শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
কাল মাঝরাতে রিনি হঠাৎ ঠেলে তুলেছিল সঞ্জয়কে, শুনছ, আমার বড্ড ভয় করছে।
হুইস্কির গভীর আচ্ছন্নতা থেকে আঠায় লাগানো দু’ চোখের পাতা খুলে সঞ্জয় বলে, কীসের ভয়! স্বপ্ন দেখেছ?
কী যেন উৎকর্ণ হয়ে শুনল রিনি। বলল, ওই শোনো। এত রাতেও রাস্তায় কারা চিৎকার করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খাবার চাইছে।
সঞ্জয় কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসে শুনল। এ তার চেনা চিৎকার। ‘মা গো, মা গো’ বলে গলিতে গলিতে, রাস্তায়, বড় রাস্তায় কারা যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের গলার ওই অপার্থিব চিৎকার। কলকাতায় আজকাল প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। এর পাতকুড়ুনি। মানুষের রাতের খাওয়ার সময় পার হয়ে গেলে রাস্তায় বেরোয়।
রিনির ভিত সুন্দর মুখখানার দিকে তাকিয়ে ঘুম-চোখেও সঞ্জয়ের হাসি পেল। বলল, এ তো রোজকার ব্যাপার। আজ নতুন করে শোনার কী?
রিনির মাথা নড়ে উঠল। ইয়ারিং ঝলসে ওঠে ম্লান আলোয়। বলল, রোজ শুনি। তুমি তো ঘুমোও, আমার যেন কেমন গায়ে কাঁটা দেয়, ঘুম আসে না। কত মেয়ে-মদ্দ রাত জেগে পথে পথে চিৎকার করে বেড়াচ্ছে। বুকের মধ্যে কেমন করে।
সঞ্জয় হাসে।
রিনি বলে, হেসো না। এর আগে এত বেশি ছিল না। দিনকে দিন বাড়ছে।
ভিখিরিকে ভয় কীসের রিনি? বলে পাশ ফেরার চেষ্টা করে সঞ্জয়।
রিনি আস্তে করে বলে, ওরা সবাই কি ভিখিরি?
না তো কী? গাঁয়ে যখন খরা কি বন্যা হয় তখন দলে দলে চলে আসে শহরে। এবারও হয়তো কিছু একটা হয়েছে কোনও জেলায়। প্রতি বছরই হচ্ছে তো!
কী হয়েছে?
কী জানি! কাগজে লিখছে এবারকার ফলন ভাল নয়।
রিনি শ্বাস ফেলে বলে, কাল দেখলাম আমাদের পায়ের দিকের জানলার শার্সিতে একটা ছায়া। ঘোমটা মাথায় একটা বউ, তার কোলে বাচ্চা ছেলে। এমন চমকে উঠেছিলাম! মনে হল জানালার কাছে গিয়ে দেখব যে, ওখানে কেউ নেই, কেবল ছায়াটাই দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তাতেও বোধ হয় কেবল চিৎকারগুলোই ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঠিক এ-রকম অদ্ভুত মনে হয় আমার—
তা হলে ভূতই হবে বোধ হয়।
আচ্ছা গো, এই যে দিনরাত জুড়ে দেশময় ভিখিরিরা হাঁটছে তার মানে কি ভিখিরিরা অনেক বেড়ে গেছে?
অনেক।
রিনি একটু চুপ করে থাকে। অন্ধকারে তার ঘন শ্বাসের শব্দ শোনা যায়। বড় ভয় করে গো!
ভয় কীসের?
মনে হয় এরা শিগগিরই দলে ভারী হয়ে যাবে খুব। আর এরা দল বাঁধলে—
সঞ্জয় নিঃসাড়ে হাসল। রিনি একটা আঙুল দিয়ে ওর বুকের ওপর আঁকিবুকি কাটল।
তারপর বলল, দেশময় ঘুরে বেড়াচ্ছে না-খাওয়া খিদে-পাওয়া লোক, দিনরাত জুড়ে ঘুরে ঘুরে ডাকছে। আমার বুক কাঁপে। আমি যেন টের পাই, আমাদের এই ছোট্ট একটু ঘর-সংসারের দিকে, আমাদের এক ফোঁটা পিকলুটার দিকে চার দিকের খিদে-পাওয়া মানুষের শাপশাপান্ত ছুটে আসছে। আমার বিধবা ঠাকুমা মা’র সঙ্গে ঝগড়া হলে মাটিতে লাথি মারতে মারতে বলত, তোর অবস্থা যেন আমার মতো হয়— আমার মতো হয়। ঠিক সেই রকম বুঝলে, ঠিক সেই রকম আমি চার দিকে মাটিতে লাথি মারার শব্দ শুনি। আমার বুকের মধ্যে ধুপধুপ শব্দ হয়। কারা যেন আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে, তোদের অবস্থা যেন আমাদের মতো হয়—আমাদের মতো হয়— আমাদের মতো হয়। অনেক সময়ে শাপশাপান্ত ভীষণ ফলে যায়, জানো?
শুনতে শুনতে সঞ্জয় ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে, ও বাচ্চা মেয়ের মতো সঞ্জয়ের বুকের মধ্যে মিশে রইল। আধফোটা গলায় বলল, তুমি এ-সবে বিশ্বাস করো না, না?
সঞ্জয় আস্তে করে বলল, মিছিল দেখেছ রিনি, শুনে দেখো মিছিলের স্লোগানেও কত অভিশাপ থাকে। সব কি ফলছে? ভেবে দেখলে আমাদের সকলেরই মন-ভরা অভিশাপ। কাকে দিতে হবে তা জানি না।
তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিল সঞ্জয়।
আজ সকাল থেকেই আবার গড়িমসি করছিল সঞ্জয়। বেলায় ঘুম ভেঙেছে আজ। তারপর রিনির নরম সাদা বুকের মাঝখানে মুখ ডুবিয়ে রেখেছে অনেকক্ষণ। চন্দনের গন্ধ পেয়েছে গা থেকে। জিজ্ঞেস করেছে, কাল তোমার গিটারের মাস্টার এসেছিল?
হুঁ।
কী শিখলে?
বাব্বা, আজকাল যে খুব খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে! ব্যাপার কী?
সঞ্জয় অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে করে বলেছে, শেখো, খুব ভাল করে শেখো। আমি জীবনে সিটি দেওয়া ছাড়া আর কিছু শিখিনি। পিকলুকে তুমি গান-বাজনা কিংবা সাহিত্য-ফাহিত্য কিছু একটা শিখিয়ো। ও-রকম একটা কিছু জানা থাকলে মানুষের একটা কিছু থাকে।
পিকলু তখন উপুড় হয়ে প্রাণপণে হামা টানার চেষ্টা করে গর্জন করছিল, চার দিকে উঁচু বালিশের বেড়া পার হতে পারছিল না। রিনি তার গাল টিপে দিয়ে বলল, শোনো পিকু, বাবু কী বলছে। তোমাকে অনেক কিছু শিখতে হবে।
সঞ্জয় আস্তে বলল, যদি বাঁচে।
ফের!
সঞ্জয় হাসে। ভিখিরির অভিশাপ ফলে যায়, রিনির এ-বিশ্বাসও আছে। না, সিঁদুর লুকিয়ে, সেজেগুজে, গিটার শিখেও রিনি কোথায় যেন থেমে গেছে।
সঞ্জয়ের মন ভাল নেই। কাল রমেনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকেই মন খারাপ হয়েছিল। আহা, বেচারা রমেন। এখন ওর আর কিছু নেই। চক্রবৎ সুখ-দুঃখ আসে। এ তো জানা কথা। তবু কি তা ভাবতে ভাল লাগে? রমেন যখন গঙ্গার ধারে তার প্রকাণ্ড বাড়িতে বাইরের ঘরে বসে পিয়ানো বাজায়, যখন পুরনো মোটরখানা দাবড়ে চষে বেড়ায় কলকাতা থেকে ডায়মন্ডহারবার, তখন সঞ্জয় সামান্য মোটর মেকানিক, ভূতের মতো খাটে আর পয়সা জমানোর বৃথা চেষ্টা করে। আর গতকাল তার এয়ারকন্ডিশন্ড অফিস ঘরে মুখোমুখি বসেছিল রমেন আর কিছুই নেই। আবার কি কখনও এই অবস্থা পালটে যাবে? উলটো হয়ে যাবে ছবিটা? ঐশ্বর্যবান এক রমেনের পাশাপাশি একই সমাজে বাস করবে ভিখিরি সঞ্জয়! দেখা যাচ্ছে কোনও কিছুরই শেষ পর্যন্ত স্থায়িত্ব নেই। রিনির ওই যে ভয়, ওটাও একদিন সত্যি হতে পারে, জোট বাঁধতে পারে ভিখিরি আর অকিঞ্চন মানুষেরা!
এক-এক সময়ে মনে হয় যখন তার কিছুই ছিল না তখনই সঠিক ঐশ্বর্যবান ছিল সঞ্জয়। তিনটে গুণ ছিল তার। সততা, কর্মক্ষমতা আর নিষ্ঠা। তখন সে কত রাত চটের বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছে। তার কোলের মধ্যে শুয়ে থাকত একটা বেড়াল, মাথার ওপর দিয়ে লাফিয়ে যেত ইঁদুর। কখনও বা ফুটপাথে শুয়ে থেকে সে শুনেছে গায়ের পাশ ঘেঁষে চলে যাচ্ছে মাতালের পা, ঘুম ভেঙে কখনও দেখেছে রাতের আকাশ থেকে সহস্র চোখে কে একজন তাকে লক্ষ করছে। সুন্দর ছিল সেইসব রহস্যময় অনুভূতি। খোলামেলা মানুষ ছিল সে। সে স্পষ্টই জানত, বুঝতে পারত একদিন তার অবস্থা ফিরবে। যে চায়ের দোকানে সে বয়গিরি করত সেটা উঠে গেছে এখন, তার মালিক মারা গেছে লিভার সিরোসিসে, ছেলেমেয়েগুলো এত দিনে রাস্তায় নেমে গেছে বোধ হয়। হাজরার মোড়ের কাছে সেই মোটর সারাইয়ের কারখানা যেখানে সে ছিল মেকানিক তা সে-রকম হতশ্রী রয়ে গেছে। পরশুদিন সেই কারখানার পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এল সঞ্জয়, বুড়ো হয়ে গেছে বাদু মিঞা, কালো একটা মোটর গাড়ির বনেট-খোলা ইঞ্জিনের মধ্যে ঝুঁকে গাড়ির মালিকের সঙ্গে দরাদরি করছে বোধ হয়। ইচ্ছে হয়েছিল গাড়িটা একবার থামায়। কিন্তু লজ্জা করেছিল। সে তো সেই ছেলেবেলাতেই জানত যে একদিন সে মোটর দাবড়ে ঘুরে বেড়াবে, বাড়ি করবে বালিগঞ্জে। কেননা তার তিনটে গুণ ছিল, অসম্ভব তিনটে গুণ। যা ওদের নেই। সে গাড়ি থামায়নি।
সত্য বটে, গুণগুলো এখন আর সঞ্জয়ের নেই। তবু সে নিজের চেষ্টাতেই উঠেছে এত দূর। তাই এখন যদি দুম করে একটা কিছু হয়, যদি জোট বাঁধে ভিখিরিরা; যদি বিপ্লব হয়, যদি কোনও দুর্ঘটনায় হঠাৎ পঙ্গু হয়ে যায় সে, যদি মারা যায়, তবে আবার সব চলে যাবে। কেন যাবে? কেন কিছুরই স্থায়িত্ব নেই সংসারে? যদি এখন কেউ এসে তার কাছ থেকে সব কেড়েকুড়ে নিয়ে বলে, আবার গোড়া থেকে শুরু করো দেখি! কেমন পারো শূন্য থেকে তৈরি করতে বাড়ি, ঘর, ফ্রিজিডেয়ার, মোটর গাড়ি! তা হলে কিছুতেই পারবে না সঞ্জয়। কিছুতেই না। কেবল ভয় করে এখন। অকারণে মাঝে মাঝে ভয় করে।
যেমন ভয় করেছিল কাল, রমেনের মুখোমুখি।
কলিং বেলটা টুংটাং করে বেজে উঠলে বিছানা ছেড়ে উঠল সঞ্জয়। দরজা খুলে দেখল পাশের ফ্ল্যাটের মাদ্রাজি ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে।
লোকটা বাংলায় বলে, আপনার টেলিফোন।
সঞ্জয় এখনও নিজের টেলিফোন পায়নি, অ্যাপ্লাই করেছে অনেক দিন। এই লোকটার টেলিফোনে তার কাজ চালাতে হয়।
টেলিফোন ধরতেই চমকে গেল সঞ্জয়। অজয়ের গলা।
কে! সঞ্জু? শিগগির আয়, মা’র স্ট্রোক।
হঠাৎ হাত-পা হিম হয়ে আসে। গলা ঠিক রাখার চেষ্টা করে বলে, কীসের স্ট্রোক?
জানি না। অবস্থা ভাল না। জ্ঞান নেই। চলে আয়।
কী করে যাব? আজ তো সব বন্ধ!
পুলিশের গাড়ি ধরার চেষ্টা কর, ওরা অনেক সময়ে নেয়। দেরি করিস না।
সঞ্জয় ঘরে ফিরে আসে। তার পা সামান্য কাঁপছে। কিছুক্ষণ অর্থহীনভাবে সে রিনির দিকে চেয়ে রইল।
রিনি জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
সঞ্জয় উত্তরে বলল, বালিগঞ্জ থেকে বেলেঘাটা হেঁটে যাওয়া যায়? তোমার কোনও আইডিয়া আছে কতক্ষণ লাগবে?
রিনি উঠে বসে, কী হয়েছে বলো তো!
সঞ্জয় অন্যমনস্কভাবে বলল, যদি পুলিশের গাড়িতে না নেয় তবু রাস্তাটা আমাকে হেঁটেই পেরোতে হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন