শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
আর-একবার ব্যর্থতার স্বাদ পেল ললিত। গভীর হতাশায় ডুবে যেতে লাগল। সে আর কোনও ঘটনাই ঘটাতে পারে না পৃথিবীতে।
দুপুরে খাওয়ার পর তীব্র অম্বল বর্শার ফলার মতো বুক চিরে উঠে আসছিল। একটু পরেই বমি হয়ে যাবে। ললিত কাত হয়ে শুয়ে, শরীরটাকে মুচড়ে, বালিশে মুখ ঠেসে বমিটা ঠেকানোর চেষ্টা করছিল। হাতে জ্বলে যাচ্ছে বৃথা সিগারেট, ঠোঁট পর্যন্ত আনতে পারছে না সে। বালিশে মুখ গুঁজে সে একটা অস্ফুট ‘অঃ ক’ শব্দ করে।
মা বাসায় নেই। কারও বাড়িতে গিয়ে বসেছে আড্ডয়। বুকের ভিতরটা ভরদুপুরে একা কেমন খাঁ খাঁ করে। দুপুর তার কোনও দিন কাটতে চায় না। কেমন ঝিম ধরে যায় মনে, বড় একা লাগে। দুপুরেই তার মিতুর কথা মনে পড়ে কিংবা মরবার কথা।
জানালার শিকের ভিতর দিয়ে ঘরে এসে মুখ বাড়িয়েছে পেয়ারা গাছের কয়েকটি পাতা। হাওয়ায় নড়ছে। সবুজ, কচি। নতুন জন্মেছে তারা, এখনও ধুলো বালি পড়েনি তাদের গায়ে। শিশুর মতোই নিস্পাপ দেখাচ্ছে। শিশুর মতোই যেন এক মুখশ্রী রয়েছে তাদের। ললিতের ইচ্ছে করে উঠে গিয়ে সে একটু ওদের আদর করে আসে।
পেয়ারাপাতার শিশুমুখ লক্ষ করে সে বড় অবাক হয়। বড় ভাল লাগে তার। সেই দিকেই স্থির চোখে চেয়ে থেকে, ক্লান্ত হয়ে ক্রমে তার চোখ বুজে আসে। তন্দ্রা এসে যাচ্ছিল তার। বমিট হয়তো শেষ পর্যন্ত হবে না।
এমন সময় টের পায়, খোলা দরজা দিয়ে কে যেন নিঃসাড়ে ঘরে এল। মা কি? না তো, মায়ের গন্ধ সে চেনে। চোখ খুলল না ললিত। অপেক্ষা করতে লাগল। মনে হচ্ছিল, মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে কে যেন তাকে দেখছে। শ্বাশ বন্ধ করে রইল সে। যে এসেছে সে বোধ হয় পৃথিবীর কেউ নয়। সে এসেছে ওইপার থেকে, যে-পারে তাকে শিগগিরই যেতে হবে। চোখ খুললেই সে দেখবে একজন একটা টিকিট এগিয়ে ধরে রেখেছে তার দিকে, সে বলবে, তোমার টিকিট হয়ে গেছে, জাহাজ ছাড়তেও আর দেরি নেই।
কিংবা, যে এসেছে সে হয়তো আদিত্য। ললিত চোখ চাইলেই বলবে, ট্রেটার! শাশ্বতীকে ফিরিয়ে দে।
ললিত!
চমকে চোখ খুলল ললিত। আস্তে আস্তে উঠে বসল। ক্লান্ত গলায় বলল, বোসো বিমান।
বিমানের চোখ লালচে, রুক্ষ চুল, স্নান-না-করা ধুলোটে চেহারা। সে নিবিড়ভাবে ললিতের দিকে চেয়ে ছিল। শ্বাস ফেলে বলল, ললিত, আমি আবার পাগল হয়ে যাচ্ছি।
সে কী? ললিত অবাক হয়ে বলে, কী হয়েছে?
কী জানি! মাঝে মাঝে এমনিই এটা হয়, কোনও কারণ থাকে না। আবার কখনও কোনও একটা ধাক্কা খেলে এটা হয়। কাল অনেক রাতে আমি একটা ভাড়াটে মেয়েকে কয়েকজন গুন্ডা ছেলের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম।
একটু চুপ করে থেকে বিমান বলে, কয়েক দিনের মধ্যেই আমার পাগলামি শুরু হবে। আমি টের পাচ্ছি।
ললিত নড়েচড়ে বসল। বলল, কাল বিকেলেও তুমি একজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলে, না বিমান?
মাথা নিচু করে একটু বসে থাকে বিমান। তারপর বলে, একে বাঁচানোটা তার চেয়ে শক্ত ছিল। কারণ এ বাঁচতে চায়নি। ওই যে বটগাছতলায় বাঁধানো বেদি আছে, ওখানে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে সে বসে ছিল, অনেক রাতে, অন্ধকারে আমি তার মুখও দেখিনি।
ললিত বড় বড় চোখে চায়। বলে, আই বাপ, বিমান, ওটা যে শচীনদের আড্ডা, ওরা ওখানে চোলাই খায়।
বিমান মাথা নাড়ে, বলে, জানি। মেয়েটাকেও ওরা ভাড়া করে এনেছিল, আমি জানতাম। চা খেতে বেরিয়ে আমি ওদের পাল্লায় পড়ে গিয়েছিলাম! কিন্তু তারপর যখন একটা ছেলে সেই মেয়েটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তখন— বুঝলে—তখনই আমার সব গোলমাল হয়ে গেল। জানি মেয়েটা নিজের ইচ্ছেয় এসেছে, ওটাই তার কাজ তার রুজি-রুটি, তবু মনে হল সে যেন ভিতরে ভিতরে বেঁচে যেতে চাইছে, সেটা কেউ বুঝতে পারছে না।
ললিত জিব দিয়ে চুকচুক করে একটা আফসোসের শব্দ করে বলে, রাতারাতি তুমি পৃথিবী পালটে দিতে চাও?
বিমান একটা শ্বাস ফেলে বলল, আমার এ-রকম হয়। আগে আমি কত, নিরীহ ছিলাম, যা-কিছু চোখে পড়ত তা থেকেই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজের ভাবনা-চিন্তার মধ্যে ডুবে যেতাম। জানি তো আমি কেমন দুর্বল মানুষ! কিন্তু কাল রাতে আমি চেঁচিয়ে লোক ডাকছিলাম, বলছিলাম, বাঁচাও, কে কোথাও আছো—। কেউ এল না, কেউ সাড়াও দিল না। কিন্তু নিশ্চয়ই অনেকে সেই ডাক শুনেছিল। তবু কেউ আসেনি। কেন জানো? তারা সবাই আমারই মতো নিরীহ, চোখের সামনে অন্যায় দেখলে চোখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার করলে কানে হাত চাপা দেয়। আমি এতকাল সবাইকেই আমার চেয়ে সাহসী আর শক্তিমান ভেবেছি। কিন্তু বৃথা, কেউ তা নয়।
ললিত একটু হেসে বললে, কিন্তু আমি তোমার ডাক শুনতে পাইনি।
পেলে কী করতে? যেতে?
নিশ্চয়ই।
আর যখন গিয়ে দেখতে যে আমি কতকগুলো বাজে ছেলের হাত থেকে একটা নষ্ট মেয়েকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছি, তখন কী করতে? লড়াই করতে ওদের সঙ্গে?
না
বিমান উত্তেজিতভাবে ললিতের একটা হাত ধরে ঝাঁকুনি দেয়, না! না। কেন
সেটা পণ্ডশ্রম হত। ওই ছেলেগুলো ওইরকম, মেয়েটাও ওইরকম, সেখানে আমাদের কী করার আছে?
নেই! বিমান হতাশ হয়, নেই কেন! তুমি কি ওদের সমর্থন কর
ললিত ভ্রূ কুঁচকে উত্তেজিত বিমানকে একটি দেখল। তারপর বলল, না, সমর্থন করি না। কিন্তু ওরা যে খুব একটা অন্যায় করছিল তাও তো নয়! কেউ যদি নিজের পয়সায় মদ খায়, ভাড়াটে মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করে তাতে আমার কী? মদ খাওয়া বারণ নয়, প্রস্টিটিউটদেরও লাইসেন্স আছে—
ঠিক। কিন্তু তোমার মন কী বলে। কাল বিকেলে দেখছিলাম তুমি আদিত্য আর শাশ্বতীর বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছ। মেয়েটা বিয়ে করতে রাজি নয়, যে-কোনও কারণেই হোক সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। তবু তুমি তাকে গায়ের জোরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলে। তুমি মনে মনে বুঝতে পারছিলে এটা অন্যায়, তবু তুমি তোমার অহংকার আর নিরপেক্ষতা বজায় রাখছিলে। আমি এখনও জানি না ওই মেয়েটার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী! তবু আমার বিশ্বাস তুমি ওর ওপর একটা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে চাইছিলে। তাই অত জোর দেখিয়েছিলে তুমি। নিরপেক্ষতার ভান করেছিলে। তবু তোমার মুখ সাদা হয়ে যাচ্ছিল, তোমার হাত কাঁপছিল। কাল শাশ্বতীর জন্য আমার ততটা কষ্ট হয়নি, যতটা তোমার জন্য হচ্ছিল।
ললিত চোখ নামিয়ে বলল, তার সঙ্গে এ-ঘটনার সম্পর্ক কী?
বিমান মৃদু হাসল। বলল, কাল যদি আমিও তোমার মতো নিরপেক্ষ থাকতাম তা হলে আজ তুমি হাত কামড়াতে, চুল ছিঁড়তে, গাল দিতে নিজেকে। তুমি অত নিরপেক্ষ থেকো না, তা হলে একদিন তোমার ঘরে চোর ঢুকবে আর তুমি দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকবে।
ললিত মাথা নাড়ল, কিন্তু বলো, কালকের মেয়েটাকে তুমি বাঁচাতে চেয়েছিলে কেন?
বিমান নিজের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, যখন ওই ইতর ছেলেটা নষ্ট মেয়েটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন মেয়েটার কোনও উপায় ছিল না। সে সতী নয়, ঘরের বউ নয়, চল্লিশ কি পঞ্চাশ টাকায় সে কেনা হয়ে গেছে, তার পছন্দ-অপছন্দ নেই, যে কিনবে সে তার। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যে, সে-মেয়েটা এ রকম চাইছিল না। কেউ তাকে কিনে জিনিসপত্রের মতো যেমন খুশি ব্যবহার করুক, এটা কে চায়! আমার মনে পড়েছিল, বিকেলে শাশ্বতীকেও ভোমরা টেনে নিয়ে যাচ্ছিলে, সেও যাচ্ছিল, সে হয়তো সইও করত, কারণ সে বুঝতে পারছিল যে, তার উপায় নেই। না, না, তুমি রাগ কোরো না, শাশ্বতীর সঙ্গে আমি সে-মেয়েটার তুলনা করছি না। কিন্তু আমার কাছে দুটোই অনেকটা এক ব্যাপার। বিকেলে শাশ্বতীকে যেমন দেখেছি, রাত্রিবেলায় ওই মেয়েটাকেও ঠিক ওই রকম দেখেছিলাম, উপায়হীন বলে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কিছু লোক।
ললিত একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলল, তুমি পাগল।
বিমান গম্ভীরভাবে বলল, ঠিক। ললিত, যেদিন আমি দুটো ছিনতাইবাজ লোকের কাছ থেকে আমার ঘড়ি আর মানিব্যাগ কেড়ে নিলাম, সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমি এ-রকম কাজ আবার করব এবং করতে থাকব। আমার স্বভাবের নিয়ম পালটে গেছে। কিন্তু তার ফল এই হবে যে, একদিন কেউ আমাকে নিঃশব্দে সরিয়ে দেবে, কাজের বাধা হচ্ছে বলে। কে আমাকে রক্ষা করবে তখন? কে আমার সহায় হবে? মানুষের মধ্যে তেমন শক্তিমান কাউকে দেখি না। তার চেয়ে এই ভাল যে, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি…আঃ, কিছু দিনের জন্য নিশ্চিন্ত।
বিমান একটুক্ষণ চোখ বুজে বসে রইল। মুখে মৃদু একটু হাসি। তার মাথার মধ্যে চমৎকার নীলাভ আকাশখানা আস্তে আস্তে ঢুকে যাচ্ছে। মাথার ভিতর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে সব চিন্তা, স্মৃতি, ক্ষোভ।
ললিত অস্বস্তি বোধ করে। দাঁতে নখ কামড়ায়। তারপর একসময়ে বিমানের গায়ে হাত দিয়ে বলে, কী ভাবছ?
আকাশ। ধীর স্বরে এই কথা বলে চোখ খুলে বিমান একটু হাসে, বলে, আকাশের চিন্তাই ভাল। আর দু’-এক দিনের মধ্যেই আমার ভিতরটা আকাশে ভরে যাবে। চারদিকে কিছুই আর চোখে পড়বে না। তখন যে খুশি এসে কেড়ে নিক আমার ঘড়ি কিংবা মানিব্যাগ, যার খুশি জোর করে বিয়ে করুক শাশ্বতীকে, সেই বদ ছেলেগুলো যেমন খুশি বেলেল্লাপনা করুক পারুলের সঙ্গে, তাতে আমার আর কিছু যাবে আসবে না।
হঠাৎ ললিতের বড় লজ্জা করে। সে মুখ নিচু করে বলে, আমরা কী করতে পারি বলো!
বিমান মাথা নাড়ল। বলল, কিছু না। কাল রাতে আমার মনে হয়েছিল একজন খুব শক্তিমান মানুষের বড় দরকার, যিনি মানুষের এক ডাকে ছুটে আসবেন। ওই ছেলেগুলো বোমা মারে, ছোরা চালায়, আর ওই মেয়েটা ভাড়াটে। কে আসবে ওদের হাত থেকে ওই ন্যাকা ঢঙি মেয়েটাকে বাঁচাতে! সেটা হবে একটা হাস্যকর কাজ। কারণ, মদ খাওয়া বারণ নয়, বেশ্যাদেরও লাইসেন্স আছে। কাজেই আসতে চাইলেও বউ দরজা আটকে দাঁড়াবে, বাধা হবে ভয়, দুর্বলতা, কিংবা নিরপেক্ষ থাকার ইচ্ছা। কাজেই একমাত্র সেই লোকই ছুটে আসতে পারে যার ঘর-সংসার নেই, পরিবার পরিজন নেই। মানুষ ডাকলে সে নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। তেমন একজন মানষকে বড় দরকার—সবাই তেমন একজন মানুষের অপেক্ষা করছে—যার দিকে নির্ভর করে দু’হাত বাড়িয়ে বলা যায়, বাঁচাও—আমি শাশ্বতী—আমি পারুল—আমি ললিত—আমি বিমান—আমাকে বাঁচাও…
ললিত হাসে, কোথায় পাবে?
বিমানের চোখ চিকমিক করে, হঠাৎ বলে, যদি না-থাকে, তবে একজন কাউকে তৈরি করে নিতে হবে।
পাগল।
বিমান আস্তে আস্তে আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়। তারপর করুণ মুখ করে বলে, আমার একটা উপকার করবে?
কী?
পকেট থেকে অপর্ণাকে লেখা চিঠিখানা বের করে বিমান। বলে, এই ঠিকানায় মেয়েটাকে চিঠিটা পৌঁছে দেবে? ডাকে দিতে পারতাম, কিন্তু ওদের বাড়ির অভিভাবকেরা মেয়েদের নামে চিঠি এলে খুলে পড়ে, তারপর দেয়। তুমি দিয়ে আসবে ওর হাতে?
ললিত অবাক হয়, বলে, কী করে! আমি একটা অচেনা লোক, ওদের বাড়িতে—
বিমান বাধা দিয়ে বলে, না, বাড়িতে নয়। চিঠিতে একটা ফোন নম্বর দেওয়া আছে। আগে ওকে ফোন করো, কিন্তু নিজে কোরো না, পুরুষের গলা শুনলে ওরা অপর্ণাকে ডেকে দেবে না! তুমি বরং কোনও মেয়েকে দিয়ে ফোন করিয়ে। অপর্ণা ফোন হাতে নিলে তুমি কথা বলবে। বাড়ির বাইরে কোথাও একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিয়ো। খুব শক্ত না, তবে একটু ঝামেলার ব্যাপার। পারবে?
তুমি নিজে গেলে না কেন?
দূর! ওরা আমাকে ঢুকতেই দেবে না।
কেন
বাঃ, আমি—আমি পাগল না!
ললিত একটু ইতস্তত করল। তারপর হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিল। বিমান বলল, চারটের পরে যেয়ো, তখন ও কলেজ থেকে ফিরবে।
চারটের একটু আগেই ললিত ঘরে তালা দিয়ে বেরোল। শম্ভুর ছোট ভাইটা একা একা সিঁড়িতে বসে সিগারেটের কুড়ানো প্যাকেট গুনছে। তাকে ডেকে বলল, মা কোন বাড়িতে গেছে জানিস?
ওই তো, হালদারদের বাড়ি।
ঘরের চাবিটা দিয়ে আসবি? বলিস, ফিরতে একটু দেরি হবে।
ঘাড় হেলিয়ে চাবিটা নিয়ে দৌড়ে গেল ছেলেটা।
ললিত খানিক দূর হাঁটল। তখনও গলা বুক ঢকঢক করছে অম্বলে। হাঁটতে গেলে পাঁ কাঁপছে। শ্বাস ফেটে যাচ্ছে মাঝে মাঝে আমি কি পারব শেষ পর্যন্ত? ভাবল ললিত। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে সে আনোয়ার শা রোড় পর্যন্ত হেঁটে গেল। বেরিয়ে এসে বাইরের রোদে হাওয়ায় চমৎকার লাগছে তার। কিন্তু শরীর দিচ্ছে না।
একটু দূরে ফিল্ম-স্টুডিয়োটার সামনে একটা ট্যাক্সি খালি হচ্ছে। পকেটে হাত দিয়ে সে টাকা কয়টা গুনে দেখল। পাঁচ টাকা আর কিছু খুচরো আছে। হয়ে যাবে। তারপর দূর থেকে অসহায়ভাবে দুর্বল হাত তুলল ললিত। মনে মনে বলল, হে ভগবান, ট্যাক্সিওয়ালাটা যেন আমাকে দেখতে পায়, আর অন্য কেউ যেন ওটাকে ধরে না-ফেলে।
ট্যাক্সিওয়ালাটা দেখতে পেয়েছিল তাকে। ধীর গতিতে সামনে এসে দাঁড়াল। ট্যাক্সিতে উঠে নিশ্চিন্তে ঘাড় হেলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে হঠাৎ তার মনে পড়ল একটু আগে ট্যাক্সিটার জন্য সে ভগবান—অর্থাৎ ভগবান নামে একটা অলীক বস্তুকে ডেকেছে। সে একটু মৃদু হাসল। ট্যাক্সিটা সে পেয়েছে, তবে এবার কি ভগবানকে বিশ্বাস করবে? করতে মাঝে মাঝে বড় ইচ্ছে হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত করা যায় না। বিশ্বাস করুক আর না করুক, তবু যদি ভগবানের ইচ্ছেয় সে ট্যাক্সিটা পেয়ে থাকে তবে তাকে তার একটা ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। তাই সে ফিসফিস করে বলল, ধন্যবাদ। তারপর নিজের কাছেই লজ্জা পেল।
গড়িয়াহাটার কাছে ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিল ললিত।
চারদিকে অনেক টেলিফোন করার জায়গা রয়েছে। কিন্তু এখন দরকার একজন মেয়েকে।
কিন্তু এখন মেয়ে কোথায় সায় ললিত! একটি বেশ ভদ্র, সভ্য, শান্ত এবং চালাক মেয়ে! ললিত আপন মনে একটু হাসল। তারপর মনে মনে বলল, মাইরি, ভগবান, একটা মেয়ে জুটিয়ে দাও দেখি, যে-মেয়ে কথা বলতে গেলেই ভ্রূ কোঁচকাবে না, তেড়ে আসবে না, বেশ দয়ালু গোছের একজন…
আশ্চর্যের বিষয়, পেট্রল পাম্পের জানালা দিয়ে টেলিফোন টেনে এনে বাইরে দাঁড়িয়ে ফোন করছে একটা মেয়ে। চোখে চশমা, হাতে বটুয়া, হলদে শাড়ি পরা, বেশ ধারালো বুদ্ধির চেহারা মেয়েটির। কথা বলতে বলতে হাসছে। মিষ্টি হাসিটি। ললিত নিঃশব্দে তার অদূরে গিয়ে বশংবদভাবে দাঁড়াল। অপেক্ষা করতে লাগল।
মেয়েটা বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল, তারপর এক সময়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে এক পলক দেখে টেলিফোনে বলল, এই ছেড়ে দিচ্ছি, পিছনে লোক অপেক্ষা করছে… আচ্ছা!
মেয়েটি পয়সা দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই ললিত পথ আটকাল।
প্লিজ যদি একটু উপকার করেন।
একটুও ঘাবড়াল না মেয়েটা। নরম মুখে বলল, বলুন।
একটি মেয়েকে একটু টেলিফোনে যদি ডেকে দেন। ওর গার্জিয়ানরা— মেয়েটি ঝিলিক দিয়ে হাসল, বলল, বুঝেছি। নাম্বারটা দিন। আর নামটা।
ললিত বলল, তারপর শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল। মেয়েটা দ্রুত অভ্যস্ত হাতে ডায়াল ঘুরিয়ে মিষ্টি গলায় বলল, হ্যালো—অপর্ণা আছে?…আমি মীরা ওর সঙ্গে…
মেয়েটি মাউথপিসে হঠাৎ হাত চাপা দিয়ে ললিতকে তীক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করল, কলেজে পড়ে তো!
হ্যাঁ।
কোন কলেজে?
‘হে ভগবান’, ললিত মনে মনে দ্রুত বলল, ‘কোন কলেজে?’ হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়ে গেল, সুবল বলেছিল লেডি ব্র্যাবোর্ন।
লে—লেডি ব্রাবোর্ন।
মেয়েটি মিষ্টি গলায় টেলিফোনে বলল, হ্যাঁ আমরা এক ক্লাসের মাসিমা।…কে, অপর্ণা? এই যে ভাই, কথা বলুন—আমি কিন্তু মীরা—
মিষ্টি একটু হাসল মেয়েটি। ললিত হাত বাড়িয়ে টেলিফোনটা নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, ধন্যবাদ। মেয়েটি ঘাড় হেলিয়ে চলে গেল।
ও-পাশ থেকে খুব সতর্ক সরু একটা মেয়ে-গলা বলল, কী রে—মীরা?
ললিতের গলা কাঁপছিল, সে ঘাবড়ে যাচ্ছিল। বলল, আমি বিমান রক্ষিতের বন্ধু, আমার নাম ললিত।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বল না।
বিমান একটা চিঠি দিয়েছে আপনাকে। সেটা কোথাও এসে আপনাকে নিতে হবে।
ইস, দ্যাখ তো, কী বিচ্ছিরি সময়ে বললি, চারটে বেজে গেছে, বিকেলে আবার আমার মিউজিক ক্লাস। কোথা থেকে ফোন করছিস?
অস্বস্তি বোধ করে ললিত বলল, গড়িয়াহাটা।
আচ্ছা, শোন মীরা, আমি যাচ্ছি তোর বাসায়, আর আধ ঘণ্টা পর, মিউজিক ক্লাসে যাওয়ার পথে।…ইস, তুই আজই লক্ষ্নৌ যাচ্ছিস আগে বলিসনি তো! হঠাৎ ঠিক হয়ে গেল?…ফোন করে ভাল করেছিস পি এস-এর নোটটা না হলে একদম প্রিপ্যারেশন হত না…
ললিত হঠাৎ বুঝতে পারলে মেয়েটা তাকে সময় দিচ্ছে। এবার তাকে একটা জায়গার নাম বলতে হবে। সে দ্রুত চিন্তা করে বলল, হিন্দুস্থান মার্টের ভিতরে যে চায়ের দোকানটা আছে, ওইখানে। সাড়ে চারটে।
ইস, তোকে কি আর চিনতে পারব, যা মুটিয়ে ফিরবি লক্ষ্ণৌ থেকে!
ললিত ইঙ্গিত বুঝল। বলল, আপনার পোশাকটা বলুন। আমিই আপনাকে চিনে নেব।
পরশুদিন যা একখানা শাড়ি কিনেছি না রে, দেড়শো টাকাও বলবি সস্তা। জামদানির ওপর পিঙ্ক বাটিকের কাজ। আজ পরে যাব, দেখিস…আচ্ছা ছাড়ছি…কেমন!
টেলিফোন রাখার পর ললিত টের পেল তার কপাল ঘামছে।
আরও আধঘণ্টা সময় আছে। কিন্তু একটু যে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াবে ললিতের সে সাধ্য নেই। তাই সে আস্তে আস্তে হেঁটে হিন্দুস্থান মার্টের নির্জন চায়ের দোকানটায় এসে বসল। এক কাপ চা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। হঠাৎ তার মনে পড়ল একজনের একটা পাওনা সে এখনও চুকিয়ে দেয়নি। ঠিক সময়ে সে ঠিক মেয়েটিকে পেয়ে গিয়েছিল টেলিফোন করার জন্য, আর অপর্ণার কলেজের নামটাও মনে পড়েছিল ঠিক সময়ে। মৃদু একটু হাসল ললিত আপনমনে, তারপর একদম ফাঁকা রেস্টুরেন্টটায় একটু চোখ বুলিয়ে অনুচ্চ ফিসফিস স্বরে বলল, ধন্যবাদ, তুমি খুব ভাল।
উত্তেজনাটা বড় চমৎকার লাগছিল ললিতের। এখন তার ইচ্ছে করছে আরও বহুবার এইরম রহস্যময়ভাবে সাংকেতিক ভাষায় অচেনা মেয়েদের ফোন করে দুপুরবেলায় এ-রকম রোজ এসে বসে থাকে এ-রকম রেস্তরাঁয়, কারও জন্য অপেক্ষা করে। এ-রকম কত কিছু হতে পারত জীবনে, ঠিক যেন অলৌকিক কাণ্ড সব!
একটু অন্যমনস্ক ছিল ললিত। হঠাৎ সিগারেট ধরিয়ে মুখ তুলে দেখল চমৎকার শাড়ি পরা একটি রোগা ফরসা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। মুখখানা লম্বাটে একটু কিশোরীর মতো মুখশ্রী। চোখ দুটো বড়, কিন্তু একটু ভারী। খুব কাঁদলে যেমন চোখের চেহারা হয়। তবে এ-মেয়েটি কাঁদেনি, চোখ দুটোই ও-রকম। মুখের হাসিটুকু দেখে মনে হয় এ খুব বেশি হাসে না কখনও। আঁচল ডান ধার দিয়ে ঘুরিয়ে এনে সমস্ত শরীরটা ঢেকেছে।
একটু হেসে বলল, আপনিই ললিত?
ললিত মাথা নেড়ে বলল, বসুন।
বসল। তারপর একটু বিব্রত হেসে বলল, টেলিফোনে আমার কথা শুনে খুব হেসেছেন, না? কী করব বলুন, আমাদের বাড়ির ওইরকম নিয়ম।…কই, চিঠিটা দেখি।
দেড়-দুই লাইনের চিঠি, তবু বুকের কাছে তুলে নিয়ে ললিতের চোখের আড়াল করে গভীরভাবে পড়ল অপর্ণা। মুখখানা হঠাৎ বড় ম্লান হয়ে গেল। চিঠিটা ধরে রইল একটুক্ষণ। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আপনি ওর কীরকম বন্ধু? পুরনো?
যদিও মিথ্যে কথা, তবু ললিত বলল, অনেক দিনের। সেই কলেজ-লাইফ থেকে। মাঝখানে দেখাশোনা ছিল না, এখন কাছাকাছি বাসা।
ওঃ। ওকে কেমন দেখলেন?
খুব শকড।
কেন? মেয়েটা হঠাৎ ঝুঁকে তীক্ষ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল।
বলা উচিত হবে না, তাই গতকালের ঘটনা কিছু বলল না ললিত, শুধু বলল, ও অল্পেই উত্তেজিত হয়।
মেয়েটা একটু চুপচাপ থেকে হঠাৎ বলল, কিছুদিন আগে কে যেন টেলিফোন করে বাবাকে ওর নামে যা-তা কথা বলেছে। বলেছে ও নাকি আমাকে নষ্ট করে দিচ্ছে, কে বলুন তো!
ললিত সামান্য শিউরে ওঠে মনে মনে। সুবলের কালো চকচকে মুখখানা মনে পড়ে, সে মাথা নেড়ে বলল, কী জানি!
হঠাৎ অপর্ণার চোখে জল এসে যাচ্ছিল। স্খলিত গলায় বলল, ওকে যন্ত্রণা দিয়ে কার কী লাভ! আমার বাবা ইচ্ছে করলে ওর চাকরি খেয়ে ফেলতে পারেন, নানা রকম ট্রাবল দিতে পারেন। কাজেই বাবাকে যে জানিয়েছে তার কী লাভ? আমি ওকে এইটুক বেলা থেকে জানি, ওর মতো ভাল হয় না।
একটু চা বলে দিই!
না। অপর্ণা মাথা নাড়ল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, আমি বাবার একমাত্র সন্তান। বাবার সব সম্পত্তি আমার। কিন্তু তাতে কারও কোনও লাভ নেই, আমি ওকেই ভালবাসি। আর কাউকে কখনও
ললিত হঠাৎ বলল, এ-সব কথা কেন বলছেন?
মেয়েটা চোখ নামিয়ে নেয়, টেবিলের নুনের কৌটোটা একটু নাড়াচাড়া করে। বলে, কী জানি! আমার কেবলই মনে হয় আমাদের যেন একটা বিপদ আসছে
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন