পঞ্চম অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পাঁচ

ললিত প্রথম ফোন করল মানস নামে একটি ছেলেকে তার অফিসে। বড়পিসির পাশের বাসায় থাকে ছেলেটি। ললিত যে হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছে সে-খবরটা পিসিকে দিয়ে দেবে।

দ্বিতীয় ফোন করল আদিত্যকে। তাকে পাওয়া গেল না। কোনও দিন পাওয়া যায়ও না। বরাবর তার পাশের টেবিলের কালীনাথ উঠে এসে ফোন ধরে, আর সেই একই কথা বলে, না, উনি তো টেবিলে নেই, সকাল থেকেই দেখছি না।…না, না, এসেছেন দেখছি, এসেই তারপর… আপনার নামটা বলুন, বলে দেব।

আজও নাম বলল ললিত।

কালীনাথ পরিচয়ের হাসি হাসল, ওঃ হোঃ, আপনি! অনেক দিন আর ফোন করেননি তো আদিত্যবাবুকে। কেমন আছেন?

ইতস্তত না করেই ললিত বলল, ভাল। আপনি?

এই চলছে।

ওকে বলবেন যেন বিকেলে আমার বাসায় আসে।

বিকেলে! একটু চিন্তিত শোনাল কালীনাথের গলা, আমাদের একটা মিটিং আছে আজ, ময়দানে। আচ্ছা, ঠিক আছে, বলে দেব।

আদিত্য কি মিটিংয়ে যাচ্ছে?

কালীনাথ হাসে, যেতে চায় না তো কখনও। আজ জোর করে নিয়ে যেতুম। আপনাদের কি জরুরি দরকার?

ললিত একটু ভেবে বলল, খুব জরুরি নয়। আমার একটা অসুখ হয়েছিল, আদিত্য জানে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছি, একটু খবরটা দেবেন। দেখা হলে ভাল হত, কিন্তু সে কাল হলেও হবে।

আপনার কী অসুখ হয়েছিল?

ও পেটের একটা ব্যাপার।

পেট! পেট নিয়ে আমিও ভুগছি। আমারটা ক্রনিক। আপনার কী হয়েছিল?

আমারটাও ক্রনিক। সারবে না মনে হচ্ছে।

আলসার?

ও-রকমই। আচ্ছা, আদিত্যকে বলবেন।

আচ্ছা। বাংলাদেশটা মশাই পেটের জন্য গেল। আপনি একটা কাজ করবেন, বুঝবেন। কাঁচা পেঁপে আর থানকুনির ঝোল খাবেন রোজ, আর সকালে উঠে এক গ্লাস জলে আস্ত একটা কাগজি লেবুর রস, জলটা খুব খাবেন। কলের জল নয় কিন্তু, কলকাতার কলের জল পয়জন, টিউবওয়েলের জল খাবেন, বুঝলেন!

আচ্ছা। বলে ফোন রাখল ললিত। কালীনাথের ছোটখাটো বোগা ক্ষয়া কালো চেহারা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল সে। তার ওপর কালীনাথ একটা ঝকঝকে রোল্ডগোল্ডের ফ্রেমের চশমা পরে, আর বারো মাস ধুতি আর সাদা শার্ট। রোল্ডগোল্ডের ফ্রেমের চশমা পরলে যে-কোনও লোকেরই দু’-দশ বছর বয়স বেড়ে যায়। আর ওই সাদা পোশাক বারো মাস! ভয়ংকর একঘেয়ে। কালীনাথের সঙ্গে রোজ অনেকক্ষণ কাটাতে হলে যে-কোনও লোকেরই মানসিক ক্লান্তি আসতে পারে। কে জানে আদিত্য কালীনাথের পাশের টেবিলে বসতে হয় বলেই টেবিল-ছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়ায় কিনা! তা ছাড়া তার পেটের অসুখের গল্পগুলোও আদিত্যর সহ্য না হওয়ারই কথা।

তৃতীয় কোনটা ললিত করল সঞ্জয়কে।

ফোন রেখে আপনমনে একটু হাসল ললিত। সঞ্জয়! তার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সুখী আর সচ্ছল সঞ্জয়। সবচেয়ে কম লেখাপড়া জানা। সেটা অবশ্য বোঝা যায় না, তুখোড় ইংরিজি বলতে পারে সে, হালফিল দুনিয়ার খবর রাখে। আর আছে একরোখা স্বভাব। অনেক দিন আগে একবার তারা পাঁচ-সাতজন বন্ধু ফুটবলের একটা চ্যারিটি খেলা দেখতে গিয়েছিল। পরের দিন খেলা, তারা আগের দিন রাতে খাওয়ার পর গিয়ে লাইন দিয়েছিল। রাতে বৃষ্টিতে ভিজেছিল তারা, দুটো ছাতা আর দুটো গাছের ডাল মাটিতে পুঁতে ওপরে চাদর টাঙিয়ে তার তলায় বসে টর্চ জ্বেলে তাস খেলেছিল, অশ্লীল গল্প করেছিল, গান গেয়েছিল। তখনও তাদের আগে মাত্র কুড়িজনের মতো লোক ছিল লাইনে, সারা রাতে তাদের সঙ্গেও হয়েছিল বন্ধুত্ব আর পরস্পরের সিগারেট কিংবা জলের বোতলের জল খাওয়া-খাওয়ি। পরদিন বেলা বাড়ছিল আর সামনের লাইনের লোকসংখ্যাও ক্রমে ক্রমে কীভাবে যে বেড়ে যাচ্ছিল! কুড়ির জায়গায় যখন প্রায় তিনশো লোকের পিছনে পড়ে গেল তারা তখন বুঝতে পারল সামনের লোকেরা জায়গা বিক্রি করছে। আট আনায় এক টাকায়। ক্রমে সে রেটও বাড়ছিল। যারা জায়গা বিক্রি করছে তাদের ফোটো আগের দিন তুলে নিয়ে গেছে খবরের কাগজের লোকেরা, নাম পরিচয় লিখে নিয়ে গেছে। কাগজে ছাপবে, এঁরা কত বড় ধৈর্যশীল। বস্তুত ধৈর্যটা যে কেন তা কেউ জানে না। ধৈর্য টাকা এনে দেয়। সঞ্জয়কেও দিয়েছে। ঘোড়সওয়ার পুলিশ যখন এল তখন তাদের একটা লাইনের জায়গায় চার-পাঁচটা লাইন তৈরি হয়ে গেছে, কোনটা আসল কে বলবে। সেই সব লাইন ভেঙে একটা লাইন করার জন্য পুলিশ ঘোড়া চালাল, আর তখন কোথা থেকে যে কোথায় চলে গেল তারা! ধূ ধূ দূরে সরে গেল মাঠে ঢোকার গেট, হাজার লোক এসে গেল তাদের সামনে। ফিরে আসা ছাড়া উপায় ছিল না, লাভও নয়। কিন্তু সঞ্জয় কেবল তার না-খাওয়া না-ঘুমোনো চোয়াড়ে মুখ শক্ত রেখে বলল, তোরা যা, আমি খেলার শেষে ফিরব। তাই ফিরেছিল সঞ্জয়, খেলা দেখেই। কী করে যে কে জানে। জিজ্ঞেস করলে সে শুধু বলেছিল, কেউ কখনও দয়া করে আমাকে কিছু দেয়নি। তা ঠিক! ললিত জানে। ধৈর্য, সম্ভবত ধৈর্যই সঞ্জয়কে সবই দিয়েছে, আর ওই লেগে থাকার ক্ষমতা। একটা সময় ছিল, বা এক-একটা সময় আসে যখন সঞ্জয়কে নিজের থেকে নিচু মনে হয় ললিতের, সেটা ওর লেখাপড়ার অভাবের জন্যই। মনে হয় চেষ্টা করলে, সামান্য একটু উদ্যোগী হলেই ও-রকম বা ওর চেয়ে উঁচু জায়গায় পৌঁছে যাওয়া যেত।

কিন্তু যাওয়া যায়নি। এম এ পাশ করার পর সহজেই স্কুলের চাকরিটা পাওয়া গেল। আপাতত এটাই করা যাক, যতদিন বড় সুযোগ না আসছে, এ-কথা ভেবে চাকরি নিল ললিত। তারপর সাত বছর রয়ে গেল স্কুলে, বড় সুযোগ আর এল না। না, ভেবে দেখলে কোনও দিনই খুব একটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না ললিতের, সেই ছেলেবেলা থেকেই নয়। পরীক্ষার খাতায় পাশ নম্বর ওঠার মতো লেখা হয়ে গেলে তার আর লিখতে ইচ্ছে করেনি কোনও দিন। অনর্থক মনে হত। তাই এই স্কুল ছেড়ে পড়াটাও তার বরাবর পণ্ডশ্রম মনে হয়েছে। অনেক ছুটি, স্ট্রাইক, ফাঁকি এবং কামাইয়ের স্বাদ পেয়ে ক্রমে আরও অলস, উদ্যমহীন এবং আড্ডাবাজ হয়ে গেছে সে, দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত কী করে লোকে চাকরি করে তা ভাবতেও সে শিউরে ওঠে। তাই মাঝে মাঝে সঞ্জয়ের শ্রমটাকেও পণ্ডশ্রম মনে হয় ললিতের। কিন্তু কখনও রাস্তার শো-কেসে দামি জিনিস দেখলে, কিংবা বন্ধুরা খুব দূরে বেড়াতে যাচ্ছে শুনলে, বা মা মাঝে মাঝে তাকে বাড়ি তৈরি করার কথা বললে তার মনে হয়, টাকা থাকলে মন্দ হত না। অনেক অপব্যয় অন্তত করা যেত। কিংবা সমাজের খুব উঁচু একটা জায়গায় পৌঁছুলে ক্ষতি কী ছিল। সে মাঝে মাঝে ভেবে দেখে, কখনও কিছু হওয়ার জন্য সে চেষ্টা করেনি, কিন্তু চেষ্টা করলে সে কি পারত?

আপনমনে মাথা নাড়ল ললিত। না, পারত না। বড় হওয়ার অনেক ঝামেলা। নির্ঝঞ্ঝাটে সে বেশ আছে। তা ছাড়া ভেবে দেখলে এ-রকমই সবচেয়ে ভাল হয়েছে। সে আর-একটু পয়সাওলা হলে, এমনকী অধ্যাপক হলেও সম্ভবত এতদিনে সে বিয়েটিয়ে করে ফেলত। কে জানে, বাচ্চাও হত হয়তো। তখন?

স্কুল থেকে বেরিয়ে আসার মুখে অঙ্কের সতীশ হালদার ধরল তাকে। একটা ফর্ম বাড়িয়ে দিয়ে বলল, একটা লটারির টিকিট কিনুন।

ললিত হাসল, কত প্রাইজ?

এক লাখ দশ হাজার।

দ্যুৎ ওটুকুতে আমার কী হবে?

অন্তত সিগারেটের খরচটা চলে যাবে তো? মাত্র তো একটা টাকার টিকিট। লিখুন।

এটা সতীশ হালদারের সাইড বিজনেস, বোধহয় কুড়ি টিকিটে টাকা ছয়েক লাভ থাকে তার। ললিত অবহেলায় তার নাম লিখল।

সতীশ হালদার ফর্মটা নিয়ে নম্‌-ডিপ্লুমটা দেখে হাসল, কোনও মেয়ের নাম?

হ্যাঁ

বেশ ঘরোয়া নাম। মিনু।

টাকাটা পেলে মিনুকেই দিয়ে দেওয়া যাবে। না, পুরোটা মিনুকে নয়। অর্ধেকটা মা’র। তারপর ভেবে দেখল ললিত, দূর! অর্ধেক দিয়েই বা মিনু কী করবে; তার অনেক আছে, হয়তো নেবেই না তার লটারির টাকা। সে সতীশ হালদারকে ডেকে বলল, নামটা পালটাব।

কী লিখবেন?

একটু ভেবে ললিত বলল, ধৈর্য। পেশেন্স।

সতীশ হালদার লিখে নিল। তারপর হেসে বলল, লোকে নাম নিয়ে ভাবে। আসলে নামে কিছু যায় আসে না। যে-কোনও নামেই পাওয়া যায়, ভাগ্যে থাকলে।

চলে আসতে আসতে হঠাৎ ললিতের মনে হল সতীশ হালদার তার অসুখের খবর জানে তো! জানলে ললিতকে এ-রকম টিকিট বিক্রি করাটা কি ঠিক হয়েছে তার?

দুপুরে খাওয়ার পর মাকে ডেকে ললিত বলল, আমি যখন থাকি না তখন তুমি সারা দুপুর কী করো মা?

কী আর! এই এ-বাড়ি ও-বাড়ি সে-বাড়ি একটু যাই, কি ওরাই আসে আমার বাড়ি, লুডো কি তাস টাস একটু খেলা হয়, পাঁচটা কথা এসে পড়ে। কোনও দিন হয়তো বা একটু ঘুমোই।

তুমি খুব আড্ডাবাজ, না?

কেমন ছেলের মা, একটু হব না?

ও! তা হলে তোমার কাছ থেকেই আড্ডার স্বভাবটা পেয়েছি আমি! বাবার কাছ থেকে নয়।

মা হাসে, তোদের বংশই আড্ডাবাজদের বংশ। বসে খেতে পারলে আর কিছু করতে চাইবে না। ভাশুরঠাকুরকেও দেখতুম…

পুরনো কথা এসে পড়ার আগেই ললিত বলল, তোমার লুডোটা বের করো তো! পর পর কয়েক গেম হারিয়ে দিই তোমাকে!

খেলবি! একটু অবাক হয় মা।

হুঁ। মা, তুমি কি এ-পাড়ার লুডো-চ্যাম্পিয়ন?

শিশুর মতো হাসে মা, আমার হাতে খুব দান পড়ে, জানিস!

সত্যি! তবে আজ তোমার চ্যাম্পিয়নি কেড়ে নিই, এসো।

সে তোকে আমি এমনি দিলুম।

সে হবে না। খেলে দাও, দয়া করে না।

পাগলা। বলে মা মেঝেতে শতরঞ্জি বিছায়, লুডোর ছক পাতে। আঁচলে ভারী চশমাটা মুছে নেয়। বলে, তুই একটু শুয়ে থাকলে পারতিস, রোদ্দুরে অত ঘোরাঘুরি করে এলি!

সে-কথায় কান না দিয়ে ললিত কাঠের ছোট্ট চালুনিটার মধ্যে খটাখট শব্দে ছক্কাটাকে নাড়ে। দান ফেলে বলে, দেখো মা, ছক্কা!

ইস! চোখে দেখি না ভেবেছিস। পাঞ্জা!

তবে আর একবার কাল দাও, এটা ট্রায়াল।

নে।

চালতে গিয়ে হাসে ললিত, নেব কেন! আমি কি উইক খেলোয়াড় নাকি!

মার একটা পোয়া পড়ল। হেসে গড়াল ললিত, এই তোমার ভাল দানের হাত!

ললিতের অবশেষে ছয় পড়ল। পর পর দু’বার। দেখে মা’র মুখ শুকিয়ে গেল, দেখিস, সাবধানে চালিস, তিন ছক্কা না হয়। হলে পচা।

আবার ছয় পড়ল। তিন ছক্কা। মা একটু ঝুঁকে বলল, পাঞ্জা, না? দুই ছয় পাঁচ তা হলে।

ললিত মাথা নাড়ে, না। তিন ছক্কা। পচা। তুমি দেখেও দেখছ না।

মা রাগ করে, ভাল করে চাল। চালুনিটা অত জোরে নাড়িস কেন? অলক্ষুণে অভ্যাস!

ললিতের এবার পোয়া পড়ল। মা একটুও খুশি হল না।

তুমি চালো এবার। বলে চালুনি এগিয়ে দিল ললিত।

মা’র পড়ল ছয়। দুই ছয়। দম বন্ধ করে দেখছিল ললিত। তিন ছয় না হয়। না, দুই ছয় তিন। মা’র দুটো গুটি বেরিয়ে গেল। ‘বাক আপ’ বলে চেঁচাল ললিত, এগিয়ে যাও মা, এগিয়ে যাও।

মা হাসে, তুই ভাল করে চাল। আমি ফাঁকা মাঠে এগিয়ে কী করব তুই সামনে না থাকলে!

আহা, সারা খেলায় আমার যদি ছয় না পড়ে আর!

দূর, তাই হয় নাকি!

হবে না কেন! এটা তো চান্সের ব্যাপার, না-ও পড়তে পারে।

তা হয় না। ছয় পড়বেই। ঠিক করে চাল।

পড়বেই! ছয় পড়বেই! গুনগুন করল ললিত। দেখল তার দানে পড়েছে দুই।

মা’র দানের হাত সত্যিই ভাল। অনিচ্ছায় চালছিল মা তবু ছক্কা-পাঞ্জার ছড়াছড়ি হতে লাগল। ললিত বলল, তোমার কপট পাশা— না কপট লুডো মা! তুমি মন্ত্র করে রেখেছ।

মা হাসে। খেলা এগোয়। পাঁচ-ছয়-তিন-দুই-চার-পোয়া।

মা’র একটা চাল দেখে ললিত চেঁচাল, তিনের মুখে আমার গুটিটা খাও মা।

ইস! মা মৃদু হাসে, ললিতের গুটি না খেয়ে অন্য গুটি চালে মা, বলে, গুটি খাব কেন! আমি আমার পাকা গুটি ঘরে তুলব।

হতাশায় ললিত দু’ হাত ওপরে তুলে বলে, এই তুমি পাকা খেলুড়ি? খাওয়ার গুটি খাচ্ছ না!

নিজের গুটি পাকাতে পারলে অন্যের গুটি কে খায়!

আমি কিন্তু খাব। ছাড়ব না।

খা না! খেতেই তো দিচ্ছি। তুই এগিয়ে যা তোর তো দানই পড়ছে না। ভাল করে চাল দেখি!

ললিতের গুটি খাওয়ার ঘরে পেয়েও এড়িয়ে যাচ্ছে মা, অন্য গুটি চালছে। নিজের গুটি এগিয়ে দিচ্ছে ললিতের গুটির মুখে মুখে। আমার গুটি খা ললিত, তুই এগিয়ে যা। তুই সামনে না থাকলে ফাঁকা মাঠ। ধু-ধু মাঠ। আমি কার দিকে এগোব, কোন ঘরের দিকে!

খেলা তাই জমে না। হেলা-ফেলা করেও মা-ই এগিয়ে যায়। ললিত পিছনে পড়ে। হাসে। বলে, খেলা জমছে না, মা।

তোর দান আমি চেলে দিই ললিত? আমার দানের হাত ভাল।

দূর। তাই হয় নাকি! খেলা খেলাই, যার দান তার দান। তুমি ফেললে দান তোমার হয়ে গেল।

মা লজ্জা পেয়ে হাসে। যখন মা’র বয়স আরও কম ছিল তখন মা মাঝে মাঝে গুনগুন করে গান গাইত। রামপ্রসাদি। সে-সব গানের এক-আধটা ললিতের প্রিয় ছিল। সে তার মা’র মুখে শোনা প্রিয় একটা লাইন গুনগুন করছিল, মায়ে পোয়ে মোকদ্দমা মা, ডিক্রি হবে এক সওয়ালে…

একটি-দু’টি করে পাড়ার বুড়িরা দরজায় দেখা দিতে লাগল, কী হচ্ছে গো, ললিতের মা!…ওমা, তুই যে আজকাল বড় লক্ষ্মী হয়েছিস ললিত!…মায়ে পুতে খেলা, জবর খেলা গো, হারজিত আছে, না নেই?

ললিত ঝুঁকে মা’র কানে কানে বলে, মা, তুমি হচ্ছ এ-পাড়ার সব বুড়িদের মধ্যে হিরো। হিরো-বুড়ি। তোমাকে না দেখে দেখো সব দলে দলে আসছে।

ঘরে বুড়িদের জটলা হয়ে গেল। মাঝপথে খেলা ভেঙে উঠে পড়ল ললিত, বলল, এবার তোমরা খেলো, মা।

তুইও বোস না।

আমি একটু খোলা হাওয়ায় যাই।

কোথায় যাবি আবার! দুপুর রোদ এখন।

গলির মধ্যেই। একটু পায়চারি করি।

অন্য বুড়িরা কাছে থাকলে মা’র সামনে সিগারেট খায় না ললিত। তার ধারণা তাতে মাকে অপমান করা হয়। সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বালিশের খাঁজ থেকে তুলে নিয়ে সে গলিতে বেরিয়ে আসে। দরজা থেকে মুখ ফিরিয়ে দেখে ছয়-সাতজনের ভিড়ের মধ্যে মা বসে আছে। হিরো-বুড়ি। তোমার দলে তুমি হিরো মা, আমার দলে আমি কিন্তু হিরো নই। বাক আপ মা, আপনমনে হাসল ললিত। তুমি এগিয়ে যাও তো! দেখি কেমন আমাকে ছাড়া পারো।

ঘন ছায়ায় ঠান্ডা হয়ে আছে গলিটা। গলির মুখেই তেজি রোদ। ছুরির মতো ধারালো হয়ে আছে রোদ ও ছায়ার সীমারেখাটুকু। সেই রেখাটার ধারে দাঁড়াল ললিত। চোখ বুজে ভাবল সে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্রহ্মপুত্র নদী— তাদের গাঁয়ের পাশ দিয়ে যা বয়ে যেত। না, দেশের কথা তেমন মনে নেই ললিতের। সে তখন ছোট, মা তখন এত বুড়ি নয়, আর বাবা বেঁচে আছে তখনও। মনে পড়ে সে তখন সাঁতরে গাঙ পার হত, গাছে উঠত। আশ্চর্যের বিষয়, কলকাতায় এসে তার কোনও দিন গঙ্গায় নামতে তেমন তীব্র ইচ্ছে হয়নি। দেশগ্রামের সঙ্গে সঙ্গেই যে যেন তার সাঁতার আর গাছে-ওঠাও ফেলে এসেছে অনেক দূরে, ভিন দেশে। সেইখানে ফিরে গেলে আবার এক বার ফিরে পাওয়া যেতে পারে সেই সাঁতার কিংবা সেই কাঠবেড়ালির মতো গাছ-বাওয়া! দেশ ভাগের পর একদিন দূরের স্টেশনে ট্রেন ধরার জন্য শেষ রাতে তারা গ্রাম ছেড়ে এল। খুব বেশি কিছু মনে নেই ললিতের, শুধু মনে আছে ঘুমচোখে শেষরাতের অন্ধকারে পা ফেলতে গিয়ে সে তাদের উঠোনে বিষ-পিঁপড়ের ঘর ভেঙেছিল। বিদ্যুৎ চমকের মতো তার পায়ের পাতা থেকে ঊরু পর্যন্ত উঠে এসেছিল পিঁপড়ের কামড়। বিষ-যন্ত্রণা। চিৎকার করে কেঁদেছিল সে, আর বাবা চাপা গলায় কাকুতি মিনতি করে বলছিল ‘চুপ কর ললিত, চুপ কর।’ আর হাত ধরে জোরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তাকে। তখনও ঘুমচোখ, মাথায় স্বপ্নের বাসা, দিকহীন শেষরাতের আবছা অন্ধকারে বাবার হাত ধরে কোন পথে কোথায় যে যাচ্ছিল ললিত!

ক্রমে ক্রমে আর সবকিছুই আবছা হয়ে গেছে। এখন আর ঠিকঠাক সব মনে পড়ে না। কেবল মনে আছে পায়ের পাতা থেকে ঊরু পর্যন্ত সেই বিষ-পিঁপড়ের কামড়। সেই বিষ-যন্ত্রণা। এত স্পষ্ট যে আজও হঠাৎ মনে পড়লে তার ভিতরকার এক ছোট্ট ললিত যন্ত্রণায় মোচড় খেয়ে ওঠে। ওই উঠোনে কত দাপিয়ে বেড়িয়েছে ললিত। কোনও দিন পিঁপড়ের ঘর নজরে পড়েনি। সেদিন তবে তাদের চেনা উঠোনে কোথা থেকে এসেছিল সেই পিঁপড়ের বাসা? কোথা থেকে?

কে জানে?

মা কেবল গল্প করে। নদী, নৌকো আর গাছগাছালির গল্প। মাছ, ধান আর পিঠে-পায়েসের গল্প। একঘেয়ে, তবু মাঝে মাঝে কান পেতে শোনে ললিত। মায়ের গলায় জল-মাটির নোনা আর সোঁদা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে যায়। তবু সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে সেই পিঁপড়ের কামড়, শেষরাত্রির আবছায়া ঘুম ও স্বপ্নের মধ্যে এক অলৌকিক নিরুদ্দেশ যাত্রা।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%