শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সারা রাত ধরে ঝিরঝির বৃষ্টি হয়ে গেল কি? নাকি রান্নাঘরের টিনের চালের ওপর পেয়ারা গাছের ডালপালা নড়ার শব্দ! গাঢ় ঘুম হয়নি ললিতের— সারা রাত সে এক অবসন্ন আচ্ছন্নতার মধ্যে পড়ে ছিল। তার মধ্যে অস্বস্তিকর খ্যাপাটে সব স্বপ্ন দেখেছে সে।
রেলগাড়ির একটা কামরায় সে একা খুব দূরে কোথাও চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ টের পেল গাড়ি থেমে আসছ। বাইরে ধীরে গম্ভীর গলায় কেউ হেঁকে বলছে— যশিডিহ্…যশিডিহ্…। যেন তার জন্যই ওই ডাক, ওই নামোচ্চারণ। হঠাৎ খেয়াল হয় এইখানেই তার নামার কথা, এইখানেই তার যাত্রা শেষ, এই যশিডিতে। ত্বরিতে উঠল সে, লাফিয়ে নামল বাঙ্ক থেকে, সুটকেস টেনে নিয়ে অন্য হাতে দরজা খুলে সে দেখতে পেল গভীর অন্ধকার চরাচর, প্লাটফর্ম নেই, স্টেশনের বাতি নেই, লোকজন নেই। শুধু খুব লম্বা কালো পাথরের মতো চেহারার একটা দেহাতি লোক একটা মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার জন্যেই। যন্ত্রের মতো ধীর গম্ভীর গলায় সে বলে যাচ্ছে— যশিডিহ্… যশিডিহ্…। তার মশালের আলো তার শরীরের মন্ত ছায়াকে নিয়ে দুলছে। মশালের আলো পড়েছে ধান-কেটে-নেওয়া খেতে, আলের ওপর বর্ষার ব্যাঙ ডাকছে, সেই ডাক শূন্য মাঠগুলিকে আরও বেশি শূন্য করে দিচ্ছে। এই অদ্ভুত যশিডিতে তার জন্যেই থেমেছে রেলগাড়ি। তাকে নেমে যেতে হবে। দুঃখে বুক ভেঙে যাচ্ছিল ললিতের— গাড়ির কামরায় কামরায় ঘুমন্ত সুখী লোকেরা টেরও পেল না যে, ললিতকে অন্ধকার শূন্য একটা মাঠের মধ্যে নামিয়ে দিয়ে রেলগাড়িটা চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক যশিডি নামিয়ে নিচ্ছে তাকে চিরকালের মতো…
শেষরাত্রির দিকে ললিত ঘুমের মধ্যে যশিডির ডাক শুনতে শুনতে চমকে উঠল। যশিডি, না ললিত? তার নাম ধরে কেউ ডাকছে না?
ঘোর অন্ধকারে চোখ খুলল সে। গায়ে ঘাম। ঘরে একটা বদ্ধ হাওয়ার ভ্যাপসা গন্ধ। জেগে সে শুনতে পেল মা ডাকছে, ললিত, ও ললিত।
উঁ।
পাশ ফিরে শো। তোকে বোবায় ধরেছে।
স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল ললিত। বিছানায় একটা ঘেমো ভেজা-ভেজা ভাব, শরীর রাখতে ইচ্ছে হয় না। আস্তে সে উঠে বসল ঘোরের মধ্যে। মাকে জিজ্ঞেস করল, সারা রাত খুব বৃষ্টি হয়েছে, না মা?
দুর! বৃষ্টি কোথায়, আমি তো শুয়ে থেকেই জেগে আছি।
আচ্ছন্নতার মধ্যে বসে থেকে একটু চিন্তা করল ললিত। মনে হল সারা রাত যে বৃষ্টির শব্দটা সে শুনেছে সেটা বোধহয় বৃষ্টি নয়। মশারি তুলে বাইরে যেতে গিয়েও সে অপেক্ষা করল। না, আর কোনও শব্দ নেই। ভুলই। বুকের মধ্যে দুরদুর করে দ্রুত শব্দ হচ্ছে হৃৎপিণ্ডের— ঘুম ভেঙে হঠাৎ উঠে বসলে এ-রকম হয়, আবার শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু আর শুল না ললিত, বালিশের পাশ থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই হাতড়ে আনল। দেশলাই জ্বালার শব্দে মা আবার জেগে উঠে বলল, ললিত উঠলি!
হুঁ
শরীর কেমন লাগছে?
ভাল। তুমি ঘুমোও।
আমার আর ঘুম! মা বিড়বিড় করে কী একটু অস্পষ্ট কথা বলে পাশ ফিরল। মায়ের হাই তোলার শব্দ শুনল ললিত। ললিতের মনে হল মা এখন আস্তে আস্তে কথা বলতে শুরু করবে। বুড়ো হয়ে গেলে মানুষের কথা বলার ঝোঁক বেড়ে যায়। তা ছাড়া এখন ললিতকে মায়ের অনেক কথা বলার আছে। সে-সব কথার অধিকাংশই আবোল-তাবোল, অর্থহীন, পুরনো দিনের কথা বলতে বলতে ভুল হয়ে যায়, এক কথা থেকে পারম্পর্যহীন আর-এক কথা এসে পড়ে, কখনও ললিতের বিয়ে এবং ভবিষ্যৎ, চাকরি কিংবা রোগা হয়ে যাওয়া চেহারার কথা বলতে বলতে সম্পূর্ণ অবাস্তব জগতে চলে যায় মা। বলে, একটা বাড়ি করবি ললিত, পুরো চোদ্দো কাঠা জমির ঘেরওলা ছ’টা আম, চারটে কাঁঠাল, একটা ডুমুর, সজনে, দশটা সুপুরি আর দশটা নারকোল গাছ লাগাবি, পিছনে থাকবে কলার ঝাড়। কুঞ্জলতা আমার বড় পছন্দ, বুঝলি! বেড়ার গায়ে গায়ে লতিয়ে দেব। তুই তো শিম খেতে ভালবাসিস— একটু শিমের মাচান করবি, গোয়ালঘরের চালের ওপর লকলকিয়ে উঠবে লাউডগা…। ললিত জানে কোন সুদূর ছেলেবেলায় দেখা পুরনো ছবিটাকে মা আবার টেনে এনে দূর ভবিষ্যতের গায়ে টাঙিয়ে রাখছে। এইভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে মা, ধীর পায়ে মৃত্যুর দিকে। দীর্ঘ সব ঘুমহীন রাত জেগে ভাবতে ভাবতে মা’র মনে সব অতীত ভবিষ্যৎ গুলিয়ে ওঠে, জট পাকায়। বুদ্বুদের মতোই তখন মা’র মুখে কথা ভেসে ওঠে। কথা বলতে বলতে আস্তে আস্তে হালকা হয়ে যায় মা’র মন, আর তখন এইসব একা থাকা দীর্ঘ দিনরাত্রিগুলোকে আর-একটু সহনীয় মনে হয় মা’র।
এখন মায়ের কথা শুনতে ইচ্ছে করছিল না ললিতের। মশারি-টশারি তুলে বেরিয়ে গিয়ে বাইরের বাতাসে একটু হাঁফ ছাড়তে ইচ্ছে করছিল তার। ঘুমহীনতার জন্য তার শরীরে জ্বর জ্বর ভাব, মুখের ভিতরে আঠালো লালা, চোখের পাতায় আঁশের মতো জড়িয়ে আছে ঘুম। অবসন্ন লাগছিল তার। বাঁ হাতের তেলোয় সিগারেটের ছাই ঝাড়ছিল ললিত। গরম ছাই কখনও ছ্যাঁকা দিচ্ছে হাতে। সেটুকু একরকম ভালই লাগছিল তার। ওই ছ্যাঁকাগুলো থেকেই বোঝা যায় যে, সে জেগে আছে, বেঁচে আছে। খুব সামান্যই এই অনুভূতিটুকু, নিতান্তই শারীরিক। তবু ললিত মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে হাতের পায়ের চামড়ার খুব কাছাকাছি আগুনটা ধরে রাখছিল, চামড়া তেতে গেলে সরিয়ে নিচ্ছিল আগুন। খেলার মতোই, অথচ ঠিক খেলাও নয়। কেননা তার এই ছোট্ট খেলাটুকুর মধ্যেই কোথাও জীবনমৃত্যুর একটা প্রশ্নও জড়িয়ে ছিল। সিগারেটে টান দিলে মশারির ভিতরটুকু আলো হয়ে যাচ্ছিল। সেই লাল আভার ভৌতিক আলোয় মশারির লম্বা সেলাইয়ের ধার ঘেঁষে ছোট্ট একটা ছারপোকাকে লক্ষ করল ললিত। তার বিছানায় বরাবরই ছারপোকা। মা চোখে দেখে না, তবু মাঝে মাঝে বিছানা বালিশ টেনে নিয়ে রোদে দেয়, গরম জলে ধুয়ে দেয় চৌকি। তবু ছারপোকাগুলো কখনও ঠিক নির্বংশ হয় না। কোথাও কোনও কোনায় ঘুপচিতে এক-আধটা থেকে যায়, সেই থেকেই আবার বংশ বিস্তার করে। চোখে পড়লে ললিত মারে। আজ সে সিগারেটের আগুন ছারপোকাটার কাছে নিয়ে গেল। তাপ পেয়ে পোকাটা দৌড় দেয়। ছেড়ে দিল ললিত! ওটা বেঁচে থাকলে ললিতের আর সামান্যই ক্ষতি হবে। বরং পোকাটার প্রাণ দিয়ে সে ভালই করল। কে জানে এর ফলে তার আয়ু কিছুটা বেড়ে যাবে কি না। সব কর্মেরই তো ফল আছে।
সিগারেটের শেষ অংশটুকু ফেলে দেওয়ার জন্য ললিত উঠল। মা আবার নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে। যতদুর নিঃশব্দে সম্ভব দরজা খুলে বাইরে এসে ললিত মুগ্ধ হয়ে গেল। এত ভোর সে বোধ হয় তার জ্ঞানবয়সে দেখেনি। আকাশভরা তারা, আর পুব দিকে আকাশের রং ময়ূরের গলার মতো রঙিন। সামান্য হিম পড়েছে। সেই হিম ধুয়ে দিয়েছে বাতাসকে। বাতাস এখন বড় পবিত্র, বড় উদার। শূন্য অলিগলি রাস্তাঘাট নিয়ে কলকাতা এখন প্রকাণ্ড হয়ে আছে। সবাই জেগে উঠলে কলকাতা আবার ঘিঞ্জি আর ছোট হয়ে যাবে।
দরজার সিঁড়িতেই বসল ললিত। চৌকাঠে হেলিয়ে রাখল ক্লান্ত মাথা। আস্তে আস্তে ঘুমের ঢল নেমে আসছিল শরীরে। সামনের আকাশ, আকাশ-ভরতি তারা, না-ওঠা সূর্যের কাছে বিড় বিড় করে প্রার্থনা করল যেন তার মৃত্যু এই রকম সুন্দর একটি শেষরাত্রির সময়ে ঘটে। তারপর সে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙল বেলায়, যখন গলির দেয়ালের ওপর দিয়ে রোদ তার মাথা ছুঁয়েছে তখন মা তাকে ডেকে জাগাল। জেগে দেখল সামনে শম্ভু দাঁড়িয়ে আছে, পায়জামার ওপর আধময়লা শার্ট, হাতে বাজারের থলি। কিছুদিন হল ললিতের অসুখের প্রায় শুরু থেকেই শম্ভু তাদের বাজার করে দিচ্ছে।
শম্ভু চৌকো সুখে সরল হাসি হাসল, শরীর কেমন?
ললিত দেখল শম্ভু গেঞ্জি পরেনি, পাতলা বুক-খোলা শার্টের ওপর দিয়ে ওর শরীরের চমৎকার পেশিগুলো জেগে আছে। কখনও শরীরের চর্চা করেনি ললিত, যদিও মাঝে মাঝেই তার মনে হয় গায়ের জোরওয়ালা পুরুষ হতে পারলে বেশ হত। তার ছাত্রদের মধ্যে যারা খেলোয়াড় তারা মাথায় মোটা হলেও ললিতের প্রিয়। শম্ভুর শান্ত মুখ। চোখ আর কণ্ঠায় একটু কোমল ফোলা ভাব দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় রাতে ও সুন্দর ঘুমিয়েছে, ঝকমকে দাঁত দেখলে বোঝা যায় ওর লিভারের দোষ নেই। তবে এ-কথা নিশ্চিত যে শম্ভুর চিন্তাশক্তি কম, বুদ্ধি প্রখর নয়। শম্ভর মুখোমুখি নিজেকে বেশ রুগ্ণ আর অসুস্থ বলে বোধ হচ্ছিল তার, হাই তুলে ললিত বলল, শেষ রাতে বাইরে এসে এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছি।
শেষ রাতে তো আমি রোজ উঠি। শম্ভু বলল, আপনি উঠেছেন জানলে ডাক দিয়ে যেতাম।
তুই ভোরে উঠে করিস কী?
দৌড়োই।
হাসল ললিত, শরীর ছাড়া শম্ভুটা কিছু বোঝে না। বলল, রোজ দৌড়োস! কতটা?
আনোয়ার শা রোড এক চক্কর দিয়ে আসি।
ললিত আচমকা প্রশ্ন করল, তোর লজ্জা করে না?
বড় অবাক হল শম্ভু, কেন, লজ্জা কীসের!
তোর পরনে কী থাকে?
এবার শব্দ করে হাসল শম্ভু, আপনি না এক্কেবারে— তারপর বলল, পরনে থাকে শটস, গায়ে গেঞ্জি, গলায় মাফলার আর পায়ে কেডস। আপনি একটু ভাল হয়ে নিন, আপনাকে তুলে নিয়ে যাব। রোজ দৌড়ে দেখবেন শরীর খুব ফ্রি হয়ে যাবে।
দূর! ওই পোশাকে আমি বেরোতেই পারব না!
পোশাক আপনি যা খুশি পরুন না। দৌড়টাই আসল। দৌড়নো যায় এমন যে-কোনও পোশাক করবেন। বলতে বলতে শম্ভু গলির মধ্যেই উবু হয়ে বসল, আমি বলছি আপনি দৌড়ে দেখুন ললিতাদা।
মৃদু হাসল ললিত, তারপর কী হবে!
তারপর আমি আপনাকে আসন করা শেখাব। আমাদের জিমনাশিয়ামের ট্রেনারের কাছে নিয়ে যাব। দেখবেন আপনার সব অসুখ সেরে যাবে। যোগব্যায়ামে শরীরকে যা খুশি করা যায়। আপনার কিছু হয়নি, দেখবেন আমি গ্যারান্টি দিয়ে সারিয়ে দেব।
ঘরের ভিতর থেকে মা বলল, নিয়ে যাস তো শম্ভু, আমি ওকে রোজ রাত থাকতে তুলে দেব। জোয়ান বয়সের ছেলে দেখ, রাতে নাকি ঘুম হয় না, সকাল আটটার আগে উঠতে পারে না, একটু বেশি ভালমন্দ খেলে সইতে পারে না। তুই নিয়ে যাস তো। না যায় তোর বন্ধুদের দল বেঁধে এনে জোর করে নিবি। দে তো ওর সব অসুখ সারিয়ে।
শম্ভুর গায়ে জোর আছে, আর আছে বোকার মতো খানিকটা বিশ্বাস। অল্প বুদ্ধিতে শম্ভু যেটুকু বোঝে সেটুকুকেই গোঁয়ারের মতো অনুসরণ করে। যুক্তি-তর্ক সম্ভব-অসম্ভবের কোনও বিচার নেই তার। ললিত সবই বোঝে। তবু এখন তার হঠাৎ শম্ভুর কথাটার ওপর নির্ভর করতে ইচ্ছে করছিল। যোগব্যায়ামে সব সেরে যায়। একবার চেষ্টা করে দেখবে নাকি ললিত! যদি সারে, যদি সেরেই যায়, যখন এ-রকম ভরসা একজন যে-কেউ জোরের সঙ্গে দিচ্ছে— তখন আশা করতে, বিশ্বাস করতে দোষ কী? যোগব্যায়ামের কতটুকু জানে ললিত? কে জানে এই রহস্যময় সব পদ্ধতির ভিতরে কী রকম প্রাণশক্তির সন্ধান রয়েছে।
সে হেসে বলল, খুব শক্ত হলে কিন্তু পারব না রে! আমার ও-সব কোনওকালের অভ্যাস নেই।
শম্ভু তড়িৎগতিতে একটা হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরল, বিশ্বাস করুন ললিতা, একটুও শক্ত না। দম নেওয়া আর ছাড়া, খুব ধীরভাবে শরীরকে বাঁকানো— এটুকুই যা শক্ত। খুব সহজে অভ্যাস হয়ে যাবে দেখবেন। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কত রোগের রুগি আসে আমাদের জিমনাশিয়ামে— আরথ্রাইটিস, পোলিও, হার্টের অসুখ, আলসার…।
সব সেরে যাচ্ছে?
সব। কিন্তু জলদিবাজি করলে চলবে না। এ তো কেনাকাটার মতো সহজ ব্যাপার নয়। এ যোগ। করতে হবে ঠিকমতো, চলতে হবে ঠিকমতো, অনাচার করলে চলবে না। যেমন চলতে বলবে, তেমন চলবেন। চাল্না ঠিক হওয়া চাই। শম্ভুর চোখ বিশ্বাসে ভক্তিতে চকচক করে উঠছিল, সমস্ত শরীরে চাপা আবেগে পেশির ঝড় খেলা করছে। বোকা শম্ভুর মুখখানা দেখে হঠাৎ ললিতের বুক ভরে উঠছিল। শম্ভু অন্য জায়গায় যেমনই হোক, নিজের ক্ষেত্রকে সে কিন্তু ঠিকঠাক জানে। সম্ভবত সেখানে শম্ভুর ভুল হয় না। শম্ভুর কথার ওপর আত্মসমর্পণ করার একটা তীব্র ইচ্ছা বোধ করছিল ললিত।
ললিতের মনে তার হাসিঠাট্টার ভাব ছিল না। তবু মুখে একটু ঠাট্টার ভাব বজায় রেখে সে প্রশ্ন করে, চল্না মানে কী রে?
শম্ভু ললিতের নাড়ির গতি বুঝতে পারছিল। তাই তার চোখমুখে ঐকান্তিক নিষ্ঠার ভাব ফুটে উঠেছে, চলনা মানে চালচলন। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া, অনিয়ম না করা, পরিষ্কার থাকা, সৎ চিন্তা এবং সৎ আচরণ করা— সব বলে দেওয়া হবে।
দুর! হতাশায় মুখ ফেরাল ললিত, ও-সব হবে না। আমি সিগারেট খাব না, রাত জাগব না, দুপুরে ঘুমোব না, আলসেমি করব না! ও-সব বিধবা আর সিদ্ধবাবারা পারে।
হাসল শম্ভু, পারবেন। পারতে হয়। বিপদে পড়লে মানুষ সব পারে।
কথাটা ধাক্কা দিল ললিতকে। সামান্য উত্তেজিত হল ললিত, বলল, আমি পারব না। এতকাল পারিনি। ধাতে সইবে না।
মা দরজার কাছে খুঁটি গেড়ে বসে সব শুনছিল। এবার বলল, এমন কী শক্ত! শম্ভ করছে না! ওর চেহারা দেখ, চোখ জুড়িয়ে যায়। আর তোর কেবল হাড্ডিগুড্ডি সার হচ্ছে। কত ফরসা ছিলি, আর কেমন রোদে-পোড়া চেহারা হয়েছে। খুব পারবি, আমি তোকে চালিয়ে নেব। তুই ওকে দলে নিয়ে নে শম্ভু।
শম্ভু ঘাড় নাড়ে। ললিতকে বলে, ঠিকমতো না চললে হয় না। আমার ক্রনিক ফ্যারিনজাইটিস সারছে না, দেখুন না গলায় মাফলার জড়িয়ে সকালে বেরোতে হয়। সর্দির অ্যালার্জি, চিংড়ি ইলিশ ডিম বারণ তবু খেয়ে ফেলি, অনেক সামলেও নানা রকম অনিয়ম হয়ে যায়। কিন্তু জানি রোগটা সারানো সহজ, ঠিক মতো চললেই সেরে যাবে। অসুখটা তেমন খারাপ নয় বলে গা করি না, কিন্তু আপনার তো তা নয়…
বেলা হয়ে যাচ্ছে বলে শম্ভু উঠল। বলে গেল কাল আসবে, এসে তার জিমনাশিয়ামে নিয়ে যাবে ললিতকে। ললিত রাজি হল না, অত ভিড়ের মধ্যে খালি গায়ে আমি পারব না। প্রথম প্রথম তুই দেখিয়ে দে, একটু একটু বাসায় করি, তারপর যাব তোর জিমনাশিয়ামে।
গলির মুখে যখন শম্ভু বেরিয়ে যাচ্ছে তখন হঠাৎ ললিতের ইচ্ছে হল ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁরে, আমার এ-বয়সে একটু দেরি হয়ে যায়নি তো! এখনি কি কোনও ফল হবে? জিজ্ঞেস করল না লজ্জায়। কিন্তু ভাবতেই হঠাৎ বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। যদি ফল না হয়!
বেলা দশটা নাগাদ ললিত নাক টিপে, জোর করে বমির ভাব আটকে রেখে এক গ্লাস দুধ খেল। খড়িগোলা জলের মতো বিস্বাদ। এখন তাকে এইসবই খেতে হচ্ছে— দুধ, ফলের রস, দুধভাত, সেদ্ধভাত! ঝাল-মশলা দেওয়া তীব্র স্বাদের খাবারই ললিতের প্রিয় ছিল। জলো স্বাদের খাবার তার ভাল লাগত না। এখন খেতে হচ্ছে। মনে মনে ভেবে রেখেছে ললিত এ-সব নিয়মকানুন ঝেড়ে ফেলে সে স্বাভাবিক বেপরোয়াই হয়ে যাবে আবার, এখন আর ভয় কী? শম্ভু শিঙি মাছ এনে দিয়ে গেছে বাজার থেকে, আর কাঁচা পেঁপে। দুই-ই তার অখাদ্য।
মায়ের দোক্তার কৌটো থেকে সে বেছে বেছে কয়েকটা ভাজা মৌরি ধনে মুখে দিল। তারপর ধোয়া পায়জামা পরল একটা, ধীরে ধীরে গায়ে চড়াল পাঞ্জাবি। মা রান্নার মশলা নিতে ঘরে এসে তাকে দেখে বলল, কোথায় যাচ্ছিস!
স্কুল থেকে একটু ঘুরে আসি।
কোনও দরকার নেই। সদ্য হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছ, মাথা ঘুরেটুরে রাস্তায় পড়ে গেলে…
ঘরে থাকা এখন অসম্ভব। বাইরে টলটল করছে শরৎকালের মিঠে রোদ, রাস্তায় চলেছে লোকজন। এখন একবার হাঁফ ছাড়ার জন্য বাইরে যেতেই হবে ললিতকে। অনেক দিন মৃত্যুর ছায়ার মধ্যে সে শুয়ে ছিল। তার শরীর দুর্বল, চলাফেরার উপযুক্ত নয়, কিন্তু তবু একবার সুস্থ মানুষের মতো ভিড়ের মধ্যে গিয়ে চলে ফিরে আসতে বড় ইচ্ছে করছে। মা বলছিল সে ভাল হয়ে গেছে। কিন্তু ললিত নিজের শরীরের চামড়ায় একটা বিবর্ণ হলদে ভাব লক্ষ করে— ছায়ায় বেড়ে ওঠা গাছের রং যেমন হয়। তার সমস্ত শরীর রোদ-জল-মাটির জন্য ছটফট করছে, আবার স্কুল, চায়ের দোকানের আড্ডা, চা-সিগারেট, মেয়ে দেখা, দুֹ’-একটা অশালীন শব্দ, সিনেমা-থিয়েটার, বিয়ের নিমন্ত্রণ, আরও কত কিছুর জন্য চনমন করছে মন। হঠাৎ মনে পড়ে কত তুচ্ছকেই সে কত ভালবেসেছিল। অসুখের আগে কখনও মনে হত না যে, সে বড় ভালভাবে বেঁচে আছে। কিন্তু এখন মনে হয় তখন সে কত ভালভাবে বেঁচে ছিল!
মায়ের কথার সহজ উত্তর দিল না ললিত। বলল, স্কুলে একটু টাকাপয়সার খোঁজ করা দরকার। ডি এ-টা বোধ হয় এসেছে। ট্যাক্সিতে চলে যাব। ক্লাস তো করছি না।
মা তবু গুনগুন করে কী সব বলছিল। কান দিল না ললিত। দরজার বাইরে এসে চেঁচিয়ে বলল, সদরটা বন্ধ করে দাও।
সহজভাবে হাঁটতে পারছিল ললিত। তবে একটু কুঁজো হয়ে, সোজা হলে পেটের কাটা জায়গায় টান পড়ে। পেটের মধ্যেকার সেই ভয়ংকর ব্যথাটা আর নেই, যে-ব্যথায় সে মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যেত। এক দিন ক্লাসঘরে, আরেক দিন ফুটপাথেও শুয়ে পড়তে হয়েছিল তাকে। কোনও কাণ্ডজ্ঞানই বজায় রাখা যেত না তখন। ও-রকম ব্যথা যে-কোনও লোকেরই শালীনতা-ভদ্রতাবোধ, বিচার এবং বুদ্ধির শক্তি, সমস্ত রকমের সংযম ও পৌরুষ ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সেই ব্যথার জায়গায় এখন তার পেটে একটা নাড়ি দোল খায় যেন, আর মনে হয় পেটের মধ্যে অনেকটা ফাঁপা শূন্য জায়গা। যেন খানিকটা আকাশ ঢুকে গেছে।
অনেককালের চেনা পাড়ার ভিতর দিয়ে হাঁটছিল ললিত। সে গলির মুখে ডাকবাক্সটা পেরিয়ে গেল, করপোরেশনের জলের কলের গা ঘেঁষে গোপালদার মনোহারি দোকান, ডান দিকে একটা গ্যারেজের মধ্যে ক্লাবঘর, এখন তালাবন্ধ— মাঝে মাঝে বৃষ্টি বা দুর্যোগের দিনে বেরোতে না পারলে ললিত এইখানে এসে পাড়ার একটু বয়স্ক যুবকদের সঙ্গে তাস বা দাবা খেলেছে কখনও সখনও। ক্লাবঘর ছাড়ালে চৌধুরীদের বাগানের টানা লম্বা দেয়াল অনেকটা পর্যন্ত গেছে। দেয়ালের ওপর দিয়ে উঁকি দেয় নারকেল সুপুরি আর জাম গাছের মাথা—এ-রকমই একটা বাগানওলা বাড়ির বড় শখ মা’র। ললিত যেন এ-রকম বাড়ি করে। মাত্র চোদ্দো-পনেরো কাঠা জমি— বেশি তো নয়! বাঁ দিকে একটা তালার কারখানা। অনেক চেনা মুখ চোখে পড়ছে- এই যে ললিত, ভাল তো? হেসে ঘাড় নাড়ে ললিত। এরা বেশির ভাগই তার অসুখের খবর রাখে না, গত দু মাস কেন দেখা হয়নি এই প্রশ্নও কারও মনে আসছে না। ভেবে দেখতে গেলে দু’মাস একটুও বেশি সময় নয়। তবু ললিতের মনে হচ্ছিল অনেক দিন বাদে, যেন প্রায় সেই ছেলেবেলার ছেড়ে যাওয়া কোনও জায়গায় সে আবার ফিরে এসেছে। তার মনে হচ্ছে চার দিকে বিপুল কোনও পরিবর্তন ঘটে গেছে, অথচ কিছুই চোখে পড়ছে না। হয়তো পরিবর্তনটাই খুব গভীর আর রহস্যময়, চোখে দেখা যায় না কিন্তু টের পাওয়া যায়। আজ সব কিছুই সে খুঁটিয়ে দেখছিল, আশ্চর্যের বিষয় যে এতকাল তার নজরে পড়েনি যে সান্যালদের ছাদের ওপর একটা পায়রার বাসা আছে, লক্ষ করেনি ধোপাদের বস্তির পিছনে ছোট্ট একটা শিবমন্দিরের ত্রিশূল রাস্তা থেকেই দেখা যায়। এ-রকম ছোটখাটো আবিষ্কার করতে করতে বড় রাস্তার কাছে পর্যন্ত পৌঁছে গেল ললিত। তারপর আর সে দাঁড়াতে পারছিল না। কিছুটা বা ব্যগ্রতায় সে প্রয়োজনের চেয়ে দ্রুত হেঁটেছে, অনভ্যাসে তার পদক্ষেপ একটু বেচাল হচ্ছিল, আর সামান্য টলমল করছিল মাথা। এখন তার পা কাঁপছিল, সমস্ত শরীরে ঘাম, মাথার মধ্যে ঝিঁঝি পোকার ডাক, আর বমির ভাব বুক জুড়ে।
অল্প দূরেই দেখা যাচ্ছে গলির পথটা আনোয়ার শা রোডে শেষ হয়েছে। তেরাস্তায় তিন-চারটে রিকশা দাঁড়িয়ে। ওই পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে একটা রিকশায় গা এলিয়ে দিতে পারত ললিত, পৌঁছে যেত ট্রাম-বাসের রাস্তায়। কিন্তু ললিত সে-চেষ্টা করল না। করলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। তার শরীর ইতিমধ্যেই মাটির দিকে ঢলে পড়ছে। মুখের মধ্যে জলহীন শুকনো ভাব, জিভ চটচট করছে। শরীরে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরেকার মতো ঠান্ডা তাপহীনতা বোধ করছে সে, হাত পা দুর্বল হয়ে আসছে। চেনা একটা ছেলের মুখ নজরে পড়ল ললিতের। পাড়ার ছেলেই হবে, কিংবা হয়তো তার ছাত্রই। বখাটে চেহারা, হাতে সিগারেট। তাকেই হাতছানি দিয়ে ডাকল ললিত। সে কাছে আসতেই বলল, আমাকে একটা রিকশা ডেকে দেবে ভাই, আমি অসুস্থ, হাঁটতে পারছি না।
ছেলেটা সিগারেট লুকোয়নি, কিন্তু চটপটে পায়ে দৌড়ে গিয়ে তেরাস্তা থেকে গলির মধ্যে রিকশা নিয়ে এল। ললিতকে ধরে তুলে দিল রিকশায়। রিকশার ঢাকনা উঠিয়ে দিল। রিকশাওয়ালাকে বলে দিল, আস্তে চালিয়ে নিবি।
অতটুকু ছেলেকে ধন্যবাদ দিতে লজ্জা করছিল ললিতের। সে শুধু একটু কৃতজ্ঞতার হাসি হাসল। রিকশা চলতেই ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগল চোখেমুখে। আস্তে আস্তে আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছিল সব। চোখ চাইল ললিত— বাঁ ধরে খুপরি দোকানের সারি, নোংরা বাজার আর বস্তি, গত বর্ষার জল উপচে পড়ছে কাঁচা ড্রেনে, ডান ধরে রেলিং ঘেরা একটা পুরনো পুকুর, তার পাশে মসজিদ। বড় রাস্তায় এসে রিকশা ছেড়ে দিল ললিত। দেখল অফিসের ভিড়-বোঝাই বাসে-ট্রামে ওঠা অসম্ভব। এ-সময়ে ট্যাক্সি পাওয়া ভাগ্যের কথা।
অসহায়ভাবে সে ট্রাম-স্টপে দাঁড়িয়ে রইল। এই অসম্ভব রোগগ্রস্ত শরীরটার জন্য বড় ঘেন্না হচ্ছিল ললিতের। শরীর— তবু শরীর ছাড়া অস্তিত্ব নেই।
একটা ট্রাম তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল ধীরগতিতে। সেকেন্ড ক্লাস থেকে কে যেন ডাকল, ললিতদা!
অত ভিড়ের মধ্যে কাউকে চিনবার উপায় নেই। ললিত ট্রামটার দিকে চেয়ে রইল শুধু। লক্ষ করল ট্রামটা তাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলে দরজার ভিড় ঠেলে লাফিয়ে নামল একজন। দূর থেকেই তাকে দেখে হেসে হাত উঁচু করল, এগিয়ে এল তার দিকে। ভ্রূ কুঁচকে দেখছিল ললিত। লোকটার পরনে ঝকমকে টেরিলিনের প্যান্ট-শার্ট, হাতে ফোলিও ব্যাগ, গলায় টাইও ঝুলছে। কিন্তু এমনই গ্রাম্য তার হাবভাব, হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে চলার বিশ্রী ভঙ্গি যে, পোশাকটাই মার খেয়ে গেছে। চিনতে পারছিল না ললিত। লোকটা যখন খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে হাসল তখন তার পান-খাওয়া কালো দাঁত, ডান গালে পানের টিবি, আর কপালে ছোট্ট একটু রক্তচন্দনের ফোটা দেখে চিনতে পারল— এ লক্ষ্মীকান্ত । কোনও দিনই তার সম্বন্ধে আর পাঁচজনের মতামতকে পরোয়া করে না লক্ষ্মীকান্ত। সে যে এখনও পোশাক-আশাক পরে রাস্তায় বেরোয় এটাই রাস্তার লোকের বাবার ভাগ্য।
ফোলিও ব্যাগটা ডান হাত থেকে বাঁ হাতে নিয়ে বাড়িয়ে ললিতের হাত ধরে রামঝাঁকানি দেয় লক্ষ্মীকান্ত, ললিতদা, কী কথা ছিল?
যেন পরশুদিনই কথাটা হয়েছে এমনই জিজ্ঞাসার ভঙ্গি তার। ললিত হাসল, কেমন আছ লক্ষ্মীকান্ত?
ভাল। বলে হাত ছেড়ে দিয়ে লক্ষ্মীকান্ত কাজের কথায় আসে, ললিতদা, কী কথা ছিল? অ্যাঁ?
ঠিক কী যে করে লক্ষ্মীকান্ত তা জানে না ললিত। তাকে একনজর দেখেই মনে হয় যে লোকটি খুব বিষয়ী, দালাল কিংবা ফড়ে। বস্তুত লক্ষ্মীকান্ত তাই। মোটাসোটা কালোকালো চেহারা তার, মাথায় একটু টাক— সম্ভবত আসল বয়সের তুলনায় তাকে বেশি বয়সেরই দেখায়। তবে তার আসল বয়সটাও অবশ্যই ললিতের চেয়ে অন্তত বছর পাঁচেকের বেশি। তবু বরাবরই লক্ষ্মীকান্ত ললিতকে দাদা বলে ডেকে আসছে, আর ললিত— যে-কোনও লোকের সঙ্গেই যার ‘আপনি’থেকে ‘তুমি’তে নামতে অনেক সময় লাগে, সেও সেই প্রথম থেকেই লক্ষ্মীকান্তকে নাম ধরে ডেকে ‘তুমি’ বলে আসছে। এর জন্য লক্ষ্মীকান্তর স্বভাবটিই দায়ী— সকলের কাছে সবসময়েই সে বশংবদ, একনাগাড়ে নিজেকে উজাড় করে কথা বলে যায়, অন্যে বিরক্ত হচ্ছে কি না তা লক্ষও করে না। লক্ষ্মীকান্তর আত্মসচেতনতা নেই, বিষয়ী লোকের তা থাকলে চলেও না। কলকাতার বিস্তৃত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সে হচ্ছে খুঁটে-খাওয়া পাখি। বিশেষত তার অনেক রকমের দালালি, হাজারটা লোককে চরিয়ে খেতে হয়। তাই নিজেকে নিচু করে রাখা লক্ষ্মীকান্তর স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। কুড়ির ওপর বয়সের যে-কোনও লোককেই সে দাদা বলে ডাকে— ব্যবসার সম্পর্ক থাক আর না থাক। তাকে দেখে মনে হয় সে সম্মান বা সমাদর খুব কমই পায়, এবং পায় না বলে তার কোনও ক্ষোভও নেই। যে-কোনও লোকের সঙ্গেই মিশ খেতে গেলে ও-রকম ক্ষোভ না থাকাই ভাল। কবে, কীভাবে যে ললিতের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল তা আজ আর ললিতের মনে নেই, তবে লক্ষ্মীকান্ত পায়ের তলায় সরষে নিয়ে সারা শহরে চরকিবাজি খায় বলে মাঝে মাঝেই তার সঙ্গে ললিতের দেখা হয়ে যায়, আর দেখা হলেই লক্ষ্মীকান্তর এক কথা, কী কথা ছিল দাদা! মনে নেই?
মনে আছে ললিতের। হাজার পাঁচেক টাকার একটা জীবনবিমা তাকে দিয়ে করাতে চাইছে সে। এবং চার বছর ধরে তার পিছনে লেগে আছে। জীবনবিমার উপকারিতা, বা না-করা যে সামাজিক অপরাধ— এ-সব নিয়ে খুব বেশি কিছু বলে না সে, তার আবেদন অন্য রকমের— যদি না করেন তবে আমার এজেন্সিটা চলে যাবে, খুব ঝামেলায় পড়ে যাব দাদা। তারপর নিজের সংসার, অপদার্থ ছেলেমেয়ে, নিষ্ঠুর ভাইরা এবং একচোখা বাবার কথা অকপটে বলতে থাকে সে। আর মাঝে মাঝে বলে যে, এবার গভর্নমেন্টের সঙ্গে তার একটা মামলা লেগে যাবে। বালিগঞ্জের ভাল একটি পাড়ায় অনেকটা বেওয়ারিশ জমি দখল করে আছে লক্ষ্মীকান্ত। ওখানে জমির দাম পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা। জমিটা কেনেনি সে, খাজনাও বোধ হয় দেয় না। সামনে তার একটা মুদির দোকান আছে, যেটার দেখাশোনা করে তার বারো বছর বয়সের ছেলে। দোকানের গা ঘেঁষেই মাটি দিয়ে গেঁথে কালীর মন্দির বানিয়েছে সে, নিত্যপূজা হয়, বাগান করে গাছ লাগিয়েছে, যাতে সহজে উচ্ছেদ হতে না হয়। লক্ষ্মীকান্তর বাড়ি বাঁকুড়ায়, তবু রিফিউজি কার্ড করিয়ে রেখেছে সে। তার ধারণা তাকে তোলা বড় সহজে হবে না। তার বিশ্বাস আরও বছর দশেক ওখানে টিকে যেতে পারলে জমিটা তার হয়ে যাবে। এ-সবই ললিতের লক্ষ্মীকান্তর কাছেই শোন। এত সব সত্ত্বেও লক্ষ্মীকান্তর সঙ্গ খুব প্রিয় মনে হয় না ললিতের, দু’ দণ্ড তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করে। সম্ভবত এই গুণটুকুর জন্যই টিকে আছে সে, টিকে যাবে।
ললিত প্রসন্ন মুখে হেসে বলল, ব্যবসা কেমন?
ভাল কোথায়? আপনি গা করছেন না, কিন্তু এই ভাল সময় চলে যাচ্ছে। দেরি করলেই দেরি। চার বছর আগে করে রাখলে আজ আপনি চার বছর এগিয়ে যেতেন ম্যাচুয়ারিটিতে। চিন্তা করে দেখুন বিশ-পঁচিশ বছর পর এক থোকে অত টাকা…
বিশ-পঁচিশ বছর সময় বড় অলীক বলে মনে হয়। তবু হাসল ললিত, বলল, বিশ-পঁচিশ বছর পর টাকার দাম অনেক কমে যাবে লক্ষ্মীকান্ত, আজকের দাম পাওয়া যাবে না। ঠকা হয়ে যাবে!
হতাশ হল লক্ষ্মীকান্ত, বলল, আপনাদের কেবল ওই এক কথা! বিশ বছর লম্বা সময়, ততদিনে দাম কমে-বেড়ে কী হবে তা কি বলা যায়! হয়তো দেখলেন পাঁচ হাজারের দাম পাঁচ লাখে দাঁড়িয়েছে…
তা কি বলা যায়! তা ছাড়া দেখো লক্ষ্মীকান্ত, পাঁচ হাজার টাকার জন্য বিশ বছর হাঁ করে বসে থাকাও বড় কষ্টের। আমার অত ধৈর্য নেই।
বেঁচে থাকাটাই ধৈর্যের ব্যাপার ললিতদা। দেখুন না, আমি চার বছর ধরে আপনার পিছনে ঘুরছি, আপনি ফিরিয়ে দিচ্ছেন….
ললিত হাসল, যদি ততদিন না বাঁচি লক্ষ্মীকান্ত, তবে আমার টাকাটা খাবে কে? বুড়ি মা ছাড়া আমার কে আছে?
লক্ষ্মীকান্ত জিব দিয়ে চকাস শব্দ করল, টাইয়ের ফ্ল্যাপ তুলে থুতনির কাছে একটু ঘাম মুছে নিল। তারপর সে কথা বলার জন্য মুখ খুলতেই ললিত বুঝতে পারল লক্ষ্মীকান্ত কী বলবে। সে তার ভাবী বউ এবং বাচ্চাকাচ্চার কথা তুলবে এবার, বলবে, এই বেলা বিয়ে করে ফেলুন, আমি মেয়ে দেখে দিচ্ছি। চমৎকার মেয়ে আছে আমার হাতে। যতদূর শুনেছে ললিত, লক্ষ্মীকান্ত ঘটকালিরও একটা সাইড-বিজনেস করে, মেয়ের বাপের কাছ থেকে পয়সা নেয়। তাই ললিত তাড়াতাড়ি বলল, আমার শরীর ভাল নেই লক্ষ্মীকান্ত, সদ্য একটা অপারেশন হয়েছে আমার। তুমি আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দাও দেখি।
দেখছি। বলে বড় ব্যস্ত হয়ে পড়ল লক্ষ্মীকান্ত।
ট্যাক্সি পাওয়া খুব সহজ হল না। মোটা মানুষ লক্ষ্মীকান্ত তার থলথলে শরীর নিয়ে গাড়িঘোড়ার মধ্য দিয়ে কয়েকবার রাস্তার এপার-ওপার ছোটাছুটি করল, ভরতি ট্যাক্সিকেও হাত তুলে থামাবার চেষ্টা করল বারকয়েক। অনেক দূর হেঁটে গেল, একবার ডান পারে, একবার বাঁ ধারে। তার ব্যস্ততা এবং আগ্রহ দেখবার মতো। ললিত দেখছিল। সে ভেবে দেখল খুব স্বার্থেও সে নিজে কারও জন্য ট্যাক্সি ধরে দিতে এত ছোটাছুটি করত না। প্রাণ আছে লক্ষ্মীকান্তর, কিংবা কে জানে এটাও লক্ষ্মীকান্তর ব্যবসার অঙ্গ কি না। যে-কাউকে খুশি করতেই লক্ষ্মীকান্ত বড় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সবসময়ে যে তার প্রতিদান চায় তা নয় বোধ হয়। কেন না ললিতের দ্বারা যে তার খুব সুবিধে হবে না এটা লক্ষ্মীকান্ত নিশ্চিত বুঝে গেছে।
ট্যাক্সি পাওয়া গেল অবশেষে। লক্ষ্মীকান্তই ধরে আনল।
একই দিকে যাবে বলে লক্ষ্মীকান্তও উঠল ট্যাক্সিতে। পাশাপাশি বসে ললিতের দিকে তাকিয়ে হাসল সে, বে-খেয়ালে টাইয়ের ফ্ল্যাপ তুলে থুতনির ঘাম মুছল—বস্তুত ওই জায়গাটাই বোধ হয় বেশি ঘামে তার। ললিত ভেবে পেল না টাইটা আসলে লক্ষ্মীকান্তর পোশাকের অংশ, না কৌশলে থুতনির ঘাম মুছবার জন্যই ওটা বেঁধেছে সে!
লক্ষ্মীকান্ত আস্তে আস্তে কথা পাড়ছিল। সংসারও যে একটা ধর্ম এবং সেটা যে উপেক্ষা করার নয়— সেই পুরনো কথা।
ললিত বলল, তুমি কি আমাকে বিয়েটিয়ের কথা বলবে নাকি লক্ষ্মীকান্ত? বলে হাসল সে, তবে দেখো ইনশিওর করা কী ঝামেলার ব্যাপার! পাঁচ হাজার টাকার ওয়ারিসান খুঁজতে গিয়ে বিয়ে করা! তার চেয়ে এই বেশ আছি হে, শেষে ঢাকের দায়ে মনসা বিকোবে…
স্কুলের কাছাকাছি পৌঁছে ট্যাক্সি ছেড়ে দিল ললিত। লক্ষ্মীকান্ত নেমে বলল, আর একদিন দেখা করব দাদা, এবার বাসায় যাব। ঠিকানা আমার কাছে আছে।
যেয়ো। ললিত হেসে বলল, কিন্তু আমার একটা শক্ত অসুখ করেছে, বোধহয় বেশি দিন বাঁচব না।
কী অসুখ? বলে সত্যিকারের উৎকণ্ঠা দেখাল লক্ষ্মীকান্ত।
ক্যানসার। বলে ললিত ভাল করে ওর মুখটা দেখছিল। আশ্চর্য হয়ে সে দেখল লক্ষ্মীকান্তর চোখে সত্যিকারের বিস্ময় ফুটল, ছোট হয়ে গেল মুখ।
দুঃখিতভাবে মাথা নাড়ল সে, এত অল্প বয়সে, দাদা?
শুধু হাসল ললিত। কিছু বলার ছিল না।
আবার দেখা হবে লক্ষ্মীকান্ত। বলে পিছু ফিরল ললিত। দেখা হবে, না হলেও ক্ষতি নেই। ললিতের ইচ্ছে হল একবার লক্ষ্মীকান্তকে ডেকে বলে— তোমাকে আমি পছন্দ করতুম, লক্ষ্মীকান্ত। পরমুহূর্তে সে সামলে গেল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল লক্ষ্মীকান্ত খুবই ধীরে পায়ে ট্রাম রাস্তার দিকে এগোচ্ছে। একবার সেও ঘাড় ফেরাল। চোখাচোখি হয়ে যাওয়ার ভয়ে ত্বরিতে মুখ ঘুরিয়ে নেয় ললিত।
বড় রাস্তা থেকে গলির মধ্যে কয়েক পা এগোলেই তার স্কুল। পুরনো আমলের জমিদার বাড়ি, বাইরের দিকে বারান্দায় দুটো পাথর বসানো মোটা থাম আর কাজ করা রেলিং। বাড়িটার কাছাকাছি আসতে-না-আসতেই শ’খানেক ছেলে ছুটে এল চার দিক থেকে মৌমাছির মতো। ঘিরে ধরল তাকে। চিৎকারে কানে তালা লেগে গেল ললিতের; ‘স্যার…স্যার…স্যার’ অজস্র প্রশ্ন শুনতে পাচ্ছিল ললিত— কোথায় ছিলেন স্যার? কী হয়েছিল স্যার? কেমন আছেন স্যার?
এক পা-ও এগোনোর জো ছিল না আর। খোলা রাস্তার ওপরেই তার পায়ে ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম শুরু হয়ে গেছে। পায়ের চামড়ায় কচি হাতগুলো খাবলে দিচ্ছে, ঘষা খাচ্ছে, কাড়াকাড়িতে নখের আঁচড় লাগছে। ধাক্কায় বেসামাল ললিত হাসিমুখেই দাঁড়িয়ে টাল খাচ্ছিল। মনের কোনও চিন্তাশক্তি ছিল না ললিতের। আবেগে সে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল। চোখের পাতা বুজে আসছিল তার— দুর্বল শরীর যে-কোনও সময়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়তে পারে, তবু বড় ভাল লাগছিল ললিতের। যেন চার দিক থেকে প্রাণ আর জীবন তাকে চেপে ধরেছে, হঠাৎ কোথাও তার যাওয়ার উপায় নেই, আর কোনও বহুদূরে নয়। সে দেখছিল যেন হাজার হাজার ছেলে তাকে ঘিরে ধরেছে।
ললিত জানে ছেলেদের কাছে সে কত প্রিয় ছিল। ক্লাসে অনেক দিন ফাঁকি দিয়েছে সে, পড়া ফেলে রেখে গল্প করেছে, কিংবা অকারণ টাস্ক দিয়ে বসিয়ে রেখেছে ছাত্রদের, তারপর আর সে টাস্ক দেখে দেয়নি। তবু ললিত স্যার ছেলেদের বড় প্রিয়, সবচেয়ে প্রিয়। তাই ছেলেদের হল্লার মধ্যে দাঁড়িয়ে সে হঠাৎ অনুভব করল যে, সে বড় বেঁচে আছে। মনে মনে সে বলছিল, ধন্যবাদ, তোমাদের ধন্যবাদ।
তার অবস্থা দেখে মাস্টার মশাইরা অনেকেই বেরিয়ে এসেছিলেন। ললিত শুনল উদ্ধববাবু চিৎকার করছেন, ছেড়ে দে, ছেড়ে দে, স্যারের অসুখ, ভয়ংকর অসুখ। সরে যা। দম নিতে দে… পণ্ডিতমশাই ছেলেদের নড়া ধরে বেড়াল ছানার মতো সরিয়ে দিয়ে ধমকাচ্ছিলেন, আদরে মেরে ফেলবি রোগা মানুষটাকে! হট সব হট যা…
দু’পাশ থেকে তার হাত ধরে উদ্ধববাবু আর পণ্ডিতমশাই তাকে কমনরুমে নিয়ে এলেন। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে তাকে দেখে। মাথার ওপর ফ্যান চালিয়ে দেওয়া হল, বসতে দেওয়া হল জানালার কাছে সবচেয়ে সুন্দর জায়গার চেয়ারটিতে।
লোকের ভিড়ে নিজেকে আর অনুভব করতে পারছিল না ললিত। এত উত্তাপে আদরে উৎকণ্ঠায় সে গলে চার দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। ক্রমান্বয়ে হাসা ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না, আর মাঝে মাঝে ‘এখন কেমন আছেন?’ এই সাধারণ প্রশ্নটির উত্তরে সে মাথা নেড়ে বলছিল, ভাল, বেশ ভাল। তাকে ঘিরে এসে দাঁড়িয়েছে সবাই। অজস্র কথার শব্দ হচ্ছে। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে, তবু সুবোধবাবু ভাঁজকরা একটা খবরের কাগজ তার মাথার ওপর পাখার মতো নাড়ছিলেন।
ললিত দেখল জানালা বেয়ে উঠেছে ছেলেরা। শিকের ও-পাশে তাদের ঘিঞ্জি মুখ, দরজার চৌকাঠের ও-পাশ থেকে শরীর ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ভিতরে ঢোকা বারণ বলে। উঁচু ক্লাসের ছেলেরা ভিড় সরাতে সরাতে চেঁচাচ্ছে। ললিত তার চেনা মুখগুলো দেখছিল…সাধন…অমিতাভ…নিশীথ দে… অরুণ বরুণ দুই ভাই… হাতকাটা পশুপতি… অনেকের নাম মনে নেই। সে দেখল কানু বেয়ারা ভিড় ঠেলে প্লেট ঢাকা এক গ্লাস জল নিয়ে তার দিকে আসছে, সেই কানু যে কোনও দিন ললিতের বশ মানেনি। সে সুনীল হালদারকে দেখতে পাচ্ছিল, যার কাছে গত দু’বছর ধরে তার পঁচিশটা টাকা পাওনা আছে। বেঁটেখাটো প্রতাপবাবুর হাসি-হাসি মুখটি ভিড় ঠেলে এগিয়ে আছে, কিছু দিন আগে তিনি ললিতের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিলেন। সম্ভবত এখন বিয়েটা হয়নি বলে নিজের ভাগ্যকে তিনি ধন্যবাদ দিচ্ছেন। তবু সকলের প্রতিই একধরনের কৃতজ্ঞতা অনুভব করছিল ললিত।
তার মনে হচ্ছিল এ-রকমভাবে সকলেই যদি চায়, সকলেই যদি ভালবাসায় বেঁধে রাখে তাকে, তবে কে তাকে নিয়ে যাবে জীবন থেকে! কী করে মরবে ললিত!
পাঁচ মিনিটের ঘণ্টা বাজছিল। দশটা পঞ্চান্ন। জানালা থেকে টুপটাপ করে খসে পড়ছে কচি মুখগুলি, তার চারধারের চাপ ভিড় আলগা হয়ে যাচ্ছে। স্কুল বসবে। ঘণ্টা বাজছে।… স্কুলের ঘন্টা তার বড় চেনা। তবু হঠাৎ মনে পড়ে বিষাদময় সেই ঘণ্টার শব্দ— বড় স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার আগে যেমন বাজে। ভিড় আলগা হয়ে যাচ্ছে চারদিকে… ললিতের অস্তিত্ব থেকে খসে যাচ্ছে চেনা, প্রিয় মানুষেরা… ট্রেন ছাড়তে আর দেরি নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন