দ্বাদশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

বারো

সে মিথ্যে কথা বলেছিল।

ভোর রাত্রে পাতলা ঘুমের মধ্যে অস্বস্তি বোধ করছিল শাশ্বতী। দেখল, ভীষণ অন্ধকারের ভিতর মেঠো পথ দিয়ে লণ্ঠন হাতে একটা লোক চলে যাচ্ছে। লোকটার শরীর দেখা যায় না, কেবল লণ্ঠনের ম্লান আলো তার রোগা, ধুলো মাখা, চলন্ত পা দু’খানার ওপর পড়েছে। লণ্ঠনের আলোয় রহস্যময়, ভৌতিক সব ছায়া নেচে যাচ্ছে। একই স্বপ্ন, দৃশ্য বারবার। যত বার চোখে একটু ঘুম আসে শাশ্বতীর, তত বার সেই মেঠো পথ দেখে, লণ্ঠনের আলোয় চলে যাচ্ছে দু’খানা পা। চমকে তার ঘুম ভেঙে গেল অনেক বার।

যত বার ঘুম ভাঙে শাশ্বতীর, তত বারই চোখ খুলে সে দেখে অন্ধকার ঘরে আবছা মশারির চাল দেখা যাচ্ছে। ভয়ে সিটিয়ে গিয়ে সে জোর করে চোখ বুজে ফেলে, শ্বাস বন্ধ করে থাকে অনেকক্ষণ। দিনের বেলা এই ঘরটা তার খুব চেনা, কিন্তু নিশুতি রাত্রে এই চেনা ঘরটা আর তাদের থাকে না। প্রেতাত্মাদের হাতে চলে যায়। মাঝরাতে হয়তো বা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে চোর, কিংবা ধর্মনষ্টকারী পুরুষেরা। তাই কোনও দিন মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে শাশ্বতী পরিষ্কার টের পায়, তাদের ঘরে এবং ঘরের বাইরে সর্বত্র একটা অপার্থিব অচেনা পরিবেশ। নিঃশব্দে কারা যেন ফাঁদ পাতছে, ভয় দেখানোর ষড়যন্ত্র করছে। তাই নিঃসাড়ে শুয়ে থাকে শাশ্বতী, নিশ্বাসেরও শব্দ করে না, বুকের হৃৎপিণ্ড ধকধক শব্দ করতে থাকে বলে অস্বস্তি বোধ করে। নিজেকে জড়সড় করে কাঠ হয়ে শুয়ে থেকে সে তখন কারও জেগে থাকার একটু শব্দ শোনার জন্যে অপেক্ষা করে। কারও একটি গলাখাঁকারি, কিংবা কোনও বাড়ির দরজা খোলার শব্দ, কিংবা যদি কেউ রাস্তা দিয়ে জুতো মশমশিয়ে হেঁটে যায়, এ-রকম যে-কোনও খুব তুচ্ছ একটু শব্দের জন্য সে কান খাড়া করে থাকে। কেউ জেগে আছে টের পেলে নিশ্চিন্ত হয়ে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে।

প্রথম বার স্বপ্নটা দেখে শাশ্বতী তেমন কিছু বুঝতে পারেনি। ঘুম ভেঙে মাঝরাতের সেই ভয় হয়েছিল তার। হৈমন্তীর কাছাকাছি একটু সরে গিয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে রইল সে। একসঙ্গেই শোয় তারা, কিন্তু শাশ্বতী পারতপক্ষে কখনও হৈমন্তীকে ছোঁয় না। কেননা তার শরীর কাঁপে, শিরশির করে। তা ছাড়া হৈমন্তীর শরীরের একটা বিশ্রী ঘামার দোষ আছে। শীত-গ্রীষ্মে সবসময়েই ও ঘেমে তুকতুকে হয়ে থাকে। ছুঁতে একটু ঘেন্না করে শাশ্বতীর। আজও প্রথম বার শাশ্বতী ছোঁয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় বার আবার সে একই স্বপ্ন দেখল, লণ্ঠনের আলোয় মেঠো পথে দু’খানা পা হেঁটে যাচ্ছে। এবার, ভীষণ চমকে উঠল শাশ্বতী। একই স্বপ্ন দু’বার কেউ দেখে নাকি? ঘুম ভেঙে তার ভীষণ অবাক লাগল। দু’হাত মুঠো করে, দাঁত চেপে, চোখ বন্ধ করে সে হৈমন্তীর খুব কাছাকাছি সরে গেল। মাঝরাতের যে-পৃথিবী সেটা তাদের নয়, মাঝরাতের পৃথিবী চলে যায় চোর কিংবা অসৎ মানুষ, অশরীরী আর স্বপ্নের রহস্যময়তার হাতে। শাশ্বতীর বালিশ গরম হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পাশ ফিরে শুতে তার সাহস হল না। সে আস্তে আস্তে হৈমন্তীকে ঠেলা দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করল। কিন্তু হৈমন্তীর ঘুম খুব গাঢ়। সে একটু বোকাসোকা ভালমানুষ, বুদ্ধি বেশি নেই বলেই বোধ হয় হৈমন্তী অত নিঃসাড়ে ঘুমোতে পারে। হৈমন্তী জাগল না। শাশ্বতী অনেকক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকল। তারপর সে ক্ষীণ, খুব ক্ষীণ একটু গানের রেশ শুনতে পেল। অনেক দূরে, তাদের কলোনির বাইরে কিংবা যাদবপুর থেকেও দূরে কোথাও একটা মাইক বাজছে। সম্ভবত রাতজাগা কোনও অনুষ্ঠান। খুবই ক্ষীণ সেই শব্দ, মশা ওড়ার শব্দের চেয়েও মৃদু। তবু অনেকটা স্বস্তি বোধ করে শাশ্বতী ঘুমিয়ে পড়ে। আবার একই স্বপ্ন দেখে সে। আবার ঘুম ভেঙে যায়। ভয় পায় সে। তারপর বহু চেষ্টায় মাইকের সেই আন্দাজি শব্দটা শুনবার চেষ্টা করে। তারপর ঘুমোয়।

ভোর রাত্রে পাতলা ঘুমের মধ্যে সে আবার সেই মেঠো পথ, লণ্ঠন আর রোগা দু’খানা পা দেখতে পেল। হঠাৎ তীব্র ভয়ে চমকে উঠল তার বুক। ছটফট করতে করতে শাশ্বতী হঠাৎ জেগে উঠেই টের পেল তার নিজের গলায় একটা অদ্ভুত গোঙানির শব্দ হচ্ছিল এতক্ষণ। সে সজাগ হয়ে সেই গোঙানির শেষ একটু শব্দ শুনতে পেল। ভীষণ অবাক হয়ে চোখ খুলে রইল শাশ্বতী। তার শরীর অবশ, চোখ-মুখে একটা পোড়া-পোড়া জ্বালার ভাব, তালু বুক শুকিয়ে আছে তেষ্টায়। সে টের পেল বাইরে অন্ধকার পাতলা হয়ে এসেছে, ঘরের টিনের বেড়ার ফাঁক-ফোকর দিয়ে বাইরের একটা ফিকে সাদাটে ভাব চোখে পড়ে। টিনের চালের ওপর হয় শুকনো পাতা, নয়তো শিশিরের ফোঁটা পড়ার টুপ-টাপ শব্দ হয়। ভোর হয়ে আসছে, এখন পৃথিবী থেকে সরে যাচ্ছে অশরীরী প্রেতাত্মা কিংবা স্বপ্নের মানুষেরা। এখন আর ভয়ের কিছু নেই। তবু শাশ্বতীর বুকে তীব্র একটা ভয় বাঘের থাবার মতো বসে রইল। একই স্বপ্ন কেউ এত বার দেখে!

এ-স্বপ্নটার ভয়েই আর ঘুমোতে ইচ্ছে করল না তার। স্বপ্নটা এই ঘরের আনাচে-কানাচে অপেক্ষা করে ওত পেতে আছে। সে ঘুমোলেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে আসবে। শাশ্বতী আস্তে আস্তে উঠে বসল। হৈমন্তীকে আর-একবার জাগানোর জন্য সে হাত বাড়িয়েছিল, হঠাৎ সেই শিরশির শীতভাবে তার শরীর কেঁপে ওঠে। আর হঠাৎ মনে পড়ে যায়, গত কাল, গত কাল বিকেলে সে একটা মিথ্যে কথা বলেছিল। আদিত্যকে, তার গা ছুঁয়ে।

ভোর রাত্রির শান্ত নিস্তব্ধতার মধ্যে স্থির হয়ে একটু বসে রইল শাশ্বতী। হৈমন্তীর শরীরের দিকে বাড়ানো হাতখানা টেনে আনল। তারপর দু’হাত কোলের ওপর রেখে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে চোখ বুজল। কথাটা সত্য ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, কথাটা সে ইচ্ছে করে বলেনি। কাল বিকেলে হঠাৎ আদিত্য পাগল না হলে ললিতের মুখ তার মনেই পড়ত না। পড়লেও সে আস্তে আস্তে ক্রমশ ভুলে যেত সে ললিতকে কেমন দেখেছিল। কিন্তু আদিত্য ভুলতে দিল না, মনে পড়িয়ে দিল। আসলে মুখোমুখি ললিতকে সে কেমন দেখেছিল কে জানে! কিন্তু পরে যখন আদিত্য তাকে নানা কথার মার দিয়ে আস্তে আস্তে একটা কোণে ঠেলে নিয়ে গেল, যখন বারবার জিজ্ঞেস করল সে কেমন দেখেছিল ললিতকে, তখন, হঠাৎ তখনই শাশ্বতীর মনে হয়েছিল যে, সে ললিতকে সুন্দর দেখেছে— সন্ত-যোগীর মতো সুন্দর— অপার্থিব সেই রূপ। আশ্চর্য, আদিত্য তাকে খোঁচা না দিলে এ-কথাটা তার মনে পড়ত না! আর যখনই এই অতি সত্য কথাটা তার মনে এসেছে, ঠিক তখনই সে আদিত্যর গা ছুঁয়ে বলেছে যে, সে ললিতকে একটুও সুন্দর দেখেনি।

মিথ্যে কথা। সে মিথ্যে কথা বলেছিল।

কেউ ছুঁলে শরীর কেঁপে ওঠার যে বিশ্রী একটা অনুভূতি শাশ্বতীর ছিল এত কাল, সেটা আজকাল কমে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে। আদিত্যর সঙ্গে মিশবার পরে সেটা আরও কমে গিয়েছিল। শাশ্বতী বুঝতে পারছিল, এবার তাকে শরীর দিয়ে দিতে হবে। কিন্তু কাল সন্ধেবেলায় যখন আদিত্য তাকে যাদবপুরের বাসে তুলে দিচ্ছে, তখন সেই এক-চাপ ভিড়ের বাসে ওঠার সময় অচেনা লোকজনের শরীরে লেগে ভয়ংকর শিউরে উঠছিল তার শরীর। সে টের পাচ্ছিল তার প্রতিটি রোমকূপে খর বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। আবার আগেকার মতোই স্পর্শকাতর হয়ে যাচ্ছে সে। সারাটা সন্ধে তার চোখ-মুখ ভেজা-ভেজা ছিল, বুকে ঠান্ডা-বসার মতো একটা কান্নার ভাব ভার হয়ে ছিল। সন্ধেবেলা সে বাড়িতে ফিরে কয়েক বার বই খুলে অন্যমনস্ক থাকার চেষ্টা করেছে, না পেরে হাজরাদের বড় মেয়ে শিবানীর সঙ্গে রাস্তায় পায়চারি করে গল্প করেছে অনেকক্ষণ, রাত্রে ভাল করে খেতে পারেনি, যদিও তার প্রিয় সোরা-মাছ রান্না হয়েছিল কাল, তারপর শোয়ার সময় রোজ যা করে শাশ্বতী, বালিশে আঙুল দিয়ে ঠাকুরদেবতার নাম লেখা, সেটা লিখতেও ভুলে গিয়েছিল।

সেই কারণেই সে কি দুঃস্বপ্ন দেখেছে! একই স্বপ্ন দেখেছে বারবার।

না। বোধ হয় তা নয়। ঠাকুরদেবতার নাম লিখেও অনেক বার ভয়ের স্বপ্ন দেখেছে শাশ্বতী। তা ছাড়া, এ-স্বপ্ন বোধহয় ভয়ের স্বপ্ন ছিল না। মেঠো পথে লণ্ঠন হাতে একটা লোক চলে যাচ্ছে, তার শরীর দেখা যায় না। কে লোকটা! কোথায়ই বা যাচ্ছে। কিছুই বোঝা যায় না। গ্রাম-দেশ কখনও দেখেনি শাশ্বতী। তবু তার স্বপ্নে কোথা থেকে এল ওই মেঠো পথ! না, স্বপ্নটা ভয়ের ছিল না। বরং রহস্যময়। বারবার না দেখলে এই স্বপ্ন তার মনেও থাকত না। তবে সে কেন বারবার দেখেছিল?

শাশ্বতী স্থির হয়ে বসে চেয়ে রইল। তার স্পর্শকাতর শরীরে শিউরোনো রোমকূপ, গায়ে জ্বরজ্বর ভাব, তালু-গলা শুকিয়ে আছে তেষ্টায়, চোখ জ্বলছে, পেট ডাকছে কলকল করে, তার রাতের খাবার হজম হয়নি। তবু শারীরিক অনুভূতিগুলো সে সঠিক টের পাচ্ছিল না। তার মনে পড়ছিল যে, গতকাল সে আদিত্যকে ছুঁয়ে একটা ভীষণ মিথ্যে কথা বলেছিল, আর সারা রাত ধরে সে একটা অচেনা-অজানা লোকের দু’খানা পা স্বপ্নে দেখেছে। মনে মনে কোনওটার সঙ্গে কোনওটাই তার মিলছিল না। কেবল মনে হয়, তার মনের গভীরে কোথাও এক অতি রহস্যময় সূত্রে সেই মিথ্যে কথাটার সঙ্গে স্বপ্নে-দেখা লোকটার একটা সম্পর্ক রয়ে গেছে।

নিজেকে সামলাতে পারছিল না শাশ্বতী। খুব অস্থির লাগছিল তার। ঘরের মধ্যে ভোর রাত্রির এক অদ্ভুত আলো-আঁধারি। মশারির সাদা গায়ে অস্পষ্ট সব ছায়া। বাইরে কখনও কখনও ভোরের কাক ডাকছে। এখনও তেমন আলো ফোটেনি বলে পাখিরা বাসা ছাড়েনি। নানা অস্পষ্ট চিন্তা, স্মৃতি, স্বপ্ন তার মাথার মধ্যে ঘুলিয়ে উঠছিল। অকারণ। আর, একটা ভয়।

সকালের দিকেই ঘুম শাশ্বতীর প্রিয়। কিন্তু ভয়ে সে ঘুমোতে পারল না। চুপচাপ বসে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর পাশের ঘরের দরজায় ছিটকিনি আর আড়কাঠ খোলার শব্দ শুনল সে। মা।

এত সকালে সে কোনও দিন ওঠে না। আজ উঠে বাইরে এসে ভোরবেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল সে। এখন শরৎকাল, সকালের দিকে সামান্য কুয়াশা হয়। একটু শীত করে। উঠোনজোড়া বাগান ভিজে আছে, সতেজ দেখাচ্ছে গাছপালা। ঝাঁকড়া জামরুল গাছটার পেশি-ফোলানো পুরুষ চেহারা, তার প্রকাণ্ড গা বেয়ে নেমেছে শিশিরের জল। অল্প কুয়াশার একটু আবছা তার ওপরে ডালপালা। রাস্তার ও-পাশে বাড়িগুলো দিনের বেলা রোদে যেমন দেখায় তেমন দেখাচ্ছে না এখন। পাতলা কুয়াশায় ডুবে যেন জলের তলাকার দৃশ্যের মতো দেখায়। কুয়াশার মধ্যে ছায়ার মতো ওড়াউড়ি করছে কাক।

শাশ্বতী দেখে উঠোনের এক ধারে বসে মা তোলা-উনুনের ছাই বের করছে। মা’র পরেই ঘুম থেকে ওঠে হৈমন্তী। মা তাকে না দেখেই হৈমন্তী বলে ভুল করে বলে, হৈম, সতীটার গায়ে চাপা আছে কি না দেখে আয়। আজকাল শীত পড়ে।

শাশ্বতী হাসে, উত্তর দেয় না। উঠোনে নামতেই ঠান্ডা মাটির শীত শরীর বেয়ে ওঠে। শিউরে ওঠে শরীর। মায়ের বুকের পাশ দিয়ে হাত বাড়িয়ে উনুনের ছাই তুলে আঙুলে দাঁত মাজতে মাজতে শাশ্বতী তাদের বাগানটার কাছে চলে আসে। একটুক্ষণ গাছপালা দেখে।

হঠাৎ এতক্ষণ পর মা বলে ওঠে, ও মা! তুই?

শাশ্বতী মুখ ফিরিয়ে হাসে, উঠে পড়লাম।

এত সকালে! পেট গরম হয়নি তো? রাতে ঘুমিয়েছিস?

শাশ্বতী মাথা নাড়ে, না, কিছু না। এমনিই উঠলাম।

আর কথা হয় না। মা একমনে ঘুঁটে ভাঙে। শাশ্বতী দাঁত মাজতে মাজতে বেড়ায়। বারান্দার ওপর বেড়া দেওয়া একটা খুপরি। কালীনাথ ওটাতে থাকে। জানালার বেড়ার ঝাঁপটা তোলা। সেখান দিয়ে একবার উঁকি মেরে শাশ্বতী দেখল, কিছুই দেখা যায় না। কেবল মশারিটা। আজ অফিসে কালীনাথের সঙ্গে আদিত্যর দেখা হবে। আদিত্য কালীনাথকে কিছু বলবে কি? বলার মতো কিছুই ঘটেনি। তবু হয়তো আদিত্য বলবে, শাশ্বতীকে নিয়ে ললিতের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তার কী রকম সব অনুভূতি হয়েছিল। আদিত্য সবাইকে সব কথা বলে দেয়।

অনেকক্ষণ ধরে দাঁত মাজছিল সে, বে-খেয়ালে। মা বারান্দা ঝাঁট দিতে দিতে ঝাঁটাটা বারান্দার কোণে আছড়ে বলল, দাঁতগুলো ক্ষয় করে ফেলবি।

শাশ্বতীর খেয়াল হল সে অনেকক্ষণ দাঁত মাজছে। তাদের বাড়ির পিছন দিকে পুকুর। যাওয়ার রাস্তাটা জুড়ে গত বর্ষায় ঘন হয়ে উঠেছে কচুকন, যাওয়া-আসার সময়ে গায়ে লাগে। একটা পাতা গায়ে লাগতেই টপ করে এক ফোঁটা শিশিরের জল তার হাত বেয়ে নেমে যায়। শিরশির করে ওঠে শরীর। কাঁটা দেয়। আর জন্মে তুমি শজারু ছিলে, সতী নিজেকেই সেকথা বলে আর হাসে।

পিছনে পুকুর পর্যন্ত তাদের বাড়ির সীমানা। অনেকটা জায়গা। আটচল্লিশ সালের গোড়ায় এসে বাবা এ-জায়গাটার দখল নিয়েছিল। তখন বাবা ছিল বিষয়ী লোক। কোন জমিটা সরেস, কোনটা নীরেস তা সঠিক বুঝত। বাবা পুকুরের গা ঘেঁষে, দু’পাশে রাস্তা হওয়ার সম্ভাবনা আছে দেখে তবেই দখল করেছিল জায়গা। সাত-আট কাঠা জমি। বুক-সমান উঁচু ঘেরাপাঁচিলে ঘিরে নিয়েছিল জমি। তখন রিফিউজি কলোনিতে জমির কাড়াকাড়ি চলছে, কে কোথায় বসে ঠিক নেই। বাবা ঠিক বসেছিল। এখনও এই কলোনিতে তাদের বাড়িটাই সবচেয়ে সুন্দর জায়গায়। তাদের জমিতে ছ’টা নারকেল গাছ, পিছনে পুকুর, সামনে বাগান, দু’পাশে রাস্তা। যখন এই বাড়িটার জন্ম হচ্ছে তখনই জন্মেছিল শাশ্বতী, এই বাড়িতেই। বাড়ির পিছনে এই কচুবনের মধ্যেই গোয়ালঘরের মতো একটা আঁতুড়ঘর, তার জন্মের তিন-চার মাস আগে থেকেই তুলে রেখেছিল তার বিষয় এবং সতর্ক বাবা। জন্মের আট-নয় বছর পরেও ঘরটা দেখেছে শাশ্বতী, সেই ঘরটা তখন সত্যিই গোয়ালঘর। তার ছোট ভাই বাচ্চু জন্মায় শাশ্বতীর জন্মের প্রায় দশ বছর পর। মা-বাবার সেই বয়সে সন্তান হওয়াটা বেমানান। বাচ্চু হঠাৎ হয়ে গিয়েছিল। বাচ্চু হওয়ার সময়ে আর আঁতুড়ঘর তৈরি হয়নি, সে হয়েছিল শোয়ার ঘরেই। কারণ, তখন আর ঠাকুমা বেঁচে নেই, বাবা-মায়েরও নেই দেশগাঁয়ের সেই শুচিবাই। তারা অনেক পালটে গিয়েছিল। এখন আর সেই গোয়ালঘরটা নেই, গোরুটা মরে গেছে কবে। গাছগাছালি কেটে তৈরি হয়েছিল ঘরটা, আবার সব গাছগাছালিতে ঢেকে গেছে। যেমন উঠোনে যাবার সেই গুহার মতো গর্তটার জায়গায় আবার তকতক করছে উঠোন।

মুখ ধুয়ে পুকুর থেকে উঠে আসবার সময়ে শাশ্বতী ঘাটের পথটুকু দেখল। স্বপ্নের সেই মেঠো পথের সঙ্গে এই পথটুকুর কোনও মিল নেই। সে-পথটা, সেই লণ্ঠনের আলোয় যতটুকু দেখেছিল শাশ্বতী, দিগন্তজোড়া মাঠের ভিতর দিয়ে গেছে। সেটা অনেক দূরের পথ। আশ্চর্য, কোথা থেকে কোথায় যে যাচ্ছিল লোকটা। তার মুখ দেখেনি শাশ্বতী। যদি দেখত, তবে কি চিনতে পারত শাশ্বতী! সে কি চেনা লোক?

স্বপ্নটার কথা মনে পড়তেই সুন্দর ভোরবেলায় আবার তার মন ভারী হয়ে গেল।

উঠোনে ঢুকবার মুখে শাশ্বতী দেখল সামনেই একটা বাধা। বাচ্চু ঘুমচোখে উঠে এসে বারান্দার ধারে দাঁড়িয়ে পথ জুড়ে পেচ্ছাব করছে।

শাশ্বতী বলল, অ্যাই!

ঘুম-জড়ানো বোকা চোখে বাচ্চু অবাক হয়ে চেয়ে আছে। ওর হাঁ-করা মুখ দিয়ে ভাপ বেরোচ্ছে। ওর বয়সের কথা কেউ খেয়ালই করে না। সকলের অনেক পরে জন্মেছে বলে সকলেই ওকে শিশুর মতোই দেখে। আদরে আদরে ও শিশুই রয়ে গেছে এখনও। খুব কচি মুখচোখ, বোধবুদ্ধি তেমন ফোটেনি।

শাশ্বতী দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল। তারপর হেসে বলল, এই বাচ্চু, দাঁড়া, দেখাচ্ছি! এই ধরলাম….

সে হাত বাড়াতেই বাচ্চু পা মাটিতে ঠুকে চেঁচায়, অ মা!

মা বারান্দা থেকে বলে, ঠান্ডু, ওকে ছেড়ে দে।

শাশ্বতী বলে, তুই ঘাটের রাস্তায় পেচ্ছাব করছিস কেন?

বাচ্চু প্যান্ট নামিয়ে পিছিয়ে গিয়ে হাসে, ইল্লি…

উঠোনে ঢুকতে ঢুকতে শাশ্বতী মনে মনে হিসেব করল। করে অবাক হয়ে দেখল, বাচ্চুর বয়স এখন দশের কাছাকাছি। লীলাবতীর ঘটনা যখন ঘটে তখন বাচ্চু খুব ছোট। সে ঘটনাটা আট কি নয় বছরের পুরনো হয়ে গেল। লীলাবতীর মুখ আর মনেই পড়ে না, বাচ্চু লীলাবতীকে ভাল করে দেখেইনি। বাচ্চু বয়স এখন দশের কাছাকাছি ভেবে একটু অবাক হয় শাশ্বতী। না, আর বাচ্চুর সঙ্গে তার ও-রকম খেলা করা উচিত না।

উঠোনে বাবা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে খুরপি। বাবা এখন বাগানে ঢুকবে, তারপর সারা দিন ঘুরে-ফিরে বাগানেই থেকে যাবে। গাছগাছালির কাছাকাছি। এখন গাছপালা ভালবাসে বাবা, যত্নে বাগান করে। কিন্তু একটা সময়ে, বাবা যখন বিষয়ী লোক ছিল তখন বাগানের জায়গায় বাড়ি করে ভাড়া দেওয়ার কথা ভেবেছিল বাবা। কিন্তু রিফিউজির দখল করা জমির ওপর গভর্নমেন্ট ছাদওয়ালা বাড়ি করতে দেয়নি বলে সেটা হয়নি। জমিটায় বাগান করেছিল লীলাবতী— তার হাতের কামিনী আর শিউলি গাছ এখনও রয়ে গেছে। মা’র ঠাকুর পুজোর ফুল দেয়। বাবা তার গর্ত থেকে উঠে আসবার পর মানুষজনের সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দিল খুব। গাছগাছালির খেলায় মেতে রইল। এখন বাবা গাছেদের সঙ্গে কথা বলে, সারা দিন ঘোরে তাদের কাছাকাছি। বাবার ব্ৰহ্মরন্ধ্র ভেদ করে সেই আমলকী গাছটা শেষ পর্যন্ত আর বেরোয়নি। কিন্তু বাবার সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে খানিকটা বিশ্বাস করে কিছু কৌতুহলী লোক অনেক দিন তাদের বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করেছে। বাবার মাথা থেকে গাছ বেরোয়নি দেখে হতাশ হয়েছে তারা। কিন্তু শাশ্বতী দেখে, বাবার শরীর গাছ হয়ে না গেলেও তার মধ্যে গাছগাছালির একটা স্বভাব এসে গেছে। নির্বিকার, নিরুত্তাপ, আবেগ নেই এতটুকু। সারা দিন প্রায় বোবা হয়ে থাকে বাবা। অনেকেই হয়তো ভাবে, লীলাবতীর স্মৃতি জুড়িয়ে আছে বলেই বাবা বাগানটা নিয়ে পড়ে আছে। কিন্তু শাশ্বতী জানে যে, তা নয়। কারও জন্যই আর তেমন কোনও বোধ নেই বাবার। কতকাল ‘মলু’ ডাকটা আর শোনেনি শাশ্বতী! আসলে, বাবা সেই গুহার গর্তে বসে গাছেদের মতোই নির্বিকার হতে চেয়েছিল বোধ হয়। সেই চাওয়াটা পূর্ণ হয়েছে। কেবল মাঝে মাঝে পাগলামি দেখা দেয়। কিছু দিন পর আবার ঠিক হয়ে যায়। বাবা গাছেদের কাছে ফিরে যায়।

একমাত্র বাচ্চুর সঙ্গে ছাড়া বাবা স্বেচ্ছায় কারও সঙ্গেই কথা বলে না। কিন্তু বাবাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে মাঝে মাঝে উত্তর পাওয়া যায়। অদ্ভুত সব উওর। লোকে এখনও বিশ্বাস করে বাবার ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায়। হয়তো যায়। বাগানের বেড়ার পাশে পথের ওপর দাঁড়িয়ে এখনও অনেক লোক বাবার সঙ্গে কথা বলে, পরামর্শ চায়। অধিকাংশ সময়েই নীরব থাকে, কিন্তু মাঝে মাঝে বাবা উত্তর দেয়। লোকে বলে, সে-সব উত্তর মিলে যায়। কিন্তু শাশ্বতীরা জানে যে, বাবার কোনও যোগসিদ্ধ নেই, বাবা সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিল। মা’ও তাই জানে। তবু কখনও-সখনও শাশ্বতী লক্ষ করেছে মুশকিলে পড়লে মা বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, সমস্যার কথা বলে জিজ্ঞেস করে, তুমি কী বলো? তাদের লুকিয়ে জিজ্ঞেস করে মা, তবু তারা দেখেছে ব্যাপারটা।

বাবা তার দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাবা এখন বাচ্চুর জন্য অপেক্ষা করছে। বাচ্চু মুখ ধুচ্ছে বারান্দার এক কোণে। মুখ ধুয়ে পান্টের দু’পকেটে মুড়ি আর ছোট্ট কাস্তে কিংবা কোদাল হাতে বাচ্চু এসে সমবয়স্ক বন্ধুর মতো বলবে, চলো বাবা। তারপর দু’জনে নিঃশব্দে বাগানে ঢুকে যাবে। সাড়ে সাতটা-আটটায় উঠবে কালীনাথ, তখন মাটিমাখা হাত ধুয়ে বাচ্চু এসে পড়তে বসবে।

বাবার আশেপাশে উঠোনে একটু ঘুরে বেড়াল শাশ্বতী। আঁচলে মুখের জল মুছে নিল। বাবা কি সব প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দিতে পারে? শাশ্বতীর বিশ্বাস হয় না। তবু তার ইচ্ছে করে বাবাকে দু’-একটা প্রশ্ন করতে। কী উত্তর দেয় দেখাই যাক না।

কিন্তু করি করি করেও ইতস্তত করে শাশ্বতী। সংকোচ হতে থাকে। হঠাৎ চোখে চোখ পড়তেই দেখে বাবা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে-চোখে কিছুই ছিল না, তবু হঠাৎ তার মনে হল এক্ষুনি তার কী একটা গোপন কথা বাবা জেনে যাবে।

শাশ্বতী বারান্দায় উঠে এল। বাচ্চু তার যন্ত্রপাতি হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। মুখোমুখি হতেই তাকে মুখ ভেঙিয়ে দৌড়ে নেমে গেল বাচ্চু। বারান্দা থেকে শাশ্বতী দেখল বাগানের বেড়ার গেট খুলে আগে আগে বাচ্চু, আর তার পিছনে বাবা ঢুকে যাচ্ছে। গেট বন্ধ করার জন্য বাবা একবার পিছু ফিরল। ফিরেই সোজা বারান্দায় তার চোখে চোখ রাখল। শান্ত চোখে বোধহয় সদ্য ওঠা সূর্যের আলোর একটু ঝিলিক দেখা গেল। কিন্তু শাশ্বতীর মনে হল, বাবার চোখ সকৌতুকে হেসে উঠছে। ‘মানুষের দুর্বলতাগুলি আমি জানি।’ বুক কেঁপে উঠল তার। সে মুখ ফিরিয়ে নিল।

বাবা কি সত্যিই কিছু জানে? না কি সব ভুয়ো, ফক্বিকারি? তবু তার ইচ্ছে করে জিজ্ঞেস করতে রাত্রের দেখা স্বপ্নটার কথা, কিংবা আদিত্য আর ললিতের কথা, কিংবা তার নিজেরই কথা। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে ভয় করে তার।

ঠিকে ঝি আজ কাজে আসেনি। একটু বেলা পর্যন্ত দেখে মা আর হৈমন্তী এঁটো বাসন কোসন নিয়ে ঘাটে যাচ্ছিল। পড়ার টেবিলে বসে খোলা বইয়ের সামনে জানালা দিয়ে বাইরে অন্যমনে তাকিয়ে ছিল শাশ্বতী। মাকে ঘাটে যেতে দেখে উঠে এসে বাসনগুলো নিয়ে বলল, আমি আর মেজদি সেরে দিচ্ছি, তুমি রান্নায় যাও।

শাশ্বতী পড়াশুনো করে বলে মা কখনও তাকে ঘরের কাজে ডাকে না। হৈমন্তী পড়াশুনোয় ভাল ছিল না, স্কুল ফাইনালের পর আর পড়া হয়নি। হৈমন্তী একটু বোকাও। বাড়ির কাজে সেই থাকে মায়ের সঙ্গে। কাজেই শাশ্বতী আর এগোয় না। কিন্তু আজ তার অন্যমনস্ক এবং কোনও কাজে ব্যস্ত থাকতে ইচ্ছে করছিল।

ঘাটে হৈমন্তীর মুখোমুখি বাসন মাজতে বসে সে হঠাৎ আচমকা জিজ্ঞেস করল, তুই কখনও দুঃস্বপ্ন দেখিস?

হৈমন্তী বলল, দেখি।

কীসের?

অনেক রকম।

ভূতের?

না। আমি দেখি সাপের।

শাশ্বতী ঠোঁট ওলটায়, দূর! সাপের স্বপ্নে জ্ঞাতি বাড়ে। তাতে তোর কী?

হৈমন্তী একটু ভেবে বলে, কী জানি?

আমি কাল একটা ভয়ের স্বপ্ন দেখেছি।

কী?

একটা লোক লণ্ঠন হাতে হেঁটে যাচ্ছে।

বলতে গিয়ে শাশ্বতী বুঝল, স্বপ্নটা তার কাছে যতখানি ভয়ের, অন্যের কাছে ততটা নয়। তাই সে আর বলল না।

হৈমন্তী হাসল, তোর মাথায় পোকা। একটা লোক লণ্ঠন হাতে হেঁটে যাচ্ছে, তাতে ভয়ের কী?

শাশ্বতী চুপ করে অনেকক্ষণ একটানা বাসন মাজল।

হৈমন্তী জিজ্ঞেস করল, কাল তোরা কোথায় গিয়েছিলি?

শাশ্বতী হৈমন্তীকে আদিত্যর সব খবর দেয়। কোথায় গিয়েছিল, কোন রেস্টুরেন্টে কী খেয়েছিল, কিংবা কোন হল-এ কী সিনেমা দেখেছে— সব। হেমন্তী খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে। তাকে উৎসাহ দেয়। খুবই সরল হৈমন্তী। শাশ্বতীর মাঝে মাঝে মনে হয়, হৈমন্তী তার দিদি নয়, ছোট বোন। সরল, বোকা, ভাল মেয়েটা।

শাশ্বতী হেসে বলল, ওর এক বন্ধুর অসুখ, তাকে দেখতে গিয়েছিলাম।

কলেজ পালিয়ে?

হুঁ।

কেমন দেখলি! কী অসুখ?

ক্যানসার।

মেসোমশাইয়ের মতো?

মেসোমশাইয়ের তো শ্বাসনালীতে ছিল। এরটা পেটে।

বাঁচবে?

শাশ্বতী ঠোঁট ওলটায়, কী জানি?

কেমন দেখলি?

চেহারা ভালই। অসুখ বলে মনেই হয় না।

তা হলে বাঁচবে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে হৈমন্তী

শাশ্বতী হাসে। তারপর বলে, লোকটা খুব চালাক। আমি ভদ্রলোককে সাহস দেওয়ার জন্য মেসোমশাইয়ের কথা বললাম, তারপর বললাম, দেখবেন, আপনি ভাল হয়ে যাবেন। উত্তরে একটু ঘুরিয়ে লোকটা বলল, আপনারা তাড়াতাড়ি বিয়েটা করে ফেলুন, আমি যেন দেখে যেতে পারি।

আহা রে। হৈমন্তী বলল, কষ্ট হয়। কত বয়স?

বেশি না। ত্রিশ-বত্রিশ, কিংবা আর-একটু বেশি।

আদিত্যর মতো?

হ্যাঁ।

হৈমন্তী কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে, তারপর খুব মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে, আদিত্য বিয়ের কথা কিছু বলে না?

একটু অন্যমনস্ক ছিল শাশ্বতী, এই কথায় চমকে উঠে হেসে ফেলল। তারপর ঘাড় নেড়ে বলল, বলে। যখন বাই ওঠে তখন বলে, এক্ষুনি চলো রেজিষ্ট্রি করে আনি। আবার কখনও কখনও বিয়ের কথা ভুলে যায়।

তোরা রেজিষ্ট্রি করবি?

করব।

কেন?

শাশ্বতী একটু ভেবে বলল, ওর সঙ্গে আমাদের জাত মেলে না, সামাজিকভাবে করলে মা-বাবা-দাদার নিন্দে হবে।

বলতে বলতে হঠাৎ মনে মনে শিউরে ওঠে শাশ্বতী। গতকাল বিকেলে আদিত্য জাতের কথা বলেছিল। সে জাত আলাদা। অন্য রকমের এক জাতিভেদ। আদিত্য তাকে বুঝিয়েছিল, কিন্তু সে ভাল বোঝেনি। কিন্তু এখন হৈমন্তীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তার মনে হল, সে নিজেও অনেক দিন ধরেই জানে যে, আদিত্যর সঙ্গে তার জাত মেলে না।

হৈমন্তী বলল, দাদা তো ওর সঙ্গে আমারও বিয়ে দিতে চেয়েছিল, সামাজিকভাবেই। তোরা রেজিষ্ট্রি করবি কেন?

করলে কী হয়?

হৈমন্তী বিষণ্ণ মুখে বলে,আমাদের বাড়ির দুটো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল, অথচ আলো জ্বলল না, বাজনা বাজল না, আমরা সাজলাম না— দূর, ভাবতে ভাল লাগে না।

শাশ্বতী হাসে, আমার বোধ হয় বউভাত-টউভাত হবে না।

হৈমন্তী মৃদু গলায় বলে, আদিত্যর বাপ-মা রাজি হবে না, না?

শাশ্বতী ঠোঁট ওলটায়, কী জানি! মনে তো হয় না।

হৈমন্তী বড় করে শ্বাস ছাড়ে হঠাৎ! তারপর আচমকা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে, পুরুষমানুষেরা কেমন হয় বল তো!

শাশ্বতী স্থির চোখে একটু হৈমন্তীকে দেখে। তারপর উত্তর না দিয়ে অন্যমনস্ক থাকে একটু। আশ্চর্য যে এই প্রশ্নটা তারও মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরুষমানুষেরা কেমন হয়?

পুকুরের ও-পারে হাজরাদের বাড়ি। ঘাট থেকে শিবানী ডাকল।

সতী!

শাশ্বতী মুখ তুলে হাসল, কী রে!

বাসন মাজছিস! ঝি আসেনি?

না।

কলেজ যাচ্ছিস?

যাব।

আমি যাচ্ছি না।

কেন?

জামাইবাবু এসেছে। আজ ম্যাটিনি শো-তে সিনেমায় যাব।

কী ছবি?

কী যেন…বলে হাসল, শক্ত নাম। ভুলে গেছি। হিন্দি। দেবানন্দ ওয়াহিদা। তুই যাবি? টিকিট আছে।

না রে।

শিবানী হাসল, জানতাম, যাবি না। কলেজের পর কোথায় যাচ্ছিস?

কোথাও না।

ইস। শিবানী হাসল, জানি।

শিবানী ঘাট থেকে উঠে গেল। হৈমন্তী গুনগুন করে শাশ্বতীর কাছে শিবানীর নিন্দে করছিল, বেহায়া, পাড়া-বেড়ানি, আড্ডাবাজ। শাশ্বতী মন দিয়ে শুনল না। কেবল একবার হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বলল, আমাদের কেউ প্রশংসা করে না।

হৈমন্তী চুপ করে গেল।

কথাটা বলেই শাশ্বতীর মনে পড়ল যে, এখনও তাদের পরিবারের নিন্দের কথা আদিত্য জানে না। লীলাবতীর ঘটনা তাকে কেউ বলেনি। জানলে কী করবে আদিত্য? ভেবে পেল না শাশ্বতী। হয়তো হো হো করে হেসে বলবে, দূর। ও কিছু না। কিংবা হয়তো গম্ভীর হয়ে বলবে, একথা এত দিন বলোনি কেন? দুটোর যে-কোনওটাই করতে পারে আদিত্য। তার সম্বন্ধে নিশ্চিত করে কিছু বলা মুশকিল। শাশ্বতীর মনে হয় অনেক আগেই তার আদিত্যকে লীলাবতীর ঘটনাটার কথা বলে দেওয়া উচিত ছিল। অন্য কারও কাছ থেকে শোনার আগে তার কাছ থেকে শুনলেই ভাল হত। কেন বলেনি সে?

সারা সকাল হৈমন্তী আর মা’র সঙ্গে ঘরের কাজ করল শাশ্বতী, মশারি তুলে বিছানা ঝাড়ল, ঘর মুছল, ঠাকুর পুজোর জল আনল পুকুর থেকে। বই নিয়েও বসল একটু। পড়া হল না।

পুরুষমানুষেরা কেমন হয়?

কালীনাথ ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় বসে বসে চা খাচ্ছে। তার সামনে মাদুর বিছিয়ে পড়তে বসেছে বাচ্চু। রান্নাঘরে হৈমন্তী। ঠাকুরঘরে মা। বাবা বাগানে একা।

শাশ্বতী পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠোনে এল। কয়েক পা এদিক-ওদিক হাঁটল। তারপর আস্তে বাগানের গেট খুলে ভিতরে ঢুকে গেল।

ঘন গাছপালার একটা আলাদা জগতের মধ্যে চলে এল সে। ভেরেন্ডাগাছের উঁচু বেড়ার আড়ালে তাদের বাগান। শান্ত। নিস্তব্ধ। ঠান্ডা। হাঁটতে গেলে গাছপালা গায়ে লাগে। সরসর শব্দ হয়। শিউরে ওঠে শাশ্বতীর শরীর। এখানে ততখানি আলো নেই। একটু ঝুপসি আলো-আঁধারি। এর মধ্যে বাবাকে প্রথম দেখতে পেল না শাশ্বতী। অনেকটা বড় তাদের বাগান। সে পায়ে পায়ে গাছপালার ভিতর দিয়ে হাঁটতে লাগল। বাচ্চুর তৈরি করা নুড়িপাথরের কৃত্রিম পাহাড়, তার পাশ দিয়েই গেছে আঁকাবাঁকা লাল সুরকির ক্ষুদে রাস্তা, রাস্তার মাঝখানে একটা চত্বরে পিচবোর্ডের তৈরি ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাফিক পুলিশটার গায়ে একটা সাদা কাগজ আঠা দিয়ে লাগানো, তাতে লেখা— বাবা ওই দিকে। নিচু হয়ে লেখাটা পড়ে শাশ্বতী হাসে, ট্রাফিক পুলিশটার ডান হাত যে-দিকে দেখিয়ে দিচ্ছে সে দিকে তাকিয়ে সত্যিই বাবাকে দেখল শাশ্বতী। গোলাপের ডাল মাটিতে পুঁতে তার ডগায় গোবরের ঢিবি লাগাচ্ছে বাবা। ট্রাফিক পুলিশটার দিকে তাকিয়ে আবার একটু হাসে শাশ্বতী। এটা বাচ্চুর বুদ্ধি। বাবা যখন যে-দিকে থাকে সে-দিকে ওটাকে ঘুরিয়ে রাখে। কিংবা হয়তো বাবাই ঘুরিয়ে দেয়, বাচ্চুর বাবাকে খুঁজতে সুবিধে হবে বলে।

গত তিন-চার মাস আর বাগানে আসেনি শাশ্বতী। গত বর্ষায় জঙ্গল বেড়ে গেছে। বাবার কাছে না গিয়ে একটু এদিক-ওদিক ঘুরল! বাবা তাকে লক্ষ করল না। তারপর ধীর পায়ে আস্তে সে বাবার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। অনেক—অনেক দিন হয় সে বাবার সঙ্গে কথা বলেনি। তার লজ্জা করছিল।

তারপর ঝুপ করে মাটিতে বসল সে। বলল, বাবা, এই সময়ে কেউ গোলাপের ডাল লাগায়? বর্ষাকালে লাগাতে হয়।

বাবা উত্তর দিল না। কিন্তু খুব ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত চোখে তাকে একবার দেখে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।

শাশ্বতীর বুক ঢিবঢিব করে। বাবা কি বুঝতে পারছে যে সে আসল কথা বলার আগে একটা ভূমিকা করছে?

অনেকক্ষণ পর বাবা হঠাৎ তার প্রশ্নের উত্তর দিল। খুব আস্তে গলায় বলল, লাগানো যায়। একটু বেশি জল দিতে হয়।

একটু সাহস পায় শাশ্বতী। বলে, অনেক আগাছা হয়েছে। পরিষ্কার করো না কেন?

বাবা চুপ করে কাজ করতে থাকে। উত্তর দেয় না।

অস্বস্তিতে মাটিতে একটু পা ঘষে শাশ্বতী। জামরুল গাছটার ডালে ছোট্ট মৌচাক—মৌমাছি উড়ছে। ঘাসের ওপর দিয়ে কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে হলুদ প্রজাপতি। পোকামাকড়ের শব্দ হয়। ঝিঁঝি ডাকে। শান্ত, সুন্দর, ঠান্ডা ছায়ায় ঝিম মেরে আছে বাগানটা। একটু দূর থেকে বাচ্চুর ট্রাফিক পুলিশ তার দিকেই আঙুল উঁচিয়ে আছে।

শাশ্বতী হঠাৎ শান্ত গলায় বাবাকে জিজ্ঞেস করে, বাবা, আমার কী হবে বলো তো! আমার ভবিষ্যৎ কী?

বাবা উত্তর দেয় না। কেবল একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে শান্ত চোখে দেখে। চোখ ফিরিয়ে নেয়। শাশ্বতীর বুক কাঁপে। ভয় করে।

কাল রাতে আমি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি। শাশ্বতী বলল।

বাবা কিছু জিজ্ঞেস করল না।

তবু শাশ্বতী জোর করে বলল, একটা লোক লণ্ঠন হাতে মেঠো পথ দিয়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। লোকটার মুখ দেখিনি, কিন্তু মনে হয় মুখ দেখলে আমি চিনতে পারতাম। বলে শাশ্বতী থামে, তারপর জিজ্ঞেস করে, লোকটা কে বলো তো!

বাবা উত্তর দেয় না। খুরপির ধার দিয়ে হাতের গোবর চাঁচে। হাতে মাটি মাখতে থাকে। ঘাসের ওপর হাত ঘসে।

শাশ্বতী বাবার দিকে একটু চেয়ে থাকে। তার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, কাল আদিত্য আমাকে সন্দেহ করেছিল কেন? আমি ললিতকে সুন্দর দেখেছিলাম কেন? আমি কাল একটা মিথ্যে কথা বলেছিলাম কেন?

কিন্তু তার লজ্জা করল। বাবা সেই আগেকার মতো বাবা আর নেই। গাছের মতোই উদাসীন। ইচ্ছে করলে জিজ্ঞেস করা যায়। কিন্তু শাশ্বতী পারল না। তবু অনেকক্ষণ বসে রইল শাশ্বতী। তারপর হঠাৎ সচেতন হয়ে হাসল।

দূর! বাবা সত্যিই কিছু জানে না। বাবা পাগল।

সে একটা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল।

চলে আসছিল শাশ্বতী। হঠাৎ শুনল বাবা খুব মৃদু স্বরে বলল, সাবধানে থেকো। পড়ে যেয়ো না।

সে চমকে ঘুরে দাঁড়াল। বাবা গোলাপ-ডালটার সামনে নিচু হয়ে বসে আছে, মাটির দিকে চোখ। না, শাশ্বতীকে নয়। বোধ হয় গাছটাকে বলছে বাবা। শাশ্বতী লক্ষ করে গোবরের ঢিবির ভারে গাছটা নয়ে পড়েছে মাটির দিকে। হ্যাঁ, গাছটাকেই সাবধান করছে বাবা, সাবধানে থেকো। পড়ে যেয়ো না।

শাশ্বতী মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে বাচ্চুর ট্রাফিক পুলিশটাকে পার হল, চলে এল বাগানের গেটটার কাছাকাছি। গেট খুলে বেরিয়ে আসবার সময়ে তার এমনিই মনে হল, বাবা ওই কথা বলেছে শুধু গাছটাকে নয়। শুধু গাছটাকে নয়…

স্নান করতে যাওয়ার সময়ে সে মাথায় তেল ঘষতে ঘষতে হৈমন্তীকে বলল, আজ সিনেমায় যাবি? আমার কলেজ যেতে ইচ্ছে করছে না। যাবি তো বল, দাদার কাছ থেকে টাকা চেয়ে রাখি।

হৈমন্তী হাসল, আমার সঙ্গে তোর ভাল লাগবে? লাগলে যাব।

স্নান করে এসে আবার কী একটু ভাবল শাশ্বতী। আজ কলেজে একবার আদিত্য আসতে পারে। এখন, কালকের পর তাদের একবার দেখা হওয়া দরকার। কালীনাথ বেরিয়ে যাচ্ছে দেখেও শাশ্বতী টাকা চাইল না।

হৈমন্তী জিজ্ঞেস করল, দাদাকে বললি না?

থাক গে, শাশ্বতী বলে, আজ কলেজেই যাই। কাল-পরশু দেখব।

কলেজে যাওয়ার সময়ে চলন্ত বাস থেকে শাশ্বতী একটা পোস্টার দেখল। দেবানন্দের সুন্দর মুখ হাসছে। শিবানীরা আজ সিনেমায় যাচ্ছে। চলন্ত বাস থেকে ছবিটার শক্ত নামটা পড়তে পারল না শাশ্বতী। পেরিয়ে গেল। সিনেমায় গেলেও মন্দ হত না। গেল না বলে হৈমন্তীর মন খারাপ হয়ে গেল বোধ হয়। কিন্তু কলেজে যাওয়াটাই আজ দরকার শাশ্বতীর। আজ কোনও একটা ঘটনা ঘটবে। তার মন বলছে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%