অষ্টাবিংশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আটাশ

পলাশপুরে ভদ্রলোকের বসত যত বাড়ে ততই ভাল। গাঁখানা ছেলেবেলা থেকেই রক্তে মিশে আছে। আগে একেবারেই চাষাভুষোর গাঁ ছিল। এখন ধানকল, বি ডি ও-র অফিস, জাতীয় সড়ক আর হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল হয়েছে। আরও ভদ্রলোক আসুক, বসত বাড়ুক। বর্ণ হিন্দুরা না থাকলে গাঁ গ্রামের মধ্যে নিরেট একটা অন্ধকার টের পাওয়া যায়। বউ পেটানো, ছেলেকান্না, মুখখিস্তি। বসন্ত সিংহি জন্মকালেও এ-গাঁয়ের বাতাসে একছত্র সংস্কৃত শ্লোক উচ্চারিত হতে শোনেনি। চালচলনে কারও সহবত ছিল না। লোকে বুঝত তালের রস মানেই তাড়ি। এখন গাঁয়ের চেহারা পালটেছে। ভদ্রলোক এবং সত্যিকারের ভদ্রলোক আরও আসুক। ঝলমল করে উঠুক গাঁখানা।

তুলসীকে তাই নিজের বাড়িখানা সযত্নে ঘুরে ঘুরে দেখাল বসন্ত সিংহি। উঠোনে টিউবওয়েল, পাকা পায়খানা, উঁচু ভিতের বাড়ি। বিধবার সম্পত্তি। খুড়িমা শেষ জীবনটা বসন্ত সিংহির ঘাড়ে পড়েছিল। বদলে লিখে দিয়েছিল জমিখানা। উনিশশো পঞ্চাশে তুলেছিল বাড়িখানা। টিনের চালওলা দু’খানা পাকা ঘর, পাকা ভিত। সরকারি অফিসকে ভাড়া দেওয়ার মতলব ছিল। কিছু দিন ব্রিজ-কনস্ট্রাকশনের অফিসাররা থেকেছিল। তারপর এক সময়ে জুনিয়ার হাইস্কুলটা এক লাফে হাই হয়ে গেল, বাঙালদের আগমনে বসতি বেড়েছিল কিছু, স্কুলে ছেলে ধরে না। তখন উঁচু দিকের কয়েকটা ক্লাস বসত এইখানে। মাগনাই ছেড়ে দিয়েছিল বসন্ত। আহা, বিদ্যাশিক্ষা হলে বাড়ি পবিত্র হয়।

তুলসী উঠোনের পিছন দিকটা ঘেরা নেই বলে ভ্রূ কোঁচকাল, ও-পাশ থেকে বাড়ির ভিতরটা যে দেখা যায়!

বসন্ত সিংহি হাসে, দেখা যায়! কিন্তু দেখবে কে? ওদিকটা পতিত জমি, জঙ্গল।

শেয়াল-ফেয়াল ঢুকে পড়তে পারে।

ঘিরে দেব। ভাববেন না।

ভদ্রলোক আসছে পলাশপুরে। তার জন্য না হয় খরচা একটু হলই।

ভাড়া মাত্র ত্রিশ। তুলসী মনে মনে খুশিই হচ্ছিল। এই বাসাখানা তার হবে। একান্তই তার আর মৃদুলার। সে পরিবারের কর্তা। ব্যাপারটা ভাবাই যায় না। এতকাল পরে স্বাধীন হচ্ছে তুলসী।

তুলসী তবু বলল, একদিন আমার ওয়াইফকে নিয়ে আসব। সে পছন্দ করলে তবে—

বসন্ত সিংহি হাসে, মা লক্ষ্মী কলকাতার মানুষ। পছন্দ হবে না জানি। তবে দেখবেন থাকতে থাকতে অসুবিধেগুলো আর লাগবে না।

সন্ধেবেলা বাসায় ফিরে মৃদুলাকে গোপনে বাসাটার বর্ণনা দিল তুলসী।

মৃদুলা ম্লানমুখে বলল, আমার এ অবস্থায় টিউবওয়েল পাম্প করা কি সম্ভব হবে?

দূর! ও তো আমি করে দেব। তখন হাতে কত সময় পাওয়া যাবে। সকাল থেকে পৌনে এগারোটা পর্যন্ত ছুটি। আবার বিকেলে তিনটে কি চারটে থেকে। অত সময় নিয়ে আমি করব কী? কত ঘরের কাজ করে দেব দেখো।

মৃদুলা তারপর শুকনো মুখে বলে, দাদাকে কীভাবে বলবে? মুখোমুখি বলতে পারবে?

তুলসীর দাদা নারায়ণ গম্ভীর মানুষ। একটু বোকাও। ছেলেবেলায় সবাই বলত বোকা নারাণ। গবেট ছাত্র ছিল। কিন্তু ঘষে ঘষে বেরিয়ে গেল ঠিকই। যে বছর পাকিস্তান হয় সে বছর পাকিস্তান আর হিন্দুস্থান দু’ জায়গায় ম্যাট্রিক দিয়েছিল নারায়ণ। দুটোতেই পাশ করেছিল থার্ড ডিভিশনে। তারপর বি এ পর্যন্ত পাশ করে ফেলল ব্যাঙ্কে কেরানির চাকরি করতে করতে। নোয়াখালি ব্যাঙ্ক ফেল করলে চাকরি পেল রেলে। দুরে বদলি করায় চাকরি ছেড়ে ঢুকল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাজনা বিভাগে। সবাই বলত নারায়ণের কপালটাই ভাল। সেই তুলনায় ছাত্র ভাল ছিল তুলসীই। কিন্তু কার্যকালে তুলসী মফস্সলের মাস্টার। দাদা অফিসার, নাকতলায় দেড় কাঠা জমি কিনেছে। এখন খুব গম্ভীর দেখায় দাদাকে। মুখোমুখি আলাদা বাসা করার কথা বলতে ভরসা পায় না সে। বিয়ের পর এখনও মাস দুয়েক কাটেনি, এর মধ্যে ভাগ হওয়ার কথা বলাই যায় না।

তবু বলতেই হবে।

তুলসী একটু ভেবে বলে, টেলিফোনে বলব।

মৃদুলা হেসে ওঠে, কী বুদ্ধি!

তবে?

মৃদুলা ম্লানমুখে বলল, যে ভাবেই আলাদা হও ঠিক আমার ঘাড়ে দোষ পড়বে।

অনেক দিন হয় মৃদুলা তার মা আর ভাইকে দেখে না। বাবাও সময় পান না আসার। এক-একবার ইচ্ছে করে বেহালার বাসায় যায়। কাপড়ের ঢাকনা-দেওয়া তানপুরাটা এখনও দাঁড় করানো আছে শোওয়ার ঘরের বেঞ্চিটার এক কোণে। পাশে রাখা আছে গদিতে ঢাকা তবলা আর পেতলের ডুগি। ধুলো পড়ছে। বাবাকে বলেছিল ওগুলো দিয়ে যেতে। বাবা আনেনি। পলাশপুরে চলে যাওয়ার আগে একবার বেহালার বাসায় ঘুরে আসতে ইচ্ছে করে খুব। কত কালের পুরনো বাসা তাদের, চোখ বেঁধে দিলেও মৃদুলা ঠিক এ-ঘর ও-ঘর চলে যেতে পারবে। কিন্তু যাওয়া যায় না। এখনও বিভুর দলবল ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে।

রাত্রে শোওয়ার আগে মৃদুলা একটা পোস্টকার্ডে মাকে চিঠি লিখে জানাল যে তারা শিগগিরই পলাশপুরে বাসা নিয়ে চলে যাচ্ছে। শেষে লিখল, একবার পলাশপুর এসো। কলকাতায় তো আর দেখা হবে না। আমার খবর তো জানোই। আর সাত-আট মাস পরে কী হবে ভাবতেই ভয় করে। যদি না-বাঁচি তবে আর দেখাই হবে না। পলাশপুরে কিছু দিন গিয়ে থেকে এসো বাবা আর টুপুকে নিয়ে…

লিখতে লিখতে কয়েক বার চোখের জল মুছল মৃদুলা।

রাত্রে পাশাপাশি খেতে বসে তুলসী কাঁপা বুকে একসময়ে দুম করে কথাটা বলে ফেলল। আশ্চর্য এই, নারায়ণকে খুব দুঃখিত বা ভেঙে পড়া দেখাল না। বরং মুখের রেখাগুলো সহজ আর চোখ দুটোয় একটু অবিশ্বাসের ভাব দেখা গেল। যেন স্বস্তি।

বলল, কীরকম বাসা? ভাল?

খুব। এক্কেবারে আলাদা।

কেবল পিতু ভীষণ আশ্চর্য হয়ে বলল, কাকিমাকে নিয়ে যাবে?

তুলসী মাথা নিচু করে রইল।

বউদি ধমক দিয়ে বলল, না তো কী! হাত পুড়িয়ে রেঁধে খাবে দু’ বেলা? তারপর তুলসীর দিকে চেয়ে হেসে বলল, একটা তবু জায়গা হল বেড়াতে যাওয়ার।

বউমার যত্ন-টত্ন নিতে পারবি তো!

খামোখাই মৃদুলাকে বউমা ডাকে নারায়ণ। ওর মুখে বেমানান আর বুড়োটে লাগে। নাম ধরে ডাকলেই তো পারে। আসলে নারায়ণের ধারণা বাবার অভাবে সে-ই তুলসীর বাবার জায়গা দখল করে আছে।

খুবই নিশ্চিন্ত লাগল তুলসীর। কথাটা বলে ফেলা গেছে।

রাতে মৃদুলা ঘুমোয়। দুশ্চিন্তায় জেগে থাকে তুলসী। দেখে, কেমন লাবণ্যহীন হয়ে গেছে মৃদুলার মুখ। ঠোঁট শুকনো, চোখের কোল কালো, হনুর হাড় দুটো জেগে উঠছে। রাতে খাওয়ার পরই বমি হয়ে গেছে। ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে বিকেলে দুটো চপ এনেছিল তুলসী। মশারির মধ্যে বসে সেই চপ দুটো খাচ্ছিল যখন তখনই মৃদুলাকে খারাপ দেখাচ্ছিল। আজ সকালে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমোচ্ছিল মৃদুলা, মুখখানা হাঁ করা, গাল বসা, শরীরটা যেন মুচড়ে আছে ব্যথা-বেদনায়। ওর খোলামেলা বিশৃঙ্খল শরীর দেখে একটুও কাম জাগেনি তুলসীর। বরং বড় উদোম মাঠের মধ্যে যখন হাওয়া বয়ে যায় তেমনি হা-হা করে উঠেছিল তার বুক, মৃদুলা কি বাঁচবে?

তুলসী ঠিক করল এবার থেকে সে ভিখিরিকে ভিক্ষে দেবে, যথাসম্ভব ভাল কাজ করবে রোজ দু’-একটা, পবিত্র থাকবে। থাকা দরকার। মাঝে মাঝে কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বরে নিয়ে যাবে মৃদুলাকে।

পলাশপুরে নিয়ে গিয়ে একটুও কাজ করতে দেবে না মৃদুলাকে। সে জল তুলবে নিজে, বিছানা পাড়বে, রান্নার লোক রাখবে একজন, যদি পয়সায় কুলোয়। পলাশপুরে গেলে সব হবে।

ললিত একদিন হাসপাতাল থেকে চেক-আপ করিয়ে এল। অল্পবয়সি ডাক্তারটি হেসে বললেন, শরীর তো ঠিক আছে। এবার কাজকর্মে লেগে পড়ুন। ঘরে বসে থাকার আর দরকার নেই।

আবার যেন সেই পুরনো দিনে ফিরে গেছে ললিত। ক্লাস-ঘরের নোংরা দেয়ালে পেন্সিলে লেখা জ্যামিতির উপপাদ্য, ইতিহাসের রাজাগজার নাম আর সন-তারিখ, বিজ্ঞানের যন্ত্রের ছবি, কিংবা সরল অঙ্ক, ভূগোলের জলবায়ু। যত দূর হাত পৌঁছেছে তত দূর দেয়ালে যথাসম্ভব লিখেছে ছেলেরা। হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা গেছে কিছু দিন আগেই।

পড়াতে পড়াতে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যায় ললিত। ছেলেদের মুখগুলি বাতাসে ভেসে ভেসে হঠাৎ কতগুলি শূন্য হয়ে যায়। পড়ানো থামিয়ে ললিত জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকে। পশ্চিমের আকাশে মেঘস্তর। কখনও বা দেখে তিনতলার ছাদ থেকে উড়ছে মেরুন রঙের শাড়ি। কখনও বা জানালার পাশের দেয়াল বেয়ে একটা বেড়াল কেমন নিঃশব্দে হেঁটে লাফ দিয়ে কার্নিসে উঠে যায়। কত হাজার দৃশ্য দেখা যায়।

আজকাল তার ক্লাসে ছেলেরা খুব একটা শব্দ করে না। আগে গল্প বলুন স্যার বলে জ্বালিয়ে খেত, আজকাল নিঃশব্দে চেয়ে থাকে। ললিত স্যার তাদের বড় প্রিয় ছিল। কেউ হয়তো তাদের বলে দিয়েছে যে, ললিত স্যার আর বেশি দিন থাকবেন না। তাই কখনও কখনও ললিত টের পায় মুখের ভিড়ের ভিতরে একটি-দু’টি চোখ যেন তার দিকে চেয়ে ছলছলিয়ে ওঠে।

গিরিজা হালদার ক্যাশ ক্লার্ক। জালে-ঘেরা কাউন্টারের ও-পাশে বসে থাকে, তার গম্ভীর হিসাবমনস্ক মুখ। আগে মাঝে মাঝে কাউন্টারের ঘুলঘুলির সামনে ক্লাসে যাওয়ার পথে ললিত দাঁড়িয়ে দেখত হালদার কালেকশনের টাকা গুনছে। সে ঘুলঘুলির ভিতরে হাত ঢুকিয়ে অদৃশ্য রিভলভার উঁচিয়ে বলত, হ্যান্ডস আপ। হালদার হাসত। কখনও বা অকারণে হালদারের সামনে রাখা রবার স্ট্যাম্প তুলে দেয়ালে ছাপ বসাত। হালদার চেঁচিয়ে কপট রাগ দেখাত।

পোলাপান আর কারে কয়? আপনে কি ছ্যামরাগো পড়াইতে আহেন, না তাম্শা করতে? তবু ললিতের এই ছেলেমানুষি হালদারের প্রিয় ছিল। বিনা দরখাস্তে অনেক বার ললিতের ক্যাজুয়াল ছুটি মঞ্জুর হয়েছে, যা ললিত টেরও পায়নি। আজকালও ঘুলঘুলির সামনে দাঁড়ায় ললিত। হালদার শরীর ঠিক রাখার উপদেশ দেয়, চোখে চোখ রাখে না। রবার স্ট্যাম্প তুলে নিয়ে আগের মতোই দেয়ালে ছাপ বসায় ললিত, হালদার আপত্তি করে না, কেড়ে নিতে হাত বাড়ায় না। যত খুশি স্ট্যাম্প মারো, ইচ্ছেমতো মেরে নাও। আর কী কী করতে ইচ্ছে করে তোমার? খেলাটা তাই জমে না। রবার স্ট্যাম্পটা রেখে দেয় ললিত। মায়ের সঙ্গে সেই লুডো খেলাটাও জমেনি। এখন সবাই তাকে দান ছেড়ে দেয়।

তবু সেই পুরনো স্কুলবাড়িতে সেই পুরনো দিনগুলির স্মৃতি ছায়ার মতো দোল খায়। টিচার্স রুম-এর দেয়ালে বিখ্যাত মনীষীদের উইয়ে-খাওয়া ফোটো। সেই আলমারির ওপরে গ্লোব। মেয়ে-দেখা চেয়ার, যে-চেয়ারে বসলে রাস্তার পথ-চলতি মেয়েদের দেখা যায়। বিভূতিবাবুর সঙ্গে অনেক বার চেয়ারটা নিয়ে কাড়াকাড়ি করেছে ললিত। এখন চেয়ারটা তার জন্য খালি রাখা হয়। ললিত বসে না।

ক্লাস এইটের মাধব মুকুন্দ-বেয়ারার ছেলে। টিফিনে সে ক্লাস থেকে এসে মাস্টারমশাইদের চা দিয়ে যায়। ছেলেরা সেই কারণে তাকে খেপায়। মাধব এখন বড় হয়ে গেছে একটু। স্কুলের ফুটবল টিমে খেলছে। বাপ তাকে ক্রমশ সমীহ করছে। ললিত লক্ষ করে এ-সব।

ক্লাস নাইনের হরেনকে দেখে অনেক দিন আগেকার একটা দৃশ্য মনে পড়ে যায়। হরেনকে ভরতি করতে এসেছিল ফরসা গোলগাল সুন্দর চেহারার এক ভদ্রলোক। পোশাকে বনেদিয়ানা, স্কুলের সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে। লোকটাকে চিনতে পেরেছিল ললিত। একসময়ের বন্ধু। ললিত পরিচয় দিতেই লোকটা একটু ঘাবড়ে গেল, হেসেটেসে বলল, তুমি এই স্কুলে! বাঃ বেশ ভালই হল।

ললিত জিজ্ঞেস করল, কাকে ভরতি করতে এসেছ?

লোকটা খুব অপ্রস্তুত হয়ে লাজুক অপরাধী গলায় বলল, আমি তো জানতাম না যে, তুমি এই স্কুলে আছে। আমি—

গলা খুব নিচু করে ললিতের কানে কানে বলল, যাকে ভরতি করতে এনেছি সে আমার ডোমেস্টিক সার্ভেন্ট। পড়াশুনোয় ঝোঁক আছে বলে— বলতে বলতে লাল হয়ে গেল লোকটা।

সাম্যবাদে বিশ্বাসী ললিত। তবু হঠাৎ তার মনে একটা কোথাও ধাক্কা লেগেছিল। সেটা নিশ্চয় দুর্বলতা। আমি শালা তোমার চাকরকে পড়াব? পরমুহূর্তেই দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে অতিরিক্ত উৎসাহে ললিত চেঁচিয়ে উঠেছিল, খুব ভাল, এই তো চাই।

ললিত হরেনকে বেশিরকম নজরে রাখত। লাভ হয়নি। হরেনের মাথা ভাল না, বোকা। কিন্তু বহুকাল হরেনের কাছে সহজ হতে পারেনি ললিত।

মাঝে মাঝে সঞ্জয়ের টেলিফোন আসে। ললিতকে ক্লাস থেকে ডেকে আনে বেয়ারা, হেডমাস্টার হাত বাড়িয়ে রিসিভার তার হাতে দেয়, তারপর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। নিয়ম হল, ফোন এলে কাউকেই ক্লাস থেকে ডেকে দেওয়া হবে না, তাতে ক্লাসের ক্ষতি। শুধু ‘ফোন এসেছিল’ এই খবরটা দেওয়া হবে। কিন্তু ললিতের বেলায় এই নিয়মটা ভাঙা হয়েছে। হেডমাস্টারের যে-চোখে ললিতের দিকে তাকানো উচিত ঠিক সেইভাবে উনি আজকাল তাকান না, বরং তাঁর চোখে একটা ‘আহা’ ভাব।

এ-সবই হয়তো সত্য। কিংবা ললিত কল্পনা করে। আজকাল সে বড় স্পর্শকাতর হয়ে গেছে।

অক্টোবরের প্রথম থেকেই শীতের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। সন্ধেবেলা কুয়াশা হয় আজকাল। রাত গভীর হলে জানালায় দাঁড়িয়ে বাইরে একটা বিদেশি রহস্যময়তাকে প্রত্যক্ষ করা যায়। পুজোর ছুটির আর দেরি নেই।

একদিন টিফিনের আগে তুলসী এসে হাজির।

চল, একটা সিনেমা যাই।

সিনেমা!

ললিত সিনেমার কথা ভুলেই গিয়েছিল। কতকাল আর সিনেমা দেখা হয়নি।

তুলসী বিমর্ষ মুখে বলে, পলাশপুরের বাসার ভাড়া আগাম দিয়ে এলাম। পুজোর ক’টা দিন কাটিয়ে লক্ষ্মীপুজোর পর চলে যাচ্ছি। আর সিনেমা-ফিনেমা দেখা হবেই না।

টিফিনেই বেরিয়ে পড়ল দু’জন। ললিত হেডমাস্টারকে বলতেই উনি ঘাড় নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, চলে যান, ক্লাস ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে।

ম্যাটিনিতে একটা বেলেল্লা ছবি দেখল দু’জনে। ললিতের মনটা খারাপ ছিল। তুলসীটা দূরে চলে যাচ্ছে। এখন কেউ একটু দূরে যাচ্ছে শুনলে কেমন যেন হাহাকারে ভরে যায় বুক। আর কয়েকটা মাস থেকে যেতে পারলি না তুলসী? আমার খাটের এক কোণে তোর কাঁধ দেওয়ার কথা ছিল যে! দিবি না? অতদূরে কে তোকে খবর দেবে সময়মতো?

পর্দার চলন্ত ছবির দিকে চেয়ে দু’ চোখ ভরে জল আসছিল। হয়তো বহুকাল পরে দেখছে বলেই পরদার আলো চোখে সহ্য হচ্ছে না, কিংবা হয়তো মন অজান্তে তুলসীর চলে যাওয়ার কথা ভাবছে। চেয়ারের হাতলে রাখা তুলসীর রোগা হাতখানার ওপর নিজের হাতখানা রাখে ললিত। অন্যমনস্কভাবে বসে থাকে। অনুভব করে সুখে দুঃখে তাদের পুরনো বন্ধুত্ব।

সিনেমার পর তুলসী বলল, চল একটু হাতিবাগানে গিয়ে পুজোর জামা-কাপড় কয়েকটা কিনে আনি। সাউথে বড্ড দাম।

তুলসীর পকেট গরম। সিনেমা হলের সামনে ছ’টার শোয়ের একটা দল নামছিল ট্যাক্সি থেকে। খোলা দরজা দিয়ে ফুড়ুত করে ট্যাক্সির মধ্যে চলে গিয়ে তুলসী ডাকল, আয়।

সেই পুরনো দিনের মতো। অবিকল পুরনো দিনের মতো।

ট্যাক্সি থামিয়ে মিষ্টির দোকানে তারা ছানার মিষ্টি খায়।

তুলসী খুশি গলায় বলে, খা। যা খুশি খা।

ফাঁসির খাওয়া খাওয়াচ্ছিস!

মৃদুলার জন্য একটা বিষ্ণুপুরি সিল্কের শাড়ি কিনল তুলসী। লাজুক গলায় বলল, আমি ওকে সোনাদানা কিচ্ছু দিইনি। প্রথম পুজোটা বিয়ের পর, তাই। নইলে তাঁত-ফাঁত দিতাম।

ললিতের মায়ের কথা মনে পড়ে যায় হঠাৎ। অনেককাল মাকে কাপড়-চোপড় দেওয়া হয়নি। মা কখনও কিছু বলে না। আগেকার পাড়ওলা শাড়িগুলোই এখনও পরে।

কে জানে তার জীবনের এটাই শেষ পুজো কি না। একটা সরু কালোপেড়ে কাপড় মায়ের জন্য কিনল ললিত। আর একটা সুন্দর ছাপা শাড়ি কিনল।

তুলসী অবাক হয়ে বলে, শাড়ি কার জন্য?

তোর বউয়ের জন্য। চল, আজ তোর বউকে দেখে আসি। তুই তো শালা ডাকলিই না।

তুলসী ভীষণ খুশি হয়, বলে, চল শালা, মালটা দেখিয়ে দিই।

বড় মিষ্টি বউটি তুলসীর। ললিতের নাম শুনে প্রথমটায় থতমত খেয়ে গেল। একটু অবাক চোখে দেখল ললিতকে। তারপর হাতজোড় করে বলল, ওঃ—আপনিই—আপনিই—

এর চেয়ে বেশি কিছু তার বলার নেই। ললিত বোঝে।

শাড়িটা দিতেই ভীষণ লজ্জা পায় মৃদুলা। ‘এ-সব কেন’ বলে মৃদু আপত্তি করে আদরে শাড়িখানা নিয়ে বুকের কাছে ধরে রাখে একটু। ললিত নামে একজন মৃত্যুপথযাত্রীর দেওয়া বলে শাড়িখানাকে মনে মনে সম্মান করে সে। এ-সবই বুঝতে পারে ললিত।

পিতু এসে ললিতের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। বলে, ললিতকাকা, সেই কবে বলেছিলে একটা সিনেমা দেখাবে—

তুলসীর বউদি আসে। চোখ বড় করে বলে, ওঃ মা! কী ভাগ্যি ঠাকুরপো! কী একটু অসুখ হয়েছিল শুনলাম, তারপর থেকে দেখা নেই!

বাচ্চারা ঘরে এসে ভিড় করে।

এ-রকম চমৎকার দিন আসে এক-একটা। ঠিক সেই আগেকার মতো স্বাভাবিক, সুন্দর, হালকা দিন। তখন ব্যাধিটার কথা মনেও থাকে না।

তুলসীর বউ দুধের গ্লাস আর সন্দেশ নিয়ে এসেছিল। তাকে ফিরিয়ে দিল ললিত। বলল, ও-সব নয়। চা খাব। অনেককাল খাই না।

মৃদুলা ইতস্তত করছিল, তুলসীর দিকে তাকিয়েছিল একটু, ললিত হালকা ধমক দিল, চা আনুন।

অনেকক্ষণ সময় কাটাল ললিত।

মৃদুলা বলল, একবার পলাশপুরে আসবেন। ওখানে তো আমাদের সময় কাটবে না।

যাবে। ললিত যাবে।

বেরোবার মুখে তুলসী সঙ্গ ধরে বলল, চল পৌঁছে দিয়ে আসি। ললিত তাকে ফিরিয়ে দেয়, দূর শালা, নিজেকে একটু নর্মাল ভাবতে দে আমাকে।

একা একা রাস্তায় খানিক ঘুরল ললিত। স্বপ্নের মতো এক-একটা দিন আসে, যখন আগেকার সবকিছু ফিরে পাওয়া যায়।

সন্ধে পার করে ফেরার পথে বাসায় না ফিরে বিমানকে দেখতে গিয়েছিল ললিত।

বন্ধ দরজার বাইরে থেকেই শুনতে পেল, ভিতরে বিমান একা একা অনর্গল কথা বলছে।

আজ বিমানের চোখ অনেকটা ঘোলাটে লাল হয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে কথার তাল থাকছে না।

সে জোর করে মাথা ঠিক রাখার চেষ্টা করছিল। ললিতকে দেখে ক্ষীণ শুকনো হাসি হাসল একটু। এনে বসাল বিছানার ওপর। তারপর নিজের হাতে চা করতে বসল। অনেক বার চায়ের বাসনকোসন কেটলি, চামচ, জমাট দুধের কৌটো গোলমাল করে ফেলছিল সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় আধ ঘণ্টার চেষ্টায় সে দু’ কাপ চা বানিয়ে ফেলল। চা বানাবার সময়ে অনর্গল কথা বলছিল সে, কাকে বলছে তা সবসময়ে খেয়াল থাকছিল না। মাঝে মাঝে হাসছিল।

ললিত তাকে জোর করে পাশে বসাল। কাঁধে হাত রেখে বলল, কী হয়েছে বিমান?

বিমান কথার তাল রাখতে পারছে না। কেবল বড় কষ্টের সঙ্গে বলে, সব ব্যাপারই কেমন খারাপের দিকে চলে যাচ্ছে দেখছ! অথচ কত সুন্দর হতে পারত সবকিছু!

অনেকক্ষণ তারপর চুপ করে থাকে বিমান। আস্তে আস্তে বলে, এবার আমার একদম ইচ্ছে করছে না।

কী? ললিত আকুল প্রশ্ন করে।

এই পাগল হয়ে যেতে।

বড় কষ্ট হয় ললিতের। চুপ করে থাকে।

ফেরার পথে অশ্বত্থ গাছটার তলায় ঝুঁঝকো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায় ললিত। ভাবে। সে নাড়াবুনে হয়েও একদিন সেজেছিল কীর্তনীয়া। মানুষের মুক্তির কথা বলেছে কত! হায়, এই পাগলের জন্য সে কিছুই করতে পারে না।

রাতে ঘরে ফিরে ললিত শুয়ে ছিল একা। চুপচাপ। শরীর ভাল ছিল না, তার চেয়েও খারাপ ছিল তার মন। কোনও একটা দিনই সম্পূর্ণ ভাল যায় না কখনও। তার মাথার মধ্যে বিমানের কথা দু’টি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এইবার আমার একটুও ইচ্ছে করছে না, পাগল হয়ে যেতে।

কত কথা ভাবে ললিত। এক দুঃখবোধ আরও দুঃখের ঝরনা খুলে নেয়। বুকের ভিতরে কী একটা খামচে ওঠে। আর কত দিন! কত দিন আর! সে মরে যাওয়ার পরও সবাই থেকে যাবে। তুলসী হাঁটুর ওপর ধুতি তুলে স্কুলে যাবে। সঞ্জয় গাড়ি চালিয়ে ফিরবে তার রিনি আর পিকলুর কাছে। শাশ্বতী হয়তো তার প্রেমিকের সঙ্গে হেঁটে যাবে দোকানের আলোয়, ফুটপাথ ধরে, অনির্দিষ্টভাবে। কিংবা আদিত্যই ফিরে আসবে নাকি! আহা আদিত্য! কত দিনের বন্ধু তার! কেটে গেল শালা। আবার আসবে কি ফিরে! ললিত মরার আগে এসে ডাকবে, কী রে লোলিটা?

শম্ভু এসে দরজায় মুখ বাড়িয়ে বলল, ললিতদা, একজন আপনাকে খুঁজছে।

আলসেমি ভেঙে উঠল ললিত।

গলির মুখে এসে দেখল আবছায়ায় একটা লম্বা লোক দাঁড়িয়ে আছে। হাতে টিনের সুটকেস আর ছোট্ট বিছানা।

কে?

ললিত, আমি রে, আমি রমেন। তোর কাছে এলাম।

হঠাৎ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে গেল ললিতের বুক। কতকাল…কতকাল দূর থেকে তার কাছে কেউ আসেনি!

রমেন! দু’হাত বাড়িয়ে ললিত বলল, আয়।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%