মেরে শেষ করবে। এখন আর ক্ষুদিরাম হওয়া অত সহজ নয়। সুভাষ বোসও হওয়া যায় না আর। ছেলেবেলায় ‘বন্দেমাতরম’ বলে চেঁচালে কখনও-সখনও পুলিশ তাড়া করত, চনমন করে উঠত আশেপাশের লোকজন। কিন্তু এখন চেঁচালে লোকে ভেড়ার মতো তার দিকে একটু চেয়ে নিজের কাজে চলে যাবে। ঈশ্বরের বিধানে সবসময়েই তো আর শত্রুর গায়ের রং সাদা নয়। সবসময়ে চেনাও যাবে না তাকে যে মুখোমুখি লড়ে যাবে।
তবু বিভুর ভিতরটা খেপে ওঠে। পিচের ওপর আছড়ে ইট ভাঙে সে। মিত্তিরদের প্রকাণ্ড বাড়ির একতলায় বাথরুমে ঘষা কাচের সুন্দর জানালা বিভুর ইট লেগে মড়াত করে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে। ‘কে? কে?’ বলে কারা ছুটে আসে বারান্দায়। বিভু দৌড়ে চলে যায় অলিগলির মধ্যে, দু’ হাত তুলে চেঁচায়, বন্ধ—আজ সব বন্ধ—সব বন্ধ করে দে। একটা ঝাঁপও যেন না খোলে!
রাস্তায় চলন্ত লোকজন দ্রুততর বেগে হেঁটে সরে যায়। বন্ধ হয়ে যায় বাড়িঘরের জানালার পাল্লা।
বিশু হাঁফাতে হাঁফাতে দৌড়ে তার কানের কাছে মুখ এনে বলে, তুই কি কমিউনিস্ট, না তুই কী? হরতাল তো তাতে তোর কী?
আমি! আমি! ঠিকঠাক জবাব দিতে পারে না বিভু। কিন্তু হঠাৎ ভিতরটা টগবগ করে ফোটে।
হুজ্জত করিস না। তোর এ-সবে মাথা গলানোর কী? তোর পকেটে টাকা আছে, তোর বাবার পয়সার অভাব নেই…
আই। বিভু দাঁড়িয়ে যায়। বাবা! বাবার কথাই মনে ছিল না। তিন-চারটে গোরুর দুধ আর তার সঙ্গে মিল্ক পাউডার, সয়াবিন আর কী-সব যেন মিশিয়ে তৈরি হয় দুধ, ছানা। কী এক অদ্ভুত উপায়ে টালিগঞ্জ খালপাড়ে চলে বাবার মিষ্টির দোকান। মনে পড়তেই ঝিমিয়ে যায় বিভু। এককালে বাবা দেশে নিজের হাতে চাষ করত। এখন অবস্থা ফিরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
যদি বাপকেই মারি ল হলেই কি শহিদ হওয়া যাবে? দূর! তাই কখনও হয়। লোকে থুথু দেবে গায়ে।
না, শত্রু চেনা এখন আর সহজ নয়। সকলেই সকলের শত্রু। মানুষ মারলে এখন আর বাহবা নেই। সেই ভোররাত্রে উঠে ঠান্ডা জলে স্নান করে গীতা পড়তে পড়তে হঠাৎ ফাঁসিতে চলে যাওয়া, জেলখানার বাইরে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার লোক কাঁদছে, ফিসফিস করে বলছে ‘অমর শহিদ বিভু ঘোষ জিন্দাবাদ’—এ-রকম একটা ছবি স্বপ্নের মতোই থেকে যাবে। অলীক।
তার চেয়ে যদি কখনও যুদ্ধ হয়! বিভু চলে যাবে। তারপর ভয়ংকর লড়াইয়ের শেষে একদিন তার দেহ নির্জন নদীর ধারে পড়ে থাকবে, বুটসুদ্ধ পা দু’খানা অন্তৰ্জলিতে জল ছুঁয়ে আছে, মুখে হাসি—আমি দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছি।
শুনলে হা-হা করে হেসে উঠবে লোকজন।
না, ও-সব কিছু আর হবে না। বিভু আস্তে আস্তে ভাড়াটে হয়ে যাবে। শুধু গোপনে তার অন্তরে এক না-হওয়া শহিদের, বিপ্লবীর, দেশপ্রেমিকের রক্ত ফুট-ফুট করে ফুটে ফুটে ক্রমে শীতল হয়ে আসবে।
মৃদুলার বাড়িটাকে ভরদুপুরেও পোড়া বাড়ির মতো দেখায়। লক্ষ্মী ছেড়ে গেছে যেন।
ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে বিভুর। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে। কোনও দিন বিভু একটা খুব মহৎ কাজ করে মরে যাবে। তার সেই কীর্তির কথা মৃদুলা যেন জানতে পারে, হে ভগবান! যেন তার জন্য মৃদুলাকে একদিন কাঁদতে হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন