ত্রয়োদশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

তেরো

বস্তুত সেদিন কলেজে কিছুই ঘটল না।

টানা তিনটে পিরিয়ড করল শাশ্বতী, সম্পূর্ণ অন্যমনস্কভাবে। দু’-এক লাইন নোট টুকল খাতায়, বাদবাকি সময় অপটু হাতে কয়েকটা ছবি আঁকল। ছবিগুলো সবই পুরুষমানুষের মুখের। কিন্তু একটা মুখও সুন্দর হল না।

তৃতীয় পিরিয়ড তার ফাঁকা। ক্লাসঘর থেকে বেরিয়ে সে বারান্দা পেরোল আস্তে ধীরে। কমনরুমে ঢুকতে যাচ্ছে, এমন সময়ে রাকার সঙ্গে দেখা। রাকার পোশাক সবসময়ে ঝকমকে। সাত দিনে সাত রকমের শাড়ি পরে আসে। মেয়েরা ওকে খ্যাপায় মিস ওয়ার্ডরোব বলে। বাড়ির মোটর গাড়ি ওকে কলেজে পৌঁছে দেয়, নিয়ে যায়। ভারী হাসিখুশি মেয়ে রাকা। কখনও মুখ ভার করে থাকে না। অশ্লীল কথা বলে অনায়াসে সে, ঠিক পুরুষদের মতো।

তাকে দেখে রাকা দু’হাত বাড়িয়ে বলল, আরে গোমড়ামুখী, তোর এখন অফ পিরিয়ড না?

শাশ্বতী মৃদু হাসল, বলল, পর পর দু’পিরিয়ড অফ। তারপর এস. বি-র ক্লাস।

রাকা সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠল, তা হলে চল, আমার গাড়িতে একটু ঘুরে আসবি। দাদা গাড়ি নিয়ে এসেছে, একটু রেডিয়ো-স্টেশনে যাব। আজ আমার অডিশন। কী ভয় করছে রে! দ্যাখ বুকে হাত দিয়ে কেমন ধুপধাপ হাতির পা পড়ছে…বলতে বলতে শাশ্বতীর হাত টেনে বুকে চেপে ধরল রাকা, তারপর চোখ গোল করে জিজ্ঞেস করল, টের পাচ্ছিস!

শাশ্বতী কিছু বুঝল না, হাত টেনে নিয়ে বলল, তুই একা যা। আমার ভাল লাগছে না।

রাকা মুখে দুঃখের ভাব ফুটিয়ে বলল, একটা বন্ধুও যেতে চাইছে না। সব শালি আমাকে ইগনোর করে। এদিকে আমি যে কী ভীষণ ভয় পাচ্ছি।

শাশ্বতী জানে রাকার ভয়-ডর বলে কিছু নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে ভান করে। এর আগে বোধ হয় তিন-চারবার রেডিয়োতে অডিশন দিয়েছে রাকা। একবারও সুযোগ পায়নি। আসলে ছটফটে বলে কোনও কিছুই মন দিয়ে শেখে না ও। ক’দিন গান গায়, ক’দিন সেতার বা সরোদ শেখে, কিছু দিন নাচের স্কুলে গিয়েছিল, এক বছর নষ্ট করেছে আর্ট কলেজে, মাঝেমধ্যে কবিতাও লিখে ফেলে গাদা গাদা। তারপর আবার রাকা ছটফটে আড্ডাবাজ, আমুদে রাকা হয়ে যায়। কোনও শিল্পকর্মই তার ভিতরে গাম্ভীর্য আনে না। তার বিলিতি রঙের দামি টিউবগুলো পচে নষ্ট হয়, সেতারি সরোদ পড়ে থাকে, কবিতার খাতা হলদে হয়ে যায়, খামোখাই গানের স্কুলে মাসে মাসে মাইনের টাকা জমা পড়ে। আবার ঝোঁক চাপলে পনেরো দিনের মধ্যেই বড় গায়িকা কিংবা সেতারি কিংবা আঁকিয়ে হওয়ার জন্য উঠে-পড়ে লাগে।

রাকা হঠাৎ মুখে-চোখে হাসি ফুটিয়ে বলল, আমার দাদাকে তোর মনে নেই? সেই যে একবার কলেজ ছুটির পর আলাপ করিয়ে দিয়েছিলুম! তারপর কত দিন দাদা তোর চোখ আর চুলের প্রশংসা করেছে। আমাকে জিজ্ঞেস করেছে তোর চুল চোখ অরিজিনাল কি না। আজকালকার মেয়েরা তো চুল চোখ তৈরি করতে পারে। আর আমার দাদাকেও তো তুই দেখেছিস! ও-রকম হ্যান্ডসাম ক’জন আছে? বলে চোখ নাচাল রাকা, শাশ্বতীর হাত ঝপ্‌ করে টানতে টানতে বলল, জীবনে উন্নতি করতে চাস তো শিগগির চল। আমি যখন ভিতরে অডিশন দেব, তখন তুই আর দাদা দু’জনে দু’জনকে অ্যাডমায়ার করবি। আয়…

ব্যাপারটা যে শাশ্বতী জানে না তা নয়। মাঝেমধ্যে রাকা তার দাদার কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে বলেছে। নিয়ে যেতে চেয়েছে তাদের বাড়িতে। শাশ্বতী যায়নি।

কোথায় যেন দুর্বলতা থাকে। থেকে যায়। মানুষে তা বুঝতে পারে, কিন্তু কিছু করার থাকে না। মাস দুই আগেই বোধ হয়, কলেজ ছুটির পর ওরা একসঙ্গে বেরোচ্ছিল। কলেজের গেটের সামনে একটা সবুজ রঙের হেরাল্ড গাড়ির বাফারে পা তুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক সাতাশ-আটাশ বছর বয়সের ভদ্রলোক। ফরসা টকটকে রং, বিশাল কাঁধ, পেশিবহুল দুখানা হাত। নিজের সৌন্দর্য দেখাতে জানেন ভদ্রলোক। পরনে ছিল গ্রে রঙের চাপা একটা দামি প্যান্ট, গায়ে চেক-ওলা একটা স্পোর্টস শার্ট। চোখে চমৎকার একটা সবুজ রোদ-চশমা। রাকা সব বন্ধুকে ডেকে তার দাদার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। কয়েক মিনিটের মাত্র পরিচয়। তারপরই তারা ভাইবোনে হেরাল্ড গাড়িটার সামনের সিটে বসে, তাদের দিকে একটু মিষ্টি হেসে, হাত নেড়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। রাকা আর তার দাদার সেই চলে যাওয়ার দৃশ্যটি আজও স্পষ্ট মনে আছে শাশ্বতীর। সেই গাড়ি থেকে হাত নেড়ে হেসে চলে যাওয়ার মধ্যে একটা অদ্ভুত আভিজাত্যের সৌন্দর্য ছিল। যে-সৌন্দর্য নিজেদের পারিবারিক জীবনে কখনও প্রত্যক্ষ করেনি শাশ্বতী। সেই সৌন্দর্যটুকু আজও কাঁটার মতো ফুটে আছে মনে। কলেজের বন্ধুদের দেখানোর মতো গাড়ি নেই শাশ্বতীর, নেই অমন সুন্দর চেহারার স্মার্ট একটি দাদাও। যত বার ‘হিংসে করব না’ বলে ভাবে শাশ্বতী তত বারই নিজের কাছে নিজে হেরে যায়।

ওই যে একটু তার প্রশংসা করেছে ভদ্রলোক, যা সে রাকার মুখে শুনল, তাইতেই মনটা একটু ছটফটে চঞ্চল হয়ে গেল তার। এ তার মেয়েমানষি দুর্বলতা, সে জানে। তাই রাকা টেনে নিয়ে গেল, আর সেও ‘যাব না, যাব না’ বলতে বলতে চলে এল কলেজের বাইরে। এবং মনে মনে ভীষণ লজ্জা পেতে লাগল।

আজ হেরাল্ড গাড়িটা ছিল না। তার বদলে সাদা রঙের একখানা অ্যাম্বাসাডার মার্ক টু দাঁড়িয়ে আছে। ওদের কটা গাড়ি আছে কে জানে। আজ রাকার দাদা বাইরে দাঁড়িয়ে নেই। স্টিয়ারিং হুইলে হাত দু’খানা অলসভাবে ফেলে রেখে, মাথা পিছনে হেলিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। রোদ-চশমায় ঢাকা চোখ। হঠাৎ দেখলে মনে হয় মার্কিন টুরিস্ট।

তাকে দেখেই বোধ হয় টুক করে দরজা খুলে নামলেন ভদ্রলোক। রাকা কিছু বলার আগেই ঈষৎ হেসে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করলেন, চিনতে পারছেন?

লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল শাশ্বতী। ঘাড় নাড়ল সম্মতির। হ্যাঁ, সে চিনতে পারছে।

রাকা কলকল করছিল ইতিমধ্যেই, ওকে ধরে নিয়ে এলাম দাদাভাই, একা যেতে আমার একটুও ভাল লাগে না। তা ছাড়া দেখি ওর লাক-এ এবার হয় কি না!

খুব খুশি হল রাকার দাদা, বলল, আরে, আসুন আসুন। আপনি গেলে তো কথাই নেই। আবার আমরা ভাইবোনে গাড়িতে করেই পৌঁছে দেব আপনাকে। আসুন…

কেন যেন শাশ্বতী বুঝতে পারছিল যে, তার যাওয়া উচিত নয়। তার মন চাইছিল না। তবু, সে বড় দুর্বল। কখনও কখনও প্রতিরোধের সমস্ত শক্তি চলে যায় তার। যে যা খুশি করিয়ে নিতে পারে তাকে দিয়ে। মিনমিন করে সে কী একটু আপত্তি করল বটে। কিন্তু রাকার কলকলানি আর তার দাদার ভরাট গলার হাসিতে সেটুকু চাপা পড়ে গেল।

রাকার দাদাকে বেশ ছেলেমানুষের মতো দেখতে। ‘ছেলেটা’ বললেই মানায়, ‘ভদ্রলোক’ বলে উল্লেখ করতে বাধো বাধো লাগে। সামনের সিটে তারা তিন জন বসল। মাঝখানে রাকা। জানালার পাশে শাশ্বতী— লাজুক, নতমুখে।

গলায় আঁচল জড়িয়ে রাকা বলল, বাব্বাঃ, হাওয়া লাগাব না।সে-বার গানের মাঝখানে গলা ফেঁসে গিয়েছিল।

তার দাদা হাসল। ভারী সুন্দর চিকমিকে দাঁত দেখা গেল তার, যেন শ্বেতপাথরে তৈরি। বলল, তোর কোনও দিন হবে না। তোর ধৈর্য নেই। তারপর শাশ্বতীর উদ্দেশে বলল, জানেন, রাকার একদল গানের মাস্টারমশাই বাড়িতে আসেন, ওস্তাদ মানুষ, খুব নামডাক, সেই ভদ্রলোককে বসিয়ে রেখে ও বত্রিশ বার জল খেতে বাড়ির ভিতরে যায়, আর গিয়ে আমাদের সঙ্গে রাজ্যের ইয়ার্কি দিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করে আসে, ওস্তাদজি হাঁ করে বসে থাকেন।

যাঃ! বলে হেসে লুটিয়ে পড়ল রাকা, বলল, কী করব, তেষ্টা পায় কেন? মাইরি, গানের সময় আমার যত তেষ্টা, মাথা চুলকোনো, পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরা— কেমন যে করে!

গাড়িটা যখন বাঁক নিচ্ছে বড় রাস্তায় ওঠার সময়ে ঠিক তখনই আদিত্যকে ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে আসতে দেখল শাশ্বতী। হাওয়ায় রুক্ষ চুল উড়ছে, শ্রীহীন মুখখানা ধুলোটে আর কেমন তেলতেল করছে শিরা-ওঠা প্রকাণ্ড কপালখানা। জামা-কাপড়ের ভাজ নেই। উদ্‌ভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছে তাকে। বড়লোকের গাড়িতে একটি সুন্দর পুরুষমানুষের কাছাকাছি বসে চলে যেতে যেতে দৃশ্যটাকে খুব করুণ লাগল শাশ্বতীর। সে একটু চমকে উঠেছিল প্রথমটায়। সামলে নিল। আদিত্য লম্বা লম্বা পা ফেলে যাচ্ছে তারই কলেজের দিকে। গিয়ে বেচারা হতাশ হবে। কিন্তু শাশ্বতী আর ফিরে তাকাল না। কী একটা জিজ্ঞেস করছিল রাকার দাদা। অন্যমনস্ক শাশ্বতী শুনতে পায়নি। এবার ঝুঁকে বলল, উঁ! সে কিছুতেই বলতে পারল না, বলতে তার ইচ্ছে করল না যে, গাড়ি থামান। ওই চলেছে আমার প্রেমিক, আমারই খোঁজে। আমি ওর কাছে যাব। এই সুন্দর মানুষটির কাছে ওই শ্রীহীন জিরাফের মতো লোকটাকে প্রেমিক বলে পরিচয় দিতে তার লজ্জা করল।

শাশ্বতী ঠিকই দেখেছিল। সত্যিই আজ বড় কুশ্রী দেখাচ্ছিল আদিত্যকে। চলন্ত গাড়ি থেকে একপলকে শাশ্বতী তবু ভাল করে দেখেনি। দেখলে দেখতে পেত, একদিনের মধ্যেই কণ্ঠার হাড় উঁচু হয়ে গেছে তার, গাল বসে গেছে, চোখ গেছে কোটরে, দাড়ি কামানো হয়নি, স্নান হয়নি, ভাত খাওয়া হয়নি তার কাল রাত থেকে।

কাল বিকেলে শাশ্বতীর সঙ্গে সে যে অদ্ভুত ব্যবহার করেছিল সেই থেকেই মেজাজ ঠিক ছিল না। সন্ধেবেলা সে তাদের দুর্গের মতো বাড়িটিতে ফিরে প্রথম মহল পার হয়ে দ্বিতীয় মহলের সিঁড়ি বেয়ে দোতলার বারান্দায় উঠেই একটা দেড়শো বছরের পুরনো দৃশ্য দেখতে পেয়েছিল। যে-দৃশ্যটা ধনতান্ত্রিকতার নিখুঁত একটি ছবি। চিক-দেওয়া বারান্দায় পাথরের মেঝেতে পাতা ছোট্ট গালিচার আসনে চওড়া পাড়ের শাড়ি পরা মা বসে ভারী জাঁতিতে সুপুরি কাটছে। কোলের কাছে নানা রকমের খোপওয়ালা পানের বাটা, প্রতিটি খোপে রয়েছে নানান মশলা। মা’র হাতে ঝকমক করছে ভারী সোনার গয়না, পিঠের আঁচল চাবির ভারে ঝুলে আছে। আধো-ঘোমটায় ঢাকা মায়ের ঢলঢলে সুখী বোকা মুখখানা। মায়ের হাঁটুর কাছে বাবার চটিপরা পা নড়ছে। বাবা বসে আছে কাঠের জালিকাজ করা সিংহাসনের মতো দেখতে প্রকাণ্ড গদিওলা চেয়ারে, সামনে পাথরের টেবিল। টেবিলের ওপর রুপোর রেকাবে কাটা ফল, রুপোর গ্লাসে জল। পিছনে চাকর দাঁড়িয়ে খুব বড় হাতপাখায় বাতাস করছে।

দৃশ্যটা দেখে হঠাৎ আগাপাশতলা জ্বলে গেল আদিত্যর। একসময়ে কলেজ-জীবনে ললিত তাকে রাজনীতি শিখিয়েছিল। সেগুলো কোনও দিনই ভাল বোঝেনি আদিত্য। কিন্তু তার ফলে নিজেদের অবস্থার প্রতি একটা বিদ্বেষ গজিয়েছিল তার। তার ওপর রমেনকে দেখে সে শিখেছিল নিজেকে ঘেন্না করতে। সেইসব বিদ্বেষ ঘৃণা মনের কোন অন্ধকার জল ঘোলা করে তলানি থেকে উঠে এল।

সে ঘরে গিয়ে জামা-কাপড় ছাড়ল নিঃশব্দে। তারপর শুয়ে রইল বিছানায়, অন্ধকার ঘরে। সে এই পরিবারে, এই বাড়িতে জন্মেছিল বলে নিজেকে ধিক্কার দিল অনেক। বিকেলে যা ঘটেছিল তার সবটুকু বিষ উঠে এল তার গলায়। সে বুঝতে পারল, এ-বাড়ির ছেলে হয়ে লেখাপড়া শিখতে যাওয়া তার উচিত হয়নি, ঠিক হয়নি শাশ্বতীর সঙ্গে প্রেম করতে যাওয়া। তার জাত আলাদা। শাশ্বতীকে নয়, আসলে তার সন্দেহ নিজেকেই । প্রতি মুহুর্তেই ভয়, শাশ্বতীর সঙ্গে বুঝি তারে মানায় না। সবসময়ে সন্দেহ, ললিত যেন তাকে কোথায় হারিয়ে দিয়ে রেখেছে, কিংবা রমেন বুঝি জন্ম থেকেই মহাপুরুষ, যার নাগাল তার সাধ্যাতীত। এইসব সন্দেহ তাকে কুরে কুরে খায়।

শুয়ে থেকে সে এই বিষজ্বালা টের পাচ্ছিল। গলার কাছে, জিভে দাঁতে উঠে আসছে বিষ। এক্ষুনি ঢালতে হবে কোথাও। নইলে সে রাগে, বিদ্বেষে, ঘৃণায় নীল হয়ে যাবে বুঝি।

ঠিক সেই সময়েই অন্ধকার ঘরে এল মা। চুড়ি বালার ঝন শব্দ করে ঠান্ডা হাতখানা কপালে রেখে বলল, খোকা, তোর শরীরটা ভাল নেই! শরবত খেলি না যে!

অমনি ফণা তুলল আদিত্য। ছিটকে উঠে বলল, চলে যাও, চলে যাও, আমাকে ছুঁয়ো না। তোমার গায়ে বন্দকি সোনার গয়না…

তার চিৎকার শুনে বাবা বারান্দা থেকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

ফুঁসে উঠল আদিত্য। উপর্যুপরি ছোবল মারতে লাগল চারদিকে। অন্ধের মতো। কী বলেছিল তা আর আজ খেয়াল নেই তার। বোধ হয় বলেছিল, আপনি কেন লেখাপড়া শেখেননি!…কেন কোনও দিন মূল্য দেননি মানুষকে?…কেন আত্মসম্মান ভাসিয়ে খদ্দেরদের ‘বাবু’ বলে ডাকেন এখনও?…কেন আপনার জন্য বন্ধুদের কাছে আমার মুখ দেখাতে লজ্জা করবে?…

সে-সব উলটোপালটা কথার কোনও মানেও হয় না। কিন্তু তাতে অপমানের বিষটা ঠিকই ঢালতে পেরেছিল আদিত্য। তার বাবা কিছুক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইলেন তার দিকে। ফলটল তখনও খাওয়া হয়নি।

তারপর তুমুল কাণ্ড হয়েছিল অনেক। চেঁচামেচি, কান্না, শরিকির অংশ থেকে জ্ঞাতিরাও চলে এসেছিল। বাবা চটি খুলেছিলেন মারতে। বহুকাল তিনি তাঁর এই শিক্ষিত ছেলেটিকে সমীহ করে চলেছেন। কিন্তু কাল রাতে আর পারেননি।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য চটিটা ব্যবহৃত হয়নি। বাবা বলেছিলেন, তোমার সবকিছু বদহজম হয়েছে। লেখাপড়াটড়া সব। তুমি রোগগ্রস্ত, কিন্তু সেটা টের পাচ্ছো না। এখনই দূর হও এ-বাড়ি থেকে।

কাল সারা রাত আদিত্যর কেটেছে ফাঁকা আস্তাবলে। মশা আর পোকার উপদ্রবে, আর নিজস্ব হলাহলে জেগে থেকেছে সারা রাত। মাইনের টাকা মাসের দশ তারিখের মধ্যে ফুরিয়ে যায় তার। এরপর থেকে মা দেয় হাতখরচ, মাসে প্রায় তিন-চারশো টাকা। কাল পকেটেও কিছু ছিল না। গড়িয়াহাটা থেকে ট্যাক্সিতে ফিরেছিল, ফলে অবশিষ্ট ছিল দু’-তিন টাকার মতো। নইলে গতকাল রাতেই সে বেরিয়ে পড়ত। পকেটে টাকা না থাকলে সে এখনও কোথাও যেতে ভরসা পায় না।

সকালে মা এসে চুপি চুপি পাঁচশো টাকা দিয়েছে তার হাতে, বলেছে, কোথাও গিয়ে দু’-দশদিন থেকে আয়। বাবুর রাগ কমলে আবার ফিরে আসিস। বড় রেগে আছে বাবু। আমি তোর সুটকেস-টুটকেস লুকিয়ে গুছিয়ে এনে দিচ্ছি। তুই বরং নিমতেঘোলায় তোর মেজোমামার কাছে গিয়ে থেকে আয় ক’দিন। কাছেই তো…

সুটকেস আর পাঁচশো টাকা নিয়ে সকালে বেরিয়েছে আদিত্য। সুটকেসটা রেখে এসেছে এক বন্ধুর মেসে, কলেজ স্ট্রিটে। তারপর সারা দিন ঘুরছে। কলকাতা শহরটাকে এমন ধূসর মরুভূমির মতো তার আর কখনও লাগেনি। নিজেকে মনে হয়নি এমন অসহায়। আসলে, দিনের শেষে নিরাপদ আশ্রয় বাগবাজারের সেই দুর্গের মতো বাড়িখানায় আর ফিরে যেতে পারবে না, অবচেতন মনে এই চিন্তাই তাকে ভীষণ ভিতু আর অস্থির করে তুলছে। এখন কোথায় যাবে সে, কীভাবে থাকবে? সে কি পারবে নিজস্ব চাকর ছাড়া? সে কি পারবে নিজস্ব আলাদা ঘর, রোজ চাদর বদলানো বিছানা, শোওয়ার আগে এক গ্লাস দুধ ছাড়া? সে কোনও দিন চেয়ে খায় না। মা নিজে বসে তার খিদে বুঝে খাওয়ায়। নতুন জায়গায় সে কী করে চেয়ে খাবে? তা ছাড়া এক ওই বাড়ির লোকজন আর দাসদাসীরাই সহ্য করে তার উগ্র মেজাজ, তাকে তারা বোঝে, আর কেউ বুঝবে কি? নিজের সম্বন্ধে এইসব অনিশ্চয়তা তাকে আরও অস্থির করে তুলেছিল সকাল থেকে। বন্ধুর নোংরা মেসে সে এক গ্রাসও ভাত খেতে পারেনি। কলাইকরা থালা দেখে বমি উলটে এসেছিল।

আজ অফিস করেনি আদিত্য। কেবল ঘুরেছে আর ঘুরেছে। কয়েকটা বাসারও খোঁজ করেছে সে। পায়নি। কলকাতায় বোধহয় কেউ আর ঘর ভাড়া দিচ্ছে না।

দুপুরের পর শাশ্বতীর অফ-পিরিয়ডটা কখন তা তার মনে ছিল। শাশ্বতীর রুটিন তার মুখস্থ। সেই সময়েই সে এসেছিল শাশ্বতীর কাছে। পেল না। কলেজের দারোয়ান বলল, একটু আগেই শাশ্বতী চলে গেছে। এক দিদিমণির গাড়িতে।

খুব ধীরে ধীরে বড় রাস্তার মোড়ে এসে আদিত্য একটা সিগারেট ধরাল। ক্লান্ত লাগছিল খুব। গাড়িতে কোথায় গেল শাশ্বতী? এখন তাকে কাছে পেলে হয়তো একটু ভাল লাগত আদিত্যর।

আশ্চর্য এই যে, কোনওকালে কোনও অনিশ্চয়তাকে বোধ করেনি সে। বরাবর জানত সে যাই হোক, যাই করুক, তার পিছনে দুর্গের মতো বিশাল আশ্রয়টি আছে। স্বার্থপর লোভী লোকটি তার বাবা, তবু বটগাছের মতো তিনি আছেন মাথার ওপর। এখন সে তার পিছনে সেই দুর্গ আর গাছটিকে অনুভব করতে পারছিল না। শরতের বেলা পড়ে আসছে দ্রুত। একটু পরেই রাত নামারে কলকাতায়। অসহায় আদিত্য একা কোথায় যাবে!

সে ললিতের কথা একটু ভেবে দেখল। বন্ধুদের মধ্যে ললিত একমাত্র লোক যার কাছে যে-কোনও অবস্থাতেই যাওয়া যায়। গেলে দু’হাত বাড়িয়ে ‘আয়’ বলে টেনে নেবে ললিত। যাবে তার কাছে!

পরমুহুর্তেই সে আপন মনে মাথা নাড়ল। তা হয় না। কাল যা ঘটে গেছে তার পিছনের কারণ আসলে ললিতই। ললিতকে নিয়েই গণ্ডগোলটা লেগেছিল। শাশ্বতীর সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য তেতো হয়ে গেল সম্পর্ক, তারপর বাড়ির ওই ব্যাপার। সবকিছুর জন্যই ললিতকে দায়ী করা চলে। সেই কলেজ জীবনে কেন ললিত তাকে শেখাতে গিয়েছিল সাম্যবাদ! যদি না শেখাত তবে আজ সংস্কারবশতই সে তার লোভী স্বার্থপর বাবাকে একরকম করে মানিয়ে নিতে পারত। কেন বিষ ঢুকিয়েছিল ললিত?

ক্রমে অন্ধকার হয়ে এল। গড়িয়াহাট ছেড়ে অনেক দুরে একা একা ভবঘুরের মতো হাঁটল আদিত্য। হিজিবিজি চিন্তা, অনিশ্চয়তা আর ভয়ের উলটোপালটা স্রোত তার মাথার ভিতরে ঘূর্ণিঝড় তুলছে।

অবশেষে রাত আটটা নাগাদ সে হাল ছেড়ে দিল। এসপ্ল্যানেডের একটা দোকান থেকে ফোন করল বাড়িতে, বাবাকে।

বাবার স্বর ভেসে এল, সেই পুরনো চেনা সতর্ক ভারী গলাটি, হ্যালো।

আমি আদিত্য বলছি।

একটু চুপ ওধারে। তারপর, কী চাও?

আদিত্য চোখ বুজল ক্লান্তিতে, শ্বাস ফেলে বলল, আমাকে ক্ষমা করুন।

বাবার গলা হঠাৎ খুব নরম শোনাল, সারা দিন তুমি কোথায় ছিলে? আমি আজ তোমার জন্যই দুশ্চিন্তা করেছি কেবল। রাতে শুয়েছিলে কোথায়?

আদিত্য সে-সব কথার উত্তর না দিয়ে বলল, আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমাকে ফিরে আসতে দিন।

এসো, খুব তাড়াতাড়ি চলে এসো। এসে খাও, বিশ্রাম করো। আমাদের সকলেরই ভুল হয়, তাতে লজ্জার কিছু নেই। …কোথায় আছ— কোথা থেকে টেলিফোন করছ বলো, গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

না, আমিই যাচ্ছি।

ট্যাক্সি নিয়ে এসো। টাকা না থাকলে চিন্তার কিছু নেই। আমি গেটের কাছে দাঁড়াচ্ছি, তুমি এলে ট্যাক্সিভাড়া দিয়ে দেব। চলে এসো।

কথা শেষ হয়ে গেল। তবু টেলিফোন ছাড়ল না আদিত্য। ধরে রইল। ও-পাশে ধরে রইল বাবাও। কয়েক সেকেন্ড। তারা পরস্পরের ক্লান্ত শাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনল কেবল। তারপরই আদিত্য রেখে দিল টেলিফোন।

বাইরে এসে ট্যাক্সি ধরল।

ওদিকে শাশ্বতী আজ একটা নতুন ধরনের বিকেল কাটাল।

রাকাদের গাড়িটায় ওঠার পর থেকেই সে একটা মৃদু উত্তেজনা বোধ করছিল। সে উত্তেজনাটা বেড়ে গেল যখন রাকা তাদের দু’জনকে রেখে ঢুকে গেল রেডিয়ো স্টেশনে।

তখন কিছুক্ষণ লজ্জায় মুখ নত করে রইল শাশ্বতী। রাকার দাদা চুপ করে একটুক্ষণ চেয়ে রইল অন্য দিকে।

তারপর প্রথম কথা বলল রাকার দাদা, এখানেই গাড়িতে চুপচাপ বসে থাকবেন, না কি কোথাও গিয়ে একটু চা খাবেন? রাকার আসতে বেশ দেরি হবে।

শাশ্বতী একটু চুপ করে থেকে বলল, ফিফ্‌থ পিরিয়ডে আমার একটা ক্লাস ছিল। ভাবছিলাম তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে ক্লাসটা করব।

রাকার দাদা কবজির ঘড়ি দেখে বলল, ক’টায় ক্লাস?

শাশ্বতী সময়টা বলতেই রাকার দাদা মাথা নেড়ে বলল, তা হলে মোটে আধ ঘণ্টা সময় হাতে আছে। অবশ্য আপনাকে দশ মিনিটেই পৌঁছে দিতে পারি… কিন্তু, খুব ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস কি?

শাশ্বতী একটু ইতস্তত করে বলল না, তেমন কিছু নয়।

তবে চলুন, কোথাও একটু বসি।

শাশ্বতী নতমুখে লাজুক একটু হাসি হাসল কেবল।

রাকার দাদা সুমন্ত এক মিনিটও দেরি না করে ঘুরিয়ে নিল গাড়ি।

এটা কেমন যে শাশ্বতীর এখন বেশ ভাল লাগছে! কেন লাগছে? সে নিজের মনে খুঁজে দেখল, কিন্তু কোনও যৌক্তিকতা খুঁজে পেল না। না কি কেবল বাধা নিয়মের বাইরে যাওয়ার মধ্যেই এক আনন্দ আছে। এ কি অবৈধ? অবৈধ কেন হবে! সে তো আর আদিত্যর কাছে বাঁধা নয়! না কি বাঁধা! কোনও এক অদৃশ্য বন্ধন রয়ে গেছে! আদিত্যর ক্লান্ত মুখখানা চোখে এক পলকে জন্য ভেসে উঠল তার। বহু দুর থেকে এসেছিল মানুষটা, তারই খোঁজে। সে অবহেলায় চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।

সুমন্ত জিজ্ঞেস করল, গঙ্গার ধারে একটা সুন্দর চা খাওয়ার জায়গা আছে, নির্জন এখন। যাবেন?

শাশ্বতী ঘাড় নাড়ল। যাবে।

সকাল থেকেই তার মন বলছে, আজ একটা কিছু ঘটবে। সেটাই ঘটতে যাচ্ছে কি? ঘটুক, কোনও ক্ষতি নেই। আজ জীবনে এই প্রথম তার গা ভাসাতে ইচ্ছে করছে। গঙ্গার ধার ধরে যাচ্ছে গাড়ি। হাওয়ায় শাশ্বতীর আলগা বেণি থেকে কিছু চুল খুলে উড়ছে। আঁচল উড়ছে। চোখ বন্ধ করল শাশ্বতী। একটু বুঝি শরীর তলিয়ে দিল পিছন দিকে।

ওদিকে ভিড় করে জেটিতে বেঁধেছে জাহাজ। দুপুরের আকাশে তাদের ক্ষণস্থায়ী মাস্তুল দেখা যায়। গঙ্গার জলের ভাপ মুখে এসে লাগে। নৌকো স্থির হয়ে আছে মাঝ গাঙে, দুলছে বয়া। গঙ্গার ঘাট দেখলেই দূরকে মনে পড়ে। মনে পড়ে, বিদায়। প্রবল স্রোত আর তার ওপরে আকাশের দিগন্ত-প্রসার। একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে দুর দুরান্ত এসে তছনছ করে দিয়ে যায় মানুষকে। নোঙর তুলে ফেলবার সাধ জাগে মনে।

রেস্টুরেন্টে, প্রায় গঙ্গার জলের ওপর মুখোমুখি দুই চেয়ারে বসে তারা চুপ করে গঙ্গা দেখল অনেকক্ষণ। কথা বলল না।

এ-সব জায়গায় শাশ্বতীকে কেউ কখনও আনেনি। আদিত্য বড় ঘরমুখো। তার সামনে বিপুল বিস্তার আর দূর আর দূরান্তের কথা ভাবতে ভাবতে একসময়ে শাশ্বতীর সাধ হল, সে একজন নোঙরছাড়া ভবঘুরে পুরুষের সঙ্গে একদিন এইখানে আসবে। তারপর এখান থেকেই সংসার ত্যাগ করবে তারা। আর ফিরবে না।

কয়েক মুহূর্ত পর চটকা ভাঙে শাশ্বতীর। সে টের পায় যে সে এক প্রায় অচেনা পুরুষের সঙ্গে একা একটা অচেনা জায়গায় বসে আছে।

সুমন্ত কফি আর স্যান্ডউইচ আনাল। অন্য পুরুষের সামনে খেতে বড় লজ্জা করে শাশ্বতীর। কিন্তু তার স্বভাব অনুযায়ী সে তো আজ চলছে না। তাই গঙ্গার দিকে মুখ ফিরিয়ে সেই সুস্বাদু স্যান্ডউইচ খেতে ভালই লাগল তার।

সুমন্ত প্রথমে কলেজ ইত্যাদির কথা জিজ্ঞেস করল, নিজের কলেজ-জীবনের কথা বলল কিছু কিছু। জিজ্ঞেস করল, শাশ্বতী রাজনীতি করে কি না। তারপর আচমকা ভীষণ ব্যক্তিগত প্রশ্ন করল সে, আপনি কি কারও সাথে এনগেজ্‌ড?

কথাটা বুঝতে একটু সময় লাগল শাশ্বতীর। হু হু করে বাতাস বইল অনেক, ছল ছল শব্দ করল জল, দূরে বাজল জাহাজের ভোঁ। সমস্ত হাতে নুনের কৌটো নিয়ে খেলা করতে করতে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করল।

প্রশ্নটা বড় দেরিতে বুঝল শাশ্বতী। বুঝে উত্তর দিতে পারল না। মাথা নত করে রইল। রক্তের ঝাপটা লাগল মুখে।

অবশেষে সুমন্ত মাথা নিচু করে বলল, প্রশ্নটা করা আমার উচিত হয়নি। কিন্তু আমার একটা সৎ উদ্দেশ্য ছিল।

সেটা কী শাশ্বতী জানতে চাইল না। অনুমান করল মাত্র।

সুমন্ত খুব লাজুক নয়। সরাসরি অনেক কথা বলতে পারে। বলল, রাকাকে আমি মাসখানেক আগে বলে রেখেছিলাম আপনার কাছ থেকে যেন কয়েকটা কথা জেনে নেয়। তার মধ্যে এই প্রশ্নটা একটা। রাকা অবশ্য আমাকে বলেছিল যে আপনি এনগেজ্‌ড নন, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি ও না-জেনে কথাটা বলেছে। বলে হাসল সুমন্ত, রাকা বড্ড কম সিরিয়াস। কোনও ব্যাপাবেই গুরুত্ব দেয় না।

শাশ্বতী হঠাৎ, ধরা গলায় কোনওক্রমে বলল, আমি এনগেজ্‌ড এ-কথা তো বলিনি।

নন? ভীষণভাবে শরীর ঝাকিয়ে সোজা হয় সুমন্ত।

এখন কী বলবে শাশ্বতী? সে নিজেও যে বুঝতে পারছে না সত্যিই সে কারও সঙ্গে আবদ্ধ কি না!

সুমন্ত খুব সুন্দর করে হাসল। খুশির হাসি। তারপর ভরাট আত্মবিশ্বাসের গলায় বলল, তা হলে একদিন আমার প্রস্তাব যাবে আপনার কাছে। তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, অবশ্য আরও কিছু জানার থেকে গেল। আপনারও, আমারও। কিন্তু প্লিজ, দয়া করে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবেন না। যদি কিছু জানার থাকে এক্ষুনি জেনে নিন।

কিন্তু শরীর ঝিমঝিম করল শাশ্বতীর। মৃদু মদের নেশার মতো অবশ হয়ে গেল তার হাত-পা। চুপ করে বসে রইল সে। কথা বলল না।

একটু পরেই ঘড়ি দেখে সুমন্ত বলে, চলুন, যাওয়া যাক।

তারপর অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে লাগল। রাকাকে রেডিয়ো স্টেশন থেকে তুলে নিল সুমন্ত। তারপর তারা গেল খুব বড় একটা রেস্টুরেন্টে। অদ্ভুত খাবার খেল সব। অজস্র কথা বলল রাকা। সুমন্ত হাসল খুব। আর সারাক্ষণ ঝিম ঝিম করল শাশ্বতীর শরীরের ভিতরটা।

সুমন্ত হয়তো কোনও ফাঁকে, হয়তো রেডিয়ো স্টেশনেই যখন রাকাকে আনতে লবি পর্যন্ত গিয়েছিল তখনই, কিছু বলে থাকবে। তাই রাকা এক ফাঁকে শাশ্বতীর কানে কানে বলল, তুই আমার কত নম্বর বউদি জানিস তো! তিন নম্বর! এই দাদা সেজো। তুই হবি আমার সেজোবউদি।

কথাটা শুনতে মোটেই ভাল লাগল না শাশ্বতীর। কিন্তু সে চুপ করে রইল। ভাল করে আজ কিছু বলতে পারছে না। সে এখনও বুঝতে পারছে না সে খুব সুন্দরী কি না। কোনও দিন কেউ তো বলেনি যে সে খুব সুন্দর! নইলে কাল কেন ও রকম অদ্ভুত সন্দেহ করেছিল আদিত্য? বলেছিল যে তার জাত আলাদা! সকলেরই কেন এত মনোযোগ তার প্রতি? ভাবতে ভাবতে কেবলই ঘোলা হয়ে গেল মাথা।

ঘোর-ঘোর সন্ধেবেলায় বাড়ির কাছেই বড় রাস্তায় তাকে ওরা নামিয়ে দিয়ে গেল। তখন শাশ্বতী সত্যিই টলছে। রাকা গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে বলল, শিগগিরই আমরা একদিন আসছি দল বেঁধে কনে দেখতে। তৈরি থাকিস।

কত দ্রুত ঘটনা ঘটে যায়। কিছু করার থাকে না।

রাতে যখন বিছানায় শুয়ে ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখ তখন শাশ্বতী অনুভব করল তার বুক ভরতি টলটল করছে ভালবাসা-আত্মসমর্পণ। কিন্তু কে নিতে পারে সেই মহামূল্যবান? আদিত্য না, সুমন্ত না। যারা তাকে চায় তারা কেউ না। যে পুরুষ তাকে যাচ্‌ঞা করে সে কিছুতেই তার নয়। সে হবে অন্য কেউ। হয়তো সে খুব উদাসীন। হয়তো সে খুব কর্মব্যস্ত একজন।

কিন্তু সে কে যে কে জানে!

আচমকা মনে ভেসে ওঠে কয়েক মিনিটের দেখা মৃত্যুপথযাত্রী একজনের দৃঢ় ধারালো মুখ। সে-মুখ ললিতের। আহা— যে বাঁচবে না। তবু মনে পড়তেই ঘুমের মধ্যেই অন্যমনে মুখ টিপে হাসে শাশ্বতী। হাসিটুকু ঠোঁটে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%