শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
ডিটেকটিভ বই পড়তে পড়তে একদিন বারান্দায় সকাল দশটার সময়ে ঘাড় কাত করে রায়বাবু বসে আছেন। কোলের ওপর খোলা বই। ছেলের বউ স্নান করাতে নিয়ে যেতে এসে ডাকল, বাবু, উঠুন…
রায়বাবু নড়লেন না। খোলা বইয়ের পাতা ফরফর করে বাতাসে উড়তে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিড় জমে গেল রাস্তায়।
খবর পেয়ে ললিত তাড়াতাড়ি বেরোচ্ছিল, মা পিছন থেকে ডেকে বলল, মড়া ছুঁস না। তোর রোগা শরীর, সবতাতে সর্দারির দরকার কী?
বারোটা নাগাদ খাটলি, ফুল, নতুন কাপড় এসে গেল। শম্ভু, সুবল, আর কয়েকজন ছেলে রাস্তার মাঝখানে খাট সাজিয়ে ফেলল।
মড়া যখন নামানো হচ্ছে তখন মাথাটা ঝুলে লটপট করছে দেখে ভিড় থেকে এগিয়ে রমেন মাথাটা তুলে ধরে। বিশাল চেহারা ছিল রায়বাবুর। কোমরের দিকটা ধরে ঠিক তাল সামলাতে পারছিল না শম্ভু। রমেন ললিতকে ডেকে বলল, মাথাটা ধর তো এসে, আমি কোমরটা ধরি।
ললিতের ভিতরটা তখন কাঁপছ। এইভাবে—একদিন এইভাবে—
সে শূন্যচোখে চেয়ে বলে, ছোঁব?
ধর শিগগির। রমেন ধমক দেয়।
রমেন রায়বাবুর কোমর ধরতেই শম্ভু তাকে চাপা গলায় বলে, দাদা, আপনি খাটে কাঁধ দিলে কিন্তু খাট একদিকে উঠে থাকবে। আপনি যা টল।
সার্জেন্টের চাকরিতে লোকটা একনজরে সিলেক্টড হয়ে যেত। শম্ভু ভেবে দেখল।
চার বছরের নাতিটা ভয় পেয়ে কঁদছে। এ-রকম রাজকীয় সমারোহে সে দাদুকে কখনও দেখেনি। একা ভিড়ের মধ্যে দিশেহারা হয়ে সে মানুষের পায়ের ভিতরে ভিতরে রাস্তা খুঁজছিল। হঠাৎ তাকে আকাশে তুলে নিল কেউ। অবাক হয়ে সে দেখল, একটা লোক সকলের মাথার ওপরে তাকে তুলে ধরেছে। উঁচু থেকে সে তার দাদুর মুখখানা শেষবারের মতো স্পষ্ট দেখতে পেল।
বল হরি—হরি বল।
ললিত নিচু স্বরে বলল, শ্মশানে যাবি?
রমেন বলল, তুইও চল।
বিবর্ণ মুখে ললিত বলে, আমার শরীরটা—
রমেন শক্ত করে তার হাত ধরে, চল।
শ্মশানের বদ্ধ চাতালে বসে আগুনের আঁচ অসহ্য লাগছিল ললিতের। আর ওই গন্ধটা। একটু দূরে শম্ভুরা আড়াল হয়ে সিগারেট টানছে আর ঠাট্টা করছে ডোমদের সঙ্গে, কীরে ক’ বোতল বেঙ্গলি টেনেছিস?
রমেন শান্ত মুখে বসে ছিল। একটা ছোট্ট খাট নিয়ে এসেছে কয়েকজন। বাচ্চা ছেলের মড়া। রমেন ললিতকে ডেকে বলল, ওই দ্যাখ, কলেরার মড়া।
কী করে বুঝলি?
রমেন উত্তর না দিয়ে উঠে গেল। কথাবার্তা বলতে লাগল বাচ্চাটার সঙ্গের লোকজনদের সাথে।
রায়বাবুর চিতাটা ভালই ধরেছে। গুনগুন করছে আঁচ। আগুনের ভিতর থেকে এখনও অমলিন পা দুটো দেখা যায়। পা দুটো দেখছিল ললিত। ফট করে একটা শব্দ হয়ে চিতাটা নড়ল, কাঠের গিঁট ফাটল বোধ হয়। ললিত দেখল রায়বাবুর দু’খানা ফরসা পা, আগুন ছোঁয়নি এখনও, একটু নড়ে উঠল। অনভিজ্ঞ লোক দেখলে চমকে উঠত। ললিত অনভিজ্ঞ নয়, এর আগে সে দু’-চার বার মড়া পুড়িয়েছে। তবু এখন কেমন শরীরে ঘাম ছাড়ে।
ডোমদের একটা বারো-তেরো বছরের ছেলে তাকে রায়বাবুর চিতাটা দেখিয়ে কিছু একটা বলছে।
কী রে?
ওই পা দুটো। চিতা থেকে পড়ে যাবে। ভারী কাঠ চাপা দিন।
ললিত বুঝল না কী করে পা দুটো চিতা থেকে পড়বে। এখনও চিতার মধ্যেই শোয়ানো রয়েছে পা দুটো।
রায়বাবুর বড় নাতিটা শম্ভুদের দঙ্গলের মধ্যে হাঁটুতে মুখ গুঁজে আছে। সে হঠাৎ মুখ তুলে চেঁচিয়ে উঠল, বাবা।
সবুজ পাতায় ছাওয়া বীথি পথটি দিয়ে ভিতরে এসে দাঁড়িয়েছে অবনীশ। অফিসে ফোন করে ওকে পাওয়া যায়নি।পি ডব্লিউ ডি-তে কাজ করে, সাইটে গিয়েছিল। অফিসে ফিরে খবর পেয়ে সোজা শ্মশানে এসেছে। এখনও গায়ে অফিসের টিপটপ সাজপোশাক। টেরিলিনের টাই ঝুলছে গলায়। কালোর ওপর একটা লাল ত্রিভুজ। দাঁড়িয়ে টলছিল। এক্ষুণি অবনীশ পড়ে যাবে। ছায়ার মতো রমেনকে দেখা গেল তার পাশে। অবনীশ আর পড়বে না। বুঝতে পেরে নিশ্চিন্ত মনে চোখ বুজল ললিত।
শুনতে পেল কে যেন চেঁচিয়ে বলছে, পা দুটো দ্যাখ।
ললিত চোখ খুলে দেখে রায়বাবুর পা দুটো দু’খানা কাঠের মতো সোজা, আস্তে আস্তে ওপরে উঠে যাচ্ছে। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে উঠে স্থির হল। যেন ডুবন্ত মানুষের পা, জলের ওপর উঠে আছে। তারপর পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি ভেঙে আরও ওপরে উঠতে লাগল আস্তে আস্তে।
রমেন দৃশ্যটা আড়াল করে সামনে এসে দাঁড়াল। ডান পা’টা খসে গেল প্রথমে। হাঁটু থেকে পাতা পর্যন্ত অংশটা গড়িয়ে চিতার গা বেয়ে দূরে গিয়ে পড়ল। তখনও ফরসা রং গোড়ালির কড়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
বাচ্চা ছেলেটা দৃশ্যটা দেখতে পেল না, অবনীশও না। রমেন তার প্রকাণ্ড চেহারা দিয়ে দৃশ্যটা ঢেকে ফেলল।
ডোমরা বড় একটা গা করে না। কিছু একটু করতে বললেই বোতলের পয়সা চায়। রমেন ললিতকে বলল, তুই একটু আড়াল করে দাঁড়া, আমি পা-টা তুলে দিই। বাচ্চাটা নইলে ভয় পাবে।
ললিত কষ্টে দাঁড়াল। রমেন চিতার ও-পাশে গিয়ে কুড়িয়ে নিয়ে পা-খানা চিতার মধ্যে গুঁজে দিল, বাঁশ দিয়ে ভেঙে দিল অন্য পা।
মাথা ঘুরে বসে পড়ল ললিত। তারপর টক-তেতো জল বমি করতে লাগল। অনেকক্ষণ কিছু খাওয়া হয়নি। সে ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকল, রমেন!
উঁ। খুব কাছ থেকে উত্তর দিল রমেন।
তুই আমাকে এখানে আনলি কেন?
রমেন উত্তর দিল না।
দিন সাতেক বাদে বিমানের ঘরখানা খালি হয়ে গেল। তার বইগুলো নিয়ে গেল ললিত, আর বাসনপত্রগুলো বস্তায় পুরে মুখ বেঁধে রাখা হল বাড়িওয়ালার ঘরে। অপর্ণার প্রকাণ্ড মোটরগাড়িখানা বটতলায় অপেক্ষা করছিল, লাগেজ বুটের বিশাল ডালাটা খোলা। বিমানের বিছানাপত্র আর বাক্স পাড়ার লোকরাই ধরাধরি করে তুলে দিল গাড়িতে। সুবলকে ভীষণ ব্যস্ত দেখাচ্ছিল। তার মুখ লাল, চোখের পাতা বার বার নেমে আসছে, যত বার অপর্ণার দিকে তাকাচ্ছে সে।
বইয়ের র্যাক আর চৌকিটা পড়ে রইল। অপর্ণা বাড়িওয়ালার হাতে বাকি ভাড়ার টাকা দিয়ে বলল, ও-জিনিসগুলো ইচ্ছে করলে পরে যে ভাড়াটিয়া আসবে তারা ব্যবহার করতে পারে। নইলে আপনি যা খুশি করবেন।
বিমানকে মাঝখানে রেখে দু’ধারে বসল ললিত আর রমেন। স্টিয়ারিং হুইল ধরেছে অপর্ণা। গাড়ি ছাড়ার মুহূর্তে সুবল জানালা দিয়ে ঝুঁকে বলল, ললিতদা, দরকার হলে আমি সঙ্গে যেতে পারি।
অপর্ণা দাঁতে ঠোঁট কামড়াল।
ললিত মাথা নেড়ে জানাল, দরকার হবে না।
একটু হতাশা দেখা গেল সুবলের মুখে।
পাড়ার লোক ভিড় করে গাড়ি দেখছে।
দু’জনের মাঝখানে নিথর হয়ে বসে আছে বিমান। সে আজকাল আর কিছুই টের পায় না। আকাশে টইটুম্বুর তার মাথা। দিনরাত আকাশ-ডুব। তাকে খুব রোগা দেখাচ্ছিল। মাথার চুল খুব ছোট করে ছাঁটা। তালুর খানিকটা অংশ চেঁছে ফেলা হয়েছে, সেখানে একটা পুলটিস লাগানো। দুটো কোটরগত চোখ জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। আগে পাগল হয়ে গেলে শান্ত থাকত বিমান। কিন্তু এবার সে গন্ডগোল করেছে। প্রায়ই লাঠি হাতে লোকজনকে তাড়া করত। রাতে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ত। অচেনা বাড়ির দরজায় নিশুত রাতে গিয়ে কড়া নেড়ে চেঁচাত, টেলিগ্রাম… টেলিগ্রাম… শম্ভুদের জিমনাসিয়ামে গিয়ে প্যারালাল বার-এ উঠবার প্রাণপণ চেষ্টা করত মাঝে মাঝে। একদিন পেশিবহুল একটা ছেলে তাকে বের করে দেয়, তাকে ইট নিয়ে তাড়া করেছিল বিমান, বিপুল চেহারার ছেলেটি ভয়ে ছুটে পালিয়েছিল।
এখন বিমান শান্ত। কোনও অস্থিরতা নেই, কিন্তু কোটরগত দু’খানা জ্বলজ্বলে চোখ মাঝে মাঝে চারপাশে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। সে চিনতে পারছে না এরা কারা এবং কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে।
ললিতের মুখ আর ঠোঁট সাদা। বিমানের একখানা হাত কোলে টেনে নিয়ে তার ওপর হাত রেখেছে সে। ঠান্ডা সেই হাত। ঘামছে। সে কোনও একটা সান্ত্বনার কথা বলতে চাইছিল অর্ণাকে। পারছিল না।
গাড়ি চলতেই রমেন বিমানের কানের কাছে মুখ এনে ডাকল, বিমান।
বিমান নড়ল একটু, উত্তর দিল না। রমেন বিমানের উদ্ধত মাথাটা হেলিয়ে দিল সিটের পিছন দিকটায়। অমনি গলার শীর্ণতা ফুটে উঠল বিমানের, দেখা গেল কন্ঠাস্থির ওঠা-নামা। বিমান বার বার তার শুকনো মুখের বাতাস গিলছে। রমেন ওর কপালের ঘাম মুছে দিল হাতের চেটোয়। বিমান স্নান করতে চায় না, খেতে চায় না। রমেনই ওকে সব করাচ্ছে। একা। রমেনের হাতে-গালে ওঁর দাঁত আর নখের দাগ দেখা যায়।
ললিত চোখ ফিরিয়ে নেয়। সে ব্যাপারটা ঠিক চোখে দেখতে পারছিল না। অপর্ণা আর বিমানের কত সুন্দর বোঝাপড়া ছিল! এখন এই সব বিয়োগান্ত দৃশ্য সহ্য করতে পারে না। একটা গভীর শূন্যতার মধ্যে তার মনে পড়ে একদিন— খুব শিগগিরই— তাকে মরে যেতে হবে। বিমানের দিকে তাকিয়ে ওই রোগা মুরগির গলার মতো সরু আর তেলচিটে ময়লা-বসা গলা দেখে তার মনে হয় ও-রকমই একটা রুগ্ণ চেহারা নিয়ে সে মরবে।
তিন দিন আগে আদিত্যর একটা চিঠি এসেছে। সংক্ষিপ্ত চিঠি। লিখেছে— এখানে জানালা খুললেই পাহাড় দেখা যায়। একটা অদ্ভুত উপত্যকা সামনে, ছোট্ট নদী বয়ে যাচ্ছে। দেহাতিরা হেঁটে নদী পেরিয়ে হাটে যায়। কলকাতার সব ভুলে যেতে ইচ্ছে করে। উদোম মাঠে দাঁড়িয়ে যখন চারপাশটা খাঁ খাঁ করতে দেখি তখন হঠাৎ নিজেকে খুব মহৎ লাগে, মাইরি বিশ্বাস কর। একটা পিপুল গাছের নীচে চেয়ার টেনে বসে থাকি সারা দুপুর, একবারও সতীর কথা মনে পড়ে না। লোলিটা, সতীকে যদি দেখিস তবে বলিস, আমি যদি বিয়ে করতাম ওকে তবে সারা জীবন সন্দেহ করতাম। এ-রকম অদ্ভুত সম্পর্ক মানুষকে ছোট করে। আমি এখন অনেক দিন এখানে থাকব। সতীকে বলিস আমি ওকে অনেক ট্রাবল দিয়েছি। আর না। সঞ্জয়ের পেটে লাথি মেরেছিলাম, ওটা কি মরেই গেছে? মরলে পৃথিবীর মহৎ উপকার হয়েছে। কিন্তু ঠিক জানি ও মরেনি, অনেক জ্বালাবে। যদি পারিস এইখানে চলে আয়।
চিঠি পড়ে ললিতের ঠোঁট সামান্য কেঁপেছে। গলায় ঠেলা মেরেছে কান্নার ডেলা। শাশ্বতীকে ছেড়ে দিচ্ছে আদিত্য! কিন্তু তাতে কী লাভ?
অলৌকিকভাবে বেঁচে যেতে ইচ্ছে করে।
বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল ললিত। শুনতে পারছিল বিমান গুনগুন করে কথা বলছে। কখনও-সখনও হঠাৎ বিমান লাফিয়ে উঠে দরজা খুলে ছুটে বেরোনোর চেষ্টা করেছে। কখনও চিৎকার করেছে, কিন্তু আবার পরক্ষণেই নিথর হয়ে গেছে। এখন বিমান কী বলছে তা শুনতে পাচ্ছিল না ললিত।
সঞ্জয়ের মা মারা গেছে। গুরুর দশা নিয়েই এসে দু’দিন আড্ডা দিয়ে গেছে। গলায় ধড়া, হাতে কুশাসন, গালে দাড়ি আর একটোকা চুল মাথায়। কী বীভৎস শোকের চেহারা! হিন্দুত্বের ওই আর-এক দোষ। শোকটাকে বিজ্ঞাপনের মতো নিয়ে বেড়ায়। লোকে চমকে ওঠে, মন খারাপ হয়ে যায়। বরং শোকচিহ্নগুলি লুকিয়ে রাখাই ভাল, মানুষের এমনিতেই দিনে কত বার মৃত্যুর কথা মনে পড়ে।
অপর্ণা—রোগা ফরসা মেয়েটা—সুন্দর গাড়ি চালায়। এত বড় গাড়ি কী অনায়াসে চালিয়ে নিচ্ছে! ওর মনের অবস্থা কী তা ললিত বোঝে। তবু ওপরের দাঁতে ঠোঁট কামড়ে মাঝে মাঝে উড়ন্ত চুল চোখের ওপর থেকে সরিয়ে নিয়ে দুটো সহজ হাতে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সামনেই রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মহামহিম এক ল্যাংটা পাগল, হাতে লাঠি, ললিত চোখ বুজে ফেলে লজ্জায়। গাড়ির গতি ধীর হয়ে যায়। ললিত টের পায় গাড়িটা বেঁকে পাশ কাটিয়ে নিল। পাগলটা রাস্তা ছাড়ল না। পাগল কত বেড়ে গেছে আজকাল। হঠাৎ হঠাৎ খেপে যাচ্ছে মানুষ। বিড়বিড় করছে হঠাৎ। মাঝরাতে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ছে রাস্তায়, গায়ের জামা-কাপড় খুলে ফেলে দিচ্ছে। পাকিস্তান হওয়ার পরই এটা বেড়ে গেছে খুব। গতবারের আগের বার পুজোয় বন্ধুরা সব বেড়াতে গেল বাইরে। ললিত মাকে একা রেখে যেতে পারে না কোথাও। তাই সে রাস্তায় ঘুরে-টুরে সময় কাটাত। সেই সময় একদিন ভবানীপুরের ফুটপাথে প্রচণ্ড ভিড়ের ভিতরে একটা লোকের চোখে চোখ আটকে গেল। লাল আঁজি-আঁজি জ্বলজ্বলে পাগলের চোখ। লোকটা হঠাৎ তার দিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে বলল, তুমি। হঠাৎ গুড়গুড় করে উঠেছিল ললিতের বুক। আমি! আমি কী! আমি কী! এক রাস্তা ভিড়ের মধ্যে অচেনা লোকটা তার শীর্ণ হাত তুলে তাকে চিহ্নিত করছে। থরথর করে কাঁপছে তার আঙুল, লক্ষ লোকের মাঝখানে সে ললিতকেই কিছু বলতে চাইছে, তুমি। হঠাৎ ও-রকমভাবে কেউ ‘তুমি’ বলে চেঁচিয়ে উঠলে যে কেউ টলে যায়। নিজেকে আজন্ম পাতি পাতি করে খুঁজে দেখতে ইচ্ছে করে। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, আমি কী করেছি! কী করেছি! ললিতের ঠিক তাই হয়েছিল। সেই পাগলটা কেন তাকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে বলেছিল, তুমি? হয়তো সে একটা কিছু দেখেছিল যা অন্য কেউ লক্ষ করেনি। সে হয়তো লক্ষ করেছিল ললিতের অসংগতি। হয়তো কোনও ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা। কিংবা হয়তো সৌভাগ্যসূচক কিছু। আলটপকা বড় নাড়া খেয়েছিল ললিত। পরমুহূর্তেই সে স্বাভাবিক হয়ে হেঁটে চলে গিয়েছিল ভিড়ের মধ্যে। আশ্চর্য, সেই ঘটনার পর দু’বছরও কাটেনি, তার ক্যান্সার হল।
কোনও যোগাযোগ নেই, তবু আবছাভাবে মনে হয় যোগাযোগ আছে। পাগলটা হয়তো তাকে সাবধান করেছিল।
বিমান গুনগুন করে কথা বলছে। মুখ ফিরিয়ে ললিত দেখল রমেন নিবিষ্টভাবে বিমানের কথা শোনার চেষ্টা করছে।
কী শুনছিস?
রমেন আস্তে বলল, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
ললিত বিমানের দিকে ঝুঁকে বসল। কথাগুলো ঠিক বোঝা যায় না। অসংলগ্ন। মনে হয় বুঝি বা কোনও কবিতার লাইন।
কতোবার গিয়েছি যে ব্যাবিলনে, স্বপ্নের উদ্যানে…কতোবার গিয়েছি যে…
রমেন হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠে সোজা হয়। তারপর অপর্ণার দিকে মুখ বাড়িয়ে বলে, আপনি পারবেন না। গাড়ি টাল খাচ্ছে, অ্যাকসিডেন্ট হবে।
অপর্ণা মুখ ফেরায়। মুখখানা অল্প লাল, উত্তেজিত। চোখ টলটল করছে। একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, ঠিক ব্যালান্স থাকছে না।
গাড়ি থামান।
থামিয়ে?
আমি চালাব।
অপর্ণা একটু থমকে বলে, লাইসেন্স আছে?
রমেন হাসে, ছিল। কিন্তু ভয়ের কিছু নেই। আমি চালিয়ে নিতে পারব।
অপর্ণা জিওলজিক্যাল সার্ভের উলটো দিকে গাড়ি দাঁড় করিয়ে সরে বসল। রমেন গিয়ে ধরল হুইল। সামান্য হাঁফাচ্ছিল অপর্ণা। বলল, সার্কুলার রোডের লাল বাতি আমার নজরেই পড়েনি। দিব্যি পার হয়ে এলাম। পুলিশ বোধ হয় নম্বর টুকে নিয়েছে।
ললিত দশ বছর পর গাড়ি চালাতে দেখছে রমেনকে। দশ বছর আগে পুরনো ঝরঝৱে অস্টিন গাড়িটা যখন চালাত রমেন তখন তারা আশেপাশে আর পিছনে বসত। রমেন নিয়ে যেত শহরের বাইরে। কত বার গাড়ি চালানো শেখার চেষ্টা করেছে ললিত, ঠিকমতো পারেনি। একসঙ্গে এতগুলো যন্ত্র সামলাতে হয় যে তাল থাকে না। রমেন বিরক্ত হয়ে বলত, যন্ত্রপাতির মধ্যে তোর মনোযোগ নেই।
হঠাৎ ললিত আর-একটা ব্যাপার লক্ষ করে মনে মনে হেসে উঠল। সামনের সিটে ওরা দু’জন। রমেন—প্রাক্তন জমিদার আর অপর্ণা— কারখানা মালিকের মেয়ে। পিছনে সে স্কুলমাস্টার, আর বিমান—কর্পোরেশনের জমাদারবাবু। ঘটনাচক্রে দুটো শ্রেণী আলাদা আলাদা জোট বেঁধেছে।
দক্ষিণেশ্বরের কাছে মানসিক হাসপাতাল। খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গা। সামনের দিকে একটু বাগান আছে। ললিত ভিতরে গেল না। গাড়ি থেকে নেমে বাগানের মধ্যে বেড়াতে লাগল। বিমানকে ধরে ধরে নিয়ে গেল রমেন, পিছনে অপর্ণা নত মুখে। দৃশ্যটা এত খারাপ লাগছিল ললিতের! একটু পরে দু’জন লোক এসে গাড়ির লাগেজবুট খুলে বিমানের বাক্স-বিছানা নিয়ে গেল। হাসপাতালে বাক্স-বিছানা রাখতে দেয় কি না কে জানে! হয়তো মানসিক হাসপাতালের ব্যবস্থা আলাদা, নয়তো রমেন আর অপর্ণা বন্দোবস্তটা করিয়ে নিয়েছে। ওগুলো কোথাও রাখার জায়গা ছিল না।
ওদের ফিরে আসতে অনেক সময় লাগল। যখন বারান্দায় তিনটে সিঁড়ি ভেঙে এরা দু’জন, অপর্ণা আর রমেন নেমে আসছিল, তখনই হঠাৎ বিমানের জন্য সত্যিকারের একটা কষ্ট টের পাচ্ছিল ললিত। সেরে উঠতে বিমানের কত দিন লাগবে কে জানে! তত দিনে ললিত কোথায়?
ফেরার সময়েও গাড়ি চালাচ্ছিল রমেন। রমেনের পাশে ললিত। পিছনে অপর্ণা।
এক সময়ে অপর্ণা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ওরা যত্ন নেবে তো?
রমেন মুখ না ফিরিয়ে বলল, নেবে। ওরা আমার অনেক দিনের চেনা লোক।
অপর্ণা দাঁতে রুমাল কাটল। তারপর আচমকা বলল, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
ললিত ভয়ংকর চমকে উঠে ফিরে বলল, সে কী?
অপর্ণা মাথা নুইয়ে চুপ করে রইল একটুক্ষণ, যেন কাঁদবে। কাঁদল না। ম্লান মুখখানা তুলে বলল, বাবা সেদিন আমাকে ডেকে বললেন, অর্পণা, তুমি বুঝতে পারছ না আমার শরীরের অবস্থা। কিন্তু ডাক্তার কাজকর্ম চলাফেরা একদম বারণ করে দিয়েছে। এখন আমার এত সব কে দেখে! আমি ইঙ্গিতটা ধরতে পারলাম। উত্তর দিইনি। কিন্তু বাবা খুব কনসিডারেট, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার যদি পছন্দ মতো কেউ থাকে তো বলো আমি তার সঙ্গেই বিয়ে দেব। কিন্তু তাড়াতাড়ি বিয়ে, উইদিন এ মান্থ। জামাইকে আমার ছেলে হয়ে সব দেখতে হবে।
আপনি কী বললেন?
অপর্ণা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, আমি কিছু বললাম না।
কেন?
ও তো বাবার ছেলে হতে পারত না!
তাতে কী আসে যায়!
অপর্ণা একটু হাসল। তারপর বলল, কী জানি! আমি তো তবু রাজি ছিলাম। কিন্তু ও সেদিন আমাকে বলল, আমি তোমাকে নিয়ে কী করব? তোমাকে খাওয়ানোর সাধ্য আমার নেই। তা ছাড়া আমি বিয়ে করব কেন, আমি কি সুস্থ? আমার সন্তান যে মাথার দোষ নিয়ে জন্মাবে না তার গ্যারান্টি কী? আমার ঠাকুমা পাগল ছিল। আমাদের সমাজ যদি মানুষ সম্পর্কে সচেতন হত তা হলে আইনত আমার মতো মানুষকে বিয়ের অযোগ্য বলে ঘোষণা করে দিত। সমাজ যখন তা করছে না তখন দায়িত্ব আমারই।
ললিত ভীষণ চঞ্চল হয়ে বলল, কিন্তু আপনি তো ইচ্ছে করলে একা থাকতে পারেন!
অপর্ণা আবার নতমুখ হয়ে যায়। সম্ভবত নিজের ত্যাগের অভাবের কথা ভাবে। তারপর বলে, সেটা করা যায় না যে তা নয়। কিন্তু কীসের আশায়! কেন?
কোনও যুক্তিপূর্ণ কথা খুঁজে পায় না ললিত, তবু আবেগ থেকে বলে, একজনের কাছে আপনি বাঁধা আছেন।
আপনাকে তো বলেছি আমি ভীষণ দুর্বল, আর ভিতু। একা আমি অত বড় কারখানা চালাতে পারব না। কর্মচারীদের আমি ভয় পাই। তা ছাড়া ওই যে ছেলেটা আপনাদের পাড়ার, ভীষণ ডেসপারেট, আজও বার বার আমার গা ঘেঁষে দাড়াচ্ছিল, ও-রকম সব ছেলের হাত থেকে কে আমাকে বাঁচাবে?
বড় রেগে গিয়েছিল ললিত। উত্তেজনার মাথায় বলে ফেলল, ভগবান বাঁচাবেন।
বলেই লজ্জা পেল।
খুব অবাক হল অপর্ণা। বলল, ভগবান! আপনি ভগবানের কথা বলছেন?
ইয়াঃ! বলে হেসে ফেলল ললিত। বলল, অত ভয় পেলে কি চলে?
অপর্ণা মাথা নাড়ল, আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম ওর মাথা পুরোপুরি ভাল হওয়া মুশকিল। র্যাডিক্যাল কিওর নেই। থাকলে আমি চেষ্টা করতাম। অথচ বিয়েটা বাবার দিক থেকে সত্যিই প্রয়োজন।
ললিত চুপ করে থাকে।
রমেন মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনাকে কোথায় পৌঁছে দেব?
অপর্ণা বলে, পরাশর রোড। ওখানে এক বন্ধুর বাসায় যাব। মাকে বলে এসেছি রাত্রে খাওয়ার নিমন্ত্রণ আছে।
পরাশর রোড়ে একটা বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই কলস্বরা একটি মেয়ে ছুটে এল। অপর্ণা তখন নামছে, তার হাত ধরে ভীষণ উত্তেজিত চাপা গলায় হাসতে হাসতে বলল, মাসিমা একটু আগে ফোনে তোর খোঁজ করছিলেন, ড্রাইভার নিয়ে বেরোসনি বলে চিন্তা। আমি বলেছি তুই আর-এক বন্ধুর বাড়িতে একটু গেছিস, এক্ষুনি এসে পড়বি। ইস, সেই থেকে দরজায় দাঁড়িয়ে আছি।
অপর্ণা মৃদু হেসে রমেনের দিকে ফিরে বলল, গাড়িটা আমার এখন দরকার নেই, আমি তো সেই দু’ ঘণ্টা পরে বাড়ি ফিরব। আপনি বরং ললিতবাবুকে পোঁছে দিয়ে আসতে পারেন। ওঁর তো শরীর খারাপ।
রমেন ললিতকে একটু চোখ টিপল। তারপর অপর্ণাকে বলল, সেই ভাল, চল রে ললিত।
বলে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল রমেন।
গাড়ি ছাড়তেই ললিত বলল, তুই আবার গাড়ির ঝামেলাটা ঘাড়ে নিলি কেন! আবার তো তোকে ফিরতে হবে। বেশ তো দু’জন নির্ঝঞ্ঝাটে কেটে পড়তাম।
রমেন মৃদুস্বরে বলল, গাড়ি চালানোর একটা নেশা আছে। কতকাল চালাই না! আর কী ভাল গাড়ি দেখছিস! বুইকের হাল-মডেল।
ললিত ঝেঁঝে উঠল, দূর।
রমেন একটু চুপ করে থেকে বলল, মেয়েটা বোধ হয় আমাকে কিছু একটা বলতে চায়। হয়তো একা বলবে। তাই গাড়িটা দিল, যাতে আমি ফিরে আসি।
আমার সামনে বলতে দোষ কী ছিল?
রমেন উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ নিঃশব্দে গাড়ি চালাল রমেন। ময়দানের কাছাকাছি এসে পড়ল।
ললিত বলল, খামোখা পেট্রল পোড়াচ্ছিস!
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ছাড়িয়ে গিয়ে নির্জন রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করাল রমেন। আয়, ড্রাইভিং সিটে বোস।
আমি! দূর, আমি ও-সব পারব না। শেখার বয়স চলে গেছে।
আয় না।
দূর, অন্যের গাড়ি, কোথায় চোটফোট লেগে যাবে।
কিন্তু রমেন ছাড়ল না।
ললিত বসল ড্রাইভিং সিটে। অনেকদিন আগে একটু-আধটু শিখেছিল। শিখিয়েছিল রমেন। রমেন তাকে আবার সব বুঝিয়ে দিল। তারপর বলল, চালা।
স্টার্ট দিতেই গাড়ি লাফিয়ে উঠল।
রমেন আস্তে করে বলল, তাড়াহুড়ো নেই। আস্তে চালা।
যন্ত্রপাতিগুলো ধীরে ধীরে অধিকার করে নিচ্ছিল ললিতকে। তীব্র উত্তেজনা বোধ করছিল সে। প্রথমটায় গাড়ি একটু এঁকেবেঁকে যাচ্ছিল, পিছন থেকে সাঁ সাঁ করে গাড়িগুলো তাদের পেরিয়ে যাচ্ছিল। ভয় করছিল ললিতের, যদি ধাক্কা লাগে! রমেন একটা হাতে ধরে রেখেছিল স্টিয়ারিং।
আস্তে আস্তে রোখ আর সাহস বেড়ে যাচ্ছিল ললিতের। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সে একটু লালচে মুখে প্রবল মনোযোগের সঙ্গে একাই গাড়িটা চালিয়ে নিচ্ছিল ময়দানের নির্জন রাস্তায় রাস্তায়। পাশে একটু ঘাড় হেলিয়ে চোখ বুজে বসে আছে রমেন, যেন ঘুমোচ্ছে। একবারও সাবধান করছে না ললিতকে।
সাহস বাড়ছিল। উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছিল।
চাপা গলায় সে বলল, রমেন!
উঁ।
ওই যে সামনে একটা ছোট গাড়ি যাচ্ছে, দ্যাখ ওটাকে ওভারটেক করছি।
কর দেখি।
ললিত করল। গাড়িটা চালাচ্ছিল একটা মেয়ে। এক ঝলক সে প্রকাণ্ড বুইকটার দিকে ঈর্ষার চোখে তাকাল। ভীষণ একটা আনন্দ পেল ললিত। এই দেখো আমি ললিত, কত বড় আর দামি একখানা গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
তারপরেই একটু হতাশা আসে। গাড়িটা তার নয়।
ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষণ চক্কর দিল ললিত। সমস্ত মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে সে গাড়ি চালাচ্ছিল। অখণ্ড মনোযোগে।
বোজা চোখে রমেন একটু হাসল।
রমেন!
উঁ।
এবার ফিরি। তুই চালা এবার। ভিড়ের রাস্তায় আমি তো পারব না।
দূর। ভবানীপুর পর্যন্ত তুই চালা৷ তারপর আমি দেখব।
আশ্চর্য এই, ললিত অনায়াসে ভবানীপুর পর্যন্ত চলে এল। অসুবিধে হচ্ছিল না তা নয়। কিন্তু খুব মনোযোগ দিয়ে সে চালাচ্ছিল। ভুল করছিল না।
এলগিন রোডের কাছে গাড়ি থামিয়ে জায়গা বদল করার সময় রমেন চাপা গলায় বলল, সাবাস।
বাচ্চা ছেলের মতো লাজুক হাসল ললিত। তার কপালে ঘাম। হাত-পা কাঁপছে। অনেক—অনেক দিন বাদে আজ সত্যিকারের একটা আনন্দকে সে টের পাচ্ছিল। একটা ছোট্ট সাফল্যের অনাবিল আনন্দ। আমি সব পারি।
প্রতি দিন লক্ষ লক্ষ লোক গাড়ি চালায় যন্ত্রের মতো নির্ভুলভাবে। তারা হয়তো কোনও দিনই ললিতের এই আনন্দকে টের পায় না। একমাত্র ললিত জানে কেন এই আনন্দ।
রাত সাড়ে আটটায় অপর্ণাকে পৌঁছে দিচ্ছিল রমেন।
সারাক্ষণ তেমন কোনও কথা হল না।
শুধু একবার অপর্ণা প্রবল ক্ষোভের সঙ্গে বলল, এখন লোকে আমাকে খারাপ ভাববে। আমি সারা জীবন একজনকে ভালবাসলাম, কিন্তু বিয়ে করছি আর একজনকে। কিন্তু আমি সত্যিই তা চাই না। জানেন! যদি কেউ একজন আমার ভার নিত, যার টাকা পয়সা কিংবা মেয়েমানুষের জন্য একটুও দুর্বলতা নেই তবে কত ভাল হত। কিন্তু সেরকম বোধহয় কেউ নেই, না?
রমেন উত্তর দিল, আছে। বিমান।
অপর্ণা জিজ্ঞেস করে, আপনি—আপনি আমাকে কী করতে বলেন?
আধো-অন্ধকারে রমেন হঠাৎ অপর্ণার দিকে একপলক তাকাল।
ভীষণ চমকে উঠল অপর্ণা। তার মনে হল এ-লোকটা জানে যে অপর্ণা আসলে সেই ছেলেবেলার বয়ঃসন্ধিতে কবে যেন বিমানকে ভালবেসেছিল। তারপর ভালবেসেছিল সেই স্মৃতিকে। তারপর কখনও সে ভালবেসেছে অকিঞ্চনকে ভালবাসার মধ্যে তার নিজের যে মহং আত্মত্যাগ আছে, তাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার কোনওটাই বিমান নয়। যে-বিমান কর্পোরেশনের জমাদারদের বাবু, যে মাঝে মাঝে পাগল হয়ে যায়, তাকে সঠিক কবে ভালবেসেছে অপর্ণা?
এ-লোকটা বোধহয় জানে সব। বুঝতে পারে। তাই সে সারা রাস্তায় আর কথা বলল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন